“আমার কবিতা আমার নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা”
ত্রিপুরার কবিতা জগতে কবি সুনীতি দেবনাথ এক সুপরিচিত নাম । জীবনের সামগ্রিকতা নিয়ে ভাবেন সিরিয়াসলি । তার তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ‘বাস্তবতা পরাবাস্তবতার মিশেলে আর গভীর বেদনাবহ অন্তর্লোকের দ্বন্দ্বে যখন জর্জরিত, তখন বিনিদ্র রাতের পর রাত নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা।’—নিজের সাথে সেই কথা বলা নিয়ে আজ আপনার কাছে কিছু শুনতে চাই ?
উত্তর ঃ চুয়াল্লিশ বছর! মানব জীবনের সার্বিক পরিসরে বৃহৎ একটি অংশ এতে কোন সন্দেহের অবসর থাকেনা। স্বামীর সঙ্গে আমার দাম্পত্য জীবন চুয়াল্লিশ বছরের। এই পরিসরে আমরা সুখে দুঃখে আনন্দ বেদনায় একাত্ম হয়েই দিন কাটিয়েছি। এ আমাদের জীবনের বাস্তব। সত্য কথা । এইতো বাস্তব । কিন্তু মৃত্যুকে আমরা মেনে নিতে পারি কই? মৃত্যু জীবনের পরিণতি জেনেও মৃত্যুকে ঘিরে আমাদের মর্মন্তুদ বেদনা, চিরন্তন দ্বন্দ্ব। আমার স্বামী যাঁর সঙ্গে চুয়াল্লিশটি বছর কাটিয়েছি, ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে আকস্মিক হার্ট এ্যাটাক হয়ে চলে গেলেন। একটা ঘোরতর একাকীত্ব সেই মুহূর্ত থেকে আমাকে আস্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ফেললো। এক অনন্ত বেদনার অতলান্ত সমুদ্রের সুগভীর আবর্তসংকুল জলে আমি হাবুডুবু খেতে লাগলাম। এখনি কেন চলে যাওয়া, আরও কিছুদিন কি থেকে যাওয়া যেতো না, মৃত্যু এতো নিষ্ঠুর কেন, মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম আছে কি, আছে কি পুনর্মিলন ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্নের দ্বন্দ্ব আমাকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো।দিনের দিন বেদনার নীল বিষে আমি জর্জরিত হচ্ছিলাম, রাত আসছিলো বিভীষিকা নিয়ে। ঘুুম পালাতো রাতের নিস্তব্ধ প্রহরে কোন এক অন্ধ দিগন্তে জানিনা। এতো জ্বাল।, এতো যন্ত্রণা ! আমার আমিত্ব একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খেতো। আমি শুধু অনুভব করতাম আমাতে আমি ডুবে গেছি, " কেউ নেই কিছু নেই সূর্য ডুবে গেছে ..."। পৃথিবীও হারিয়ে গেছে কোন অনন্তে। এমনি পরিস্থিতিতে শুরু করলাম ' নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা...'। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা বলতে বুঝায় সৃষ্টি কর্মে মগ্ন হওয়া। সাহিত্যের যে কোন শাখায় কবি বা সাহিত্যিক মগ্ন হয়ে যখন সৃষ্টি কর্মে লিপ্ত হন, তখন সব কিছু ভুলে যান। কেবলমাত্র নিজের সৃষ্টির সাথে একাত্ম হয়ে যান। বিনিদ্র রাতের পর রাত আমি তেমনি আমার লেখা কবিতার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছি। আমার মনের চেতন স্তরের বাস্তবতা আর অবচেতন মনের পরাবাস্তবতার মিশ্রণে ভয়ংকর অন্ধকারের বিনিদ্র সেই রাতের পর রাত কেটেছে কবিতা লিখে। এই আমার ' নিজের সঙ্গে নিজে কথা ' বলা।
প্রশ্ন ঃ ‘আজ প্রান্তিক ধূসর আলোয়/ কোন রঙ নেই পরাজিতা শুধু’— আপনাকে সংগ্রামী বলেই সবাই জানে এবং চেনে। তারপরও মর্মে এত আহত কেন আপনি? না, কবি মূলত মর্মাহত-ই!
