‘মুখাবয়ব’ ও ত্রিপুরার গল্প নিয়ে একটি পাঠক প্রতিক্রিয়া ঃ তমালশেখর
দে
গদ্যের মুখ ও মুখোশ
কখনও প্রতিস্থানান্তরিত কখনও প্রমত্ত, কখনও নিভৃত । এত তার ভঙ্গি, এত তার
মুখ-দশাননও যেন নিষ্প্রভ তার অনেক সত্তায় । বহুতার মাঝখানেই সাহিত্যের প্রাণ,
প্রাণের যুক্তি । এই স্পন্দন লেগে থাক মুখাবয়বে । মুখাবয়ব হতে পারে লেখক পাঠকের
সেতুবন্ধ ।’ – অনেকটা এভাবেই সম্পাদক দেবব্রত দেন ‘মুখাবয়বকে উপস্থাপিত করেন পাঠক
দরবারে । মুখ দ্বিজ হয় মুখাবয়বে।
বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে নিছক সাহিত্য-বোধকে
কীভাবে একটা আন্দোলনের স্তরে নিয়ে যাওয়া যায় দেবব্রত দেবের ‘মুখাবয়ব’ তার একটা
উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সদ্য ‘মুখাবয়ব’ তার ২৫-তম
বার্ষিক সংখ্যা অতিক্রম করবে । সম্পাদকের গর্বের সাথে এখানে আমরাও গর্বিত । পদ্যের
তুলনায় গদ্য-সাহিত্য সম্পাদকের পক্ষে তা এক শ্রমশীল ইতিহাস । তাও ত্রিপুরার মত
প্রান্তিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছরে পা দিল। প্রথম সংখ্যা
বেরিয়েছিল১৯৮৪ সালে। এত বছর ধারাবাহিকভাবে গদ্যের গুণগত মেজাজ ধরে রাখা সহজ কথা নয়
। অথচ অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে অতিক্রম করে এমন এলেন দেবব্রত দেব ।
মূলত ছোটো গল্পকে
ভিত্তি করে দেবব্রত দেব তার ‘মুখাবয়ব’-এর
পরিকল্পনা শুরু করেন। এখন পর্যন্ত অনুবাদসহ প্রায় চারশোর মতো গল্প, তিনটি উপন্যাস
তিরিশটির মতো প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, গ্রন্থবীক্ষন চিঠিপত্র দিয়ে সম্পাদক তার সাধের
পত্রিকাটি সাজিয়ে আসছেন এতদিন ধরে । নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে তা এক বিশাল সংযোজন
।
ত্রিপুরার
সাহিত্যের ক্ষেত্রে তো তা প্রশ্নাতীতভাবে প্রসারিত ও প্রবাহিত। সবচেয়ে বড় কথা,
গদ্য চর্চার এই
জায়গাটাকে উন্নত রুচিবোধের রেশ এত দিন থেকে বজায় রাখতে পারা। সম্পাদক হিসাবে,
এই ক্ষেত্রে
অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলেন। জীবন- সাহিত্য-অর্থনীতি- এই তিন মৈত্রীর টানা পোড়নে
কোথাও বা যান্ত্রিক হয়ে পড়তে বাধ্য হন। তখন হয়ত নিয়ম মেনে একটা কাগজ বের হয়,
কিন্তু তাতে
প্রকৃত সম্পাদকের সে মেজাজ, অনুসন্ধানের সে-তীব্রতা পাওয়া যায় না। এতে অনেক সময়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে
পাঠক মন। দেবব্রত দেব ত্রিপুরার গদ্য সাহিত্যের একমাত্র ভরসাকে কখনই সে-রকম
পর্যায়ে পৌঁছবার সুযোগ দেননি। পঁচিশ বছর পরও প্রথম সংখ্যার মত প্রকাশ ও
অনুসন্ধানের ক্ষুধা, তার
মননে বর্তমান। তিনি খুব পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে এই পর্যন্ত পরিকাঠামো গড়ে তুলেছেন
বলেই আমার ধারনা।
‘মুখাবয়ব’-এর
১ম সংখ্যা থেকে ২৫তম সংখ্যা পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়
ত্রিপুরা থেকে যাত্রা শুরু করে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পাঞ্জাব এমন
কি বাংলাদেশ পর্যন্ত একটা রূপরেখা টেনে ধরতে সফল হয়েছেন সম্পাদক দেবব্রত দেব । অসমীয়া ও পাঞ্জাব
