Monday, September 9, 2024

অনেক সম্পদই হারিয়ে গেছে সময়ের ঘূর্ণনে”-- সঙ্গীত শিল্পী অনুবাদক, লেখক চিত্রা মল্লিক

 

 

 


অনেক সম্পদই হারিয়ে গেছে সময়ের ঘূর্ণনে

 

ত্রিপুরা চাকমা উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে নাচ-গান-কবিতা-নিবন্ধ সব আঙ্গিকেই চিত্রা মল্লিকা চাকমা অপরিহার্য এক নাম।  তাঁর সাথে আলাপচারিতায় তমালশেখর দে।   

প্রশ্ন ঃ আপনার গানের জগতে আসার প্রেরণা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ আমাদের বাড়ির পরিবেশ ছিল সাংস্কৃতিক বাতাবরণে ভরপুর।  বাবা বব্রুবাহন চাকমা ছিলেন এই প্রেরণার উৎসভূমিতিনি নাটক-যাত্রা করতেন,রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার ও গাওয়ার জন্য প্রেরণা দিতেন। যে-কোন  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাদের এগিয়ে দিতেন। তাছাড়া  মা চিকনবী চাকমাও  ছিলেন একই ভাবনায়  অনুপ্রাণিততিনি  চাকমাদের  নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ‘হেংগেরং’ বাজিয়ে জাপানসহ ভারতের সর্বত্র মঞ্চ জয় করেছেন। ফলে বুঝতেই পারছেন, আমার মেয়েবেলা, বড় হওয়া  সবই ছিল এইরকম একটা পরিবেশে।  

প্রশ্ন ঃ রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়ে আপনি চাকমা ভাষায় কাজ করেছেন অনেক। তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমে  পড়লেন  কিভাবে ? 

উত্তর ঃ সেই যে বললাম, বাবা! তিনিই এর প্রেরণাদাতা। তাঁর মুখে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ‘বিসর্জন’  নাটক নিয়ে গল্প শুনতে শুনতে প্রেমে পড়া। সেই প্রেম থেকে ক্রমান্বয়ে আরও গভীরের দিকে ধাবিত হতে হতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তন্ময়তার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। একসময় মনে হল, আমার এই ভাললাগা, ভালোবাসা নিজের ভাষায় অনুবাদ করে চাকমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া দরকার। সেই বোধ থেকেই আমার প্রিয় কিছু  রবীন্দ্রসঙ্গীত চাকমা ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করি ‘চাকমা ভাঝে রবীন্দ্রসঙ্গীত নাম দিয়েপ্রকাশক ছিল উপজাতি গবেষণা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র, ত্রিপুরা সরকার।    

প্রশ্ন রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবের মিলন কি চাকমা সংস্কৃতির আবেগ-অনুভুতির সাথে মিলে ?

উত্তর আমি ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে খুব ভালোবাসি।হৃদয় দিয়ে তাঁকে  অনুভব করি। সেই ভালোবাসা থেকেই কাজে হাত দিয়েছিলাম।আমাদেররাইননেপর্যায়ের কতগুলো  বিরহমিশ্রিত  গানের সাথে  আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত- ভাবনার খুব মিল খুঁজে পাই। বর্তমানে -গানগুলো প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।কাউকে গাইতে শোনা যায় না।অথচ এই গানগুলো আমাদের সম্পদ, ঐতিহ্যের বিরাট এক অংশ। ঝোপঝাড়ের বনজ গাছের ভিতর থেকে কু...কু......কু কু...কু......কু করে ডুগি পাখী ডাকলে আমরা  মনে করি,যখন কোন গভীর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, তখন এরা এভাবে  ডাক দিয়ে থাকে এইসব ভাবনাকে কেন্দ্র করে চাকমাদের খুব সুন্দর সুন্দর বিরহের গান আছে। এই গানের সাথে আমি অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীতের মিল খুঁজে পাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত  অনুবাদের সময় এই ভাবনাগুলোও আমাকে  অনুপ্রাণিত করেছিল।         

 

প্রশ্ন ঃ আপনি তো চাকমা কবিতাকে, গানকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার কাজ করছেন। এ’ক্ষেত্রে আপনার  কি ধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে ?

