“আমার ভেতরে আমারই অভ্যুণ্থান, আত্মজীবনী নয়, আত্মার জীবনীই আমার কবিতা । অভ্যুথ্থান ।”
বাংলা সাহিত্যে কবি মিলনকান্তি দত্ত মানেই এক ভিন্ন স্বর ।ভিন্ন উচ্চারণ । ত্রিপুরার মনজ্ঞ মহলে মিলনকান্তি মানেই একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস। তর্ক-বিতর্কের উর্দ্ধে জ্ঞান-গভীরতায় এক শীতল আশ্রয়-প্রশ্রয়।নিজস্ব শিল্প-ভাষা বৈচিত্র্যে ভরপুর তাঁর কবিতা। নিজের সাথে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা না–করলে তিনি একজন বিখ্যাত চিত্রকর হতে পারতেন,আরও অনেক উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারতো তাঁর বেশ কয়েকটি গবেষনাপত্র, হতে পারতেন আরও অনেক কিছু...। আজ কবি মিলনকান্তি দত্ত-এর সাথে নিবিড় থেকে নিবিড়তম আলোচনায় আমি তমালশেখর দে। এখানে আমি কবি মিলনকান্তি দত্ত –এর চেয়েও বেশি সন্তকেবি মিলনকান্তি দত্ত –কে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।চলুন, প্রশ্ন-উত্তরে পরিভ্রমণ করি তাঁর
ভাবনার জগৎ -
প্রশ্ন ঃ দিবারাত্রি যাপনের কোন
পর্যায়ে আপনি একটি কবিতা লিখতে বাধ্য হয়ে পড়েন
?
উত্তর ঃ কবিতা তো লিখি না, হয়তো কবিতা হয়ে উঠি।
রবীন্দ্রনাথ ভাইঝি ইন্দিরাকে লিখেছিলেন,হয়তো তুমিও জানো কথাটা, ‘আজকাল কবিতা
লেখাটা আমার পক্ষে যেন একটা গোপন-নিষিদ্ধ
সুখসম্ভোগের মতো হয়ে পড়ছে –’ শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেমন তাঁর কবিতাসিদ্ধ
স্পষ্টতায় বলেছিলেন,‘কবিতা লেখাটা যৌন
উত্তেজনা পাওয়ার মতো ব্যাপার।!’ আমার ক্ষেত্রে যে কথাটি তোমাকে বলার – কবিতা লিখতে
বাধ্য হওয়ার যে ব্লাস্টার্ তা-কি বর্ণনা করা যায় ? আমির একটা অভ্যুণ্থান টের পেলে-
আত্মস্বরূপের ক্লেদ ও লাভা হৃদয়ে মগজে একাকার হয়ে গেলে একটা লেখ্য বিষয় হয়ে জন্মাই
-- এটাই আমার কবিতা, আমার উচ্চারণে ‘মন্ত্র’।
প্রশ্ন ঃ আপনার উচ্চারণে একে ‘মন্ত্র’ বলতে চাইছেন কেন? একটা
ধর্মীয়- ঝোঁক থেকে যাচ্ছে না কথাটায়? যদি একটু খুলে আলোচনা করেন?
উত্তর ঃ ধর্মীয় ঝোঁক থাকলে কবিতার ক্ষতি হয় বলে
মনে করি না। কেন না ধর্ম মানুষের অধিআত্মা, সংস্কৃতি ও সমাজ-সর্বাত্মক উৎকর্ষের
কথা বলে। হয়তো তাই কবি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন, কবিতা একপ্রকার ধর্ম
বিশেষ।বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, কবিতা ধর্মের সহায়। সে যাই হোক, মন্ত্র শব্দের একটা
অর্থ যা মনকে ত্রাণ করে বা মনকে পরিশুদ্ধ করে। আরও অর্থ আছে যেমন, মন্ত্রণা,
রহস্য, পরামর্শ, বিচার। সুতরাং কবিতা কেন মন্ত্র নয়?
প্রশ্ন ঃ একজন সিরিয়াস কবি বাস্তব
জীবনে লম্পট হতেই পারেন, আবার একজন ঋষি। কাব্য-ভাবনার কোন পর্যায়ে দু’জনেই আবার
একাকার হয়ে যান বলে আপনি মনে করেন ? না-কি তা সম্ভব নয় আদৌ?
উত্তর ঃ তোমার এ-প্রশ্নের উত্তরে আমার এক রগুড়ে
বন্ধুর বলা পঙক্তিটি শোনাই,
‘লম্পট নিশ্চিন্তে চলে ছেনালের সাথে,তিনিই চম্পট
যিনি চলেন তফাতে।’ হাঃ!ভারী মজার পঙক্তিটি। লম্পট ও ঋষি দুটোই চূড়ান্ত মিউটিলেট
শব্দ – প্রকৃতকবিতার কোনো কাজেই লাগে না, হয়তো টলস্টয় জানতেন, তবে অন্য একটা দিক
থেকে ভাবা যেতে পারে । ভালবাসা দায়িত্বকান্ডহীন,
কর্তব্যের ভার নাকি সে বহন করতে পারে না, এমনটাই মনে করতেন বার্ট্রান্ড
রাসেল, লাভ ফর লাভ সেক্, ভালবাসা লম্পট স্বভাব। যেখানে যত বেশি ঘনত্ব, তার
কুঞ্জ সেখানে। কবি চৈতন্যকৃষ্ণ তাই ঈশ্বরকেও লম্পট বলেছেন, ‘যথা তথা বা বিদধাতু
লম্পটো, মৎপ্রাণনাথস্তু স এব না পরঃ।’ সে লম্পট যা ইচ্ছে করুক না কেন, আমার
প্রাণেশ্বর তিনি ছাড়া আর কেউ নন ।কবিরও প্রকৃত কোনো বদ্ধদায় নেই, কবিতা লেখা ছাড়া।
যে-কারণে তার প্রিয় পাঠককেও সে অতিক্রম করে যেতে পারে, আর ঋষি বলতে যদি শব্দচাষা
ধরো, যার বাক্য তিনিই ঋষি এই বৈদিক অর্থেও, তো বলা যেতেই পারে ‘না ঋষি কুরুতে
কাব্যম’ ঋষি ছাড়া কে কাব্য রচনা করবে ? এ-ক্ষেত্রে রাজর্ষিদের(?) এড়িয়ে চলাই ভাল।
নাভিচেতনা ও কবিতাজননের প্রতিভা একটা অন্বয়পর্যায়ে চলে এলে মানুষ-কবি একটু
চাম্পট্য প্রশ্রয় দেন। একটু তফাতে চলেন – বিষয়টা এ রকমই ভেবেছি অগত্যা।
প্রশ্নঃ ‘নাভিচেতনা’ – শব্দবোধটার
ব্যাপকতা অনেক দূর অবধি যেতে যেতে শব্দহীনতার দিকে একসময় বাঁক নেয়। আপনি সে চেতনাকে
কতদূর অবধি নিয়ে যেতে চান? সেখানে কি কোনো পাঠক নেই ?
উত্তর ঃ নিঃশব্দের কথা বলতে গেলেও শব্দ দিয়েই
বলতে হয়। কেননা, কবিতা একটি শব্দশিল্প। শব্দ অর্থ্যাৎ অর্থবোধ্য, ভাবগ্রাহী অক্ষর সমষ্টি এবং ধ্বনি। ওয়ার্ড ও সাউন্ড। কবিতা
বাক্ ও অবাকের অন্বয়। অবাক অংশই থাকে কবিতার মজ্জা। কিন্তু তা বাকের মাধ্যমেই আত্মগত করতে হবে। বাক্যই
বিশেষ এক পর্যায়ে কাব্য। বানীই বিশেষ এক পর্যায়ে বীণা। কাজেই কবিতার তো পাঠক
থাকবে। কিন্তু সেই পাঠকও তখন কবির মতো অবাক্ পর্যায়ের অংশী। চেতনাকে কতদূর অবধি
নিয়ে যাব, তা কি তাৎক্ষণিকতায় বলা সম্ভব ? এমন সচেতনভাবে? বিষয়টা যে অন্দরমহলের
সংবাদ!
৫।প্রশ্ন
ঃ অতি সম্প্রতি পৃথিবী জুড়ে চলছে তত্ত্বের বিস্ফোরণ। এর ক্রমিক ঘাত-প্রতিঘাতে আমূল
বদলে যাচ্ছে দেখার চোখ, লেখার প্রকরণ,পাঠকের সাথে লেখকের সম্পর্ক। পুনর্বিবেচিত
হচ্ছে আধুনিকতার সব ধারণা। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক হোমে মারামাগোর
‘ব্লাইন্ডনেস’ উপন্যাসে দেখা যায়, হঠাৎ মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে পরে আবার
দৃষ্টি ফিরে পায়।ঔপনিবেশিক আধুনিকতা বা একটু ঝেড়ে-কেশে বলা যায় যা ইউরো-আধুনিকতার
প্যারামিটারে দীর্ঘকাল মাপা হয়েছে আমাদের মননের সৃজন – একটা অন্ধতা গ্রাস করে
ফেলেছিল, তোমার চোখে যা পরিবর্তন মনে হয়েছে, আমি স্বাগত জানাই, আমার মূল্যায়ণ এই
রকম, বিশেষ করে আমাদের দেশে হরাইজেন্টালকালচার
বা মৃত্তিকাশায়ী লোকজ কাব্যসাহিত্য এত সমৃদ্ধ এবং আধুনিক কোনো তাৎপর্যেও
এতো প্রসঙ্গিক যে, ইউরো-আধুনিকতার গাড়ল-অনুগমন এখন আর জরুরি নয়। আধুনিকতার সব
ধারণা পুনর্বিবেচিত হোক-- এটা সবচে বড়ো কথা। কাব্যসাহিত্যের এটাই তো সচলদিক নতুবা
সহস্র শৈবাল ইত্যাদি ইত্যাদি ।
৬।প্রশ্ন ঃ ‘আমাদের মননের সৃজন – একটা অন্ধতা গ্রাস করে
ফেলেছিল- ’ – আপনি কোন্ অন্ধকার দিকের কথা বলতে চাইছেন? বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ
এবং অনেকটাই তৎপরবর্তী সাহিত্য কি ‘ইউরো-আধুনিকতার প্যারামিটারে’ নির্ণীত হয়নি?
নিছক কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ...
উত্তর ঃ রবীন্দ্রনাথ অব্দি আধুনিকতার একটা
পর্যায়- রবীন্দ্রনাথের কাছে আধুনিকতার নিত্যপদার্থ হচ্ছে, মানুষের সনাতন আনন্দবোধ,
সুষমাবোধ, অসত্য নয়। রবীন্দ্রপরবর্তীতে জীবনানন্দ বললেন, আধুনিকতার চিরপদার্থ আরও
একটা পর্যায়, তা হল মানুষের অবচেতনের অভিঘাত।জীবনানন্দ মানব মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-যন্ত্রণা
অশান্তিকে চিরকালীন বলেছেন। দু’টি পর্যায়ের পুষ্টি নিয়েই বাংলাকবিতা- এবং তা
আলোচিত হয়েছে ইউরো-আধুনিকতার প্যারামিটারে। হ্যাঁ, আমি বলতে চেয়েছিলাম, তৃতীয় একটি
‘নিবিড়নিভৃতিপূর্ণিমা নিশীথিনী’-র দিকে যাত্রা সম্ভাবনার কথা!
৭। প্রশ্ন
ঃ ‘বাক্-কে কেউ হয়ত দেখেও দেখলো না, কেউ হয়ত শোনেও শুনলো না।আবার কাউকে সে অনাবৃত
করে দিল,সুবেশ প্রেমার্দ্র পত্নী পতির কাছে যেভাবে নিজেকে তুলে দেয়’ – ঋকবেদের এই উক্তির
প্রেক্ষাপটে আপনার কাছে জানতে চাইছি, একটি অদৃশ্য কবিতা কীভাবে আপনার মননে স্থান
করে নেয় ? কখনই বা তা নির্মাণের কৌশলে জন্ম নেয় কবিতায়?
উত্তর ঃ পরা-পশ্যন্তি-মধ্যমা-বৈখরী । বাকের এই
চতুর্দশা । বাক্ ও অবাকের শিল্পই মন্ত্র।
বাক্ দেখা যায় তাই তিনি বর্ণ। বাক্ শোনা যায় তাই তিনি শ্রুতি। বাক্ আমাদের ঐতিহ্যে
তাই তিনি স্মৃতি। গুনীর গান বাক্ । আমরা অবাক হয়ে শুনি। সন্তকবি রাধারমণ
দত্ত বলেছেন, ‘নিজের বেদন সবাই বুঝে পরের বেদন না, গোকুলে
সুহৃদ পাই না কার ঠাঁই করি আ।’ এই ‘আ’ বাক্ সুহৃদ অর্থ্যাৎ একমাত্র হৃদয়প্রতিভার
কাছেই তার ঠাঁই ।আমি প্রথমেই বলেছিলাম তোমাকে তমাল, আমার ভেতরে আমারই অভ্যুণ্থান,
আত্মজীবনী নয়, আত্মার জীবনীই আমার কবিতা। এখানে নির্মাণও নেই। কৌশলও
নেই। একটি ওয়ানলাইনারে বলেছিলাম , ‘ফুসফুসভরা কবিতা নিয়ে জাগি, কবিতার
প্রতিপক্ষদের নিয়ে ঘুমাই বলে’ – নির্মাণ,কৌশল এরা সবই কবিতার প্রতিপক্ষ, কিন্তু
প্রতিপক্ষেরও ইন্ধন জরুরি। এরা আছে বলেই আত্মপক্ষ অর্থ্যাৎ আত্মার পক্ষ পক্ষী হয়ে ওড়ে ।
৮।প্রশ্ন ঃ ‘বাক্ থেকে বাক্য’—এই দূরত্বকে আপনি কীভাবে
দেখছেন ? কিংবা রবীন্দ্রনাথ যখন মন্তব্য করেন – ‘প্রকৃত বাঙলা ব্যাকরণ
একখানিও প্রকাশিত হয় নাই। সংস্কৃত ব্যাকরণের একটু ইতস্তত করিয়া তাহাকে বাঙলা
ব্যাকরণ নাম দেওয়া হয়েছে।’ এই সার্বিক বিষয়ে আপনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একটু
বিস্তারিত জানতে চাইছি?
উত্তর ঃ
বাক্ থেকে বাক্য – দূরত্ব নয়। অঙ্গাঙ্গী। আর রবীন্দ্রমন্তব্য, ‘ প্রকৃত
বাঙলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই।’ – কথাটা মান্য।বাংলা ভাষার একটা
স্বতন্ত্র মেজাজ, শব্দশৈলী,স্বতন্ত্র উচ্চারণ ও কথাভঙ্গি রয়েছে, রয়েছে শব্দগঠনের বিমিশ্র
উপভাষিক রীতি। সংস্কৃতের নিয়ন্ত্রণ বা অনুশাসনমুক্ত হয়ে তার স্বাধীন হওয়া দরকার।
এখানে কিন্তু সংস্কৃতভাষাকে ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে না, তা সম্ভবও নয়। এক্ষেত্রে
আধুনিক বৈয়াকরণ বা ভাষাবিদরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কিছু কিছু কাজ করছেন – বাংলা
ব্যাকরণে কিছু পরিবর্তনও চোখে পড়েছে - এক্ষেত্রে বাংলাদেশেও ভাল কাজ হচ্ছে। পবিত্র
সরকার একটা সুন্দর কথা বলেছিলেন – ‘পুরো ব্যাকরণ কোনও জ্যান্ত ভাষার ক্ষেত্রে এখনও
রচিত হয়নি, হবে না। বাক্যের ব্যাকরণ শেষ
হলেও থাকে অর্থের ব্যাকরণ। সে এক মহাসমুদ্র।’ সমুদ্রের মহানাবিক তো মানুষই। আমার
বিশ্বাস, খণ্ড খণ্ড ক্ষেত্রে অখণ্ড সেই
কাজ এগোবে ।
৯। প্রশ্ন
ঃ কবিতা- আধুনিকতা এবং সময় এই ত্রয়ী শব্দবন্ধ-কে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইবেন
?
উত্তর ঃ আমি বিশ্লেষণ করব না।সংশ্লেষণই কবির কাজ। সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া
কবির কাজ নয়। বরং সময়কে প্রভাবিত করা। বরং এ-কথাও বলে নেওয়া ভালো, সময়ের আপন্ন-বিপন্ন
বলে কোনো ব্যাপার নেই।কবিতারও আধুনিকতা,
অনাধুনিকতা বলে কোনো বিষয়বস্তু নেই। কবিতাই
কবিতার কামগায়ত্রী।‘আমারে কলম মারলায় কবি কোন্ মাথা দিয়া’ —এই বেদনাবেদই কবিতাপাঠকের হৃদ্ কমলে
ধুম!
১০। প্রশ্ন
ঃ ‘সময়ের আপন্ন-বিপন্ন বলে কিছু নেই’— আপনার এই উক্তিটি যদি ধরে নিই, তাহলে
রবীন্দ্রনাথের ‘এই আধুনিকতা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে –’ কথাটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা
করবো ? নাকি আজকের প্রেক্ষাপটে উক্ত মন্তব্যের আর তেমন কোনো মানে নেই ?
উত্তর ঃ সময় বিমূর্ত ধারণা সেই অর্থে বলেছি।
সময়ের বিপন্নতা গুছের যে কথাগুলো আমরা বলি, তা হল বহিঃপ্রকৃতি ও মানুষের
অন্তঃপ্রকৃতির সমষ্টিগত একটা ধারণা । রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকে নির্বিকার তদ্ গতভাবে
দেখাটাকেই বলেছেন আধুনিকতা, সাহিত্য বাঁক নেয় মাঝে মাঝে এই বাঁকটাই মর্জি,
স্রষ্টার স্বভাব অর্থে। রবীন্দ্রনাথের কাছে মানুষের নিত্য পদার্থ হল, সত্য-সুন্দর
ও আনন্দের চিরন্তন দিকগুলো । জীবনানন্দের
কাছে মানুষের চিরপদার্থ হল তার জান্তব-জৈবিক মনোবিশ্লেষণগুলো । কাব্য-সাহিত্যের
প্রেক্ষাপট তো মূলত স্রষ্টার মন। কাজেই বলবো, রবীন্দ্রনাথের উক্ত উক্তির মানে,
আমরা আজও হারাইনি।
১১। প্রশ্ন
ঃ মিথ বা মিথষ্ক্রিয়া আপনার কবিতার বাঁকে বাঁকে স্বযত্নে লালিত-পালিত হয়। আপনি
অতীত থেকে তুলে আনেন আধুনিকতার বীজমন্ত্র। এই নিয়ে আপনার ভাবনা-চিন্তা যদি
আমাদের একটু খুলে বলেন ?
উত্তর ঃ অতীত থেকে তুলে আনা আধুনিকার বীজমন্ত্র
--
আধুনিকার এই শব্দ সমবায়ে তুমি যা বলতে চাইছ, আমি
বুঝি একটা তন্মাত্রে অতীত থাকে না, মনে হয় তা তুমুলভাবে এই বর্তমানেরও কন্ঠস্বর, কেননা মানবসভ্যতার গোঁড়াঘেঁষা
কিছু বিষয় আছে। মিথ বা মিথস্ক্রিয়া যা-ই বলো, সমস্ত
পুরান-লোকবৃত্তকথা-তন্ত্র-বেদশ্রুতি সবই আমার আমিতে মিশে আছে। আমি শুধু আমার
সমকালিনতার সঙ্গে মানুষের চিরপদার্থকে মিলিয়ে নিই। এই মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তোমাকে একটা কথা বলতে
পারি মাত্র, যা একসময় ফারহাদ মজহার বলেছিলেন, ‘কবিতা যদি আমার মধ্যে কোনো অভিজ্ঞতার সঞ্চার করতে না পারে তো সেই
শালার পদ্য পড়ে কী লাভ’-- পাঠকের সঙ্গে এই
অভিজ্ঞতার বিনিময়টা আমার চাওয়া।
১২। ‘সমস্ত
পুরান-লোকবৃত্তকথা-তন্ত্র-বেদশ্রুতি সবই আমার আমিতে মিশে আছে।’ – সবই যদি মিশে আছে
তবে লিখছি কেন ? আপনি আগে যে অর্থে ‘সময়’-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেই অর্থে আপনার এই
‘আমি শুধু আমার সমকালিনতার সঙ্গে মানুষের চিরপদার্থকে মিলিয়ে নিই।’ উক্তি কীভাবে
জাস্টিফাই হচ্ছে?