নিয়ে ‘বিশেষ সংখ্যা’
অনুবাদ-সাহিত্যে তাদের সেরা উপহার। এবং মুখবন্ধের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অস্থায়ী
সময়ে বছরে অত্যন্ত একটি সংখ্যা অনুবাদ-সাহিত্য সম্পদ নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকবে। এ-পর্যন্ত
৩টি অন্যধারার উপন্যাস প্রকাশ করার ঝুঁকি নিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদক । তার মধ্যে একটি
অনুবাদ উপন্যাস।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম-শতবার্ষিকীতে তাঁর বিভিন্ন দিক নিয়ে ২০টির মতো
প্রবন্ধ-আলোচনা সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে। যা ‘মুখাবয়ব’- এর কাল-পর্বে বড় একটি
উপলব্ধির মধ্যে একটি।
গদ্য
সাহিত্যের তুলনায় বিশ্ব সাহিত্যে ছোটোগল্পের আবির্ভাব অনেকটা আধুনিক ঘটনা বলা যায়।
নিখুঁত তর্ক-বিতর্ক বাদ দিয়ে বলা যায়, উনিশ শতকেই তার সযত্ব প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা। আর বাংলা সাহিত্যের বেলায়
বলা যায় ১২৮৪ সালের শ্রাবণ-ভাদ্র মাসের 'ভারতী' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভিখারিনী' প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তার যাত্রা শুরু।
একে একে সাপ্তাহিক 'হিতবাদী
সাধনা' 'সবুজ
পত্র 'ভারতী' এর জীবন এ প্রকাশিত হতে থাকে। তবে এই
ছোট গল্পের প্রেক্ষাপট ঠাকুর বাড়ীতে গুনগুন করছিল বেশ কিছুদিন থেকেই। যেহেতু
রাশিয়া, আমেরিকা,
ফ্রান্স ও
ইংল্যান্ডে তা আগে থেকেই প্রকাশিত হয়ে পাঠক মহলের প্রশংসা কুঁড়িয়ে নিচ্ছিল। আর তার
সুবাদেই ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায় সুপণ্ডিত জ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুরের নজরে পড়েছিল নতুন
এই গল্প-কাঠামোটা। তিনি তাঁর স্বভাব অনুযায়ী একাধিক গল্প অনুবাদ করে তৎকালীন পত্রিকায় প্রকাশ করেন। 'সাহিত্য' পত্রিকায় তা নিয়ে আলোচনাও হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বলেন্দ্র নাথ ঠাকুরের কাছে বাংলা ছোট গল্প লিখতে আছেন তখন
মোটামুটি বিশ্ব সাহিত্যে ছোটোগল্পের একটা রূপরেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবতঃ সেই
সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার মৌলিক প্রতিভা বলে,
ছোট গল্পকে
বাংলাদেশের আবহাওয়ার পরিমণ্ডলে, প্লট ও প্রাণের সাথে মিশিয়ে আর এক জীবন্ত রূপে মহিমান্বিত করে তুলে
ছিলেন, আর এখানেই তিনি
পিতার ভূমিকা নিয়ে নেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প-রচনার কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়
প্রথম দিকের ১২৯৮ থেকে ১৩০২ সালের মধ্যে লেখা প্রায় চুয়াল্লিশটি গল্প শিলাইদহে
জমিদারী পরিচালনার ফাঁকে ফাঁকে লিখেছিলেন। এজন্যই হয়ত প্রথম দিকের গল্পগুলিতে
গ্রামীণ জীবনের এত প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।। তাদের হতাশা, দারিদ্রতা, সম্পর্কের টানা পোড়েন সবই মিলে মিশে
একাকার হয়ে উঠেছিল তার গল্পে। পরে অবশ্য তিনি নাগরিক বিষয় নির্বাচন করেছিলেন।