উত্তর অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রায়ই আমাদের কর্ম-পদ্ধতি , জীবন প্রণালী   চঞ্চলতার সাথে রবীন্দ্র-ভাবনা-প্রবাহের খুব একটা স্বাভাবিক মিল ছিল না।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সুরে-লয়ে-তালে ফেলতে গিয়ে শব্দ নির্বাচনে খুব বেগ-পেতে হয়েছে। তেমনই কষ্ট হয়েছে ভাবগতভাবে মননে ফেলতে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সাধারণত তা হয়েই থাকে।

প্রশ্ন ঃ  ‘রোদন ভরা এ বসন্ত সখী, কখনো আসে নই বুঝি আগে’ এইরকম ভাব- ব্যঞ্জনাময় একটা পরিবেশের ধরণ কি চাকমাসঙ্গীতের মনন-পরিকাঠামোতে থাকে?

উত্তর ঃ এত বৈচিত্র্য নেই। তবে এইরকম দ্যূতনাময় বিরহকরুণামিশ্রিত একটা সুরমিশ্রন আমাদের ‘রাইন্নে’ গানে লক্ষ্য করা যায়।আমি এটার সাথে খুব রিলেট করি। যদিও বর্তমানে  এই ধরণের গানগুলো আমাদের অনেকেই জানেন না বা হারিয়ে যাচ্ছে। এটা দুঃখজনক  

প্রশ্ন ঃ আপনি কবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। আপনার কবি-প্রেরণা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ আমাকে কবিতার জগতে আসার প্রেরণা দেন, প্রাক্তন স্পীকার অমরেন্দ্র শর্মা।আগরতলা থেকে ধর্মনগর আসা-যাওয়ার পথে তিনি আমাদের  নবীনছড়ার বাড়িতে কিছুক্ষণ বসে যেতেন।বাবার সাথে কখনও পার্টির কথা, কখনও এমনই গল্প করার জন্য নামতেন।  তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন,‘চিত্রমঙ্গলা, তুমি কবিতা লেখো। চাকমা ভাষায় লেখো।’ তখন আমি চাকমা ভাষায় সংগ্রামী বা গনসঙ্গীত গান লিখতে শুরু করি, যা চাকমা ভাষায় এর আগে ছিল না। এরপর স্যরের তাড়নায় কবিতার জগতে আসি। এবং আস্তে আস্তে কবিতা লিখতেও শুরু করি 

প্রশ্ন ঃ চাকমা ভাষায় কি আগে প্রতিবাদের গান ছিল না ?

উত্তর ঃ হ্যাঁ। আমাদের মধ্যে প্রতিবাদী গান এর আগে ছিল না। আনন্দের গানই আমাদের মূলধারার গান। আনন্দকেই আমরা বারবার শিল্প-সাহিত্যে বেশি যাপন করেছি।    

প্রশ্ন আপনাদের বিজু গানের সাথে কি আসামের বিহূগানের কোনরকম  সরাসরি সম্পর্ক আছে ?

উত্তর ঃ বিজু-বিহূ ধারণাগতভাবে প্রায় একই ভাবধারার। তারপরও  আসামের বিটের সাথে আমাদের নাচের বিট সম্পূর্ণ আলাদা। তাল,অঙ্গভঙ্গি সবই আলাদা। আমাদের মধ্যে কোমর ডায়ে-বায়ে ঘুরে ,কিন্তু  তাদের মধ্যে কোমর সামনে-পেছনে দোলে।আবার আমাদের  নৃত্যের মধ্যে পায়ের কাজ বেশি, তাদের আবার হাঁটুর কাজ বেশি। আমাদের বিজু উৎসবের মধ্যে খেলাধুলাও অতন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে থাকে। 

 

প্রশ্ন আচ্ছা, আসামের বিহূ উৎসবের সাথে প্রেমের একটা সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে বলে আমরা জানি। সেটা কি আপনাদের মধ্যেও চিরাচরিতভাবে বর্তমান ?

