“আমাদের তুলনায় আজ গানের স্কুল বেড়েছে কয়েকশো
গুন, সাথে সাথে তার মানও কমেছে
ততধিক।”
সূত্রকথা ঃ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ গান শোনা এবং ভালো লাগা থেকে ধর্মনগর-এর প্রথম সঙ্গীত শিক্ষাগুরু রঞ্জিত
ঘোষ-এর প্রথম ছাত্র হিসেবে গান শিখতে যাওয়া । এরপর তো আজ ৭৭বছর গান নিয়েই বেঁচে থাকা। চার বছর থেকে গুরু চলে গেলে তিনি একাই সঙ্গীতকে পাথেয় করে এগিয়ে যান। ধর্মনগরের প্রবীনতম সঙ্গীত
শিক্ষাগুরু ভানু ধর -এর সাথে কথোপকথন ।
প্রশ্ন ঃ আপনার
গানের জগতে আসা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমার গানের
জগতে আসা খুব সাধারণভাবেই ।ছোটবেলা গান শুনলে আর সবার মত আমারও ভালো লাগতো।একদিন
ধর্মনগর মঞ্চে সদ্য আগরতলা থেকে বদলি হয়ে আসা
শ্রদ্ধেয় গুরু রঞ্জিত ঘোষ-কে অনুষ্ঠান করতে দেখে কেন জানি, মনে হল তাঁকে
গিয়ে বলি, ‘আমি গান শিখবো!’ যথারীতি গিয়ে বললাম এবং তিনি রাজিও হয়ে গেলেন। সেই সময়
আমি ১৯৬১-৬২সালের কথা বলছি। শ্রদ্ধেয় রঞ্জিত ঘোষ
আমাকে তাঁর শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করলেন। শুরু হল আমার গানর জীবন।আজও যা
অব্যাহত। গুরু সঙ্গীতের স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন
‘রবি সঙ্গীত ভারতী’। এটাই ধর্মনগরের প্রথম সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান। আমাদেরটা নিয়ে তখন
ত্রিপুরাতে মাত্র তিনটি গানের স্কুল ছিল।আজ
ধর্মনগরে ৪৪-টি গানের স্কুল! কোন-না-কোনভাবে সবার শিকড় ভূমি এটাই।
প্রশ্ন
ঃ তারপর কীভাবে এগিয়ে গেলেন ?
উত্তর ঃ তারপর গুরু
কাছে গান শেখা। রেওয়াজ করা। তাল-রাগ সে তো এক বিশাল সমুদ্র, তোমাকে কত বলবো ! সবই
শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীত ।একের পর এক রাগ-রাগিনি’র সাথে আত্মীয়তা বাড়তে লাগলো। রেওয়াজ
করে করে সম্পর্কটাকে আরও ঘনিষ্ট করতে লাগলাম ।
প্রশ্ন
ঃ তখন কি মূলত শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানো হত ?
উত্তর ঃ আমাদের সময় শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীত’টাই বেশি প্রচলিত ছিল ।আমরা বছরের পর বছর শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীত অনুশীলন করেছি।কোন রাগের
কোন বৈশিষ্ট্য শিখেছি। যেমন- ‘ইমন’ রাগটির উৎপত্তি কল্যাণ ঠাট থেকে। গাইবার সময়
রাত্রি প্রথম প্রহর। গ- বাদী, নি- সম্বাদী। যেমন, এই গানটা ধর, ‘পিয়াসে নয়না লগানে
চলি/ উর কি প্যাস বুঝানে চলি’ – ইমন ত্রিতাল (মধ্যলয়) এই বন্দিস শোনে আজকের দিনে
তথাকথিত গায়ক-গায়িকা কিংবা ছাত্র-ছাত্রী ক’জন বলতে পারবে আমার সন্দেহ হয়, কোনো
কোনো সময়। কিন্তু আমাদের সময় এমন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুব কম ।
প্রশ্ন
ঃ তার মানে আপনি কি বলতে চাইছেন,সঙ্গীত শিক্ষার
ক্রমশ অবমূল্যায়ণ ঘটছে?
উত্তর ঃ দুঃখজনক হলেও,আমার উত্তর হ্যাঁ ! ধর্মনগরে আজ ৪৪-টি গানের স্কুল। এদের থেকে বেরিয়ে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা
কতজন তালজ্ঞান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে বেরিয়ে আসে ? এখন গানের পরীক্ষায় কেউ
ফেল করে ? সবাই ৭০% ৮০% নিয়ে পাশ ! এর মানে-টা কি ! এরা কি শিক্ষা দেবে পরবর্তী
জেনারেশনকে?পড়াশুনার মত এটাও তো একটা সিরিয়াস শিক্ষার বিষয় । আগে তো তৃতীয়বর্ষই
কতজন ফেল করতো । দস্তুর মত তানপুরা নিয়ে বসে গান গেয়ে পরীক্ষা দিতে হত । এখন সে সব
কল্পনা করা যায় না ।আমি তো সেই ১৯৬৮সাল থেকে ‘এলাহাবাদ প্রয়াগ সঙ্গীত সমিতি’-এর পরীক্ষকের ভূমিকা পালন
করে আসছি।সেই দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষিতেই কথাগুলো বলছি, আমাদের
তুলনায় আজ গানের স্কুল বেড়েছে কয়েকশো গুন, সাথে সাথে তার মানও কমেছে ততধিক।
প্রশ্ন
ঃ তখনকার শ্রোতা আর এই সময়ের শ্রোতাদের মধ্যে তুলনামূলক বিচার করে কিছু বলতে বললে
কি খুব বিব্রতবোধ করবেন ?
উত্তর ঃ কিছু বিব্রতবোধ করবো বৈকি!আজকাল আর স্তযি বলার সাহস আগের মত পাই না। ৭৭বছর বয়সে আগের সেই
মেজাজ, স্পর্ধা কোনটাই নেই !(একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন)তারপরও বলবো, আগের
শ্রোতারা অনেকবেশি সঙ্গীতবোদ্ধা ছিলেন। তাদের
শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্পর্কে অগাদ ধারণা
ছিল। গান গাওয়ার সময়ে কোন কারণে তালজ্ঞানে ভুল করলে ঠিক ধরে ফেলতেন। শ্রাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হলে প্রেক্ষাগৃহ
ভর্তি লোক থাকতো। শেষ জীবনে এসে একবার এক আয়োজনে দেখলাম দর্শক বা শ্রোতা মাত্র দু-জন !বাকি
তিনজন গভীর নিদ্রায়। একে সময়ই বলতে হবে।এখন শ্রোতারা হালকা গান ভালোবাসেন ।এখন পুজোতে পূজার গান
বাজে না, লক্ষ্য করেছো? বিসর্জনে থাকে না কোনো দুঃখবোধ। এই পরিবর্তন সময়ের দাবি
হলে আমার কিছু বলার নেই।এই রুচিবোধ তরুণদের চাহিদা হলে,আমি নিরুত্তর। কিন্তু মনে
মনে আমাদের সময়ের কথা ভেবে দুঃখ তো হয়ই ।
প্রশ্ন
ঃ আপনার কি মনে হয়, এই যে আপনি আগের
শ্রাস্ত্রীয়সঙ্গীত শ্রোতার অভাবের
চিত্র লক্ষ্য করেছেন, আপনি কি মনে করেন তার প্রভাব কোন-না-কোনভাবে এই জেনারেশনের
উপর প্রভাব বিস্তার করেছে ?
উত্তর ঃ প্রভাব তো অবশ্যই পড়বে। শ্রাস্ত্রীয়সঙ্গীত শুধু গান নয়, সাথে তো একটা ভারতীয় বোধও গড়ে তুলে।
রবীন্দ্রসঙ্গীত-নজরুলসঙ্গীত এরা যদি আমাদের চৈতন্যপ্রবাহে না-থাকে, তাহলে আমরা
মননের দিক দিয়ে যে ক্রমশ পিছিয়ে যাবো
এবিষয়ে বলার তো অপেক্ষা রাখে না।
প্রশ্ন
ঃ আপনার জীবনসঙ্গীনি একজন ভাষা-সংগ্রামী ছিলেন । এনিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমার স্ত্রী মীরা রানী ধর
ছিলেন একজন ভাষাসংগ্রামী। শিলচরের ১৯৬১সালে বিশ্বের প্রথম মহিলা সংগ্রামী
কমলাদেবীর মাথায় যে গুলিটা লেগেছিল, তা আমার স্ত্রী-র ডানহাতকে ছিন্ন করেই লেগেছিল। উনি আজ পাঁচবছর হল দেহত্যাগ করেছেন।
তাঁকে অনেক সংবর্ধনা, সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ঃ আপনিও তো সঙ্গীতের জন্য সম্মাননাপত্র, সংবর্ধনা পেয়েছেন নিশ্চয়ই ?
উত্তর ঃ বাবা, মিথ্যে বলবো না, অনেক অনেক সংবর্ধনা, সম্মাননাপত্র পেয়েছি। এই
গত কয়েকদিন আগেও পেয়েছি।এই দেখো, জমে জমে কতটা হয়েছে। এর জন্য আমি সত্যিই
সম্মানিত, গর্ববোধ করি।
প্রশ্ন
ঃ আপনার এই সময়ের ব্যক্তিগত জীবনের সংকট নিয়ে আমাদের কিছু বলবেন ?
উত্তর ঃ কি আর বলবো ? এই বয়সেও টিউশনি করে খেতে হয় ।যেদিন আর টিউশনি করতে
পারব না, সেদিন কি হবে?এই বয়সে কি আর এসব হয়? নিজে তো কিছু করতে পারলাম না।
সারাজীবন কেবল গান শিখিয়ে গেলাম। একটা নিজস্ব বাড়ি পর্যন্ত করতে পারিনি। ভাড়া
বাড়ি। তিনতলায় কতটা সিঁড়ি মাড়িয়ে এসেছো, দেখেছো তো ?এই ৭৭বছর বয়সে প্রতিদিন কতবার
নামতে উঠতে হয়।আমি তো নিঃসন্তান। সংসারে কেউ নেই।কাল বিছানায় পড়লে কি হবে?মাঝে
মাঝে অন্ধকার ঘরে ঘুম আসে না। তখন অভিমান হয়। রাগও উঠে। কিন্তু কার উপর করবো ?
সেটাও বুঝে উঠতে পারি না।এজীবন তো আমি নিজেই পছন্দ করে নিয়েছিলাম।আর কি বলবো, বলো
...? অনেক কিছুই তো বললাম।
প্রশ্ন ঃ আপনার কিছু প্রিয় ছাত্রছাত্রীর নাম ?
উত্তর ঃ কত নাম বলবো ! তবু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে – উত্তম দাস, প্রমোদ দাস, তাঁর
মত প্রতিভাবান ছাত্র আমি এ’জীবনে আর পাইনি।সে আজ নেই। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা
করি। তারপর বলবো তান্নু বর্মণ, মিতালী রায়, দিপালী ভট্টাচার্য, সাথী রায়, অভীক
চাকমা, তাকে আমি চাকমা গানে অনেক সুর করে দিয়েছি। সে বাংলা গান চাকমা ভাষায় অনুবাদ
করতো।আর কত বলবো ...
প্রশ্ন
ঃ আর কিছু বলতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ কি বলবো ? আমাদের জন্য তো নিদিষ্ট কোনো ভাতার ব্যবস্থা নেই, যে বলবো—ভাতা
চাই। তবে বেঁচে থাকার চিন্তা তো সবসময় করে থাকি। কীভাবে থাকবো, কীভাবেই বা চলবো
বাকি জীবন ! আর কতদিনই বা টিউশনি করতে পারবো? এসব কতকথাই তো বলতে পারি। কিন্তু
বলবো না। বলবো ভালো আছি। তুমিও ভালো থেকো। আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছো, এর জন্য তোমাকে
অসংখ্য ধন্যবাদ...
