“আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই ছোটদের নিয়ে কাজ করতে।”
নাটক-যাত্রা-মঞ্চ- রূপসজ্জা, পরিচালনা,
প্রায় সব বিষয়ের সাথেই জড়িয়ে আছেন ত্রিপুরার অন্যতম নাট্যব্যক্তিত্ব নারায়ণ দেব । তার সাথে
একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন
ঃ নাটক, যাত্রাপালা, পথনাটক, নির্দেশনা, মঞ্চনির্মাণ, রূপসজ্জা নাটকের প্রায়
প্রতিটি বিভাগের সাথে আপনি ঘনিষ্ঠভাবে
জড়িয়ে। নাটকের কোন বিভাগ আপনার খুব স্বাচ্ছন্দ্যের ?
উত্তরঃ নাটকের
প্রতিটি বিভাগই একটা আরেকটার পরিপূরক। যখন যা করি যেমন নাটক বা যাত্রাপালায় অভিনয়,
তখন সেখানেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আবার
পথ নাটকে দর্শকের সঙ্গে অভিনেতার দুরত্ব কম।
তাতে দর্শকের মনের অনুভুতি সহজেই বোঝা যায়। এও এক ধরনের ভালো লাগা । তবে
সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই ছোটদের নিয়ে কাজ করতে। তাদের নাটকের নাট্য নির্দেশনায় অপরূপ
এক আনন্দ অনুভব করি। আমার মনে হয় ক্ষুদে শিল্পীরা একেকজন জাত অভিনেতা।
তাদেরকে যা দেখানো হয় অতি সহজেই তা রপ্ত করে নেয় এবং অভিনয়ে সেটা প্রয়োগ করে তাক
লাগিয়ে দেয়। ছোট্টরা প্রত্যেকেই ভয়ডরহীন। আমরা বড়রা যেখানে মঞ্চে উঠে আলোর অবস্থান
মাপ-জোক ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করি, ছোটরা
সেখানে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই মঞ্চ
দাপিয়ে বেড়ায়। এদের সঙ্গে কাজ করা মানে প্রতিনিয়ত নিজেকে সমৃদ্ধ করা।
প্রশ্ন ঃ দীর্ঘ নাট্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে
আপনি –‘আমার নাট্য যাপন’ নামক
গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ আপনি রচনা
করেছেন । আপনার এই উদ্যোগ নিয়ে আমাদের
কিছু বলুন ?
উত্তরঃ দিনগুলি
ভালোই কাটছিল। সন্ধ্যায় নাটকের রিহার্সাল। নাটক মঞ্চস্থ
করা। নিজের নাটক না থাকলে অন্য
নাটকের গ্রুপের নাটক দেখা । এর
কোনটাই না থাকলে রবীন্দ্র ভবনের সামনে নাট্য বিষয়ক আড্ডা।হঠাৎ কোবিড নামক এক মারণ
ব্যাধির দমকা ঝড় সব কিছু এলোমেলো করে দিল। বাইরে বের হওয়া যাবেনা। সব কিছু বন্ধ।
নাটক পাগলদের অবস্থা তো খুবই করুন। কি আর করা নিয়মতো মানতেই হবে। ঘরে বসে ছবির এ্যালবাম ঘাটছিলাম। হাতে উঠে এল
পুরানো দিনের একটি নাটকের ছবি। মুহূর্তে মনটা চলে গেল সেই সব দিনে। মঞ্চে নাটক নেই তো
কি হয়েছে। অতীত দিনের নাটকের কথাগুলো তো লিখতে পারি। হোক-না নিজের নাটক যাপনের
কথা। তার সঙ্গে তো উঠে আসবে সত্তর দশকের নাটকের নানা কথা। নাটকের রিহার্সাল থেকে
শুরু করে মঞ্চায়ন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাবলীর ছবি। যেই ভাবা সেই কাজ। বসে
পড়লাম কলম নিয়ে। এ-ব্যাপারে অবশ্য আমার দুই ছেলে
আমাকে দারুনভাবে উৎসাহিত করেছে।
প্রথমে ফেইসবুকে পোষ্ট। তারপর গ্রন্থাকারে
ছেপে প্রকাশ। উদ্দেশ্য নাট্যচর্চায় না থেকেও নাটক নিয়ে থাকা। পাশাপাশি বইটি
পড়ে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই নাটকের প্রেমে
মজবে, এইরকম একটা ইচ্ছেও ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার নাট্যজগতের ক্রমযাত্রা সম্পর্কে আপনি
ওয়াকিবহাল। আপনাদের সময়ের নাটকের পরিবেশ- পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের কিছু বলুন
। ঠিক কেমন ছিল সেইসব দিন ?
