Monday, September 9, 2024

মানসিকভাবে চরম কোন নিভৃতক্ষণই একটি কাঙ্খিত কবিতা সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণ -- কবি পার্থ ঘোষ

 





মানসিকভাবে চরম কোন নিভৃতক্ষণই একটি কাঙ্খিত কবিতা সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণ বলে আমার মনে হয়।

 

কবি  পার্থ ঘোষ  কবিতাময় এক  সত্তা । জীবনের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা, শ্লেষ, ব্যঙ্গ সটানভাবে ছাপ ফেলেছে  তার কবিতার ভিতর সজ্জায়  তার সাথে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে।

 

প্রশ্ন ঃ  দিবারাত্রির কোন্ পর্যায়ে আপনি একটি কবিতা লিখতে বাধ্য হয়ে পড়েন?

 উত্তর ঃ - কলম নিয়ে বসলাম আর হঠাৎ কেউ একটা কবিতা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিল- আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন হয় না। পরিস্কার করে বললে, আমার লেখালেখির কোন জীবনদেবতা নেই। আসলে একজন কবি দিনরাতের চব্বিশঘণ্টাই কবিতাতে ডুবে থাকেন। তাঁর যাপনের প্রতিটি মুহূর্তই কবিতাময়। কবিতো সংসারে থেকেও একজন নিবিষ্ট সন্ন্যাসীই। যাবতীয় বাধ্যতামূলক কাজের মধ্যেও তার বুকের মণিকোঠায় কিছু ভাবনা, কিছু শব্দ কিংবা চাক্ষুষ দেখা কিছু ঘটনা ক্রমাগত বাজতে থাকে। সে সবই কবির মানসপটে বিন্দু বিন্দু রসের মত জমতে থাকে, আর একান্ত কোন নিভৃত ফুরসতে তা দিয়েই সৃষ্টি হয় একটা সার্থক কবিতা কিংবা কবিতার কিছু হিরন্ময় পংক্তি। সেই বিরলতম মুহূর্তটি অবশ্যই কোন সময়-কাটার অধীন না। মানসিকভাবে চরম কোন নিভৃতক্ষণই একটি কাঙ্খিত কবিতা সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণ বলে আমার মনে হয়।

 প্রশ্ন কীভাবে কাকে বলা যায়,মরে আছি বহুকাল আপনার কাব্যগ্রন্থের নাম - 'বেদনার মত নীল হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ কি? আপনি কি ক্লান্ত এই সময়ের চাপে?

 উত্তর -   সমকালের ক্লেদ, নৈরাশ্য, গ্লানি, বা  যাবতীয়  যুগযন্ত্রণা ছাড়াও কবির ব্যক্তিগত যাপনের রেশ নিশ্চিত কবিকে প্রভাবিত করে, এটাই  অত্যন্ত স্বাভাবিক। 'সময়ের তীক্ষ্ণ তীর উদ্দাম আমাদের দিকে'- যে কোন কবির ক্ষেত্রেই হয়তবা এক চরম সত্য। আর 'সময়ের চাপ'- চিরকালই কবিকে ঘিরে ছিল, আছে, থাকবেও। আজও এর ব্যতিক্রম হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও সময়ের চাপে ক্লান্ত হওয়াটা কবির ধর্ম না। আমি বিশ্বাস করি- সমাজের অবক্ষয়িত রূপ, মানুষের নৈতিক স্খলন, নৈরাশ্যপীড়িত একাকীত্ব হয়ত কবির কলমকে সাময়িকভাবে বিধ্বস্ত করতে পারে, কিন্তু সেই জাঁতাকলে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখাটাও কবিকে মানায় না।

 প্রশ্ন ঃ আপনার কবিতায় শ্লেষ, শব্দের তীব্রতা, আবেদন-সবই লক্ষ্য করা যায়। একটি কবিতাকে কীভাবে দেখতে আগ্রহী আপনি?

 উত্তর -  কবিতার জন্য কোনপ্রকার পূর্বশর্ত বাধ্যতামূলক হওয়া ঠিক না। যে কোন কবির একমাত্র শর্ত হওয়া উচিৎ কবিতা- কবিতা কোন প্রথাগত দর্শনের দাসত্ব করে বলেও মনে হয় না, তাই কবিতার মধ্যদিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলবই বা কোন বার্তা দেওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য কখনো হতে পারে না।কবিতার কাছে আমার চাওয়া, সে যেন বৈচিত্রমুখী হয়। নগরসভ্যতার অবক্ষয় যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে প্রকৃতির চাঁছাছোলা রূপ, কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে মোহনীয়া রূপের গুণকীর্তন। মানুষের সাধারণ অসাধারণ সমস্ত ইতরামি গুলোও যেন বাদ না-যায়। এককথায় মানবজীবনে সাক্ষী হওয়াইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই মরজগতের সবটুকুই নানাভাবে কবিতায় উঠে আসতে পারে। যদি পরকাল বলে কিছু থাকে কিংবা অতিন্দ্রিয় অনুভূতি, তাও অনায়াসেই আসতে পারে। কবি-কল্পনার বিষয় নিয়ে, আঙ্গিক শব্দ নিয়ে কোনপ্রকার ছুঁতমার্গে আমার বিশ্বাস নেই। কবিতার প্রয়োজনে সবই প্রাসঙ্গিক আমার কাছে।  কবিতা আমার কাছে জীবনের, মরণের, হতাশার, আনন্দের, বিরহের, প্রেমের, অপ্রেমেরও - এক নান্দনিক প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই না। যার কোনকিছুর কাছেই কোন দায় নেই, আবার কোন দায়িত্বকে সে অস্বীকারও করবে না। যা আমাকে অব্যক্ত, অবর্ণনীয়, অলৌকিক এক আনন্দস্রোতে ভাসিয়ে রাখবে, কবিতা আমার কাছে তাই।

 প্রশ্ন ঃ “ ঘর আসলে একটা মোহ/ফিরে আসাটা একটা ভ্রম” - কবিতার এই  লাইন দুটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন?

