Tuesday, September 10, 2024

“ আমার ছবিতে আমি নিরন্তর নিজেকেই খুঁজি, নানাভাবে ।”-- চিত্রশিল্পী মিতালী গঙ্গোপাধ্যায়

 

 









আমার ছবিতে আমি নিরন্তর নিজেকেই  খুঁজি, নানাভাবে ।”

 আমাদের রাজ্যে প্রখ্যাত  চিত্রশিল্পী মিতালী গঙ্গোপাধ্যায়তিনি তাঁর ছবির ভিতর দিয়ে ভ্রমণ করেন এক নিজস্ব জগৎ ।  তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।

 প্রশ্ন আপনি কখন একটা সাদা ক্যানভাসের সামনে  বসে পড়তে বাধ্য হয়ে  পড়েন?   আপনার সেই উপলব্ধির মুহূর্ত নিয়ে কিছু কথা শুনতে চাই ।

 

উত্তর ঃ  যখন দিনরাত স্বপ্ন সবকিছু অধিকার করে কিছু রঙ ফর্ম আর তাই দিয়ে তৈরি কিছু দৃশ্য- কবিতা ক্যানভাসে বন্দি হবে বলে অস্থির করতে থাকে তখনই বোধহয় সব শিল্পীই তাঁর ক্যানভাসের কাছে বসে পড়তে বাধ্য হন । বস্তুত পক্ষে যে কোন চিত্রশিল্পীই খালি ক্যানভাস, রঙ তুলি দেখলে লোভাতুর না-হয়ে পারে না । ক্যানভাসের গায়ে যখন রঙের আঁচড় ফুটে উঠতে দেখি, তখন সৃষ্টি সুখের সে অনির্বচনীয় আনন্দে ভেসে ওঠে মন ।

 

 


প্রশ্ন ঃ  চিত্র হবার জন্য অবশ্যই রেখা এবং রঙের সাথে চাই মনন। এই মনন থেকে তৈরি হয় যে-কোন শিল্পীর নিজস্ব চিত্রভাষা। আপনি কিভাবে সেই ভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন ? বা এই বিষয়টা নিয়ে কি ধরণের চিন্তাভাবনা করে থাকেন ?

 

উত্তর ঃ মনন ছাড়া ছবি হয় না একদম ঠিক কথা তেমনই আবার এই মননের ভাষাই ঠিক করে দেয়  কার ছবি ঠিক কেমন হবে ।  কিন্তু আমি নিজে থেকে কোন ভাষা তৈরির চেষ্টা করি নাআসলে এই ভাষাটা ঠিক  চেষ্টা করে আসে না । যদি হওয়ার হয় অর্থাৎ যার যা মনে আছে  তা যদি  সত্যি সত্যিই ক্যানভাস বন্দি করা যায়, তাহলে তাঁর নিজস্ব চিত্রভাষা অনায়াসেই ফুটে  ওঠে । তাকে তাঁর স্বভাব অনুযায়ী এমনিতেই অন্যের থেকে আলাদা করে দেয় । যেটা চেষ্টা করে আনা সম্ভব নয় । একেকজন শিল্পী তাঁর রঙ নিয়ে ফর্ম নিয়ে নিজের উপস্থাপনা নিয়ে আলাদা করেই ভাবেন ।  এবং সেই ভাবনা থেকেই নিজের অজান্তেই একসময় নিজের চিত্রভাষা  গড়ে ওঠে ।

 

প্রশ্ন ঃ  সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আঁকার প্রকৃতি, বিষয়, বিন্যাসের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই আসছে। আপনার উপলব্ধিতে কেমন ধরা পড়ছে এই পরিবর্তন ? 

 

উত্তর ঃ সময়ের পরিবর্তন অবশ্যই আছে আর সেটা প্রাসঙ্গিক এবং খুব স্বাভাবিক  এখন সিমপ্লিফিকেশনের যুগ । মানুষ আগের মত খুঁটিনাটি বিস্তারিত আঁকার থেকে সরলীকরণ ফর্মেই আজকাল চিত্রশিল্পীরা আঁকতে এবং দেখতেই  পছন্দ বোধ করে বেশিতাতে গভীরতা কিন্তু কমেনি বরং বেড়েছে। কারণ কথা যত কম হয় তত তাতে আরও ব্যঞ্জনা বাড়ে। আমি নিজে হয়ত এত সরলীকরণ ফর্মে কাজ করতে পারি না । হয়ত বা চাইও না করতে । আমার ছবিতে আমার অজান্তেই গল্প থাকে । আর সেটাই আমার ছবি ।

 




প্রশ্ন ঃ চিত্রকলা এবং দর্শক অনিবার্যভাবে একে অন্যের পরিপূরক।দর্শকের তৃপ্তির বিষয়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?

