“ছবি এবং নাটক, এই দুটো প্রকাশ মাধ্যমই কিন্তু শেষ অবধি জীবনকে নিয়ে
কথা বলে”
ত্রিপুরার ছবি এবং নাট্য জগতে খুবই পরিচিত
নাম তপশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় । কলকাতায় জন্ম হলেও তিনি ত্রিপুরার মনন ও নাট্য জগতের
সাথে একাত্মায় মিলেমিশে একাকার । তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে
প্রশ্ন ঃ আপনি একজন চিত্রকর । অথচ এক পর্যায়ে আপনার জীবন
হয়ে গেল নাটকময়। নাটকে আসার জার্নিটা নিয়ে
প্রথমেই কিছু শুনতে চাই ? কীভাবে ঠিক নাটকে আসা আপনার ?
উত্তর ঃ আমার প্রথম নাটক ‘অমিত্রাক্ষর’ । আমার ভাসুর মানস গাঙ্গুলী, তিনি প্রায় জোর করেই
আমাকে নাটকে নিয়ে এলেন । ‘রুপম’ নাট্য গোষ্ঠীর রিহার্সেল আমাদের বাড়িতেই হত । তাই
আমি একটা বাড়তি সুবিধা পেতাম । ত্রিপুরার প্রখ্যাত সব কুশীলবরা আমাদের বাড়িতেই
আসতেন । ফলে আমার মানিয়ে নিতে কোন অসুবিধা হয়নি । বাড়ির পরিবেশটাই ছিল নাটকময় ।
একসময় আমারও ভাল লেগে যায় । এভাবেই ক্রমে ক্রমে নাটকের সাথে জড়িয়ে গেলাম ।
প্রশ্ন ঃ ছবি এবং নাটকের
মধ্যে কি কোথাও মিল খুঁজে পেয়েছিলেন ? নাকি দুটো পুরোপুরি আলাদা বিষয় মনে হয়েছে
আপনার ?
উত্তর ঃ ছবি এবং নাটক, এই দুটো প্রকাশ মাধ্যমই কিন্তু শেষ অবধি জীবনকে নিয়ে
কথা বলে। নাটকটা হচ্ছে সরাসরি উপস্থাপনা । সে কিন্তু সব সময় সরাসরি কথা বলা না । সে
কিছুটা বলে , কিছুটা আভাস দেয় । আবার অনেক সময় সরাসরিও বলে । তবে প্রথমত আভাসটাই
মুখ্য থাকে । আমি তাই মনে করি । ফটোগ্রাফির
সাথে আমি তাই ছবিকে একটু আলাদাভাবেই দেখতে চাই । আমি চাই, আমার ছবি নিয়ে দর্শকরা
কিছুক্ষণ ভাবুক । কিছুটা বুঝতে পারা, কিছুটা বুঝতে না-পারা এই রহস্যটা যেন আমার ছবি ধরে রাখতে পারে । আবার আকর্ষণের
বা অ্যাবস্ট্রাক্টের এই বিষয়টা কিন্তু নাটকে থাকে না । যেটা আমি ছবিতে পাই । সে
তুলনায় নাটক অনেক বেশি সরাসরি কথা বলে তার দর্শকের সাথে । এবং দর্শকরাও তা রিলেট
করতে পারে । একথায় বলা যায়, প্রতীকের বিষয়টা ছবির তুলনায় নাটকে ততটা নেই । এই কথনে
আমি অ্যাবসার্ড নাটককে ধরছি না । সে অর্থে ত্রিপুরায় অ্যাবসার্ড নাটক হয়ও না । আমি বলতে চাইছি, ছবি এবং নাটক দুটোই ঘুরেফিরে
জীবনের কথা বলে, কিন্তু ভিন্নভাবে বলে । দুটোর ভঙ্গি আলাদা ।
প্রশ্ন ঃ কখনও কখনও কী
বিষয়ও আলাদা মনে হয়েছে আপনার ?
উত্তর ঃ না, সে-অর্থে আলাদা বলবো না আমি। কারণ, জীবনকে নিয়েই তো কথা বলা । আবেগের
বহিঃপ্রকাশের ধরণটা আলাদা হয়ে যায় ।
প্রশ্ন ঃ আপনার করা
উল্লেখযোগ্য কিছু নাটকের নাম জানতে চাই! এর মধ্যে আপনার প্রিয় নাটক কোনটি ?!
উত্তর ঃ এই মুহূর্তে যে কয়েকটি নাটকের নাম মনে পড়ছে, তা হল – ‘অলকানন্দার চিত্রকন্যা’ ‘শোভাযাত্রা’ ‘ দায়বদ্ধ’ ‘শক্তি- সম্পত্তি’ ‘ভূমিজ’ ‘আনজাম’ ‘সুন্দর’ এমন অনেক নাটক করেছি । এই মুহূর্তে সব মনে পড়ছে না ।এর মধ্যে আমার প্রিয় নাটকের কথা যদি বলতে বল, তাহলে একটু মুশকিলে পড়ি বই কী ! কেননা, প্রত্যেকটা নাটকেরই আলাদা আলাদা ম্যাসেজ থাকে । তবু বলবো, ‘ভূমিজ’টা আমাকে নাড়িয়েছে প্রবলভাবে । ত্রিপুরার প্রখ্যাত নাট্যকার চন্দন সেনগুপ্তের লেখা এবং তিনি জীবিত থাকাকালীনই তার সামনে এটা মঞ্চস্থ হয়েছিল । সেদিক দিয়ে এই নাটকটি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এছাড়া মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের ‘সুন্দর’ নাটকটাও আমাকে খুব আলোড়িত করেছিল । ‘অলকানন্দার চিত্রকন্যা’-রও আলাদা একটা টেস্ট ছিল আমার কাছে ।
প্রশ্ন ঃ ছবি থেকে কি তখন
বেরিয়ে পড়ছিলেন ?
