Thursday, January 23, 2025

ত্রিপুরার কবিতা জগতে জ্যোতির্ময় রায় একটি স্মরণীয় নাম / তমালশেখর দে


 কবি জ্যোতির্ময় রায় আর নেই আমাদের মাঝে । কিন্তু তাঁর কথাগুলো রয়ে গেছে । কবিতাময় তাঁর শেষ যাত্রাকে প্রণাম ।

ত্রিপুরার কবিতা জগতে জ্যোতির্ময় রায় একটি স্মরণীয় নাম। সাহিত্যের নানা শাখায় স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতেন তিনি ।
প্রশ্ন ঃ আপনি একাধারে ছড়াকার, কবি, নাট্যকার, সঞ্চালক, গবেষকও। শিল্পশাখার এতটা বিভাবে আপনার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এর মধ্যে আপনার স্বস্তির জায়গাটা নিয়ে আমাদের একটু আলোকপাত করুন!

উত্তর ঃ এক এতগু‌লো শাখা‌তে স্বচ্ছন্দ বিচর‌ণের যে ব্যাপার সে‌ক্ষে‌ত্রে বলা যায় সবগু‌লোরই মূল শিকড় এক জায়গায় ।অবশ্যই কিছুটা নান্দ‌নিক অনুভূ‌তি সহজাতভাবে আসে। অর বা‌কিটা হল জগৎ ও জীবন‌কে ভা‌লোবাসার যে জায়গাটা । কা‌জেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ ক‌রি ছড়া থে‌কে ক‌বিতা ক‌বিতা থে‌কে নাটক নাটক থে‌কে প্রবন্ধ ম‌ঞ্চে। সঞ্চালনায় । সব‌কিছুর ম‌ধ্যেই ঐক্য‌বিন্দু‌তে পাই জগৎ ও জীবন‌কে ভালবাসা । কা‌জেই অামার কোথাও কো‌ন বি‌রোধ ঘ‌টে না । আমার ম‌নে হয় সব ক্ষে‌ত্রেই আমি একই কথা বল‌ছি এবং একই বিষয়টা‌কে পা‌চ্ছি । প্রকা‌শের মাধ্যম বা অা‌ঙ্গিক বা প্রকরণ যা-ই বলুন সেটাশুধু ভিন্ন এই যা । তারপরও যদি বলতে হয় বলবো, ছড়াতেই আটকে থাকে আমার প্রাণভ্রমরা। আমি স্বস্তি এবং শান্তির দীর্ঘ শ্বাস নিই ছড়া কাটার মধ্যে দিয়েই। শিকড়ের কোথাও যেন তাকে আমি খুব নিবিড়ভাবে অনুভব করি এবং ভালবাসি।

প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার কবিতার জগৎ যতটা উজ্জ্বল, ততটা উজ্জ্বল ছড়ার জগৎ নয়। শিশুদের মধ্যেও ছড়া লেখার প্রবণতা কমে আসছে। এর কারণ কি মনে হয় আপনার ?

উত্তর : ছড়ার চর্চা একটু কম হ‌চ্ছে ব‌টে ত‌বে হতাশাব্যাঞ্জক নয় । বিস্তর ক‌বি র‌য়ে‌ছেন কিন্তু ছড়াকার সেভা‌বে উঠে আস‌ছে না । আস‌লে প্রেক্ষিতটা‌কে অস্বীকার করা যায় না । অাজকাল ঠাকুরমার ঝু‌লি,দাদামশা‌য়ের থ‌লে,কিংবা রূপকথার বা জাত‌কের গল্প ক'জন শিশু কি‌শোর প‌ড়ে ? ওরা স্কুলপাঠ্যবই‌য়ের বোঝা পি‌ঠে শুধু প্র‌তি‌যো‌গিতার দৌ‌ড়ে। আমরাও শিশু মনটা‌কে হা‌রি‌য়ে ফেল‌ছি । আমি য‌দি শিশুম‌নের দোলাটা আমার অনুভ‌বে না আন‌তে পা‌রি তো আমি শিশুছড়া লিখব কী ক‌রে? আমার প্রা‌প্তি বা সঞ্চ‌য়ের যোগান য‌দি শৈশবের ঐ আকাশ বাতাস ফুল পা‌খি প্রজাপ‌তি নদীনালা মাঠঘাটপ্রান্তর থে‌কে সমৃদ্ধ না হয় শুধু বৌ‌দ্ধিক সত্বা দি‌য়ে সে লেখা আস‌বে না । অভিজ্ঞতায় দে‌খে‌ছি ক‌বি শ‌ক্তি সুনীল নী‌রেন্দ্রনাথ খুব ভা‌লো ছড়া লিখ‌তেন । আমা‌দের রা‌জ্যে নেই তা একেবা‌রেই তা নয় । ক‌বি অনিুল সরকার বিম‌লেন্দ্র চক্রবর্তী, চুনি দাস, অপরাজিতা রায়সহ অনেকেই আছেন। কিন্তু বর্তমান এ সম‌য়ে আরও বড় ক্ষেত্র প্র‌য়োজন তো অস্বীকার করার নয় ।ত‌বে আমি একটা প্রস্তাব দি‌তে পা‌রি যে ব‌সে অাঁ‌কো প্র‌তি‌যো‌গিতা ইত্যা‌দির মত ব‌সে তাৎক্ষ‌নিকভা‌বে ছড়া লিখন প্র‌তি‌যো‌গিতা করা যে‌তে পা‌রে ।

