Monday, September 9, 2024

‘ছবির ভিতরে জীবনকেই ফিরে দেখা’/ তমালশেখর দে

 

                  

 ‘ছবির ভিতরে জীবনকেই ফিরে দেখা’

                       তমালশেখর দে    



    

 

বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রকর পিকাসো একবার বলেছিলেন, ‘আমি ছবি আঁকি, যেমন কেউ আত্মজীবনী লেখে।’ তার মানে, এক অর্থে শিল্প শিল্পীর যাপিত জীবনের  বহিঃপ্রকাশ।তুলির ভিতর দিয়ে আসলে তার মনোভাবনাই কথা বলে। দর্শন পড়ে, না-পড়ে প্রত্যেক শিল্পীই গোপনে একটা জীবনদর্শন অনুসরণ করেন। তাঁরা ইচ্ছে করে,   দর্শনের ভাষায় কথা বলেন না হয়ত, কিন্তু তাদের শিল্প থেকে সব সময়েই একটা জীবনদর্শন বিচ্ছুরিত হয়ে থাকে। হতে বাধ্য। তা সে জীবন নিয়ে হোক, সমাজ নিয়ে, দেশ নিয়ে, প্রেম নিয়ে, এমন বহুভাবেই হয়ে থাকতে পারে। প্রত্যেক শিল্পীর সেই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে খোঁজার জন্য, তার ছবির ভিতরের রহস্যময় ছায়াপথের ভ্রমণ করতে করতে প্রায় প্রতিটি প্রদর্শিত ভাবনা-প্রতীকের সামনে থেমে থেমে গেছি কিছুক্ষণের জন্য।  কোন কোন ছবির সামনে এই ক্ষণ গড়াতে গড়াতে কখন যে মুহূর্তের পর মুহূর্তে অকাতরে গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। কবিতা যদি চিত্রকল্প হয়  তবে ছবি কল্পচিত্র।কত শিল্পী কতভাবে তাদের  কল্পনাকে চিত্রের বাঁকে বাঁকে সাংকেতিকভাবে তুলে ধরেছেন সংগঠিত চিত্র এখানে কেবলমাত্র সংকেতক থেকে যায়নি বরং এক পর্যায়ে সংকেতিত হয়ে উঠেছে অর্থ্যাৎ ছবি স্বয়ং বস্তুর স্থিতি নিয়ে নিয়ে এবং নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণিত করে তুলেছে প্রদর্শনী হলঘরে ঢুকার মুখেই প্রদীপ উজ্জ্বলনের উপস্থাপনার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে  মন  ভরে উঠে।প্রদর্শনীতে ড্রয়িং,ফটোগ্রাফী,ইনস্টেলেশন, স্কাল্পচার, গ্রাফিক্স, পেইন্টিং সবই ছিল। আর্ট কলেজ ছাড়াও আর্ট কলেজ বহির্ভূত নির্বাচিত প্রবীণ-নবীন শিল্পীর শৈল্পীক চিন্তাচেতনার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখার সুযোগ পাওয়া গেল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। ছবি যেহেতু মনের আয়না, তাই এই সময়ে শিল্পীরা নিশ্চয়ই তাদের সৃষ্টির ভিতর  এই সময়কে মাথায় রেখেই তাদের সৃজনকে উপস্থাপনা করেছেন। এবার এই সময় কার কাছে কেমন হবে, কে, কিভাবে এই সময়কে মেলে ধরতে চাইবেন, সেটা তার ব্যক্তিগত স্বাধীন শিল্প- সত্ত্বা-ভাবনা। বেশির ভাগ শিল্পীকেই দেখলাম, সময়ের বদলে নিজেদের মেজাজকেই তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ হয়ে পড়েছেন নস্টালজিক । যেমন শিল্পী দেবব্রত ভারতী, তার ‘টোয়াইলাইট’, যা শিল্পীর অনুমতি না-নিয়ে বাংলা করলে দাঁড়ায়  গোধূলি সময় কিংবা ঊষা।এবং খুব চমৎকারভাবে শিল্পী এখানে অনিশ্চিন্ত একটা দৃশ্যকে,ক্ষীণ আলোর ভিতর দিয়ে দূর থেকে একটা কিছু দেখার চেষ্টা করেছেন।তার যেন মনে হচ্ছে, ঐ-দূরে  রহস্যময়  একটা-কিছু মায়াজাল রয়েছে। তিনি যেন আজ তারই সন্ধানী। আবার কখনো মনে হচ্ছে, তিনি এমন একটা প্রাচীন সময়কে ধরার চেষ্টা করছেন, যে সময়টাকে আসলে তিনি কোনদিন দেখেননি, কেবল ভাসাভাসা ভোরের স্বপ্নে দেখেছিলেন হয়ত-বা।