Monday, September 9, 2024

“নাটক যদি সঙ্কট উত্তরণের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত না করে, তবে সে নাটক পথভ্রষ্ট” -- অভিনেতা, নির্দেশক অরুণ পাল

 

 




নাটক যদি সঙ্কট উত্তরণের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত না করে, তবে সে নাটক পথভ্রষ্ট”   

 ত্রিপুরার খোয়াই মানেই নাটকের  তীর্থভূমি । ‘কালচারাল ক্যাম্পাস’-এর নাটক মানেই আলোড়ন।  সেই ‘কালচারাল ক্যাম্পাস’-এরই একজন অভিনেতা, নির্দেশক অরুণ পাল-এর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।   

 প্রশ্ন ঃ নাটক নিয়ে সবারই জড়িয়ে পড়ার একটা মুহূর্ত থেকে । আপনার সেই মুহূর্ত নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

 

উত্তর ঃ নাটকে জড়িয়ে পড়ার মুহূর্ত নিয়ে গুছিয়ে বলাটা আপাত মুশকিল ! বাবা যাত্রা করতেন । বড়দাকেও নাটক করতে দেখেছি । পারিবারিকভাবে একটা ধারা ছিল । তবে আমার নাটকের সাথে  প্রথম পরিচয় খোয়াই  লালছড়া পাড়ায় বলাই সেনের উঠোনে ‘ ফটিক’ নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমে তখন আমি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র । সপ্তম  শ্রেণিতে পড়ার সময় নাটক করি ‘ডাকঘর’ । এরপর দশম শ্রেণিতে উঠার পর নজরে আসি সদ্য প্রতিষ্ঠিত ‘কালচ্যারাল ক্যাম্পাস’ এর নির্দেশক তথা রাজ্যের খ্যাতনামা নাট্যব্যক্তিত্ব  সঞ্জয় করের । তিনি আমাকে একদিন ডাকলেন ‘ বিবসনা বৃহন্নলা’ নাটকে অভিনয় করার জন্য । প্রকৃতঅর্থে তখন থেকেই আমার নাটকের সাথে  ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়া এবং সে-ই থেকে আজ প্রায় চল্লিশ বছরের নাট্য পরিক্রমার  সাথে মিশে আছি প্রাথমিকভাবে এইটুকুই বলতে পারি ।     

 

প্রশ্ন ঃ  ‘কোর্ট মার্শাল’ আপনার অভিনীত একটি বিখ্যাত নাটক । নাটক-টার বিষয় আজও খুব প্রাসঙ্গিক। সেই নাটক প্রসঙ্গে আজ আপনার ভাবনা-চিন্তা-পূর্ণমূল্যায়ন জানতে চাইলে, কীভাবে কী বলতে চাইবেন ?

 উত্তর ঃ দেখুন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি দ্বারাই সামগ্রিকভাবেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আমাদের সামাজিক জীবন । আর সেই সামাজিক জীবনকে কখনই অবহেলা করতে পারে না আমাদের নাটক । জাতির এবং সমাজের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্খা, আনন্দ-স্বপ্ন নাটকে যদি প্রতিফলিত না-হয়, তবে সে নাটক ও নাট্যশালা লক্ষ্যভ্রষ্ট । নাটক যদি সঙ্কট উত্তরণের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত না করে, তবে সে নাটক আমার মতে পথভ্রষ্ট।  এই বোধগুলি  ‘কোর্ট মার্শাল’  সৃষ্টিতে উদ্দীপ্ত করেছে । এই নাটক দর্শকের মনে  প্রচণ্ড  ঝড় তুলেছেজাতপাতের ঘেরাটোপে সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীও কি তবে নানাভাবে বাঁধা- ধরা ? সত্য উদঘাটিত হোক । কিন্তু কোন সে-ই সত্য ? মুখোশের আড়ালে এ-কোন মুখ ? শৃঙ্খলার আড়ালে এ-কোন বিশৃঙ্খলা! ১৯৯৭ সালে ‘কোর্ট মার্শাল’   খোয়াই টাউন হলে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ।  তারপর তো ইতিহাস । একটানা ১৮ বছর রাজ্য, রাজ্যের বাইরে, বাংলাদশের বিভিন্ন জায়গায় এই নাটক  তার প্রাপ্য সম্মান ছিনিয়ে নিতে পেরেছিল সেই অর্থে বলতে গেলে, এখনও  নাটকটি সমান প্রাসঙ্গিক । এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ  নাটকের  মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে আমি গর্বিত ।

