কবি দীপঙ্কর সাহা : জীবনপ্রিয়, বোহিমিয়ান এক কবির নাম
তমালশেখর দে
কবি দীপঙ্কর সাহা, ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “নিষিদ্ধ এলাকা” উৎসর্গ করেছিলেন প্রখ্যাত হাংরি আন্দোলনের কবি ফালগুনী রায়-কে । এর দুই বছর আগে মানে ১৯৭৯ সালে তাঁর ৯৭ লাইনের দীর্ঘ একটি কবিতা নিয়ে বের হয় “মিলিত কান্নাকাটি মিলিত নিরাপত্তা” ছোট্ট কবিতাগ্রন্থটি । আবার তাঁর “স্বনির্বাচিত কবিতা” কবিতা সংকলন, যা তিনি নিজেই নির্বাচিত করছিলেন তাতে তিনি তাঁর প্রথম কাব্য “মিলিত কান্নাকাটি মিলিত নিরাপত্তা”-টিকে নির্বাচিত করেননি । এতে আমরা স্পষ্টই ধরে নিতে পারি, তিনি কবিতা হিসেবে প্রথম কাব্যকে বেশ দুর্বলই মনে করেছিলেন । এবং বাস্তবেও তাই মনে হয়েছে আমার বিচ্ছিন্ন কয়েকটি লাইন ছাড়া । তবে এই কাব্যের বিচ্ছিন্ন লাইন যেমন– ‘অসময়ে রাত বেড়ে যায় স্নায়ুতে ক্ষুধা হা হয়ে আছে / শরীরের অন্দরে আরেক শরীর চমকায়” কিংবা “শহরের লাল মানুষ প্রকৃত কমুনিষ্ট হতে পারলো না / মানুষের নগ্ন শরীরে জন্মের দাগ মুছে যায়” কিংবা “সামনের ব্যালকনী থেকে শাড়ী ঝুলছে নগর নঢীর / একজন দৌঁড়ুতে গিয়ে থেমে পড়লো” কিংবা “ নিজেকে সন্দেহ করেও রেহাই নেই” –- এভাবেই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি লাইন । এতে আসলে শুধু কবির কবিতাবোধের ভিতরের মননের দানাবাঁধার উন্মেষ পর্যায়টাই ধরা পড়ে । হয়ত এইজন্যই তিনি এই কাব্যকে তাঁর স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলনে যুক্ত করেনি ।
সত্যি অর্থে কবি দীপঙ্কর সাহা-কে আমরা পাচ্ছি তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “নিষিদ্ধ এলাকা” থেকে । এখানে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এই কাব্যটি তিনি উৎসর্গ করেছেন হাংরি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কবি ফালগুনী রায়-কে । এবং উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লিখছেন – “কবিরাই সত্যকার নক্ষত্র... মহাকাশে ভ্রাম্যমাণ” । এর থেকে আমরা বুঝতেই পারি ফালগুনী রায়-এর কবিতা কতটা থাকে স্পর্শ করত । তিনি কতটা প্রভাবিত ছিল তাঁর কবিতা নিয়ে । সেই প্রভাবেরই তো ফল এই উৎসর্গ পৃষ্ঠা ।
আমরা যদি কাব্যের প্রথম কবিতাটা লক্ষ করি –
“পার্কে ছেলেরা সত্যের মুখোমুখি হতে চেয়েছিল
ধ্রুবনক্ষত্র জেগে থাকে পার্কের কোণ ঘেষে –
যেখানে মেয়েটি অপেক্ষা করে শক্তভাবে সন্তানের কথা ভাবে”