অস্পষ্টতাকে ভাষা দিয়েছেন অদ্ভুত যত্ন দিয়ে। মনের ভিতর দীর্ঘক্ষণ যাপন না-করলে এইরকম একটা ছবি আঁকা সময়কে ধরা সম্ভব নয়। এমন মুহূর্তের  মুখোমুখি হলে, সময় যে কোন মোহজালে গড়িয়ে যায়, বোঝাই যায় না।এখানেই শিল্পী দেবব্রত ভারতী-র স্বার্থকতা ঠিক এরকমই একটা সময়কে নিয়ে গেছেন ভিন্ন এক মাত্রায়, রোমহর্ষক এক দৃশ্যকল্পে শিল্পী মিতালী গঙ্গোপাধ্যায় আকাশের চিত্রকল্প, দূরে সারিসারি গাছেদের সংসার, বিস্তার, জলে তার ক্ষীণ অথচ দ্যুতিময় ঝিলিকও এক অজানা জগতের হাতছানিশিল্পীর তুলির বিন্দুর মত ছোঁয়া সিন্ধুর স্বাদ দিয়ে  গেল। ছবিটির নামও শিল্পী নির্বাচন করেছেন ছবির ভাষা মতই ‘মধুচন্দ্রিমা’।এই দুটি ছবি দেখার পর, তার আমেজ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ভিন্ন এক রুচির বা মাত্রার ছবির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। তখনই চোখে পড়ে শিল্পী দেবাশিষ বিশ্বাস-এর ছবি ‘ ল্যান্ডস্কেইপ অফ ডিজাইন’, একি যুক্তিহীন দুর্বার গতি! দাঁড়িয়ে পড়ি শিল্পীর সাহসের সামনে। শিল্পীর মূল মেরুদণ্ডই তো সাহস।  সাহস থেকেই আসে ভাঙন। সাহস থেকেই তো  উত্থান,নয় পতন। এখানে শিল্পী খুব বুদ্ধিমত্তা এবং শৈল্পীক প্রজ্ঞা দিয়ে ছবিকে বের করে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন । জলকে আমাদের উপজাতি ‘পাছড়া’র মত রূপ দিয়ে চূড়ান্ত মুন্সিয়ানার সাথে সাথে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চোখের সামনে দিয়ে যেন হাসিমুখে বেরিয়ে গেলেন । যেন বলবো, বলবো, করেও কিছু বলতে পারলাম না।তার ছবির সামনে থেকে সরে এসে কিছুটা আনমনা হাঁটছিলাম, কোথাও যেন মন’টা এই সময়ের একটা প্রতিচ্ছবি দেখতে চাইছিলএই মুহূর্তে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিকে কেবল সমস্যা আর সমস্যা। আফ্রিকা মহাদেশের ২৯টি দেশে, মধ্যপ্রাচ্যে ২৬৭টি বিদ্রোহী দল,ইউরোপের ১০টি দেশে ৮০টি বেসামরিক বাহিনী,এশিয়ায় ১৬টি দেশে ১৬৮টি বিদ্রোহী দল নানা দাবিতে যুদ্ধে সক্রিয়।এই রকম একটা সময়ে শিল্প চর্চা কি নিছকই আত্মবিনোদন? এমন একটা প্রশ্ন হঠাৎই মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলছিল। পৃথিবীর এরকম একটা বিপন্নময়, আগ্রাসী সময়ে, শিল্পীরা কেবলমাত্র নস্টালজিক বা কাব্যিক বা নানা রকম শৈল্পীক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন থাকবেন ? মেনে নিতে পারছিলাম না।তরুণ শিল্পীদের তো প্রতিক্রিয়া করা মানবিক দায়িত্বের ভিতরেই পড়ে যায় ! এমন সময়ই চোখ গেলো তরুণ শিল্পী অমিত কুমার নাথ-এর ‘আফটার ওয়ার’ ছবিটির দিকে। একটা বিশ্বাস ভেঙে পড়েনি, এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ছবিটির কাছে গেলাম । যুদ্ধের পরের পটভূমিকে শিল্পী ধরেছেন উপর থেকে। নিচে অস্পষ্ট গলিত দেহস্তূপ, উপরে তাই গোল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে বাজপাখি কিংবা শকুন। যুদ্ধ বিপর্যস্ত পৃথিবীকেই যেন দেখছেন শিল্পী, যার দিকে  ক্ষিপ্ত বেগে ধেয়ে যাচ্ছে তারা। এই পর্যন্ত কল্পনা বা পরিকল্পনা তাৎপর্যময় তবু,  কোথায় যেন দেখাটা মননশীল ব্যক্তি অবধি ছিল, কিন্তু এই দেখা’টাই শিল্পীর দেখা হয়ে উঠলো , তিনি যখন ছবির প্রেক্ষাপটে এই হাহাকারময় পরিস্থিতির ফাঁক