 

উত্তর হ্যাঁ। এই বিষয়টা আমাদের মধ্যেও আছে আমাদের চাকমা সমাজেও এইসময় একে-অন্যকে ভালোলাগা বা ভালোবাসার বিষয় জড়িয়ে আছে বিজু  উৎসব বছরে তিনদিন হয়— প্রথমে ‘ফুল বিজু’  তারপর হল ‘মূল বিজু’ এরপর আসে ‘গর্জ্যা পর্জ্যা’। বিজু এক অফুরন্ত প্রাণোচ্ছলতার নাম। বিজু মানেই প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস—‘ এচ্যে আমার রঙর মেলা বঝর বিজু দিন/ ফুল বিজু, মূল বিজু, গজ্যাপজ্যা দিন’কারো হাতে পাহাড়ি ফুলের তোড়া, তো কারো হাতে ‘মদ-জগরা’র বোতল। কারো হাতে উঁচিয়ে ধরা  ‘কল্পতরু’ বৃক্ষ। এভাবেই এক প্রাণখোলা মিলনের ভিতর দিয়ে শেষ হয় আমাদের বিজু উৎসব। প্রাপ্তবয়স্করা  শিকারে যেত, কেউ যেত মাছ ধরতেবনভোজনেও অনেকে গিয়ে থাকেন। রান্নাবান্না, হাসিফুর্তি করে খেয়ে বিকেলবেলা ঘরে ফিরে চৈত্র মাসের শেষদিন গ্রামের যত কিশোর-কিশোরী আছে, প্রত্যেক ঘর থেকে এক-এক জন করে এসে একজায়গায় জড়ো হয় এবং সবাই এক কলসি করে  জল নিয়ে এসে, গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক  পুরুষ এবং মহিলা অভিবাবকের পায়ে প্রণাম করে  জল দিত, এককথায় স্নান করাত। সেই রীতিগুলো আমাদের গ্রামে এখনও রয়ে গেছে।

প্রশ্ন ঃ আপনি তো বোধহয় বিজু দলের প্রতিনিধি হয়ে দিল্লিও গিয়ে ছিলেন?

উত্তরঃ মিনিস্ট্রি অফ ক্যালচার এর উদ্যোগ এবং জোনাল ক্যালচারাল সেন্টার-এর আয়োজনে মহামহিম আবুল কালাম আজাদ-র সামনে  ত্রিপুরার দল নিয়ে ২৯জানুয়ারি ২০০৫ সালে বিজুনৃত্য পরিবেশন করে এসেছি। তাঁর ভালো লাগা ছিল আমাদের দুর্লভ প্রাপ্তি। আরও বহু জায়গায় বিজু দল নিয়ে আমি গেছি এবং পরিবেশন করেছি।   

প্রশ্ন ঃ আপনাদের লোকগান বা বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কি আজ সংকটের মুখোমুখি বলে আপনি মনে করেন ?  

উত্তর ঃ হ্যাঁ । অনেক সম্পদই হারিয়ে গেছে সময়ের ঘূর্ণনে। আমি              চাকমা ভাষায় গানের ‘পোথ্যা পোখো র’ এবং ঘুমপাড়ানি গানের সংরক্ষিত বই  ‘অৌল’ প্রকাশ করেছি। আরও করার চেষ্টা করছি। আমাদের পুরনো বাদ্যযন্ত্রগুলোও ক্রমে হারাচ্ছে। ধর্ম-সাহিত্য-সংস্কৃতি উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘স্টেইট লেভেল বিজু মেলা ডেভেলাপ্টম্যান্ট সোসাইটি’-র আমি সহসভাপতি, ‘ধুদুক কালচারের অর্গানাইজ’-র সাথে জড়িয়ে আছি।  এভাবে আমি আমার মত চেষ্টা করছি। রাজ্য সরকারও করছে, কেন্দ্র সরকারও চেষ্টা করছে। দেখা যাক কি হয়। নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবো।

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...