উত্তর ঃ
‘সমস্ত পুরান-লোকবৃত্তকথা-তন্ত্র-বেদশ্রুতি সবই আমার আমিতে মিশে আছে।’ কেন না আমি
তো একটা ভূখন্ড, একটা সংস্কৃতিতে, একটা
সংস্কারের ভেতর জন্ম নিয়েছি। অজস্র যোনিচক্রস্মৃতিও তো আমার অবচেতনে রয়েছে,
কিন্তু আমরা কি সচেতন? সেই জায়গাটায় তো আত্মআবিষ্কারের প্রয়োজন রয়েছে। অনুভবের
প্রয়োজন। ‘তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান’ যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন।‘
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি’ যেমন জীবনানন্দ বলেছিলেন। লিখছি এজন্য যে, আমি
কীভাবে বেঁচে আছি সেই সবের মধ্যে, সেই সবকে নিয়ে, আমি কবি, আমার ধর্ম তো প্রকাশ।
যেহেতু আমি আছি, যেহেতু আমি জানি, সেহেতু প্রকাশ আমাকে করতেই হবে। হে স্বপ্রকাশ,
তুমি প্রকাশিত হও। পুরাণ-লোকবৃত্তকথা-তন্ত্র-বেদ-শ্রুতি থেকে আমরা কিছু নিচ্ছি না,
যা আছে তা আমারই আছে, আমার মনের নবসূর্যনীলিমাক্রান্তির সঙ্গে তা সমর্থিত হচ্ছে
অথবা কিছু অংশ অসমর্থিত হচ্ছে মাত্র।সময়ের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম, তা
মানবমননিরপেক্ষ। সময় বিরাটশিশু, তার খেলা তার মতো। কিন্তু যে মানবহৃদয় কবিতা রচনা করে, সে
সমকালীনতা থেকে চিরকালীনতা অর্থ্যাৎ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় ‘ তুমি নিয়ে চলো
আমাকে লোকোত্তরে,/ তোমাকে, বন্ধু, আমি লোকায়তে বাঁধি।’
১৩।প্রশ্ন
ঃ উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিকে কেবল সমস্যা আর সমস্যা। আফ্রিকা মহাদেশের ২৯টি
দেশে, মধ্যপ্রাচ্যে ২৬৭টি বিদ্রোহী দল,ইউরোপের ১০টি দেশে ৮০টি বেসামরিক বাহিনী,এশিয়ায়
১৬টি দেশে ১৬৮টি বিদ্রোহী দল নানা দাবিতে যুদ্ধে সক্রিয়।এই রকম একটা সময়ে কবিতা কীভাবে সাহায্য
করতে পারে? নাকি সবই নিছক আত্মবিনোদন?
উত্তর ঃ তুমি অতি সাম্প্রতিক থেকে বেশ ভালো তথ্য
দিয়েছ। অনেকের কাজে লাগবে।তবে কথা হল, আমার গুরুকবি, নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনার শাব্দিক
সুধীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ থাকে না। কবিও অন্ধ থাকতে
পারেন না। তার কণ্ঠে যে পারিপার্শ্বিকের মালা ।কবিতা সব সময়ই মানুষকে সাহায্য করতে
পারে। কিন্তু কবিতা থেকে মানুষ সাহায্যটি কীভাবে নেবে, কতোটা, কী প্রয়োজনে নেবে তা
ভাবতে হবে বই-কি! কবিতা তো সবচেয়ে বড়ো সাহায্য করে প্রথমত কবিকেই । মাথার ঘায়ে
পাগলরাই কবি হন প্রধানত । দার্শনিক মিশেল ফুকো মনে করতেন, আদিম সামাজিকতায় মানুষ উন্মাদ হয়
না। মানবসমাজের বাইরে কোনো উন্মাদ ব্যক্তি নেই।সভ্যতার চাপই মানুষকে ক্লান্ত করে।
ক্লান্ত করে।উন্মাদ করে।কবি ক্লান্তির কথা বলবেন।ক্রান্তির কথাও বলবেন।লিঙ্গাত্মার মুক্তির কথা বলবেন। ‘কীভাবে’ প্রশ্নটা এক
থেকে ভিন্ন অনেক সমস্যার।অবশ্যই কবিতা নিছক আত্মবিনোদন নয়।
১৪।
প্রশ্নঃ ‘লিঙ্গাত্মার মুক্তি’ – ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বিগত
কয়েকদশকে এমন কোনো কবিতার লাইন তো দেখা গেলো না, যাকে সামনে তুলে ধরে পতাকা করা
গেছে? অথচ যুদ্ধ চলছে নিরন্তর--!আমিই-বা কেন এত হতাশ হয়ে পড়ছি?
উত্তর ঃ ‘লিঙ্গাত্মার মুক্তি’ বলতে আমাদের স্থূল উদ্বোধনের মুক্তি।‘ মহাপৃথিবী’র কবি যেমন বলেন, ‘ আরো দূর
চক্রবান হৃদয়ের পাবার প্রয়োজন রয়ে গেছে...’। বিগত কয়েক দশকের বাংলাকবিতার পরিসর
নেহাৎ ছোট নয়। বাংলাকবিতাবিশ্বের অজস্র অকাট্য পঙক্তিবেদ উদ্ধার করা যেতে পারে,
হয়তো কবি অজস্র বলে, এখন কেউ কেউ কবি নন, অনেকেই কবি, হয়তো পরিসর সহস্রযোজন বলে
বিস্ফোরণ-আন্দোলন-যুগান্তকারী নাড়া, এই জাতীয় কিছু সহসা চোখে পড়ছে না।তুমি যেমন
বললে – ‘ সামনে তুলে ধরে পতাকা করা’ – আমি বিশ্বাস করি, কবির নিজের মধ্যে বিস্ফোরণ
হোক, বিপ্লব হক,কালান্তর হোক, কবিতাসংক্রান্তি ঘটুক, সে ক্ষেত্রে হতাশ নই আমি !
১৫। প্রশ্ন ঃ এই সময়ে
সার্বিক অর্থে রাজনীতি বলুন, সংস্কৃতি বলুন, সাহিত্য ভাবনায় বলুন, কি ধরনের
প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলেন, যা আপনি দেখতে পাননি বা পেয়েছেন ?
উত্তর ঃ এই সময়ের প্রথম আলোয় সার্বিক অর্থে,
তুমি যা বললে – রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্যভাবনার ক্ষেত্রে একটি তরুণ-তরুণীর
বোধজগতে কোনো প্রতিক্রিয়া একটু অভিভাবুকতার কারণে যাদের কাছে আশা করেছি – খুব ভালো
সাড়া পেয়েছি।লেখাপত্তর, ছবিআঁকা, ধ্রুপদী বিষয়ে কোনো আড্ডাপীঠে অথবা আজকালকার
মুখ-বইয়ের দৌলতে । অনেক তরুণ-তরুণীই খুব সুন্দর কথা বলেন। লিখেন । অনুভূতি শেয়ার
করেন। সর্বোপরি তাদের পড়াশোনার জগতও যথেষ্ট ক্লিন-কাট্। আমি এই প্রজন্মের
ভাবনাপ্রতিভাকে সম্মান করি। আমরা তো ততোটা সুযোগ পাইনি ! সদর্থক ভাবনার খরা যেখানে
বয়স্কদের মধ্যেই, সেখানে তারুণ্যের কাছে যতোটা প্রত্যাশা করা যায়, সবটাই হয়তো জল-অচল
নয়। বাংলাকবিতায় তো তারুণ্যের উপস্থিতি ঈর্ষনীয় । বিশেষ করে মেয়েদের।
১৬। প্রশ্ন ঃ গোটা বাংলাসাহিত্যের
নিরিখে ত্রিপুরার সাম্প্রতিক সাহিত্য-চর্চায়
প্রাপ্তি ও সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
উত্তর ঃ মোড়লরা মানুক বা না-মানুক গাঁয়ে মানে —ত্রিপুরার
সাম্প্রতিক সাহিত্যচর্চা বিশেষ করে কবিতা, এবং তার স্বরে যা বলবার মত তা হচ্ছে,
প্রবন্ধ-নিবন্ধ সঙ্গে নাটক-উপন্যাস-ছোটগল্প আমি যথেষ্ট সম্ভাবনাময় বলে মনে করি। রাজন্যযুগ
থেকে এই শূন্য দশক অবধি, অনঙ্গমোহনী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ, বিকচ চৌধুরী-র
রবীন্দ্র গবেষণা সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষ-এর উৎসাহ—এসব তো মাথায় আছেই,আজকাল ত্রিপুরার
সাহিত্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখছেন অনেকেই।সেদিন এক সাহিত্য সম্মেলনে শুনলাম,
কিন্নর রায় স্বীকার করলেন যে, ‘মগের মূলক’ শব্দটি ছাড়া তার মগ জাতি সম্পর্কে কোন
ধারণাই ছিল না, ত্রিপুরায় এসে দেখালাম—এখানে মগ-সাহিত্য আছে, এমনকি মগ জাতির
কবি-লেখকরা ভালো বাংলা ভাষাতেও লিখছেন। উপজাতিরা তাদের মুখের ভাষায়
রবীন্দ্র-সৃষ্টির অনুবাদ করছেন, যা শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী দ্বারা স্বীকৃত ও
প্রকাশিত হচ্ছে। সাহিত্য একাডেমি সম্মাননাও লাভ করছেন কেউ কেউ। ত্রিপুরার সাহিত্য
চর্চার সম্ভাবনার দিকটা আমি দূর্বল মনে করি না -- তবে আমরা আমাদের মত করে এগিয়ে
যাবো। ‘তোমরা যা বলো তা বলো আমার লাগে না মনে’ ...
১৭। প্রশ্ন ঃ আপনার
কবিতার লাইন- ‘এমন কি মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রতিটি বন্দুক চায়/ একটু আড়ালপ্রিয়তা/...যেখানে
সম্ভাব্যযুদ্ধটা কবিতাপাঠের পর নিষিদ্ধ করতালির মত/আপাত শান্ত’ — আপনি এই সময়ের
একটি গোপন সংকটের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন
স্পষ্ট । যদি একটু আলোচনা
করেন?
উত্তর ঃ বহু কবিতার শুধু কথামাত্র,কথার অতিরিক্ত
ব্যাপ্তি নেই।অথচ এই ব্যাপ্তি আড়ালেই তৈরি হয়। অথচ আড়ালের কথাগুলোই কবি বলিয়ে নেন বিশ্বপ্রকৃতির কারো কারো প্রকাশ্য বাস্তবতার
দ্বারা - দেখেছি বন্দুকদ্বন্দ্ব’ও একেবারে সরাসরি হয় না, দুটো মরণখিলাড়ি, মাঝে
মাঝে নিজেদের মধ্যে অন্তরালে সৃষ্টি করে, এটা একটা ব্যাপার । দেখেছি ঠোঁটের তীব্র
বিকিরণের কাছে গোঁফের এ্যাম্বুশ – এখানেও একটা আড়ালের চিত্রকল্প আছে, গোঁফের
এ্যাম্বুশের কাছে ঠোঁট কি তীব্র বিকিরণ ছড়াতে পারে, তার একান্ত আপন বিকিরণ ? অথবা
আরেকটা অনুভুতি আমার হয়, একটা কবিতা কি হাততালির বিষয় ? হাততালি নিষিদ্ধ হলে
কবিতার ফ্লুত শরীরটা প্রকৃত’ই অনুভূত হয়, হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছো , হাততালিতে একটা
সমর্থন আছে যেন, আবার নিষিদ্ধ শব্দের প্রয়োগে একটা বাধাও আছে। শ্রুত আর প্রতিশ্রুতের
দ্বন্দ্ব সম্পর্কে একটা আড়াল যেন সব সময়ই কবিকে
দিয়েও নিরালার ফুল কুড়োয়। এখানে হয়ত একটা অলীক গন্ধময়তাও আছে। এখান থেকে কবির
খিস্তি গড়ে উঠলে তাও রাষ্টীয় আ্যান্থেম হওয়ার যোগ্য । বিল-হার বার্ট’এর একটা কথা মানি,
‘কবিতা একটা মূলগত মানব আচারন’ – একটি কবিতা হয়ে উঠার ক্ষেত্রে আড়ালের সঙ্গে
প্রিয়তার যোগ ঘটিয়ে, মানব আচারন যে এস্টিমেশন গড়ে তোলে – তা আমি অনুভব করার চেষ্টা
করি। জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘ভালো করে লেখা মানে নিজের পছন্দকে খুশি করে লেখা নয়
শুধু, নিজের বোধিকে পরিতৃপ্ত করে লেখা।’ মনে হয় প্রত্যেক কবি প্রথমে নিজের পছন্দকেই খুশি করে লেখেন, পরে নিজের বোধিকে একটা
পরিতৃপ্তির স্তরে নিয়ে আসার তাগিদ টের পান, ব্যাপারটা সচেতনভাবে হতে পারে।
অবচেতনেও ঘটে যেতে পারে। তুমি যে কবিতা পঙক্তিগুলো বললে, তা ‘আড়ালপ্রিয়কথা’ নামে
আমার একটি কবিতার, যা ‘উন্মুলিত ক্রোকাসের দল’ কবিতা বইতে আছে। হ্যাঁ এটাও তুমি
ঠিক ধরেছো, এই প্রিয় আড়াল একটা সংকটও বটে, সংকট এই কারণে যে, দ্বিধা তরতর চেতনায়
সকলের ক্ষেত্রে তা সাতটি অমরাবতী হয়ে ধরা দেয় না। তা ব্যক্তি হোক, সমাজ হোক,
রাষ্ট্র হোক।
১৮। প্রশ্ন
ঃ আপনি তো একসময় অনেক ছোটগল্প লিখেছিলেন। সেও অনেকদিন আগের কথা। এ’দিকে আর এগুলেন
না কেন?
উত্তর ঃ হ্যাঁ। ছোটগল্প লিখেছি। কয়েকটি সেই
সময়ের ‘জাগরণ’ দৈনিকের রোববারের পাতায় ছাপা হয়েছিল। নিরীক্ষাধর্মী গল্প। তবে গল্পে
আমি সহজিয়া রীতিই পছন্দ করি। অর্থ্যাৎ গল্পে গল্প থাকবে এবং থাকবে গাল্পিকের নিজের
বক্তব্য, চরিত্র ও পারিপার্শ্বিকতার বিশ্বস্ত কথন। এ-পথে আর বেশি এগিয়ে যাওয়া
সম্ভব হল না, মূলত, অভিজ্ঞতার অভাবে। মূর্খ, ততোটা সামাজিক নই বলেই হয়তো।
১৯। প্রশ্ন
ঃ গল্প মানেই বাক্যের তরল এবং তীক্ষ্ণ বিন্যাস।এই ক্ষেত্রে ত্রিপুরার গল্প বিন্যাস
কতটা সফল বলে আপনি মনে করেন?আমার তো মনে হয়, এখানে স্পষ্ট একটা সংকটে
ভুগছি। আপনার মূল্যায়নটা ঠিক কি রকম?
উত্তর ঃ ‘গল্প মানেই বাক্যের তরল এবং তীক্ষ্ণ বিন্যাস’
তোমার এই সংজ্ঞায়নটি সার্বিক? তাছাড়া এ-রাজ্যের গল্পের ‘স্পষ্ট সংকট’টা তোমার
ইচ্ছায় কী-রকম তা বলোনি, তবু বলি, এ-রাজ্যে অনেকগুলো গল্প-সংকলন বেরিয়েছে। রাজ্যের
গল্পকাররা লিখে যাচ্ছেন, ক্রমউৎকর্ষের একটা ছাপ আছে, কবিরা গল্প লিখছেন, আমি তো
খুব বেশি পড়িনি, যতোটুকু পড়েছি তা-তে রাজ্যের গল্পচর্চা অসফল বলে মনে হয় না।
২০। আমি ঠিক ‘অসফল’ বলতে চাইছি না, কলকাতা, বাংলাদেশের
সাথে তুলনামূলক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে
বলতে চাইছিলাম। ‘গল্প মানেই বাক্যের তরল এবং তীক্ষ্ণ বিন্যাস’ এটা ‘সার্বিক’ অর্থে না-হলেও, সাম্প্রতিক
পরীক্ষা-নিরীক্ষার অর্থে উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম। আখ্যান-পরবর্তী
ছোটগল্পে যে শব্দ এবং বাক্যে, চরিত্র চিত্রকল্পে, যে সটান গতি এসেছে, তাঁর দিকে
ইঙ্গিত করেই বলেছিলাম।সেই নিরিখে এখন আবার বলছি, এই নিরিখে আপনি কী মনে করেন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, তোমার কথাটি বুঝতে পেরেছি।
ত্রিপুরায় কবির তুলনায় সংখ্যা তো খুব বেশি
ন্য়। তাদের মধ্যেও
অনেকে আবার হয়তো পাঠকের কথা ভেবে,
আখ্যান ধর্মীতায় বিশ্বাস করেন, কিছু সংখ্যক গাল্পিক অবশ্যই আছেন, যারা হ্যাঁ গল্প-
না গল্পের মাঝমাঝি একটা স্তরে লিখছেন। আধুনিক ছোটগল্পের জনক স্টিভেনসন ছোটগল্পের
৩টি শ্রেণী নির্ণয় করেছেন — ১। প্লটের গল্প ২। চরিত্রের গল্প ৩। ইম্প্রেশন বা
প্রতীতির গল্প। বিমল কর মশাই আখ্যান ছেড়ে দিয়ে চরিত্রধর্মী গল্প লিখেছেন এবং গল্পে
একটা নতুনধারার সঞ্চার করেছিলেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, এ-রাজ্যে এই নিরিখটা হয়তো
এখনো এতোটা শক্তিশালী নয়।
২১।প্রশ্ন
ঃ আপনার প্রতিভা বহুমুখি। সময়ের সন্ধিক্ষণে আপনি একসময় নাটক লিখেছেন এবং অভিনয়ও
করেছিলেন।শিল্পের সেই অবস্থান বা আঙ্গিক থেকে সরে এলেন কেন?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, নাটক লিখেছি। অভিনয়ও করেছি।
শিল্পের সেই অবস্থান বা আঙ্গিক থেকে সরে এসেছি মূলত, কবিতা ও
আলোচনাসাহিত্য-প্রবন্ধে বেশি সময় দেব বলে, মনে হয়েছে এ’দুটি ক্ষেত্রই আমার
স্ব-ক্ষেত্র।
২২।প্রশ্ন
ঃ এই সময় নাটক প্রচলিত বাস্তববাদী ধারাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পৌঁছতে চাইছে সময় ও
ব্যক্তির নানাবিধ অসুখের উৎসে। ফর্মহীনতার মধ্যেই খুঁজে নিতে চাইছে তার ফর্ম। সে তুলনায়
ত্রিপুরার নাটক এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে কি আপনার মনে হয়?
উত্তর ঃ ‘সময় ও ব্যক্তির নানাবিদ অসুখের উৎস’
এটাও প্রচলিত বাস্তববাদী ধারাই। ফর্মহীনতার ফর্মও বাস্তববাদী। নাটক সবসময়ই
কালেক্টিভ ক্রিয়েটিভ এন্ড পারফর্মিং আর্ট। হ্যাঁ, তুলনা যদি করতে হয়, তবে মারাটি নাটক,
পশ্চিমবঙ্গের নাটক বা মণিপুরের তুলনায় ত্রিপুরা ততোটা পেশাদারি দক্ষতায় পৌঁছতে
পারেনি, তবে, এ-রাজ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের কয়েকটি নাটোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে
যাওয়ার পর নাটকে তুমুল রকমের একটা সচেতনতা এসেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক এবং
স্থানিক লোককথা ভিত্তিক অথচ বিশ্বমানবতার ভাবনাসূত্র ধরে, কম হলেও, অন্যধারার
নাট্যচর্চা অব্যাহত রয়েছে। বেশ কয়েকটি নাট্যবিষয়ক কাগজের প্রকাশও বেশ আগ্রহব্যঞ্জক।
এটা ভালো দিক। এই সঙ্গে ভাবনার একটা বিশেষ দিক হল, কেবলমাত্র কোরিওগ্রাফির চর্চা
এখন আম-দর্শক খুব একটা নিচ্ছে না, কিছু শহুরে দর্শক ছাড়া গ্রামীণ লোকসংযোগে আধুনিক নাটক পোঁছতে পারছে না। যেখানে
আবেগীঅভিনয়ের গুরুত্বকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। অর্থ্যাৎ একটা মিশ্রপদ্ধতি । তাছাড়া
নাটক এখন শুধু বাচিক ও আঙ্গিক নয়, মঞ্চসজ্জা, মঞ্চভাঙা, প্রতীকী আসবাবের ব্যবহার,
আলো, শব্দ-প্রক্ষেপন, সবকিছু মিলিয়ে একটা মোটমাট আয়োজন।
২৩।প্রশ্ন
ঃ ‘বিসর্জন’ নাটক নিয়ে আমরা অবশ্যই গর্ব বোধ করি এবং করবো। কিন্তু তারপরও ক্ষীণ একটা অনুযোগ পাহাড়ের মত ঠেকে আমার
কাছে, যা হল- এই কাহিনিতে ঐতিহাসিক
চরিত্রকে কবি নিজের দাবার গুটির মত পরিচালনা করেছেন, যা তাঁর ক্ষেত্রে হয়ত
সুবিধাজনক হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত চরিত্রের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে
আপনার মতামত জানতে চাইছি ? এই প্রসঙ্গে দায় এবং দায়িত্ব নিয়েও যদি কিছু বলেন?