দিয়ে দেখে ফেলেন,  পূর্ণিমার বাঁকা চাঁদ, স্বপ্নীল এক আকাশ, যে এখনো স্বপ্নের কথা বলে যায়এখানেই সাধারণ মানুষ থেকে এগিয়ে যান শিল্পী । ছবির কাজে, ভাবনায়, উপস্থাপনায় মুন্সিয়ানা  দেখিয়েছেন শিল্পী অমিত।দ্বিমাত্রিকতায় ত্রিমাত্রিকতার  একটা তাৎপর্য আনার সাহস দেখিয়েছিলেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি। এই রকম সাহস তার আরেকটা ছবি ‘সিটি লাইফ’-ও লক্ষ্য করা যায়। এই স্পর্ধার জন্যই শিল্পীর কাছে অনেক প্রত্যাশা রইল। রাজ্যের বরিষ্ঠ শিল্পী বরুণ চক্রবর্তী-র জলরঙের আঁকা ‘প্যানিক স্ট্রিকন’ আবার অন্য এক বিপন্নতা, পীড়িত, যন্ত্রনাগ্রস্থ, নিদারুণ এক দৃশ্যপটের দিকে আমাদের নিয়ে গেল।কোন একটা ঘটনায় হঠাৎ যেন থমকে গেছে পারিবারিক জীবনযাত্রা। কেবল ভাবছি কি এমন হতে পারে ? আমাদের এই ভাবনার জন্য শিল্পী ইচ্ছে করেই যেন চিত্রপটের একটা অংশ স্পেস দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। মনটা নিঃস্বতায় আবার যেন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। ছুটলাম একটা স্ফূর্তির খুঁজে। এবং মুখোমুখি হলাম রাজ্যের প্রখ্যাত শিল্পী সঙ্ঘমিত্রা নন্দী-র ‘আনটেম্যাবল’ নামাকরণে খরস্রোতা জলোচ্ছ্বাসময় ক্যানভাসের সামনে। এই উচ্ছ্বাসকে যেন পোষ মানানো যাচ্ছিলো না। কি এক অমোঘ টানে মন ছুটে চলেছিল। অ্যাক্রিলিকের কাজ।কাজে স্ফূর্তি দেখার মত। রং এবং কনসেপ্ট নিয়ে দ্রুতগামীর এই খেলা শিল্পীর জাত চিনিয়ে দেয়। এরপর মন গিয়ে থামল স্বদেশী চিত্রপট, ধরণ-ধারণা, জীবন-চেতনার ভিতর দিয়ে দেখা শিল্পী প্রদীপ চক্রবর্তী-র ‘অভিসারিকা’ এবং শিল্পী পলি রানী ভৌমিক-এর ‘উইথ ইন এলিপাস ম্যাক্সিমাস’-এর কাজ। ভালো লেগেছে শিল্পী মিতালী দেবনাথ-এর ‘গোসিপ ইন বেল্কোনি’মনের ভিতরে এরকম একটা বারান্দা সবার হৃদয়েই খেলা করে।নাগরিক জীবনের মন খারাপ, ভালোবাসার, মুক্তির একটাই যেন  ঠিকানা—বারান্দা।হয়ত এখানে আরও ব্যঞ্জনা তৈরি করা যেত। প্লট হয়ত তাই দাবি করছিল।শিল্পী অনিতা দেবনাথ ‘ নাইট গার্ড’ মনকে ছুঁয়ে গেছে। শিল্পী বাপ্পা চক্রবর্তী-এর ‘নীল নক্সা’র ভিতর দিয়ে নারী মনের স্বপ্ন এবং তার বিন্যাসগত জটিলতাকে কখনো কাব্যময়, কখনো নাটকীয় করে তুলতে পেরেছেন।

 