 প্রশ্ন ঃ একদা খোয়াই মানেই ছিল নাটকের জোয়ার । চন্দন সেনগুপ্ত, কমল রায় চৌধুরী, হীরেন্দ্র সিনহার মতো একঝাঁক নাট্যপ্রতিভারা ছিলেনআজ সে ইতিহাস অনেকটাই ম্লান। এই শূন্যতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?     

 উত্তর ঃ   চন্দন সেনগুপ্ত, কমল রায় চৌধুরী, হীরেন্দ্র সিনহার মতো প্রমুখদের মতো নাট্যব্যক্তিত্বদের শূন্যতা আমাদের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি  কিন্তু তারাই আবার আমাদের নাটকের ভিত্তিটা খুব শক্ত জায়গায় বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন । সেই ভিত্তির উপর ভর করে আজও আমরা দাঁড়িয়ে আছি । হয়ত আমরা তাদের মতো হতে পারিনি। তবে তাদের সঞ্চারিত বোধ থেকে আমরা কেউই সরে আসিনি । এখনও নতুন নতুন নাট্যপ্রযোজনা, নাট্যকর্মশালা, নাট্য উৎসব আয়োজন করে চলেছি আমরা । নব্বই-এর দশক থেকে একটানা অনেক বড় পরিসরে কাজ হয়েছে নাটকের উপর । আমাদের রাজ্যের প্রখ্যাত সব নাট্যব্যক্তিত্ব ছাড়াও  কানাইলাল, রতম থিয়াম, সাবিত্রী দেবী, ঊষা গাঙ্গুলি,  রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, স্বাতীলেখা  থেকে শুরু করে প্রায় সবার পা পড়েছে খোয়াইয়ের নাট্যমঞ্চে। এইসব নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি । ২০০৫ সালে  ‘কালচ্যারাল ক্যাম্পাস’-এর রজতজয়ন্তী বর্ষে একটানা ১৫ দিন নাট্যউৎসবে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছি আমরা । ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শ্রুতিনাটক, মূকাভিনয়সহ নাটকের উপর একের পর এক কর্মশালা হয়েছে ।  সাফল্য-অসাফল্যের বাইরে গিয়ে আমরা আমাদের মতো নাটক নিয়ে এখনও কাজ করে চলেছি আমাদের পূর্ববর্তীদের খ্যাতির ধারা অব্যাহত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমরা সবাই মিলে 

 প্রশ্ন ঃ  ত্রিপুরার নাটকে একটা সময় স্থানীয় খুব ভালো ভালো পাণ্ডুলিপি এবং সেই পাণ্ডুলিপি থেকে আমার খুব ভালো মানের নাটকও পেয়েছি । আজ সে জায়গাটা বেশ দুর্বল । এর কারণ কি মনে হয় আপনার ?  

 উত্তর ঃ সামগ্রিকভাবে দীর্ঘ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে নিরাশার তেমন কিছু দেখছি না বরং আমি উল্টোটাই বলতে চাইবো  । তবে বড় দুর্বলতা হল, সময়কে বুঝে, কোথাও একটা ভবিষ্যতের দিশার হওয়া বা দেশের জন্য, সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক বোধের উপর দাঁড়িয়ে মৌলিক নাটক রচনা করা তার জন্য হয়ত আরও অপেক্ষা করতে হবে আমাদের । তবে আমি নিশ্চিত, আগামীতে এই অপূর্ণতা থাকবে না । চন্দন সেনগুপ্ত, হীরেন্দ্র সিনহা-দের মতো বিখ্যাত নাট্যকারদের জায়গা  নিশ্চয়ই কোনো-না-কোনো  তরুণ এসে পূর্ণ করবে তাদের উজ্জ্বল জায়গাটা স্বগৌরবে গ্রহণ করবে । আমি সেই অর্থে আশাবাদি ।    

 প্রশ্ন ঃ আপনাদের সময়ের তুলনায় বর্তমানে নাটকের উপস্থাপনায় বা মঞ্চায়নে অনেক বেশি চাকচিক্য এসেছে।সাউন্ড এফেক্ট এসেছে । আলো  এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটকে এই প্রজন্ম কতটা কাজে লাগাতে পারছে বলে, আপনি মনে করেন ?

