Thursday, October 3, 2024

“আমাদের সময় যাত্রাই তো ছিল বিনোদনের অন্যতম বিষয়।” -- শিল্পী নৃপেন দে


 


আমাদের সময় যাত্রাই তো ছিল বিনোদনের অন্যতম বিষয়।

 

সূত্রকথা ঃ  স্বাধীনতা সংগ্রামী বাবার ভক্তি-কীর্তন  দেখে দেখে বুকের ভিতরে গানের অঙ্কুর জন্মায়। তারপর স্কুল-কলেজে বন্ধুদের তাড়নায় গান গাইতে গাইতে গানের জগতে একসময় অন্ধের মত চলে আসা  ত্রিপুরার ষাট-সত্তর দশকের প্রখ্যাত গায়ক,যাত্রা



শিল্পী প্রায় আশি বছরের  নৃপেন দে

প্রশ্ন ঃ আপনার ছেলেবেলা এবং গানের প্রতি মোহ তৈরি হওয়া নিয়ে আমাদের কিছু   বলুন ?

উত্তর ঃ  আমার বাবা খুব ভালো কীর্তন করতেন। আমি তাঁর পাশে বসে মন্দিরা বাজাতাম।  একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশের ভিতর দিয়ে আমি বড় হয়েছি। বাবা কর্মসূত্রে কুমিল্লা থাকার সময় রামঠাকুরের আশ্রম কৈবল্যধামে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আরতি-কীর্তন করতে যেতেন। সেখানে বাবার সাথে যেতে যেতে আমারও গানের প্রতি  একটা মোহ জন্মে যায়। কিন্তু তখন এ’নিয়ে আর তেমন কিছু ভাবিনি। চর্চাও হয়নি। ১৯৪৮ সালে দাঙ্গার ফলশ্রুতিতে সিলেট জেলার সুনামগজ্ঞ থেকে সপরিবারে আমরা চলে আসি ধর্মনগর চন্দ্রপুরেপ্রসঙ্গত বলতে পারি আমার বাবা গিরীন্দ্র দে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। ভারত সরকার কর্তৃক ভাতাও পেতেনতাঁর একান্ত ইচ্ছে ছিল আমি  বড় হয়ে যেন একটা ভালো চাকরি করি।কিন্তু তা আর হল কই !

 

প্রশ্ন ঃ তাহলে গান নিয়ে সিরিয়াস হলেন কখন ?

উত্তর ঃ প্রথম দিকে কারো কাছে গান শিখিনি। গান শোনতাম, গেয়ে ফেলতাম।এমন-কি হারমোনিয়াম, তবলাও কেউ আমাকে শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু একটা সময় যখন দেখলাম-- গানই আমার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে গেছে, তখন ধর্মনগরের প্রথম ক্ল্যাসিকেল গানের শিক্ষক কানাইলাল চক্রবর্তী-র কাছে গান শিখি। ‘বীর বিক্রম ইনস্টিটিউশন’ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করে কৈলাসহর ‘রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়’ ভর্তি হই। কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের উৎসাহ-তাড়নায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতে গাইতে কখন যে তার নেশায় পড়ে গেলাম নিজেই জানি না। গান নিয়েই দিনরাত মেতে  থাকতে শুরু করলামকলেজেও খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠলাম। নিজেরও কেমন যেন ভালো ভালো লাগছিল সবাই খাতির করত।

প্রশ্ন ঃ  তারপরের ইতিহাস নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?কি রকম ছিল সে সময়ের গানের পরিবেশ ?