সেখানেও বিভিন্ন ভাবে গল্প নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। কখনও চরিত্রকে
প্রাধান্য দিয়ে, কোথাও
বা গল্পের জন্য ভালো গল্প বলার প্রয়াস করেছেন। কোথাও বা নায়ককে দিয়ে নিজেই নিজের
কথা বলিয়েছেন। আবার কখনও বা লেখক স্বয়ং একটু এগিয়ে দেওয়ার পর কাহিনির সুতো ছেড়ে
দিয়েছেন অন্যান্য চরিত্রের হাতে। স্ত্রীর পত্র গল্পে এনেছেন অভিনব এক অন্তরঙ্গতার
ছোঁয়া।
এক
কথায় বাংলা সাহিত্য পেল বিন্দুতে সিন্দুর স্বাদ। রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী কাব্যের
বর্ষা যাপন কবিতার অংশ নিয়ে অনেক সময় বলা হয়
ছোটো
প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোটো ছোটো দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র
বিস্মৃত রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাস
তারি দু-চারটি অশ্রু নন
নাহি
বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘন ঘটা
নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ।।
কিন্তু
সত্যিই কি তাই ? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গল্পে
রয়েছে- মনস্তত্ত্বের তীব্র ব্যবহার মন ও বুদ্ধির মধ্যেকার দহন-জ্বালা, সমাজ ও ব্যক্তি সম্পর্কের টানাপোড়েন,
প্রকৃতি ও
মানুষের নিবিড়তার অনুসন্ধান, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটের উম্মোচন, স্বদেশ রাজনীতি ভাবনা, নারী চরিত্রের জটিল বিশ্লেষণ, গ্রাম ও শহরের মনস্তাত্ত্বিক টানাটানি।
তাহলে,
ছোটো ছোটো কথা,
ব্যথার প্রসঙ্গ বার বার আসে কেন ? সে
কী গল্পের একমুখী টান প্রবণতাকে স্পষ্ট করার জন্য? এখানে একমুখীনতাকেই এত জোর দেওয়া হয়
কেন ? এটা কি কোন শর্ত ? আমার মনে হয়, মোটেই তা নয়। বরং আমার মনে হয়, এটা ছোটো
গল্পের লেখকদের প্রতি একটা সতর্কবার্তা।
যাতে তারা গল্পে বহুমুখী ইঙ্গিতকে ব্যবহার করতে গিয়ে খেই-না হারিয়ে বসেন। যেহেতু
এখানে পরিসরটা ছোটো গল্পের আদর্শ অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষ। আপনি দুশো পৃষ্ঠার একটা কাহিনি
লিখে দাবী করতে পারেন না যে, ছোটো গল্প লিখেছি। তাই একমুখী নীতি নেওয়াটা সুবিধাজনক। কিন্তু
নিতান্ত সহজ সরলের এই প্রশ্নটা যখন আসে, তখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন- “ শ্রমজীবী মানুষদের একটি সমস্যা ধরতে
গেলে হাজারটা বিষয় এসে পড়ে, রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতার
নানান সমস্যা যা একটা থেকে অন্যটা বিচ্ছিন্ন নয়। সমাজের প্রবল ভাঙচুর, সমাজ ব্যবস্থায় নতুন নতুন শক্তি ও
উপাদানের সংযোগে মানুষের ভিতরে গভীরে রদবদল হতে থাকে, ফলে ছোটো গল্পের শরীরেও পরিবর্তন ঘটতে
বাধ্য। ছোটো প্রাণ ছোটো কথা, ছোটো দুঃখ বলে কিছু নেই। তার মধ্যে জড়িয়ে আছে হাজার জটিল সমস্যা।
কুটিল উৎস।" সময়ের সাথে সাথে চিন্তার এ-পরিবর্তন স্বাভাবিকতারই দাবী। একেই
হয়ত উত্তরণ বলবো। তার গল্পে তা দেখতেও পাই। কিন্তু সেখানেও তিনি বিষয়ের একমুখীনতা
