“প্রতিবাদ যতদিন থাকবে
ততদিন নাটক থাকবে”
বর্তমানে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঢপযাত্রা
দেখে শৈশবে নিজের অজান্তেই মনের ভিতরে গড়ে উঠেছিল অভিনয়ের স্পৃহা । সেই স্পৃহা
থেকেই জয় করলেন গ্রামীণ জীবনের যাত্রা থেকে নাটকের মঞ্চ । নির্দেশক- অভিনেতা-
নাট্যকার মতিলাল দে-র সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ প্রথমেই আপনার
কাছে জানতে চাইব, নাট্য জগতে আসার উৎস-প্রেরণা কী ছিল আপনার ?
উত্তর ঃ ‘ নেশা লাগিলো রে’ – লালন ফকিরের
এ-গানের মতো নেশা লাগল ঈশ্বরে নয় পালাগান ঢপ যাত্রায় । খুব ছোটবেলায় বাংলার
বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোয় বইয়ের সময় কোনও কোনও বাড়িতে আসর বসত ঢপযাত্রা, কবিগান,
রামায়ণ গান কিংবা যাত্রাগানের । এইসব আয়োজন বা রিহারসেল দেখে দেখে বড় হয়েছি । মনে
মনে নিজের ভিতর অন্য এক অনুভব টের পেতাম, কল্পিত চরিত্র কিংবা ঘটনার প্রবাহের
সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ভাবতাম, হয়ত এইসব মননচর্চাই ছিল আমার নাটক পাগল হবার মূল
কারণ । তখন মূলত সব মাধ্যমেরই কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ধর্ম । ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়
।
আমি যে গ্রামে জন্ম নিই, সেই রাঘনা গ্রামে
ছিল নিজস্ব যাত্রা দল । পুজো-পার্বণে, বিবাহবাসরে গান গেয়ে বেড়াত এই যাত্রাদল ।
স্কুল শেষে যাত্রাদলের পোশাকে সেজে মাঝে মাঝে তলোয়ার হাতে সংলাপ আওড়ে অভিনয় করতাম
আপন মনে । এই প্রেম কেন জেগেছিল জানি না ।সংক্ষেপে এই হল আমার নাটকে আসার ইতিবৃত্ত
। তবে অন্তর্লীন কামনা বাস্তব হল আরও বহুদিন পর । ঢপযাত্রা একসময় থেমে পড়ল ।
বহুবিদ কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হয়তো ছিল একসঙ্গে এত সুরেলা স্বর বা কণ্ঠ পাওয়া ।
কারণ ঢপযাত্রা ছিল গানের মাধ্যমে কাহিনির বিস্তার, যা সত্যি অর্থে ছিল কঠিন । এর
পরিপ্রক্ষিতে ঝোঁক এল যাত্রার । এখানে সবার গান না-জানলেও হতো । তখন আমি ষষ্ঠ
শ্রেণিতে, দুর্গেশমামা নামে এক ব্যক্তি শুরু করলেন রাঘনার ছেলেমেয়েদের নিয়ে
রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘ডাকঘর’। রাজা-রানি নেই, দেব-দেবীহীন টানা টানা স্বরের
বিলম্বিত সংলাপবিহীন এক নতুন প্রবাহ। আমার মন-প্রাণ কাতর হল – ‘অম্ল’-এর
নিঃসঙ্গতায় । এক অপার্থিব আবহে সকল চরিত্র আপন মা-বাবা, ভাই-বোন প্রতিবেশীর রূপ
ধরে আমার সামনে এসে প্রতিভাত হল । আমি চমকিত হলাম আর নিজের অজান্তেই সাক্ষর করলাম
আজীবন নাটকের দাসত্বে ।

প্রশ্ন ঃ অভিনয় থেকে
নির্দেশনায়, নির্দেশক থেকে নাট্যকার – এই ভ্রমণের প্রেক্ষাভূমি নিয়ে আমাদের কিছু
বলুন ?
উত্তর ঃ
অভিনয়ে আসার প্রেক্ষাভূমি নিয়ে তো আগেই বলেছি । প্রথম দিকে তো বিভিন্ন
চরিত্রে অভিনয় করেছি একের পর এক ।একটা সময়ের পর আমি নির্দেশকের নির্দেশনায়
সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না । যাত্রার আবেগকে ছাড়িয়ে নাটকের ভিতর আমি স্বাভাবিকতার
একটা আঁচ আনার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেই নির্দেশনার দিকে ঝুঁকলাম। প্রাথমিক নেশা যে
কখন দায়িত্বে রূপ নিল বুঝতেই পারিনি । কলকাতার নাট্যকারের লেখা নাটক পরিচালনা করতে
করতেই মনে হল, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের সময়-সমস্যার সঙ্গে আমাদের সময়-সমস্যার অনেক
পার্থক্য । তাদের গণসংকট, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ত্রিপুরার সঙ্কট
অনেকাংশেই ভিন্ন । তখনই আমি আমার সময়-সঙ্কটের সঙ্গে মিল রেখে নাটক লেখার চেষ্টা
করলাম এবং সফল হলাম । নিজের চিন্তা-ভাবনায় আরও একটু জোর পেলাম । এভাবেই অভিনয় থেকে
নির্দেশনা, নির্দেশনা থেকে নাট্যকার হয়ে ওঠা ।
প্রশ্ন ঃ আপনার সময় মানে,
সত্তর-আশির দশকে নাটক নিয়ে প্রায় বিপ্লবীর মতো একটা বাউণ্ডুলেপনা লক্ষ্য করা যেত ।
যা আজ আর লক্ষ্য করা যায় না । এটা কি আপনাদের ব্যর্থতা ?