উত্তর ঃ ইতিহাস এক জিনিস। ইতিহাসভিত্তিক কাব্যনাট্য বা
উপন্যাস আরেক জিনিস। একজন কবি বা ঔপন্যাসিক ঐতিহাসিক নন। তিনি ইতিহাস থেকে
উপাদানবস্তু সংগ্রহ করবেন, কিন্তু তার মন ও মননের ইতিহাসই তার কাছে প্রকৃত ইতিহাস।
এমন অর্থ ইতি-হ-আস অর্থ্যাৎ ‘এই রকম অবশ্যই ঘটেছিল, সর্বদা তিনি না-ও মানতে পারেন।গোবিন্দমাণিক্যের
কথা আমরা রাজমালা পড়লেই জানতে পারি –ত্রিপুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষায়
গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্রটি কতোটা বাস্তবনিষ্ঠ এ-সব তথ্য। তার জন্য
রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি বা বিসর্জন পড়ার দরকার পড়ে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে,
রবীন্দ্রনাথের মানসসৃষ্টি। এই উপন্যাসে কবির মননে যা মানবাদর্শের দৃষ্টান্ত তারই মূর্তরূপ গোবিন্দমাণিক্য। এ-গোবিন্দমাণিক্য কালের ইতিহাসের নয়। কালাতীতের।
ঠিক একইভাবে বউঠাকুরানীর হাট উপন্যাসেও প্রতাপাদিত্য চরিত্র অঙ্কনে কবি ইতিহাস
অনুগত থাকেননি। বিষয়টাকে চরিত্রের অবমূল্যায়ন বলব না—কাব্যসাহিত্য নাটকে এটা
সিদ্ধপ্রথা, এমন অনেক প্রসিদ্ধরাও করেছেন। ‘দি পিকচার অফ ডোরিয়ান এে’ উপন্যাসে
অস্কার ওয়াইল্ড একটা সুন্দর কথা বলেছিলেন, ‘ ভালো কিংবা খারাপ, এমন কোনো বই
অসম্ভব। প্রশ্ন, সুলিখিত না ব্যর্থ। এইটেই আসল।’ কবির সুলিখিত একটা বই হিসেবেই
বিসর্জন নাটকের মূল্য এমন নয়, তা মানবতার ইতিহাসে ব্যর্থ নয় বলেই নাটক.টির
যথার্থতা।
২৪। প্রশ্ন ঃ আপনার সব যুক্তি মাথায় নিয়েই, পুনরায় একটা প্রশ্ন
স্পষ্ট জানতে চাইছি যে, ‘বিসর্জন’ নাটকে
রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ‘নক্ষত্র’-কে অঙ্কন করেছেন তা প্রায় তার চরিত্রের বিপরীত।
রাজা গোবিন্দমাণিক্যের ক্ষেত্রেও কিছুটা হলেও তাই। এ-যে সত্যের বিপরীত, যা আমরা
পাঠ্য পুস্তকে বহন করছি এবং আগামীতে করতেই থাকবো। এ-নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন
জানতে চাইছি ?
উত্তর ঃ দেখো, প্রথমেই বলি বিসর্জন একটা
কাব্যনাট্য। রবীন্দ্রনাথ তার ভাষা, আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে পরিণতি বা ক্রাইসিসটাকে যে
উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তার ধারেকাছে কেউ পৌঁছতে পারেননি, কারণ তিনি
রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের তুলনা মাথায় রেখে বলব, ঠিক ব্যর্থতা নয়, আমাদের, হয়তো
আমাদের নাটকশিল্পীরা অন্যধারায় ভাবছেন এবং কিছু কিছু নাটক তো দর্শকনন্দিত হচ্ছে, অবশ্য আমাদের খুব সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে।
২৫।প্রশ্ন
ঃ ‘শেষে রঘুপতির রাজরক্তের দাবি মেটাতেই
প্রাণ দিয়েছেন জয়সিংহ। কী ভীষণ, কী শোচনীয় সেই পরিণতি ! রঘুপতির পক্ষে এই মৃত্যু
কী নিদারুণ! এক নিমেষে এত ষড়যন্ত্র, এত প্রাণান্তকর প্রয়াস, এত একাগ্র উদ্যম সব
যেন খেলা মনে হল! যে জগতে জয়সিংহ নেই, সে জগতে যে দেবীও নেই।’ -- এবার আমি
সরাসরি আপনার কাছে জানতে চাইছি, নাটকের
সেই পরম্পরা আমরা কত’টা ধরে রাখতে পেরেছি? কিংবা কেন পারিনি ?
উত্তর ঃ নৃশংস হিংসা-হত্যা-উদগ্র ক্ষমতা
লোভ-কামার্ততা থেকে প্রেম-অহিংসা-মানবতা অমরকেন্দ্রে উত্তরণ – মানব মনের এই
উৎকর্ষলোক তো সব সৃজনকর্মীই তাদের সৃজনশিল্পে দেখিছেন – রবীন্দ্রনাথের ‘প্রকৃতির
প্রতিশোধ’ থেকে শুরু করে ‘রক্তকরবী’’
মালিনী’ নাটক, তারাশংকরের ‘রসকলি’ ছোটগল্প, বুদ্ধদেব বসুর ‘তপস্বী ও তরঈিনী’ নাটক –
অনেক উদাহরণই দেওয়া যেতে পারে। বিষয়টা শুধু নাটকের পরম্পরা, এমন নয়, সমস্ত
সৃজনশিল্পের। এই পরম্পরা চলছে, চলবে।
২৬। প্রশ্ন
ঃ রাজনীতি কি সর্বদাই নাটককে ভয় পায় ? তাই আমরা লিখতেও ভয় পাই কিংবা উপস্থাপনা
করতে ? আপনি কি বলবেন ?
উত্তর ঃ রাজনীতি শুধু নাটকে কেন? রাজনীতি
রাজনৈতিকেও ভয় পায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ ভাবছ হবে তুমিই যা চাও, জগৎটাকে তুমিই
নাচাও/ দেখবে হঠাৎ নয়ন খুনে হয় না যেটা সেটাও হবে।’ তোমার প্রশ্নটা নাটক নিয়ে।
হ্যাঁ, চলিত রাজনীতি তো নাটককে ভয় পায়।
উৎপল দত্ত বলেছিলেন, ‘একজন নাট্যকারকে তার নাটকের রাজনীতিটা কী সেই সম্পর্কে আগে
সচেতন হতে হবে।’ এ’বিষয়ে প্রকৃত
নাট্যবিদরা ভালো বলতে পারবেন। যথার্থই নাটক লিখবেন যারা, উপস্থাপনা করবেন
যারা, তারা ভয় পাবেন না, যেমন এ’দেশে
বিজয়তেন্ডুলকর, সফদর হাসমি।
ও-দেশে ব্রেখট্ ।বিষয় যেহেতু একটাই, ‘যুক্তি
তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে নীলকণ্ঠ বাগচি্ ঋত্মিক ঘটক মশাই যা বলেছিলেন – ‘এভরিথিং
ইজ বার্নিং। এভরিথিং উইল বার্ন।’
২৭।প্রশ্ন
ঃ ‘পথ বেঁকে গেলে -/ আমরা এত বেশি/ মুখোমুখি/ হই/ মনে হয় একটি একটি ঘায়ের ভিতর /
কিলবিল / করছি/ কেউ তো সহচর নই, খচ্চর নই/’—এই দৃশ্যকল্পের ভিতর এত শ্বাস কষ্ট কেন
? ‘একটি ঘায়ের ভিতর কিলবিল ...’ আমরা কি আমাদের সুস্থ পরিবেশ থেকে ক্রমশ সরে আসছি? এই কি আমাদের ভবিতব্য তবে ?
উত্তর ঃ যে কবিতা থেকে আমাকে উদ্ধৃত করেছ, সেই আমি যথেষ্ট তরুণ। আত্মউন্মাদের সেই বয়সে কষ্টশ্বাস কিছু তো থাকে। অন্তঃপ্রকৃতি ও বহিঃপ্রকৃতি অন্বয় সঠিক চেতনার সেই স্তরে সম্ভব হয় না।নান্দনিকতাকে তখন শুয়োরের চামড়ায় মোড়া একটা পবিত্র লাইবেল বলে মনে হয়। আমাদের ভবিতব্য নিশ্চয়ই এটা নয় – তবু তাৎক্ষনিকতার সেই বোধকে
এড়িয়ে যাই কী করে? পরিপার্শ্বকে একটা ঘা বলেই মনে হয়েছিল।
২৮।প্রশ্ন
ঃ ‘... আর এখানে আমার মুখ উঠে আসছে / মূলত পিকাসোর গোয়ের্নিকার মতো। টিভির
আ্যান্টেনাবিদ্ধ এই আকাশও জানে এখানে জ্বলি, এখানে ছাই’(অমীমাংসিত সহবাস) – আপনার
মননের ভিতর দিয়ে, আপনাকে ঘিরে আছে যে চারপাশ, তার মধ্যে একটা অসংগতির বিশ্বায়ন
দেখতে পাচ্ছি।আপনার এই যন্ত্রণার ভূমাতত্ত্ব নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ যন্ত্রণার ভূমাতত্ত্ব এটাই যে, যা হয়ে
আছি তা যথার্থ আমি নই, যা হতে চাই তা-ই আমার আমি। এই হতে চাওয়াটা যখন পাওয়ায় পরিণত
হচ্ছে না তখন একটা অসংগতি তো টের পাই।আকাশটাকেও তখন উদারনীলপ্রস্থ বলে মনে হয় না,
সে এন্টেনাবিদ্ধ। এখানেই জ্বলছি, আলো দিতে পারছি না। ছাই হয়ে যাচ্ছি। পিকাসোর
গোয়ের্নিকা ছবিটার চিৎকৃত ঘোড়ার মতো যন্ত্রণার ভাষা তীব্র রকম হা করে আছে।
২৯।প্রশ্ন
ঃ ‘এক যোনিপদ্ম থেকে আর-এক যোনিপদ্মের দিকে আমার গমন,/ স্তন থেকে স্তনান্তরে
চুম্বনের দায় থাকে বাকি / তন্ত্ররমণীর জঘনে ধরা অমৃতের মত্ন/করাঙ্গুলে জীবনের জপ
ধরে থাকি।’(আমি ডোম্বি, আমিই সিদ্ধা)কিংবা ‘গুরুপত্নী গমনের পর আর / কোন গমন থাকে
না।/ তবু, বাল্যসখি, তুই / জেনে গেলি রূঢ়/ স্থলনের দাগ/’(গমন)— আমার প্রশ্ন
হচ্ছে, আপনাকে জানতে গেলে, আপনার কবিতার
রহস্য উন্মোচন করতে হলে, পাঠকের তন্ত্র বিষয়ে জ্ঞান থাকা কি আবশ্যক? কবিতার পাঠক কি সেই চাপ নেওয়ার পক্ষপাতি? কিংবা
দায়বদ্ধ ? কবিতার লেখক হিসাবে আপনি কি মনে
করেন?
উত্তর ঃ আমাকে চ্যানতে গেলে, আমার কবিতার রহস্য
উন্মোচন করতে হলে পাঠকের তন্ত্রবিষয়ে জ্ঞান থাকা আবশ্যক নয়। মুলত,আমি কবিতাই
লিখছি। কবিতার পাঠক এতো জ্ঞানের ভার বহন করবেন কেন? যদিও জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই,
এখানে জ্ঞান বলতে সেই বোধি, যা বোধাতীত এক
সম্বোধির জন্য আর্ত হয়, কেন হয়? হয়তো স্পষ্ট বলা যায় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
‘যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা...’। তুমি আমার ‘আমি ডোম্বি, আমিই সিদ্ধা’
কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উল্লেখ করেছ – তখন একটা সংগতিশান্তির সন্ধান হয়তো পাচ্ছে
আমার ক্ষরচেতনা, চর্যাপদ ও তন্ত্রভাষায় উপলব্ধিটা এরকম যে, জীবনের কাছে এক অতিজীবনের
আলো নিয়ে ফিরে আসা। জীবনকে, জীবন যে রকম, যে রকমভাবে ভালবেসে, শ্রদ্ধা করে যাওয়া,
তারপর হয়তো সেই জীবনই বলে দেবে কোনো অমৃতের কথা! মাতৃযোনিভেদের যন্ত্রণাসার থেকে
প্রেমযোনি বা কোনো দিব্যযোনির দিকে যাত্রা। যোনিচক্রস্মৃতির মধ্যে এই হাজারবছরের হাঁটা
শেষতক এক গন্তব্যমুখে এসে দাঁড়াচ্ছে!
৩০। প্রশ্ন
ঃ ‘কবির বুকের ভাষা জানে লিলুয়া আকাশ।’(বাংলা ভাষা)— কবি মাত্রই জ্ঞানে-অজ্ঞানে দর্শনকাতর
। আপনি নিশ্চয়ই স্বজ্ঞানে লিলুয়া-কাতর
উত্তর ঃ নীলবর্ণ আকাশ, নীলিমা, শব্দটা কী
লীলাময়? লোককবির ভাষায় নীল, লীন ও লীলা মিলেমিশে লিলুয়া! কবির বুকের ভাষা তো
সবসময়ই আকাশপ্রিয়। আকাশের সঙ্গে থাকার
নামই সুখ। আকাশ থেকে দূরে থাকার নামই দুঃখ। ‘খ’ অক্ষরটির অর্থ হচ্ছে আকাশ।
বৈদিককবিতায় একটা শব্দ আছে ‘দাব্যাপৃথিবী’ অর্থ্যাৎ আকাশ ও মাটি। মাটির সীমা
আকাশের অসীমকে প্রার্থনা করে। মনকে প্রসারিত করতে পারলে কাঁটা রাখার জায়গা হয়।
হয়তো তাই জীবনানন্দ বলেছিলেন—‘যেখানে আকাশে খুব নীরবতা, শান্তি আছে,/ হৃদয়ে
প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে ক্রমে সেখানে মানুষ/ আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী
নক্ষরের কাছে’ – কবিমাত্রই জ্ঞানে-অজ্ঞানে দর্শনকাতর। হ্যাঁ, এখানে এই দার্শনিকতা
কোনো ডগম্যাটিক ব্যাপার নয়, এটা আত্মদর্শন – বাউলের ‘ কোথায় পাব তারে’ এমন আকুতি ও
আততির ব্যাপার, আধুনিক কবির ভাষায় দিক্ শূন্যপুরের টান, ডহরের ঘোর- গহনের টান!
দর্শন, দৃশ্ ধাতু, ফিলসফি নয়, নিজেকে দেখা, মাটির শিকড় প্রকৃতই আকাশে, আকাশ শব্দের
ভাবগত একটা অর্থ হচ্ছে সীমাহীন প্রদীপ্তি !
৩১।প্রশ্ন
ঃ ‘বিশ্বের বিবাহকাতর মেয়েগুলো এই মুহূর্তে শুয়ে আছে/ বিউটিপার্লারের পেটের
ভিতর/... নিশ্চিত গর্ভপাত সেরে ফিরে আসা একটি রেডিও/বিউটিপার্লার বুকে জড়িয়ে
ঘুমোচ্ছিল – ’(বিউটিপার্লার) (স্থূল-অর্থে) এখানে আপনি অতি আধুনিকতার সাথে সাথে
নারী জীবনের জটিলতার গভীর এক দিকে ইঙ্গিত করছেন। সেই ইঙ্গিত’টা যদি আর একটু খুলে বলেন ?
উত্তর ঃ বিউটিপার্লার একটা প্রতীক।
পণ্যকেন্দ্রিকতা ও বিপণনবিশ্বের প্রতীক। এখানে সুন্দর বিক্রিত। সুন্দর এখানে
নারীজীবনের সঙ্গে প্রতীকায়িত। বিউটিপার্লারকে বিপণন বিশ্ব তার তৈরি করা সৌন্দর্য
দিয়ে গড়ে তুলেছে, এবং মানুষের ভেতরে সেই কাঙ্খা ঢুকিয়ে দিয়েছে, যে, সে সুন্দর
বললেই তুমি সুন্দর। নিশ্চিত গর্ভপাত সেরে ফিরে আসা একটি নারী, বিপর্যস্ত ভাষায় বলা
হয়েছে রেডিও, তার বুকের ভেতরেও বিউটিপার্লার, এই বিউটিপার্লারের স্বীকৃতি ও পলিশ
না-পেলে তার বিবাহ-ও আটকে যাবে, কবিতাটিকে একটা পরাবাস্তবিক তামাশা আছে।এই কবিতায়
‘পাছার প্রতিভা’ শব্দটি কবি সুধীর সরকারের খুব কানে লেগেছিল, আমি এটাই চেয়েছিলাম।
তামাশা বলছি খুব সচেতনভাবে, শেষ পঙক্তিতে বলা হয়েছে। ‘ হে প্রেতবৈঠকের মিডিয়াম,
তাকে জাগিয়ো না।’ আসলে এই ভাষায় তাকে জাগানোর কথাই বলা হচ্ছে।
৩২। প্রশ্ন
ঃ ‘একটি গার্ডেন আমব্রেলা হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে/ ঘাম-জবজব বগলতলা সেলিব্রেটিদের বউরা নাচছেন/ মহাকর্ষের টানে একে
একে সরে যাচ্ছে মিউজিক্যাল চেয়ার/ ক্যান্টিনমাসির মেয়েকে পেয়ে বসেছে চূড়ান্ত
চেয়ার’ (মিউজিক্যাল চেয়ার)—আমাদের জীবনের পাশ্চাত্য আধুনিকতা এবং তার নিম্নগামী
না-বাচক প্রভাবের শিকার একটি মেয়ের জীবনী
এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আমি জানতে চাইছি, আপনার দৃষ্টিতে এটাই কি আমাদের
ভবিতব্য ? ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’এই একটা চেয়ারের দিকে তো এখন তো আমাদের প্রায় সবারই শ্যেন দৃষ্টি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে উঠছে
প্রায় তাকে কেন্দ্র করেই। আমি কি ধরতে
পারলাম কবিতাটা?
উত্তর ঃ এই কবিতাটি ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ ছোট্টকবিতা। কিন্তু আমার বড়ো প্রিয় কবিতা। কবিতাটির ভেতরে দুটো বিষয় আছে। বাস্তবতা একটাই, কেন জানি না, এই খেলাটি আমি মোটেই পছন্দ করি না। অফিসকম্পাউন্ডে কোনো ন্যাশনাল ডে উদযাপনের উৎসব-আনন্দে এই খেলাটি আমরা প্রয়োগ দেখি। সেলিব্রেটি বা অফিসিয়ালদের বউরা চেয়ার ঘিরে নাচেন, ওরে বাপরে, খানিকটা হাঁটা, খানিকটা দৌঁড়, সে কি আদেখলেপনা, শুধু চেয়ারে বসার জন্য। পুরুষগুলো হারমোনিয়াম বাজায় আর অগোচরে বাজনা থামিয়ে চেয়ার টেনে নেয় পেছন থেকে। স্যরের বউদের উৎসাহিত করার জন্য অধস্তনরা হাত তালি দেয়-- কিন্তু শেষতক চূড়ান্ত চেয়ারটির দখল নেয় পরিশ্রমী, খেটেখাওয়া, বুদ্ধিমতী অথচ আলাভোলা ক্যান্টিনমাসীর মেয়েটি। একটা সামাজিক ভবিতব্যের ছবি! অলটারইগো পিছিয়ে যাচ্ছে এবং সাব-অলটার্ন জিতে যাচ্ছে। এটা তুমি ঠিক বলেছ, ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ এই একটা চেয়ারের দিকে এখন তো আমাদের প্রায় সবারই শ্যেনদৃষ্টি। এ-বিষয়টাও আমার কবিতায় আছে। আরেকটা বড়ো বিষয়ও আছে, খুব ইংগিতে, সেটা হল, ‘ মহাকর্ষের টানে একে একে সরে যাচ্ছে মিউজিক্যাল চেয়ার’ আমাদের সৃষ্টিটাও তো সরে সরে যাচ্ছে, ‘সংসর ইতি সংসারঃ’ – সরে সরে যায় বলেই সংসার শব্দটি উৎপন্ন। অদৃশ্যলোকে হ্যামলিনের বাঁশির মতো একটা মারণধুন বাজছে – জীবনানন্দের ঘাঁই হরিণীর ডাকে যেমন হরিণপুরুষরা দলে দলে এসে শিকারীর ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে, এরকম, যে প্রতিষ্ঠাকে নিয়ে এতো এতো তৎপরতা, সে তো বিসর্জনের টান এড়িয়ে যেতে পারে না !
