Tuesday, October 1, 2024

“প্রতিবাদ যতদিন থাকবে ততদিন নাটক থাকবে”-- নির্দেশক- অভিনেতা- নাট্যকার মতিলাল দে

 






“প্রতিবাদ যতদিন থাকবে ততদিন নাটক থাকবে”

 বর্তমানে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঢপযাত্রা দেখে শৈশবে নিজের অজান্তেই মনের ভিতরে গড়ে উঠেছিল অভিনয়ের স্পৃহা । সেই স্পৃহা থেকেই জয় করলেন গ্রামীণ জীবনের যাত্রা থেকে নাটকের মঞ্চ । নির্দেশক- অভিনেতা- নাট্যকার মতিলাল দে-র সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।

 

প্রশ্ন ঃ প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাইব, নাট্য জগতে আসার উৎস-প্রেরণা কী ছিল আপনার ?

 

উত্তর ঃ ‘ নেশা লাগিলো রে’ – লালন ফকিরের এ-গানের মতো নেশা লাগল ঈশ্বরে নয় পালাগান ঢপ যাত্রায় । খুব ছোটবেলায় বাংলার বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোয় বইয়ের সময় কোনও কোনও বাড়িতে আসর বসত ঢপযাত্রা, কবিগান, রামায়ণ গান কিংবা যাত্রাগানের । এইসব আয়োজন বা রিহারসেল দেখে দেখে বড় হয়েছি । মনে মনে নিজের ভিতর অন্য এক অনুভব টের পেতাম, কল্পিত চরিত্র কিংবা ঘটনার প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ভাবতাম, হয়ত এইসব মননচর্চাই ছিল আমার নাটক পাগল হবার মূল কারণ । তখন মূলত সব মাধ্যমেরই কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ধর্ম । ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয় ।

আমি যে গ্রামে জন্ম নিই, সেই রাঘনা গ্রামে ছিল নিজস্ব যাত্রা দল । পুজো-পার্বণে, বিবাহবাসরে গান গেয়ে বেড়াত এই যাত্রাদল । স্কুল শেষে যাত্রাদলের পোশাকে সেজে মাঝে মাঝে তলোয়ার হাতে সংলাপ আওড়ে অভিনয় করতাম আপন মনে । এই প্রেম কেন জেগেছিল জানি না ।সংক্ষেপে এই হল আমার নাটকে আসার ইতিবৃত্ত । তবে অন্তর্লীন কামনা বাস্তব হল আরও বহুদিন পর । ঢপযাত্রা একসময় থেমে পড়ল । বহুবিদ কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হয়তো ছিল একসঙ্গে এত সুরেলা স্বর বা কণ্ঠ পাওয়া । কারণ ঢপযাত্রা ছিল গানের মাধ্যমে কাহিনির বিস্তার, যা সত্যি অর্থে ছিল কঠিন । এর পরিপ্রক্ষিতে ঝোঁক এল যাত্রার । এখানে সবার গান না-জানলেও হতো । তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে, দুর্গেশমামা নামে এক ব্যক্তি শুরু করলেন রাঘনার ছেলেমেয়েদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘ডাকঘর’। রাজা-রানি নেই, দেব-দেবীহীন টানা টানা স্বরের বিলম্বিত সংলাপবিহীন এক নতুন প্রবাহ। আমার মন-প্রাণ কাতর হল – ‘অম্ল’-এর নিঃসঙ্গতায় । এক অপার্থিব আবহে সকল চরিত্র আপন মা-বাবা, ভাই-বোন প্রতিবেশীর রূপ ধরে আমার সামনে এসে প্রতিভাত হল । আমি চমকিত হলাম আর নিজের অজান্তেই সাক্ষর করলাম আজীবন নাটকের দাসত্বে ।

 


প্রশ্ন ঃ অভিনয় থেকে নির্দেশনায়, নির্দেশক থেকে নাট্যকার – এই ভ্রমণের প্রেক্ষাভূমি নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

 উত্তর ঃ  অভিনয়ে আসার প্রেক্ষাভূমি নিয়ে তো আগেই বলেছি । প্রথম দিকে তো বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছি একের পর এক ।একটা সময়ের পর আমি নির্দেশকের নির্দেশনায় সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না । যাত্রার আবেগকে ছাড়িয়ে নাটকের ভিতর আমি স্বাভাবিকতার একটা আঁচ আনার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেই নির্দেশনার দিকে ঝুঁকলাম। প্রাথমিক নেশা যে কখন দায়িত্বে রূপ নিল বুঝতেই পারিনি । কলকাতার নাট্যকারের লেখা নাটক পরিচালনা করতে করতেই মনে হল, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের সময়-সমস্যার সঙ্গে আমাদের সময়-সমস্যার অনেক পার্থক্য । তাদের গণসংকট, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ত্রিপুরার সঙ্কট অনেকাংশেই ভিন্ন । তখনই আমি আমার সময়-সঙ্কটের সঙ্গে মিল রেখে নাটক লেখার চেষ্টা করলাম এবং সফল হলাম । নিজের চিন্তা-ভাবনায় আরও একটু জোর পেলাম । এভাবেই অভিনয় থেকে নির্দেশনা, নির্দেশনা থেকে নাট্যকার হয়ে ওঠা ।  

