Wednesday, September 11, 2024

“প্রচ্ছদ ব্যাপারটা আমার কাছে ক্যানভাসের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।” -- প্রচ্ছদশিল্পী চারু পিন্টু

 





“প্রচ্ছদ ব্যাপারটা আমার কাছে ক্যানভাসের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”  


প্রচ্ছদশিল্পী  চারু পিন্টু, বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গসহ  ত্রিপুরায়  অতি পরিচিত একটি নাম। আধুনিকতার  বৈচিত্র্যময় সব কারুশিল্প দিয়ে তিনি সাজান তার  প্রচ্ছদভাবনা  তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।    


প্রশ্ন আপনি এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার প্রচ্ছদ করে ফেলেছেন  এটা একটা ঈর্শণীয় সংখ্যা ।  আপনার কাছে জানতে চাইছি, একটা বই যখন আপনার কাছে প্রচ্ছদ করার জন্য আসে, তখন আপনি ঠিক কোন কোন বিষয়কে প্রথমেই প্রাধান্য দেবার চেষ্টা করে থাকেন ?


উত্তর  হ্যাঁ, সংখ্যা তো হয়ে গেল অনেক প্রায় দেড়যুগের বেশি কাজ করার কারণে এটা যতটা না ঈর্শনীয়, তার চেয়ে বেশি ভাল লাগা অথবা আমার সৌভাগ্যের ব্যাপার বলতে পারেন কেননা সত্যি অর্থেই এতটা বইয়ের সাথে আমি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি, এটা ভাবতে ভাল লাগে প্রচ্ছদ  শিল্পে প্রাধান্য  দেবার ব্যাপার থাকে অনেককিছুই একটা স্ক্রীপ্ট কোন সাবজেক্টের উপর লেখা, তার ধরণ বৈশিষ্ট্য তো থাকেই এবং গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্রের গুরুত্বটাও অনেকসময় দাবি রাখে প্রচ্ছদ রচনা হবার জন্যে কবিতা অনেকটা বিমূর্ত বা ভাববাদি চিন্তার উপস্থিতি অথবা দ্রোহের কাব্য থাকে, তার উপর নির্ভর করেও আলাদা আলাদা প্রচ্ছদ নির্মাণ করে থাকি প্রচ্ছদ ব্যাপারটা আমার কাছে ক্যানভাসের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেসত্যি অর্থে, একটা লেখনীর ব্যাপকতার সারাংশই হল প্রচ্ছদ ।  

 



প্রশ্ন ঃ আপনি বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় সমানভাবে জনপ্রিয় । এই তিনবাংলায় কাজের ধরণ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাইবো । গোটা বিষয়টাকে কীভাবে দেখে থাকেন আপনি ?

 

উত্তর হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, কলকাতায় সমানভাবেই কাজ করছি প্রতিনিয়ত আমার কাছে আলাদা বলে কিছু নেই কেননা -এক ব্যাপার, একই থালায় ভাত খাবার মতোই রাজনৈতিক কারণে ভূমিগত জায়গায় হয়তো আমরা আলাদা  বা ঢাকার দুই পাশে দুই আলাদা রাজ্য কিন্তু ভাষার জায়গায় তো আমরা এক সেই রবীন্দ্রনাথ, সেই নজরুল, জীবনান্দ কিংবা বঙ্কিম পড়েই তো বেড়ে ওঠা আমাদের নিছক কাটাতাঁরের কারণে  সাহিত্য কী  ভাগ হতে পেরেছে? শিল্প কী ভাগ হতে পেরেছে? এমনকি মানুষের চেহারায়ও  তো ভাগ হয়নি বৈশিষ্ট্যটাও ভাগ হয়নি সুতরাং আমার কাছে আলাদা বা ভিন্ন কিছু মনে হয় না আসলে সবাই আমরা বাঙালী বাঙালিপনার কোনো ভাগ নেই আলাদা করে কোনো বৈশিষ্ট্য নেই তবে মাঝে মাঝে হয়ত আলাদা লাগে প্রিন্টিং প্রযুক্তির কারণে  একটা বই শুধু প্রচ্ছদের উপর নির্ভর করে না,  সাথে কাগজ প্রিন্টিং, টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিয়েই  একটা কম্পিলিট বই হয় সুতরাং এক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু শিল্পে, কবিতায় অর্থাৎ  ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টিতে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, অন্তত আমার দৃষ্টিকোণ থেকে