নারীর মনস্তাত্ত্বিক জগতের নিগূঢ় উপলব্ধিকে  শিল্পী এখানে তার মত করে দেখতে চেয়েছিলেন। শিল্পী  বিক্রমজিৎ সরকার তার ‘দুর্গা’ ক্যানভাসে রঙের টিউবকে নিয়ে দেহ আঙ্গিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।ধারণা প্রশংসনীয় কিন্তু এখনো চূড়ান্ত কোন জায়গায় যেতে পারেনি বলে আমার ধারণা। শিল্পী উমা মজুমদার-এর ‘ক্রীচার’ ক্যানভাসের সামনে এসে হঠাৎ করে চোখ আটকে গেল পড়ন্ত  পাতার দিকে তাকিয়ে। শিল্পীর সৃষ্ট ঝরাপাতা বুঝি এমনই হয়। এই ক্যানভাসে পাতাটা একটা মুখ্য ভূমিকা  তৈরি করে ফেলেদর্শকের প্রথম দৃষ্টিকে তিনি ঝরাপাতা দিয়েই আটকে ফেলেন।  তারপর কাছে গেলে আস্তে আস্তে ছবি তার কাহিনি মেলে ধরতে থাকে। রঙের কাজে তিনি মুন্সিয়ানা জানেন, জানেন সরাসরি ক্যানভাসে রং ফেলে সাহসী পদক্ষেপ নিতে। পেঁচার মত একটা দৃশ্যকল্প মনকে আরও অজানা এক অনুভবের দিকে নিয়ে যায়।আর এই অজানার উপলব্ধি তৈরির জন্য ছবিটির গুরুত্ব বেড়ে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে রঙের ব্যবহার, ছবির ব্যালেন্স বজায় রেখেছেন চমৎকারভাবে অ্যাক্রিলিকের কাজ।উমার চিত্রকল্প প্রতীক ও উপমায় স্পষ্ট অভিমুখ সঞ্চারী সকল উপাচারের সমন্বয়ে  চিত্রতলের সংস্থাপন শিল্পীর নারী অস্তিত্বচেতনা ও প্রতিবাদী অবস্থানের বাহক হয়ে উঠে। তার  উজ্জ্বল সম্ভাবনা আশা করাই যায়। রাজ্যের তথা দেশের খ্যাতনামা শিল্পী স্বপন নন্দী-র কাজ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষাই রাখে না।তার ‘ দ্য বার্ড এন্ড দ্য মেইড ইন ওয়াইড’ চমৎকার একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ভিতর দিয়ে ত্রিপুরার নিজস্বতাকে তুলে ধরেছেন। অনেকটা সেই নিষ্পাপ শকুন্তলার পটভূমিকার মত একটি কুমারী মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি, যে এই মুহূর্তের জীবন জটিলতার উর্দ্ধে উঠে প্রকৃতির  ভিতরে প্রকৃতির মতই সহজ-সরল এক জীবনের প্রতীক হয়ে এখানে ধরা দিচ্ছে। যদিও শিল্পী তাঁর খ্যাতির বিস্তৃতির মান অনুযায়ী কালো একটা শেড বা বন-ছায়া লেপন করে তার ভিতরে হাল্কা করে একটা ইঙ্গিতও ছেড়ে দিয়েছেন আমাদের বোধের দিকে, চিন্তনের দিকে। তারপরও ছবিটির ভিতরে একটা স্বস্তি আছে। অ্যাক্রিলিকের কাজ করে গেছেন ভীষণ দ্রুততার সাথে, যেমন ব্রাশ, তেমনি তার পেছন, সব উপকরণকে এত দ্রুত ব্যবহার করেও ক্ষণিকের জন্যও কনসেপ্ট থেকে সরে যাননি।  অভিজ্ঞতা এবং ভাবনা-চিন্তার পরিমাপ খুব স্পষ্ট না-থাকলে বোধ হয়  এত ভাল কাজ তুলে না বা ফুটিয়ে তোলা যায় না। তিনি তাঁর কম্পোজিশন এমন ভাবে সৃষ্টি করেন, যেখানে দর্শককে বাধ্য করেন, তার প্রচলিত চিন্তার বাইরে এসে চিন্তা করতে।

 