সঙ্গীত
শিল্পী নৃপেন দে
“আমাদের সময় যাত্রাই তো
ছিল বিনোদনের অন্যতম বিষয়।”
সূত্রকথা ঃ স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবার ভক্তি-কীর্তন
দেখে দেখে বুকের ভিতরে গানের অঙ্কুর জন্মায়। তারপর স্কুল-কলেজে বন্ধুদের
তাড়নায় গান গাইতে গাইতে গানের জগতে একসময় অন্ধের মত চলে আসা । ত্রিপুরার ষাট-সত্তর দশকের প্রখ্যাত গায়ক,যাত্রা শিল্পী প্রায় আশি বছরের নৃপেন
দে ।
প্রশ্ন ঃ আপনার ছেলেবেলা এবং গানের প্রতি মোহ
তৈরি হওয়া নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ
আমার বাবা খুব ভালো কীর্তন করতেন। আমি তাঁর পাশে বসে মন্দিরা বাজাতাম। একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশের ভিতর দিয়ে আমি বড়
হয়েছি। বাবা কর্মসূত্রে কুমিল্লা থাকার সময় রামঠাকুরের আশ্রম কৈবল্যধামে প্রতিদিন
সন্ধ্যাবেলা আরতি-কীর্তন করতে যেতেন। সেখানে বাবার সাথে যেতে যেতে আমারও গানের
প্রতি একটা মোহ জন্মে যায়। কিন্তু তখন
এ’নিয়ে আর তেমন কিছু ভাবিনি। চর্চাও হয়নি। ১৯৪৮ সালে দাঙ্গার ফলশ্রুতিতে সিলেট
জেলার সুনামগজ্ঞ থেকে সপরিবারে আমরা চলে আসি ধর্মনগর চন্দ্রপুরে ।প্রসঙ্গত বলতে পারি আমার
বাবা গিরীন্দ্র দে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। ভারত সরকার কর্তৃক ভাতাও পেতেন।তাঁর একান্ত ইচ্ছে ছিল আমি বড় হয়ে যেন একটা ভালো চাকরি করি।কিন্তু তা আর
হল কই !
প্রশ্ন ঃ তাহলে গান নিয়ে সিরিয়াস হলেন কখন ?
উত্তর ঃ প্রথম দিকে কারো কাছে গান শিখিনি। গান
শোনতাম, গেয়ে ফেলতাম।এমন-কি হারমোনিয়াম, তবলাও কেউ আমাকে শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু
একটা সময় যখন দেখলাম-- গানই আমার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে গেছে, তখন ধর্মনগরের প্রথম
ক্ল্যাসিকেল গানের শিক্ষক কানাইলাল চক্রবর্তী-র কাছে গান শিখি। ‘বীর বিক্রম ইনস্টিটিউশন’ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করে কৈলাসহর ‘রামকৃষ্ণ
মহাবিদ্যালয়’ ভর্তি হই। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের উৎসাহ-তাড়নায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
গান গাইতে গাইতে কখন যে তার নেশায় পড়ে গেলাম নিজেই জানি না। গান নিয়েই দিনরাত
মেতে থাকতে শুরু করলাম ।কলেজেও খুব তাড়াতাড়ি
জনপ্রিয় হয়ে উঠলাম। নিজেরও কেমন যেন ভালো ভালো লাগছিল ।সবাই খাতির করত।
প্রশ্ন ঃ
তারপরের ইতিহাস নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?কি রকম ছিল সে সময়ের গানের পরিবেশ ?
উত্তর ঃ ইতিহাস আর কি! পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল
করতে পারলাম না। বাবা খুব রাগ করলেন। আমি সে-সব নিয়ে খুব একটা ভাবলামই না। আমরা কয়েকজন যেমন—শ্যামল চৌধুরী, অধিপ
চক্রবর্তী, মিলন রায়, মীরা চক্রবর্তী,নমিতা ভট্টাচার্য, মাঝে মাঝে আগরতলা থেকে এসে
যোগ দিতেন আমার জামাইবাবু প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত গায়ক অনঙ্গ বিজয় পাল, চুটিয়ে বৈঠকী
আড্ডা দিতাম। গান আর গান নিয়ে মেতে থাকতাম দিনের পর
দিন। কেউ নজরুল, কেউ আধুনিক, তো কেউ শ্যামা সঙ্গীত। এরপর একসময় এসে আমাদের সাথে
যোগ দিলেন প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত গায়ক উত্তম দাস। আর যার কথা না-বললেই নয় তিনি হলেন ,
ধর্মনগরের তবলা বাদক কালী শংকর বিশ্বাস। তাঁর হাতে যেন আগুন ছিল। আজও কানে
বাজে।আমার শিক্ষক জীবন কিছুদিন দামছড়ার পর প্রায় পুরোটাই কাটে প্রত্যকরায় স্কুলে।
প্রত্যকরায়-এর সাথে আমার জীবন জড়িয়ে। এমন কোনো বাড়ি নেই, যে বাড়িতে আমি গান
গাইনি।যতবারই বদলির আদেশ আসতো, গ্রামের লোকজন ডেপুটেশন দি্যে আমাকে আটকে দিত।
স্বপ্নের মত ভালোবাসা পেয়েছি তাদের কাছ থেকে। এবং এর একটা মূল ভিত্তি ছিল
গান।যে-কোন অনুষ্ঠানে আমার থাকা এবং গান গাওয়া ছিল অনিবার্য।
প্রশ্ন ঃ আপনার নাম উঠলেই শ্যামাসঙ্গীত ও
যাত্রাপালা প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়ে। এর কারণ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমাদের সময় যাত্রাই তো ছিল বিনোদনের
অন্যতম বিষয়। ষাট-সত্তর দশকে আমাদের এদিকে তিনচার
বাড়ি বাদ দিলে বৈদ্যুতিক বাতির কোনো সুবিধা
ছিল না। মশাল জ্বালিয়ে বাজার বসতো। কোনো পাকা
বাড়ি ছিল না। কাদা মাখামাখি করেই সারাবছর থাকতে হত। তাই নবান্ন উৎসবের শেষে শীতের
শুষ্কতার সময়ই ছিল বিনোদনের মূল সময়। মূলত
দুর্গা পূজার পর থেকেই শুরু হয়ে যেত যাত্রাপালাসহ বিভিন্ন ধরণের মঞ্চানুষ্ঠান।
সে-যাত্রার উন্মাদনা আজ তোমরা হয়ত কল্পনা করতে পারবে না। ত্রিপুরাতে আর সে-অর্থে
কোথায় হয় যাত্রাপালা? আমার জীবনের একটি স্মরণীয়
যাত্রাপালা হল ‘ধর্মনগর নাট্যসংস্থা’-র প্রযোজনায় ‘সাধক রামপ্রসাদ’। সারা ত্রিপুরায় অন্তত
তিরিশটি পালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উদয়পুরের মাতাবাড়ি থেকে শুরু করে চৌদ্দ
দেবতার মন্দির সর্বত্র দর্শকের মন জয় করে। এইপালার গানের ভিতর দিয়ে শ্যামাসঙ্গীতকে আমি অন্য এক উপলব্ধিতে নিজের
মধ্যে অনুভব করেছি।সে অনুভূতি বুঝিয়ে বলার মত নয়। তখনই বুঝলাম, শ্যামাসঙ্গীত
গাইলেই গাওয়া হয় না,তার একটা আলাদা আদল আছে, মায়া আছে। তাকে হৃদয়ে ধারণ করতে না-পারলে শ্রোতার মনকে স্পর্শ যায় না।
প্রশ্ন ঃআপনার যাত্রাপালা জীবনের স্মরণীয় একটা
ঘটনা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ স্মরণীয় ঘটনা বলতে এই মুহূর্তে মনে
পড়ছে , আমবাসার কাছাকাছি একটা জায়গায় যাত্রাপালা শেষ হয়েছে। সাজঘরে এসে সাজ তুলছি।
এমন সময় দেখি বাইরে লোকজন ভিড় করেছে – ‘কি ব্যাপার!’ উত্তর এলো -- ‘আমরা সাধক
রামপ্রসাদকে একটু দেখতে চাই!’ ড্রেসিং রুমে সব খুলে বসে আছি, তাই আমাকে চেনা
যাচ্ছিল না। বললাম, ‘আমিই রামপ্রসাদ।’ তখন দেখি সবাই একে একে প্রণাম করতে লাগলো।
আমি ‘না,না, করেও কাউকে আটকাতে পারলাম না। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল আগরতলায়। এই
ভক্তি-সম্মান আমাকে খুব আলোড়িত করেছিল।মনে মনে আমি সবার প্রণাম তাঁর শ্রীচরণেই
অর্পণ করলাম। ঠাকুর তারা সবাই আপনার আশীর্বাদই কামনা করছে।
প্রশ্ন ঃ নতুন শিল্পীদের গান শোনেন ? কেমন লাগে
?
উত্তর ঃ কি বলবো কিছু ভেবে পাচ্ছি না। কেন
জানি, অনেকের ক্ষেত্রেই মনে হয়, সবাই যেন একে অন্যের অনুকরণ করছে। নিজস্ব ঢং তৈরি
করতে পারছে না।
মঞ্চকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সবাই। বৈঠকী আড্ডা
প্রায় উঠেই গেছে। অথচ এইসব ঘরোয়া আড্ডা থেকেই কিন্তু গলা তৈরি হয়। মনটাকে আগে রসে
মজাতে হয়, তারপর না, গান !সেই বিষয়টাতে ঘাটতি লক্ষ্য করি প্রায়ই।
না-হলে গলা অনেকেরই খুব ভালো। লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে ধর্মনগরের সুনাম আগে থেকেই।
এখনো সেটা বজায় আছে দেখে ভালো লাগে। এ’জন্য লোকশিল্পী-শিক্ষক উত্তম দাসকে ধন্যবাদ
দিতেই হয়।
প্রশ্ন ঃ আর শ্যামাসঙ্গীত ?
উত্তর ঃ শ্যামাসঙ্গীতের চর্চা আর কোথায় হয় ?
সেই ভক্তি, বোধ কোনোটাই নেই আজকের গায়কের
মধ্যে। আসবেও কোথা থেকে ! শ্যামাপুজোর সময় দু-একটা প্যান্ড্যাল ছাড়া তো সারাবছর
তাঁর গান কাউকে গাইতেই দেখি না। চর্চা কম হলে তো তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই পড়বে।
প্রশ্ন ঃ আপনি তো আধুনিক গানও গাইতেন। সেই
আধুনিক গানের গতি-প্রকৃতিকে আজ আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন ?
উত্তর ঃ দেখো, আমরা যে-সময়ে যে-ভাব নিয়ে, মনন
নিয়ে আধুনিক বাংলা গান গাইতে এসেছিলাম, সে
সময়-মনন আজ প্রত্যাশা করি না, করা ঠিকও হবে না।
কিন্তু তা-বলে এ’কথা না-বলেও পারছি না যে, আজকালকার গান আমার ভালো লাগে না। কেন জানি মনে হয়,আধুনিক গানের মৃত্যু হয়ে
গেছে । কথা-সুর দুটোই বড় দুর্বল। কোনো
কোনো গানে বাজনার আড়ম্বরই সার।পুরনোকেও দিতে পারছে না নতুন মাত্রা।
প্রশ্ন ঃ জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত --
উত্তর ঃ বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর
সিলেটের কুলাউড়ায় একটি ‘বিজয়া সম্মেলনী’
হয়েছিল, তাতে গান গাওয়া।খুব সাধারণ মানের অনুষ্ঠানই ছিল কিন্তু প্রাণ ছিল অফুরন্ত,
উন্মাদনায় টগবগ করছিল স্বাধীনতার আবেগ।মুক্তির স্বাদ।
প্রশ্ন ঃ এই সায়াহ্নবেলায় চরম উপলব্ধি –
উত্তর ঃ সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেছে। কোথাও কোনো
রস নেই। কি গান কি হয়ে যাচ্ছে ! এখন আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করে না।( দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) যাবার
দিন গুনছি শুধু ...