এখানে শেষ শব্দ ‘ভাবে’ কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না কেন জানি । বরং “ভেবে” হওয়াটাই উচিত ছিল মনে হচ্ছে । কিন্তু বইতে এবং সংকলনেও দুটোতেই দেখছি “ ভাবে” লেখা । অথচ দেখুন “সন্তানের কথা ভেবে” – এটাই তো যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে। কবিতাটির চিত্রপট অনুযায়ী একটি মেয়ে নিষিদ্ধ এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে শক্তভাবে, এখানে “শক্তভাবে” শব্দটাও খুব অর্থবহ । নিষিদ্ধ এলাকায় সাধারণত কেউ শক্তভাবে দাঁড়ায় না ! গ্রাহক টানার জন্য এটা উপযুক্ত পোজ বা দেহ-আঙ্গিকও নয় । তারপরও মেয়েটি দাঁড়িয়েছে, তখনই তো মূল প্রশ্নটা আসে - “কেন তবে দাঁড়ালো মেয়েটি ?” আর এখানে আমরা লক্ষ করি মেয়েটির নিরুপায়তার চূড়ান্ত সীমা । অবশেষে শেষ সম্বল হিসেবে নিজের দেহ-টাকে নিয়েই সে পার্কের এক কোণে এসে দাঁড়ায় । কিন্তু এই চূড়ান্ত সীমায় আজ থাকে আসতে হল কেন ? এর উত্তর কবিই দিচ্ছেন–“ সন্তানের কথা ভেবে” । এই অর্থে এই শব্দ কিছুতেই “ভাবে” হতে পারে না, সব অর্থেই মনে হচ্ছে হবে “ভেবে”।আর এই লাইন না-দাঁড়ালে, গোটা কবিতাটাই প্রকৃত অর্থে তার মানে বা প্রকৃত ক্রাইসিসটাই হারিয়ে ফেলে । কবি তাই প্রথম লাইনেই উল্লেখ করেছেন – “পার্কে ছেলেরা সত্যের মুখোমুখি হতে চেয়েছিল”। সত্য তো এটাই ! সন্তানের চূড়ান্ত ক্ষুধা মেটাতে সে আজ নিরুপায় হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে পার্কের নির্জন এক কোণে, গ্রাহকের অপেক্ষায় । যার বিনিময়ে সে ক্ষুধা নিবারণ করতে চায় সন্তানটার ।
আবার উপরের ভাবনার কিছুক্ষণ পর এভাবেও ভাবতে লাগলাম -- ‘সন্তানের কথা ভাবে’ – এক অর্থে এটাও ঠিক হতে পারে । তখন আবার মনে হল, কখন “মেয়েটি” এমনটা ভেবেছিল ? মেয়েটি নিশ্চয়ই ভেবেছিল, কখন গ্রাহক তাকে ছাড়বে, এবং কখন সে এই টাকা নিয়ে নিষিদ্ধ এলাকা ত্যাগ করে, সন্তানের জন্য খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে যাবে ! কোনো সম্ভাবনাকেই তো আপনি পাঠক হিসেবে নিশ্চিন্ত হয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন না ! এই লাইনটার মধ্যে তো দু-দিকেই কবিতা-চর্চার চিন্তাকে প্রবাহিত করার সম্ভাবনা রয়ে গেছে । আমি পাঠক হিসেবে, এই লাইনটিকে দুইভাবেই ঘুরিয়ে দেখলাম এবং পুনঃপাঠের নতুন একটা আমেজও পেলাম । তবে যে অর্থেই হোক, এখানে কবিও মুখোমুখি হলেন এক চরম সত্যের । আবার এখন মনে হচ্ছে, এই ছেলেটি আর কেউ নয় স্বয়ং কবিই যেন । কবিই এখানে ‘ছেলে’-র রূপকে এক সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন যেন। চূড়ান্ত এক সত্যের মুখোমুখি । ক্ষুধার বাস্তব মুখোমুখি । পেট পোড়ার গন্ধই যেন বাতাসে রাবার পোড়ার গন্ধে রূপান্তরিত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে । যে পোড়াগন্ধ, কবির নাকে পার্কের সেই মেয়েটির হৃদয়ের, তার জীবনের স্বপ্ন পোড়ার গন্ধ হয়ে ধরা দিয়েছে । মেয়েটির ব্যথাই আজ কবির ব্যথা ।
সেই আশির দশকে একটি কাব্যের নাম রাখলেন – “নিষিদ্ধ এলাকা”, এই সিদ্ধান্তটাই তো একটা সাহসী সিদ্ধান্ত ।