৩৩। প্রশ্ন
ঃ ‘সাক্ষাৎকারের শেষদৃশ্যে যুবতীটি/ হঠাৎ
ব্লাউজের ভেতর হাত গলিয়ে/ তুলে আনল একগোটা
স্তন এবং / দাঁত দিয়ে চুঁচি ছিঁড়েমালটা/ মহাকাশ জংশনের দিকে ছুঁড়ে মারতেই/ থর-থর
টাইম এন্ড স্পেস্ । এনকাউন্টার।’(ভৌতিক কথাবার্তা) আমি জানতে চাইছি, আমাদের
প্রথাগত এবং প্রচলিত শ্লীল ও অশ্লীল শব্দ’টাকে আপনি কবিতায় কীভাবে বিশ্লেষণ করে
থাকেন? না, সে দায় ছেড়ে দেন অবলীলায় পাঠকের দরবারে ?
উত্তর ঃ কাব্য-সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল বিষয়টা বহুচর্চিত
ও অসীমাংসিত । শ্লীল-অশ্লীলের চূড়ান্ত কোনো সংজ্ঞা নেই। শব্দ নিজে কখনও শ্লীলও নয়,
অশ্লীলও নয়। শব্দ ব্যবহার করে কবি বা লেখক বার্তাটি কী দিতে চান – তথাকথিত
শ্লীল-অশ্লীল নির্ধারিত হয় এভাবে।স্তনকে এ্যানেটের মতো ছুঁড়ে মারা মহাকাশের দিকে –
‘দাঁত দিয়ে চুঁচি ছিঁড়ে মালটা’ চিত্রকল্পটি সালভাতোর দালির একটি ছবির প্রেরণায়
মূলত, থর থর টাইম এন্ড স্পেস, আসলে সৃষ্টিকে আমি মহাজাগতিক শূন্যতার প্রেক্ষায়
স্থাপন করে বুঝাতে চেয়েছিলাম কল্পনাপ্রতিভার বিস্ফোরণকে, বিকিরণকে!
মাতৃতান্ত্রিকতা
থেকে পিতৃতন্ত্রে উত্তরণের পথে পুরুষপক্ষই যৌনবিশুদ্ধির বন্ধনে সমাজকে পুনর্গঠন করেছে।
অধিকাংশ মানবসমাজে ( কৌম থেকে গোষ্ঠী) তখন শ্লীল- অশ্লীলের সীমারেখাটি প্রণয়ন হয়।
এটা ব্যক্তিপুঁজির প্রথমস্তরে। পুরুষপক্ষই আবার যৌনতাকে চোলিকে পিছে রেখে পন্যে বা
নিষিদ্ধ উত্তেজনার খোরাকে পরিণত করেছে। ভারতবর্ষে কোনকালেই এবিষয়ে
শুচিবায়ুগ্রস্থতা ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাম অবলম্বন করে এদেশে বহু
সহজিয়া-মরমিয়া ধর্ম সাধনমত-পথ প্রচলিত আছে। এছাড়া পুরাণকাব্যকল্প-লোককথা তো আছেই।
যৌনতত্ত্ববিদ্ ফ্রয়েডের বহু আগেই এদেশে বাৎস্যায়নের
কামশাস্ত্র রচিত হয়েছে। এদেশে ভর্তৃহরির মতো কবির হাতে ‘বৈরান্যশতকয়’ যেমন রচিত
হয়েছে, তেমন তার হাতেই রচিত হয়েছে ‘শৃঙ্গারশতকয়’-এর মতো কাব্য। এদেশে ত্যাগের
মন্দিরগাত্রের বীভৎসরকম ভোগের চিত্রণ রয়েছে, খাজুরাহো ইত্যাদিতে। শ্লীল-অশ্লীল বিষয়টা
আপেক্ষিক সমাজনীতি মাত্র। আছে, থাকবে, ভেঙে যাবে। আবার আছে, থাকবে, ভেঙে যাবে।
চূড়ান্তযাত্রা এরকম পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা বেয়ে বেয়ে একটা মুক্তাবস্থায় পৌঁছবে—সেই
অবস্থায় প্রেম ও কামের কোনো বদ্ধাবস্থা থাকবে না, সমরেশ বসু ‘শাম্ব’ উপন্যাসে
খানিকটা আভাস দিয়েছেন। এখানে অর্থ্যাৎ সেই অবস্থাপ্রাপ্তির জন্য বিবর্তনের ভূমিকা
যেমন আছে, তেমন মানুষিক চেতনাচালিত পরিবর্তনেরও কার্যকর ভূমিকা থাকবে।
৩৪।প্রশ্ন
ঃ এবার একটু প্রসঙ্গ পাল্টে জানতে চাইছি, আমরা আপনাকে রবীন্দ্রগবেষক হিসেবেও জেনে
থাকি। সেই প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখেই বলছি, কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি
ঔপনিষদিক আবার গীতিকার হিসেবে তিনি
অনেকখানি বৈষ্ণবীয়— এই দুই ক্ষেত্রে
রবীন্দ্রনাথকে আপনি কীভাবে স্পর্শ
করেছেন বা করছেন?
উত্তর ঃ ‘রবীন্দ্রগবেষক’
শব্দে একটা অ্যাকাডেমিক গন্ধ আছে। সেই অর্থে আমি গবেষক নই, খুব সাধারণ মানের
লেখাপড়া করা মানুষ আমি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নিজের মতো করে কিছু লেখা লিখেছিমাত্র ।
‘রবীন্দ্রসূক্র’ নামে একখানা অভিধান রচনা করেছিলাম, যা-তে শব্দের রবীন্দ্রকৃত
সংজ্ঞায়ন, ভাষ্যের বিনির্মান ছিল। এরকম
কাজ হয়েছে কিনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, জানি না। বইটির যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া উচিত
ছিল। এ’রাজ্যে অনেক অনুচিতের ভিড় তো রয়েছে, সেই ভিড়ের ঠেলায় হয়তো বইটি অনেকে ভুলে
গেছেন। বইটির ভিন্ন একটা সংস্করণ করার কথা ভাবছি। যদিও রবীন্দ্র গবেষক বিকচ চৌধুরী
প্রশংসা করেছিলেন, শুনেছি। তোমাকে বলি, রবীন্দ্রনাথকে ঔপনিষদিক বা বৈষ্ণবীয়
অর্থ্যাৎ কবিতা ও গানের দিক থেকে, এমন করে ভাবা কি ঠিক ? রবীন্দ্রনাথ
সর্বাস্তিবাদি । এই সহস্রশীর্ষ পুরুষটিকে যদিও যথার্থভাবে আমি খুঁজে পাই তার গানে
এবং শান্তিনিকেতন ভাষণমালায় । রবীন্দ্রনাথের গানের আমি দীক্ষিত শিল্পী নই, নিজের
মনের আবেগে খালি গলায় যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাই, তখন শীর্ষেন্দুর ঘুণপোকা উপন্যাসের সেই চরিত্রটির মতো, যে বিপদে
পড়লে রবিঠাকুরকে স্মরণ করত। অন্তরে অন্তঃকরণে একটা দিব্যউপশমের আর্দ্রআভা যেন বয়ে যায়। প্রত্যেকেরই উপলব্ধিতে একজন
নিজস্ব রবীন্দ্রনাথ থাকেন, আমারও আছেন, তিনি রবি তিনি ইন্দ্র তিনি নাথ, অর্থ্যাৎ
তিনি সূর্যসনাথ – ন অথ বিদ্যতে ইতি নাথ, এরপর শ্রেষ্ঠ আর কিছু নাই, এরকমই একটা
বোধোদয়, শীলিত অনুভব।
৩৫। প্রশ্ন
ঃ রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যকে বারবার মঙ্গলের সাথে যুক্ত করেছেন। কবির কাছে – সত্য,
মঙ্গল ও সুন্দর এই তিনটি সমীকৃত।আবার কবি কখনও বলেছেন – ‘শান্তম্, শিবম্ ও
সুন্দরম্’। ভারতীয় দর্শনের প্রেক্ষিতে আপনি কীভাবে এই শব্দের সাথে নিজেকে
একীভূত বা বিশ্লেষণ করে থাকেন?
উত্তর ঃ আমাদের ঔপনিষদিক শাস্ত্রীয় উচ্চারণটি হল
‘ শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্’ । ফরাসি দর্শনবেত্তা cousin Victor এর
উক্তি Le uvai , Le beau , Le bien যা পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায়, Le bon ( The good) Le
vai ( The truth ) Le beau ( The
beautiful) --
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বাক্যটির সংস্কৃত বিরচনা করেন এরকম, ‘ ‘সত্যম্
শিবম্ সুন্দরম্’ – কবি কীটস বলেন, যা সত্য তা-ই সুন্দর। ভারতীয় দৃষ্টিতে তা-তে
যুক্ত হল কল্যাণের অর্থ্যাৎ শিবের আদর্শ । রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ভারতের আদর্শ হল
জ্ঞানে অদ্বৈত, কর্মে যোগসাধনা, ভক্তিতে বিশ্বমৈত্রী। ভারতীয় দর্শনের এই মর্মসার। সত্য, মঙ্গল ও সুন্দরের এই অন্বয়ের
মধ্যেই মানবাত্মার মূলসুরটি বিধৃত। আমার লিখিত ওয়ানলাইনার একটি কবিতায় লিখেছিলাম,
‘গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ ধরে রবিবাউলের আখড়া, তুই ফেলে এসেছিস কারে?’ রবিবাউলের
আখড়াটি সত্য, মঙ্গলের পথ ধরেই ওই সত্যের দিকে আমাদের অভিযাত্রা, ওই রাঙামাটির পথ ধরে, ওই রাঙামাটি ত্যাগের রঙ,
যাকে ফেলে এসেছি, তার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে, এটাই সুন্দর, সু-কে ধরে আছে বলেই
তা সুন্দর, বিচ্ছিন্নতাই অসুন্দর । সুন্দ ও উপসুন্দ, পুরাণচরিত্ররা তিলোত্তমা
সুন্দরীকে যখন আচ্ছন্নকামের দ্বারা ভোগ করতে চাইল, তখনই আত্মদ্বন্দ্বে তারা মরে
গেল, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল নিবিড় ভ্রাতৃপ্রেম থেকে। ইংগিত স্পষ্ট বোঝা যায়।
৩৬। প্রশ্ন ঃ ‘সব
কবি-ই একটা সুইসাইড নোট নিয়ে জন্মায়,/ আমিও’
-- আপনার জীবনযাপনেও এই রকম একটা
সুপ্ত সুইসাইড প্রবণতা যেন টের পাওয়া যায়। চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, বিয়েও করেননি।
গৃহত্যাগীর মত গৃহে আছেন।আরেকটা কবিতায় লিখেছেন, ‘নিজস্ব অঙ্কন বেয়ে-বেয়ে নদীর
স্রোতশরীর বেঁকে যায়/ নিজেই নিজের শবের বাহক...’ – আমি জানতে চাইছি, উক্ত
লাইনগুলোর ভেতরে কোথাও আপনার
বেদনার-আত্মজীবনী লুকিয়ে নেই তো?থাকলে সেটা কি রকম ?
উত্তর ঃ আমার
চেতনায় সবসময়ই একটা নির্লিপ্তি কাজ করে। কবিতায় বলেছিলাম – ‘ সকলের সঙ্গে আছি আবার
কারো সঙ্গে নেই/ আন্দাজ মতো নুন/ ব্যঞ্জনের স্ব জায়গায় বর্ণ হয়ে আছি, হয়তো-বা
বৈষম্যও’—কোলাহল খুলতেই বল্কল বেরিয়ে পড়ে, আদি অরনির আগুন অর্থ্যাৎ কিনা এক ধরণের
স্টয়িসিজম । তার সঙ্গে বেদনার আত্মজীবনীও যুক্ত বৈকি! শিক্ষক হব, শিক্ষকতা করব,
এরকম এক ভবিতব্যের স্বপ্নে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলাম, আগরতলায় একদা কবি জয়দেব বসু
জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি কি অধ্যাপক?’ বলেছিলাম, অধ্যাপক না-হলে কি ভালো লেখা যায় না ? আমার
শ্রদ্ধাজন অধ্যাপক সুজিত চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘তোমাকে ছাত্র হিসেবে আমি যে কলেজে পেয়েছিলাম, তুমি সেই কলেজের অধ্যাপক
হওয়ার যোগ্য!’ যে আবহমানের ভাঁড়রা আমাদের সমাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের বিবেচনায়
আমার চাওয়াটি, পাওয়াতে পরিণতি লাভ করেনি। কিন্তু আমি চরিতার্থ, মানুষ আমাকে শুধু
শিক্ষক কেন, তারও অধিক অন্তঃকরণের আলোর মর্যাদা দিয়েছে। সময়ের সেই উদ্দেশ্য-বিধেয় ভ্রষ্ট
অবস্থায় কিছু অশ্রু-নৈরাশ, অর্থদৈন্য এই সব আমার কবিতায় ছাপ ফেলেছে। একটা রাজকার্য
অবশ্য কপালে জুটেছিল, বেশ ক’বছর সার্ভিসের পর ছাড়পত্র দিয়ে মুক্তিলাভ করেছি, কেন
না আমার মনে হয়েছিল ঐ রাজকার্যটি আমার
আমিকে হুইপিং করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল, যতো পাই বেত, না পাই বেতন, তবু চেতনটাকে কেতনভ্রষ্ট হতে দিইনি। সংসারে সন্ন্যাসের মতো একটা
আত্মস্থদর্শন আমার মনোভঙ্গি, মনোমুদ্রায় বরাবর ছিল, বিয়ে-থা না করা কোনো স্থূলঅসুবিধার কারণে নয়। আর্ত ছিলাম, হয়তো কবিতায় ততোটা উচ্চকিত
নাদ ছিল না। এই সময়খণ্ডে মেটাফিজিক্যাল কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দের ভাষায়
যিনি ছিলেন ‘নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা’ । তাঁর বৈদগ্ধ্য, শূন্যবাদ, নিখিলনাস্তির
দর্শন বিশেষ করে তাঁর গদ্যশৈলী, শব্দশৈলী আমার উপর খুব প্রভাব ফেলে । তবে তুমি যে
পঙক্তিটি উল্লেখ করলে, ‘ সব কবিই একটা সুইসাইড নোট নিয়ে জন্মায়’ উচ্চারণটি
অনেকবেশি মগ্নতার, কবিতা ও কবির ভিতরকার কথা ! আপনা মাংসে হরিণা বৈরীর মতো
কবির অতি সংবেদনাই তার ঘাতক, ক্লান্তি ক্ষমা
করার কোনো প্রভু যখন সে খুঁজে পায় না তখন চেতনার যাতনাবেদ থেকে মুক্তি পেতে
অন্ধকারের স্তনের ভিতর, যোনির ভিতর অনন্তকাল তার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। যে অর্থে
জীবনানন্দ ঘুমোতে চান, যে অর্থে সুকান্তের ঘুম নেই, যে অর্থে জয় গোস্বামী বলেন,
ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা? বেদনার অর্থই তো যে জানতে দেয়, জানিয়ে দেয়, কবি বিষ খেয়ে বেঁচে
থাকে !
৩৭।প্রশ্ন
ঃ ‘কবিকে নিয়ে সভ্যদের কোন জয় করারত্ত হবে কি না/ জানি না/অনেককিছু-ই আমাকে জানে না বলে কবিতা/ আমাকে
লেখে/ কবিকে অসভ্য হতে হয়/ সভ্যতার দস্তুর জেনে অসভ্যকে কবি হতে হয়।’(কবিকে অসভ্য
হতে হয়)— এখানে আপনি স্পষ্টত কবি,কবিতা এবং বিদ্রোহ এই তিনটি বিষয়কে টেনেছেন। এই
একত্রীকরণ কি কাল্পনিক? না, বিশ্বাস করেন আজও কবিতা দিয়ে বিপ্লব সম্ভব?
উত্তর ঃ না।
কবিতা দিয়ে কোনো সামাজিক বিপ্লব হবে, আমি বিশ্বাস করি না। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বলেছিলেন তো – ‘ মানুষের বয়স ১০ লক্ষ বছর। কিন্তু তার ল্যাজ খসতেই তো কোটি বছর
কেটে গেছে। একটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই লেজছাড়া বাঁদরটা ঈশ্বর হয়ে যাবে ? তা কখনও
হয়?’ তবে কবিতার দ্বারা কবির নিজের মধ্যে বিপ্লব হয়। নিজের মধ্যে একটা
উন্মোচনকাণ্ড ঘটে যেতে পারে। কবি ছাড়া কারো কারো হয়তো জয় বৃথা হতে পারে, তবে জয়
ছাড়া কবি বৃথা নয়, কেন না, কবি এক পরাভূত সদাত্মা, কবি মানস পালের ভাষায় – ‘পরাজয়
টেনেছে বহুদূর’ – কবি যা চান তার অনেকটাই তো হয় না, হয়ে গেলে কবিতার কাজও মনে হবে
শেষ, তাই কবি আর কতোটা সামাজিক থাকবেন, মূর্খ বড়ো! রাষ্ট্রযন্ত্রও তাকে স্বাধীনতা
দেয় না, নিজের হাজারবোল্ট পতাকার জোরে তাকে স্বাধীন থাকতে হয়—তথাকথিত সভ্য
রাষ্ট্রের কাছে কবি তাই অসভ্য, অথচ এই অসভ্যকেই কবি হতে হয়, এবং যা সভ্যতার
দস্তুর! কবিতাটি লেখার পর আমার অনেক সুভাজন পাঠক ও কবিবন্ধু মজা করে বলেছিলেন, ‘এতোদিন
জানতাম কবিকে সৎ থাকতে হয়, মিলন বললেন, কবিকে অসভ্য হতে হয় !
৩৮।প্রশ্ন
ঃ আজকাল ধর্মের নামে রাজনৈতিক মতামত আলাদা হয়ে যাচ্ছে। যেভাবেই হোক, ধর্ম ও
রাজনীতি এত পাশাপাশি যে, যেকোন মানবিক-যুদ্ধ আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আপনি বিষয়টাকে
কীভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ প্রশ্নটি তোমার খুব সময়োচিত এবং
গুরুত্বপূর্ণ । রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করে বলি, ধর্ম ও ধর্মতন্ত্র সম্পূর্ণ পৃথক দু’টি
বিষয়। ধর্ম মুক্তির কথা বলে, ধর্মতন্ত্র বন্ধনের কথা বলে। অজস্র নিগড়ে মানুষকে
বেঁধে রাখতে চায়। আমাদের ধর্মদর্শনের দু’টি ভাগ, শ্রুতি ও স্মৃতি । শ্রুতি জীব ও
জগতের স্বরূপে ব্রহ্ম, সেই ব্রহ্ম অব্যক্তকে ব্যক্ত করার কথা বলেছে। অথচ বাস্তব
পরিহাস এটাই যে, স্মৃতি অজস্র নিষেধ, অনুশাসন, সংস্কারের জগদ্দল নিয়মে মানুষকে জড়
করে রেখেছে। তাসের দেশের রাজা যেমন বলেছে –
‘চলো, নিয়মমতে।’ আমাদের মনে রাখতে হবে, টুপির সমালোচনা করতে গিয়ে যেন আমরা মাথা
কেটে বাদ না-দিই।বাজে টুপি তো মাথাই পরে, তাই মাথাকে মুণ্ডু না-ভেবে তাকে মস্তিস্কে পরিণত করতে
হবে। ধর্ম মানুষের দসর্বাত্মক প্রকর্ষ। ড. সুকুমার সেন বলেছেন, ‘ধর্ম শুধু আধ্যাত্মিক উন্নতি আনে না।
সেই সঙ্গে আনে তার চিত্তের উন্নতি
অর্থ্যাৎ সাংস্কৃতিক উন্নতি, যাকে ইংরেজীতে
বলে ‘ কালচারাল প্রগ্রেস’।’ ‘চৈতন্যাবদান’ বইটি পড়ে দেখ। আমাদের
মহাজনবাক্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে, এই আস্তিক্যবুদ্ধির নামই শ্রদ্ধা। শ্রৎ
অর্থ্যাৎ সত্যশ্রেষ্ঠকে ধারণ করা । দুষ্টরা ধর্মতন্ত্রকে পুষ্টি জুগিয়ে এটাকেই ধর্ম
বলে চালিয়ে দিচ্ছে। সমস্যা এই জায়গায়, এখানে রাজনীতি তার ক্ষমতার স্বার্থে
প্রয়োজনীয় অম্লজানের জোগান দেয়। এরকম চলতে থাকলে তো মানবিকযুদ্ধ আসন্ন হবে, আমি
মেনে নিই সেই নিন্দার কথা – মানবিকতার বিপর্যয় আসন্ন নয়, ঘটে চলছে।এক্ষেত্রে লেখক
কবি সাহিত্যিকরা ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করবেন,
আত্মিক বোধের স্তরে ব্যাপারটা আনবেন, সস্তা বামাচারীদের মধ্যে এই এক
বিলাসিতা আছে, ধর্মের বিরুদ্ধে দু’একটা কথা বলতেই হবে ! কথা বিপ্লব বেশি, কাজের
কথা কিস্যু হচ্ছে না। এই মতাদর্শগত হেঁয়ালি মানুষ বোঝে না। মানুষকে স্পষ্ট বলতে
হবে, ধর্ম যেখানে মুক্তির সহায়ক, সেখানে আমরা ধর্মের পক্ষে। ধর্মতন্ত্র যেখানে
মানুষকে বেঁধে রাখে, সেখানে আমরা তার বিপক্ষে।বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘কবিরা
ধর্মের সহায়।’ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘কবিতা একপ্রকার ধর্মবিশেষ। দুঃখের
বিষয় আজকাল এ-বিষয়ে প্রগাঢ়সন্ধানের বড়োই অভাব – এমনকি, কবিলেখকদের একটা বড়ো অংশের
মধ্যেও, তরুণদের মধ্যে তো এ’বিষয়ে হাহাকার করার মতো অজ্ঞতা !