শিল্পী
রত্না দত্ত
“রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রাণের
আর গনসঙ্গীত সংগ্রামের।আমি এভাবেই এক আত্মায় দুই চেতনাপ্রবাহকে নিয়ে বেঁচে
আছি।”
সূত্রকথা ঃ মা’র তাগিদ-ভাললাগা, বাবার আড়াল থেকে কান পেতে গান শোনার
আগ্রহ তাঁকে ভীষণভাবে গান শেখার প্রেরণা
দিত। বাবা পার্টির কাজে আগরতলা গেলেই কিনে আনতেন গনসঙ্গীতের ক্যাসেট । বাড়িতে দলবেঁধে চলতো গানের মহড়া। সেই
সব স্মৃতি নিয়ে শিল্পী রত্না দত্ত-এর সাথে একান্ত আলোচনায় -
প্রশ্ন ঃ আপনার মেয়েবেলা থেকে গানের জগতে আসা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমার মেয়েবেলা আর দশজন মেয়ের মতই সাধারণ ছিল। তবে আমি বড় হয়েছি বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে। বাবা অমৃতলাল দত্ত ছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন একনিষ্ঠ
কর্মী। সারাদিনরাত পার্টির কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ফলে তাঁকে বেশি সময় কাছে
পাওয়া সম্ভব ছিল না। মা’য়ের কাছ থেকেই গান শেখার প্রেরণা পেয়েছি। মা বিভিন্ন ধরণের
গান জানতেন। মা’য়ের হারমোনিয়ামটা দিয়েই গান গাওয়া শিখেছি।এখনও সেই হারমোনিয়াম
দিয়েই গান গাই। তিনিই আমাকে হারমোনিয়াম বাজানো শিখিয়েছেন।প্রথমে রঞ্জিত
ঘোষ-এর কাছে, পরে ভানু ধর-এর কাছ থেকে
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছি। বাবা রেওয়াজ করার দিকে খুব বেশি
জোর দিতেন।প্রতিদিন সকালবেলা দুই ঘণ্টা এবং বিকেলবেলা দুই ঘণ্টা রেওয়াজ করতাম। তাছাড়া আমার কাকা বিষ্ণুপদ দত্ত
আমাকে প্রচুর রেকর্ড প্লেয়ার এনে দিতেন, আমার বড়দা মানে মানিক দত্ত আমাকে খুব
উৎসাহ দিতেন। গানের বই এনে দিতেন। মীরা বাকচি ধর্মনগর নগর পঞ্চায়েতের প্রাক্তন
চেয়ারপার্সন আমাকে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছিলেন, ‘যা ছিল কালো ধলো তোমার রঙে রঙে রাঙ্গা হলো’। তিনি তখন বলেছিলেন, তুমি পারবে। শেখো।’তাঁর এই প্রেরণা
আমাকে খুব প্রানিত করেছিল।এবং আমি পেরেছি, শিলচর থেকে আগরতলা সব জায়গা থেকেই
আমন্ত্রণ পেয়েছি, গেয়েছি। আজও গাইছি...
প্রশ্ন ঃ আপনি তো প্রথমত রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে
থাকেন এবং ভালোবাসেন।সেই রবীন্দ্রপ্রেম নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার কাছে ভগবানের মত
পবিত্র। তাঁর গান আমাকে আনন্দ দেয়। রাঙ্গিয়ে তুলে ভালোবাসার বিচিত্র রঙে। তাঁর
সুর-কথা আমাকে অনুভবের মোহময় এক জগতে নিয়ে যায়, যার বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব
নয়। গীতবিতানকে আমি আমার নিভৃত সময়ের সঙ্গী করে রাখি। আত্মিক-সংকট থেকে পরিত্রাণ
পেতে বারবার তাঁর গানের কাছেই ছুটে যাই।তুমি দেখো, আমার ঘরে টিভি নেই।কারণ আমি
আমার মনের ভিতরের রবীন্দ্র-বলয়ের বাইরে যেতে চাই না।আমার দিবারাত্রি রবীন্দ্রনাথকে
নিয়েই কাটে। যখন গান গাই তখনও, যখন গান গাই না তখনও।আমি আমার চেতনায় সবসময় তাঁকেই
অনুভব করি। বেশি বলে ফেলছি কিনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমি সত্যি মনের ভিতরে এমন
উপলব্ধি করি।এবং আমার সৌভাগ্য আমার স্বামী
গৌতম মজুমদারও খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। তিনি কখনো আমাকে গানের ব্যাপারে বাধা দেননি, বরং উৎসাহ
দিয়েছেন বারবার। ফলে আমার জীবনে ব্যক্তিগত কোন দুঃখ নেই। আমি আমার স্বামী,দুই
মেয়ে নন্রতা ও রিনিতা-কে নিয়ে খুব খুশি।তাদের পাশাপাশি অবশ্যই আমার আত্মার আত্মীয়
রবীন্দ্রনাথ, যাকে ছাড়া এ’জীবন ভাবতে পারি
না।রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গাইতে একসময় মনে হল, তাঁকে বুঝতে হলে, তাঁর সাহিত্য
জগৎ নিয়ে পড়াশুনা করা উচিত। তখন আমি তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়তে শুরু করলাম।এরফলে তাঁর
মননের জগতে ঢুকতে আমার আরও সুবিধা হয়েছে।
প্রশ্ন ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আজকাল অনেক ধরণের
এক্সপেরিমেন্ট চলছে, এটাকে আপনি কীভাবে নিচ্ছেন ?
উত্তর ঃ এটা একটা শ্রেণির দাবি হয়ে থাকতে পারে।
হয়ত কারো কারো ভালোও লাগছে, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কেন জানি, মন থেকে এই রকম এক্সপেরিমেন্ট
মেনে নিতে পারছি না।আমার কান তাতে সায় দেয় না,
আমার তাতে নাড়া দেয় না। বুকের ভিতর কোথায় যেন সে শান্তিটা, স্বস্তিটা পাই না। তাঁর
গানকে আমি সাধনার মত গাই।রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সুরটাই আমার কাছে চূড়ান্ত মনে
হয়।
প্রশ্ন ; আপনার কি কখনো আধুনিক গান গাইতে ইচ্ছে
করে নি ?
উত্তর ঃ ওমা! আমি তো আধুনিক গানও অনেক গেয়েছি।
আমার বড়দাদা,শংকরদা আমাকে প্রচুর আধুনিক গানের ক্যাসেট এনে দিতেন, এমন কি বড়দা
আমার জন্য সিনেমা হলে টেপ-রেকর্ডার নিয়ে গিয়ে গানের অংশটা রেকর্ড করে এনে
দিতেন।বাড়িতে বসে আমি সেসব গান গলায় তুলতাম। যেমন লতা-সন্ধ্যা-প্রতিমা মুখোপাধ্যায়
এদের গান আমি গাইতাম।হেমঙ্গ বিশ্বাসের অনেক গান আমি গলায় তুলে গেয়েছি। যদিও সেটার
অন্যমাত্রা ছিল ।
প্রশ্ন ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি আপনি তো
গনসঙ্গীত নিয়েও ব্যস্ত থাকেন । গনসঙ্গীতের সুখ-দুঃখ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, গনসঙ্গীতও আমি বলতে আমরা গাই।
গাইতেই হবে। সে আর এক জীবনের তাগিদ এবং অবশ্যই একটা সংগ্রাম।সবাইকে নিয়ে অন্যায়ের
বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সংগ্রাম। এখনও মনে আছে, বাবা পার্টির কাজে আগরতলা গেলেই
আমার জন্য গনসঙ্গীতের রেকর্ড কিনে আনতেন।আমরা দল বেঁধে রিহারসেল দিতাম এবং
পরবর্তীতে কোনো অনুষ্ঠানে তা গাইতাম ।কোথায় না গেয়েছি!আমি, বিশ্বজিৎ, আমার বোন
বেবি,জয়ন্তী,রিনা, দীপঙ্কর-অপন-জয়ন্ত আরও
অনেকে কত নাম বলবো! আমরা সবাই মিলে গাইতাম। শংকর’দার(চক্রবর্তী) কথা অবশ্যই বলতে
হয়। তিনি আমার বা আমাদের সাথে তবলা বাজাতেন। আমাকে গানের ক্ষেত্রে খুব
প্রেরণা দিতেন। তখন সম্পর্কগুলোও খুব নিবিড় ছিল । একটা প্রাণবন্ত ভাব ছিল। বাবাও
খুব খুশি হতেন।বাবার পার্টির কোনো কাজে আসতে পেরে আমারও খুব ভালো লাগতো। সমগ্র
নর্থে যত পার্টি অনুষ্ঠান হত, আমরা যেতাম, গান করতাম।আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রাণের আর গনসঙ্গীত সংগ্রামের।আমি এভাবেই
এক আত্মায় দুই চেতনাপ্রবাহকে নিয়ে বেঁচে আছি।
প্রশ্ন ঃ আর দুঃখ ?
উত্তর ঃ আমি জানতাম, তুমি এখন আমাকে এই
প্রশ্নটাই করবে! হ্যাঁ এটা ঠিক যে, সেই সময়ের মত এখন গনসঙ্গীত উঠে আসছে না।
গনসঙ্গীতের সে উন্মাদনাটাও নেই। তুমি হয়ত এটাই বলতে বা জানতে চাইছো। এই মুহূর্তে
গনসঙ্গীতের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।এই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক সংকট, তাই দাবি
রাখছে বলে আমি মনে করি। অন্যান্য বিষয়ের মত গনসঙ্গীতের উপর কর্মশালা হওয়া খুব
দরকার। গোটা ভারতবর্ষের পরিমণ্ডল সেই অর্থে ভালো নেই।
প্রশ্ন ঃ আজকাল ছেলেমেয়েরা খুব দ্রুত একটা কিছু
পেতে বা অর্জন করতে চাইছে, এই প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ এটা ঠিকই খুবই কষ্টদায়ক এক অনুভূতি।আমি
আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যত দেখছি, দিনদিন তত বেশি করে অবাক হচ্ছি। তারা খুব
দ্রুত একটা কিছু করে ফেলতে চায় । সেটা গানের বেলা যতটা সত্য, নাচের বলাও ততটা সত্য। অভিবাবকরা চাইছেন, তাদের
বাচ্চা যেন নাচে-গানে-আর্টে-পড়ায় সবকিছুতেই যেন এগিয়ে থাকে অথচ তা কি সম্ভব ?না,
স্বাভাবিক! আমাদের তুলনায় আজকের একটা শিশুকে কতটা চাপের মধ্যে বড় হতে হচ্ছে,
ভাবলেই খারাপ লাগে।গানের ক্ষেত্রেও দেখছি, অভিবাবকরা একই সাথে রবীন্দ্র-নজরুল-লোকসঙ্গীত-তবলা-নাটক
সবই শিখিয়ে নিতে চাইছেন। এতে তারা যেমন
বিভ্রান্তির স্বীকার হছে, তেমনই কোন-না-কোনভাবে একটি প্রতিভার সম্ভাবনা শুরুতেই
বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি।
প্রশ্ন ঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত বলুন, নজরুল বলুন,
কিংবা নাটক আমাদের এদিকে উচ্চারণ ভঙ্গিমায় ব্যাপক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে
অনেক সময়ই উপস্থাপনায় আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। আপনি কি বলেন এই ব্যাপারে ?
উত্তর ঃ এটা একদমই ঠিক কথা। আমাদের
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটা একটা বিরাট সমস্যা বা ত্রুটি। আমি আমার ক্ষেত্রে এটা বারবার
বাড়িতে সঠিক উচ্চারণ অনুশীলন করে করে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এর
জন্য নিজের কানকে সচেতন রাখতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে নোটেশনের দিকে। আমি
রবীন্দ্রনাথের ৬৫টা স্বরবিতানের বই সংগ্রহ করেছি। যেকোনো গান গাইতে গেলে সঠিক সুর
লাগার পাশাপাশি সঠিক উচ্চারণ খুব জরুরি ।তা সে যে ধরণের গানই গাওয়া হোক না কেন ? আমি আমার জীবনে হারমোনিয়মকে বক্সে ঢুকাই
নি কোনদিন ।কারণ এটা চোখের সামনে থাকলে রেওয়াজ করার কথা ভুলে যাওয়ার
সম্ভাবনা থাকে না। রেওয়াজ , শুদ্ধ উচ্চারণের চেষ্টা আজও আমার অব্যাহত।শেখার কোনো
শেষ নেই।
প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের স্মরণীয় কোনো ঘটনা যা
আপনাকে আজও মর্মাহত করে?
উত্তর ঃ আমার বাবার মৃত্যু! যা আমাকে আজও তাড়িত
করে। কেবল মনে হয়, আর তো কেউ চুপিচুপি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমার গান মনযোগ দিয়ে
শোনবে না, হঠাৎ দেখবো না জানালাটা নড়ে উঠেছে । পেছন ফিরে চেয়ে দেখবো বাবা -- রেডিও
সেন্টারে আমার গান যেদিন দিত, বাবা ঠিক সময়ে বাড়ি চলে আসতেন।যতদিন যাচ্ছে বাবার এইসব
ছোটছোট কিন্তু খুব আদরের, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো মিস করি।
প্রশ্ন ঃ বাকি জীবন কীভাবে কাটাতে চাইছেন ?