উত্তর ঃ না, সে রকম হয়নি । এর মধ্যে ছবির প্রদর্শনও
হয়েছে কলকাতা, মুম্বাই, আগরতলায়। মুম্বাইতে আমি ছবির জন্য পুরস্কার পেয়েছি । তবে কোথাও-না-কোথাও সত্যি বললে, বলতেই হয় নাটকে একটু
বেশিই জড়িয়ে গিয়েছিলাম ।
প্রশ্ন ঃ ছবির ক্ষেত্রে কোন ফর্মে কাজ করতে আপনি বেশি
স্বচ্ছন্দবোধ করেন ?
উত্তর ঃ আমার সব ছবিই অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে ।
এই ফর্মেই আমি বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করি। আসলে, একটা রহস্য থেকেই আমার এই ভাল লাগা ।
ছবির রহস্য নাটকের রহস্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । দুটোর দুই দিক। ছবির রহস্য বোঝার
জন্য আলাদা এক ধরণের দীক্ষার প্রয়োজন হয় । আমার ছবি দেখতে গিয়ে একজন দর্শক যে ভাবছে, এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে আমি
কিন্তু তাকে তৈরি করে নিচ্ছি । তাকে একটা ভাবনার ঘোরে ফেলতে পারছি, এটা আমাকে খুব
তৃপ্তি দেয় । প্রথম হয়ত বুঝবে না । কিন্তু
কিছুদিন পর বুঝবে । এভাবে দর্শককে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে দেওয়াকে আমি শিল্পী
হিসেবে খুব উপভোগ করি। আমি দর্শকের ভিতরে একটা ভাল লাগা তৈরি করতে চাই ।
প্রশ্ন ঃ আপনার ছবির বিষয় নিয়ে আমাদের কিছু বলুন। বিষয়
নির্বাচনে কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেন?
উত্তর ঃ ল্যাণ্ডস্ক্যাপ আমার ভীষণ প্রিয়।
তাছাড়া আমার দৈনন্দিন জীবনকেই আমি বেশি ফোকাস করি । এই যে দৈনন্দিন জীবন, প্রতিদিনের
আমাদের জীবনের ঘটনা, ঘাত-প্রতিঘাত, ভিতরের তোলপাড় করা মুহূর্ত, একেক সময় একেক রকম
ভাবনা হয়, একন সময় অভিমান হল, কোন সময় রাগ হল, প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হল, কোন সময়
দুঃখ হল, আনন্দ হল, সেই সব ভিতরের অনুভূতি, সেই অনুভূতিগুলোকে আমি আমার বিষয় করি ।
করতে ভালবাসি ।
প্রশ্ন ঃ আপনি তো কলকাতার
নাটকের সাথে পরিচিত ছিলেন। ত্রিপুরায় যখন নাটকের সাথে জড়ালেন এবং একের পর এক নাটক করে গেলেন, তখন তুলনামূলক বিচারে ত্রিপুরার নাটককে কীভাবে অনুভব করলেন ?
উত্তর ঃ সেইভাবে বলতে গেলে, আমি যখন
ত্রিপুরায় এসেছি বা যখন থেকে ত্রিপুরার নাটক দেখছি, ধীরে ধীরে কিন্তু উন্নতিই
দেখছি । ত্রিপুরার নাটকের মেজাজটাই আলাদা
। সঞ্জয় কর তো নাটক নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে । তার কাজে আমি খুব উৎসাহী । আরও
অন্যান্যরা ভাল কাজ করছেন।তাদের ভাবনা- চিন্তা আমাকে মুগ্ধ করে । তারা উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে । কলকাতার
নাটকে তবু একটা বাণিজ্যিক ব্যাপার আছে, সে তুলনায় ত্রিপুরায় যারা নাটক করে, তারা
নাটক ভালবেসে, নাটকের ভিতর দিয়ে যাপন করে নিজের শিল্পসত্তাকে । চাকরি- বাকরি,
ব্যবসা করার ফাঁকে মনের তাগিদ থেকে নাটকটা করে । সেই সময়টা তো তারা সংসারেও দিতে
পারতো! কিন্তু একটা শিল্পবোধের তাগিদ থেকে সেই সময়টা তারা নাটকে দেয়। ভালবেসে দেয়
। এর মাধ্যমে তারা নিজেরাও যেমন আনন্দ পান, তেমনই সমাজকেও কিছু দেয়ার চেষ্টা করেন
। তাদের এই প্রাণবন্ত দিকটা আমাকে খুব প্রভাবিত
করে। কলকাতা থেকে বেশিই করে। এখন তো এন এস ডি আসায় বিষয়টা আরও ব্যাপকতা পেয়েছে । এবং খুব ভাল মানের নাটক
হচ্ছেও ।



No comments:
Post a Comment