হাংরি ঘরানার যাবতীয় বৈশিষ্ট্যই দীপঙ্কর সাহা-র কবিতায় লক্ষ করা যায় । তাই তো তিনি স্বকণ্ঠে ঘোষণা করতে পারেন – “আমি যা লিখি তা এক ধরণের রচনাই হবে--, কবিতা লেখার অজুহাতে কবিতা আমি বিশ্বাস করি না । আত্মার উলঙ্গ অবস্থা এবং স্বাধীন নির্দেশ কেউ সহ্য করে না, মানুষ নিজের সম্পর্ক লুকিয়ে ফেলেছে। অজ্ঞাতবাসের বন্ধুরা যারা ধরা পড়ে গুলি খেয়েছিল, তারা তাদের দণ্ডদাতার চেয়ে সত্যি ছিল প্রমাণ হয়ে গেছে”
এখানে কবির নিজের চিন্তা-জগতের বিশেষ কিছু দিক ধরা পড়ে । কবি কবিতাকে এক ধরণের রচনাই বলছেন। এর জন্য বিশেষ কোনো ট্যাগ্ চাইছেন না । তাই তো এরপরই বললেন – শুধু “কবিতা লেখার অজুহাতে কবিতা আমি বিশ্বাস করি না।” এখানে কবি পছন্দের কথা বলেননি, বলেছেন বিশ্বাসের কথা । একজন কবিকে, তাঁর কবিতাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে, তাঁর বিশ্বাসের জগতকে আগে বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি । কেননা, বিশ্বাসই তো কবিতার মনোজগতের বুনন এবং বিন্যাস । কবি তাই তো লক্ষ করেছেন – “আত্মার উলঙ্গ অবস্থা এবং স্বাধীন নির্দেশ কেউ সহ্য করে না” । এই ভাবনার ঘরানা কিন্তু হাংরি ফিলোসফি থেকেই উঠে এসেছে । আমরা কেউই আত্মার উলঙ্গ নির্দেশ গ্রহণ করার সাহস রাখি না । তাকে সবসময় পোশাকের আড়ালেই লুকিয়ে রাখি । আত্মার সরাসরি নির্দেশ গ্রহণ করার ক্ষমতা আর কতজন রাখতে পারেন, না, পারেন সহ্য করতে ? আমরা বরাবরই মুখোশের আড়ালে থাকতে পছন্দ করি । নিজের প্রকৃত সত্তাকে লুকিয়ে রাখি নিজের ভিতরেই । এরপর কবি লিখলেন– “অজ্ঞাতবাসের বন্ধুরা যারা ধরা পড়ে গুলি খেয়েছিল, তারা তাদের দণ্ডদাতার চেয়ে সত্যি ছিল প্রমাণ হয়ে গেছে।” এই কথাগুলি কবি ধর্মনগরের ৮০-র দশকের হুরুয়ার সেই ঘটনা, যেখানে নকশালবিপ্লবী গোবিন্দ তেলীসহ সাতজনকে প্রকাশ্য দিনেরবেলায় পুলিশ ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে। সম্ভবত সেই প্রসঙ্গেই কবি কথাগুলো বলেছিলেন । কবি তাদের –“দণ্ডদাতার চেয়ে সত্যি ছিল প্রমাণ হয়ে গেছে।” বলে উল্লেখ করেছেন । এই একটি উক্তি থেকে কবিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় । তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, স্বাধীনচেতা মনোভাব । এবং গোটা ব্যবস্থাকে খোলা চোখে দেখার মানসিকতাই এখানে প্রকাশিত হয় । সমাজ যে গোটা এই মনোভাবকে সহ্য করবে না সহজে, তা তিনি জানতেন, তাই তো বলেছেন – “আত্মার উলঙ্গ অবস্থা এবং স্বাধীন নির্দেশ কেউ সহ্য করে না” সেই মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এখনও গড়ে উঠেনি ।
একের পর এক কবিতায় তাঁর সাহসী উচ্চারণ তাই তো প্রমাণ করে । যেমন,
কবি “তোমাদের ঘরে” কবিতায় লিখছেন –
“সেই সময় কলকাতার কবিরা চন্দ্রাহত
কিংবা পামেলার স্তনে গেরিলা তৎপর ?