প্রশ্ন ঃ “বরাক উপত্যকায় ১৯শে মে-র ভাষা আন্দোলন ও দ্বাদশ শহিদকথা” – আপনার একটি চমক লাগানো গবেষণামূলক বই। এই বই নিয়ে আপনার কাছে একান্ত কিছু কথা শুনতে চাই। এতদিন পর হঠাৎ এই গবেষণা পত্র কেন ?

উত্তর ঃ " বরাক উপত্যকায় ১৯শে মে-র ভাষা আন্দোলন ও দ্বাদশ শহিদকথা " বইটি আসলে হঠাৎ নয়। আর এটা আমার কোন অ্যাকাডেমিক গবেষণাও নয় । এটা আমার সত্য সন্ধান । ঘটনার কালটা আমার শৈশব । স্থানটা আমার জন্মভূমিতে ।সুতরাং একটা বাড়তি অাবেগ কাজ করেছে । আমার পিতা প্রয়াত জীতেন্দ্রলাল রায় এই ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন । এই আবেগটাও কিছুদিন ধরে কাজ করে ছিল । আন্দোলনের বিবরণ অনেকবার বাবার মুখ থেকে শুনে ডাগর ডাগর চোখে গিলেছিলাম । আমার পেশা জীবনজীবিকার ব্যস্ততায় কিছু করতে পারছিলাম না । এরই ভিতরে অামি কিছু তথ্যের খোঁজও পাই । যা আমার ভিতরের প্রেরণাগুলোকে যেন উজ্জীবিত করে তুলে ।শুরু করি ক্ষেত্র সমীক্ষা । অনেকগুলো যোগসূত্র চতুর্দিক থেকে সমন্বিত হয়েছে । তাকেই দু'মলাটের মধ্যে করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমার আবেগটা কাজ করেছে । আর চমক বলবেন কি না জানি না তবে ১৯শে মে~র শিলচরের ভাষা শহিদ সংখ্যার বিচারে সবাই একাদশ বলেন । আমি তথ্য দিয়ে শহিদ সংখ্যা একাদশ নয় দ্বাদশ দেখিয়েছি। এটা নতুননত্ব । বাংলাভাষী পাঠকবর্গ একে মান্যতা দেবেন কি না এটা তারা বুঝবেন । আমি তথ্যটা জানান দিতে চেয়েছি ।

প্রশ্ন ঃ ইদানিং আপনার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে, “প্রজন্ম চত্বর”। এই নামটা শুনলেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের কথা মনে পড়ে যায়। এই নাম এবং এর উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার কাছে কিছু জানতে চাই !

উত্তর ঃ হ্যাঁ ,বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তো স্বীকারে আছেই । পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিছু জায়গা নানাবিধ কারণে যখন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কালের ইতিহাসে ইতিহাস হয়ে যায় তখন ওই নামটাকে সবাই ব্যবহার করেন । এক সময় বাংলাদেশের শাহবাগের এই প্রজন্মচত্বর~এর প্রতিবাদ আন্দোলন বিশ্বজনবিদিত । এই প্রজন্মচত্বরে বাংলাদেশের তরুণতরুণীরা তাদের প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করে । আমি নামটা ওখান থেকে নিয়েই একটা সার্বিক ব্যঞ্জনা দিতে চেয়েছি । প্রজন্মচত্বর মানে আগামী চত্বর ।সমস্ত স্রষ্টাদের আগামীর স্থান একটা মঞ্চ বা ক্ষেত্র । আর উদ্দেশ্য বলতে ষাটের দশকে কবি পীযূষ রাউত যখন ‘জোনাকি’ পত্রিকা বের করতেন, তখনতো বাংলাদেশও হয়নি । পূর্ববঙ্গ কলকাতাত্রিপুরা ব্রহ্মপুত্র বরাক উপত্যকার সব কবিকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্র ছিল ‘জোনাকি’ ।একটা সফল অভিযাত্রা ছিল সেটা । পরবর্তী সময়ে নবপর্যায়ে কোন যোগ্যজন একে ধরে রাখেননি । সেই জোনাকি-র মতই আমি চাই ‘প্রজন্মচত্বর’-ও যাতে সকলের চারণ ক্ষেত্র হয় ।

প্রশ্ন ঃ বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিশ্চয়ই ‘বাংলা ভাষা ও সংকট’ বিষয়টা আপনাকে ভাবিয়েছে। আপনি কীভাবে ভাবছেন বিষয়টা নিয়ে?

