Thursday, January 23, 2025

“দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব”- এক অনন্য পাঠ অভিজ্ঞতা / তমালশেখর দে


 

“দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব”- এক অনন্য পাঠ অভিজ্ঞতা

                  তমালশেখর দে

 

 আলোচক সেলিম মুস্তাফা-র “দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব” গ্রন্থটি চোখের পলকেই আমার হৃদয় ছুঁয়ে নিল । কবি হিসেবে তিনি আমার খুবই প্রিয় । সম্প্রতি বেশ কয়েক বছর থেকে তিনি আলোচনা সাহিত্যের দিকেও প্রবলভাবে আলোকপাত করছেন । সৈকত প্রকাশন থেকে এবাবের ৪৩তম আগরতলা বইমেলায় তার এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে স্বভাবতই খুব আগ্রহ নিয়ে বইটি হাতে তুলে নিইএবং প্রথমেই খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখ যায় ব্ল্যার্বের দিকে, যেখানে দেখতে পাই, প্রকাশক লিখছেন - “ত্রিপুরার আলোচনা সাহিত্যের সূত্রপাত প্রয়াতা সাহিত্যিক অপরাজিতা রায়ের হাতে, সেই ষাটের দশকে । এরপর চেষ্টা করেছেন অনেকে, যদিও সেভাবে দানা বাঁধেনি কারো প্রয়াস । প্রায় শূন্য এই জায়গায়, গত চার বছরে, সামান্য হলেও দাগ কাটতে পেরেছেন কবি সেলিম মুস্তাফা।” কথাগুলো  বড় দাগ কাটল মনে। বস্তুতই ত্রিপুরার আলোচনা সাহিত্য সব অর্থেই বড় দুর্বল । তবে এখানে অবশ্যই একটি প্রশ্ন উঠে আসে, আলোচনা সাহিত্য উন্নতি করল না কেন? সেটা কি লেখকের অভাবে ? নাকি আলোচকের অভাবে ? মূলত এই প্রশ্নটাই আমাকে খুব ভাবাচ্ছিল! কিছুক্ষণ এইসব নিয়ে ভাবা প্র্যাকটিসের পর দেখলাম, না, ত্রিপুরার সাহিত্য, সেটা কবিতা- গল্প- উপন্যাসই, যে পর্যায়েরই হোক, আলোচনা করার মতো বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে তাহলে আলোচনা-সমালোচনার জায়গাটা এখনও এত ফাঁকা বা দুর্বল কেন ? আমি বিশ্বাস করি, বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সব সময় সাহিত্যকে বিচক্ষণ বা পরিপক্ হতে সাহায্য করে ।  আলোচক এই গ্রন্থের মধ্যে দশজন কবি এবং চারজন কথাকারের নিবিড় পর্যালোচনা করেছেন । কবিদের মধ্যে রয়েছেন– কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি তপন দেবনাথ, কবি স্বপন সেনগুপ্ত, কবি প্রদীপ চৌধুরী, কবি পীযূষ রাউত,কবি শক্তি দত্ত রায়, কবি অজিতা চৌধুরী, কবি মানস পাল, কবি অর্পিতা আচার্য, কবি স্বাতী ইন্দু, গল্পকার-উপন্যাসিক দীপক দেব, গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে, উপন্যাসিক সুতপা দাস, গল্পকার দীপক দেব।