একদিন গেরিলার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে
শিশুর পিতা শুয়ে থাকে তোমাদের ঘরে” ।
আশির দশকেই কবি কবিতার চিত্রকল্পে আঁকছেন –
“দুয়ার পেরিয়ে বাইরে শূন্য মাঠ –
ঐ সব শূন্যতা
বগলদাবা করে কেউ চলে যায়
আর ফিরে আসে না
এক বন্ধ্যা কাক উড়ে এসে –
গলে গেলো গলিত শরীরে।”
কবিতায় কবির বয়ান পদ্ধতি, টেকনিক, এবং শব্দের বুননে বন্ধ্যা সময়েরই প্রতিধ্বনি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন । কিংবা “ঘড়ি” কবিতায়, কবির বয়ানে দেখি –
“আমার ব্যক্তিগত প্রণয়িণী বুকের মধ্যে
মাথা রাখতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে,
বলে- ‘একি তোমার বুকে টিকটিক সময় চলছে
ধ্যাৎ -- তোমাকে ভালোবাসা যায় না’
এরপর সে অন্য একটি বেঞ্চিতে কারুর বুকে মাথা রাখে।
আমি দালি-র ঘড়ি দেখিনি – রাধানগরের ঘড়ি দেখেছি ।”
এখানেই কবি দীপঙ্কর সাহা-র কবিতার স্বতন্ত্রতা । দালি-র সময়ের ঘড়িকে রাধানগরে স্থানান্তরিত করা । বুকের ব্যক্তিগত প্রণয়িনীকে অন্য কারও বুকের ভিতরে খুঁজে পাওয়ার মধ্যে যাপনের বিবর্তনকে পর্যালোচনা করা । “ধ্যাৎ -- তোমাকে ভালোবাসা যায় না’” – এই উক্তির মুন্সিয়ানা, টেকনিক, তাঁর কাব্যমেধাকেই ফুটিয়ে তোলে । সামাজিক অবস্থানের প্রতি একটা শ্লেষও যেন কোথাও ফুটে ওঠে । বয়ানের মধ্যেও ধরা পড়ে ঝরঝরে, স্মার্ট এক উপস্থাপনা-ভঙ্গি ।
“নিষিদ্ধ এলাকা” কাব্যের কয়েকটি বয়ান লক্ষ করুন –
“কলকাতা অধীন বাহির বারান্দায় শুয়ে থাকে যতীন
অনুরাধা যতীনকে চেনে না শুধু হেসেখেলে ভালোবাসা যেতো ।” (হলুদ টেলিফোন-১)
(আমার মনে হয়েছে এখানে “ভালোবাসা” না-হয়ে “ভালোবেসে” যেত হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত ছিল । চেনে না, তারপরও শুধু নিছক ভালোবাসা! এ-কেমন ভালোবাসার চিত্রকল্প আঁকতে গেলেন কবি ? এতো বিশ্বাসহীনতারই চিত্রকল্প । )
“কথাবার্তা – জাঙ্গালের পাশে নষ্ট শিশু আমাদের –
নষ্ট হাসি – নষ্ট ভালোবাসা – নষ্ট হ্যালো –
হ্যা-ল্লো – হ্যালো – হলুদ টেলিফোন চুরমার এবার।” ( হলুদ টেলিফোন)
(এই কবিতায়ও—“জাঙ্গালের” – শব্দটা নিশ্চয়ই “জঙ্গলের” হবে , নাহলে তো অর্থ তার ব্যঞ্জনা পাচ্ছে না।)
“যেখানে রক্তের দালাল ঘুরে যায় –
ঠিক সেই স্থানে যীশুর ছবি ” ( হাসপাতাল-২ )
একজন কবিকে ধরতে গেলে তাঁর মনোযোগের ক্ষেত্রটা জানা খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কবি দীপঙ্কর সাহা-কে ধরতে গেলে, কবির মনোজগতের ভিত্তি, বা তাঁর গঠন পর্যায়টা, বেড়ে ওঠাটা জানা খুবই প্রয়োজন । এক্ষেত্রে আমরা দেখি, কবি দীপঙ্কর সাহা ছোটবেলায় বেড়ে উঠেছেন গ্রাম্য পরিবেশে, নদীর জলরাশি ছুঁয়ে ছুঁয়ে। অনুভব করেছেন নদীর ঢেউ, ছুঁয়ে দেখেছেন নদীর হৃদয়, নদীর দুরন্তপনা । পড়াশোনা করেছেন আগরতলার বোধজং স্কুলে । দ্বাদশশ্রেণিতে পড়াশোনা করেছেন বিজ্ঞান বিভাগে। এরপরই তাঁর বেশিরভাগ জীবন কাটে কলকাতায়। মূলত কলকাতাকে কেন্দ্র করেই বেড়ে উঠেছে তাঁর মনন চর্চা। এমনকি তাঁর কাব্য চর্চাও । কলকাতা হয়ে উঠেছিল তাঁর চর্চাভূমি, কাব্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু । সেখান থেকেই বের হয়ে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ "মিলিত কান্নাকাটি মিলিত নিরাপত্তা "। আগেই বলেছি, এই কাব্য ছিল তাঁর গঠন পর্যায়ের বিস্তার-পর্ব। কাব্যটি প্রকাশিতও হয়েছিল কলকাতা থেকে। এর দু-বছর প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "নিষিদ্ধ এলাকা"। এবং সেখানেই ধরা পড়ে তাঁর কাব্যভাবনার মূল বিস্ফোরণ । আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেও তিনি কোনদিন আইনজীবী হয়ে উঠতে পারেননি। আদালতে একদিন গিয়েই ইতি টানেন সে পেশায়। আসলে মেনে নিতে পারেননি এই পেশাকে। নাকি মেনে নিতে পারেননি সেই পেশার ছল-ছাতুরীকে ? প্রকৃত কবির পক্ষে কতটাই বা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল ! তারই প্রতিফলন দেখি তাঁর জীবনে, যাপনে। তাই তো তিনি কখনও কবিতার অজুহাতে কবিতা লিখতে চাননি। তাই তো তিনি কবিতায় চেয়েছিলেন আত্মার উলঙ্গ অবস্থাকে উন্মোচন করতে। তিনি নিজের স্বাধীন চিন্তায় বিশ্বাস করতেন। সাহস রাখতেন তাঁর প্রকাশের। আর এখানেই তাঁর চিন্তার মৌলিকতা ধরা পড়ে। একজন সৎ কবির পক্ষে এটাই তো ছিল স্বাভাবিক।
কলকাতা তার পথে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এজন্যই তাঁর কবিতা তৎকালীন ত্রিপুরার কবিদের থেকে আলাদা । আমি মনে করি এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর কলকাতা বসবাসের অভিজ্ঞতার জন্যই । ত্রিপুরায় তাঁর বন্ধু তালিকায় ছিলেন মানিক চক্রবর্তী, অরুণ বণিক, অরূপ দত্ত, কালুয়া সাত্ত্বিক নন্দীসহ অন্যান্যরা । মানিক চক্রবর্তীকে যারা কাছে থেকে জানেন, তারা জানেন কতটা আধুনিক ছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে কতটা অগ্রসর ছিল তাঁর বা তাদের চিন্তাভাবনা । মানিকদা এবং সাত্ত্বিক-দার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল সবচেয়ে নিবিড়। কালুয়ার আড্ডাই ছিল শেষ অবসাদের আশ্রয় কেন্দ্র । এসবেরই একটা প্রভাব দেখি আমরা তাঁর কবিতার ছত্রের ছত্রে। ফলে এই কবিকে বুঝতে হলে, তাঁর যাপনকে আগে জানা খুব প্রয়োজন। তার যাপনের উন্মাদনাকে বিশ্লেষণ করা খুব প্রয়োজ। নাহলে ব্যক্তিকবিকে আমরা কখনও জানতে পারবো না। আর ব্যক্তিকে না-জানলে, তাঁর কবিতা বিশ্লেষণ করবো কীভাবে ? তাকে মূল্যায়নই বা করব কোন প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে ? তাই কবির যৌবন, যৌবনের উন্মাদনা, ভালোবাসা, ভালোবাসার ব্যথা-বেদনা সবকিছুর উপরই আমাদের আলোকপাত করা প্রয়োজন । নাহলে নিছক কবিতায় ব্যবহৃত কবির লাইনকে ব্যাখ্যা করে হয়ত আমরা কিছু একটা পাবো কিন্তু কবিতার মর্মকথা, মর্ম-মন্থন থেকে যাবে বহুদূর। কেননা, এই কবি শুরুতেই বলেছেন – “শুধু কবিতা লেখার জন্য আমি কবিতা লিখতে চাই না।” কবি তাঁর কবিতায় জীবনের, যাপনের কথাই বলতে চেয়েছেন এবং বলেছেনও। তাই তাঁর কবিতার ছত্রছত্রে আমরা দেখতে পাই, তাঁরই জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ । তাই তো তার কবিতায় বারবার হাসপাতাল এসেছে । এসেছে জীবনের অস্থিরতার কথা । এসেছে মানুষের ক্ষুধা যন্ত্রণার কথা । ভালোবাসাহীনতার কথা । এসেছে, মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথা । তিনি তাঁর কবিতায় সমাজের মুখোশ খুলে দেখাতে চেয়েছেন কবিতার পর্বে পর্বে। এজন্যই এতদিন পর তাঁকে আমরা আবার পাঠ করছি, পুনর্মূল্যায়ন করছি । আজকের সমাজের কথা হয়ত তিনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। এজন্যই আজ যখন তাঁর কবিতা পড়ি তখন খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আসলে তিনি সময়ের আগেই ভেবেছিলেন সময়ের কথা। এজন্যই তাঁর কবিতা আজও আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় । মনে হয় কবিতাটা আজকের । তাই তো তিনি তখনই লিখতে পেরেছিলেন ---
" যেখানে রক্তের দালাল ঘুরে যায় --
ঠিক সেই স্থানে যীশুর ছবি "(হাসপাতাল -২)
অথবা
" মগজে দশলক্ষ বছরের ফেড্ ছবি ও অদৃশ্য রীল
বহন করি -- মধ্যে-এশিয়া থেকে পৃথিবীর আধুনিক
পয়গম্বর - ক্লান্ত মগজে দুশ্চিন্তা বিকিরণ...