উত্তর ঃ ভারতে বাংলাভাষা একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে,এই প্রশ্নে রাজনৈতিক গভীরে না গিয়ে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে,হ্যাঁ, আমাদের দেশ বহুভাষিক এবং বহুত্ববাদী, সেখানে প্রাদেশিক ভাষা বাংলার উপর সংখ্যাগুরুর ভাষার একটা চাপ আছে আর এটাই সংকট। তা কাটানোর জন্য মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সচেতনতা যেমন দরকার,তেমন রাজনৈতিকশক্তি গুলিরও সহিষ্ণুতা দরকার।ইদানীংকালে রাজনৈতিক আভরণে বহু শব্দ এ অঞ্চলের আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চালু করা হচ্ছে । বিশেষত উত্তর ভারতীয় শব্দগুলির বহুল ব্যবহার করা হচ্ছে । বাঙালির চিন্তাভাবনা চেতনা বোধ মনন সংস্কৃতিতে এটাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে । যুব সমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে । এনিয়ে চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে । অন্য ভাষা যত বেশি শেখা যায় তত বেশি মানুষকে অপন করা যায় ।কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে যোগ্য মর্যাদায় রেখে তো !
প্রশ্নঃ আপনি তো নাটকের সাথে বিভিন্নভাবে দীর্ঘদিন জড়িয়েছিলেন। সেই নাটক থেকে বেশ কিছুদিন থেকে দূরে। তার কারন কি ? আপনার কি মনে হয়, নাটক আসলেই সমাজের মানসিকতা পাল্টাতে সক্ষম?

উত্তরঃ হ্যাঁ, আমি নাটকের সাথে জড়িয়ে ছিলাম । বহু পথ নাটক লিখেছি । মঞ্চনাটক আলেখ্যও লিখেছি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এমনকি জাতীয় স্তরেও সরকারি অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত হয়েছে আমার নৃত্যালেখ্য পর্যন্ত। মঞ্চনাটকের পাশাপশি অসংখ্য পথনাটক করেছি । তখন পেশাগত কারণে গ্রামেগঞ্জে ,পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতাম। মানুষের সমস্যা পীড়া দিত । স্বত:স্ফূর্তভাবে মানুষের গান নাটকের সংলাপ বেড়িয়ে আসত । তখন বিভিন্ন কর্মসূচীতে এলাকার বন্ধুবান্ধব শিশুকিশোরদেরকে নিয়ে নাটক করতাম । পরবর্তীতে আমার কাজের ক্ষেত্রটা পরিবর্তন হয়ে যায় । সময়টা অন্যদিকে ব্যয় হত । নাটকের জন্য প্লট ভাবনায় আসলেও প্রতিটি চরিত্র অনুযায়ী সরস সংলাপ ,নাটকের দ্বন্দ্ব বা উত্তরণের বিষয় নিয়ে ভাবনার সুযোগ থাকত না ।
আর সখের নাটকের পক্ষ নিয়ে নিছক বিনোদনের জন্য নাটক নয় মানুষ নাটকটাকে দেখে যাতে তার মননে কিছু নিয়ে যেতে পারেন তার পক্ষে আমি । নাটক তো জীবন থেকে উৎসারিত বিষয় । এই নাটকে মানুষের যাপনের প্রতিটি মুহুর্তের বিভিন্ন বাস্তবোচিত দিক তুলে ধরা যায় । এই নাটকের মধ্যে মানুষ তাকেই দেখেন । তার সুখ দু:খ ব্যাথা বেদনা যন্ত্রণাকে স্বীয় চোক্ষে অবলোকন করেন । সফল নাটক থেকে তার উত্তরণের পথও পেয়ে যান তারা । সমাজ সভ্যতার শত্রু মিত্রকে চিহ্নিত করতে পারেন মানুষ এই নাটকের মধ্য দিয়েই । কাজেই শিশুর বাসযোগ্য নতুন বিশ্ব গঠনে নাটক যে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে
তা অনুমেয় ।


May be an image of 1 person and smiling
All reactions:
Niharika Prokashani, শম্ভু শংকর and 39 others

“দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব”- এক অনন্য পাঠ অভিজ্ঞতা / তমালশেখর দে


 

“দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব”- এক অনন্য পাঠ অভিজ্ঞতা

                  তমালশেখর দে

 