 



প্রশ্ন ঃ  একজন চিত্রশিল্পীকে শুধুমাত্র প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে, অনেক শিল্পীকেই অভিমান করতে দেখেছি । এই ‘চিত্রশিল্পী’ থেকে ‘প্রচ্ছদশিল্পী’ এই দুই শব্দের ব্যবধানকে আপনি কীভাবে দেখে থাকেন ?  তাদের সম্পর্ক বা রসায়নকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন ?


উত্তর দেখুন, যদি আপনি আপনার ডান হাত বা বাম হাতকে চিনতে চান তবে হয়তো বলবেন এটি ডান হাত বা ওটি বাম হাত কিন্তু যখন বলবেন এগুলো আপনার হাত তখন কি দাঁড়াবে! সেটা মিথ্যে হয়ে যাবে? শিল্পী তো কেবল চিত্র আঁকলেই শিল্পী নয়, গান যে গায় সেও শিল্পী একজন কুমার যখন কলস বানায় সেও শিল্পী শিল্পী একটা সামগ্রি ব্যাপার শিল্পী বলার কী কোনো নির্দিষ্ট সংবিধান আছে? আপনি যদি সুন্দর করে কথা বলেন সেটাও একটা শিল্প আসলে, আমার কাছে  সব নান্দনিকতাই শিল্প আর যিনি সেটা ঘটা তিনি শিল্পী, এটাই সহজ ব্যাখ্যা অন্তত আমার কাছে অনেকের দ্বি-মত থাকতে পারে কেননা, শিল্পী শব্দটাই একটা অভিলাসি বৈষম্যমুলক শব্দ অন্যান্য প্রতি শব্দের মতো যেমন ডাক্তার, আমলা, ব্যারিষ্টার আসলে, এসব  ডেজিনেশন বা উপাধি  আমি মানি না প্রচ্ছদ শিল্পী বলেন আর চিত্রশিল্পী বলেন! এই গণ্ডিমার্কা চিহ্ন আঁকার কোনো মানে নেই, যখন আপনার সত্যিকারের পাখি স্বভাব আর এই ডেজিনেশন তখনই নির্মাণ হয় যখন আপনি সাধারণ জনগণ থেকে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় মাপতে চান আমার মতে, এটা একটা মানুষের হিংস্র রূপ মাত্র সাধারণ মানুষ থেকে নিজেকে আলাদা করার কোনো মানে নেই

 



প্রশ্ন ঃ  অনেকের অভিমত, আপনি বিমূর্ত ধারায় বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন এই ব্যাপারে আপনার ব্যক্তিগত চিন্তাধারা জানতে চাইছি ? 