জায়মান ভালোবাসার গ্যাসচুল্লী মগজ অভ্যন্তরে
ভূতগ্রস্ত ডেকোরামে একজন নারী ---
'ডেপ্রিসল' শহরে আমার মগজ রান্না করে!
দেশে থেকে আমার শব -- আমার শহরে? (রান্নাঘর)
অথবা
"সমস্ত প্রেমিকার কাছে উড়ে গেছি কাপালিকের বেশে
স্তব্ধ ওঙ্কারের শব্দে --"মাগো দেহতত্ত্ব শোন'।
টিপটিপ বৃষ্টির মত প্রেমিকারা হেসে --
শব্দহীন পুরুষকে নিয়ে চলে যায় বালুঘাটের দিকে। "
( নায়িকা বিলাস)
অথবা
" মানুষের ক্ষুধা পেলে আমারো ক্ষুধা পায়
আত্মভুক আমি নিদ্রাও জাগরণের মধ্যে
যে নিরেট অন্ধকার হানা দেয় আমার খাদ্যে
তাকে সদ্য ভেবে অহংকার ও সঞ্চয় ডুবে গেলে
পুলিশ ও কুকুর সাবধানে তৎপর -- মানুষের
বিসম্বাদ আর কোনদিন শেষ হবার নয়
ঘুম থেকে উঠে আবার ক্ষিধা পায়
আত্মভুক এক মানুষের গল্প আমার সম্পর্কে। "
( আত্মভুক)
এভাবে একের পর এক অসংখ্য লাইনের উদ্ধৃতি দিতে পারি, যা দীপঙ্কর সাহা-র তীব্র কাব্যপ্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। এক্ষেত্রে পাঠককে এগিয়ে আসতে হবে। ছুঁয়ে দেখতে হবে তাঁর কবিতার বই। পড়তে হবে তাঁকে নিয়ে।
কবি দীপঙ্কর সাহা-র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা – ১) মিলিত কান্নাকাটি মিলিত নিরাপত্তা ২) নিষিদ্ধ এলাকা ৩) দৈববাণী ৪) উৎসবের ভেতর দীর্ঘ কফিন ৫) অ্যাভিনিউ নার্সিং হোম ৬) অনন্ত যাত্রা ৭) শান্ট সঙ্গীত ৮) পর্দার ভেতরে ।
কবি দীপঙ্কর সাহা-কে নিয়ে লিখতে হলে আরও লিখে যেতে হয় । তাঁর কবিতা ধরে ধরে বুঝিয়ে দিতে হয় তিনি কীভাবে জীবনের ফর্মকে সাহিত্যের ফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে করে এগিয়ে
গেছেন তাঁর কবিতায় । মাত্র
৩৭ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি অনেক কিছুই লিখে গেছেন । “ অনন্ত যাত্রা” কাব্যে তিনি অনায়াসে লিখে গেছেন –
“যে যায় সে তো যাবেই
অন্ধকারে রাত থেকে
পূবালী ভোরের আলোতে
এক দীর্ঘ সংকেত
যে যায় সে তো যাবেই
বাতাসের ভেতর এক প্রলাপধ্বনি
সঙ্গীতের মাত্রাটুকু ভোরের ভেতর
জেগে উঠেছে এক পূবালী সুর,
...
সম্পূর্ণ স্নেহের বশে অন্ধ হয়েছি আমি
যে যায় সে তো যাবেই
।” (অনন্ত যাত্রা -১)
এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে উপন্যাসিক
শ্যামল ভট্টাচার্য
‘উত্তরপূর্ব’ ম্যাগাজিনের ১৯৯১ সালেই
লিখেছিলেন – “ ‘অনন্ত যাত্রা’ কাব্যগ্রন্থে কোথাও
আপনি মৃত্যুচেতনা খুঁজে
পাবেন না
। এক
আশ্চর্য বাঁচার ইচ্ছা
এবং প্রেরণা
আপনাকে অনুপ্রাণিত
করবে ।”
তারপরও একটা আক্ষেপ
টের পাই
বই- কি!