উত্তর ঃ ইতিহাস আর কি! পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারলাম না। বাবা খুব রাগ করলেন। আমি সে-সব নিয়ে খুব একটা ভাবলামই না।  আমরা কয়েকজন যেমন—শ্যামল চৌধুরী, অধিপ চক্রবর্তী, মিলন রায়, মীরা চক্রবর্তী,নমিতা ভট্টাচার্য, মাঝে মাঝে আগরতলা থেকে এসে যোগ দিতেন আমার জামাইবাবু প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত গায়ক অনঙ্গ বিজয় পাল, চুটিয়ে বৈঠকী আড্ডা দিতামগান আর গান নিয়ে  মেতে থাকতাম দিনের পর দিন। কেউ নজরুল, কেউ আধুনিক, তো কেউ শ্যামা সঙ্গীত। এরপর একসময় এসে আমাদের সাথে যোগ দিলেন প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত গায়ক উত্তম দাস। আর যার কথা না-বললেই নয় তিনি হলেন , ধর্মনগরের তবলা বাদক কালী শংকর বিশ্বাস। তাঁর হাতে যেন আগুন ছিল। আজও কানে বাজে।আমার শিক্ষক জীবন কিছুদিন দামছড়ার পর প্রায় পুরোটাই কাটে প্রত্যকরায় স্কুলে। প্রত্যকরায়-এর সাথে আমার জীবন জড়িয়ে। এমন কোনো বাড়ি নেই, যে বাড়িতে আমি গান গাইনি।যতবারই বদলির আদেশ আসতো, গ্রামের লোকজন ডেপুটেশন দি্যে আমাকে আটকে দিত। স্বপ্নের মত ভালোবাসা পেয়েছি তাদের কাছ থেকে। এবং এর একটা মূল ভিত্তি ছিল গান।যে-কোন অনুষ্ঠানে আমার থাকা এবং গান গাওয়া ছিল অনিবার্য।   

প্রশ্ন ঃ আপনার নাম উঠলেই শ্যামাসঙ্গীত ও যাত্রাপালা প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়ে। এর কারণ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর ঃ আমাদের সময় যাত্রাই তো ছিল বিনোদনের অন্যতম বিষয়ষাট-সত্তর  দশকে আমাদের এদিকে তিনচার বাড়ি বাদ দিলে বৈদ্যুতিক বাতির  কোনো সুবিধা

ছিল না। মশাল জ্বালিয়ে বাজার বসতো। কোনো পাকা বাড়ি ছিল না। কাদা মাখামাখি করেই সারাবছর থাকতে হত। তাই নবান্ন উৎসবের শেষে শীতের শুষ্কতার সময়ই ছিল বিনোদনের মূল সময়।  মূলত দুর্গা পূজার পর থেকেই শুরু হয়ে যেত যাত্রাপালাসহ বিভিন্ন ধরণের মঞ্চানুষ্ঠান। সে-যাত্রার উন্মাদনা আজ তোমরা হয়ত কল্পনা করতে পারবে না। ত্রিপুরাতে আর সে-অর্থে কোথায় হয় যাত্রাপালা? আমার জীবনের একটি স্মরণীয়  যাত্রাপালা হল ‘ধর্মনগর নাট্যসংস্থা’-র প্রযোজনায় ‘সাধক রামপ্রসাদ’সারা ত্রিপুরায় অন্তত তিরিশটি পালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল উদয়পুরের মাতাবাড়ি থেকে শুরু করে চৌদ্দ দেবতার মন্দির সর্বত্র দর্শকের মন জয় করে। এইপালার গানের ভিতর দিয়ে  শ্যামাসঙ্গীতকে আমি অন্য এক উপলব্ধিতে নিজের মধ্যে অনুভব করেছি।সে অনুভূতি বুঝিয়ে বলার মত নয়। তখনই বুঝলাম, শ্যামাসঙ্গীত গাইলেই গাওয়া হয় না,তার একটা আলাদা আদল আছে, মায়া আছে। তাকে হৃদয়ে  ধারণ করতে না-পারলে  শ্রোতার মনকে স্পর্শ যায় না।       

প্রশ্ন ঃআপনার যাত্রাপালা জীবনের স্মরণীয় একটা ঘটনা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? 