 আলোচক সেলিম মুস্তাফা-র “দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব” গ্রন্থটি চোখের পলকেই আমার হৃদয় ছুঁয়ে নিল । কবি হিসেবে তিনি আমার খুবই প্রিয় । সম্প্রতি বেশ কয়েক বছর থেকে তিনি আলোচনা সাহিত্যের দিকেও প্রবলভাবে আলোকপাত করছেন । সৈকত প্রকাশন থেকে এবাবের ৪৩তম আগরতলা বইমেলায় তার এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে স্বভাবতই খুব আগ্রহ নিয়ে বইটি হাতে তুলে নিইএবং প্রথমেই খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখ যায় ব্ল্যার্বের দিকে, যেখানে দেখতে পাই, প্রকাশক লিখছেন - “ত্রিপুরার আলোচনা সাহিত্যের সূত্রপাত প্রয়াতা সাহিত্যিক অপরাজিতা রায়ের হাতে, সেই ষাটের দশকে । এরপর চেষ্টা করেছেন অনেকে, যদিও সেভাবে দানা বাঁধেনি কারো প্রয়াস । প্রায় শূন্য এই জায়গায়, গত চার বছরে, সামান্য হলেও দাগ কাটতে পেরেছেন কবি সেলিম মুস্তাফা।” কথাগুলো  বড় দাগ কাটল মনে। বস্তুতই ত্রিপুরার আলোচনা সাহিত্য সব অর্থেই বড় দুর্বল । তবে এখানে অবশ্যই একটি প্রশ্ন উঠে আসে, আলোচনা সাহিত্য উন্নতি করল না কেন? সেটা কি লেখকের অভাবে ? নাকি আলোচকের অভাবে ? মূলত এই প্রশ্নটাই আমাকে খুব ভাবাচ্ছিল! কিছুক্ষণ এইসব নিয়ে ভাবা প্র্যাকটিসের পর দেখলাম, না, ত্রিপুরার সাহিত্য, সেটা কবিতা- গল্প- উপন্যাসই, যে পর্যায়েরই হোক, আলোচনা করার মতো বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে তাহলে আলোচনা-সমালোচনার জায়গাটা এখনও এত ফাঁকা বা দুর্বল কেন ? আমি বিশ্বাস করি, বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সব সময় সাহিত্যকে বিচক্ষণ বা পরিপক্ হতে সাহায্য করে ।  আলোচক এই গ্রন্থের মধ্যে দশজন কবি এবং চারজন কথাকারের নিবিড় পর্যালোচনা করেছেন । কবিদের মধ্যে রয়েছেন– কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি তপন দেবনাথ, কবি স্বপন সেনগুপ্ত, কবি প্রদীপ চৌধুরী, কবি পীযূষ রাউত,কবি শক্তি দত্ত রায়, কবি অজিতা চৌধুরী, কবি মানস পাল, কবি অর্পিতা আচার্য, কবি স্বাতী ইন্দু, গল্পকার-উপন্যাসিক দীপক দেব, গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে, উপন্যাসিক সুতপা দাস, গল্পকার দীপক দেব।