উত্তর ঃ অবশ্যই, বাবার স্বপ্নকে সামনে রেখে।
বাবার মত হয়ত সর্বহারাদের জন্য ঘরবাড়ি ভুলে বর্তমানে আমার ভাই জন্টু মানে অমিতাভ
দত্ত (প্রাক্তন বিধায়ক) যেমন সারাক্ষণ
থাকে, সে রকম না-পারলেও গানে গানে, মাঠে-ময়দানে অবশ্যই যতদিন আছি গেয়ে যাবো। আমার
বাবার সংগ্রামকে আমি ভুলে থাকতে পারি না।
সংগীত-কবি-ব্যক্তিত্ব বিনয়
সিনহা
“ছন্দের ভিতরেই জীবনকে
পেতে চেয়েছি বারবার...”
রিফিউজি-বাবার কড়া নিষেধের পাশ কেটে
অবাধ্য বালকের মত সংগীতের হাল-ধরে ছিলেন,জীবনের বহু দুঃখেও তানপুরা থেকে হাত
সরাননি। সংগীত-কবি-ব্যক্তিত্ব বিনয় সিনহা -র সাথে একান্ত আলাপচারিতা ।
প্রশ্ন ঃ ছোটবেলায় কিভাবে এবং কী ভেবে গানের জগতের সাথে জড়িয়ে পড়লেন?
উত্তর ঃ গানের জগতে আর আসতে পারলাম কই! জড়াতে চেয়েছি বারবার। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি একটা সহজাত ঝোঁক ছিল। বাবা বুঝতে পেরে সরাসরি বললেন,‘নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়—তাদের জন্য সংগীত নয়।’ তখন বুঝিনি বাবার কথার মানে কত গভীরে! কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনুভব করেছি শূন্য হাতে ‘ রিফিউজি’ হয়ে দু’কন্যা সহ আমাদের পাঁচজনের জীবন-সম্মান বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে যারা খালিহাতে এ’পার বাংলায় পাড়ি দিয়েছিল, তারা কতটা অসহায়। অথচ মানসিক দৃঢ়তায় তাঁরা ভরপুর ছিল। যদি তা না-হতো, তবে খোলা আকাশের নিচে পরিবারসহ সাতদিন কাটাবার পর পাটকাটির চালা তৈরি করে নতুন জীবন শুরু করে মানে ‘জিরো থেকে’ আবার একটা বাঁচার মত অবস্থায় আসতে সক্ষম হতো? যার ফসল ‘আমরা’। আমরা কিছুই নই, কিন্তু লবণভাতখেয়ে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আমরা চর্চা করতে পারি, একাল-সেকাল, দেশবিদেশের নানাবিষয়সহ ইতিহাসের পাতাখুলে দেখতে পারি-- তা শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে, সেইসব বাবা-মায়েদের মানবিক দৃঢ়তা, সততা এবং মানব প্রেমের কারণে।
হাল ছাড়িনি তবুও। তখনকার সময়ে যা গান শুনতাম, তা গাইতাম খালি গলায়।স্কুলে টিফিন-আওয়ারে আধঘণ্টা প্রায় রোজই গান গাইতাম ক্লাসরুমে বসে। আর কয়েকজন বন্ধু, টেবিল বাজাতো বাজাতো তবলার
ঢং-এ। জমে উঠতো আধাঘণ্টার আসর। আর মুষ্টিমেয় কয়েকজন এই আসরের সঙ্গী হতো, বাকিরা
কেউ কেউ বাদাম, আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত। তখনকার গানের মানে বুঝতাম না।কিন্তু গাইতে
ভালো লাগত।স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে টিউশনি করে কলেজে পড়ার সময় ৩৫০ টাকা
দিয়ে একটা হারমোনিয়াম কিনেছিলাম বাবার অনুমতি না-নিয়েই। সময়টা ১৯৭৮ সাল। সংগীত
শিক্ষক সুধীর পাল-এর কাছে ১০ টাকা মাইনে সপ্তাহে মাসে একদিন। স্থায়ী হয়নি। কলেজ
শেষে চাকরির ধান্ধা।এরপর জীবনের অনেক এলোমেলো পথ পেরিয়ে সুদূর নদীয়া থেকে
ত্রিপুরার কদমতলায় চলে আসি চাকরি সূত্রে । এখানে সংগীত শিক্ষক হিসেবে প্রথমে
প্রমোদ দাস, এরপর সংগীতগুরু রঞ্জিত ঘোষ-এর কাছে এম মিউজ কোর্স শেষ করি।
প্রশ্ন ঃ গানের শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। সেই নিরিখে গানের
একাল-সেকালকে এই মুহূর্তে কিভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ?
উত্তর ঃ তমাল, আপনার এই প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে দেওয়া
হয়ত আমার সম্ভব নয়। তবে প্রশ্নটার গুরুত্ব অস্বীকার না-করে বলছি, সংগীতের অনেকগুলো
ধারা রয়েছে। আমরা ভারতীয় হিসেবে আমাদের সংগীতের যেসব শাখা-প্রশাখা রয়েছে তা স্ব স্ব মহিমায়
মহিমান্বিত। আমার তো মনে হয় না —‘
একাল-সেকাল’ এর কারণে কোনো সংগীতের ধারা বদলে যাচ্ছে বলে। আবার এক জায়গাতে
দাঁড়িয়েও নেই। বরং বলবো প্রতিনিয়ত সময়ের সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছেই।তাতে স্ব স্ব
ধারার পরিবর্তন ঘটছে, সাথে বলছে গুণগত মানের বিচার। মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গীতজ্ঞরা
নানারকম নিরীক্ষণও করে চলেছেন অবিরত। এটা একটা ভালো দিক – সেকালকে না-ভুলে
বর্তমানের সুখ-দুঃখ যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে ‘মূলধারা’কে অব্যাহত রেখে যারা নতুন কিছু
চিন্তা মানুষের সামনে হাজির করার প্রয়াস করছেন, তাদের এই প্রয়াসকে সাপোর্ট করার
মাধ্যমে, অনুপ্রেরণা দেওয়াটা মনে হয় – সময়ের দাবি।
প্রশ্ন ঃ আধুনিক
প্রযুক্তির কল্যাণে যেসব বাদ্যযন্ত্র এসেছে যেমন,‘ কি-বোর্ড’ বা এইসব ডিজিটাল
বাদ্যযন্ত্র, তারা কি সরাসরি লোকবাদ্যযন্ত্রের অপমৃত্যুর জন্য দায়ি? এই বিষয়ে
আপনার নির্মম মূল্যায়ন কি ?
উত্তর ঃ তমাল,
নির্মম বললে তো অনেক কথাই বলতে হয়। মানুষের সভ্যতা থেমে থাকবে না। প্রযুক্তির
বাড়বাড়ন্ত চলবেই প্রতিনিয়ত। মানুষ আদিম যুগ থেকেই আবিষ্কারের পর আবিষ্কার করছে
জীবনযাপনের সুবিধার্থে। এর কোনো শেষ নেই।লোকবাদ্যযন্ত্রের অপমৃত্যু নিশ্চয়ই ঘটে
গেছে, আমার মনে হয় বিশেষ করে ৮০’র দশক থেকেই।কতিপয় মানুষ আবার পুরানো বাদ্যযন্ত্র
এখনো ব্যবহার করতে দেখা যায়। আর একটা কারণ ঐ পুরানো মানুষগুলো নতুন প্রযুক্তি
ব্যবহার জানে না, বা তা ব্যবহার করার যে
ব্যয় এবং কৌশলগত দিক তাদের আয়ত্বের বাইরে। আর পরবর্তী প্রজন্ম ঐ লোকবাদ্য যন্ত্রের
ধারে কাছে যাচ্ছে না বলেই এই অবলুপ্তি।
সহজলভ্য এবং ব্যবহারগত কৌশল খুব তাড়াতাড়ি আয়ত্ব করা যায় বলেই, এ-প্রজন্মের
কাছে ‘ সিন্থেসাইজার বা কি-বোর্ড-এর কোনো বিকল্প তারা ভাবেন না। আমরা যারা
মাঝামাঝি পুরনো মানুষ তারাও লোকযন্ত্রের ব্যবহার থেকে একটু একটু করে সরে
আসছি। কিন্তু আমি বলবো, লাউ দিয়ে তৈরি
‘তানপুরা’ যে ঝংকার সৃষ্টি করে, আধুনিক প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক-তানপুরা তা সৃষ্টি
করতে পারে না। লাউ দিয়ে তৈরি তানপুরাতে সুর বাঁধতে যে কৌশল এবং কান লাগে, তা শিখতে
অনেক সময় লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে।
যান্ত্রিক-তানপুরাতে তো স্কেল সিলেক্ট করে অন করলেই তা নিয়মিত স্কেলে বাজতে থাকে,
এখানে কোনো ওস্তাদির প্রয়োজন হয় না।ওস্তাদি থাকেও না। এখানে দুঃখ করা ছাড়া আমি অন্তত কোনো উপায় দেখি না। কি-বোর্ড
বা অনুরূপ একটি যন্ত্র, একজন শিল্পী-এর থেকে একাধিক যন্ত্রের সুর বাজাতে পারে, তাই
ধীরে ধীরে অপমৃত্যু হচ্ছে নানা ধরণের লোকযন্ত্রের । তারপরও যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের
সন্তানেরা ওদের ‘শান্তি সেতু বন্ধন’ করতে পারে, সে ‘ হার্ড-রক, সফট-রক,
রবীন্দ্রসংগীত, বাউল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে, তবে তাই হোক – সেটাই কাম্য।তাদের
ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিতেই হবে। সময় হয়ত তাই চাইছে।দেখা যাক—কি হয়!
প্রশ্ন ঃ ভারতীয়
শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগরাগিণী নিয়ে আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগ্ন থাকতে দেখেছি।
রাগ-রাগিণী-নৃত্য-তাল নিয়ে আপনার গৃহস্থালি’টা কেমন চলছে?
উত্তর ঃ
রাগরাগিণী নিয়ে কথা বলার দুঃসাহস আমার নেই।তবে আগাগোড়া মন টানে। এর আনন্দ ভাষা
দিয়ে বোঝাতে পারবো না। একান্ত ব্যক্তিগত আত্মানুভুতি। ছোটোবেলায় যখন বয়স ১০/১১ তখন
কোথাও একটা রাগের সুর শুনেছিলাম, পরবর্তী কালে প্রথম গুরুর কাছে জেনেছিলাম, রাগটির
নাম—‘ দরবারি কানাড়া’। রাগটির সৃষ্টিকর্তা সম্রাট আকব্রের রাজসভার গায়ক গুরু
তানসেন। পরে এই রাগটি সৃষ্টির ইতিহাস পড়ে অবাক হয়েছি। আসলে সম্রাট আকবর সংগীত
পিপাসুর সাথে সাথে বোদ্ধাও ছিলেন। দিনের পর দিন তিনি বিভিন্নভাবে তানসেনকে দিয়ে
চেষ্টা করছিলেন, একটা সুর সৃষ্টির,যার মধ্যে থাকবে বিরহ, আবার শুধু বিরহ নয়, বিরহ
জ্বালার ফাঁকে থাকতে হবে, মিলনের আশা। সে... নেই, নেই ...নেই, আবার আশাও বেঁচে
থাকে। সুরের অন্তরালে, এই তো বুঝি-- সে আসছে, সে আসছে, আবার নেই, নেই , নেই। এই
দ্বৈরথ ভাব সুরের মহিমায় ফুটিয়ে তুলতে বারবার চেষ্টা করছেন তানসেন।কিন্তু সম্রাটকে
কিছুতেই খুশি করতে পারলেন না ।বরং ভৎর্সনা পেয়েছেন । এর বহুদিনপর কোনো-একদিন রাগটি পরিবেষণের পর সম্রাট আকবর
খুশি হয়ে রাগটির নাম দিয়েছিলেন ‘দরবারি কানাড়া’। পুরস্কৃত করেছিলেন তানসেন’কে।
তমাল, ছন্দ! এই
ছন্দের ভিতরেই জীবনকে পেতে চেয়েছি বারবার।এ’নিয়েই আমার সুখ-দুঃখের ঘর-সংসার।
গৃহস্থালি ...
