“এক সুপ্ত ছবি ও স্বপ্ন যেন জেগে ওঠে কলম কালিতে”
‘দিগন্তে মেলেছি ডানা’-র মত খোলামেলা সরল দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের ভিন্নস্বাদের কবিতা
তুলে আনা সত্তর দশকের কবি সনজিৎ বণিক-এর সাথে আলাপচারিতায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন
ঃ আপনি কবিতা পাগল মানুষ। কবিতাকে একেক কবি একেকভাবে আবিষ্কার করে থাকেন। আপনি
কীভাবে কবিতাকে দেখেন বা অনুভব করেন?
উত্তর ঃ এক রোদের ঝিলিক যেন মস্তিস্ক
ছুঁয়ে যায়। মনকে আন্দোলিত করে। আনন্দ নিরাপদ ও প্রতিবাদে মুখরিত হয় বিবেক চৈতন্য। একসময় এসবের ভেতর থেকে
সত্য এক মাথা চাড়া দেয় লেখায়। অনুপ্রেরণা জাগে এবং লেখা হয় কবিতার নির্যাস। এক
সুপ্ত ছবি ও স্বপ্ন যেন জেগে ওঠে কলম কালিতে। ভালোবাসা ও বিশ্বাসের পথ আঁকা হয়
কবিতায়।
প্রশ্ন ঃ সেই ‘ভালোবাসা ও বিশ্বাস’ নিয়েই কিছু জানতে চাইছি?
কি বিশ্বাস করেন, কেন বিশ্বাস করেন?
উত্তর ঃ বিশ্বাস করি প্রতিদিনের নতুন সূর্যের জেগে ওঠা। সে আলোতে স্নান করে
জেগে বই রাতভর দিনভর নিজস্ব ভালবাসার প্রাণবায়ুতে যেখানে জড়াজড়ি করে জেগে রয় প্রাণ
প্রতিমা আমার, ভাল্বাসায়-ই এতসব সম্ভব। আর সেই ভালবাসার নির্যাস নিয়েই কবি তার
ভেতর নতুন সূর্যস্নানের প্রতীক্ষা আমাকে ও ঐ ধরিত্রীকে জাগিয়ে রাখা দিনের পর দিন।
আর বিশ্বাসের বীজই মনুষ্যধর্মের মোদ্দাকথা নয়তো জড়ত্বের দুনিয়া চুপচাপ অন্ধকারময়।
প্রশ্ন
ঃ আপনি সত্তর দশকের কবি। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১১টি । ‘শাব্দিক’ কবিতাপত্র সম্পাদনা করছেন ৪১ বছর।
তারপরও আপনি প্রায়ই আলোচনার বাইরে নীরবে বসে থাকেন। আপনি কি নীরবতা ভালোবাসেন? না,
সবাই আপনাকে এড়িয়ে চলতে ভালোবাসে? আপনি কি বলবেন?
উত্তর ঃ সম্পাদক হিসেবে কবিতাপত্র উপস্থাপনা করার দিকে ঝোঁক থাকে বেশি। পাঠক ও
লেখকরাই আন্দাজ করতে পারেন কবিতাপত্রের ওজন কতটুকু। কখনো-সখনো আলোচনা হয় পাঠক ও
লেখকদের সাথে।
নীরবতা বড় ভালোবাসি। নিজের সাথে ফাঁকি দেয়া যায় না। আর এড়িয়ে চলার অভ্যেস
মোটেই নেই। বরং সম্পাদক হিসেবে কবি ও লেখকদের সাথে মেলামেশায় যে আনন্দ ও অভিজ্ঞতা
অর্জন করা যায় তা অসাধারণ ও সম্পাদক হিসেবে কাজে লাগানো যায় কবিতার উত্তরণে।
কেউ এড়িয়ে যেতে চললে, বলার থাকে না কিছুই। বরং ডেকে জিজ্ঞেস করতে যে আনন্দ তা
উপলব্দির অভিজ্ঞতা সাহায্য করে। মোদ্দাকথা মেলামেশায় বড় বেশি বিশ্বাস।
প্রশ্ন ঃ ‘পাঠক বা লেখক’-দের দিকেই ঠেলে দিলেন আপনার বল?
আমি আপনার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন জানতে চাইছিলাম ?
উত্তর ঃ পাঠক কিংবা লেখকরাই মূল্যায়নের আসল মানুষ সমালোচক ও বিশ্লেষণের
চাবিকাটি নিয়ে বসে আছেন। আগ বাড়িয়ে সম্পাদিত কাগজ পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ করি না।বরং প্রকাশিত কাগজটি পাঠক ও
পত্রিকা অফিস দপ্তরে পৌঁছে দিই। কখনো কখনো জড়াল আলোচনা হয়। কখনো একেবারেই না। নজরে
আসে না। ‘শাব্দিক’ কবিতাপত্র নতুন কবিকূলের সূতিকাগার। বিভিন্ন জায়গার বাংলা
ভাষাভাষী কবিদের লেখাও পেয়ে থাকি। কাগজটি ষাণ্মাসিক না-হয়ে মাসিক/ত্রৈমাসিক হলে মূল্যায়নের
সুযোগটা বেড়ে যেত বিশ্বাস। কবিকেই দায়ভরে
নিয়ে অনেকটা জোয়াল কাঁধে করে হাঁটতে হয় এই
কাব্যভূমিতে। প্রয়োজনে সবসময়ই চোখ কান খোলা রেখে চলতে চলতে দিক্ নির্ণয়-ই
কবিদের কাজ ও ধর্ম।
প্রশ্ন
ঃ ‘কোথাও যাবার জায়গা নেই/ একথা বলে পথ/একথা বলে মন’ – আপনার নিঃসঙ্গতায় একসাথে
মিশে গেল ‘পথ ও মন’। কবিতায় নিজেকেই খনন করে চলেন। এই যাত্রাপথ নিয়ে কিছু শুনতে
চাই?