ও পরিসর এ-দুটিকে অস্বীকার করতে পারেন নি। কেন না, উপন্যাসের সাথে ছোটো গল্পের এখানেই মৌলিক
পার্থক্য। না-হলে একটা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপকেও তো ছোটো গল্প বলা যেতো। তাদের
লক্ষ্য ভিন্ন, তাই
তারা ভিন্ন। যেমন আকার, তেমনি প্রকরণে।
উপরোক্ত
আলোচনার নিরিখে এখন যদি ত্রিপুরার গল্প পটভূমির দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই ত্রিপুরার প্রথম গল্প অজিত বন্ধু দেববর্মার ‘দায়মুক্ত’
১৯৩০ সালে। আজ থেকে প্রায় উনআশি বছর আগে। এরপর পাই ১৯৩৪ সালে সতীশ দেববর্মার ‘কেরানীর
অপরাধ’ গল্প । এরপর ১৯৮৫ সাল দেখা যায় সুখময় ঘোষ ও বিকচ
চৌধুরীর সম্পাদিত পাঁচ দশকের গল্প সংকলন। ত্রিপুরার গল্প ইতিহাসকে মোটামুটি চারটি
পর্যায়ে ভাগ করা যায়। চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশকের শেষ অব্দি, প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় পর্যায় ধরা যায়
সত্তর দশক। তৃতীয় পর্যায় আশি ও নব্বই। এবং এর পরবর্তীকে চতুর্থ পর্দায়। দ্বিতীয়
এবং তৃতীয় দশক-টাই আমাদের কাছে বেশি উল্লেখ যোগ্য বিবেচিত হবে। তার কারণ এই দুই
পর্যায়ই কিন্তু বর্তমান ভিত তৈরী করতে পারা, না-পারার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে
নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। কেননা, প্রবীণ গল্পকারদের চ্যালেঞ্জ করে একদিন তারা তাদের তরুণ কাঁধে কলম
নিয়েছিলেন এবং প্রায় তিন দশক ধরে ভিত তৈরীর ক্ষেত্রে বলিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিলেন।
“বিংশ শতকে ত্রিপুরার শ্রেষ্ঠ বাংলা
গল্প” সংকলনের সম্পাদক গল্পকার দুলাল ঘোষ তার
মুখবন্ধে এভাবে ধরা দিয়েছেন- "ত্রিপুরার বাংলা গল্প চর্চার দ্বিতীয় পর্যায়
বলতে সত্তর দশককেই বোঝায়। সত্তর দশক সংকল্পের দশক। এই প্রথম ত্রিপুরার গল্পকারদের
মধ্যে বাংলা সাহিত্যে কিছু না কিছু কন্ট্রিবিউট করার সংকল্প নিয়ে কাজ করতে দেখা
যায়। শুধুই শরণার্থীদের স্মৃতি বিজড়িত গল্প নয়, ত্রিপুরার জল হাওয়া মাটিতে মিশে তখনকার
বাস্তবতা নিয়ে, আদিবাসীদের
জীবন সংগ্রাম নিয়ে গল্প লেখা হতে থাকে। অর্থাৎ বায়বীয় নয়, মাটির সঙ্গে সম্বন্ধ টের পাওয়া যায়
তখনকার গল্পে। তাদের কমিটমেন্ট আরো স্পষ্ট হয় -- যখন দেখা যায় বহু ব্যবহারে
দ্যুতিহীন প্রথাসিদ্ধ বাংলা গল্পে প্রকরণগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন সে সময়ের
লেখকেরা; একঘেয়েমি
থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন পাঠকদের এবং অতি অবশ্যই নিজেদের মত করে-- অন্য
কারো পথ অনুসরণ করে নয়। যার ফলে ত্রিপুরার বাংলা গল্প ক্রমশই নূতন ধারার গল্প
হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সক্ষম হয় । তখনকার
গল্পগুলিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ত্রিপুরার ভূমিকা যথেষ্ট জায়গা জুড়ে
ছিল। তাছাড়া ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, রাজন্য ভাতা বিলোপ জরুরী অবস্থা, নকশাল আন্দোলনে ঢেউ, হাংরি জেনারেশনের প্রভাব সবই তৎকালীন