উত্তর ঃ
ইতিহাসে একেকটা সময় এমন আসে যখন তুঙ্গে থাকে সকল স্তরের সৃষ্টিশীলতা । এরপর
স্বাভাবিক নিয়মেই ভাটা আসে । হয়তো এটা
প্রকৃতির নিয়ম । তবে সকল নিম্নগামীতার
একটা কারণ নিশ্চয়ই থাকে । নাটকে শুধু ত্রিপুরা নয়, ভারতের নানাপ্রান্তে উক্ত দশকের
দিনগুলোতে একটা উন্মাদনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল । আমার ভাগ্য ভালো, আমি ওই-সময়ের
সংগ্রামী প্রেক্ষাপটে নাটক পাগল একজন যুবক ছিলাম । কোনও পরিকাঠামো ছিল না, ছিল না
অর্থনৈতিক সামর্থ । তবু নাটক নিয়ে স্বপ্ন
দেখতাম । নিজের হাতে মঞ্চ বানিয়েছি, নাটকের পাত্র-পাত্রী খুঁজে বের করতাম,
রিহারসেল দিতাম, নাটক করতাম । যতবার দল ভেঙেছে, ততবার দ্বিগুণ উৎসাহে নতুন দল
গড়েছি। কোথাও কোনও ক্লান্তি বা বিরক্তি আসেনি । সে এক অন্য সুখ, অন্য উন্মাদনা-
উত্তেজনায় মেতেছিলাম সেসব দিনগুলিতে । নতুন নাটক, নতুন শৈলী, নতুন নাট্যকর্মী
তৈরির আনন্দ । এখন ভাটির টান পড়েছে সর্বত্র, একথা অস্বীকার করার মতো কিছু নেই । এই
সংকটের সময়টাকে নানান জনে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন । কেউ বলেন, প্রযুক্তির
প্রভাব, কেউ বলেন, রাজনীতি-অর্থনৈতিক অবস্থার জটিল অক্টোপাসের আগ্রাসন । এভাবে বহু ব্যাখ্যা
হলেও এটা সত্য, হয়তো আমরা পারিনি আমাদের মতো উত্তরসূরি তৈরি করে যেতে । তবে সময়
ঘুরবে । সমাজে শোষণ থাকলে নাটকও থাকবে । থাকতে বাধ্য । সংকটই নাটককে আবার তুলে আনবে
নতুন করে, নতুন রূপে । নতুন ডাইমেনশনে ...

প্রশ্ন ঃ আপনার নাটক কি কখনও সে অর্থে মানুষ বা
প্রশাসনের টনক নাড়াতে পেরেছিল ?
উত্তর ঃ আমার কিছু নাটক দর্শকদের মন ছুঁতে
পারলেও, অতিরিক্ত কিছু রাগ-অনুরাগীদের রাগের কারণ হয়ে উঠেছিল । বারবার চাকরির
স্থান বদল হয়েছে । তবে নাটক থেকে সরাতে পারেনি ।
প্রশ্ন ঃ আপনাদের সময়ের
সংকটের সঙ্গে আজকের সময়ের সংকটকে আপনি কীভাবে নাটকে রূপান্তরিত হতে দেখেছেন ? আপনি
কি আশাবাদী ?
উত্তর ঃ অবশ্যই আশাবাদী । আসলে আমাদের সময়ের
সঙ্গে আজকের সময়ের প্রযুক্তিগত পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে । সময়ের গতি, রীতিনীতি, যে
শতগুণ এগিয়ে গেছে, এই সত্যকে জোর করে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আমাদের সময়ের
তুলনায় এখন নাটকে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি । বিভিন্ন কারণে প্রেক্ষাপটও অনেক জটিল হয়ে
পড়েছে । বাইরে কাজ হচ্ছে । এদিকেও হবে । আশাই জীবন । আমার কাছে আশাই নাটকের,
জীবনের শেষ কথা ।
প্রশ্ন ঃ ‘ত্রিপুরার নাটক’ –
এইরকম একটা উচ্চারণ বা নিজস্বতা কি কিছু থাকা উচিত, যা আপনারা তৈরি করতে পেরেছিলেন
বা পারেননি ?
