"ত্রিপুরার কোন নিজস্ব চিত্রভাষা নেই। যেমন সাহিত্যেও নেই।"
ত্রিপুরার চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্য, মননের
তীব্রতাকে বাঙ্ময় করে নতুন এক চিত্রভাষায় রূপ দেন তার ছবিতে। শিল্পীর সাথে
একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে।
প্রশ্ন ঃ
চিত্র হবার জন্য অবশ্যই রেখা এবং রঙের সাথে চাই মনন। এই মনন থেকে তৈরি হয় যে-কোন
শিল্পীর নিজস্ব চিত্রভাষা। এনিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ভাবনা জানতে চাইছি?
উত্তর ঃ চিত্রকলা অবশ্যই বাস্তবের হুবহু অনুকরণ নয়। তাকে
গভীর বোধ থেকে এক নান্দনিক ভাষায় রূপান্তর করতে হয়। সেখানেই আসে ছবির নিজস্ব মেজাজ
ও অভিব্যক্তির প্রতিফলন। আর সেখানে থেকেই তৈরি হয় নিজস্ব এক চিত্রভাষা।এই চিত্র
ভাষাও আবার কখনও কারও কারও ক্ষেত্রে আরোপিত ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি, যাকে
আমরা মার্জিত ভাষায় সিগনেচার পেইন্টিং বলি। তার যেমন একটা নিজস্ব দীর্ঘ অভিজ্ঞতার
সুর ধ্বনিত হয়, তেমনই সেটা আবার শিল্পের নতুন কোন দিক উন্মোচনে প্রতিবন্ধকতাও হয়ে
দাঁড়াতে পারে। পিকাসোকে যেমন আমরা কিউবিক শিল্পী হিসেবে জানি! এই চিত্রভাষাই সারা
পৃথিবীতে তার পরিচয়। কিন্তু তিনি তার শিল্পজীবনে অনেকবার চিত্রভাষাকে
পালটেছেন। এখানেই তিনি মহান। আজ আমি যা
আঁকছি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাই আমার চিত্রের একটি সুর, ভাষা বা শিল্প হয়ে আছে। জোর
করে কোন ভাষা তৈরি হয় না। একজন শিল্পী সততার চলনের মাঝেই ফুটে ওঠে এক সহজিয়া
চিত্রভাষা।
প্রশ্ন ঃ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আঁকার প্রকৃতি,
বিষয়, বিন্যাসের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই আসছে। আপনার উপলব্ধিতে কেমন ধরা পড়ছে এই
পরিবর্তন?
উত্তর ঃ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ‘আর্ট ফর্ম’, আমি ইচ্ছে করেই আর্টফর্ম
বললাম, কারন চিত্রকলা ব্রাশ আর শুধু রঙ-তুলি, কাগজ-ক্যানভাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এমন কি গ্যালারির মধ্যেও নয়। প্রকৃতি পরিবেশের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে শিল্পের
প্রয়োজনীয়তা একেবারে অন্য মাত্রায়, অন্যভাবে। ভিডিও আর্ট, পারফরমেনস্,
ইনস্টোলেশান, ডায়লগ বেসড কমিউনিটি আর্ট, এনভায়ারমেন্টাল আর্টের মতো বিভিন্ন ফর্মে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আর্ট। শুধু
পরিবেশকে নিয়ে ছবি আঁকা নয়। সামগ্রিক চেতনা, জীবনযাপন রাজনৈতিক, ইকনোমিক প্রভাবের
মাঝেও এক মনস্তাত্ত্বিক বোধকে ভিসুয়ালাইজ করার চ্যালেঞ্জ। কেউ কেউ এই প্রকাশকে মূর্ত দৃশ্য চেতনায়
প্রতিফলিত করছেন। আবার কেউ বিমূর্ততায়!কেননা বিমূর্ততাই এক গভীর সত্যতায়
স্পিরিচুয়াল বাস্তব সত্য। এত যে বললাম, তারপরেও আমি বলব চিত্রকলা রঙ-তুলি,
কাগজ-ক্যানভাসের চিরন্তন সখ্যতা কোনদিন
হারিয়ে যাবে না। কারন সে তো জীবন দর্শনের এক ধারাবাহিক প্রতিফলন মাত্র।
প্রশ্ন ঃ ছবি-কবিতা
এবং আপনি এই ত্রয়ী সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এই নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি, ভালো লাগা জানতে চাইছি -
উত্তর ঃ আসলে
সমস্ত শিল্পের ভিশন কিন্তু একটিই, সেটা
ছবি কবিতা গান সিনেমা নৃত্য যাই বলি না কেন! পিকাসোও কবিতা নাটক লেখালেখি করেছেন। তিনি এমন একটি
নাটক লিখেছেন যা নাট্য শিল্পের ইতিহাসে সম্পূর্ণ একটি অন্য ভাষা ও ফর্মের রহস্যে
ভরা। জার্মান মহাকবি গ্যাটে ছবিও আঁকতেন। তাঁর রঙ নিয়ে বিশেষ গবেষণা এক বিশেষ
আবিষ্কার। রাশিয়ান মহাকবি পুশকিন্ ভীষণ ভাল ছবি আঁকতে
পারতেন। আসলে আমি বলতে চাইছি দরজা একবার কাছে টেনে খুলতে দিলে অনায়াসে ঢোকে পড়া