ত্রিপুরার বাংলা গল্পে লক্ষ্য করা যায় ।
তারপর
আশি ও নব্বই-এর দশক ত্রিপুরার বাংলা গল্প চর্চার তৃতীয় পর্যায়; এ পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ও বটে।
নদী যখন সাগরে এসে পড়ে, তখন সিদ্ধিলাভের মুহূর্ত, ত্রিপুরার বাংলা গল্পের আলোচনা বেরোতে শুরু করেছে বাংলাদেশের পত্র
পত্রিকায়, পশ্চিমবঙ্গে
উত্তরবঙ্গে, এবং
উত্তর পূর্বাঞ্চলের সর্বত্র, ঠিক তখনই এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হল আমাদের, যেন মানবতার মাতৃরূপই শুধু এতদিন দেখে
এসেছি, তার
ছিন্নমস্তারূপটি না-দেখলে অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ হবে না। ৬ জুন ১৯৮০, ত্রিপুরার যে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়ে গেল
আদিবাসী আর সমতলীদের মধ্যে
মান্দাই
হত্যাকাণ্ড, ইতিহাসের
এই কলঙ্কময় ইতিহাসের সাক্ষী ত্রিপুরার গল্পকাররাও। ফলে সত্তরের প্রথা প্রকরণগত
সংস্কারের শেষে বিপ্লব ঘটে গেল বিষয় নির্বাচনে। মানবতা মনুষ্যত্ব যখন প্রশ্নের
সম্মুখীন, মতাদর্শগত
শিক্ষা কোন কাজেই লাগল না। আত্ম-সমীক্ষা চলল মুখে কুলুপ এঁটে। তারো আগে থেকেই
পৃথিবী জুড়ে খোলা হাওয়া বাজার অর্থনীতির ঢেউ আছড়ে পড়ছে আমাদের এখানেও। আঞ্চলিকতা
বিচ্ছিন্নতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। মুল্যবোধ পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। কেবলমাত্র সরকারি
বেসরকারি চাকুরী বা ব্যবসা নয়, এখন উগ্রপন্থাই অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে সহজ পথ। এবং মধ্যযুগের মত
আজকের রাজনীতিতেও ধর্মের ছায়ায় কলুষিত গণতন্ত্র। এতসব বিষয় বৈপরীত্যই আশি ও নব্বই-এর
দশকে ত্রিপুরার বাংলা গল্পে স্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয়।
দুলাল
ঘোষের দীর্ঘ এই প্রেরণা ও প্রেক্ষিত মুখবন্ধে দেখতে পাই, এই তিন দশকের লেখকেরা অফুরন্ত
বিষয়বস্তুর মুখোমুখী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আজকের তুলনায় গল্পের বিষয় হিসেবে কি-না
ছিল তাদের পরিমন্ডলে। কিন্তু তারা কতটা সফলতার সাথে যে সময়কে গোটা বাংলা সাহিত্যের
নিরিখে কাজে লাগতে পেরেছিলেন ? দুলাল ঘোষের আলোচনায় চারটি বিষয় উঠে এসেছিল-- (১) ত্রিপুরার বাংলা গল্প ক্রমশই নূতন ধারার
গল্প হিসেবে (২) স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। (৩) সত্তরের প্রথা প্রকরণ গত
সংস্কারের শেষে (৪) বিপ্লব ঘটে গেল বিষয় নির্বাচনে।
এখানে
আত্ম-প্রশংসা যতটা ত্রিপুরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, ততটা বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলক নিরিখে
প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি দুলাল ঘোষ। নদীর লক্ষ্যের মত
বাংলা সাহিত্যের সাগরই তো আমাদের চরমতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। চুড়ান্ত চ্যালেঞ্জটা তো সেখানেই। আমার মনে
হয়েছে, সেই চ্যালেঞ্জে
এখনও সবক্ষেত্রে আমরা উৎকৃষ্টের মত উতরে যেতে পারিনি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুলনায় যত সফল হতে