উত্তর ঃ ত্রিপুরায় যখন নাটক শুরু হয় তখন
ছিল কলকাতার নাটকের সক্ষম বা অক্ষম প্রকাশ বা উপস্থাপনা । প্রথম দিকে নিজস্বতার
তেমন কোনও ছাপ রাখতে পারেনি বহুকাল । পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তু মানুষেরা যখন
একটু গুছিয়ে বসলেন ত্রিপুরার মাটিতে, তখন তাদের চোখ গেল নন্দন শিল্পের দিকে ।
এখান-ওখান মিলিয়ে কিছু পাগলপারা মানুষ জুড়ে গেলেন নাটকের সঙ্গে, ত্রিপুরার সব
জেলা-শহরে-গ্রামে গড়ে উঠল নাট্যদল ।
অসংখ্য নাট্যকর্মী নাটকের জগতে পা রাখল । কিন্তু তখনও ত্রিপুরার নাটক বলতে ছিল নাটকের
পীঠস্থান কলকাতার অনুকরণ-অনুসরণ । সত্তর দশকের মাঝামাঝি কিছু নাটকের মানুষ ভাবলেন—অনেক
হল, এবার নাটকে কিছু নিজস্বতা আনার প্রয়োজন । এখন থেকে আমরা আমাদের কথা বলব, আমাদের
মতো করে । মূলত তখন থেকেই ত্রিপুরার নাটকে শুরু হল নতুন একযুগ । তখন শক্তিশালী
নাট্যকারের হাত ধরে একে একে অসংখ্য মৌলিক নাটক আমরা পেয়েছি । অনেকের ধারণা এই
মৌলিকতায় আমারও একটা ভূমিকা ছিল । তবে সেটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল বলে
আমি মনে করি । আমরা আমাদের মতো চাকরি- সংসার ম্যানেজ করে যতদূর সম্ভব করেছি, লড়েছি
।

প্রশ্ন ঃ এখন তো নাটকে
কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করছে । তবু নাটকের
প্রেক্ষাগৃহ অনেকটাই ফাঁকা । এর কারণ কী মনে হয় আপনার ?
উত্তর ঃ এই প্রশ্ন আমার মনেও এসেছে বেশ
কয়েকবার । প্রায় বছর দু-এক আগে আগরতলা ‘নজরুল কলাক্ষেত্র’-এ মহারাষ্ট্রের একদল
নাট্যদলের অপূর্ব এক নাটক দেখে অবাক হয়ে যাই । শুধু খারাপ লাগল, হলে দর্শক নেই
দেখে। অথচ এই নাটকের জন্য ছিল প্রবেশ উন্মুক্ত । কিছু স্মৃতি, কিছু ব্যথা নিয়ে
আমরা কয়েকজন পুরনো নাট্যকর্মী এই মঞ্চ-বিমুখীনতার কারণ নিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ি
ফিরলাম । কেউ দায়ি করছে, কেরিয়ারের ইঁদরদৌঁড়কে। আবার কেউ বলছে, ছেলেমেয়েরা বাংলা
পড়তেই ভুলে যাচ্ছে । কারও আবার মত, এই সময়ের ছেলেমেয়েরা ফেসবুক থেকে মাথা তুললে তো
নাটক দেখতে আসবে ? নাটক চলাকালীন দেখবে চ্যাট করছে । এমন বহু কথা, বহু মত, পথ ।
রাতের অন্ধকার, আরও অন্ধকারের দিকে গড়িয়ে গেল । সঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না । কেন্দ্রীয়
সরকার, রাজ্য সরকার কী-হারে টাকা খরচ করছে । কেউ কেউ তো এই সুযোগে ‘নাটক’কে
ব্যবসার বিষয়বস্তু করে তুলছে । নাটক নিয়ে শুরু হয়ে গেছে জালিয়াতি । তবে, এই অবস্থা
বেশিদিন থাকবে না । কারণ, নাটক সৃজনশীল চলমান এক চেতনাপ্রবাহ। কেউ না কেউ আবার
আসবে । আবার চার দশক আগের মতো দর্শককে টেনে বের করে আনবে রান্নাঘর থেকে, ড্রয়িংরুম
থেকে ।

প্রশ্ন ঃ ‘সফদার হাসমি’-কে
আর কি আমরা দেখতে পাব না বাস্তবে অন্য কোনও নামে কিংবা অন্য কোনও আদলে?
উত্তর ঃ আসবে । আসতে বাধ্য । বহু নাটক
আছে, যা আমার চিন্তা-চেতনাকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে । ‘সফদার হাসমি’রা মৃত্যুহীন
। শোষণ থাকলে প্রতিবাদ থাকবে । প্রতিবাদ থাকলে সফদার হাসমি-রাও বারবার ফিরে আসবে ।
যে যতই বলুক, আমি বিশ্বাস করি প্রতিবাদ না-করে মানুষ কোনওদিনই থাকতে পারবে না । আর
প্রতিবাদ যতদিন থাকবে ততদিন নাটক থাকবে ।
No comments:
Post a Comment