উত্তর ঃ সময় দ্রুত
ধাবমান। সময়ের গতির সঙ্গে তাল রেখে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। তবু বলছি, সেই সময়ে অনেক কিছু ছিল না । ভাল হল ছিল না । আলো এবং শব্দ প্রক্ষেপনের ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল।
দূর্গা পূজা, কালীপূজার সময়ে
গ্রামে গঞ্জে বসত যাত্রার আসর।রবীন্দ্র,নজরুল
জয়ন্তীতে বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে অস্থায়ী মঞ্চ বানিয়ে নাটক অভিনীত হত। গ্রুপ থিয়েটারগুলো
নাটক করত তুলসীবতী স্কুলের মিলনায়তন, নেতাজী
স্কুলের হলে, উমাকান্ত স্কুলের
ক্যাম্পাসে, মহারাজা বীরবিক্রম
মহাবিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনে, বড়দোয়ালী
স্কুলের হলে নতুবা পুরনো মিউজিক কলেজের হলে। পাড়ায় পাড়ায় অস্থায়ী মঞ্চ হত বাড়ি
বাড়ি থেকে চৌকি সংগ্রহ করে। আমূল দুধের কৌটো কেটে তার মধ্যে হাজার ওয়াটের বাল্ব
লাগিয়ে বিভিন্ন দৃশ্যে আলো প্রক্ষেপন করা হত। লবন জলের বালতিতে ভাঙা লোহার টুকরার সাহায্যে বিভিন্ন দৃশ্যের
প্রয়োজন অনুযায়ী আলো বাড়ানো কমানো হত।রঙীন গ্লাস পেপাড়ের সাহায্যে মঞ্চে আলোর খেলা
দেখাতেন আলোক শিল্পীরা। পিউড়ি, সবেদা,
জিংক অক্সাইড,ক্রেপ ইত্যাদি দিয়ে হতো মেক-আপ। ১৯৭২ সালের ১৫
আগষ্ট রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নাট্যচর্চার পালে নতুন হাওয়া
লাগে । অনেক কিছু নেইয়ের মধ্যেও মঞ্চস্থ হয়েছে প্রচুর সফল নাটক। নাটকের
প্রতি একটা আলাদা উন্মাদনা ছিল। ছিল অকৃতিম ভালোবাসা। নাটক এক দিকে বাকি সব এক
দিকে। সেই সময়কার শিল্পী বা নির্দেশক কারওই নাটক সম্পর্কে কোন প্রথাগত পাঠ ছিল না।
তা সত্ত্বেও অনবদ্য অভিনয় শৈলী প্রদর্শিত হত নাটকে। রিহার্সালে সময়ানুবর্তীতা এবং
শৃঙ্খলা ছিল দেখার মত। ভুল করে যদি কোন শিল্পী একটু দেরিতে রিহার্স্যালে আসতেন
তাহলে সেদিন রিহার্স্যাল রুমের দরজা তার জন্য বন্ধ থাকতো।
প্রশ্ন
ঃ সেই প্রেক্ষাপট থেকে আজকের বর্তমান নাটকের প্রেক্ষাপটকে কীভাবে দেখছেন আপনি ?
উত্তর ঃ এখন আগরতলায়
নাটকের সংখ্যা খানিকটা কমে গেছে। হাতে
গোনা তিন-চারটে নাটকের দল ধারাবাহিক ভাবে নাটক নিয়ে খুব ভালো কাজ করে চলেছে। গতবছর
আগরতলার ১৬টি নাট্যদল মিলে গঠন করে সম্মিলিত নাট্য প্রয়াস। উদ্দেশ্য প্রতিমাসের ২য়
শনিবার ক্রমান্বয়ে দলগুলো তাদের নাকট পরিবেশন করবে।নাটকের জন্য এ এক শুভ উদ্যোগ। মহকুমা স্তরে বিশেষ করে ধর্মনগর,উদয়পুর এবং বিলোনীয়াতেও নাটক আগের তুলনায় বেড়েছে।
কৈলাসহর,মেলাঘর এবং অমরপুরে
নতুন ছেলেরা নাটক নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করছে। নতুন নতুন নাট্যকর্মী এগিয়ে আসছে।
সবচেয়ে বড় কথা একটা ভাল অংশের মেয়েরা নাট্যাভিনয়ে অংশ নিচ্ছে। তবে গুটি কয়েক নাট্য
দলের মধ্যে একটু যান্ত্রিকতা লক্ষ্য করা যায়। ভাল প্রযোজনা না-করেও ‘দেখ কেমন
দিলাম’ বা ‘আমার চেয়ে কেউ বেশি নাটক বুঝে না’ - এই রকম একটা ভাব কাজ করে । হয়ত
এটাই কেটে যাবে ।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার
নাটক নিয়ে কেউ বলেন ‘আমরা ভাল আছি’ । কেউ বলেন
তুলনামূলক হিসেব করলে ‘ভাল
নেই’ । এই বিষয়ে আপনি কী মনে
করেন ?