পেরেছি। এই না-পারার অনুসন্ধানটা হবে হয়ত আমাদের আত্মানুসন্ধান। সবচেয়ে বড় যে
বিষয়টা আমার কাছে লেগেছে, সেটা হল, লেখার গুণগতমানের ধারাবাহিকতা সবসময় বজায় রাখতে না-পারা। ত্রিপুরার প্রায়
আশি বছরের গল্প ইতিহাসে গল্পকারদের বিশ্লেষণ করলে, দেখা যায়, অসাধারণ কয়েকটা গল্প লেখার পর, আরও বহুদিন সে মান অনুযায়ী গল্প লিখতে
না-পারা। না-হলে বাংলা সাহিতো প্রতিনিধিত্ব করার মত গল্প যে লেখা হয়নি, তাতো নয়। অনেক গল্পই গর্ব করার মত। এবং
বাংলা সাহিত্যেও তা সম্পদ হয়ে থাকবে। তবু সার্বিক অর্থে ধরতে গেলে যে দুর্বলতাগুলি
অন্ততঃ অনুভবে ধরা পড়েছে, আমার কাছে তা অনেকটাই এইরকম -
(১)
বাক্য গঠনের স্বাভাবিকতায় বার বার আটকে যাওয়া।
(২)
দাড়ি, কমা, যতি-ব্যবহারের দৈন্যতায় পাঠককে পরিশ্রান্ত
করে তোলা।
(৩)
সরল শব্দ ও সরল বাক্যে নিজের মনোভাবকে পেশ করে সহজ প্রত্যয় দিতে না- পারা।
(৪)
শব্দের অর্থাভাসকে সম্পূর্ণ গল্পে সমান তালে ব্যবহার করতে না-পারা।
(৫)
বাক্যগুলিকে নিছক ছেদ চিহ্নিত করা ছাড়াও তাকে বিচিত্র আয়তনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ধ্বনি
মাধুর্য দিতে না-পারা।
(৬)
ভাষা প্রায়ই বক্তব্যকে অতিক্রম করে যায়,
তাকে নিয়ন্ত্রণ
করতে না-পারা।
(৭)
কোমল বিশ্বাসের সঙ্গে সহজযুক্তির মিশ্রণ করতে না-পারা।
(৮)
ক্রিয়া পদের আধিক্যকে শক্ত হাতে বর্জন করতে না-পারা।
(৯)
কল্পনায় বৈচিত্র্য আনতে না-পারা।
(১০)
চরিত্র নির্মাণে বার বার নতুনত্ব আনতে না-পারা।
(১১)
সর্বোপরি, ঘটনা,
চরিত্র, পরিবেশ পরস্পরকে মার্জিত এবং নিখুঁতভাবে
পর্যবেক্ষণ করতে না-পারা।
আমার
সীমিত পাঠ অভিজ্ঞতায় এইটুকু পর্যন্ত বলতে পারি। যেহেতু আমি গবেষক নই। পাঠ
প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করছি কেবলমাত্র।
তবে
আমাদের না-পাওয়ার ইতিহাসের সাথে সাথে প্রাপ্তি আলোচনাটাও জরুরী। বিগত প্রায় আশি
বছরে আমাদের প্রাপ্তির তালিকাও সম্পদময়। আমরা যাদের
স্মরণীয় প্রতিভায় আলোকিত হতে পেরেছি। তাদের মধ্যে অন্যতম বিমল চৌধুরী। ত্রিপুরার
প্রাণ গায়ে জড়িয়ে “জাগরণ” গল্পের মাধ্যমে । ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত এই গল্পের উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের একটা অহংকারের জায়গা
তৈরি করে দেয়। তার বিষয় নির্বাচন জীবনের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখার দক্ষতা আজকের তরুণদের
কাছেও ঈর্ষনীয়। ত্রিপুরার গল্প সাহিত্যে দীর্ঘ একটা সময় তার লেখালেখি নবাগত
তরুণদের গল্প-সাহিত্যে সম্পর্কে উৎসাহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল এবং এখনও যেমন
রোমান্টিকতায়, তেমনি
পূর্ববঙ্গের দাঙ্গা বিধ্বস্তদের নিয়ে তার হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনায় তরুণ পাঠক মুগ্ধ। ‘অনুভব ও হিজল ফলের কান্না’ ‘তোরে নাহি
করি ভয়’ তার
উল্লেখযোগ্য গল্পটার সুখময় ঘোষের কথা বলা যায় এর পরবর্তীতেই, তার গল্প সংকলন দুটি 'সিনিমাইয়া' এবং ‘সুরেন মহাজনের নৌকাযাত্রা'। তার অসাধারণ