 উত্তর - খুবই কঠিন কাজ নিঃসন্দেহে। এভাবে নিজের কবিতার লাইন ব্যাখ্যা করায় আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই। যাইহোক, একান্ত আলাপচারিতায় তোমাকে হয়ত দুয়েকটা কথা বলা যায়। আসলে কবিতাটা লেখার সময় ঠিক কী ভাবছিলাম, এখন ততটা স্পষ্ট করে কিছু মনেও নেই। তবে আমার ব্যক্তিগত জীবন অভিজ্ঞতা দর্শনের ছাপ এতে পড়েছে এটুকু বলতে পারি। তাছাড়া ভারতীয় দর্শনের গূঢ় সত্যিটাও বোধকরি এতে রয়ে গেছে। অন্তত জীবনের নিরিখে বলা তো যায়-, আমাদের সাধের ঘর কি আর মোহ নয়? কিছুই কি আর চিরস্থায়ী আমাদেরআবার একটু অন্য ভাবে যদি বলি, প্রতিটি ব্যক্তি মানুষই এক একটা নাটক ভালবাসার মোহে আবদ্ধ হয়ে আছে। ব্যষ্টি থেকে সমষ্টি, বাহির থেকে ঘর, সব জায়গায় আজ কেমন যেন এক কৃত্রিম আপনাপন, নাটকীয়তা মাত্র। বাকিটা থাক।

 প্রশ্ন ঃ  “ মিছিলে হাঁটছি আমি,শিখে নিচ্ছি /প্রহসন ”- ‘মিছিল’ কবিতায় এত ক্ষোভ কার দিকে উগলে দিলেন? কেনই বা মিছিলকে প্রহসন মনে হচ্ছে আপনার?

 উত্তর -  ‘পদাতিক’ কবির চোখে দেখা মিছিল, আর আমার দেখা মিছিলকে আমি ঠিক যেন মেলাতে পারি না। স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের মিছিল, নিপীড়িত সর্বহারাদের মিছিলের একটা আদর্শ ছিল, এর বোধহয় গুণগত পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেকটাই। ছা-পোষা কেরানি, শিক্ষক থেকে অগুন্তি ধূলোমাখা খালি পায়ের মেহনতি মানুষকে আমি মিছিলে হাঁটতে দেখেছি। হাঁটা যেন কেবলই ভোট রাজনীতি করা পাড়ার রাজনৈতিক দাদাদের খুশি করতে। এখানে তার ব্যক্তিগত বঞ্চনার জন্য সে কমই হাঁটে বা হেঁটেছে। বরাবরই ক্ষমতাসীন দলের ভেকধারী, নীতিহীন, আদর্শহীন, পেটুয়া কিছু রাজনৈতিক দাদাকে খুশি করতেই মূলত এসব মিছিল। দাদাদের শেখানো স্লোগানের সাথে সুর মেলানো ছাড়া এদের আর কোন ভূমিকা থাকে না। নোংরা ভোট রাজনীতির শিকার সাধারণ অসহায় মানুষগুলোই তো বারবার মরে , আবার এই অসহায় মানুষগুলোকে দিয়েই মিছিলও করায় এরা। যে  কোন রাজনৈতিক মিছিল দেখলে আমার আজকাল মনে হয় এরা কেউ স্বেচ্ছায় আসেনি, এদের আসতে বাধ্য করা হয় কিংবা হয়েছিল এতদিন।

প্রশ্ন ঃ  আপনার স্বভাবসিদ্ধ কথনের স্টাইলের বাইরে আপনি কিছু আপাত অপ্রচলিত শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। এটা সাধারণত কিসের তাগিদে করে থাকেন?

 উত্তর -  যে কোন কাজের পিছনে একটা তাগিদ তো থাকেই। কিছু কিছু অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার আমি সজ্ঞানেই করেছি বা করি। ভাষা কোন নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে আটকে থাকুক, কেউ চায় বলে মনে হয় না। বাংলাভাষায় আমাদের কয়েকটা উপভাষাও রয়ে গেছে। আমরা যারা পূর্ববাংলা থেকে রাজ্যে এসেছি, আমাদেরও আছে এক বিশাল শব্দ ভান্ডার, যার যথাযথ ব্যবহারে দিনের শেষে বাংলাভাষাটাই আরো সমৃদ্ধ হতে পারে। তাছাড়া কিছু বিষয় আছে, যার ঠিকঠাক ব্যঞ্জনাও আনা যায় এসব শব্দ ব্যবহার করে, কিংবা কথনের তীব্রতা আনার জন্যও কোন কোন শব্দ আমার কাছে অত্যন্ত যুতসই বলে মনে হয়। এছাড়া কবিতার প্রযোজনে বাংলাভাষার কোন শব্দেই আমার শূচিবাই নাই।

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...