দীর্ঘ ৩৩৬ পাতার বইটি পড়তে পড়তে আলোচকের মুনশিয়ানায়, তার বিচক্ষণ পর্যালোচনায়  মুগ্ধ হয়েছি গ্রন্থের শুরুতেই “আমার কথা” লেখার এই অংশ আলোচক লিখছেন –“গল্প, কবিতা, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, আর দর্শনের সাহিত্যবিষয়ক তত্ত্বগুলি পাঠ করা আমার প্রিয় একটা বিষয় । কৌতূহলের বিষয় । আর পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় সেই তত্ত্বগুলির প্রয়োগ সাহিত্যে কোথাও আছে কিনা তা খুঁজে বের করার” বইটি পড়তে পড়তে দেখেছি আলোচক ঠিক সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই সবার সাহিত্য জগত নিয়ে আলোচনা করেছেন । কবি দীপঙ্কর সাহাকে লেখক তার চিন্তার জগত থেকে কবিতায় তার প্রভাব, এবং কীভাবে প্রভাবটা বিস্তার লাভ করেছে, সে নিয়ে তাঁর কবিতার লাইন ধরে ধরে সেলিম মুস্তাফা আলোচনা করেছেন যেমন তিনি লিখছেন –“  দীপঙ্করের মধ্যে আমরা পাচ্ছি এক শহুরে বাতাবরণ । তাঁর বাক্যগঠন কিছুটা দয়াহীন মনে হতে পারে । যতিচিহ্নের মধ্যে থাকার লোক ছিলেন না তিনি বলাই বাহুল্য, তাই বারবার পড়ে বুঝে নিতে হয় মূল অন্বেষণটি। ... তাঁর প্রায় সব লেখাই স্বয়ং-বিশ্লিষ্ট । দৃশ্যের কোলাজ-সেটিংএ উঠে আসে সময়, আর সময়কে ধরার, সমাজকে ধরার, আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলি আর সভ্য-ফাঁকিগুলি চোখের সামনে বেফাঁস করার তীক্ষ্ন আর মিতভাষ আঙ্গিক।” এভাবে আলোচক  দীপঙ্কর সাহার কবি সত্তাকে আবিষ্কার করেন । তবে এই গ্রন্থের মূল আকর্ষণ এবং আবিষ্কার মূলত গল্পকার এবং উপন্যাসিক দীপক দেব । ত্রিপুরার সাহিত্যে দীপক দেবকে নিয়ে কোনো ধরণের আলোচনা আজ পর্যন্ত হয়নি । অথচ এই দীপক দেবের মতো প্রতিভা বিরল । আলোচক তার – “ দীপক দেবের গল্প-ভুবন ঃ কিছু কথা”-য় তাঁর প্রতিভা প্রতিটি গল্প ধরে ধরে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন ।  এসেছে তাঁর জীবনের জানা- অজানা কাহিনি ।  আলোচকের কাছ থেকেই জানতে পারি, দীপক দেবের সব লেখালেখি পাওয়া যায়নি । নানাবিধ কারণে এদিকওদিক ছড়িয়ে আছে । তবু যে-কটা পাওয়া গেছে সেইসব নিয়েই তিনি আলোচনা করেছেন । এখানে আলোচক প্রতিষ্ঠা করেন, দীপক দেব কেন একজন প্রতিভাধর গল্পকার । গল্পের প্লট, গল্পের সংলাপ, তাদের কথোপকথন, চরিত্রের বিস্তার, সব মিলিয়ে তিনি সত্যিই এক বিরল প্রতিভা । তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ।  এরপর কবি স্বপন সেনগুপ্তকে আলোচক আলোচনা করেন, যার শিরোনাম তিনি দিয়েছেন – “ ধুলোমাখা পিঁড়িতে একাকী...”।  তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন- “ ত্রিপুরায় সাহিত্যের যে ভাষা ও বাতাবরণ ছিল, তার থেকে স্বপন সেনগুপ্তের রচনার ভাষা আর বিষয় যেন সহসাই অন্যরকম । আর এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য, এটাই ছিল তাঁর চিহ্নায়ন ।” কবির মূল বৈশিষ্ট্যকে ধরে ধরে এরপর আলোচক একে একে তাঁর কবিতার বিশ্লেষণ করেন ।  এই যে আলোচনা, এবং আলোচনার ধরণ, ত্রিপুরায় প্রায় দেখাই যায় না । আমরা পাঠক বা লেখক হিসেবে বই পড়ি, কিন্তু সেসব বই নিয়ে  আমরা কোনোদিনই সিরিয়াসলি কোনো আলোচনা করিনি । 