উত্তর চিত্রকলায় দুইটাই ভাষা, একটা মূর্ত অন্যটা বিমূর্ত মূর্তটা কি ? যা আমরা দু-চোখে দেখি আর বিমূর্তটা কি ? যা আমরা দু-চোখে দেখি না তৃতীয় চোখে দেখিমানে, মনের চোখে দেখি একটা কবিতা যখন লিখবেন তখন মনের চোখ দিয়েই লিখবেন গল্প যখন বলবেন, তখন তা নিজের ভাবজগতের জায়গা থেকেই লিখবেন, তাই না ?  তো এই যে, দেখা না-দেখার ব্যাপারটা আসলে আমার কাছে বিমূর্তই ! প্রচ্ছদের চরিত্রগুলোও তখন আমার কাছে বিমূর্ত হয়ে যায় আবার রিয়েলস্টিক ফর্মে  কি করি না ? অবশ্যই করি যখন একটা স্ক্রীপ্ট ডিমান্ড করে তখন নিশ্চয়ই করি যদি আপনি রবীন্দ্রনাথের জীবনী লেখেন তবে সেখানে বিমূর্ত হবার সুযোগ কম আপনাকে তো রবীন্দ্রনাথের রিয়েলস্টিক ছবি বা ড্রইং ব্যবহার  করতে হবে সেখানে , তাই না ? প্রচ্ছদ একধরনের আরোপিত শিল্প সাপের মতো গণ্ডি এঁকে দেয়া হয় যদিও অনেক প্রচ্ছদই তার তেজ নিয়ে আলাদা রূপ ধারণ করে টোটাল ব্যাপার হলো স্ক্রীপ্ট যেমন চায় তেমনই ঘটে এটা একেক জনের এক্সপেরিমেন্টাল স্টাইলের উপর নির্ভর করে

 

 


প্রশ্ন ঃ প্রচ্ছদ আর লেখনীর সম্পর্কটা খুবই আত্মিক ।  কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়,  প্রচ্ছদশিল্পীর কাজের সাথে  লেখক একমত হতে পারেছেন না । দ্বিমত চলে আসছে । এরকম কী কখনও হয়েছে আপনার সাথে ?  বিরোধের এই  বিষয়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করতে চান ?  


উত্তর ঃ  দেখুন, একজন কবির কাজ কবিতা লেখা বা লেখকের কাজ লেখা এবং শিল্পীর কাজ আঁকা প্রকাশকের কাজ প্রকাশ করা বাইন্ডারের কাজ বাঁধাই করা। কেউ কারো কাজে হস্তক্ষেপ করলে কাজটাই নষ্ট হবার সম্ভাবনা বেশি থাকেলেখকের কাজ লেখা আর  প্রচ্ছদশিল্পীর কাজ সেখান থেকে সে যে রস আস্বা  করলো, সেটা নিজস্ব স্বকীয়তায় আঁকা বা ফুটিয়ে তোলাএখন লেখক তো আর শিল্পীর ভিতরের  ভিউটা বা দেখাটা  আগাম দেখতে পাবেন না, তাই না!  সমস্যাটা হল, লেখকরা লেখার সাথে সাথে মনের ভেতর প্রচ্ছদটাও  এঁকে ফেলেনএবং  এটাই  একসময় সব থেকে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়তখন লেখক বলে এটা নয়, ওটা করুন। কই, প্রচ্ছদশিল্পী তো বলেন না আপনার এই লেখা এমন নয়, ওমন করুন ? এক্ষেত্রে আমি মনে করি,  যার কাজ তার উপরেই ছেড়ে দেয়া উচিৎ। আমার সাথেও এরকম ঘটে প্রায়। আসলে আমি চেষ্টা করি, আমার মতো করে করার ধার করা মেধা নিয়ে নিজের কাজে প্রয়োগ করতে চাই না।  হ্যাঁ লেখক বা প্রকাশকের সাথে প্রচ্ছদ করার আগে, খুব বেশি প্রয়োজন হলে আলোচনা করে নেয়া যেতেই পারে। অথবা লেখকের সাথে দীর্ঘ আলাপও হতে পারে যদি না সিনোপসিস পাওয়া যায়।


 


প্রশ্ন ঃ লিটিল ম্যাগাজিনের প্রতি আপনার প্রেম কারও অজানা নয় । আপনি লিটিল ম্যাগাজিন অন্ত প্রাণ । অনেকে আজকাল বলছেন, ডিজিটাল সময়ের যাঁতাকলে  লিটিল ম্যাগাজিন তার চরিত্র ক্রমশ হারাচ্ছে । এই ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাইছি ।  