৩৯।প্রশ্ন ঃ ‘আমার জ্যাঠামশাই,বাবা ও কাকা /আমাকে ‘বাবা’ বলে
দাক্তেন/পিসি ডাকতেন না, একটা বাঁশির জন্য / যেদিন তার বুকে মুখ লুকিয়ে
/কেঁদেছিলাম,/ তিনি ততোধিক লুকানো একটি চুমু / থুথু লাগিয়ে সেঁটে দিয়েছিলেন / আমার
গালে, কিন্তু আমি খুব বেজে উঠেছিলাম/ সেই বাজনার আজও একটাই নাম/ ‘রাধারমণ দত্ত’’
(একটি মন্ত্রকবিতা)—সত্যি রাধারমণ আমাদের কাছে এক আশ্রয়-প্রশ্রয়। গোটা কবিতার প্রেক্ষাপটে আপনি নারী-বেদনা এবং
রাধারমণের যোগসুত্রটা ঠিক কীভাবে তৈরি করছেন?
উত্তর ঃ ‘ নিজের বেদন সবাই বোঝে, পরের বেদন না।
গোকুলে সুহৃদ পাই না করা ঠাঁই করি আ।’ ‘রাধারমণ দত্ত’ আমার কাছে শুধুই এক কবি অথবা
শুধুই এক সাধক নন, একটা ফেম, একটা প্রতীক। ‘সুহৃদ’ অর্থ্যাৎ সুহৃদয়কে কাছে পাওয়ার
জন্য সহৃদয় হৃদয় সংবেদনা, ভ্রমর কইও গিয়া, এমন এক মারণপ্রেমের আমি মহাজন। যুবতী
পিশির চুম্বন গালে পড়তেই নব্যতরুণের তনু-মন-প্রাণ সহজিয়া পিরিতির টানে বেজে
উঠেছিল, এই বাজনা তো চিরকালীন। এই চিরকালীনতাকেই আমি ধরতে চেয়েছিলাম ‘ রাধার যিনি
রমণ’ রাধারমণ দত্তের নামটি ব্যবহার করে। প্রতিকবিতার ঢঙে রচিত এই লেখা, আমার পিসির
নামও রাধা, শেষঅব্ধি নব্যতরুণ ভাইপোটি নিজেই রমণ হয়ে উঠল। তার বেজে ওঠা আজও চলছে,
যেমন রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণবকবিতায় বলেন, আজিও কাঁদিছে রাধা একাকী কুটিরে, এই রোদনটিও
সেই বাজনা!
৪০।প্রশ্ন
ঃ ‘যতোই চোখ মটকাও বাংলা বাবান/ ‘শাড়ী’ শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার সহজে ছাড়ছি
না।’(নন্দনতত্ত্ব) আপনার এই না-ছাড়ার রহস্য জানতে পারি কি?
উত্তর ঃ খুব সহজ।এবং অগভীরও। কবিতায় একটুখানি
তাৎক্ষণিক মজা । আধুনিক বাংলাবানান প্রকরণে তদ্ভব বা অর্ধতদ্ভব, দেশি বা বিদেশি শব্দে
দীর্ঘ-ঈকার বর্জনের কথা বলেছে। শাড়ী শব্দটি এসেছে তৎসম ‘শাটী’ শব্দ থেকে, তবু মজা
করে বলছি, শাড়ী শব্দে দীর্ঘ-ঈকার সহজে ছাড়ছি না, যতোই চোখ মটকাও বাংলাবানান । যা
ছিল বলার কথা, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের যেমন আভিধানিক অর্থ ছাপিয়ে একটা ব্যঞ্জনার্থ
থাকে, ধ্বনিগত অর্থ থাকে, তেমন শব্দের একটা চিত্রগত অর্থও থাকে। ‘শাড়ি’ লিখনে হয়তো
বানানসংহিতা খুশি হবেন, কিন্তু শাড়ী দীর্ঘ-ঈকার প্রয়োগে নারীর হংসগ্রীবায় স্থাপিত
দীর্ঘঅঞ্চল বিপর্যয়ের বাতাসে ওড়ার একটা ছবি আছে, তা যেন বেশ ফুটে উঠে।
হ্রস্ব-ইকারে যেন একটা আধহাতি গামছা হয়ে যায়। রহস্য এটাই।
৪১। প্রশ্ন
ঃ একটু হাল্কা মেজাজের কথা বললাম, ভারির দিকে যেতে চাই বলে। আচ্ছা আপনি আগে যে বললেন,
‘দেশে হরাইজেন্টালকালচার বা মৃত্তিকাশায়ী
লোকজ কাব্যসাহিত্য এত সমৃদ্ধ এবং আধুনিক
কোনো তাৎপর্যেও এতো প্রাসঙ্গিক যে, ইউরো-আধুনিকতার গাড়ল-অনুগমন এখন আর জরুরি নয়।’-
আপনার এই কনফিডেন্সের ভিত্তিভূমি ঠিক কোথায় ? আমি তো আমাদের পাঠরীতি থেকে শুরু করে
সব কিছুতেই শিকড় থেকে সরে পড়ার একটা গন্ধ পাই। যে-হারে ক্রমশ ইংলিশ-প্রীতি বাড়ছে,
স্কুল বাড়ছে বেসরকারি-সরকারিভাবে, তাতে তো বাংলাভাষা সঠিকভাবে টিকিয়ে রাখাই মুস্কিল হয়ে পড়ছে। তার উপর আপনি
বলছেন, – হরাইজেন্টালকালচার-ভাবনার দিকে ফিরে যাবার কথা! ঠিক এই পয়েন্ট অফ ভিউ
থেকে আমি আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছি? আপনি বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর ঃ দেখ, আমরা যে শেকড় থেকে সরে যাচ্ছি, এটা তো সত্য। কিন্তু এটা সত্যের একটা দিক, একমাত্র দিক নয়। অপরদিকে ঘটমান বর্তমানেরও একটা দাবী আছে, এটাও সত্যের দাবী। আমাদের আবেগের জায়গায় আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আছে, জাতিটা নষ্ট না হয়ে গেলে ভাষা থাকবে, কারণ ভাষার কারণে আমরা ভাবি, আমরা ভাষা দিয়েই ভাবি। ভাষাহীনের ভাবনা নেই। হয়তো জীবনজীবিকাবৃত্তির জন্য ভিন্ন ভাষাপ্রীতি বাড়ছে, মাতৃভাষা যতোই মাতৃস্তন্য বলে শংসিত হোক, একটা মানবশিশুকে পরিণত বয়সে অন্য খাদ্যপুষ্টির সন্ধান দিতে হয়, তা না হলে সে শক্তপোক্ত হয়ে গড়ে উঠতে পারে না। অবশ্য বাংলাভাষা টিকে
থাকবে তার নিজের জোরেই। তার নিজের জোরটা তার ভূখন্ড-সংস্কৃতি-সাহিত্য ও তৎসঞ্জাত জাতিসন্ততির
মধ্যে নিহিত। আমি বলতে চেয়েছিলাম, আধুনিকতার যে চিরপদার্থগুলি
আমরা ইউরোপীয় আধুনিকতা থেকে আহরণ করেছি, চিত্র-কল্প-ভাষা
অন্য থেকে ভিন্ন এক দৃষ্টি ও ভঙ্গি, সৌন্দর্যসুষমা, বোদলেয়রের ভাষায় ‘চিরন্তন
মধ্যদিনের শোচনীয় সৌন্দর্য’ আঙ্গিক ও বিষয়গত কিছু সম্পদ তো আমাদের মাটি ঘেঁষা সংস্কৃতি
অর্থ্যাৎ লোকজ উপাদানে এবং পুরাণ- প্রাকপুরাণিক ঐতিহ্য পাওয়া যায়, আমরা সেগুলি
অধুনার ভাষায় ও মুদ্রায় খনন করি না কেন ? আমরা গ্রিক মিথলজি থেকে সিসিফাসকে নিয়ে
বাংলাকবিতা লিখতে পারি, কিন্তু দেশজচরিত্র নিয়ে পারি না কেন?আমরা উঠের পিঠের
গ্রীবার নিস্তব্ধতাকে বুঝতে পারি কিন্তু বৃষস্কন্দের ককুদের উচ্চতা বুঝতে পারি না
কেন ? আমরা আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিয়োরির পঞ্চম সমীকরণ নিয়ে গম্ভীর ডিসকোর্স
শুরু করি কিন্তু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের কালীতত্ত্ব নিয়ে গল্পাড্ডায় মেতে উঠি না
কেন ? এসব আমাকে ভাবায় ! আগরতলায় এক সাহিত্যসম্মেলনে উপস্থিত থেকে শুনলাম, আমাদের
বিদগ্ধ আলোচকরা তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-কাব্যের আলোচনার সূত্রপাত করেন অবধারিতভাবে
শংকরদেবের অবদানকে স্বীকার করে, কিন্তু একজনও বাংলাভাষী আলোচক তাদের আলোচনা শুরু
করলেন না, চৈতন্য রেনেশাঁসের কথা বলে! কোলকাতা থেকে লোকসংস্কৃতি শহুরে গবেষক আসেন,
সচেতনভাবে আলোচনায় এড়িয়ে যান লোকসংস্কৃতির একটা বড়ো দিক, যা হল ধর্ম, তার সম্পর্কে
কথালাপ । লোকসংস্কৃতির ধারকবাহক যে গণমানুষ, আমাদের মনে রাখতে হবে, তার একটা সিংহভাগই নাস্তিক নন, ডগমা আক্রান্ত গম্ভীর মুখের এইসব
গবেষকদের দিয়ে আমাদের লোকসংস্কৃতির কোনো হিতকর্মই সাধিত হবে আমার মনে হয় না।
এক্ষেত্রে আমাদের কিছু পাগুলে লেখকরাই
যথেষ্ট, এদের সন্ধান আছে। অন্তরাবেগ আছে। প্যাশন আছে, ফ্যাশন নেই।
হরাইজন্টালকালচার বলতে আমি বুঝিয়েছি লোকায়ত ভাবসম্পদকে। গাছের শেখড় যতো গভীরে
যাবে, গাছের ডালপালা ততোটাই আকাশ পাবে – উচ্চতা পাবে, বিস্তৃতি পাবে, এটাকে বলছি
ভার্টিক্যালচার অর্থ্যাৎ লোকেত্তর !
৪২।প্রশ্ন
ঃ ‘কবিতার একটা নারীজীবন আছে তা-তে ফলস একটা ব্যাপার থাকে যা শাড়িরাই জানে।’
‘একাকীত্বে ফিরে এসে ঝেড়ে ফেলি ভিড়ের কীর্ণ বালুকা।’ – ‘পঙক্তি কবিতা’র সংগ্রহ
থেকে নেয়া দুটি কবিতা। এক পঙক্তিতেই একটি
কবিতা। এই অভিনব ভাবনা হঠাৎ কি করে এলো আপনার চিন্তায় ? এই ভাবনার প্রক্ষাপট নিয়ে
আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ পঙক্তি কবিতাও কবিতা।আসলে সব কবিরই
বোধহয় এরকম অভিজ্ঞতা আছে, যখন কবিতা আসে তখন যেন ধরলেই হয়। যখন কবিতাদেবী বিরূপ,
তখন মাথা খুঁড়ে , হৃদয় খুঁড়ে তাকে জাগানো যায় না, হয়তো এজন্যই বলা হয়, ‘কবিতাবনিতা
ধৈব সুখদা স্বয়মাগতা’ – কবিতা স্বয়ং আগতা হলে এরচেয়ে সুখের বড়ো আর কিছু হয় না
অন্তত কবির কাছে। এরকম কোনো কোনো মুহূর্তে একটি পঙক্তিই সম্পূর্ণস্বয়ং হয়ে কবির কাছে আসে, ব্যাস্, এ-রকম
একটা আলগ্ন-বিলগ্ন অবস্থার ফল পঙক্তিকবিতাগুলো। কবিতায় সৃষ্টি ও নির্মাণ দু’টি
পর্যায় আছে, নির্মাণের সচেতনবেলায় সবই মগ্নতাজাত নয়, কবিতায় নারীজীবনে ফলস্ বিষয়টা
উল্লেখ করে এই কথা বলতে চেয়েছি, লঘুস্বরে। কবি ভিড়ে মিশে থাকেন, কিন্তু ভিড়ের
কীর্ণবালুকা ঝেড়ে যখন নিজেকে খুঁজে পান, তখন তিনি একা একেশ্বর। তার দ্বিতীয় কেউ
নেই। এরকম একটা অনুভবও এসেছে তোমার উল্লিখিত একটি কবিতায়।
৪৫।প্রশ্ন ঃ ‘হাতের চার আঙুল-ই
নারী, বুড়োটা তাদের আগুন ও প্রেমিক’ -- ‘পঙক্তি কবিতা’র একটি উজ্জ্বল কবিতা।আমাদের
হাতের পাঁচ আঙুলের সাথে আমাদের তত্ত্ব ভাবনা জড়িয়ে রয়েছে, একবার আপনার মুখে
শুনেছিলাম। সেদিন প্রশ্নটা করতে পারিনি। আজ জানতে চাইছি?
উত্তর ঃ আমাদের হাতের যেটি বুড়ো আঙুল, সেটি
পুরুষ। অঙ্গুষ্ঠ, বাকিগুলো অঙ্গুলি। নারী। নামও দেখো – তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা,
কনীনিকা। ভারতীয় তত্ত্বভাবনায় সৃষ্টির মূল
উপাদান – ক্ষিতি,অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। এই ৫টি উপাদান, মনে রাখার জন্য, হাত তো
কর্মেন্দ্রিয়, তার ৫ আঙ্গুলের সর্বদা ব্যবহার – তাই জ্ঞানীরা পঞ্চভূততত্ত্বকে
আমাদের আঙুলে বিন্যস্ত করেছেন, এরকম—অঙ্গুষ্ঠে তেজতত্ত্ব, অগ্নি। তর্জনীতে
বায়ুতত্ত্ব। মধ্যমায় ব্যোমতত্ত্ব। অনামিকায় ক্ষিতিতত্ত্ব, কণীকায় অপতত্ত্ব। সহজে
মনে রাখা যায়, বোধের জগতে আনা যায় সৃষ্টিভাবনাকে। পরিকল্পনাও দেখো কতো নিখুঁত। যা
বৃদ্ধি প্রাপ্ত তা-ই বৃদ্ধ। আগুন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তাই অঙ্গুষ্ঠে তেজ, অগ্নি।
ব্যোম বা আকাশ সবচে উঁচু, তাই উঁচু আঙুলটি মধ্যমা, আকাশতত্ত্ব। কোন ভূত তর্জন করে
? বায়ু শব্দিত হয়। বায়ু চঞ্চল বা উত্তেজিত হলেই আমরা ক্রোধ প্রকাশ করি, তর্জনগর্জন
করি, তর্জনী তুলে কথা বলি, এখানে বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাস। তাই তর্জনীতে বায়ুতত্ব । কণা-কণা জলের
স্বরূপ। বিন্দু। তাই কনিষ্ঠায় অপতত্ব। জল ও আকাশের মাঝখানে মাটি। তাই মধ্যমা ও
কণীকার মধ্যবর্তী আঙুলটি অনামিকা। ক্ষিতি বা পৃথিবীতত্ব। ভারী সুন্দর, অন্য
গভীরতত্বও হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু হঠাৎ এই ভাবনাকথাটি জেনে এক পঙক্তির কবিতায়
গেঁথে রাখলাম, একটা আনন্দ পেলাম, এইভেবে, বুড়ো আঙুলটা পুরুষ, সে আগুন, সঙ্গে
রেখেছে চারনারীকে, আগুনের পরশে তবে চারনারী কর্মে রতিযুক্তা হয়!
৪৬।প্রশ্ন ঃ ‘মেমোরেবল স্পিচ্’ ত্রিপুরার বাংলা কবিতা – আপনি
সম্পাদনা করেছেন। সেখানে ‘কথাপৃষ্ঠার ঘ্রাণ’ শিরোনামে একটা জায়গায় আপনি উল্লেখ
করছেন, ‘Making of a
poem is making myself’ – কবিতা
ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি। ত্রিপুরার কবিদের নিরিখে আপনি এই কথাটায় কতটুকু বিশ্বাসী ?
আমি তো কোথাও কোথাও দ্বিচারিতা দেখতে পাই! এবং কোনো কোনো সময় মনে হয়, বোধহয় এটাই
স্বাভাবিক। আপনি কি বলেন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ দ্বিচারিতা আছে। দেখো মনোবিজ্ঞান
অনুসারে, আমাদের প্রতিটি মানুষের মধ্যে কিছু দ্বিচারিতা বা স্ববিরোধিতা আছে।
সাধারণ ও অসাধারণ মানুষের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে এটাই যে, অসাধারণরা দ্বিচারিতা বা
স্ববিরোধিতাকে বুঝতে পারেন এবং বুঝে তার মধ্যে ভাবনা ও কর্মে, চরিত্রে তফাৎটুকু
কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। সাধারণরা পারে না। হ্যাঁ, তুমি বলেছ, কোথাও কোথাও কবিদের
মধ্যে দ্বিচারিতা দেখতে পাও। এটা স্বাভাবিক – শ্রেণীবিভক্ত সামাজিকতায় এরকম হতে
পারে, মনে হতে পারে। কবিও মানুষ তো, আমি বলব, হ্যাঁ, খুব ভীষণরকম দ্বিচারিতা আছে,
আর সেটি বড্ড পীড়াদায়ক, জীবনে ও যাপনে অন্বয় খুবই কম দেখতে পাওয়া যায়। এটাও হয়তো
ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি। ব্যক্তি তো তিনি, যিনি নিজেকে ব্যক্ত করেন। ব্যক্তি তার
অপূর্ণতা, অক্ষমতা, ভুলচুক,ভন্ডামোকে কি ব্যক্ত করছেন? কথাটা এইখানে।
৪৭।প্রশ্ন ঃ প্রত্যেক কবির একটা
কবিজন্ম থাকে। আপনার কবিজন্মের প্রেক্ষাপট নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ? ঠিক কখন কীভাবে
এই মনোভূমির একগুয়েচাষা হয়ে উঠলেন? পানিসাগরের মতো প্রত্যন্ত একটা গ্রাম থেকে
কীভাবে তা সম্ভব হল?