দীর্ঘ ৩৩৬ পাতার বইটি পড়তে পড়তে আলোচকের মুনশিয়ানায়, তার বিচক্ষণ পর্যালোচনায়  মুগ্ধ হয়েছি গ্রন্থের শুরুতেই “আমার কথা” লেখার এই অংশ আলোচক লিখছেন –“গল্প, কবিতা, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, আর দর্শনের সাহিত্যবিষয়ক তত্ত্বগুলি পাঠ করা আমার প্রিয় একটা বিষয় । কৌতূহলের বিষয় । আর পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় সেই তত্ত্বগুলির প্রয়োগ সাহিত্যে কোথাও আছে কিনা তা খুঁজে বের করার” বইটি পড়তে পড়তে দেখেছি আলোচক ঠিক সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই সবার সাহিত্য জগত নিয়ে আলোচনা করেছেন । কবি দীপঙ্কর সাহাকে লেখক তার চিন্তার জগত থেকে কবিতায় তার প্রভাব, এবং কীভাবে প্রভাবটা বিস্তার লাভ করেছে, সে নিয়ে তাঁর কবিতার লাইন ধরে ধরে সেলিম মুস্তাফা আলোচনা করেছেন যেমন তিনি লিখছেন –“  দীপঙ্করের মধ্যে আমরা পাচ্ছি এক শহুরে বাতাবরণ । তাঁর বাক্যগঠন কিছুটা দয়াহীন মনে হতে পারে । যতিচিহ্নের মধ্যে থাকার লোক ছিলেন না তিনি বলাই বাহুল্য, তাই বারবার পড়ে বুঝে নিতে হয় মূল অন্বেষণটি। ... তাঁর প্রায় সব লেখাই স্বয়ং-বিশ্লিষ্ট । দৃশ্যের কোলাজ-সেটিংএ উঠে আসে সময়, আর সময়কে ধরার, সমাজকে ধরার, আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলি আর সভ্য-ফাঁকিগুলি চোখের সামনে বেফাঁস করার তীক্ষ্ন আর মিতভাষ আঙ্গিক।” এভাবে আলোচক  দীপঙ্কর সাহার কবি সত্তাকে আবিষ্কার করেন । তবে এই গ্রন্থের মূল আকর্ষণ এবং আবিষ্কার মূলত গল্পকার এবং উপন্যাসিক দীপক দেব । ত্রিপুরার সাহিত্যে দীপক দেবকে নিয়ে কোনো ধরণের আলোচনা আজ পর্যন্ত হয়নি । অথচ এই দীপক দেবের মতো প্রতিভা বিরল । আলোচক তার – “ দীপক দেবের গল্প-ভুবন ঃ কিছু কথা”-য় তাঁর প্রতিভা প্রতিটি গল্প ধরে ধরে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন ।  এসেছে তাঁর জীবনের জানা- অজানা কাহিনি ।  আলোচকের কাছ থেকেই জানতে পারি, দীপক দেবের সব লেখালেখি পাওয়া যায়নি । নানাবিধ কারণে এদিকওদিক ছড়িয়ে আছে । তবু যে-কটা পাওয়া গেছে সেইসব নিয়েই তিনি আলোচনা করেছেন । এখানে আলোচক প্রতিষ্ঠা করেন, দীপক দেব কেন একজন প্রতিভাধর গল্পকার । গল্পের প্লট, গল্পের সংলাপ, তাদের কথোপকথন, চরিত্রের বিস্তার, সব মিলিয়ে তিনি সত্যিই এক বিরল প্রতিভা । তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ।  এরপর কবি স্বপন সেনগুপ্তকে আলোচক আলোচনা করেন, যার শিরোনাম তিনি দিয়েছেন – “ ধুলোমাখা পিঁড়িতে একাকী...”।  তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন- “ ত্রিপুরায় সাহিত্যের যে ভাষা ও বাতাবরণ ছিল, তার থেকে স্বপন সেনগুপ্তের রচনার ভাষা আর বিষয় যেন সহসাই অন্যরকম । আর এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য, এটাই ছিল তাঁর চিহ্নায়ন ।” কবির মূল বৈশিষ্ট্যকে ধরে ধরে এরপর আলোচক একে একে তাঁর কবিতার বিশ্লেষণ করেন ।  এই যে আলোচনা, এবং আলোচনার ধরণ, ত্রিপুরায় প্রায় দেখাই যায় না । আমরা পাঠক বা লেখক হিসেবে বই পড়ি, কিন্তু সেসব বই নিয়ে  আমরা কোনোদিনই সিরিয়াসলি কোনো আলোচনা করিনি । 