 প্রশ্ন ঃ আপনার সময় মানে, সত্তর-আশির দশকে নাটক নিয়ে প্রায় বিপ্লবীর মতো একটা বাউণ্ডুলেপনা লক্ষ্য করা যেত । যা আজ আর লক্ষ্য করা যায় না । এটা কি আপনাদের ব্যর্থতা ?

 উত্তর ঃ  ইতিহাসে একেকটা সময় এমন আসে যখন তুঙ্গে থাকে সকল স্তরের সৃষ্টিশীলতা । এরপর স্বাভাবিক নিয়মেই  ভাটা আসে । হয়তো এটা প্রকৃতির নিয়ম ।  তবে সকল নিম্নগামীতার একটা কারণ নিশ্চয়ই থাকে । নাটকে শুধু ত্রিপুরা নয়, ভারতের নানাপ্রান্তে উক্ত দশকের দিনগুলোতে একটা উন্মাদনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল । আমার ভাগ্য ভালো, আমি ওই-সময়ের সংগ্রামী প্রেক্ষাপটে নাটক পাগল একজন যুবক ছিলাম । কোনও পরিকাঠামো ছিল না, ছিল না অর্থনৈতিক  সামর্থ । তবু নাটক নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম । নিজের হাতে মঞ্চ বানিয়েছি, নাটকের পাত্র-পাত্রী খুঁজে বের করতাম, রিহারসেল দিতাম, নাটক করতাম । যতবার দল ভেঙেছে, ততবার দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন দল গড়েছি। কোথাও কোনও ক্লান্তি বা বিরক্তি আসেনি । সে এক অন্য সুখ, অন্য উন্মাদনা- উত্তেজনায় মেতেছিলাম সেসব দিনগুলিতে । নতুন নাটক, নতুন শৈলী, নতুন নাট্যকর্মী তৈরির আনন্দ । এখন ভাটির টান পড়েছে সর্বত্র, একথা অস্বীকার করার মতো কিছু নেই । এই সংকটের সময়টাকে নানান জনে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন । কেউ বলেন, প্রযুক্তির প্রভাব, কেউ বলেন, রাজনীতি-অর্থনৈতিক  অবস্থার জটিল অক্টোপাসের আগ্রাসন । এভাবে বহু ব্যাখ্যা হলেও এটা সত্য, হয়তো আমরা পারিনি আমাদের মতো উত্তরসূরি তৈরি করে যেতে । তবে সময় ঘুরবে । সমাজে শোষণ থাকলে নাটকও থাকবে । থাকতে বাধ্য । সংকটই নাটককে আবার তুলে আনবে নতুন করে, নতুন রূপে । নতুন ডাইমেনশনে ...





 প্রশ্ন ঃ  আপনার নাটক কি কখনও সে অর্থে মানুষ বা প্রশাসনের টনক নাড়াতে পেরেছিল ?

 উত্তর ঃ আমার কিছু নাটক দর্শকদের মন ছুঁতে পারলেও, অতিরিক্ত কিছু রাগ-অনুরাগীদের রাগের কারণ হয়ে উঠেছিল । বারবার চাকরির স্থান বদল হয়েছে । তবে নাটক থেকে সরাতে পারেনি ।

 প্রশ্ন ঃ আপনাদের সময়ের সংকটের সঙ্গে আজকের সময়ের সংকটকে আপনি কীভাবে নাটকে রূপান্তরিত হতে দেখেছেন ? আপনি কি আশাবাদী ?

 উত্তর ঃ অবশ্যই আশাবাদী । আসলে আমাদের সময়ের সঙ্গে আজকের সময়ের প্রযুক্তিগত পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে । সময়ের গতি, রীতিনীতি, যে শতগুণ এগিয়ে গেছে, এই সত্যকে জোর করে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আমাদের সময়ের তুলনায় এখন নাটকে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি । বিভিন্ন কারণে প্রেক্ষাপটও অনেক জটিল হয়ে পড়েছে । বাইরে কাজ হচ্ছে । এদিকেও হবে । আশাই জীবন । আমার কাছে আশাই নাটকের, জীবনের শেষ কথা ।

 




প্রশ্ন ঃ ‘ত্রিপুরার নাটক’ – এইরকম একটা উচ্চারণ বা নিজস্বতা কি কিছু থাকা উচিত, যা আপনারা তৈরি করতে পেরেছিলেন বা পারেননি ?