যায় আরেক শিল্পের আঙ্গিনায়। রাস্তা ভিন্ন, স্বাদ একই। রহস্যও এক। আমি কবিতা লিখেছি
কিনা সন্দেহ হয়। কবিতা পড়তে খুব ভাল লাগে। যখন ছবি আঁকি না, তখন কবিতা লিখি। আবার এমনও
হয়েছে ছবিও আঁকছি, কবিতাও লিখছি একই সময়ে। কখনও একটি লাইন বা একটি ভাবনা থেকেই
কবিতাটি এসে যায়। জোর করে কখনও কবিতা লিখবো বলে
লিখি না। ছবিও প্রতিদিনই আঁকতে হবে, এমন অভ্যেস আমার নেই। তবে প্রতি
মুহূর্তে মনের মধ্যে আঁকা ও লেখা চলতে
থাকে আর সেটাও সমস্ত প্রথাকে তছনছ করার এক
তীব্র প্রয়াস থাকে। যে রঙকে ছবির রঙ বলে সবাই ব্রাত্য ভাবে, আমি আবার তাকেই খুঁজে বেড়াই ছবির ভাষা বলে। রঙ-রেখা শব্দের রহস্য, প্রতিদিন আমাকে স্বস্তি ও শান্তি দেয়। সৃষ্টি না-হলে নিজেকে অর্থহীন জীবন্ত শব বলে
মনে হয়।

প্রিয় রঙ – কালো
প্রিয় ফর্ম – গুহাচিত্রের কালোত্তীর্ণ আধুনিকতা
প্রিয় মুখ – আমার মেয়ে তাহিতি
প্রিয় বেদনা – একটি নিজস্ব স্টুডিও না-থাকা।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার চিত্রকলার সাথে আপনার নিবিড় সম্পর্ক, তাই জানতে চাইছি, ত্রিপুরার চিত্রকর্মে বেসিক্যালি একাল-সেকালের মধ্যে কি রকম পরিবর্তন
দেখতে পাচ্ছেন ?
উত্তর ঃ ত্রিপুরার
কোন নিজস্ব চিত্রভাষা নেই। যেমন সাহিত্যেও নেই। মিলেমিশে এক বিশ্বায়নের ভাষা হয়ে
আছে। শুধু তো উপজাতির ছবি বা পাহাড়,জঙ্গলের ছবি আঁকলে ত্রিপুরার শিল্পভাষা হল না! এভাবে
কথাটা শুরু করেছি এই কারনে, সেকালে যারা ছবি আঁকতেন তাদের কারও কাছে আমরা
কোনও নিজস্ব মাটির ভাষা পাইনি। ধীরেন
কৃষ্ণ দেববর্মণ, হৃষিকেষ দেববর্মা, নলিনীকান্ত মজুমদার,
তাদের ছবিতে তখনকার কলা ভবন শান্তিনিকেতনের অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসুর প্রভাব ছিল
স্পষ্ট। ত্রিপুরার সেই সমস্ত বরেণ্য শিল্পীদের
ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে বৈকি! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম বাইরে প্রদর্শনী
করতে গেলেন তখন সঙ্গে ধীরেনকৃষ্ণ দেববর্মাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ ত্রিপুরাবাসি হিসেবে
আমার সেটা গর্বের বিষয়। পরবর্তী সময়ে বলা যায় উল্লেখ করার মতো ধর্মনারায়ণ
দাশগুপ্তের ছবিতে এক পরাবাস্তবতা, অলৌকিক উজ্জ্বলতায় প্রস্ফুটিত ছিল। তাঁর ছবি
আমার ভীষণ প্রিয় ছিল। তিনি অসময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে! ত্রিপুরার চিত্রজগতে পার্থপ্রতীম দেব এক বিশেষ
নাম।তাঁর চিত্রভাষা সারা ভারতের শিল্পীদের এক চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড
সমসাময়িক, নিয়ত ফর্মকে ভেঙে ভেঙে
এগিয়েছিলেন জাত শিল্পীর মতো।তারপর এলেন স্বপন নন্দী, বিপুলকান্তি সাহা,
পার্থপ্রতীম গাঙ্গুলী, প্রশান্ত সেনগুপ্ত প্রমুখ ত্রিপুরার চিত্রশিল্পে এদের অবদান
অসামান্য। ছোটবেলায় এদের নাম ও কাজ দেখে দেখে বড় হয়েছি।
বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা অনেক বেশি সৃষ্টিশীল। অনেক বেশি গভীর ও
নান্দনিক কাজ করছেন। রাধা বিনোদ শর্মা বর্তমানে লন্ডনে আছেন। মৃন্ময় দেববর্মা
অসম্ভব ভালো কাজ করেছিল। অভিজিৎ ভট্টাচার্য তার কাজের ফোক-চিন্তাধারা আমাকে আপ্লুত
করে। চিন্ময় রায় এই সময়েও তরুণদের মতো কাজ করছেন। অপূর্ব। এই সময়ের চিত্রভাষায় এক অসাধারন সৃষ্টিতে
মগ্ন তরুণ শিল্পী পল্টু বর্মণ,দীপিকা
সাহা, মনতোষ, শান্তা,সঞ্জীব সিনহা, পুষ্পল
দেব। সুব্রত আচার্যের ছবিতেও লোক-শিল্পের ভাষা আধুনিক হয়ে এসেছে। ত্রিপুরার রাজেস
দেবও খুব ভাল কাজ করছে। সেই সব
অর্থে বলাই যায় ত্রিপুরার তরুণ শিল্পীরা
ক্রম থেকে ক্রমান্বয়ে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠছেন ছবির জগতে নানা প্রেক্ষাপট থেকেই। সম্ভাবনাময়
এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী ত্রিপুরার আগামী সম্পদ।

No comments:
Post a Comment