প্রশ্নঃ আপনাদের
সময়ের তুলনায় বর্তমানের শাস্ত্রীয়সংগীতের হাল-হকিকৎ নিয়ে সংক্ষেপে কি বলতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ বর্তমানে
শাস্ত্রীয়সংগীতের হাল-হকিকৎ ভাটার টানে।এর কারণ হিসাবে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়,
‘রকগান’ চর্চার আকর্ষণ। এ’সময়ের যুবক-যুবতীদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, নিরাশায় আমাদের
সাথে অনেক বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়া এর একটা কারণ হতে পারে ।মনে হয়েছে, অল্প সময়ে অনেককিছুকে ধর-ফেলার একটা ঝোঁক থেকে
দীর্ঘমেয়াদি কোনো কিছুতে আকর্ষণ হারাছেন আজকের জেনারেশন। এরই
ফলশ্রুতিতে যে-কোনো শাস্ত্রীয়সংগীত শিক্ষার ঝোঁক কমছে। যেমন—যুব উৎসব প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীর সংকীর্ণতা , শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর বসানোর প্রয়াস কমে যাওয়া ইত্যাদিতে ভাটার টান
টের পাচ্ছি। আমার মনে হয়,শাস্ত্রীয়সংগীতের এখনো যারা ধারক-বাহক রয়েছেন, তারা
অন্যভাবে বিষয়টাকে চিন্তা-ভাবনা করতে পারেন, যাতে এর আকর্ষণ বাড়ানো যেতে পারে।
‘মূলধারা’-কে অব্যাহত রাখার প্রয়োজন এবং গুরুত্ব বোঝার এবং বোঝানোর সময় এসেছে। আমার সময় আমি পালা করে সপ্তাহে একদিন শাস্ত্রীয়সংগীতের
আসর বসাতাম কোনো-না কোনো ছাত্রছাত্রীর বাড়িতে,
আমি গাইতাম, তাদের দিয়েও গাওয়াতাম।কাউকে-না-কাউকে একটা পথ বের করতেই
হবে।
প্রশ্ন ঃ আপনি
গায়ক হওয়ার পাশাপাশি একজন কবিও। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে আজকের যুগ –যন্ত্রণা’কে
কিভাবে দেখছেন ?
উত্তর ঃ গান গাই,
মনের তাগিদে কিছু লিখেও ফেলি, কিন্তু তা বলে আমি নিজেকে গায়ক বা কবি বলতে যা
বুঝায়, তা দাবি করি না। ভাবনা রয়েছে, আরও
দশজনের মত, জীবনের প্রতি ভালোবাসা-মায়া-মমতা সবই রয়েছে, এতসব প্রভাবের মধ্যে থেকে
কোনো কিছুই ঠিকভাবে করা গেল না, বা করতে পারিনি।তবু বলি, কোনো একজন পৃথিবী বিখ্যাত
দার্শনিক বলেছিলেন, ‘ Music in food for soul’ আমাদের ভিতরে যে আমি রয়েছে সে সংগীত খায়।
সংগীত আত্মার খাদ্য।
যান্ত্রিক
সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যন্ত্রণা বাড়ছে। বর্তমানের যুগ-যন্ত্রণা নিয়ে বলতে
গেলে, বিস্তর কথা বলতে হয়। তবে সব যুগযন্ত্রণারই একটা মৌলিক বিষয় থাকে। আজকের যন্ত্রণার সে-বিষয় আমার মতে --
‘বিশ্বাসহীনতা!’ বিশ্বাসহীনতাই বর্তমানে
একটা বড় ফ্যাক্টর। আমি এটাকে ঠিক জেনারেশন গ্যাপ বলবো না, কারণ, যুগে যুগে এই
গ্যাপ ছিল। কিন্তু অসহিষ্ণুতার একটা মাত্রাও ছিল। এখন দেখি এর কোনো মাত্রা নেই, এর
কোনো মুখ নেই,নেই কোনো যুক্তি-তর্ক। শুধু বিশ্বাসহীনতা এবং দৃশ্যমানতার কারণে এর
হৃদয়হীন আচরণ, আগ্রাসন লক্ষ্য করা যায়। কতদূর যাওয়া যাবে জানি না! তবে আমি সবসময়
আশাবাদি। আগামিতেও আশা রাখবো ।
সঙ্গীত শিল্পী মিহিরলাল পাল
“গানের সেই রসিকরাও আজ আর নেই ।”
প্রতিদিন বাড়ির সন্ধ্যা-কীর্তন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সরল-সজীব-অকৃতিম লোকসংস্কৃতির প্রেমে পড়ে অধুনা বিলুপ্তপ্রায় ‘ঠাট গান’ বা ‘উচ্চকীর্তন’-এর প্রতি ভালোবাসা
জন্মায়। শিল্পী মিহিরলাল পাল–এর সাথে পুরনো সংস্কৃতির খুঁজে ।
প্রশ্ন ঃ
আপনার ছোটোবেলা এবং সংগীতবোধের উন্মোচন নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আসলে আমরা
কিভাবে, কখন গান শিখেছি বা সংগীতবোধের
উন্মোচন হয়েছে বলা মুস্কিল।আমি নিজেকে উঠোন-সংস্কৃতির ফসল বলে মনে করি। কেননা, আমি
আমার বোঝবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, আমার বাবার একটা আসর ছিল। সন্ধ্যার পর
গ্রামেই কয়েকজন সেখানে বসে কীর্তনগান করতেন।প্রায়ই খিচুড়ি প্রসাদ থাকতো। আমাদের
সময়ে তখন এটাই পরিবেশ ছিল। তখন গ্রাম-বাংলার পরিবেশটাই এমন ছিল। সারাদিন কৃষিজনিত
কাজকর্ম শেষে সন্ধ্যাবেলা খোল-করতাল নিয়ে আধ্যাত্মিক একটা গানের আসর বসতো। আমি
এটাকেই আজ আমাদের উঠোন-সংস্কৃতি বলতে
চাইছি। এর ভিতর দিয়েই আমি গান গাওয়া, খোল-করতাল-হারমোনিয়াম বাজানো, সবই
শিখেছি।আমাদের নিয়মমাস কার্তিক-মাসের
ভোরের কীর্তন- পরিক্রমার আনন্দ -- হায়, হায়, আজ-যে কি-করে সে আনন্দের কথা বুঝিয়ে
বলি! ৩০-৪০জন হয়ে যেত সে-সব পরিক্রমায়।বাড়ি-আশ্রম মিলিয়ে রং খেলা হত ১৫দিন পর্যন্ত,
সাথে গান। গরু-ছাগলের গায়ে রং লেগে থাকতো সারামাস। আজ সেসব দিন অতীত।আমাদের
গ্রামের প্রধান অসিত পাল উনার কাছে আমার পরবর্তী গান শিক্ষার হাতেখড়ি।
‘লক্ষ্মীনারায়ণ শ্রীনাম সঙ্ঘ’ ছিল। আমরা নাম-কীর্তন, নিমাই সন্ন্যাস,
নৌকাবিলাস,মান-ভঞ্জন পালাগান তখন আমরা গাইতাম।
প্রশ্ন ঃ ‘ঠাট গান’
আজ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। আপনি সেই হারিয়ে যাওয়া গানের সাথে এখনো জড়িয়ে রয়েছেন।‘ঠাট গান’ নিয়ে
প্রথমে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আমি ‘ঠাট
গান’কে গানের রাজা বলে থাকি। যদিও উচ্চাঙ্গসংগীত বা ক্ল্যাসিক্যাল গান সম্পর্কে
আমার কোনধরণের প্রথাগত ধারণা নেই।আমি যা বলবো, ঠাট গান বা আমাদের এ’দিকে
‘উচ্চকীর্তন’ নামেও পরিচিত , এই গান শিখতে গিয়ে যা জানি, তাই বলবো। সেই জানাকে
আপনি গ্রামীণ পর্যায়ের জানাই বলতে পারেন, যেহেতু এ’বিষয়ে তত্ত্বগতভাবে কিছু
জানাবার মত জ্ঞান-অধ্যয়ন আমার নাই । যতদূর জানি, এই
ধরণের গান, সপ্তকের ‘সা’ ও ‘পা’ সহ বাকি রে, গা, মা, ধা, নি -- এই পাঁচটি স্বরের
শুদ্ধ ও বিকৃত রূপ মিলে কোনো সপ্তক রচিত হলে তাকেই ‘ঠাট’ বলে। বিলাবল ঠাট – স র গ
ম প ধ ন, কল্যাণ ঠাট – স র গ ক্ষ প ধ ন , খাম্বাজ ঠাট – স র গ ম প ধ ণ, এই ধরণের ঠাটের উপর সুর বাঁধা আছে। ঠিক মত
একটি ঠাট গান গাইতে গেলে, এক গানেই পুরো
রাত লেগে যায়। আমরা তো সে তুলনায় ঠাট
গানের কিছুই জানি না। ঠাট গানের আসরে ‘লোয়া’ মানে আসর
শুরুর আগে যে কনসার্ট বাজায়, সেটা প্রস্তুত করতেই আড়াই থেকে তিনঘণ্টা সময় লেগে
যায়।এই ‘লোয়া’র প্রস্তুতি দেখার
মত।
প্রশ্ন ঃ ‘লোয়া’-র
প্রস্তুতি এবং সময়
লাগার কারণ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ ঠাট গানে এই পর্যায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই আড়াই থেকে তিনঘণ্টায় বিভিন্ন তালে , বিভিন্ন
বাহাদুরি এখানে দেখতে পাওয়া যায়। কত-তালে যে ঐ-সময় তাল সেট
করতে হত !এই সেট করার উপরই সারারাতের গানের ভালো-মন্দ
অনেকটাই নির্ভর করে। সে এক অপূর্ব মাধুর্য। এই তালের সাথে সাথে শুরু হয় ‘পাড়া’।এই পাড়ায় ভুল করা পাপ মনে করা হয়। আমরা ঘুরে ঘুরে পাড়া দিয়ে দিয়ে বাজনার সাথে
নিজেদের একাত্ম করি। বাজনা বলতে – ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ, রাম-করতাল, এই সব যন্ত্র থাকে। সে
এক অপ্রকাশ্য মাধুর্য। যাই হোক, বাজনার সাথে ‘পাড়া’- দেওয়াটা সবচেয়ে সমস্যার।সবই
দিতে পারে না। এই পাড়ার নির্দিষ্ট একটা ভঙ্গি আছে।এখানে পাড়া ও তালের সমন্বয়
না-হলে, গানের সুর কেটে যাবে। আপনি তিন-চার ঘণ্টায় একটা গানের সুর বাঁধলেন, সেটা
চট করে কেটে
যাবে। আর না-হলে, দেখা
যাবে, আসর জমছে না। আগে আমাদের অভিজ্ঞ দর্শক বা অভিবাবকদের ছোটবেলায় বলতে শুনেছি,
‘গানে এখনও ঘর করছে না বা, এখনও ঘর করছে না!’ তখন তো ‘গানে ঘর করছে না ’ এই বিষয়টা
বুঝতে পারতাম না। বহুপরে বুঝেছি, গানে-ঘর-করা কথাটা কতটুকু মূল্যবান একটা কথা। ‘ঘর’-
শব্দ’টাকে গানের সাথে তুলনা করে, কি অপূর্ব
ব্যঞ্জনা আমাদের পূর্ব-পুরুষরা তৈরি করেছিলেন।
প্রশ্ন ঃ ‘ঘর-করা’ মুহূর্ত’টা যদি
আর একটু বুঝিয়ে বলতেন?
উত্তর
ঃ আসলে গানের চূড়ান্ত মুহূর্ত।সুরের মাধুর্য যেখানে পাগলের মত শিল্পীর সাথে সাথে দর্শক-শ্রোতাদের শ্বাসরুদ্ধকর
এক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। এইসময় গাইয়েরা ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ বা রাম-করতাল নিয়ে লাফিয়ে
লাফিয়ে কিভাবে যে শূন্যে উঠে যায়, তারাই জানে না। আবার কখনও গাইয়েরা
ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ,রাম-করতাল রেখে শুধু হাততালি দিয়ে ধামাইলের মত ঘুরে ঘুরে, কখনো আগে
পিছে হয়ে, সাপের মত এঁকে-বেঁকে , ঊর্দ্ধ-বাহু হয়ে নাচতে নাচতে অন্তিমে যায়। কখনো
দেখা যায় তারা সারিবদ্ধ হয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে নাচতে থাকে। একটা ঘুরের ভিতর
চলে যায় গোটা আসর, বাইন থেকে গাইন। কয়েকজন মূল গানটি গাইলে অন্যরা দোহা দিয়ে এটিকে
ব্যঞ্জনাময় করে তোলে। আসলে এই মুহূর্তের সুর-স্বর-ভাব-বাজনা এমনই এক মোহ তৈরি হয়,
এখন যেন কেউ তাল কাটলে মনে হয়, যেন মেরে ফেলি। এত কষ্ট করে সাজিয়ে আনার পর যদি
সুরের ঘর-বানতে না-পারি! কার-না রাগ উঠবে ?