উত্তর ঃ স্মরণীয় ঘটনা বলতে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে , আমবাসার কাছাকাছি একটা জায়গায় যাত্রাপালা শেষ হয়েছে। সাজঘরে এসে সাজ তুলছি। এমন সময় দেখি বাইরে লোকজন ভিড় করেছে – ‘কি ব্যাপার!’ উত্তর এলো -- ‘আমরা সাধক রামপ্রসাদকে একটু দেখতে চাই!’ ড্রেসিং রুমে সব খুলে বসে আছি, তাই আমাকে চেনা যাচ্ছিল না। বললাম, ‘আমিই রামপ্রসাদ।’ তখন দেখি সবাই একে একে প্রণাম করতে লাগলো। আমি ‘না,না, করেও কাউকে আটকাতে পারলাম না। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল আগরতলায়। এই ভক্তি-সম্মান আমাকে খুব আলোড়িত করেছিল।মনে মনে আমি সবার প্রণাম তাঁর শ্রীচরণেই অর্পণ করলাম। ঠাকুর তারা সবাই আপনার আশীর্বাদই কামনা করছে। 

প্রশ্ন ঃ নতুন শিল্পীদের গান শোনেন ? কেমন লাগে ?

উত্তর ঃ কি বলবো কিছু ভেবে পাচ্ছি না। কেন জানি, অনেকের ক্ষেত্রেই মনে হয়, সবাই যেন একে অন্যের অনুকরণ করছে। নিজস্ব ঢং তৈরি করতে পারছে না।

মঞ্চকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সবাই। বৈঠকী আড্ডা প্রায় উঠেই গেছে। অথচ এইসব ঘরোয়া আড্ডা থেকেই কিন্তু গলা তৈরি হয়। মনটাকে আগে রসে মজাতে হয়,  তারপর না,  গান !সেই বিষয়টাতে ঘাটতি লক্ষ্য করি প্রায়ই। না-হলে গলা অনেকেরই খুব ভালো। লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে ধর্মনগরের সুনাম আগে থেকেই। এখনো সেটা বজায় আছে দেখে ভালো লাগে। এ’জন্য লোকশিল্পী-শিক্ষক উত্তম দাসকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। 

প্রশ্ন ঃ আর শ্যামাসঙ্গীত ?  

উত্তর ঃ শ্যামাসঙ্গীতের চর্চা আর কোথায় হয় ? সেই  ভক্তি, বোধ কোনোটাই নেই আজকের গায়কের মধ্যে। আসবেও কোথা থেকে ! শ্যামাপুজোর সময় দু-একটা প্যান্ড্যাল ছাড়া তো সারাবছর তাঁর গান কাউকে গাইতেই দেখি না। চর্চা কম হলে তো তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই পড়বে।

প্রশ্ন ঃ আপনি তো আধুনিক গানও গাইতেন। সেই আধুনিক গানের গতি-প্রকৃতিকে আজ আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন ?

উত্তর ঃ দেখো, আমরা যে-সময়ে যে-ভাব নিয়ে, মনন নিয়ে আধুনিক বাংলা গান গাইতে  এসেছিলাম, সে সময়-মনন আজ প্রত্যাশা করি না, করা ঠিকও হবে না।  কিন্তু তা-বলে এ’কথা না-বলেও পারছি না যে, আজকালকার গান আমার ভালো লাগে  না। কেন জানি মনে হয়,আধুনিক গানের মৃত্যু হয়ে গেছে । কথা-সুর দুটোই বড় দুর্বল। কোনো  কোনো গানে বাজনার আড়ম্বরই  সারপুরনোকেও দিতে পারছে না নতুন মাত্রা। 

প্রশ্ন ঃ জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত --   

উত্তর ঃ বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর সিলেটের কুলাউড়ায় একটি  ‘বিজয়া সম্মেলনী’ হয়েছিল, তাতে গান গাওয়া।খুব সাধারণ মানের অনুষ্ঠানই ছিল কিন্তু প্রাণ ছিল অফুরন্ত, উন্মাদনায় টগবগ করছিল স্বাধীনতার আবেগমুক্তির স্বাদ।

প্রশ্ন ঃ এই সায়াহ্নবেলায় চরম উপলব্ধি –

উত্তর ঃ সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেছে। কোথাও কোনো রস নেই। কি গান  কী হয়ে যাচ্ছে ! এখন আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করে না।( দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) যাবার দিন গুনছি শুধু ...

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...