এরপর আমরা পাচ্ছি – “প্রদীপ চৌধুরী ঃ কবিতাধর্মের কবি – কবির কবিতা ধর্ম” । প্রদীপ চৌধুরীকে আলোচক আর আগেও অবশ্য আলোচনা করেছেন । কিন্তু এত ব্যাপক স্তরে তাঁকে নিয়ে আলোকপাত করেননি ।  কবি প্রদীপ চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে আলোচক লিখছেন – “ কলকাতায় গুটিকয়ই ছিলেন তাঁর আত্মার খুব কাছাকাছি, বরং বন্ধুসংখ্যা ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বময় । ফলে তাঁর কাব্যভাবনা ও বিশ্বাস ছিল এমন তন্ত্রীতে বাঁধা, যার প্রকৃতই কোনো দেশ-কাল নেই – সেই চিরন্তন অনিবার্য – অনপনেয় প্রেম – মানুষের প্রতি মানুষের অলঙ্ঘ্য আকর্ষণ, যা যে-কোনো সৃজনের অপিহার্য, অনস্বীকার্য বিষয় । আর এখানেই এই মানবধর্মের কাছেই ছিলেন তিনি চির-আনত।” এই ছোট্ট মন্তব্য থেকেই আমরা কবি প্রদীপ চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব এবং কবি-সত্তাকে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছি । আলোচক তার গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এই কবিকে নিয়ে ।  এরপর “কবি পীযূষ রাউত – মানুষের আত্মজন” অংশে কবিকে নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করে কবিকে তার বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে আনেন । যদিও কবি পীযূষ রাউত সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি । কিন্তু অবাক হয়েছি “ ‘উদোম শিশুর মতো কবিতাই মুক্তি আনে’ ঃ কবি শক্তি দত্ত রায়” পড়ে । এই কবির তো কোনো কবিতাই আমার পড়া ছিল না । এই গ্রন্থে এটা আমার এক চরম প্রাপ্তি ।  এরপর পাচ্ছি আমরা “ কবি অজিতা চৌধুরী ও কবির ভূখণ্ড” ।  কবি অজিতা চৌধুরীকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে । তাঁর কবিতাও গুণমুগ্ধ আমি । তাঁকে নিয়ে আলোচকের আলোচনা সত্যিই অসাধারণ । এরপর পাচ্ছি – “ মানস পাল এক আপসহীন মানুষ, এক প্রতিবাদী কবি” । কবি মানস পালের কবিতার মধ্যে তিনি প্রেম এবং প্রতিবাদ এই  দুটো বৈশিষ্ট্যই প্রবলভাবে খুঁজে পেয়েছেন । এবং আলোচক বলেছেন, একজন কবির “বাস্তবের মুখোমুখি হওয়াই তো প্রকৃত জয়।” আর এখানেই আমরা কবি  মানস পালের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যকে আবিষ্কার করি । এরপর আমরা আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যার নাম কিশোর রঞ্জন দে । ত্রিপুরার সাহিত্য জগতে খুবই পরিচিত এবং অনন্য এক মেধাবী সত্তা, তাঁকে নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনা করেছেন লেখক তার “ কিশোর রঞ্জন দে এক মেধাবী ঘাতক” অধ্যায়ে । যেখানে তিনি লিখছেন – “কিশোররঞ্জনের লেখায় সাধারণত কোনো দৃষ্টি-আকর্ষক চমক লক্ষ করা যায় না, যা করেন তা খুবই রয়ে-সয়ে খুব মসৃণভাবে, তলে তলে। উপরন্তু, গল্পে তিনি লেখক হিসেবে অনুপ্রবেশও করেন না । নেই বিভিন্ন চরিত্রে ঢুকে অযথা মানসিক বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্য” । আসলে, এই যে গল্পকারের লক্ষণ বিশ্লেষণ করলেন, আলোচক, এটাই একজন গল্পকার জানতে চায় আলোচকের কাছ থেকেই ।  গল্পের বিষয় তো আসবে পরে । গল্প ছাড়াও একটি গল্পে আরও অনেক বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে থাকে, সেটা আবিষ্কার করাই তো মূলত আলোচকের কাজ । সে কাজে সত্যিই সেলিম মুস্তাফা তার দক্ষতা দেখিয়েছেন ।

এভাবেই আলোচক একে একে গল্পকার দীপক চক্রবর্তীর গল্পে কীভাবে সামাজিক জীবন, জীবনের সংকট ফুটে উঠেছে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন । তেমনি উপন্যাসিক “সুতপা দাসের উপন্যাস” অধ্যায়ে আলোচক তার উপন্যাসের বিভিন্ন পর্যায় বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে চরিত্ররা এক সময় নিজেরাই এক একটা স্বতন্ত্র চরিত্র হয়ে ফুটে ওঠে । আলোচক বলছেন – “গল্প উপন্যাস লেখকের একটা একান্ত গোপন তত্ত্ব থাকে, একটা অভিসন্ধান থাকে।” এই বিষয় ভাবনাকে আলোচক আরও বিস্তারিত করেছেন, যা সত্যি আমার কাছে এক নতুন উপলব্ধি ।  এরপর আলোচক “কবি অর্পিতা আচার্য” অধ্যায়ে কবির মনোজগত এবং তার কবিতার বিষয়বস্তুকে খুব সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেনএই গ্রন্থের শেষ নিবেদন – “স্বাতী ইন্দু ঃ তির্যক বর্শার ফলা”। এই কবিকে নিয়ে ত্রিপুরার কোথাও তেমন আলোচনাই হয়নি ।  এই মেধাবী কবিকে আলোচক তুলে এনেছেন তার এই মূল্যবান গ্রন্থে । যার খুব প্রয়োজন ছিল ।

অবশেষে বলতেই হয়,আলোচক সেলিম মুস্তাফা-র “দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব” গ্রন্থটি ত্রিপুরার সাহিত্যে একটা নতুন সূত্রপাত । নতুন সংযোজন । এই ধরণের গ্রন্থ সচরাচর চোখে পড়ে না । প্রচ্ছদ করেছেন  আরেক উল্লেখ্যযোগ্য কবি অরূপ দত্ত । খুবই ইঙ্গিতবহ । মন কেড়ে নেয় সহজেই। এই মূল্যবান গ্রন্থটির সার্বিক সাফল্য কামনা করছি ।  

    

 

 

Wednesday, January 22, 2025

জিভের টানেলের সামনে অকুতোভয় কবি সম্রাট / তমালশেখর দে


 