এইজন্যই আমরা প্রথম পর্যায়ে আড়াই থেকে তিনঘণ্টায় নিজেদের তৈরি করি। আমার গলার-রগ ছিঁড়ে তিনবার রক্ত এসেছে। তিন-চার
জোড়া রাম-করতাল,ঝাঁঝ,মৃদঙ্গ ছাপিয়ে আপনার গলাকে তুলে ধরা কি চারটি-খানি কথা!
প্রশ্ন ঃ ঠাট
গানের পদ ও পর্যায় নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? এখানে বিশ্রামের কি কোন সুযোগ থাকে ?
উত্তর ঃ ঠাট গানে পদ খুব কম
থাকে। পাঁচ কি ছয় লাইন থাকে। এরপর সুরের
বিস্তারেই সব গান এগিয়ে যায় সারারাত। একরাতে দুটো- তিনটের বেশি গাওয়া যায় না। আবার
এক গানেই রাত শেষ হয়ে যায়, এমন গানও আছে।তবে বর্তমানে আর এমন নেই। কে শুনবে এত
ধৈর্য ধরে ? কে-ই বা শুনাবে ? সেই বাজনা বাজাবার লোক কোথায় ?গাওয়া তো আরও কঠিন!
এটা একটা সমন্বয়ের ব্যাপার। তবু আমি গাই, অনেক ছোটো ছোটো ভাবে ভাগ করে
নিয়েছি।পনেরো-কুড়ি বছর আগেও দুর্গা পূজা, বাসন্তী পূজা, নারায়ণ পূজা উপলক্ষ্যে
গাওয়া হত । পর্যায় বলতে, প্রথমের ‘লোয়া’ বাজানো হয়। তার পরের গানের প্রথম পর্যায়কে
বলে ‘রূপক’। রূপক-পর্যায়ের পর কিছুক্ষণ
বিশ্রাম নেওয়া হয়। এরপর ‘পাতনি’তে গানকে ফেলা হয়।বিশ্রামের সময় মাঝখানে ‘কারিকা বা
বুলি ’ গাওয়া হয়। ঠাট গানের কোনও গায়কের মান পাওয়া যায় না। কিন্তু কারিকায় নাম
পাওয়া যায়। কারিকা না-গাইলে ঠাট গান বা কীর্তন পূর্ণতা পায় না। কারণ তারা পদের
শেষে গান ও নাচের তাল ধরিয়ে দেয়। এভাবেই
গানে গানে সকাল থেকে রাত, রাত থেকে ভোর হয়।
প্রশ্ন ঃ ঠাট গান
হারিয়ে যাওয়ার কারণ কি বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর ঃ এর সঠিক উত্তর আমি
কি করে দিই বলুন তো ? খুব সহজ কথায় বলতে গেলে তো নিষ্ঠুরের মত বলতেই হয়, আমরা কেউ
একে বাঁচিয়ে রাখতে চাইনি বলেই তা আজ বেঁচে নেই । যে-কোন কিছুরই পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। আগে বড় বড় জমিদাররা
করাতো, তারপর বড় বড় বাড়িতে হত। এক পর্যায়ে তারাও হারিয়ে গেছে। গানের সে-ই সৌখিন বা
রসিক লোকজনেরাও নেই। কার, কিসের দায়--
একটা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাতে টাকা খরচ করার।ফলত যা হবার তাই হচ্ছে। আমি চলে
গেলে, আপনাকে এই কথাগুলো বলার লোক আরও একজন কমবে।
এই প্রসঙ্গে একটা কথাবলার আছে, দাবি আছে – আপনারা পারলে গানগুলোকে বাঁচান।
ধরে রাখুন।আমি এখনও মনে করি, গানের রাজা ঠাট গান।এটা আমাদের সিলেটের নিজস্ব
ঐতিহ্যও বটে।এর পৃষ্ঠপোষকতা এতদিন আমাদের
পূর্ব-পুরুষরা করে এসেছেন। তখন তাদের সে অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতা ছিল। আজ কেউ
নেই। আমি রাজ্য-কেন্দ্র সব সরকারের প্রতি আহ্বান করছি, আপনারা একে উদ্ধারের জন্য
কোন প্রকল্প নিন। অন্তত পক্ষে গানগুলোকে সংক্ষরণ
করুন। একটা সংস্কৃতির সুর হারিয়ে গেলে তাকে আর উদ্ধার করতে পারবেন
না!যেহেতু এগুলো পাথর নয়, যে খনন করে কেউ আবিষ্কার করতে পারবে ...
গায়েন স্বপনকুমার পাল
“আমি এ-জীবন মা-মানসা’র গান গেয়েই অতিবাহিত করতে চাই।”
‘মনসামঙ্গল পালা গান’ আমাদের বাঙালী ঐতিহ্যে এক মৌলিক প্রাপ্তি ।বিশেষত পূর্ববঙ্গের নদীর মত সর্পিল ঘনঘটায় তার সংস্কৃতি নতুন এক মাত্রা বহন করে।বিচিত্র রাগ-রাগিনীর ভিতর তার গ্রামীণ চলন। গায়েন স্বপনকুমার পাল
(ওঝা)-র সাথে ঘনিষ্ঠ আলোচনায় ..
প্রশ্ন ঃ আপনার এই
‘মনসামঙ্গল পালা গান’-এর জগতে আসার প্রাথমিক শুরু নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ আসলে আমি বড়ই হয়েছি মনসামঙ্গলের পালা গান শুনতে শুনতে। আমার
বাবা সমরেন্দ্র পাল একাধারে বাইন ও গাইন ছিলেন। আমার দাদুও সেই সময় খুব নামকরা ওঝা ছিলেন। আমি দাদু-বাবাকে সারা জীবন মা-মনসার ধ্যান-জ্ঞানে ডুবে থাকতে দেখেছি।ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত ছিলাম। কিন্তু বাবা ছোটবেলাই আমাকে শেখাননি ।আমরা এখনো বিশ্বাস করি, মা-মনসার আদেশ ছাড়া কেউ এই গান শিখতে পারে না। বাবা হঠাৎ একদিন ডেকে আমাকে ‘তোর দ্বারা হবে। তুই গান গা !’ সেই থেকে শুরু। তিনি শেখালেন, আমিও মন দিয়ে শিখলাম। পরে স্বপ্নেও আমি মায়ের আদেশ পাই।এরমধ্যে বাবা দেহত্যাগ করলেন। মা আবার আদেশ দিলেন, ‘এখন তুই গা !’ এখনো গাইছি আটারো বছর হতে চললো ।
প্রশ্ন ঃ আপনি কোন পুঁথি অনুসরণ করে থাকেন ? এর কোন বিশেষ কারণ ছিল
কি ?
উত্তর ঃ আমি মূলত কবি চৈতন্যচরণ পাল-এর গান গাই ।তাঁর ভাষা,
রচনা-শৈলী সহজ-
সরল উপস্থাপনা আমার খুব ভালো লাগে । গাইতেও খুব সুবিধা হয়।আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বাম্বর নাথ-এর বই, দ্বিজ বংশী,বাইশ কবি এভাবে সবার পালা থেকেও গ্রহণ করে থাকি।যা আমার মনে হয় পালা উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে ভালো হবে ।চৈতন্যচরণ পাল এবং বিশ্বাম্বর নাথ ছিলেন আমাদের এ-দিকের আঞ্চলিক কবি। ফলে তাদের ভাষা খুব সহজে শ্রোতারা বুঝতে এবং গ্রহণ করতে পারে ।
প্রশ্ন ঃ আমাদের এ-দিকের আঞ্চলিক কবি বলতে …
উত্তর ঃ কবি চৈতন্যচরণ পাল ত্রিপুরাতে বহুদিন ছিলেন।জীবনের শেষ কিছুদিন তিনি আসামের নিলামবাজার-এ ছিলেন।আর বিশ্বাম্বর নাথ তো ছিলেন পানিসাগর-এর লোক। তাঁকে আমি নিজেও দেখেছি।
প্রশ্ন ঃ বাইশ কবি বা রাধা নাথ-এর পুঁথি থেকে কেন পড়েন না ?
উত্তর ঃ এই পুঁথির পালা অনেক বড় বড়। আমাদের ওঝাদের পক্ষে এক আসরে শেষ করা সম্ভব হয় না।এই সমস্যা আবার বাকি দুজনের ক্ষেত্রে হয় না।হবিগঞ্জের ওঝারা বেশি রাধা নাথের পুঁথি পছন্দ করে ।এভাবেই যার পক্ষে যেটা সুবিধাজনক…
প্রশ্ন ঃ মনসামঙ্গল গানে কি কি ধরণের বাদ্যযন্ত্র আপনারা ব্যবহার করে থাকেন ? পুরোনো ধারার সাথে আধুনিক য্ন্ত্র ব্যবহার করার কথা কখনো ভেবে দেখেছেন ?
উত্তর ঃ আমি আমার পালা গানে প্রথাগত কর্তাল এবং পাখোয়াজ ব্যবহার করে থাকি ।এটাই মূলত এর বাদ্যযন্ত্র ।হবিগঞ্জীরা হারমোনি, ঢোল-ও ব্যবহার করে। আজকাল আবার অনেক ওঝারা এর সাথে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করা শুরু করেছেন ।তবে আমি এর পক্ষপাতী নই।
প্রশ্ন ঃ কেন ?
উত্তর ঃ কি জানি ! আমার ভালো লাগে না । না-গেয়ে , না-শুনে। বাদ্যযন্ত্রের জটিলতায় কোথায় যেন ভক্তি-টা হারিয়ে যায় বলেই আমার মনে হয় ।
প্রশ্ন ঃ গুরমি এবং বাইন মনসামঙ্গল পালার এক অবিচ্ছিন্ন অংশ।এই যে সর্পিল ভঙ্গিমায় নাচ – এই নিয়ে আমাদের কিছু বলুন
?
উত্তর ঃ গুরমি এবং বাইন একে অপরের পরিপূরক ।বাইনের বাজনার উপর যেমন গুরমির নাচ নির্ভর করে তেমনি যদি একজন ভালো গুরমির উপরে বাইনের বাজনা নির্ভর করে ।লাচাড়ীর শেষ পর্যায়ে যখন নাম-পদ আসে তখন গুরমি ‘নাগ প্যাঁচ’ নৃত্য-টা সর্পিল ভঙ্গিমায় করে থাকে । তাছাড়া ত্রিপদী ছন্দে বা যখন দিশা গাই
তখন লাচাড়ী শেষে ঝুমুর আসে তখনও গুরমি ‘নাগ প্যাঁচ’ নৃত্য করে থাকে।এর সাথে যদি আরও কোনো গভীর সম্পর্ক থেকে থাকে, তা আমার জানা নেই।
প্রশ্ন ঃ মনসামঙ্গল পালা গানের সময় আপনারা যে পোষাক পরিধান করেন তার কোনো নিজস্বতা আছে ?
উত্তর ঃ এই পোষাক সম্পূর্ণ আলাদা ঢং-এর ।মাথায় পাগড়ী, কোমরে ঘাঘরার উপর আড়াই হাত কাপড়ের ঘের হয়ে থাকে। বাবা বলেছেন, এটা আমাদের দেহের বৃহদন্ত্রের সমান। কাপড় থাকবে একুশ হাত এবং তাকে আড়াই হাতের মধ্যে বেষ্টনী দিতে হ্য় ।।মাথায় পাগড়ী-টাও আড়াই হাত প্যাঁচের হয়ে থাকে।বসুমাতাকে বন্ধন করে বাঁধা হয়ে থাকে।আমরা ওঝারা একে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
প্রশ্ন : চামর-এর সাথে একজন ওঝার সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর ঃ
‘চামর’ যতক্ষণ ওঝার হাতে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত পোষাক পরিপূর্ণ হয় না। চামরের ভিতরেই মা-মনসার অবন্থান এবং আর্শীবাদ থাকে। তখন সে মায়ের অধীনে চলে যায় বলেই আমরা মনে করি ।আমার কাছে যে চামর আছে তার বয়েস প্রায় দুশো বছর। আমি পঞ্চম পুরুষ এটা বহন করছি ।বংশ পরম্পরায় এটা হস্তান্তরিত হয় ।এবং এটাকে আমরা জীবন্ত বলে বিশ্বাস করি ।
প্রশ্ন ঃ সাপের সাথে আপনাদের সম্পর্ক-টা কেমন ?