উত্তরলিটলম্যাগ আসলে সাহিত্যের আঁতুরঘর এখানে সমন্বিত চাষাবাদ করা হয় চর্চা করা হয় গাঁটের পয়সা খরচ করে লিটল ম্যাগ করা হয়এখানে ব্যবসার ফুলঝুরি থাকে না একারণের এটা আমার বেশি প্রিয় লিটলম্যাগের চরিত্র হারাচ্ছে আসলে সম্পাদকদের কারণে সে কেন লিটলম্যাগ করছে সেই কনসেপ্টই তার কাছে অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না ।  সাইজে ছোট হলেই লিটলম্যাগ হয় না লিটলম্যাগের ধর্মই হল,  বড় বাজারি ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানান দেয়া নিজের চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে মেলে ধরা অনেকে ভাবেন দুটো কবিতা দুটো গল্প দুটো প্রবন্ধ নিয়ে ছোটো সাইজে ছাপালেই লিটলম্যাগ হয়ে গেল বুঝি ! কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে এমন নয় লিটলম্যাগের লেখায় তেজ, চিন্তা সবকিছুকে মুক্তচিন্তা দিয়ে প্রকাশ করা বেশি জরুরি মুক্তবুদ্ধি যত প্রকাশ পাবে ততই আলো ছড়াবে । আর যত বুদ্ধি সংকুচিত হবে ততই ডিজিটালরূপটা প্রকাশ বেশি পাবে আসলে কাগজের ঘ্রাণ আর মণিটরের ঘ্রাণ কখনই এক নয় বলে আমি মনে করি  

 


 প্রশ্ন ঃ “কাগজের ঘ্রাণ আর মনিটরের ঘ্রাণ কখনই এক নয়” – কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, ডিজিটালরূপটা ক্রমশই কাগজকে হারিয়ে দিচ্ছে ? তাই তো দেখছি আজকাল –


উত্তর ঃ বিষয়টা দুই রকম আমার কাছে। অনলাইনে আসলে প্রচ্ছদ আমরা যেটাকে বলি সেটাকে ব্যানারও বলতে পারি। সাধারনত অনলাইনের ভাষায় ব্যানারই বেশি বলা হয়। প্রচ্ছদ-এর বৈশিষ্ট্য আর অনলাইনের বৈশিষ্ট্য অবশ্যই এক নয়। অফলাইনে ছবি আঁকা এবং তা প্রিন্ট করা এবং সেটাকে মোড়কে রূপান্তর করা, একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অনলাইনে কিন্তু সেটা আপনি পারছেন না। তবে  অনলাইনে যেটা পারছেন, সেটা আমার কাছে নিছক অলংকরণ মাত্র। অলংকরণ হারাতে পারে আরেক অলংকরণকে। কিন্তু প্রচ্ছদ সবসময় প্রিন্টেড ভার্সনযদিও ইদানিং কিছু অনলাইন পত্রিকা তাদের প্রথম পেইজকে প্রচ্ছদ হিসেবে প্রকাশ করে লিখে রাখে প্রচ্ছদ। কিন্তু আমার কাছে, প্রচ্ছদ মানেই শুধু প্রথম পৃষ্ঠা ব্যাপারটা, তা নয়। পেইন্টিং ও প্রিন্টের রিলেশন অবশ্যই থাকতে হবে। বাঁধাইয়ের সাথে সম্পর্কও থাকতে হবে। সব মিলিয়ে  তো মোড়ক,  তাই না! আসলে ডিজিটাল বা প্রিন্টেড ভার্সন দুটোর গঠ প্রণালী আলাদা ও স্বতন্ত্র এই সময়ে অবশ্য  ডিজিটালকে পুরোপুরি অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু কোনটা কাকে রেখে এগিয়ে যাবে,-সিদ্ধান্ত কেবলই পাঠকের। পাঠক কোনটাকে স্বচ্ছন্দ  মনে করে, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করে।


No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...