 উত্তর ঃ ‘কালচারাল ক্যাম্পাস’-এর সাথে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে জড়িয়ে থাকলেও, এই মুহূর্তে রাজ্যের সর্বত্রই আমার অগ্রজরা ছড়িয়ে রয়েছেন । তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, একটি সৃজনমূলক কাজ হাতে নেওয়ার আগে আন্তরিক একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন। শুধু শারীরিক সাজসজ্জা নয়, মনের অন্তর্নিহিত মানসিক  সাজসজ্জারও একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি । সে-ই পরিবেশ তৈরি করাটা খুবই জরুরী । তাহলেই চাকচিক্য সুপ্রযুক্ত হবে । আমি আশাবাদি, এই প্রজন্ম তা ভালভাবেই কাজে লাগাতে পারবে পারছেও অনেকক্ষেত্রে ।     

  প্রশ্ন ঃ  আপনারা কি যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করে যেতে ব্যর্থ হচ্ছেন ? নাকি বিষয়টাকে আপনি অন্য কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন ?

উত্তর ঃ আমার নাট্যগুরু সঞ্জয় কর । তাঁর সান্নিধ্যে নাটকে  ডুব দেওয়ার চেষ্টা শুরু আমার খুব কাছে দেখেছি হীরেন্দ্র সিনহা-কে , অভিনয় করেছি তাঁর একের পর এক নাটকে । পাশাপাশি কাজ করেছি করুণাময় সেন, কমল রায়চৌধুরী, চন্দন সেনগুপ্ত, নীরেন ঘোষ, সমীর রায়প্রমুখের সাথে নাট্যকর্মে  সংযুক্ত থেকেছি। আজ তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই-এর নাট্যজগতে অনুপস্থিত। কিন্তু তারপরও আমরা আমাদের নাটকের কাজ ধরে রেখেছি, তাদেরই দেখানো পথ অনুসরণ করে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ‘কালচারাল ক্যাম্পাস’-এর প্রথম দশটি বছর যারা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে দু-একজন বাদে আমরাই তো আরও ৩০টি বছর সাফল্যের সাথে পথ হাঁটলাম । এই চলার পথে আগামীর প্রজন্মও এখন সামনের সারিতে । অনেক নতুন নতুন ছেলেমেয়ে নাট্যশিল্পে যোগ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম খোয়াই নাট্যচর্চায়তাই  আমরা যোগ্য উত্তরসূরি তৈরী করে যেতে পারছি না, এই কথায় আমি সার্বিকভাবে সহমত পোষণ করতে পারছি না ।  

  প্রশ্ন ঃ   আপনি তো অভিনয় ছাড়াও প্রচুর নাটক, পথ-নাটক নির্দেশনাও করেছেন। এই নিয়ে প্রাপ্তিও আপনার অনেক । তা, বর্তমানে কোন নাটক নিয়ে কাজ করছেন ?

 উত্তর ঃ  বর্তমানে আমার নাট্যগুরু সঞ্জয় কর-এর লেখা নাটক ‘ দহন’ নিয়ে কাজ করছি । খুবই সমসাময়িক এবং  জ্বলন্ত এই নাটকের পটভূমি । সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারীর উপর যৌনহিংস্রতার প্রকোপ ক্রমশ উর্দ্ধমুখী। আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নয়নকে ব্যবহার করা হচ্ছে এই হিংস্রতায় । এর থেকে উত্তরণের পথ কি হতে পারে, তাই নিয়েই লিখিত হয়েছে ‘দহন’। এই নাটকের প্রয়োজনা নিয়েই আপাতত   তৎপর এবং সার্বিকভাবে ব্যস্ত।         

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...