উত্তর
ঃ কবি মূলত মর্মাহত হবেন আমি ভাবিনা। আমি সংগ্রামী কবি কিনা জানিনা। এটুকু জানি সাম্য,
মৈত্রী আর মানবিক বোধ দ্বারা এমন এক সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা,
যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সাম্য ও মৈত্রীর সম্পর্ক থাকবে। অবক্ষয়িত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক,
দেশীয় তথা আন্তর্জাতিক অবস্থায় শোষণমুক্ত হবে। সংগ্রামী মানুষ আমার মতে সর্বদা যে জয়ী হবেন তাতো নয়। তাঁরও মনে আবেগ,
ভালোবাসা, সুখ দুঃখের অনুভূতি আছে। প্রিয়জনের মৃত্যু তাঁকে আহত করে। বিশেষ করে যাঁর সাহচর্য চলার পথে তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে তাঁর মৃত্যু তাঁকে মর্মাহত করতেই পারে।
৩। প্রশ্ন ঃ সত্তরের দশকে আপনি অর্ধেন্দুশেখর,উৎপল এন্ড, ফলুদা, আরও অন্যান্যরা মিলে বিপুল একটা সাংস্কৃতিক কর্মধারা সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই হারিয়ে যাওয়া ধারা নিয়ে আজ একটু শুনতে চাইছি?
উত্তর ঃ সত্তরের দশকে আমি জীবনের সেই পর্যায়ে যখন শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে সবল সাবলীল। সাহিত্য আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও ভালোবাসার ধন। বিশেষ করে কবিতা আমার প্রিয়ভূমি।সংসার জীবন, চাকরি জীবন, দুটি সন্তানের দায়িত্ব, সভা সমিতি নিয়ে মহা ব্যতিব্যস্ত জীবন। তবুও আমি লিখছিলাম কবিতা গল্প প্রবন্ধ। আমার লেখা বিশেষ করে কবিতা ত্রিপুরা,
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল। অনেক কবিতা লেখা হয়েছিল। কালের অভিশাপে সেসব ধ্বংস হয়ে যায়।এসময় শান্তিনিকেতন থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে আসা অর্ধেন্দু ভট্টাচার্যের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। অর্ধেন্দু, স্বপন চন্দ, দীপক ভট্টাচার্য, আমার স্বামী মুরারী মোহন দেবনাথ এবং আমি স্বয়ং একটা গ্রুপ হয়ে গড়ে উঠি। আমরা' অভিষেক ' নামে একটা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বের করি। এতে সাহিত্যের পাতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। অর্ধেন্দু সম্পাদক, আমি আর দীপক যৌথভাবে সাহিত্য বিভাগ দেখছিলাম। বেশ শক্তিশালীভাবে পত্রিকা চলছিল। আমাদের পত্রিকায় প্রতি ইস্যুতে কার্টুন ছবি এঁকে দিতেন আমার স্বামী। পত্রিকার অঙ্গ সজ্জার দায়িত্ব ছিলো তাঁর। এর আগে ত্রিপুরার কোনো পত্রিকায় কার্টুন চিত্র প্রকাশিত হয়নি। ধুন্ধুমার কাজকর্ম চলছিল। রেজিস্ট্রেশন অবধি অবলীলায় চলেও শেষ অব্দি পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এসময় সাহিত্য সংস্কৃতির উদ্দাম হাওয়া বইছিল। বিস্তৃত পরিসরে এগুলো আলোচনা করতে হয়! আমি শুধু ছুঁয়ে গেলাম। এ সময় প্রবাহ নামে একটি লিট্ল্ ম্যাগাজিন খুব নাম করেছিলো। এতেও আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম এবং যথারীতি অলঙ্করণে যুক্ত ছিলেন আমার স্বামী।