উত্তর ঃ এটা কী করে বলি বলো তো ? বড্ড কঠিন বলা।
কবির কবিজন্ম প্রতিটি মুহূর্তেই। এইটুকু বলি, জানি না কতোটুকু বলা হবে—প্রচুর পড়তে
ভালবাসি। গদ্য-পদ্য-নিবন্ধ-বেদবিজ্ঞান-পুরাণ তন্ত্র ইত্যাদি। পাঠক হতে হতে সেই
পড়ুয়াবেলা থেকেই, কখন লিখতে বসে গেছি লেখকের সঙ্গে পাঠক হিসেবে আমার তর্কের কথা —কবির
সঙ্গে আমার হৃদয়ের সংবেদনার কথা, কালের
ইতিহাস থেকে বলতে পারব না, তবে মনের ইতিহাসে এই ঘটনা হয়েছে। কী ছিল বিধাতার মনে! প্রচুর
কবিতা পড়তে পড়তে একদিন দেখলাম, নিজেও এরকম লিখতে পারি, গহনের একটা টান হয়তো টের
পেয়েছিলাম, বাকিটা ডহরের ঘোর! স্বয়ংসিদ্ধ বলতে পারো। গুরু নেই, অতএব মাথার উপর
কোনোও বাদ নেই। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও আন্তর্জাতিক মননের সাহায্য পেয়েছি প্রচুর
পড়াশোনার ফলে। অদ্বৈত মল্লবর্মনের উপন্যাসে ‘ঠিশারা’ বলে একটা শব্দ আছে, অর্থ্যাৎ
ঠেস মেরে ইশারা অথবা ইশারা দ্বারা ঠেস – দেখেছি কবিতাও তা-ই, এবং এ-ভাবে লিখতে
পারি।
৪৮।প্রশ্ন ঃ একজন সিরিয়াস-কবির
সাথে একটা লিটিল ম্যাগাজিন খুব আবশ্যিকভাবেই
প্রেমিকার মতো জড়িয়ে যায়। আপনার সেই প্রেম-ভালোবাসার জার্নি নিয়ে কিছু জানতে চাই?
উত্তর ঃ লিটিল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে, গুটিকয়েক
কবি ও লেখক নিজের কথা নিজের মতো করে বলতে চান। বাজারিকাগজ-পণ্যকাগজ-প্রাতিষ্ঠানিক
কাগজ তা ছাপবে না। এই তরুণঅন্ধি কিছু
ধ্বংস করে কিছু গড়তে চায়। একজন কবি এরকমভাবে লিটিল ম্যাগাজিনের সঙ্গে জড়িত থাকতে
পারেন, আমিও ছিলাম। পানিসাগর থেকে প্রথম কবিতার কাগজ ‘প্রতিলিপি’ সাতের দশকের
শেষের দিকে বের করেছিলাম – তখন সিনেমায় অমানুষ এবং সমাজে জরুরি অবস্থা।ম্যাগাজিন
বা কাগজের সঙ্গে জড়িত থাকা বা না-থাকা জরুরি নয় একজন সিরিয়াস কবির পক্ষে অথবা বলা
যায় তিনি জড়িত থাকতে পারেন, না-ও থাকতে পারেন। কাগজের চরিত্র তৈরি করে কী লাভ ?
কাগজটা খুব নিয়মিত হলো এতে কী লাভ ? আমার লেখাটাই যদি লেখা না-হয়? কবি বা লেখকের চরিত্র
গড়ে ওঠাই হচ্ছে জরুরি কথা !
আমার যদি পাঠক তৈরি না হয়? আমার তো কাগজ নেই অনেকদিন হল, কিন্তু অনেকের চাওয়া অনুসারে বিস্তর লেখা দিতে পারি না। কাগজ অবশ্যই নিজের মনের মতন লেখাটি প্রকাশ করার মাধ্যম, পাঠক লেখাটি পেয়ে যায়।তবে কথাটিও বড্ড সরল যে,লিটিল ম্যাগাজিন কবি বা লেখক সৃষ্টি করে।একজন মানুষ কবি বা লেখক হন মূলত তার অন্তর্গত বোধাগ্নির আলোয়। অবশ্য সকল কবির মতোই, অর্থ্যাৎ যারা একসময় কাগজ করেছিলেন-- তোমার সঙ্গে অভিজ্ঞতা শেয়ার করি – সে আজ হল কতোকাল, তবু মনে হয় সেদিন সকাল, সেই লিনোকাট লেটার প্রেসের যুগে দু’পাতার একখানা কাগজ কালি মেখে বেরিয়ে গেলে মনে হত যেন ইউটোপিয়ার দেশটা হাতের মুঠোয় এল ! প্রিয়ার প্রথম চুম্বনের মতো শিহরণ জাগানিয়া সেই অনুভূতি যেন আজও খুঁজে পাই, আজকের তরুণদের মধ্যে -- তরুণদের মধ্যে তারা, যারা কাগজ করে খুব খেটেখুটে, হয়তো অর্থদৈন্য ততোটা নেই, বিক্রিবাট্টাও হয়, কিন্তু উচ্ছ্বাসবেদনায় অনুভূতিটার পরিবর্তন হয়নি! মজার কথা বলি, আমরা পানিসাগর থেকে ক’জন মিলে যখন একটা লিটিল ম্যাগ প্রকাশ করেছিলাম, তখন আগরতলা থেকে নকুল রায় লিখেছিলেন ‘তারুণ্যের চিৎকার’ !
৪৯।প্রশ্ন ঃ ‘রবীন্দ্রনাথের
শূদ্রধর্ম’ সৈকত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আপনার প্রবন্ধের বই। এ’ছাড়াও আমরা জানি,
রাজ্যের প্রায় প্রতিটি লিটিল ম্যাগাজিনের পাশাপাশি দৈনিক পত্রিকাতেও আপনি নিয়মিত
বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ লিখে থাকেন।একই গোত্রের হয়েও প্রায় পরস্পর বিরোধী সাহিত্যের
দুই ধারায় অবলীলায় আপনার পদচারণ। কি করে সম্ভব হয় ? কবিতার ক্ষেত্রে কি এর না-বাচক
প্রভাব পড়ে না ?
উত্তর ঃ একটা চলিত সরলীকরণ, কবিতা হৃদয়ের জিনিস,
প্রবন্ধ মস্তিষ্কের জিনিস। অর্থ্যাৎ একটি আবেগের বিষয়, অপরটি মেধার বিষয়। না,
একরকম নয় আদৌ। প্রবন্ধেও হৃদয়ের ব্যাপারটা আছে, কিন্তু তা হৃদয়নিয়ন্ত্রিত। আধুনিক
কবিতা তো শুধু হৃদয় নয়, মননও দাবি করে। কবি পরমানন্দ সরস্বতী জীবনানন্দের কবিতা
পছন্দ করতেন না। তিনি ভালবাসতেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা। সুধীন্দ্রনাথের কবিতা
হৃদয়ের ও মস্তিষ্কের তুল্যমূল্যবোধির উচ্চারণ। আমার প্রবন্ধ বা গদ্যলেখা অধিকাংশই
কাব্য সাহিত্যমূলক, নিজেও একজন কবিতার নির্মাণশ্রমিক হিসাবে হয়তো হৃদয়ের কথাই বলতে
চেয়েছি মস্তিষ্কের ভাষায়। বিষয়টা আমার
কবিতায় প্রভাব ফেলেছে বই-কি! আমার কবিতা পড়ে অনেকেই বলতে চেয়েছেন, এটি প্রবন্ধ।
আবার প্রবন্ধ পড়ে বলতে চেয়েছেন কাব্যের খনিজ। তা-ই চেয়েছি হয়তো।
৫০। প্রশ্ন ঃ আপনি তো একলব্যের মত
সাধনায়সিদ্ধ একজন চিত্রকর হিসেবেও পরিচিত।
রাজ্যের বিভিন্ন চিত্রপ্রদর্শনীতে আপনাকে ছবি প্রাসঙ্গিক আলোচনায়ও দেখা যায়।ছবির
প্রতি ভালোবাসা এবং চিত্রকর হয়ে ওঠার পেছনের তাগিদ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ ছবির কথা বললে, এটিও আমার গান গাওয়ার
মতোই ব্যাপার। ছবি আঁকতে পারি তবে জলরঙেই বেশি। বেশ কয়েকটি ম্যাগাজিনের ও বইয়ের
প্রচ্ছেদও করেছি। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে চিত্রী পার্থপ্রতিম গঙ্গুলির শংসালাভ আমার
কাছে মহার্ঘ অভিজ্ঞতা। জগৎখ্যাত শিল্পীদের চিত্র ও চিত্রকলার বিভিন্ন আন্দোলন ও
চিত্রতত্ত্বের ইতিহাস বিষয়ে খানিকটা পড়াশুনা করেছি। আমার প্রকাশিতব্য দু’একটা
বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী প্রকাশ কর্মকার ও পরিতোষ সেন। দুর্ভাগ্যবশত,
তাদের আঁকাগুলো আমি হারিয়ে ফেলেছি। একটি বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন বিখ্যাত
শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি ভীষণরকম উজ্জীবিত, মহানদের এই ব্লেসিং খুব কম
মানুষই পায়। চোখের উপর জগতের যে ছাপ পড়ে তা ছবি, ছবির উপর যখন মনের ছাপ পড়ে তখনই
তা চিত্র – ছবি আঁকতে গিয়ে এ’রকমই একটা তাগিদ পাই, ছবিটা আসলে মন আঁকছে, জগত থেকে
শুধু উপাদান নিচ্ছে, চোখ শুধু চয়ন করছে, ‘চীয়তে ইতি চিত্রম’ —মন এ’সব কিছুকে
হারমনিআম করছে।
৫১।প্রশ্নঃ আপনি গায়ক নন, তারপরও
আপনার কাছে সবাই গান শুনতে চায়। আপনিও গেয়ে থাকেন।এটা কি নিছকই একটা ঘটনা? না, তার
পেছনে কাজ করেছিল তীব্র কোনো নেশা?
উত্তর ঃ গাই গাইতে পারি, প্রথাগত গানের শিক্ষা
নেই, তবু গানের রাগরাগিণী, তাল-মাত্রা-ছন্দ সম্পর্কে ধারণাশূন্য নই। খালি গলায়
রবীন্দ্রসংগীত গাইতে ভালবাসি। ইচ্ছে করেই হারমোনিয়াম বা অন্যবাদ্য গ্রহণ করি না।
আমার ব্যক্তিগত পরমবোধ এইটে যে, রবীন্দ্রনাথের লিরিকটা বোঝা এবং তার এক্সপ্রেশনটা
কারো গলায় পাওয়া গেলে শ্রোতা আবিষ্ট হন। আমার সৌভাগ্য, আমার বন্ধুমহলের এই
স্বীকৃতি আমি পাই আর কেউ গাইতে বললেই আমি হা করে ফেলি। আমি রবীন্দ্রগানের ব্যাকরণ
গাই না। রবীন্দ্রনাথকে গাই। নিজের আবেগে। না, এটা নিছক ঘটনা নয়, রবীন্দ্রনাথকে আরও
অন্তরতম করে পাওয়ার জন্য একটা বাউলাব্যাপার! ভূপেন হাজারিকার গানও গাই, আমাকে
মুগ্ধ করে। ‘ ব্যক্তি যদি হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ সমষ্টি যদি হয় ব্যক্তিত্বরহিত, তবে
শিথিল সমাজকে ভাঙো না কেন?’ লক্ষ্য করেছ – ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিত্বরহিত, এমন
শব্দ আমরা গদ্যে ব্যবহার করতেও সাতবার ভাবি, অথচ অবলীলাক্রমে, কী সাবলীলভাবে ভূপেন
গানে ব্যবহার করলেন –, ‘অবাক! অবাক!’ অথবা ‘তথাপি’ শব্দটি? ‘তথাপি মনের মোর প্রশান্ত
সাগরে’ সাগরসঙ্গমে গানটিতে? ভাবা যায় ? অথবা ‘ বুক হুম হুম করে’ গুলজার হিন্দিতেও
‘হুম-হুম’ শব্দটি রেখে দিলেন – রুদালি, ছবিতে। ভূপেন হাজারিকার গান যেন কবিতা, কী আশ্চর্য সুর ও স্বর আর
কথাবস্তু !
৫২।প্রশ্ন প্রশ্ন ঃ আপনার বহুমুখী প্রতিভার কারণেই কি
কোনো একটি ক্ষেত্রে আপনি চূড়ান্ত কোনো শীর্ষস্থান
এখনও পর্যন্ত অর্জন করতে পারেননি? আপনি কি বলবেন ?
উত্তর ঃ প্রতিভা শব্দের একটি অর্থ আগুন। আগুন
স্বযোনিভক্ষক। যেখান থেকে উৎপত্তি হয়, সেখানটাই আগে দগ্ধ করে। নিজেও দগ্ধ হয়।
প্রতিভাবান ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পোড়ান, নিজেও পোড়েন। তাই প্রতিভা একটা
পাগলামোও। খুব গম্ভীরভাবে বলতে গেলে, প্রতিভা অপূর্বনির্মাণক্ষমপ্রজ্ঞা, নবনব
উন্মেষশালীবুদ্ধি । সে-যাই হোক, একটা মানুষের জীবন তো অনেকখানি, কম কথা নয়।
তথাকথিত অর্থে আমি বস্তুবাদী নই, ভাববাদীও নই। মানুষবাদ, জীবনবাদ, বিষয়টাকে আমি
এমন করে ভাবি, জীবনের যা কিছু যাপনমূল্য তার মধ্যে আমার আত্মানুসন্ধান। তোমাদের
মতো যারা সন্ধানীআলোচক তোমরা ভাববে, তবে আমি মনে করি, সব মিলিয়েই আমি, এই আমি
কতোটা চূড়ান্ত পর্যায়ে গেল, সে বিচার আগামীর, আমি আমার বিচিত্রসন্ধানে সেই
পূর্ণআমিকে পেতে চাই, এটাই আমার সৃজনের অভিমুখ। আমাকে বুঝতে হয়তো এই নিরিখটাই
আগামীর কাজে লাগবে।‘আমার কোনো দর্শন নেই দিশা নেই’ একটি কবিতায় এজন্যই বলেছিলাম,
তথাকথিত দর্শন তথাকথিত দিশার ছাপ মেরে যারা আমাকে বিশ্লেষণ করবেন তারা সঠিক নন,
আমি সেই ‘বেদিশার নেশা’ বাউলিয়া ভাষায় ‘ঝাড়িতে না লামে বিষ, ফিরিয়া উজান বায়।’
৫৩। প্রশ্ন ঃ আবার আমি একটু প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে, আপনার কাছে
জানতে চাইছি, ‘ফেইসবুক’- জগতে সদ্য আপনিও প্রবেশ করেছেন। কেমন লাগছে? সাম্প্রতিক
লেখালেখি? দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা! আপনার অভিজ্ঞতাটা ঠিক কি রকম?
উত্তর ঃ ধনতন্ত্র আমাদের ভবিতব্য কি না, তর্ক
বিতর্ক চলতেই পারে। তবে ক্লির সন্ধ্যায় এ’টুকু
বোঝা যাচ্ছে, তাতে মনে হয়, একটা
অপশক্তি নাফা অর্জনের উন্মত্ত চেষ্টায়
তরুণ মস্কিস্কের সর্বনাশ ঘটাতে চাইছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি অবশ্যই সুফল আছে,
কিন্তু তার অপপ্রয়োগের কুফলটা মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে খুব সচেতনভাবে। ফেসবুক
সময়ের দাবি, কিন্তু এই প্রযুক্তির ব্যবহারে আপত্তির কিছু নেই, কবিরাও ফেসবুকের
সুযোগটা নিচ্ছেন। কিন্তু আমার মতে, কবিতা-অকবিতার ভিড় সব কালেই ছিল। কবিতার যথার্থ
পাঠক তার প্রয়োজনীয় কবিতাটি ফেসবুক থেকেও নিতে পারেন, কবিতার বই পড়েও নিতে
পারেন।ফেসবুকের একটা আনন্দ, বই পড়ার আরেকটা আনন্দ। দুটোই চলুক- চিরকবিতা বা
চিরসাহিত্যের ভাণ্ডার কখনও খালি থাকে না, সময় কিছু কিছু রেখে দেবে। আজকের
লিখিয়েদের ক্লাসিক কাব্য সাহিত্যের পাঠ থাকা দরকার, তোমার সঙ্গে আমি একমত, অধুনার
অভিজ্ঞতায় বলি, শুধু স্মার্ট বাচনে কিছু লেখালেখির হাতেগরম উৎপাদন ছড়িয়ে দিলেই হবে না, আজকের যারা তরুণ লিখিয়ে
তারা তো একদিন প্রবীণ হবেন, তখন তাদের সময়ের
তরুণদের আলোক দান করতে হলে
চিরকালীন সাহিত্য ও কাব্য ও দর্শনের নিবিড় পাঠ থাকা দরকার। মনে হয় এখন, এই
প্রশ্নে, এখানে কিছু উপর উপর খেলা চলছে!
৫৪।প্রশ্ন ঃ কাব্যসাহিত্যে নকল, প্রভাব, বিনির্মাণ
বিষয়গুলোকে আপনি ঠিক কীভাবে ব্যাখ্যা করতে চান? বা চাইবেন ?
উত্তর
ঃ বিশেষ আখ্যাই ব্যাখ্যা, কিন্তু মূর্খের কাছে পান্ডিত্য একটা অপরাধ
বলে গন্য হয়,
অক্ষমদের এটাই সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এরকম বলে। তাই, নিজের মতো করে, নিজে যেমন বুঝেছি, সহজ করে বলি।ধরো তোমার ঘরে আলো নেই, তুমি পড়শি কে না-বলে তার ঘর থেকে গোটা প্রদীপ তুলে এনে নিজের ঘর আলোকিত করলে ।এটা নকল।তোমার ঘরে প্রদীপ আছে, তেল আছে, সলতে আছে, শুধু আলো নেই। পড়শিকে বলে তার প্রদীপ থেকে আগুন এনে নিজের প্রদীপ জ্বালিয়ে পুলকিত হলে।এটা
প্রভাব । নিজের প্রজ্জ্বলিত প্রদীপে আরোও কয়েকটি শিখা যুক্ত করলে, বড় একগাছা পিলসুজের উপর প্রদীপটি রেখে প্রয়োজনে বেশি আলোর
আয়োজন করলে,
এটা বিনির্মাণ । কবিসভ্যতার একটা সাধারণ
দস্তুর হল এই ,
একজন কবি তার লেখায় একটা সত্যবোধ প্রকাশ করলে, সত্যটি সকলের হৃদয়ের বস্তু হয়ে যায়। এটি নকল নয়, সেই সত্যটি উত্তরকবিরা নিজেদের ভাষাভঙ্গি ও অনুভবে ব্যক্ত
করেন। প্রভাব ও বিনির্মাণের
ভূমিকা এখানেই । বিষয়টা তরল নয়, কিন্তু সরল ।
গরলরাই একমাত্র ' ঘেঁটে ঘ' করে দেয়। এই নিয়ে আমি ফেইসবুকেও একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম ।
৫৫।প্রশ্ন ঃ শ্রাদ্ধবাসরকে
কেন্দ্র করে আপনি গোটা পানিসাগর জুড়ে
প্রায় একটা সামাজিক প্রথা চালু করতে সক্ষম হয়েছেন। আমি সে বিষয়ে কিছু জানতে
চাইছি? আপনি ঠিক কি বার্তা ছড়াতে চাইছেন?