উত্তর ঃ সাপ তো মায়েরই সন্তান।সেই অর্থে আমরা তো ভাই-ভাই সম্পর্ক মনে করি। ফলে আমরা এত ভয় পাই কম।বরং দেখলেই নমস্কার করি ।সাপ মারাটা ঠিক নয়।সঠিক অর্থে সাপ তো উপকারি প্রাণী ।
প্রশ্ন : আপনি কি কাউকে মনসামঙ্গল পালা শেখাচ্ছেন কিংবা শেখার আগ্রহ নিয়ে কেউ আসে আপনার কাছে ?
উত্তর ঃ আমি দুই জনকে শিখিয়েছি।তাদের বাবা-মায়ের ইচ্ছেতেই। আসলে মনসামঙ্গল গান কোন অভিভাবক তাদের ছেলেমেয়েদের
শিখাতে উৎসাহ বোধ করেন না, বরং ভয় পান। আমরাও মনে করি, যার প্রতি মায়ের কৃপা হয়, সেই এই গান শেখার অধিকার পায়। আমার দুই ছেলের কেউ শেখেনি। আমি জোর করিনি।
প্রশ্ন ঃ তবে কি হারিয়ে যাবে ?
উত্তর ঃ নিশ্চয়ই না! হারিয়ে যাবার হলে
এতদিনে হারিয়ে যেত।এখন তো আমাদের সরকারী
অনেক অনুষ্ঠানেও ছোট করে মনসামঙ্গল পালা গাওয়া হয়। তথ্য সংস্কৃতি
দপ্তর-এর উদ্যোগে ২০১১ সালে সারা ত্রিপুরা মনসামঙ্গল পালা গান নিয়ে যে প্রতিযোগিতা
হয়েছিল তাতে আমার দল প্রথম হয়েছিল। প্রয়াত মন্ত্রী অনিল সরকার আমাকে কাছে বসিয়ে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন।যা আমার কাছে আজও প্রেরণা হয়ে আছে।
প্রশ্ন ঃ মনসামঙ্গল নিয়ে আর কোন কথা ...
উত্তর ঃ কথা তো অনেক। তবে সংক্ষেপে বলবো, মায়ের কৃপা যখন হয়েছে আমার উপর
,তখন আমি এই জীবন মা-মানসা’র গান গেয়েই অতিবাহিত করতে চাই। এটাই আমার একান্ত ইচ্ছা । জয় মা মনসা ...
শিল্পী শেষাদ্রিভূষণ
মালাকার
“সঙ্গীতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য আমার কাছে কোন
মানে রাখে না। আমার কাছে শুধু সুরই মানে
রাখে ।”
ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ড-এর উদ্যোগে এবং এশিয়া
বুক অফ রেকর্ড-এর কি-বোর্ড ফিঙ্গারিং প্রতিযোগিতায় দেশের সেরা ১০১ জনের মধ্যে সবার
সেরা হন কৈলাসহরের তরুণ ডঃ শেষাদ্রিভূষণ মালাকার । ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ইউনিভার্সিটি’ শেষাদ্রি-র হাতে তুলে দেয় সাম্মানিক ডক্টরেট
ডিগ্রি । তার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে
প্রশ্ন ঃ আপনার ছেলেবেলা নিয়ে
আমাদের কিছু বলুন?
উত্তর : ছেলেবেলা আমার মা-র
(সাধনা মালাকার)উৎসাহেই গানের জগতে আসা।স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ছিলাম
‘বলো বলো সবে শত বীণা বেনু রবে’। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সঙ্গীত কলা কেন্দ্র-এর
শিক্ষক অজয় ভট্টাচার্য ।তিনি একাধারে কৈলাসহর কলেজের
প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন । তিনি মা’কে ডেকে বললেন, ‘আপনি তাকে গান শেখান ।’ সেই থেকে
শুরু ।আমার সঙ্গীত গুরু সজল বিশ্বাস, শুক্লা শর্মা
তাদের কাছে একে একে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে
শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত তিনটিই শিখলাম। তাছাড়া হারমোনিয়াম আমি তিন-চার বছর থেকেই বেশ ভালো বাজাতে
পারতাম। গড গিফটের মত পুরো করডিং আমার হাতে চলে এসেছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত
সিন্থেসাইজার বা কিবোর্ড নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনা ছিল না। একবার বাবা(সুভাষ চন্দ্র
মালাকার) আমাকে কিবোর্ড টাইপের একটা খেলনা বাজার থেকে এনে দিয়েছিলেন । তখন টি.ভি.তে ‘শক্তিমান’ নামে জনপ্রিয় সিরিয়াল ছিল, তার গান আমি প্রথম বাজিয়ে ছিলাম
।তারপর একে একে যে গান ভালো লাগতো তাই শখের বসে ঐ কিবোর্ড খেলনায় তুলতাম, বাজাতাম
।তখন থেকেই মূলত সিরিয়াসলি কিবোর্ড বাজানোর একটা প্রেরণা পাই ।এবং এগিয়ে যাই
ক্রমশ
প্রশ্ন ঃআপনি এই মুহূর্তে ‘কি-
বোর্ড ফিঙ্গারিং উইথ রিদমিক স্টাইল’
প্রতিযোগিতায় দেশ তথা বিশ্বে প্রথম স্থানাধিকারি’- এই গৌরবময় যাত্রা নিয়ে আমাদের
কিছু বলুন? কি করে সম্ভব হল এ-অসম্ভব?
উত্তর ঃ বলতে পারো খেলার ছলে নেশা লেগে গিয়েছিল।তখন আমি চেন্নাইতে পড়ছি। পিয়ানো শিখতাম, গানের প্রোগ্রামও করতাম।একদিন আমার বন্ধু নিলেশ কান্তি পানজা ব্যান্ট
পিটার-এর একটা বিডিও এনে দেখালো এবং বললো,‘ তুইও দেখ না চেষ্টা করে।’ সেই চেষ্টার
পরিপ্রেক্ষিতে একদিন গুণে দেখা যায় আমার
ফিঙ্গারিং অনেক বেশি ফাস্ট হচ্ছে। তারপর সিরিয়াসলি সিদ্ধান্ত নিই, এটা নিয়ে কিছু করে দেখাবার ।
সে-ই জুনুন থেকেই আজকের এই সাফল্য ।২০১৩ সালে চেন্নাই বালাজি হল-এ ‘কি- বোর্ড
ফিঙ্গারিং উইথ রিদমিক স্টাইল’ প্রতিযোগিতায়
অংশ নিয়ে মিনিটে ৮৬৫টি স্ট্রোক করে সবার সেরা
হই। আবার ঐ বছরই ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘দিল্লি ইন্দিরা গান্ধী কলা কেন্দ্র’-এ মিনিটে ৯০০ স্ট্রোক করে নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙি। রিদমিক স্টাইলে সেকেন্ডে ১৫টা স্ট্রোক হচ্ছে । আমার আগে ব্যাঞ্চ পিটারের রেকর্ড ৭৬৫ হিট করেছিল, যার মধ্যে কোন রিদম ছিল
না।বারবার একটা ‘কি’এর উপরে হিট করেছিল। কিন্তু আমি ষোলো মাত্রার একটি তালের উপর ভিত্তি করে রেকর্ডটা
হিট করি ।
প্রশ্ন ঃ আশ্চর্য !কি করে সম্ভব
হয় ? আপনার ডক্টরেট ডিগ্রি-টা কি এ-বিষয়ের উপরই ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ। এ’নিয়ে গবেষণা করার জন্য ‘ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ইউনিভার্সিটি, লন্ডন’ আমাকে স্কলারশিপ দেয় ।এর ফলশ্রুতিতে আমার গবেষণাপত্র ‘ মোস্ট কি-বোর্ড কি হিটস ইন আ মিনিট (রিদমিক স্টাইল)’ জমা দিই। গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ইউনিভার্সিটি দিল্লি অফিসের হেড অফ ডিপার্টমেন্ট রচনা শর্মা । ইউনিভার্সিটি আমার গবেষণাপত্র পরীক্ষা করে
সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি শংসাপত্র এবং মেডেল প্রদান করে ।
প্রশ্ন ঃ কি- বোর্ড তো একটি
পাশ্চাত্য যন্ত্র।যার কবলে পড়ে আমাদের অনেক দেশীয় বাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যেতে বসেছে।
এ’নিয়ে কখনো কিছু ভেবে দেখেছেন ?
উত্তর ঃ সঙ্গীতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য আমার কাছে
কোন মানে রাখে না। আমার কাছে শুধু সুর-ই
মানে রাখে । আমি নিজে শাস্ত্রীয়
এবং রবীন্দ্র শিল্পী। আমার কাছে যেমন হারমোনিয়াম,সেতার,তানপুরা তেমনই গুরুত্ব রাখে
কি- বোর্ড। একটি সুরকে ফুটিয়ে তুলতে যে সুরযন্ত্রকে ব্যবহার করলে সুন্দর হবে তবে
আমি সেটা অকাতরে ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ করবো না। টেকনোলজি এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে
রয়েছে , তাকে অস্বীকার করে আর কতদিন থাকা যাবে। এর কবলে পড়ে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র যে
কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, তা আমি বলবো না। তবে আমি বলবো ,যে
বাঁশি নিয়ে ভালো, সে বাঁশি নিয়ে এগিয়ে যাক ।যে সেতারে ভাল,সে সেতার। আমি কি-বোর্ড ভালো , তাই আমি কি-বোর্ড নিয়ে এগিয়ে
গেছি ।
প্রশ্ন ঃ এই সময় যারা কি-বোর্ড শিখছে ,তাদের উদ্দেশ্যে
যদি কিছু বলতে বলি,প্রথমেই কি বলতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ একটাই কথা বলবো, প্রথমে শাস্ত্রীয়
সঙ্গীত ভালো করে শিখে নিন। না-হলে একজন শিল্পী কিছুতেই পারফেক্ট নোটেশন লাগাতে
পারবে না।
প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের স্মরণীয়
ঘটনা যা আজও আপনাকে রোমাঞ্চিত করে ?
উত্তর ঃ ১৫ ফেব্রুয়ারী ‘ইন্ডিয়া বুক অফ
রেকর্ড়-২০১৪’ বইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জি আব্দুল কালাম। এই বইয়ের ৫৩ নম্বর পৃষ্ঠায় রেকর্ড ব্রেকার ফেস্টিভ্যালে আমার ছবিসহ সাফল্যের
উল্লেখ থাকা এবং তাঁর মত মহৎ ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারার
মুহূর্তটাই আমার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনা । ২০১৪ সালে ভারতের
সেরা ১০১ জনের মধ্যে আমার থাকা ।
শিল্পী সুদীপ ঘোষ
“মনিপুরী নৃত্যেকে ভারতবর্ষে আরো
ব্যাপক স্তরে নিয়ে যেতে চাই ।”
পরিবারে কেউ নাচ জানতো না। অথচ নাচ দেখলেই তাঁর শরীরে অজানা এক অনুভূতি সুড়সুড়ি
দিত । সেই সুড়সুড়ির তাড়নায় প্রথমে ঘর, ক্রমে বাইরে , একে একে এভাবেই আজ তিনি
মনিপুরী নৃত্যে দেশের প্রথম শ্রেণির একজন শিল্পী। শিল্পী সুদীপ ঘোষ- এর সাথে
আলাপচারিতায়
প্রশ্ন ঃ একজন সাধারণ বাঙালি হয়ে আজ আপনি মনিপুরী নৃত্যে জাতীয়
স্তরের একজন তরুণ শিল্পী। এই দীর্ঘ পাড়ির রহস্য বা
রোমাঞ্চকর কিছু কথা আমাদের বলুন?
উত্তর ঃ সে অর্থে কোনো রহস্য নেই ।সবই ভগবান ও গুরুর কৃপা।সাথে অবশ্যই একটা নাছোড়বান্দা জিদ কাজ করে ছিল।আমার
ছেলেবেলা খুব সাধারণ । আমার পরিবারে কেউ নাচের জগতের সাথে জড়িত নন। কিন্তু কোথাও
নাচ দেখলে আমি বুঝতাম বুকের কোথায় যেন একটা পুলক অনুভব করতাম।বাড়িতে নিজে নিজেই
নাচ প্র্যাকটিস করতাম। কোথাও নাচ হলে নাচের চেষ্টা করতাম । তাই দেখে ধর্মনগরের বিখ্যাত
‘কলামন্ডল’ সংস্কৃতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাণপুরুষ সন্তোষ সূত্রধর আমাকে ডেকে তাঁর স্কুলে নাচ শেখার কথা বলেন।
সেখানে নৃত্যশিল্পী সজল বিশ্বাস এবং লক্ষ্মী সিনহা( রামনগর)অধীনে নাচ শেখা শুরু
করি।
প্রশ্ন ঃ তারপর ...