 

উত্তর ঃ শিল্প বা শিল্পীর সঙ্গে দর্শক, শিল্পবোদ্ধার এক অপূর্ব অন্তর্বর্তী যোগাযোগ আছে । পরিপূরকও বটে। তবে আমার মনে হয় যে কোন সৃষ্টির ক্ষেত্রেই শিল্পীর তাগিদটাই মুখ্য ভূমিকায় থাকে দর্শককে  খুশি করার ব্যাপারটা বোধহয় গৌণ । প্রতিটি শিল্পীই চান তাঁর কাজের কদর হোক । কিন্তু সেটা তাঁর নিজস্বতারই । দর্শকের তৃপ্তির কথা মাথায় রেখে নিজের কাজ করাটা  বোধহয় সম্ভব নয় । দর্শক যদি তৃপ্তি পান আমার ছবি দেখে আমি ভাববো আমি তাঁর সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছি । আমি যা বলতে চেয়েছি তার সঙ্গে তিনি  নিজেকে সম্পৃ্ক্ত করতে পেরেছেন । সেটা অবশ্যই হবে যে-কোন শিল্পীর ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার । আমি অবশ্যই মানুষের কাছে পোঁছতে চাই, তবে আমার নিজস্বতা নিয়ে ।

 




প্রশ্ন ঃ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, তাকে তুলি-রঙে ফুটিয়ে তোলা অনেক শিল্পীরই খুব আরাধ্য-সাধনা। আবার অপরদিকে এই প্রকৃতির উপরই চলছে আধুনিকতার সবচেয়ে নির্মম কুঠার। পরস্পর বিপরীত এই দুই সংঘর্ষকে চিত্র-ভাবনায় কীভাবে বোঝাতে চাইবেন ?  কিংবা বুঝিয়েছেন কোথাও, সে নিয়েও শুনতে চাইবো ।

 

উত্তর ঃ   শিল্পী হোক বা সাধারণ মানুষ প্রকৃতি ভালবাসেন না এটা সাধারণত দেখা যায় না । প্রকৃতি ছাড়া শিল্পও অসম্ভব । এমন অনেক শিল্পীই আছেন যিনি শুধু প্রকৃতি বা নেচার নিয়েই কাজ করেন । আর যিনি শুধুই প্রকৃতি আঁকেন না তাঁর কাজও কোথাও-না-কোথাও প্রকৃতির দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। যে রঙ, যে ফর্ম নিয়ে কাজ হোক না কেন, তা প্রকৃতি প্রদত্তই হয় । তাই শিল্প, শিল্পী, প্রকৃতি সব এক সূত্রে গাঁথা । মুস্কিল হল, অতি আধুনিকতার বিস্তার । কিন্তু মানুষ তো তার অগ্রগতি থামিয়ে দিতে পারবে না । আর যতই মানবজাতি বিজ্ঞানের দাস হবে ততই হারিয়ে যাবে প্রকৃতির সজীবতা, নির্মলতা । আমি প্রকৃতি ভালবাসি । ভালবাসি প্রকৃতির অনন্ত বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হতে । তার কোলে হারিয়ে যেতে । তার নির্জনতায় দু দণ্ড শান্তি পেতে। অপরদিকে  যখন দেখি সেই প্রকৃতির উপর নির্মম ধ্বংসলীলা তখন বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয় তবে আমার ছবিতে যে তার চিত্র খুব উঠে এসেছে তা নয়। খুবই কম এসেছে । কারণ আমি আমার  ভালবাসাগুলোই  ক্যানভাসে আঁকতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করি। বা আঁকতে চাই বেশি। সারাদিনের যত না-ভাললাগা আমি তা ক্যানভাসের বাইরেই ছেড়ে আসতে চাই ।  বাইরের পৃথিবীর যা কিছু ছোট, আমি আমার সৃষ্টিতে তা জড়াতে চাই না । ওই জায়গাটা আমি নির্মল রাখতে চাই । যখন আমি আঁকার মধ্যে থাকি তখন ভালবাসায় থাকি, স্বপ্নে থাকি । যন্ত্রণার মধ্যে থেকেও আনন্দের, আলোয় উত্তরণের গল্প শোনাতে চাই । কোনো হতাশা, দুঃখের ছবি আমি আঁকতে চাই না । 

 




প্রশ্ন ঃ  আপনার জলরঙের ছবিতে নৈঃশব্দ খুব নীরবে তার দাবি রেখে যায় ।আপনার ছবিতে আপনি প্রকৃতিকে কীভাবে দেখতে চান । এর  নৈঃশব্দের সাথে নিজেইকেই বা কীভাবে কমিউনিকেট করার চেষ্টা করে থাকেন ?