উত্তর ঃ ‘যার মৃত্যু চিন্তা নেই সে মৃত। যার
জীবনচিন্তা নেই, সে জীবন্মৃত।’ বলেছিলেন কবি মৃণালকান্তি দাস। সন্ন্যাসজীবনে যিনি
পরমানন্ন সরস্বতী। ‘শ্রৎ’ অর্থ হৃদয়। ‘ধা’ স্থাপন করা। যেখানে বা যার উদ্দেশ্যে
নিজের হৃদয় স্থাপন করা হয়,হৃদয় অর্থে সত্যও হতে পারে — ধাতুগত অর্থে তা-ই শ্রদ্ধা।
ঐ সম্পর্কিত যা তা শ্রাদ্ধ। সকলবস্তুই তো অণুসংগঠন। মানুষও মৃত্যুর পরে তার
উপাদানগত মৌলে অর্থ্যাৎ অণুসংগঠনের রূপে ফিরে যায়। যার পারিভাষিক নাম সূক্ষ্মশরীর
বা জীবাত্মা।পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি।
সাংখ্যকার কপিলের নাম তো জানো? তিনি জানালেন, সতেরোটা উপাদান দিয়ে এই সূক্ষ্মশরীর
গঠিত। মহাকাশে একটা সীমানাদেশ আছে। পৃথিবীলোক ও ঊর্ধ্বলোকের মাঝখানে। এই যে
বর্ডারল্যান্ড তা কম্পনের সমষ্টিমূলত। হিন্দুরা বলেন বৈতরনী, পার্শীরা বলেন
ছিন্নৎব্রিজ, মুসলমানরা বলেন, ফিরৎ । প্রয়াতকে নীরবতার মাধ্যমে স্মরণ মনন করলে, একাগ্রতার ফলে একটা কম্পনের সৃষ্টি
হয়, এই সূক্ষ্মকম্পন প্রয়াতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। প্র-যান,
প্রকৃষ্টভাবে যাওয়াই প্রয়াণ,অর্থ্যাৎ মুক্তির দিকে। শ্রাদ্ধবাসরে নীরবতার দ্বারা
আমরা প্রয়াতকে শ্রদ্ধা জানাই, কিন্তু আমরা নীরব থাকলে প্রয়াতকে কী করে শ্রদ্ধা
জানানো হল, এই তত্ত্বটা জানি না। আমি কোনো শোকবাসরে উপস্থিত থাকলে এই কথাগুলিই
বলি। এই কথাগুলি বলা ও শোনার জন্যই শ্রাদ্ধ নামক একটা ক্রীয়ানুষ্ঠান হিন্দুরা
করেন। কিন্তু শ্রদ্ধা ও তত্ত্বশূন্য এইসব অনুষ্ঠান আজকাল ছেরাদ্দে পরিণত হয়েছে।
মহাভারতে ধর্মবক জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘ শ্রাদ্ধং মৃতং কথং’ শ্রাদ্ধ সাঙ্গ হয়েও কেন তা
মৃতবৎ? যুধিষ্টির উত্তর দিয়েছিলেন-- শ্রাদ্ধ সাঙ্গ হয়েও পন্ডিতব্রাহ্মণ শূন্য হলে
তা মৃত মানে পণ্ড! এখানে পন্ডিতব্রাহ্মণ মানে আত্মা বা পারলৌকিক তথ্য সম্পর্কিত
জ্ঞানবান একজন মানুষ!
৫৬। প্রশ্ন ঃ আমাদের জীবন বা মিথলজির
সাথে ১৮ শব্দটা এতো সংলগ্ন কেন? ১৮টা পুরান, ১৮পর্বে মহাভারত,১৮ অধ্যায় গীতা,
শরীরের ভিতরে ১৮ মুকাম। এই ১৮ সংখ্যার সাথে আমাদের অস্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে যদি
একটু আলোকপাত করেন ?
উত্তর ঃ প্রাচীনকালে এতো পুঁথিগত ঘেঁটে জ্ঞানলাভ
করার প্রচলন ছিল না!তাই কোনো একটি সংখ্যা ইতিহাসগত বা সমাজগত কারনে স্মরণীয় হয়ে উঠলে জ্ঞানরা এই
সংখ্যার মধ্যেই প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তত্ত্ব ঢুকিয়ে দিতেন, যাতে সহজে মনে
রাখা যায়। এভাবে ১৮ সংখ্যাটি ভারতীয় ধর্মসংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তন্ত্র মতে মানব শরীরই সাধনক্ষেত্র।তন্ বা তনু নিয়েই তার কাজকারবার। মানবদেহে ৬টি
শক্তিকেন্দ্র রয়েছে। এগুলিকে চক্র বলা হয়। ষট্ চক্র। প্রতিটি চক্রে আবার ৩টি করে
সূক্ষ্মচক্র রয়েছে। এইভাবে ৩
ইনটু ৬= ১৮ সংখ্যাটি পাওয়া গেল। আরও একটু ব্যাখ্যা রয়েছে।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ৩টি স্তর স্বীকৃত। পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, আকাশ। প্রত্যেক পদার্থের
আবার ৬টি অবস্থান – সত্তা, উৎপত্তি, বৃদ্ধি, পরিণাম, হ্রাস, বিনাশ। ৩ ইনটু ৬ = ১৮। ১৮
সংখ্যাটি সৃষ্টিতত্ত্ব। বৈষ্ণবশ্রাস্ত্রে এই দেহে ১৮টি মোকাম। তাই এর গুরুত্ব
বেশি। সাংখ্যদর্শনে চতুর্বিংশতি, কোথাও বা পঞ্চর্বিংশতি তত্ত্ব স্বীকৃত। এই ২৫টি
তত্ত্বের মধ্যে ৭ টি তন্মাত্রের সঙ্গে মহাভূতের সম্বন্ধ। তন্মাত্র সূক্ষ্ম,
মহানুভূত স্থুল। ২৫-৭ = ১৮। আবার বলা হয়ে থাকে, পুরানসাহিত্যে পুরানপুরুষ পরমাত্মা
স্বরূপ এক হলেও তার উপাধি অবস্থানভেদে ১৮ প্রকার। তোমার জিজ্ঞাসাটি সত্যি
প্রশাংসনীয়। কতো খানি জানি বলো তো ! ১৮ সংখ্যা সম্পর্কে এইটুকু বললাম। আমাদের
অস্তিত্বের সঙ্গে এই ১৮ সংখ্যার ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। স্রষ্টাকে জানতে হয় সৃষ্টির
মধ্য দিয়ে। তাই ১৮ দিন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, ১৮ অধ্যায় গীতা, ১৮ পর্ব মহাভারত ইত্যাদি হল তত্ত্বটা মনে রাখার
জন্য!
৫৭।প্রশ্ন ঃ কিছু কথা আমি আগেও জানতে
চেয়েছি, আপনি আলোচনা করেছেন। আরও একটু আলোচনা করবেন এই ভরসায় বলি, সাধক রামপ্রসাদ
একটা একটা গানের লাইন আছে –‘ কালী পঞ্চাশদ্বর্ণময়ী, তুমি, বর্ণে বর্ণে রূপ ধর’ আবার রাঘবভট্টের মতে, ‘শব্ব্রহ্মই সর্বজীবাশ্রয়ী
চৈতন্য ও প্রকৃতি’ আবার কোথাও শুনি ‘অ+উ+ম’ এই প্রণবমন্ত্রটি থেকেই জগৎ সৃষ্টি।
আপনি যদি বিষয়টাকে একটু সরলতার দিকে নিয়ে যান, উপলব্দিতে সমৃদ্ধ হই-। বর্ণের সাথে আমাদের জীবনের সম্পর্কটা আসলে ঠিক কোথায় ?
উত্তর ঃ
‘মুণ্ডমালাতন্ত্র’ নামে এতখানি তন্ত্রশাস্ত্র আছে। আমাদের বর্ণগুলি এক একটি
মুণ্ড। জ্ঞানমুণ্ড। সৃষ্টিবীজ। তাই কবি
কমলাকান্ত বলেছেন, ‘ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুণ্ডমালা কোথায় পেলি!’
ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে এই মুণ্ডমালা বা বর্ণমালা দিয়ে। বর্ণ কী? অর্থ্যাৎ কালার।
রঙ। আদিশূন্য স্পন্দিত হল। শক্তির জাগরণ। এনার্জি্র কালারফুল এক একটি সার্কেলই
বর্ণ। অ থেকে ক্ষ পর্যন্ত বর্ণ একত্রে অক্ষ। অক্ষমালা। এই অক্ষমালা সৃষ্টিদেবতা
ব্রহ্মার হাটে। শব্দের দেবী সরস্বতীর
হাটে। স্পন্দন বা শক্তি ঘনীভূত হয়ে বস্তু। সৃষ্টি বস্তুলোক। এটি বিজ্ঞান, নিছক
ভাববাদ নয় ! কবিতায় নিহিত প্রাণবীজ--। কবি অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা স্পষ্ট ইংগিত
আছে। কবি অর্থ্যাৎ ক্রান্তদ্রষ্টাই তা জানেন।আচার্য প্লেটো বলেছেন, চিন্তা ও ভাষা
মূলত একই। পার্থক্য শুধু এই – চিন্তা হল আত্মার সঙ্গে আত্মার অর্থ্যাৎ নিজেরই
কথালাপ। আর যে প্রবাহটি আমাদের চিন্তা থেকে ধ্বনির আশ্রয়ে ওষ্ঠের মধ্যদিয়ে আসে
তা-ই হল ভাষা। তা হলে দেখো তমাল, ভাষার ভেতরে আছে ধ্বনি ও প্রবাহ। এইখানেই
বর্ণপ্রসঙ্গটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্রের প্রথম সংখ্যার
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে ‘ওঁ প্রানায় স্বাহা’ এই প্রাণই শক্তি। স্পন্দন। বর্ণ।
ব্রহ্মাণ্ড কেন গোল? একান্নটি শক্তি আবর্তের শেষ আবর্তটি থেকে অণুসৃষ্টি। অণু গোল।
উপনিষদ বলেছেন, ‘যৎ কিষ্ণ জগত্যাং জগৎ সর্বং প্রাণঃ এজতি নিসৃতম্’ – সবই প্রাণ
থেকে, প্রানেই স্পন্দিত। বাইবেল বলছেন, আদিতে বাক্য ছিলেন, বাক্য ঈশ্বরের সহিত ছিলেন।
বাক্যই ঈশ্বর ছিলেন। বাক্য অর্থ্যাৎ স্পন্দন। আদি বিস্ফোরণের ফলে নানা বর্ণের
উদ্ভব হয়েছিল। তাই সৃষ্টি বর্ণময়ী। মা কালী বর্ণময়ী। এটা তন্ত্রের কথা। যোগসাধকরা
ওঙ্কার—অউম্ বলেন। পার্থক্য কিছু নেই, এটা পরিভাষামাত্র, এক এক ধর্মসাধক
সম্প্রদায়ের। তোমার অনেক প্রশ্নের জবাবে একথাগুলি বলেছি, রিপিটেশন হলেও আলোচনায় তা
আরও স্পষ্ট হয়। বিষয় তো জটিল!নিখিলের হৃদয়স্পন্দন, রবীন্দ্রনাথ কী সুন্দর বলেছেন,
‘ মম অন্তর কম্পিত আজি! পরমপুরুষকে যদি ভার্টিক্যাল লাইন হিসেবে ধরা যায়, তবে
প্রকৃতিকে যদি হরাইজেন্টাল লাইন ধরি – সেটার সংযোগই সৃষ্টির আদিকথা, ‘+’ এই
যুক্তচিহ্নই আদিব্যঞ্জন বর্ণ, রূপান্তরিত হয়ে ‘ক’। সৃষ্টির বীজ আদি স্বর ‘অ’ এবং
সৃষ্টি হল ‘ক’ । ‘ক’ বিষয়ে যিনি বিদ্, তিনিই কবি!
৫৮।প্রশ্ন ঃ বহুবছর আগে আপনার মুখে
একবার জল শব্দের ব্যাখ্যা শুনেছিলাম, সেখানে আপনি বলেছিলেন ‘জল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে
-- ‘যাতে জন্ম যাতে লয়’। সেদিন আর আপনাকে প্রশ্ন করতে পারিনি। আজ সুযোগে জানতে
চাইছি, আসলে আপনি ঠিক কীভাবে দেখছেন এই ব্যাখ্যাকে? ‘কারণবারি’ও বলেছিলেন এই
প্রসঙ্গে –
উত্তর ঃ হিন্দুদের দেব-দেবীদের মূর্তিগুলি আমরা
দেখি, এগুলি ভাবমূর্তি। মূর্তিশিল্পগুলি যদি ভালো করে তাকিয়ে দেখো, তবে দেখবে,
সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। তার হাতে কমন্ডুল। অর্থ্যাৎ কঃ মন্ডল,
জলরাশি। কমন্ডলুর জল দ্বারাই তিনি বরাভয় দান করেন।কমন্ডলুর জল দ্বারাই অভিশাপ দেন,
শত্রুনাশ করেন।ভেবে দেখো, বেশ কৌতুকের বিষয়। আমার কাছে তো দেবদেবীর মূর্তিভাবনাকে
কবিতা বলে মনে হয়। এতো রূপ, রস, প্রতীক, রূপক, ছন্দের সমাহার এগুলি!জ্ঞানতত্ত্বকে
রূপরসের ভেতর দিয়ে কনভার্ট করা হয়েছে।যা থেকে জন্ম, যার মধ্যে লয়। জলতত্ত্ব। অর্থ্যাৎ স্থূল
আণবিক জগতের সূক্ষ্ম পরিণামই জল। সেই জন্যই প্রতিমা জলে ভাসান। সেই জন্যই মৃতকে
জলের কাছে নিয়ে যাওয়া, ‘জলেহস্মিন সন্নিধি কুরু’। বস্তুকণা ও রশ্মিকণার এক তরলতাময়
রূপ। তন্ত্রের কারণবারি বা কারণসলিল, পুরাণের ক্ষীরোদ সমুদ্র। বিজ্ঞানের কোয়ান্টাম
চিন্তা ।রবীন্দ্রনাথ বলাকা কাব্যে বলেন—‘ হে বিরাট নদী, অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল/
অবিচ্ছিন্ন অবিরল/ চলে নিরবধি।/ স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে,/
বস্তুহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে/ পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুফেনা উঠে জেগে—’ এ থেকেই
স্পেস, টাইম, ইগো, কজের সমন্বয়, চতুর্মাত্রিক বস্তুসত্তার আবির্ভাব। কাজেই জল মানে
ওয়াটার নয়। জলও সৃষ্টিতত্ত্ব ।
৫৯।প্রশ্ন ঃ সেই
বৈদক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের অব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে কি এমন সংস্কার গড়ে
তুলতে পারিনি যেখানে, তাঁরাও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ বা লাভের অধিকারি হয়ে উঠতে পারে? আমাদের
সংস্কারে এখনও আমরা তাদের মেনে নিতে পারিনি কেন?
উত্তর ঃ
হিন্দুধর্ম দর্শনের মূর্ধন্য তত্ত্বটি কী? ব্রহ্ম কী ? শংকরাচার্যের মতে ‘অবাঙমানসগোচরম্’! প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ নয়,
একমাত্র অপরোক্ষ অনভূতি দ্বারা তাকে জানা যায়। আবার এটি সত্য, ব্রহ্মকে জানা গেলে
তিনি আর ব্রহ্ম থাকেন না। তাকে সম্পূর্ণ জানা যায় না। ব্রহ্ম হয়েই ব্রহ্মকে জানতে
হয়। যার থেকে বড়ো আর কিছু নেই – ‘বৃহত্বমত্বাৎ ব্রহ্ম’ এবং যিনি অন্যকে বড়ো করেন—‘
বৃংহনত্বাদ্ ব্রহ্ম’ – তিনিই ব্রাহ্মণ যিনি নিজেই এই তত্ত্ব। ‘তৎ’ মানে তিনি, তার
ভাব ‘ত্ত্ব’। তত্ত্ব। বৈদিক আর্যরা এই তত্ত্ব নিজেদের মধ্যে রেখেছেন, আমার বলার
কথা, সংস্কার আদর্শায়িত হলে সকলবর্ণ সকল সম্প্রদায়ের মানুষই এই তত্ত্ব অধিগত করতে
পারেন। সমাজপরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানুষের চেতনালোকের উর্ধ্বায়ণ হচ্ছে, তার স্বীকৃতি
প্রয়োজন, সম্মান প্রয়োজন। কূর্মপুরান বলেছেন, একসময় সব মানুষ একবর্ণে পরিণত হবে।
বেদবাদরত জ্ঞানীরা এক্ষেত্রে কী কাজ করছেন, মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা আর্ত হই।
৬০।প্রশ্ন ঃ শিবের গান প্রসঙ্গে
বিভিন্ন কথার ফাঁকে একবার আপনি বলেছিলেন, ‘শিব
আসলে ভ্যাকুয়াম তত্ত্ব’। আসলে বিষয়টা কি? কীভাবেই বা এর ব্যাখ্যা হয়ে থাকে?
উত্তর ঃ ‘অ+উ+ম+নাদ+বিন্দু’ এই হল পঞ্চমাত্রিক
প্রণবভাবনা, ওঁ। এটি শক্তি। ক্রিয়েটিভ এনার্জি। শক্তি এল কোত্থেকে ? শক্তিমান থেকে
অর্থ্যাৎ ‘বিন্দুনাদকলাতীত’ ‘চৈতন্যং শাশ্বত শান্তিং ব্যোমাতীতং নিরঞ্জনং’ সত্তা
যিনি, সেই সুপারভ্যাকুয়াম তত্ত্ব থেকে। যিনি শুধু শিব নন, পরমশিব। তিনি নিষ্ক্রিয়,
নিরুপাধি, মহাশূন্যাকার। সেই সুপার
ভ্যাকুয়াম ভাইব্র্যাট হলেই শক্তির
আবির্ভাব। সেই জন্য শিব শব্দের একটা অর্থ, শী+বন্ = শিব, অর্থ্যাৎ যিনি শায়িত,
সর্বরূপে সমাহিত, অচল, অটল, অবিকৃত,নিষ্ক্রিয়,। যিনি শ্মশানে শায়িত।শ্মশান মাটিতে
নয়, আকাশে। অর্থ্যাৎ সর্বভূতের পরিনামান্তর। কবি যতীন্দ্রনাথ, দুঃখবাদীর ভাষায় –
‘কত মরণের স্মরণ গাঁথিয়া পরেছ হাড়ের
মালা’। শিবের রূপকল্প রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মোহিতলাল, জীবনানন্দকেও লেলিহ প্রেরণা
জুগিয়েছে!
৬১।প্রশ্ন ঃ আমাদের বর্ণমালার প্রতিটি
অক্ষরের জন্য আমরা তন্ত্রের কাছে ঋনী। বর্ণের রং এবং অর্থ এসবই বর্ণিত আছে? তবে তো আমরা প্রাক্ - আর্য নার্যদের
কাছেই মূলত কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তাই নয় কি?
উত্তর ঃ সভ্যতার অস্মিতাবোধে বৈদিক আর্যরা যতোই
উন্নত হোক না কেন, তাদের কিন্তু লিপি ছিল না। বর্ণাত্মক ধর্মদর্শনের ক্ষেত্রে আগম,
নিগম ও তন্ত্রশাস্ত্রের কাছে আমরা অধর্মণ। আর এ’বিষয়ে অষ্ট্রিক, দ্রাবিড় প্রভৃতি
প্রাক্-আর্য জাতির অবদান আছে। আমাদের ঋণ আছে তাদের কাছে। আমার তো জানা নেই,
বিশ্বের কোনো ধর্মমতে অক্ষর বা বর্ণকে এমন দেবতাজ্ঞানে পুজো করা হয় কি না। হয়তো এই
কারণে বাংলাভাষারই কবি গোলাম মোস্তাফা একদা নাকি বাংলাভাষাকেও পৌত্তলিক মনে
করেছিলেন। কারণটা কী জানো ?দেখো, বড় মজার কথা! হিন্দুধর্মের অন্তর্গত শাক্তসাধনায়
বা শক্তিপূজায় মাতৃকান্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়ানুষ্ঠান। করাঙ্গুলের বিভিন্ন
রেখাস্থানে অং আং প্রভৃতি বর্ণকে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে ধ্যানজপ করা। কারণ
এগুলিই তো শক্তিবীজ! বর্ণকে মাতৃকা ভাবা, মা ভাবা – মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানাই আমরা
ভাষাদিবসে, কিন্তু তার শিকড়টা কোথায়,ভেবে দেখি না!
৬২। প্রশ্ন ঃ আমি আরেকবার প্রসঙ্গ
পাল্টে কবিতার জগতে প্রবেশ করতে চাইছি। এবং এতক্ষণ আলোচনার পর একটা কথা স্পষ্টত
জানতে ইচ্ছে করছে-- ‘আপনি তো মূলত কবি?’ না –
উত্তর ঃ জীবনে সংঘাত না থাকলে বোধহয় কবিতা হয়
না। শান্তিনিকেতনে অতিথি অধ্যাপক থাকার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘ওখানে
শান্তি বড্ড বেশি।’ শান্তিনিকেতনের ঋষি জীবন ও কবিতাকে আলাদা রেখেছিলেন—এমন একটা
কথাপ্রচার আছে। মনে হয় ঠিক নয় প্রচারটা। কেননা তিনিই তো বলেছিলেন, ছাঁট দেওয়া সত্য
এবং ঘর-গড়া সামঞ্জস্যের প্রতি আমার লোভ
নেই, অর্থাৎ জীবনে সত্য আছে, সত্য ভালো-মন্দ নিয়ে, তাকে কঞ্চিায়িত করতে হবে
জীবননিষ্ঠ হয়ে। মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই রয়েছে কবিতা। তাই কবিতাকে আমি বিশদ পরিসরে
দেখি, আমার সমস্ত সৃজনের মধ্যে কবিতার আপ্যায়ন রয়েছে। এবং এ-ও মনে করি, কবিতা শুধু
কবিরই কল্পনালতা বা আজন্মসাধনধন নয়। কবিতা আছে ছবিতে, সংগীতে, ভাস্কর্যে, নাটকে, গল্পে, উপন্যাসে – কোথায়
নেই। ঠিক সেই পরমার্থে, কবিতা আমার আত্মজীবনী নয়, আত্মার জীবন। আমিও কবিতা পাগল,
কিন্তু কবিতা পাগলামো নয়। কবিতা এক জীবনজোড়া বোধ, যার কোনো সংজ্ঞা হয় না,
শুধুই অনন্য অনুভব। এই অনুভবের প্রকাশ কখন কীভাবে, কোন মন্ত্রে হয়, জানি না। জানা
যায় না—‘ সে দেশের কথা এদেশে কহিলে, মরমে লাগিবে ব্যথা।’
৬৩।প্রশ্ন ঃ ‘বোনের বুকের থেকে সরে যায় আমার অস্বস্তিময়
চোখ
আমি ভাইফোঁটার দিন হেঁটে বেড়াই
বেশ্যাপাড়ায়
...... ......... ............