এখানেই তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেন।গণেশ পাইনের ছবি দেখে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, ‘এই এক নিরন্তর অন্তর্লোকবাসীর নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার কাব্যকূট’। স্বপন নন্দী-র ছবি দেখে আমার কেন জানি সে-কথা’টাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল চেনা জগতকে সবসময়  আমাদের সামনে  তিনি এক ভিন্ন স্বাদে উপস্থাপন করেন ।এখানেই তার মৌলিকত্ব । ড্রয়িং-এ অসাধারণ লেগেছে শিল্পী বিক্রমজিৎ সরকার , শিল্পী  বিপ্লব দাস,শিল্পী দেবাশিষ রায় ভৌমিক , শিল্পী শক্তি বিশ্বাস , শিল্পী নিশা ভৌমিক – এর কাজ।তবে শিল্পী শ্রাবণী রায় দেখিয়ে দিলেন  ফ্রেমিং নৈপুন্যতা দিয়েও কীভাবে একটি ছবিকে উতরে নেওয়া যায়।কাজও ভালো লেগেছে। ভাস্কর্য এবং ইনস্টেলেশন পর্যায়ে মন কাড়ে শিল্পী ধীমান দাস ‘প্রেশার’ এর ভিতর দিয়ে শৈল্পীক  বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেনতবে হাতের ভাষায় আরও কাজ করা যেত বলে আমার মনে হয়েছে। শিল্পী  সঞ্জীব দাস-এর ‘কাটার’ মুহূর্তে  নস্টালজিক করে তুলে। মননের স্বাদ ভরে যায় ভিন্ন একমাত্রায়। এখানেই শিল্পীর জয় আর আমাদের প্রাপ্তি। তবে সুপারির মধ্যে আরও ব্যঞ্জনা তৈরি করা যেত।শিল্পী শ্যামা প্রসাদ ভট্টাচার্য-এর ‘গার্ল উইথ চেয়ার’ও ভিন্ন স্বাদ তৈরি করতে পেরেছে। শিল্পী  ব্রজলাল দাস তার ‘স্ক্রু’ দিয়ে আমাদের মন কেড়ে নিয়েছেন। সাধারণ একটি ঘটনাকে অসাধারণ করে তুলতে পেরেছেন। তবে আরও ভালো লাগতো, হাতুড়ির আঘাতের একটু হলেও চিহ্নের আবাস যদি পাওয়া যেত।বাস্তবিক এধরনের  ক্ষেত্রে কিছুটা চিহ্ন কিন্তু দেখতে পাওয়া যায়।  আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে মনে হয়েছে আমার থাকলে ভালো লাগতো । শিল্পী পার্থ দাস ‘ মাই ড্রিম সিটি’ দিয়ে অবাক করেছেন। শিল্পী মৃদুল বড়াল তার মন জয় করেছেন ‘ ল্যান্ডিং বার্ড’ দিয়ে।শিল্পী সঞ্জীব কুমার সিনহা তার শিরোনামহীন ছবির ভিতর দিয়ে তাদের বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ঐতিহ্য- সংস্কৃতি-মিথকে এই সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ভাবনার মধ্যে একটা নিজস্বতা আছে ।‘গ্রাফিক্স’ বিভাগে শিল্পী অনিমেষ সাহা ‘রিফ্লেকশন’ যে মাত্রায় যেতে পারতো সে মাত্রায় যেতে পারেনি। একটা ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা করতে না-পারলে মন ভরে উঠে না। অথচ কনসেপ্ট’টার ভিতরে অভিনবত্ব ছিল, সাহস ছিল।ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্রের আধুনিক ব্যবহার আমাদের শিল্প-সাহিত্য ভাবনায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে তবে ইদানিং আলোকচিত্রশিল্পে কিছু প্রথিত-ফাঁকিবাজি বা কারসাজি ঢুকে গেছে বলে তার শৈল্পীক-শ্রদ্ধা বা মান নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন তুলেন কেউ কেউ।  যাই হোক, এই পর্যায়ে শিল্পী রাজু দেবনাথ-এর ‘ইয়উ উইল গ্লো টু অ্যাডোন দ্য ডার্কনেস’ মুহূর্তে থমকে দেয় তার সন্ধানী খুঁজের সামনে। হঠাৎ মনে হয়, আরে একি দেখছি? এটা শ্রদ্ধা না ভালোবাসা! আরও তাকালাম, তাকাতে তাকাতে মনে হল, আরে দু’টোর অর্থ আসলে তো একই ‘বা!’ শব্দটা শিল্পী  মনের ভিতর থেকে কেড়ে বের করে নিলেন । এখানেই তার বোধের জয়, বোধির জয়  আরেক রকম আবেশ পেয়ে যাই শিল্পী সব্যসাচী ভট্টাচার্য-এর  ‘মেডিটেটিং’ ছবিতে। এ’কেমনতরো ধ্যান ? বুকের খাঁজ জলের ঢেউ উঠে বিষয়টাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। দূরে ভাসমান নৌকা মনকে নিয়ে যায় জীবন-বোধের অতল স্পর্শে। ছবিটির দিকে চেয়ে থাকলে কখনো মন খুব রিলাক্স হয়ে উঠে, আবার কখনো ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু শিল্পীর নামাকরণ বিশ্বাস দেয়, এই ধ্যান জীবনমুখী হয়ে উঠারই ধ্যান নৌকা যেন তারই বাহন হবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমি ইচ্ছে করেই, পুরস্কৃত শিল্প-কর্ম নিয়ে কিছু বললাম না।সবার কাজ অসাধারণ হয়েছে বলেই তারা বিশেষভাবে সম্মানিত।সৃষ্টির কাজে, আখ্যানে বয়ানে প্রক্রিয়ায় শিল্পীর সম্পদ রং-রেখা-মননের পাশাপাশি ধৈর্য। এদের মধ্যেই চলে যত দ্বন্দ্ব।কখনো রেখা-রঙের সাথে যেতে চায় না, কখনো আবার রঙে রঙে বনিবানা হয় না, কখনো আবার রং-রেখার মিল হল, তো মননের মিল হল না। সবকিছুকে মিলিয়ে-সাজিয়ে নতুন গল্প বলার, সৃষ্টি করার কাজটি করা যুদ্ধ করার শামিল । এই যুদ্ধের পরই আসে সফলতা। প্রাপ্তি। পুরস্কার।        