উত্তর ঃ যা কিছু কথা ও কবিতা সবই
নিজের নয়, জগতের বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন ভাবনায় জর্জরিত মানুষের কথাই কবিতায় লিখতে
আনন্দ। স্বতঃস্ফুর্ত উচ্চারণে এসে গেলেই বেশ তৃপ্তি জাগে। একজন কবিকে সারাজীবনই খনন
করেই যেতে হয়। খননের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা মন-সাপ ও লড়াইয়ের ভাষায় উচ্চারিত স্পষ্ট
কথন জাগিয়ে রাখে কবিকে। এখন সময় জেগে থাকার ও জাগিয়ে রাখার।একজন কবি দায়সারা গোছের
বিনাশী কবি হলে চলবে না।জগতের সব নক্ষত্ররা কীভাবে দিনভর জ্বলতে থাকে, তাই দেখে
যেতে হয় হাজারবছর। পথ আর মন বড় একা। দু’জনের এক সাথে চলার ভেতর থেকে জেগে উঠবে আরও
একটি নতুন স্বদেশ পৃথিবীকে ভরে রাখার জন্য।
প্রশ্ন
ঃ ‘কখনো ভাঙন কখনো গড়নের বুক জুড়ে/ শুধু হেঁটে যাওয়া।’ -- আপনি কবিতায় সরল আঙ্গিকের উপর সবসময় বিশ্বাস
রেখেছেন।অথচ সময় জটিলতার দিকে মোড় নিয়েছে
বারবার। আপনি কীভাবে দেখে থাকেন বিষয়টাকে?
উত্তর ঃ সময় জটিলতায় মোড় নিচ্ছে বারবার ঠিকই কিন্তু আমাকে সরলতার আঙ্গিকেই
আস্থা রেখে মানুষের বুকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সহজ সরল
স্বপ্নপথের মায়ায় হেঁটে যেতে যেতেই খুঁজে পাওয়ার সুযোগ যেন উৎপেতে রয়েছে। ঘন
অন্ধকার জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে জোনাকির আলোই যেন পথ চিনিয়ে নিয়ে যায়
আমাকে বারবার।
প্রশ্ন ঃ ‘মৌলিক দাবী আদায়ের মিছিলে /গিয়ে যে নারী ধর্ষিত,/
সে দেশের মানুষের/ স্বাধীনতার অধিকার বলতে সবটাই শূন্যতা’— আপনার কবিমন কি হতাশ?আশাহীন-
উত্তর ঃ কবিকে হতাশ হলে চলবে না।
মিছিলে যারা হাঁটেন তাদের প্রথম শর্ত মানুষ হতে হবে। মানবিক গুণ সম্পন্ন মানুষেরা
কখনোই আর যাই করুক অন্তত ধর্ষণ করতে পারবে না। এই রকম ঘটনায় মন বিষণ্ণ হয়। মুখোশের
ছড়াছড়ি এ দুনিয়ায়। কবিমন হতাশগ্রস্থ হয় নিঃসন্দেহে।পরক্ষণেই নিজেকে জাগিয়ে দিতে
হয়। প্রতিবাদী মন অপরাধীকে চরম শিখায় জাগিয়ে দিতে খুঁজে ফেরে আমৃত্যু। সত্যিকারের
মানুষ হয়ে ওঠার মিছিলই জরুরী সারা
পৃথিবীব্যাপী!
প্রশ্ন ঃ এই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে
তরুণতরুণী কবিরা উঠে আসছেন সাহিত্যের অঙ্গনে।টাকা বিনিময়ে প্রকাশনী থেকে বের করে
নিচ্ছে বই। এই তৎপরতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ চমৎকার এক পথের সন্ধানে বেরিয়েছে তরুণ তরুণী ও কবিরা। নিজস্ব বুকের
শব্দে জর্জরিত ও ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন হয়ে কবিতা চর্চায় মনোযোগ বাড়ালে অবশ্যই বাহবা
পাওয়ার যোগ্য। খুব সহজেই কবিতাপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে যেতে পারবে। অন্যথা জোর করে তো
কবিতা ভুবনে বেড়ানো যায় না। এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় শুধু সম্ভব কবিতার স্পর্শ
পাওয়া।
প্রশ্ন ঃ আপনি আগামিকাল আবার একটি কবিতা কেন লিখতে চাইবেন? নেহাত
কবিতা লিখতে জানেন বলে?
উত্তর ঃ বুকের ভেতর উথাল-পাতাল। জেগে থাকার
হাজার খেয়াল; যাচ্ছে হেঁটে মন পাহাড়, হৃদয় বাহার, মন যমুনায়। এসবের খুঁজেই জেগে
থাকা ও জাগিয়ে রাখা নিজেকে বারবার প্রতিদিন প্রতিরাত।

No comments:
Post a Comment