যখন কবি
বলেন –
“শৈশবের ঘুড়িগুলি কাটা
পড়ছে
ভুল বাতাসের অনুসরণে
বাড়িতে লাটাই ও
ঘুড়ির জন্য
আমাকে মারছিলো আমার পিতা
মারধোর, পরিত্রাহি চিৎকারে
কালাকুত্তা পালিয়ে যাচ্ছে !
অজানা আশঙ্কায় নীলাকাশে
আর কোন ঘুড়ি নেই
পিতারও কোন মারধোর নেই
কৈশোর থেকে যৌবনের দুয়ারে
আমি ভেসে বেড়াচ্ছি –
কাটা ঘুড়ির মতো
আর যে যায় সে তো যাবেই!” (অনন্ত যাত্রা- ১৭)
কিংবা
“ অনন্ত যাত্রার অপরাহ্নে
আমি ভুল জায়গায় নেমে পড়ি
রাস্তা দিয়ে কালো বেড়াল পার হচ্ছে
আমি হাঁটতে থাকি অজানার দিকে
.........
বনানী ভেদ করে তীব্র বাতাসের ধ্বনি
আর প্রেমিকার ঠোঁট ফুলে ফুলে ওঠে
টগর ফুল গাছ থেকে –
কান্নায় জল ঝরছে
কেউ চিৎকার করে বলে –
যে যায় সে তো যাবেই,
অনন্তযাত্রায় পথে সে একাকী!”
(অনন্ত যাত্রা- ২৯)
অথবা
“ সমস্ত কিছু ছুঁয়ে দেখছি
চক্ষু, হৃদয়, লিঙ্গ ও মস্তিষ্ক
শুধু ছুঁতে পারি না নিজের আত্মাকে
অনন্ত যাত্রার পথে সে ঘুমিয়ে আছে ।
...
হে আত্মা হে দয়াময় হৃদয়ের অণু পরমাণুতে –
তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস ছড়িয়ে দাও
যেন আমি ছুঁতে পারি সকলের আত্মা!”
” (অনন্ত যাত্রা- ৩০)
‘অনন্ত যাত্রা’-র এইসব কবিতার ছত্রে ছত্রে
কোথাও-না-কোথাও যেন কবির একটা দীর্ঘশ্বাস
নীরবে বহমান । এরপর প্রকাশিত “শান্ট
সঙ্গীত” কাব্যের ‘অপেক্ষা’ কবিতায় কবি তাই লিখলেন –
“ সমস্ত কথা কি বলতে পারি
কত
কিছুই গোপনে বাড়ে
শব্দ চূর্ণ গায়ে মাখছি
সমস্ত কথার ভেতর
আর অপেক্ষা করি তার জন্য
নিজস্ব ভালবাসায় আবারো তার
কথা ভাবি” (অপেক্ষা)
আবার
“শান্ট সঙ্গীত” কাব্যের পর “
পর্দার ভেতরে” কাব্যে কবি লিখছেন –
“নিজেকে লুকিয়ে রাখার ছল করি
পাতার আড়ালে গুহার কন্দরে
.........