 

সম্প্রতি ‘সোসাইটি ফর প্রমোশন অফ আর্ট’-এর উদ্যোগে ‘দ্বিতীয় ত্রিপুরা রাজ্য শিল্পকলা প্রদর্শনী –২০১৭’ ‘নজরুল কলাক্ষেত্র’-এ জানুয়ারি ১৭-২১ তারিখ পর্যন্ত  হয়ে গেল। উদ্বোধক ছিলেন ত্রিপুরার মাননীয় তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী  ভানুলাল সাহা। সভাপতি ছিলেন উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা ডঃ বিপ্রদাস পালিত, বিশেষ অথিতি হিসেবে ছিলেন সাহিত্যিক শংকর বসু ,চিত্রশিল্পী সঙ্ঘমিত্রা নন্দীএই অনুষ্ঠানে রাজ্যের প্রবীণ শিল্পীদের তাঁদের নিজ নিজ শিল্প-সাধনায় মাহাত্মের কথা পরিকল্পনায় রেখে সংবর্ধনা  দেওয়া হয় মাননীয় রবীন সেনগুপ্ত, সুনীলকৃষ্ণ রায়, গৌতম দেববর্মণ এবং স্বাতী দেববর্মণ-কেএকই সাথে ড্রয়িং-এ পুরস্কৃত করা হয় প্রমিতপার্থ পাল,ফটোগ্রাফিতে অমিত কুমার নাথ,ইনস্টেলেশনে জয়দীপ ভট্টাচার্যকে, স্কাপচারে পুরস্কৃত করা হয় নন্দন দেবনাথ, গ্রাফিক্সে দেবাশিষ ভৌমিক এবং পেইন্টিং- দিপ্তেন্দু চক্রবর্তী-কে।এবারের প্রদর্শনীতে সর্বমোট ১১৪টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।

 স্বাভাবিকভাবেই আরও অনেক অপূর্ব শিল্পকর্মের কথা আলোচনা করতে পারলাম না। তার জন্য আমি দুঃখিত। তবে  এককথায় অসাধারণ একটি চিত্রপ্রদর্শনী উপভোগ করলাম রাজ্যের কয়েকজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদের অভাববোধও করেছি।দুর্দান্ত ক্যাটালগ, বাঁধাই-পর্ব আরও ভালো হতে পারতো।শিল্পী কিঙ্কর বনিক ক্যাটালগের প্রচ্ছদের কনসেপ্ট ডিজাইন করেছেন  আর্ট কলেজের মান অনুযায়ীই ধন্যবাদ  সম্পাদক, প্রকাশক অভিজিৎ ভট্টাচার্যকে এবং সোসাইটির সাথে যারা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন ভালবেসে, শ্রদ্ধাভরেএই সময়ের মত রাজ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে আশা করাই যায়।            

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...