 উত্তর ঃ ত্রিপুরায় যখন নাটক শুরু হয় তখন ছিল কলকাতার নাটকের সক্ষম বা অক্ষম প্রকাশ বা উপস্থাপনা । প্রথম দিকে নিজস্বতার তেমন কোনও ছাপ রাখতে পারেনি বহুকাল । পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তু মানুষেরা যখন একটু গুছিয়ে বসলেন ত্রিপুরার মাটিতে, তখন তাদের চোখ গেল নন্দন শিল্পের দিকে । এখান-ওখান মিলিয়ে কিছু পাগলপারা মানুষ জুড়ে গেলেন নাটকের সঙ্গে, ত্রিপুরার সব জেলা-শহরে-গ্রামে  গড়ে উঠল নাট্যদল । অসংখ্য নাট্যকর্মী নাটকের জগতে পা রাখল । কিন্তু তখনও ত্রিপুরার নাটক বলতে ছিল নাটকের পীঠস্থান কলকাতার অনুকরণ-অনুসরণ । সত্তর দশকের মাঝামাঝি কিছু নাটকের মানুষ ভাবলেন—অনেক হল, এবার নাটকে কিছু নিজস্বতা আনার প্রয়োজন । এখন থেকে আমরা আমাদের কথা বলব, আমাদের মতো করে । মূলত তখন থেকেই ত্রিপুরার নাটকে শুরু হল নতুন একযুগ । তখন শক্তিশালী নাট্যকারের হাত ধরে একে একে অসংখ্য মৌলিক নাটক আমরা পেয়েছি । অনেকের ধারণা এই মৌলিকতায় আমারও একটা ভূমিকা ছিল । তবে সেটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল বলে আমি মনে করি । আমরা আমাদের মতো চাকরি- সংসার ম্যানেজ করে যতদূর সম্ভব করেছি, লড়েছি ।





প্রশ্ন ঃ এখন তো নাটকে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করছে । তবু নাটকের প্রেক্ষাগৃহ অনেকটাই ফাঁকা । এর কারণ কী মনে হয় আপনার ?

 উত্তর ঃ এই প্রশ্ন আমার মনেও এসেছে বেশ কয়েকবার । প্রায় বছর দু-এক আগে আগরতলা ‘নজরুল কলাক্ষেত্র’-এ মহারাষ্ট্রের একদল নাট্যদলের অপূর্ব এক নাটক দেখে অবাক হয়ে যাই । শুধু খারাপ লাগল, হলে দর্শক নেই দেখে। অথচ এই নাটকের জন্য ছিল প্রবেশ উন্মুক্ত । কিছু স্মৃতি, কিছু ব্যথা নিয়ে আমরা কয়েকজন পুরনো নাট্যকর্মী এই মঞ্চ-বিমুখীনতার কারণ নিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরলাম । কেউ দায়ি করছে, কেরিয়ারের ইঁদরদৌঁড়কে। আবার কেউ বলছে, ছেলেমেয়েরা বাংলা পড়তেই ভুলে যাচ্ছে । কারও আবার মত, এই সময়ের ছেলেমেয়েরা ফেসবুক থেকে মাথা তুললে তো নাটক দেখতে আসবে ? নাটক চলাকালীন দেখবে চ্যাট করছে । এমন বহু কথা, বহু মত, পথ । রাতের অন্ধকার, আরও অন্ধকারের দিকে গড়িয়ে গেল । সঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না । কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার কী-হারে টাকা খরচ করছে । কেউ কেউ তো এই সুযোগে ‘নাটক’কে ব্যবসার বিষয়বস্তু করে তুলছে । নাটক নিয়ে শুরু হয়ে গেছে জালিয়াতি । তবে, এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না । কারণ, নাটক সৃজনশীল চলমান এক চেতনাপ্রবাহ। কেউ না কেউ আবার আসবে । আবার চার দশক আগের মতো দর্শককে টেনে বের করে আনবে রান্নাঘর থেকে, ড্রয়িংরুম থেকে ।




 প্রশ্ন ঃ ‘সফদার হাসমি’-কে আর কি আমরা দেখতে পাব না বাস্তবে অন্য কোনও নামে কিংবা অন্য কোনও আদলে?

 উত্তর ঃ আসবে । আসতে বাধ্য । বহু নাটক আছে, যা আমার চিন্তা-চেতনাকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে । ‘সফদার হাসমি’রা মৃত্যুহীন । শোষণ থাকলে প্রতিবাদ থাকবে । প্রতিবাদ থাকলে সফদার হাসমি-রাও বারবার ফিরে আসবে । যে যতই বলুক, আমি বিশ্বাস করি প্রতিবাদ না-করে মানুষ কোনওদিনই থাকতে পারবে না । আর প্রতিবাদ যতদিন থাকবে ততদিন নাটক থাকবে ।   

  

 


 


No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...