“কবিতার ক্ষেত্রে চেষ্টাকৃত ফিল্টারিং পদ্ধতিতে আমি বিশ্বাস করি না।”
কবি জেরী চন্দ এই মুহূর্তে রাজ্যের একজন প্রতিভাবান তরুণ কবি
। তার কবিতায় অন্তর্দ্বন্দ্ব ঘোরাফেরা করে নানাভাবে । তার সাথে একান্ত আলাপচারিতায়
তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ ঃ ঠিক কখন একটি কবিতা আপনার লিখতে ইচ্ছে করে ? কিংবা মনে হয়, এই মুহূর্তে যদি আমি একটি কবিতা লিখতে পারতাম, তবে অনেকটা রিলিফ বোধ করতাম!
উত্তর :- লিখি। কখনও লিখি না। আমার
আনন্দ হয়
ঘুম থেকে
জেগে উঠলে; আমার মাথায়
ঘুমের আগে
পড়া কোনো
বইয়ের পঙক্তি, সিনেমার দৃশ্য,গানের সুর
যখন ভেসে
ওঠে। জীবন আমাদের, প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষকে, পুশ করে লেখার
জন্য। আমরা পালাতে পারি কি? প্রতিবারই কোনো
গন্তব্যে পৌঁছে
যাই। টানা বিচ্ছিন্নতায়
ভুগি। কোনোদিন মনে হয়েছে
যা কিছু
ঘটে চলেছে
সবই আমার
বিপরীতে আবার
কোনোদিন মনে
হয়েছে যা ঘটছে সব আমাকে কেন্দ্র করে ! আমি কিছু
করতে পারছি
না । সেই সব দমবন্ধ
মুহূর্তে আমি বেশি লিখেছি। কখনও রিলিফ পেয়েছি কখনও আরও বেশি করে
তলিয়ে গেছি।
আকারে ছোটো প্রাণীরা তার শিকার-
রাজা-প্রজা খেলায় নিয়ম একটাই, সমর্পণ, নয়
দৌঁড়। ” – কবিতার ভাষাশৈলী নিয়ে কখনও কিছু
ভেবেছেন ? নাকি অটো-রাইটিং-এ বিশ্বাস করেন ?
প্রশ্ন ঃ আপনি
একটি কবিতায় লিখেছেন “জেরী নিজেকে পুড়িয়ে কবিতা লেখে” – হঠাৎ এমন মনে হওয়ার
কারণ কী ? আত্মযন্ত্রণার এই কথনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন আপনি ?
উত্তর ঃ ইংরেজি সাহিত্য অনুপ্রেরণা দিয়েছে এমন
নয় বোধহয়। বিশ্ব সাহিত্যে পাঠক
হিসেবে আমার
রিচ্ আর কতটুকু! এখনো কত বিশাল
পরিসর বাকি
আছে পড়াশোনার। লেখা পড়ি, সে ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি বাংলা
এমন ভাগ
নাই। মহৎ সাহিত্য অনুবাদে আমাদের
হাতে আসে। যখন যা পড়ি
কিছু কিছু
আঘাত করে। তার রিদমটা মনে
আসে। এমনকি চটুল বাংলা গান
থেকেও। আমাকে আহত করে সাধারণ
জীবনের কথাবার্তা, পাখির উড়ে
যাওয়া। কখনো চোখ পড়ে যায়
মানুষের চোখে
সেখানেই একটা
বিশাল দিগন্ত
খোলে যায়।
আর, পোষ্ট মর্ডানিজম এখন পুরনো
হয়ে গেছে । থিওরি চিন্তাকে শেপ
করে ঠিকই, অনুভূতিকে কব্জা
করে কে। জীবন যেদিকে নিয়ে
যায়, কথার চাকা সেদিকে
চলে। একজন থিওরিস্ট ভালো
বলতে পারবেন। আমরা বর্তমানে সে অবস্থায় আছি
তার নামকরণ
কি হয়েছে
তা আমি
জানি না লেখা
লিখেছি কখনও
তার থিওরিগত ইনকরপোরেশনের কথা
চিন্তা করিনি।
প্রশ্ন ঃ “জলের
গভীরে শ্মশানে ফেরত জ্বলা গাছের মুড়া,
বান্ধের পাড়ের আবর্জনা,
বাকি রাখো না কিছুই ...