  জিভের টানেলের সামনে অকুতোভয় কবি সম্রাট

            বুক  রিভিউ তমালশেখর দে  

 “তোমার আমার কাব্য বিছানার/ চাদর মুড়িয়ে নিয়ে গেছে / পরিযায়ী ঝলসানো ঠোঁট”  ( টেলিফোন) “পাজামার ফিতের মতো / বারবার খুলে যায় জুড়ির বাঁধে / কফির চামচ ডুবিয়ে ধরে / রাখতে পারিনি স্যান্ডউইচ মুড়ি দেওয়া / ফুটো ফুটো ঘামের যৌনতা” (এস্রাজ) “ জিভের টানেলের সামনে / এখনো জড়িয়ে আছো / জড়িয়ে আছো রাতের ভাষায় / থানা রোডের সিগন্যালের মতো” (সিগন্যাল)তরুণ কবি সম্রাট শীলের  ৪৩তম আগরতলা বইমেলাপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ – “ যতবার উৎসব কেটে গেছে” পাঠ করতে করতে দেখছিলাম, তরুণ কবিদের কবিতার ভাষা কীভাবে পালটে যাচ্ছে পূর্ববর্তী কবিদের কাব্যভাষা থেকে । এটাই বোধহয় সময়ের প্রভাব । জীবনের ভিতর থেকে ছোটো ছোটো বিষয়কে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাচ্ছে তার ভাবনার জগতে । প্রেমকে আর গভীর বিষয় হিসেবে দেখছে তারা । তারা সামাজিক প্রেক্ষাপটের আরও গভীরে চলে যাচ্ছে অনায়াসে । তাই তো সম্রাট লিখছে – “ যতটা দৌড়বার কথা ছিল / ঠিক ততটা মুখ থুবড়ে পড়ে যাই” ( ডুবতে দেখি)। কিংবা “ আমি জানি না কতটা / ফুল তুলে নিলে / একটি গাছ দিনের পর দিন / আমাকে এড়িয়ে বসে থাকে” (বুক-পকেট) এই প্রজন্মের ভাষা, উপমা, কীভাবে একটু একটু করে পালটে পালটে এগিয়ে যাচ্ছে । নিজেকে প্রশ্ন করতে করতে তারা ধরতে চাইছে জীবনের জটিলতাকে । রাজনৈতিক- সামাজিক জটিলতাকে । রসে আহ্লাদিত প্রেমের কাব্যময় ভাষা থেকে সম্রাট কিছুটা নিজেকে দূরেই সরিয়ে রেখেছে । আবেগ-সর্বস্ব প্রেমের বাস্তবতা থেকে জেন-জি জেনারেশন ক্রমশ যে সরে আসছে , এইসব কবিতা পড়েই তা বোঝা যাচ্ছে । তারা এখন বাস্তবতার খুব কাছাকাছি থাকতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে । তাই কী সুন্দর বয়ান করছে – “ এবার কোনো ফসল ফলেনি / খুলেনি ডিএনপির ঢাকনা / পাম্পের দরজা আর / তোমার ঠোঁটের পাঁচিল” ( পাঁচিল) কিংবা “ যেভাবে থরফর করে শুকিয়ে / গেছে তোমার চোখের কাজল / এখন আর লিখতে চাই না / ভাঙা গ্লাসে চুমুর অবশিষ্ট ছোবল” ( চুমু) তরুণ কবিদের এইসব ভাবনা আমাকে প্রেরণা দেয় । নিজের দেখা জগত থেকে তুলে আনছে কবিতা । চিত্রকল্প ।  তাদের সম্ভাবনা নিয়ে আমি খুব আশাবাদী । কবি সম্রাট শীলও খুব মননশীল । নিশ্চয়ই তারা ত্রিপুরার কবিতা জগতকে আগামীতে আরও ভালো ভালো কাব্য উপহার দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করবে । প্রচ্ছদ করেছেন অশোক দেব । বরাবরের মতো মন ছুঁয়ে যাওয়া তাঁর কাজ ।      

 

 

রাহুল শীলের কবিতায় আত্মক্ষরণের পদচিহ্ন / তমালশেখর দে


 

                 রাহুল শীলের কবিতায়  আত্মক্ষরণের পদচিহ্ন

                   তমালশেখর দে  

 