টেকনিকের উপস্থাপনা দেখি- 'দু-টাকার
একটি সন্ধ্যায়’। ত্রিপুরার গল্প সাহিত্যে ভীষ্মদেব ভট্টাচার্যকে
ত্রিপুরার এক স্তম্ভ বলা যায়। তার রচনা শৈলী,
বাক্যের
ত্বরান্বিত, গতি
আজও ভাল-লাগা মনকে তাড়িত করে। পাঠক মনকে এখনও টেনে নিয়ে যায়, তার গল্প চরিত্রের সাথে সাথে। এখানেই
তো একজন গল্পকারের প্রথম সফলতা। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'বুড়া দেবতার মাচাং' প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সাল। ১৯৮৩ সাল
প্রকাশিত হয় 'সমিধ'। গল্পের বিষয়,
চরিত্রের সাবলীল
চলাফেরা, জীবনের
রন্ধ্রে রন্ধ্রে মানবতার খোঁজ পাওয়া যায়,
তার 'দরখাস্ত'
'বুড়া দেবার
মাচাং' 'বাম'
যুদ্ধ শুরুর
সঙ্কেত, মহাভারতের
কথা গল্পে।
এভাবে
প্রত্যেক গল্পকারের গল্প নিয়ে আলোচনা এ যাত্রার লক্ষ্য নয়।
আমি
শুধু ত্রিপুরার গল্প সাহিত্যের উজ্জ্বল দিকের সূচনার দিকটা ধরিয়ে দেবার চেষ্টা
করেছি। গল্পকার ভীষ্মদেব ভট্টাচার্যের সাথে সাথে যাদের নাম উল্লেখ করা যায়,
তারা হলেন বিমল
সিংহ, ঋতেন চক্রবর্তী,
কল্যাণব্রত চক্রবর্তী,
মানস দেববর্মন,
মানিক চক্রবর্তী,
অরুণোদয় সাহা,
সুশীল দে,
সুজয় রায়। সত্তর
দশকে যাদের আগমন ত্রিপুরার গল্প সাহিত্যকে চরম মাত্রায় নিয়ে যায়। তারা হলেন।
দুলাল ঘোষ, অনুপ
ভট্টাচার্য, দীপক
দেব, কিশোররঞ্জন দে,
দেবব্রত দেব,
শ্যামল
চক্রবর্তী, সদানন্দ
সিংহ, অসিত দত্ত, সমরজিৎ সিংহ, সন্তোষ রায়, মীনাক্ষী সেন, দীপঙ্কর গুপ্ত, শুভাশিস তলাপাত্র, নন্দকুমার দেববর্মা, হরিভূষণ পাল। এর পরবর্তী আজ
পর্যন্ত বলা যায় জয়া গোয়ালা, শ্যামল বর্মন, পারিজাত দত্ত, অশোক দেব, নারায়ণ চক্রবর্তী, শ্যামাপদ চক্রবর্তী, জয়া বর্ধন, সুমন ভট্টাচার্য শঙ্খশুভ্র দেববর্মন, সত্যজিত দত্ত, পৃথ্বিশ দত্ত, নির্মল দত্ত, পদ্মশ্রী মজুমদার, এবং আরো দু'তিন জনের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে
পারছি না। তাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে এই সময়ে এবং খুব উজ্জ্বল গল্প উপহার
এবং তীব্র চর্চা করে যারা চলেছেন- দেবব্রত দেব, হরিভূষণ পাল, সত্যজিৎ দত্ত, জয়া গোয়ালা, শঙ্খশুভ্র দেববর্মন, পৃথ্বিশ দত্ত, মীনাক্ষী সেন, সমরজিৎ সিংহ, শ্যামল চক্রবর্তী এবং কিশোররঞ্জন দে।
উপরোক্ত
লেখক সূচী ত্রিপুরার খুব ছোট পাহাড়ী রাজ্যের গৌরবময় দিকটাই তুলে ধরে। তাই আজ
আমাদের না-পাওয়া তুলনায় পাওয়া যে অনেক অনেক বেশি, তা প্রমাণ করার বোধ করি আর অপেক্ষা
রাখে না। তবু আত্ম তৃপ্তিতে তুষ্ট হয়ে নিজের পিঠে নিজে বাহাবা দিতে আমি অন্তত রাজি
নই। পাঠক হিসেবে আমার আরো চাই, আরো। উপনিষদ এর মন্ত্রের মত ভূমৈব সুখং নারে সুখমস্তি- অল্প নহে,
আমার সবই
চাই।"
(মুখাবয়ব
– ৩০ তম সংখ্যা, প্রকাশ কাল – ১৫/০২ / ২০১০ সাল )
(২৪ বছর আগের এই লেখা
আজ খুঁজে পেয়ে পড়লাম আজকের অভিজ্ঞতায়। পড়ে নিজেই লজ্জিত। ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সবার সব
গল্প পড়া কি সম্ভব ? না- পড়া সম্ভব । আমার পক্ষে তো নাই । )
No comments:
Post a Comment