মনু নদী,
তুমার মনটা এমন মরা মরা ক্যানে ?” –
কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা লক্ষ করা যায় । এই
বিষয়ে আপনার ভাবনাটা জানতে চাইছি ।
উত্তর ঃ হ্যাঁ, বহুবার মনে
হয়েছে আমরা
কি প্রতিটা মুহূর্তের কথা
লিখতে পারি, যা দেখি তা কি স্পষ্ট প্রকাশ
করতে পারি
কবিতায় ? আমি যে জাগায় ঘুরে
ফিরে বড়
হয়েছি, সেই টোন-টা মাটির, সেই মিসিং
লিঙ্কের সংগ্রামটার কথা বলতে
চাই । কতটুকু পারি, জানিনা । আমার সঙ্গে এইসব
অঞ্চলের ও শব্দের ঘন যোগাযোগ আমি অক্ষত
রাখার জন্যই
নদীর বাঁধকে
বান্ধের পাড়
বলা মনে
হয় যেন
পরিচিত
সেই বান্ধের পাড়েই
দাঁড়িয়ে আছি। যে শব্দ যে সাজে আসলে
তাকে কাছের
মনে হয়, কবিতা মনে হয়, সত্য মনে
হয়, সেই শব্দগুলি আমি নির্বাচন করি
।
প্রশ্ন ঃ সম্প্রতি আপনার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ “ পরবর্তী দৃশ্যের জন্য”- এর জন্য ত্রিপুরা পাবলিশার্স গিল্ড আপনাকে “
শান্তিসুধা সাহিত্য সম্মান- ২০২২” সম্মানিত করেছে । সাহিত্য অকাদেমি-র যুব সাহিত্য
পুরস্কারেও আপনি শর্ট লিস্টেট হয়েছিলেন । প্রথম কাব্যগ্রন্থেই এতটা সফলতাকে কীভাবে
দেখছেন আপনি?
উত্তর ঃ পুরস্কার কখনও সফলতা নির্ধারণ করে না। লেখাটা আমার নিজের মতো হচ্ছে কিনা, হলে কতটা আমি আমার কাছে পৌঁছতে পারছি সেই চেষ্টাটাই আমার সফলতার প্রয়াস । সফলতার চিন্তা টা একটা ট্রেপ খুব ক্ষণস্থায়ী তার চেয়ে ব্যর্থতার কনসেপ্ট অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। বাণিজ্যিক সফলতাও আপেক্ষিক। আগরতলা বইমেলায় সব কপি শেষ হয়ে গেছিল। এটা খানিক আন-এক্সপেক্টেড ছিল আমার কাছে। 'পরবর্তী দৃশ্যের জন্য' এভাবে সমাদৃত হবে কোনোদিন ভাবিনি। আমি বিস্মিত, কিন্তু এই বিষয়গুলো আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। লেখা নিয়ে ভেবেছি সারাদিন-রাত আর হঠাৎ যেন স্বপ্ন ভেঙে আলো জ্বলে উঠলো চারিদিকে। এই আলো জ্বলে উঠার রূপই দিল্লী থেকে ফোন আসা, কখনও ‘শান্তি সুধা সাহিত্য সম্মান’এর জন্য মঞ্চে উপস্থিত হওয়া,আর আমার বোধ হয়েছে আমি শিশুর মতো পৃথিবীর বাস্তব ছুঁয়েছি।
আমার প্রকাশক তনুজ
সরকার ও নবনীতা সরকার
বিশ্বাস করেছিলেন আমার লেখার
উপর, আমি খুশি হয়েছি
তাদের আনন্দ
দেখে।

No comments:
Post a Comment