উত্তর ঃ তারপর হঠাৎ মনে হল, আমাকে এখানে থেমে থাকলে হবে না। বড় কিছু করতে গেলে বাইরে বের হতে হবে ।২০০৪ সালে আমি কলকাতায় পাড়ি দিই সেখানে আমার মঞ্জুশ্রী বন্দোপাধ্যায়-এর সাথে পরিচয় হয়। তাঁর কাছে আমি ওড়িশি নাচ এবং পাশাপাশি পৌষালী চট্টোপাধ্যায়ের কাছে মনিপুরী নাচ শিখতে থাকি। ২০০৯ সালে আমি ত্রিপুরা থেকে মনিপুরী নৃত্যে আমি প্রথম হয়ে বাইরে যাই। ২০১০
সালে আমি ‘শৃঙ্গারমনি এওর্য়াড’-এর
জন্য নমিনেশন পাই । আগরতলায় ‘ বসন্ত উৎসব’-এ আমার সাথে
পরিচয় হয় বিখ্যাত নৃত্য-ব্যক্তিত্ব মাধবী সিনহা’র । আর এটাই আমার জীবনের বড়
একটা টার্নিং-পয়েন্ট । মাধবী সিনহা’র সাহায্যে আমি
শান্তিনিকেতনে যাই । শান্তিনিকেতনে নৃত্যগুরু জিতেন সিং বললেন ‘প্রকৃত মনিপুরী-নৃত্য শিখতে হলে তোমাকে ইম্ফল যেতে হবে
।’তখন আমার ইম্ফল যাবার মত টাকাও ছিল না। তিনি আমাকে টাকা দিয়ে পাঠান।সেখানে
আমি ‘জহরওয়াল নেহেরু ডান্স একাডেমী’-তে যাই। সেখানে
পদ্মশ্রী বাবু সিংহ আমাকে শিষ্য হিসেবে
গ্রহণ করলেন । তখন দেখলাম কলকাতার মনিপুরী নাচের সাথে মনিপুরী নাচের শিক্ষার ধরণ অনেক আলাদা ।ফলে
আমাকে আবার নতুন করে শিখতে হয় । সেখানে আমি টিউশনি করে শিক্ষার খরচ ম্যানেজ করতাম। এভাবে
আমি একে একে ওজা পি.ধনঞ্জিত সিনহা, ওজা আই নলিনী দেবী, ওজা এন অমুসনা দেবী, ওজা
পদ্মশ্রী বাবু সিংহ দেহত্যাগ করার পর আমি
তাঁর পুত্র ওজা থিয়াম চিরঞ্জিত সিনহা’র শিষ্যত্ব গ্রহণ করি ।২০১২ সালে আমি মণিপুর
থেকে দিল্লী যাই , সেখানে ‘সুহিনি বাসুনি নৃত্যাঙ্গনা ইন্সষ্টিটিউশন’-এ মনিপুরী ক্রিয়েটিব ড্যান্সার হিসেবে কাজ
করি।সেখানে সিংহজিৎ সিংহ-এর সাথেও কিছু কাজ করি। এবং নরেন্দ্র শর্মা উদয়শঙ্কর এর
একেবারে প্রথম দিকের ছাত্র । দিল্লীতে আজকাল যত ক্রিয়েটিভ
ড্যান্স হচ্ছে তাঁর বেশির ভাগ তাঁরই ছাত্র। তাঁর ইন্সষ্টিটিউশনে বর্তমানে আমি মনিপুরী নাচ শেখাই ।সেখান থেকেই দেশের বিভিন্ন গুরুজীদের সাথে পরিচিত হই ।
প্রশ্ন ঃ নাচ
শিখতে গেলে নাচের বাইরে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি জানাটা কতটুকু জরুরী বলে আপনি মনে
করেন ?
উত্তর ঃ খুবই
জরুরী। যেমন আমি আমার মনিপুরী নাচের ক্ষেত্রে বলছি, তাঁদের চলন-গমন-উঠা-বসা ,ওদের
পোষাক কি,ওরা কিভাবে অতিথি অভ্যর্থনা করে – সব কিছু জানতে হবে।নিজেকে সেই অনুযায়ী
তৈরি করা দরকার ।এসব যত বেশি করে জানা থাকবে, ততবেশি করে ঐ নাচের স্বাভাবিকতার
কাছাকাছি পৌঁছা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন ঃ মনিপুরী
নৃত্য এবং রবীন্দ্রনাথ এই নিয়ে কি বলবেন ?
উত্তর ঃ রবীন্দ্রনাথের কাছে তো আমাদের ঋণের শেষ নেই।
মণিপুরী নৃত্যকে তিনিই প্রথম বিশ্বের সামনে এত ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন। অভিনয়ের ভিতর দিয়েই তো নাচকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। মণিপুরী
নৃত্যের লাস্য ভাবের ব্যাপকতাকে রবীন্দ্রনাথই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি
রবীন্দ্রনৃত্যের সাথে মণিপুরী নৃত্যের এত সুন্দর করে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ছিলেন।।মনিপুরীনৃত্যের
এই দিকটা রবীন্দ্রনাথকে খুব স্পর্শ করেছিল
প্রশ্ন ঃ একজন মনিপুরী নৃত্যশিল্পীর কোন
কোন দিকটা খেয়াল রাখা খুব দরকার বলে আপনি
মনে করেন ?
উত্তর ঃ মণিপুরী ডান্সের ক্ষেত্রে
সবথেকে প্রথমে যেটা খেয়াল রাখা দরকার সেটা হল, কী করে মঞ্চে দাঁড়াবে। সেটা হল আমরা
যদি দেখি ঘোড়া যখন দাঁড়ায় তখন তার পেছনের একটি পা একটু বাঁকা থাকে , ঠিক সেই ভাবে
আর আমাদের চারপাশে যেসব পাখীরা আছে, যেমন কাক, হাঁস এইসব পাখীরা যে ভাবে চলে সেই স্টাইল আমাদের
মণিপুরী নাচে ব্যবহার হয় । তারপর একজন
শিল্পী তার হাত কীভাবে রাখবে , কীভাবে চালনা করবে , কতটুকু দূর যাবে , তার পরিধি
কতটুকু ।মণিপুরী নাচে খুব খেয়াল রাখা খুব
দরকার , শিল্পীর হাত যেন কোমরের নিচে যেন না যায় । এবং চোখের উপর যাবে না । বিশেষ
বিশেষ ক্ষেত্রে হাত চোখের উপর উঠতে পারে । ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে একমাত্র
মনিপুরী এবং কথাকলি নৃত্যে তান্ডব ও লাস্য আলাদা । মনিপুরীনৃত্যে দাঁত দেখানো হয়
না । তাছাড়া এই নৃত্যে কখনো পুরুষ নারী চরিত্রে অভিনয় করে না। বরং একজন মহিলা
ইচ্ছে করলে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করতে পারে। মনিপুরীনৃত্যে পোশাকও একটা খুব জরুরি
বিষয় । এই ক্ষেত্রে অনেক মারাত্মক ভুল লক্ষ্য করা যায় । যেমন,আমরা যখন কৃষ্ণ বেশ
ধারণ করি তখন অনেকে দেখি পিসিন্ধাই ছাড়া নৃত্য করে। এটা ঠিক নয়। আরেকটা বিষয় হল,
যখন কোন পুরুষ মণিপুরি নৃত্য পরিবেশন করে তখন তাকে পৈতে এবং তুসির মালা অবশ্যই
পরতে হবে, বিশেষ করে জয়দেব-এর গানের সাথে।
এভাবে ছোট ছোট অনেক ভুলের কথাই বলা যায় । যেগুলো গুরু ওজা পদ্মশ্রী বাবু
সিংহ-এর খুব কাছ থেকে শেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে ।
প্রশ্ন ঃ বর্তমানে মণিপুরী-নৃত্য নিয়ে কি ভাবছেন বা করছেন ?
উত্তর ঃ বর্তমানে আমার ‘গন্ধর্বী ডান্স ইন্সষ্টিটিউশন’ আছে।কলকাতাতে এর তিনটা শাখা আছে, মুম্বাইতে ‘অভিনয় ডান্স স্কুল’-এ প্রতি দুই মাস
অন্তর অন্তর গিয়ে মণিপুরী ডান্স শেখাই
।তাছাড়া আমি অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে
মণিপুরী ডান্স নিয়ে কর্মশালা করছি। যখন যেখান থেকে আমন্ত্রণ পাই
সেখানেই যাই । তবে আমি যেটুকু দেখেছি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এখন অনেক জায়গা আছে
সেখাকার মানুষ মণিপুরী নাচ যে শাস্ত্রীয় নৃত্য সেটা জানে না ।আমি এমন অনেক জায়গাতে যাই যেখানে শুধু পাশ্চাত্য
ডান্স ছাড়া আর কিছু বোঝে না। তাদেরকে তাদের ভালো লাগার মধ্যে দিয়ে মণিপুরী নাচ শেখাই।বর্তমানে মানকাচার একটা জায়গা আছে আসাম মেঘালয়
বাংলাদেশের সীমান্তে একটাই নাচের স্কুল । তাও আবার হিন্দি সিনেমার গানের নাচ
শেখার। সেখানে গিয়ে মণিপুরী নৃত্যের উপর পাঁচ দিনের কর্মশালা করে এসেছি।
প্রশ্ন ঃ আপনার জীবনের একটা স্মরণীয়
ঘটনা যা আপনাকে ক্রমাগত প্রেরণা দিয়ে যায় ?
উত্তর ঃ আমি ২০০২ সালে লক্ষ্মী সিংহ
আমায় কলকাতায় পাঠান গুরু বিপিন পাল এর জন্মদিন উৎসবে একটা কর্মশালায়।সেখানে আমি
গুরুজীর বাড়ি ছিলাম। একদিন সন্ধ্যাবেলা
গুরু কলাবতী দেবী হঠাৎ আমাকে একটা নাচ দেখাতে বললেন। আমি মন ভরে নাচলাম। সেদিন
তিনি আমাকে আশীর্বাদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোর হবে।’ তখনি মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম —
‘যতদিন বাঁচবো ততদিন মনিপুরী নৃত্য নিয়ে থাকবো।’ আজ সেই মনিপুরী নৃত্যই আমার জীবন-যাপন ।
প্রশ্ন ঃ
ত্রিপুরা নিয়ে কিছু ভাবছেন ?
উত্তর ঃ
অবশ্যই ।আমি ত্রিপুরার ছেলে। তাই ত্রিপুরায় কীভাবে মনিপুরী নৃত্যকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা যায় সে নিয়ে
আমার কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই তা করবো । দেখা যাক কি হয়।
শিল্পী দেবাশিস ভট্টাচার্য
“সেকালে সব ভালো ছিল, আজ কিছু হচ্ছে না,
এই ধারণা ভিত্তিহীন”
নিছক একটা ট্র্যানজিসটার রেডিও থেকে
উৎসাহের শুরু, তারপর তারই সুরের টানে যেতে যেতে একসময় হারিয়ে গেলেন গানের জগতে ।
এক পর্যায়ে হাতে উঠে এলো ‘ম্যান্ডোলিন’। আজও ত্রিপুরাতে ম্যান্ডোলিন দেবাশিস বললে এক লহমায় তাকে সবাই চিনে ফেলেন ।
থাইল্যান্ড-ওমান- বাংলাদেশ- আমেরিকায় জয় করেছেন দর্শক-শ্রোতার মন । দোতারা থেকে
কী-বোর্ড সর্বত্র তার যাত্রাপথ ।
প্রশ্ন ঃ ছোটোবেলায় কীভাবে গানের জগতে
আসার প্রেরণা পেলেন ?
উত্তর ঃ ভালো-লাগা ব্যাপারটা কখন কোথা
থেকে আসে, বলা শক্ত । হয়ত গবেষণার বিষয় ।
কিছুটা সহজাত তো বটেই । কিন্তু কোনো বিষয়ে আত্মপ্রকাশের পেছনে একটা অনুপ্রেরণা কাজ
করে, তা তো নিঃসন্দেহে । ত্রিপুরা রাজ্যে তখন বড় বড় অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ ছিল কম ।

No comments:
Post a Comment