 জম্পুই গেলে সাথে নিয়ে যাই আত্মশোক,/ দহনের সাথে শীতলতা মিশিয়ে নিতে গিয়ে/ ফুলডুংসের গ্রামের যুবতীরা চেয়ে থাকলে ভাবি / সমতল থেকে আমরা যেন প্রতারক সেজে এসেছি” – কবিতার নাম পাহাড়-প্রেরিত পড়ছিলাম  ‘৪৩তম আগরতলা বইমেলা-য় প্রকাশিত তরুণ কবি রাহুল শীলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ - স্বনির্মিত জতুগৃহ আত্মক্ষরণ সমতল থেকে আমরা যেন প্রতারক সেজে এসেছি”—কবির এই স্বীকারোক্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে প্রথম লাইনে লিখেছেন – ‘“জম্পুই গেলে সাথে নিয়ে যাই আত্মশোক এই আত্মশোকএবং প্রতারকদুই লাইনের শব্দদুটিকে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে কবির ব্যথা অনুভব করার চেষ্টা করলাম কোনো ধরণের ভূমিকা না- রেখেই হঠাৎ কবি নিজেকে প্রতারক বলতে গেলেন কেন ? এই বিষয়টা আমাকে উৎসাহিত করল । আগ্রহ বাড়ল । দেখলাম এরপর কবি লিখছেন – “ নীরবতার পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে দেখি / কোথাও কোনো শব্দ নেই হিংস্রতার! / আলোগুলো নিভে যায় রাত বেড়ে গেলে / আমরা তখন উন্মাদ হয়ে রাস্তায় চিৎকার করে বলি - / জম্পুই উই লাভ ইউ / ইয়োর পীসফুল ডার্কনেস ইজ আওয়ার এক্সট্রিম নীড কবির শান্তির সন্ধান আমাদের ভাবায় ইংরেজি বাক্যের চমৎকার ব্যবহার ভাল লেগেছে এক্সট্রিম নীডশব্দটা  গোপনে যেন অনেক কথাই বলে গেল কিন্তু এরপের দুটি কাইনে আমি একটু অবাক এবং মুগ্ধও হলাম, যেখানে কবি লিখছেন – “আর পাহাড়প্রেরিত প্রতিধ্বনিতে শুনতে পাই একগুচ্ছ তিরস্কার / এবং শুনতে পাই আমাদেরই সমস্ত ইচ্ছাকৃত হিংস্রস্মৃতি কবির সরল পাহাড়িদের একগুচ্ছ তিরস্কারঅনুভব ক্রেতে পেরেছেন তাও আবার একগুচ্ছ এবং যা আমাদেরই ফেলে আসা অর্থাৎ কবি এখানে নিজেও জড়িয়েছেন কবি নিজের আত্মশোকপোষণ করতে করতে, কিংবা তার বেদনা ভুলতে পাহাড়ে গিয়ে নিজেকেই খুঁজে পেলেন হিংস্রহিসেবে কিংবা তার প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রত্যাখ্যান, একগুচ্ছ তিরস্কার, নিয়ে যেন কবি ফিরলেন জম্পুই থেকে এই আত্ম-উপলব্ধি কবির নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখার এই স্পর্ধা আমার ভালো লেগেছে একজন তরুণ কবির কাছে আজ তো এটাই কাম্য তিনি নিজেকে দেখবেন নিজের ভিতর দিয়ে অন্যকে দেখাবেন, তার দেখা নিজেকে দেখার এই প্রবণতা কবির অন্যান্য ৫৭টি কবিতায়ও দেখতে পেয়েছি নিজস্ব  কালো ছায়ার কাছে রোজ মিশে যাচ্ছে যে বিড়ালটি / খুবলে খাচ্ছে গার্হস্থের স্মৃতি, মধ্যরাত্রির শীৎকার !/ তার কাছে কি করে দাঁড়াই সংস্কারপন্থী হয়ে/ এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য এঁকে যাচ্ছে আমারই আত্মপ্রচ্ছদ( প্রচ্ছদ) কিংবা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিকারা / বসে আছে শুধু শুধু / জম্পুই হিলসে চুম্বনোপযোগী কোনো দৃশ্য নেই।( স্মৃতি বিজড়িত) কিংবা প্রেমিকার কথা লিখলে/ভাববেন না আমি একতরফা লিখি,/রাষ্ট্রের কথা লিখলে /ভাববেন না আমি বিপ্লব ঘটাতে চাইছি !’(অনুরোধ)

 

কবি রাহুল শীল সম্ভাবনাময় এই কথা তো বলাই যায় প্রস্তুত্তিপর্ব সফলভাবেই অতিক্রম করতে পেরেছেন, -কথা এখন বলাই যায় তবে কবিতার মূল পর্ব এখান থেকেই গড়তে হবে কবিকে সমাজজীবন, আমাদের ব্যক্তিজীবন, আমাদের ভালোবাসার ভিতরে দহনজ্বালা, তার রাষ্ট্রীয় প্রকাশ, এখন এইসব বিষয়  নিশ্চয়ই আরও সংযম এবং গভীরতার সাথে কবির কবিতায় উঠে আসবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি প্রচ্ছদ আরও কবিতাকেন্দ্রিক হতে পারত পাঠকরা রাহুল শীলেরস্বনির্মিত জতুগৃহ আত্মক্ষরণ”-টি হাতে তুলে দেখুন, আশাকরি ভাল লাগবে

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...