 উত্তর ঃ আমি মনে করি সব মানুষই খুব একলা । আর একাকীত্ব বড় নীরব । নিজেকে খুঁজে পেতে গেলে নৈঃশব্দের চেয়ে বড় বন্ধু আর কিছু হয় না । আমার ছবিতে আমি নিরন্তর নিজেকেই  খুঁজি, নানাভাবে । আমি নিজেকে এবং প্রকৃতিকে আলাদা করে ভাবতে পারি না । আমি প্রকৃতিরই একটি অংশ । প্রকৃতির ঋতুর রঙের মতই আমার জীবনেও সুখ, দুঃখ, আনন্দেরা খেলা করে । মাটির বুকের ক্ষত যেন আমার বুকের ক্ষতের মতই দগদগে ।

আর কমিউনিকেট করার যে ব্যাপারটা তাতো নীরবেই হয় । যখন কিছু আমরা অনুভব করতে চাই বা হৃদয়ে ধারণ করতে চাই । সেখানে শব্দ গৌণ হয়ে যায় । নিঃশব্দে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গোপনেই তো হয় মনের জানাশোনা ।

 

প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে বিমূর্ত ভাবনার তুলনামূলক কমই দেখতে পাওয়া যায় মূর্ত-বিমূর্ত চিত্রকর্মকে আপনি শিল্প ভাবনায় কীভাবে মূল্যায়ন করতে বেশি আগ্রহী ?

উত্তর ঃ এটা ঠিক আমার ছবি সেভাবে বিমূর্ত হয় নয় । কিন্তু ভাবনায় বিমূর্ত । ছবি আঁকার সময় যে ভাবনাগুলো জড়িয়ে থাকে তা সব সময়ই বিমূর্ত । আমার কাছে, মূর্ত বা বিমূর্ত দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ । এবার শিল্পী যেভাবে বলতে চান সেটা তাঁর পদ্ধতি । কেউ বিমূর্তভাবেই তাঁর সৃষ্টিতে বেশি স্বচ্ছন্দ আবার কেউ মূর্ত সৃষ্টিতে । ছবি আমরা আঁকি মনের কথা বলার জন্য। এবার যে যেভাবে বলায় স্বচ্ছন্দ সেটাই তাঁর ভাষা । আমি যদি ন্যাচারালিস্টিক ছবির কথা বলি তাহলে তাতে অনেক সময়ই অনেক লিমিটেশান থাকে । কিন্তু অ্যাবস্টাক্ট বা বিমূর্ত আঙ্গিকে শিল্পী অনেক বেশি স্বাধীন । এককথায় মুক্ত ।

 




 প্রশ্ন ঃ আপনি চারুকলা বিভাগের একজন সিনিয়র অধ্যাপকও বটে । সে সুবাধে আজকের তরুণ-তরুণীদের ভাবনা-চিন্তা বা তাদের মনোজগতের সাথে আপনি পরিচিত আজকের জেনারেশনের মূল প্রবণতা কী দেখছেন ? চিত্র তার প্রভাব আপনাকে কতটা আগ্রহী বা কিছুটা হতাশ করছে ?  

উত্তর ঃ এখনকার ছেলেমেয়েদের চিন্তাভাবনা যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। অনেক সময় তাদের ভাবনা নতুন করে ভাবতেও শেখায় । তবে ডেডিকেশনের অভাব  জিনিসটা প্রায়ই চোখে পড়ে । আজকাল কোন কিছু খেটে শেখার চেয়ে সহজে জয় করার চেষ্টাটাই প্রবল । এটা অবশ্য আমাদের কলেজের শুধু নয়, সবক্ষেত্রেই চোখে পড়ে তবে আমি হতাশ হওয়ায় মত কিছু দেখি না । সবক্ষেত্রেই উদাহরণের  অভাবও তো রয়েছে । আর সে দায় তো আমাদের মত সিনিয়রদেরই । তাদের এখন যেভাবে ভাবনার জন্য পথ দেখানো হয় সেটা অনেক উন্মুক্ত । এখন শিল্প জগতে এমন অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে যার সঙ্গে আমাদের সময় আমরা ততটা যুক্তি হওয়ার কথা ভাবতে পারিনি ।

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...