আমি এক পরিত্রাণহীন নিয়তিলিপ্ত মানুষ
আমি এক নিয়তিহীন সন্ত্রাসলিপ্ত মানুষ
আমি দেখছি আমার ভিতর এক কুকুর কেঁদে
চলে অবিরাম
...... ......... ............
কবিতার ভেতর ছন্দের বদলে জীবনের
আনন্দ খোঁজার পক্ষপাপী তাই জীবনের সঙ্গে আমার কোন বিরোধ নেই – মানুষের সঙ্গে আমার
কোন বিরোধ নেই ’
(মানুষের সঙ্গে কোন বিরোধ নেই’ -
কবি ফালগুনী রায়)
গীতিকবিতার ছন্দ মাড়িয়ে ‘কথা’ যখন
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে, তখন অনেকেই আবার প্রথাগত ছন্দকেই পুনরায় আপন করে নিচ্ছেন। আপনি এই দুই
প্রবণতাকে কীভাবে দেখছেন? কবিতা মূলত ছন্দের ভিতরে, না ঘোরে ফিরে ‘কথা’ই আসল। আপনি তো দুই ফর্মেই সব্যসাচী –
উত্তর ঃ রবীন্দ্রনাথের কাছে খনন নিয়ে মজা করে
দু’টি পঙক্তি লিখেছিলাম, ’২৪ঘণ্টার ঘূর্ণিলয়/ ৩৬৫ মাত্রার ছন্দ/ গ্রহের এইটুকুই
কবিতা/বাদবাকিটা ধন্দ।’ জীবন থেকেই কবিতা উৎসারিত হয়ে জীবনোত্তর এক মাত্রায় নিজেকে
অন্বিত করে। মোদ্দা কথাটা হচ্ছে কবিতা। কবিতাই বলে দেবে তার ছন্দ। ছন্দ বলতে বুঝি,
কবির বিশেষ এক প্রকাশভঙ্গি। সমস্ত সৃজনেই এই ছন্দটা আছে। থেকে যায়। প্রথাগত ছন্দ বা এই যে প্রকাশভঙ্গি
দু’টিতেই কবি স্বচ্ছন্দ হতে পারেন, আমি নিজেও লিখি এরকম। আসল কথা, কবিকে তার বোধি
কী ভাবে উদ্বোধিত করছে! প্রথাভাঙা অমিত্রাক্ষর যিনি লিখেলেন, তিনিই ব্রজাঙ্গনা
লিখলেন প্রথাগত ছন্দে। আসলকথা, কবিতার তন্মাত্র স্পর্শ করল কি না! প্রথাগত ছন্দ
অনেকেই পছন্দ করেন, কবিতার যারা গড়পড়তা পাঠক—আবৃত্তিমঞ্চেও এর কদর আছে। আজকাল
কবিতকে পাঠকের আরও কাছে পৌঁছে দিতে প্রথাগত ছন্দেও লিখছেন অনেকেও। এতে আপত্তি নেই,
প্রথাগত ছন্দে শঙ্খ ঘোষ, আমাদের শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ভালো লেখা আছে। তবে কৃত্রিমতা
যেন না আসে, এই অবধানটুকু কবির থাকা চাই। সত্যেন দত্তকে ‘ছন্দ-সরস্বতী’ বলে
রবীন্দ্রনাথ যে ক্ষতি করেছিলেন, সেই ক্ষতি যেন কোনো কবির না হয়। কবিতার দু’টি
ভাষা।পদ্য ভাষা ও গদ্য ভাষা। পদ্য ভাষায় লিখলে প্রথাগত ছন্দে দখল থকা দরকার। গদ্য
ভাষারও ছন্দ আছে। প্রকৃত গদ্যকবিতা লিখেছেন অরুণ মিত্র। আমাদের গদ্য গদ্যকবিতা তো
পদ্যগদ্যের একটা মিশেলমাত্র। কবি রাজকৃষ্ণ রায় একদা এই ছন্দকে ‘পদ্যপৌঙক্তিক
পদ্য-গদ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
৬৪।প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরায় কবিতা নিয়ে
সেই অর্থে কি কোন আন্দোলন বা মুভমেন্ট
হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর ঃ
কবিতা আসলে মনে আন্দোলন সৃষ্টি করে। এরকম
আন্দোলিত কবিতায় ত্রিপুরার কাব্যইতিহাস দরিদ্র, এটা মনে করি না। তবে কবিতা
ম্যানিফেস্টো নিয়ে, প্রপ্যাগান্ডা করে যে
আন্দোলন বোঝায়, তা ত্রিপুরায় হয়নি বলেই মনে হয়। হাংরি ভাবধারার খানিকটা অভিঘাত
ঘটেছিল, অস্বীকার করার উপায় নেই এবং এতে, চেতনার অভিজ্ঞতায় অন্যরকম সঞ্চারী কিছু
কবিতা আমরা পেয়েছি। অথবা পোস্টমর্ডান ছায়াপাতেও কিছু লেখা হয়েছিল, বিভিন্নভাবে।
তারপর ব্যক্তিক লেখালেখিই একটা নিরবচ্ছিন্নতা
বজায় রেখে চলেছে। এখন যেন সৃজনের
কোনো ক্ষেত্রেই যৌথখামার আর নেই, নাটক ও চিত্রচর্চা ছাড়া, এক দশকেই সংঘ ভেঙে যায়।
ব্যক্তিক শৈলী ও স্বেদই যেন বেশি করে ফুটে উঠেছে। খানিকটা শংসার ঘটনা বা রটনা
ঘটেছে, আলোচিত হচ্ছে, কিন্তু এতোই বেশি যে, তেমন চোখে পড়ছে না। তুঙ্গকবি বা
দোলন-আন্দোলন যা-ই বলো, তেমন চোখে পড়ছে না। এতো কবিতা, বহুস্বৈরিক—একজনকে ভালো
লাগতে না-লাগতেই আরেকজন বলছে, অ্যাই ! আমাকে দ্যাখ্ ! দেখতে হয়’ও।
৬৫।প্রশ্ন ঃ অনেকদিন আগে স্টিফেন
মালার্মে বলেছিলেন, ‘অস্থির আধুনিক সমাজের পরিস্থিতি কবিকে স্বচ্ছন্দে বাঁচতে দেয়
না। ফলে কখনো কখনো কবি দাঁড়িয়ে পড়েন চলমান মানবস্রোতের উল্টোদিকে এবং cuts himself
off from the world in order to sculpt his own tomb’। এসব
কথা উঠলেই আমার বিশেষ করে মনে পড়ে যায় ফালগুনী রায়ের কথা। মনে পড়ে যায় –
‘আমি লালহীন মাছের অ্যকোরিয়ামের পাশে বসে মাছভাজা
খেয়েছি বেশ্যার উঁচু
বুকে যৌন আকর্ষণের বদলে আমি লক্ষ করেছি
মাংসের ঢিবি--আমার প্রাক্তন
প্রেমিকার
বর্তমান স্বামীর দাঁতের উজ্জ্বলতায় আমি টুথপেষ্টের বিজ্ঞাপন দেখেছিলুম-
হাসি
দেখিনি ’ ( আমার রাইফেল আমার বাইবেল)
অথবা
‘ আমি
আন্দাজ মেপে কথা বলতে
পারি
না কিছুতেই একজন ঘরের বউ দেখলুম বহুগামিতায় বেশ্যাদের ছাড়িয়ে গেল
পয়সা
ছাড়াই – আমার হাহাকার ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিলুম অট্টহাসি’
(
ক্রিয়াপদের কাছে ফিরে আসছি)
ফালগুনী
রায়ের ভাবনার প্রেক্ষাপট এবং সমকালের জটিলতা কোথাও না কোথাও যেন আজও জীবন্ত। অথচ
কবি বা কবিতা যেন সেই প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলছে বারবার। বিজ্ঞাপনের দিকে প্রবল
বেগে ছুটে চলেছে আমাদের শিল্পজগত।একজন কবির দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি আমার এই কথাগুলোর
সাথে কোথায় একমত? আর কোথায় দ্বিমত পোষণ
করছেন?
উত্তর ঃ পতন- অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা জীবনের। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ
থাকবেই। তুমি ফালগুনী রায়ের অসাধারণ কিছু পঙক্তি বললে! জীবন থেকে প্রতিবাদ হারিয়ে যায় না। হয়তো
প্রতিবাদের ভাষা বদলায়, ভঙ্গি বদলায়—একেক কবির একেক রকম। তবে ঐ যে, কবিতা হাতিয়ার,
আয়ুধ ইত্যাদি হাতেগরম কথাবার্তায় আমার আস্থা নেই—এর মধ্যে একটা হিসেবীচতুরালি আছে।
নিজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই, আর বিশ্বের কোন কোণায় একটা বোমা পড়ল,
বোমারও আবার রঙ দেখা হয়, ব্যাস্!দিলাম ছেড়ে একটা কবিতা—এই ধরণের প্রতিবাদের কথা
বলছি না। জীবনে মৃত্যুটিই বাদ, জীবনই প্রতি-বাদ। ভালোবাসাই বোধ। কবিতা প্রতিরোধ।
ঋক্ বেদের কবি যখন বলেন, ‘ আ নো ভদ্রাঃ ক্রতবো যনত্ত বিশ্বতঃ’ কল্যাণকর যে সব
যজ্ঞ, তা বিশ্বের চারদিক থেকে আসুক—এ বক্তব্যও প্রতিবাদ, মণ্ডূকের কূপের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ। আবার চন্ডীদাস যখন বলেন, ‘সখি, আপনা ঘরে যাও।/ জীয়ন্তে মরিয়া যে আপনা
খাইয়াছে / তারে আর কী বুঝাও?’ এটাও প্রতিবাদ। প্রতিবাদ নয় ? আজকাল তো কবি কবিতারও
প্রতিবাদ করেন, বাংলা কবিতায় প্রথম প্রতিকবিতার কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত,
বলেছিলেন—‘ কবি নহি আমি, কবি নহি তথাকথিত/ যে-ব্যথা জীবনে সব ছন্দের অতীত-/আমি,
সে-ব্যথায় চির-ব্যথিত।’ কবি’রা ‘কবিতা’
শব্দটিকেই এড়িয়ে চলতে পারলে বাঁচেন, কিন্তু ‘কবি’ শব্দটি সম্পর্কে ততোটা যেন অসহিষ্ণু নন। এ-ও প্রতিবাদের একটা দিক।
তারা তো জেনেছেন, ‘প্রেম ও ধর্ম জাগিতে পারে না বারোটার বেশি রাতি!’
৬৬।প্রশ্ন ঃ আপনাকে সবাই সন্তের
মতো শান্ত দেখে। কিন্তু যারা আপনার খুব কাছের, একমাত্র তারা জানে- আপনার ভিতরে
বিশ্বামিত্রের মতো একটা আগুনও প্রবাহিত আছে। আমারও আপনার সাথে মিশতে মিশতে মনে
হয়েছে, আপনি এই সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন, সব কিছুর উপরে ক্ষেপে আছেন। যদিও
কবি-সাহিত্যিকরা দেখেছি সর্বদাই সব সময়ই যেকোন সমাজ ব্যবস্থার উপর রেগে থাকেন। সেই
সব দৃষ্টিকোণকে মাথায় রেখেই বলছি, আপনি মাঝে মাঝে রেগে যান কেন?
উত্তর ঃ হ্যাঁ,
স্বভাবত আমার চরিত্রের প্রতীক, স্রোতের অনুকূলে এক মৎস্য এবং প্রতিকূলে এক
মৎস্য। শান্ত ও বিলোড়নের একটা স্বভাব। নিন্দা-প্রশংসায় নির্লিপ্ত, আবার খুব বিষণ্ণ
অহং নিয়ে একা একা স্বৈরঅনাথ! তুমি রাগের কথা বললে। আমি তো এখন রাগি না। ভাষায় ক্রোধ নেই। বক্তব্যে
ক্রোধ নেই।আছে কাটাকুটি খেলা আর রগচটা বাক্ বিভূতি! ক্রোধেরও একটা সৌন্দর্য আছে। যা
ছিল রবীন্দ্রনাথের। অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ ক্রুদ্ধ না হয়ে পারে ? হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, সকল কবিই রাগী।
দৈত্যদের শুরু শুক্রাচার্য প্রচণ্ড ক্রোধী। মজার কথা, শ্রীকৃষ্ণ ম্যানিফেসেস্টোতে
বলা হয়েছে ‘ কবীনাম উশানা কবিঃ’ কবিদের মধ্যে আমিই শুক্র। এই অচরিত্র রাষ্ট্রসংসারে জীবন ও জীবিকা গ্লানিময়! আত্মগ্লানি,
সামাজিকগ্লানিতে বাঁচার জীয়ন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে কবিতা। আমাদের ঔপনিবেশিক- আধা
ঔপনিবেশিক কুনাট্যে এতো-এতো কবিতা যে লেখা হচ্ছে, এটা সুস্থতারই লক্ষণ।
আক্রমণাত্মক লেখা হয়তো অক্ষমের ঈর্ষাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু অতিক্রমাণাত্মক
লেখাই শেষপর্যন্ত স্থায়ী হয়। শুধু নিজের ভুলকে অতিক্রমণ নয়, শুদ্ধকেও। কেন না,
শুদ্ধ, শুদ্ধতর, শুদ্ধতম, শুদ্ধেরও তো তিনটি স্তর! ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রমণ!
৬৬।প্রশ্ন ঃ ‘প্রাচীন আলংকারিক বামন তাঁর ‘কাব্যালঙ্কার’
গ্রন্থে বলেছেন, -‘ সৌন্দর্যই অলংকার – সৌন্দর্যম্ অলংকারঃ’ আলংকারিক আনন্দবর্মণ
বলেছেন- ‘ অলঙ্কারো হি চারুত্বহেতুঃ’ আচার্য দণ্ডি বলছেন – ‘ কাব্যাশোভাকরান্
ধর্ম্মান্ অলঙ্কারান্ প্রচক্ষতে’ – আমি বা আমার মতো অনেকেই মনে করেন, এইসব উক্তি
নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবার দিন শেষ। আমরা কি
ভুল ভাবনায় তাড়িত? আপনি নিষ্ঠুরভাবে কীভাবে এর মূল্যায়ন করতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ আমাদের বাংলাকবিতার আধুনিকতার প্রথম
পর্যায়ে, সংস্কৃত অলঙ্কারিকদের তো কবেই বিসর্জন দিয়েছিলেন মাইকেল। অক্ষরের
অমিত্রতা এবং অমিতত্ব গড়িয়ে আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের কবিতা, সেখান থেকে দেখলে
বলতে হয় অলঙ্কারশূন্যতাই এখন কবিতার অলঙ্কার।যেমন বোদলেয়রের সময়ে ল্যাটিন অলঙ্কার
শাস্ত্র নিরর্থক হয়ে পড়ল। যেমন আবার এলিয়েটের সময়ে বোদলেয়রের ভাষা হয়ে পড়ল ‘
সিম্বল অব্ মর্বিডিটি’—কাউন্টার ক্লাসিক এবং কাউন্টার রোমান্টিসিজমের কবিসন্ততি বারবারই শাস্ত্রীয় অলঙ্কারশাস্ত্র
এড়িয়ে চলেছেন! কবিতাকে কবিতা করে তোলার বাহ্যিক করণ-প্রকরণ গৌণ, মুখ্য হয়ে
দাঁড়িয়েছে বোধের ব্যাপ্তি এবং মুখের ভাষায় নানান ব্যঞ্জনাকে কবিতায়িত করা।
এক্ষেত্রে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বড় উদাহরণ। আগে যেমন বলা হত, কবি-কবি ভাব--- ছন্দের
অভাব। এখন কবিদের কবি-কবি ভাব নেই। তারা এ-ও বলেন, আমাদের ছন্দেরও অভাব নেই। কেননা
ছন্দশাস্ত্রও তো এখন কিছু অধ্যাপকের চর্বিত ও চর্চিত – অর্থাৎ কতো রকম যে কবিতা
বলা যায়, কবিতা দাঁড়িয়েও যাচ্ছে! মানের নিশ্চয়তা এড়িয়ে যাওয়া, অফুরন্ত মানে। যেমন
ইচ্ছে হয়ে ওঠা কবিতা, অনেক রকম প্রবণতা, শ্রেষ্ঠত্বের বালাই নেই, আছে
জেনারালাইজেশন – এখানে প্রাচীন অলঙ্কারিকা কোথায় দাঁড়াবেন! ‘বহুদূর তর্ক থেকে
বিশ্বাস উঠে এলে/ আমি তারে কৃষ্ণ বলে
ডাকি/ আমার শরীরে দিলে ঠোঁট/ আমি হই বাঁশি।’- একটি মন্ত্রে লিখেছিলাম, বাঁশিটিই
আজকের কবিতা।শাস্ত্রঘাঁটা অলঙ্কারই তর্ক।
৬৭।প্রশ্ন ঃ আপনার আগামী বইগুলোর
পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? অনেকদিন হল নিশ্চুপ -
উত্তর ঃ
উদাসনির্লিপ্ত যা অনেকটা আলস্যের মতোই দেখায় এবং বিমুখপ্রচারের অবগুন আমার
চরিত্রে আছে। লেখালেখি প্রকাশ করা বিষয়ে অনেক পরিকল্পনাই ছিল, কিন্তু তা আর হয়ে
উঠছে কই! ভাবছি, প্রবন্ধগুলোর একটি নির্বাচিত সংকলন করব—প্রকাশক পেয়েছি। শ্রেষ্ঠ
কবিতার পর আরো কিছু কবিতা নিয়ে সমগ্রগোছের
একটা বই করব, তা-ও ভানার প্র্যায়ে।প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন নীহারিকার
তীর্থঙ্কর। ইদানিং মহাভারতের একটা বিষয় নিয়ে লিখছি—আপাতত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
এটাই।
তমালশেখর দেঃ ধন্যবাদ দাদা। দীর্ঘ এতদিন
ধরে আপনার সাথে সাক্ষাৎকারের স্বার্থে এতভাবে, এতবার মেলামেশা করেছি, প্রশ্নে
প্রশ্নে বিব্রত করেছি, তার জন্য দুঃখ
প্রকাশ করছি। যদি কোথাও অজান্তে আপনার মন, মননে বা স্পর্ধায় কোনভাবে আঘাত দিয়ে
থাকি, আমাকে ক্ষমা করবেন।
এসেছিলাম, নিছক এক কবির সাক্ষাৎকার নিতে। কিন্তু
ক্রম থেকে ক্রমে হাঁটতে হাঁটতে কখন নিজের অজান্তেই, অজানা এক জগতে হারিয়ে গেলাম।
আবার হারিয়ে যেতে যেতে এক পর্যায়ে মনে হল
নিজের কাছেই ফিরছি।অভিনব এই জার্নি। ঘোর অন্ধকার রাত্রির শেষে -- ‘এই আমি’ অনেকটাই অচেনা এখন আমার কাছে। এখন আমি
শিকড় খোঁজার চেষ্টা করছি, এই যে লিখছি -- বর্ণ, অক্ষর, শব্দ, তার ভিতরেই। মহাশূন্যের
কথামালা ভ্রমণ যেন নতুন করে বাড়ি ফিরলাম আবার।নতুন
করে প্রশ্ন করা শিখলাম নিজেকেই।
আবারও অসংখ্য ধন্যবাদ মিলনদা। আমার ভালোবাসার
সন্তকবি মিলনকান্তি দত্ত।
মিলনকান্তি দত্ত ঃ তোমাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ তমাল।
বিচিত্র বিষয়ে তোমার সহজাত জিজ্ঞাসার ফলে আমারও
আলোচনার উৎস মুখ খুলে যেতে সহায়ক হয়েছে। ভালো থেকো।
@@@@@@@@@@@@@@@@@@@