লুকিয়ে রাখার ছল করতে গিয়ে
আমার ব্যক্তিগত দিনগুলি টুপটাপ ঝরছে
কিশোরীদের ফর্সা হাতে।
আর আধুনিক কবিতার অন্তরায় নিজেকে
লুকিয়ে রাখার ছল করি ।” ( ফর্সা হাত)
এই কবির কবিতাকে তাঁর জীবন-যাপনের চর্চা থেকে
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তোলে আনতে হবে । কেননা, এই কবি তাঁর অনেক কথাই ছলের আড়ালে আড়ালে
বলে গেছেন বলেই আমার ধারণা । “শান্ট সঙ্গীত” কাব্যের “শান্ট” নামটাও আসলে একটা
মেডিকেল টার্ম ।
আমরা জানি, কবির প্রেম, বৈবাহিক জীবন, বিবাহবিচ্ছেদ, এইসব নানা কারণেই
বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল । বিশেষ করে প্রেমিকা এবং পরবর্তীতে শ্রী গীতশ্রী-র অবহেলা
তাঁকে সবচেয়ে বেশি মর্মাহিত করেছিল । গীতশ্রী
ছিলেন ‘কলকাতা এস এস ক্যাম্প’ হাসপাতালের নার্স । দীপঙ্কর সাহার বাবাকে
সেখানে সম্ভবত ১৯৮৭ সালে কোনো একটা অসুস্থতার কারণে ভর্তি করা হয়েছিল । ঐ-সময়ের
তাদের পরিচয় এবং ক্রমে ১৯৮৮ সালের দিকে তাদের প্রেম, বিবাহের দিকে গড়ায় । দীপঙ্কর
সাহা তখন ‘ইভেনিং ব্রিফ’ নামে একটি পত্রিকায় কাজ নেন । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের বিবাহিত জীবন সুখের
হয়নি । দাম্পত্য কলহের মূল বিষয় ছিল মূলত অর্থনৈতিক । এবং ১৯৮৯ সাল থেকেই তাঁর মাথা ব্যথা উপসর্গটা শুরু
হয় । এর মধ্যে রাতের কাজ । মাথায় নিতে হত প্রচুর চাপ । সব মিলিয়ে একটা বিপর্যস্ত অবস্থা
। এবং এরপরই চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভেলোরে ধরা পড়ে ব্রেন টিউমার । ততদিনে স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের আরও
অবনতি ঘটে । ততদিনে দীপঙ্কর সাহা চলে আসেন আগরতলা । এরপর আবার ভেলোরে গিয়ে অস্ত্রপ্রচার করে টিউমার কেটে বাদ দেওয়া হল । কিন্তু এতে নার্ভের
একটা বিরাট অংশ ডেমেজ হয়ে পড়ে। এই কারণে মাথা থেকে শুরু করে পিটিউটারি গ্ল্যান্ড
থেকে শুরু করে কিডনি পর্যন্ত একটা আলাদা চ্যানেল করতে হল। এর ডাক্তারি পরিভাষা হল
নাম-- “শান্ট”। এরপরই তিনি তাঁর পরবর্তী
বইয়ের নাম রাখেন - “শান্ট সঙ্গীত” ।
এরপর আগরতলায় থাকাকালীন কালুমামার আড্ডাতেই
নিয়মিত যেতেন, মানিকদা, সাত্ত্বিকদাসহ আড্ডা হত । ১৯৯১ সালের দিকে দীপঙ্কর সাহার
শরীর আরও খারাপ হতে থাকে । তখন সাত্ত্বিকদা একটা নাটক করেন রবীন্দ্র ভবনে । সেটা
দেখতে আসেন সোনালী এবং দেবাশিসের কাঁধে ভর করে এসে সেই নাটক দেখে যান । এটাই ছিল
তাঁর আগতলায় শেষ বের হওয়া । এর কিছুদিন পরই তিনি শয্যাশায়ি হয়ে পড়েন। তবে এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য, স্ত্রী
গীতশ্রী শেষ সময় এসে যাতে দীপঙ্করকে দেখে যায়, মানবিক এই দাবি নিয়ে মানিকদা এবং সাত্ত্বিক নন্দী গিয়েছিলেন গীতশ্রীর
কাছে । খুব অনুরোধ করলেন পিজি হোস্টেলে
গিয়ে । কিন্তু কিছুতেই তিনি সাড়া দেননি। এই বিষয়টা দীপঙ্কর সাহাকে খুব আহত
করেছিল । এককথায়, এই প্রেম এবং বিবাহ তাঁকে ভিতরে ভিতরে ভেঙে দিয়েছিল । মাঝে মধ্যে
এই নিয়ে আফসোস করে বন্ধুদের বলতেন – “গীতশ্রী আজ যদি পাশে থাকত !”
যদিও এই বিষয়টা তার কবিতায় কোনো প্রভাব
ফেলেনি । এটা কোনো সময়ই তাঁর কবিতার বিষয় হয়নি। তিনিও তাঁকে বিষয় করতে
চাননি । তারপরও বলতে হয়, কবির জীবনের এই সবকিছু
যাচাই করে করে কবির কবিতার আরও গভীরে যেতে হবে আমাদের। নাহলে নিছক কবিতার লাইন
থেকে আট কতটুকু পাওয়া যাবে কবি, যদি সেই কবি হয়ে থাকেন স্বাধীন, বোহিমিয়ান এবং জেনে ফেলেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার ছল । সে
ক্ষেত্রে তাঁকে আবিষ্কার করতে হবে আরও সযত্নে
। হয়ত আগামীতে সে চেষ্টা জারি থাকবে অনুসন্ধানী কোনো পাঠকের তরফ থেকে ।