৪প্রশ্ন ঃ আপনার স্বামী বিখ্যাত জাদুশিল্পী ডি.মুরারী-কে নিয়ে লেখা আপনার ব্যতিক্রমী গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘ম্যাজিশিয়ান ডি.মুরারী, প্রেক্ষিত পূর্বোত্তরের জাদুচর্চা’-- নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে এই লেখার অনুপ্রেরণা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর
ঃ আমার স্বামী ছিলেন শখের জাদুশিল্পী। তিনি উত্তর পূর্বাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ জাদুশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। জুনিয়র পি.সি.সরকার তাঁর পিতা সিনিয়র পি.সি.সরকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চালু করেন পি.সি.সরকার মেমোরিয়াল ট্রফি এবং ম্যাজিসিয়ান ডি.মুরারীকে এই ট্রফি সর্বপ্রথম প্রদান করেন। এসব ঘটনা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের আধুনিক ম্যাজিক চর্চা সম্পর্কে জুনিয়র পি.সি.সরকারকে তথ্য সংগ্রহ করে দিতে গিয়ে এ সম্পর্কে আমার আকর্ষণ ও আগ্রহ জন্মেছিল। স্বামীর মৃত্যুর আকস্মিক ঘটনা আমাকে প্রচণ্ডভাবে আহত করে। রাতের পর রাত ঘুম হতোনা। তাই সিদ্ধান্ত নিই এ কাজটা করার। এসব কিছু
' ম্যাজিসিয়ান ডি মু্রারী প্রেক্ষিত পূর্বোত্তরের জাদুচর্চা ' বইটি লেখার অনুপ্রেরণা হয়ে সক্রিয় হয়।
প্রশ্ন ঃ আপনি ফেইসবুকে ভীষণভাবে একটিভ।মনে হয় বেঁচে থাকার আস্বাদ পান।‘ফেইসবুক এবং আপনি’ এই সম্পর্কের সখ্যতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।
উত্তর
ঃ ' ফেসবুক এবং আমি '
অত্যন্ত তিপ্ত এক সম্পর্ক এবং আমাদের সক্রিয়তা। আগে আমি সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক সম্পর্কে কিছু জানতাম না। দেখতাম ছেলে মেয়ে বৌমা এরা সবাই ফেসবুক নিয়ে মগ্ন। কৌতূহল হলো, একটা আই ডি খুললাম নিজেই। মজার ব্যাপার হলো ফেসবুক যেন এক পৃথিবীর উপর আরেক মানুষের পৃথিবী। প্রিন্ট মিডিয়ার দুঃসময়কালে, বর্তমানে মানুষ যখন একা হয়ে যাচ্ছে, তখন ফেসবুক মানুষকে যুক্ত করছে। বিশেষ করে সাহিত্য চর্চার সুন্দর প্ল্যাটফর্ম এটি। অবসর জীবনে ভালোভাবে সময় কাটানো যায়। আমি সত্যিই ফেসবুকে খুব এ্যাকটিভ। তবে আমি চ্যাট করিনা লিখি। অবসর জীবনে ফেসবুকের কল্যাণে লেখালেখিতে সর্বক্ষণ যুক্ত থাকতে পারছি। অনলাইন লেখালেখিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এবার বইমেলায় প্রকাশিত আমার ' স্বগত সংলাপ ' বইটির ইবুক অনলাইনে আছে। বিভিন্ন গ্রুপ, ব্লগ,
ই ম্যাগাজিন, ই-নিউজ চ্যানেলে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, সমাদৃত হয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছি। বহু সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে। মনে হয় প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ফেসবুক পাঠক সংখ্যা আমার অনেক অনেক বেশি। তাই ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক লেখা প্রিন্ট মিডিয়ায়ও যাচ্ছে বৈকি! ফেসবুকে অত্যধিক সক্রিয় না হয়ে পারছি কই!

No comments:
Post a Comment