উত্তর ঃ এটা যার যার ব্যক্তিগত অভিমত হতে পারে । । তবে আমি
ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, ভালোই আছি। আগেও বলেছি, অনেক অপ্রতুল অবস্থার মধ্যেও আগে ভালো ভালো নাটক হয়েছে। এখন তো অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। আগরতলা সহ বিভিন্ন মহকুমায় রয়েছে উন্নতমানের প্রেক্ষাগৃহ। নাটক প্রয়োগের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া যাচ্ছে। ২০১২ সালে ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’ ত্রিপুরা শাখা চালু হয়েছে । নাটক নিয়ে পঠন পাঠন হচ্ছে। ছেলে মেয়েরা সেখান থেকে নাটকের শিক্ষা লাভ করে তা নাটকে প্রয়োগ করছে।‘ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’ তার শাখা অফিস খুলেছে আগরতলায়। NSD এবং
SNA-র আর্থিক সহায়তায় রাজ্যে প্রচুর নাট্যোৎসব হচ্ছে। দেশ বিদেশের নামি দামী নাট্যদল তাদের নাট্যশৈলী প্রদর্শন করছে আমাদের রাজ্যে। যা
দেখে দর্শকরা যেমন আনন্দ পাচ্ছেন তেমনি নাট্যকর্মীরা অনেক কিছু শিখতে পারছে। বিভিন্ন নাট্য দলের উদ্যোগেও হচ্ছে নাট্যোৎসব। NSD,SNA নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দিয়েছে আর্থিক সাহায্যের হাত। নাট্যকর্মীরা স্যালারি গ্র্যান্ট পাচ্ছে।চালু হয়েছে স্কলারশীপ। নাট্য দল গুলো রাজ্যের বিভিন্ন মহকুমা, রাজ্যের বাইরের বিভিন্ন মঞ্চে এবং বিদেশে যাচ্ছে তাদের নাট্য সম্ভার নিয়ে। সাংস্কৃতিক আদান প্রদান বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে নাটক পড়ানোর ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বর্তমান নাট্য চর্চার আর
একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্থানীয় পান্ডুলিপি। নব্বই শতাংশ নাটকের গ্রুপই স্থানীয় নাট্যকারের রচিত নাটক মঞ্চস্থ করছে। একজন নাট্যকর্মী হিসেবে এই সব
কিছুই তো আমার কাছে 'ভালো আছি'র লক্ষণ।
প্রশ্ন ঃ আপনি রূপসজ্জা-মঞ্চনির্মাণ নাটকের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই বিভাগের
সাথেও আপনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ত্রিপুরার নাট্য অঙ্গণে এই দুই বিভাগের বর্তমান
অবস্থান কেমন ?
উত্তর ঃ রূপসজ্জা ও
মঞ্চসজ্জা এই দুই বিভাগেই আগরতলায় হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পী কাজ করে যাচ্ছেন।
মহকুমার ক্ষেত্রে অবস্থাটা খুবই করুন। মঞ্চ সজ্জার কাজটা নিজেরা সামলে নিলেও
আগরতলা থেকে রূপসজ্জা শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে হয়। তবে আশার কথা এই যে,বর্তমানে যারা নাটক নিয়ে পড়াশোনা করছেন তাদেরকেতো
নাটকের প্রতিটি বিভাগ যেমন মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা,কস্টিউম তৈরী, আলো, আবহ সব
বিষয়েই প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। নাটকের পাঠ নেওয়া নবীন প্রজন্মের প্রত্যেক নাট্যকর্মীই
অল-রাউন্ডার। নিজেদের নাটকের মঞ্চ, রূপসজ্জা
নিজেরাই করছেন। যদিও সংখ্যাটা একেবারেই
কম।গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে পেশাদারী রূপসজ্জা শিল্পী এবং
মঞ্চসজ্জা শিল্পী অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই দুই শিল্পে নতুন কেউ এগিয়ে আসছে না। যেটা খুবই জরুরী ছিল ।
No comments:
Post a Comment