এরপর আমরা পাচ্ছি – “প্রদীপ চৌধুরী ঃ কবিতাধর্মের কবি – কবির কবিতা ধর্ম” । প্রদীপ চৌধুরীকে আলোচক আর আগেও অবশ্য আলোচনা করেছেন । কিন্তু এত ব্যাপক স্তরে তাঁকে নিয়ে আলোকপাত করেননি ।  কবি প্রদীপ চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে আলোচক লিখছেন – “ কলকাতায় গুটিকয়ই ছিলেন তাঁর আত্মার খুব কাছাকাছি, বরং বন্ধুসংখ্যা ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বময় । ফলে তাঁর কাব্যভাবনা ও বিশ্বাস ছিল এমন তন্ত্রীতে বাঁধা, যার প্রকৃতই কোনো দেশ-কাল নেই – সেই চিরন্তন অনিবার্য – অনপনেয় প্রেম – মানুষের প্রতি মানুষের অলঙ্ঘ্য আকর্ষণ, যা যে-কোনো সৃজনের অপিহার্য, অনস্বীকার্য বিষয় । আর এখানেই এই মানবধর্মের কাছেই ছিলেন তিনি চির-আনত।” এই ছোট্ট মন্তব্য থেকেই আমরা কবি প্রদীপ চৌধুরীর ব্যক্তিত্ব এবং কবি-সত্তাকে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছি । আলোচক তার গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এই কবিকে নিয়ে ।  এরপর “কবি পীযূষ রাউত – মানুষের আত্মজন” অংশে কবিকে নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করে কবিকে তার বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে আনেন । যদিও কবি পীযূষ রাউত সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি । কিন্তু অবাক হয়েছি “ ‘উদোম শিশুর মতো কবিতাই মুক্তি আনে’ ঃ কবি শক্তি দত্ত রায়” পড়ে । এই কবির তো কোনো কবিতাই আমার পড়া ছিল না । এই গ্রন্থে এটা আমার এক চরম প্রাপ্তি ।  এরপর পাচ্ছি আমরা “ কবি অজিতা চৌধুরী ও কবির ভূখণ্ড” ।  কবি অজিতা চৌধুরীকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে । তাঁর কবিতাও গুণমুগ্ধ আমি । তাঁকে নিয়ে আলোচকের আলোচনা সত্যিই অসাধারণ । এরপর পাচ্ছি – “ মানস পাল এক আপসহীন মানুষ, এক প্রতিবাদী কবি” । কবি মানস পালের কবিতার মধ্যে তিনি প্রেম এবং প্রতিবাদ এই  দুটো বৈশিষ্ট্যই প্রবলভাবে খুঁজে পেয়েছেন । এবং আলোচক বলেছেন, একজন কবির “বাস্তবের মুখোমুখি হওয়াই তো প্রকৃত জয়।” আর এখানেই আমরা কবি  মানস পালের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যকে আবিষ্কার করি । এরপর আমরা আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যার নাম কিশোর রঞ্জন দে । ত্রিপুরার সাহিত্য জগতে খুবই পরিচিত এবং অনন্য এক মেধাবী সত্তা, তাঁকে নিয়ে নিবিষ্ট আলোচনা করেছেন লেখক তার “ কিশোর রঞ্জন দে এক মেধাবী ঘাতক” অধ্যায়ে । যেখানে তিনি লিখছেন – “কিশোররঞ্জনের লেখায় সাধারণত কোনো দৃষ্টি-আকর্ষক চমক লক্ষ করা যায় না, যা করেন তা খুবই রয়ে-সয়ে খুব মসৃণভাবে, তলে তলে। উপরন্তু, গল্পে তিনি লেখক হিসেবে অনুপ্রবেশও করেন না । নেই বিভিন্ন চরিত্রে ঢুকে অযথা মানসিক বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্য” । আসলে, এই যে গল্পকারের লক্ষণ বিশ্লেষণ করলেন, আলোচক, এটাই একজন গল্পকার জানতে চায় আলোচকের কাছ থেকেই ।  গল্পের বিষয় তো আসবে পরে । গল্প ছাড়াও একটি গল্পে আরও অনেক বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে থাকে, সেটা আবিষ্কার করাই তো মূলত আলোচকের কাজ । সে কাজে সত্যিই সেলিম মুস্তাফা তার দক্ষতা দেখিয়েছেন ।

এভাবেই আলোচক একে একে গল্পকার দীপক চক্রবর্তীর গল্পে কীভাবে সামাজিক জীবন, জীবনের সংকট ফুটে উঠেছে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন । তেমনি উপন্যাসিক “সুতপা দাসের উপন্যাস” অধ্যায়ে আলোচক তার উপন্যাসের বিভিন্ন পর্যায় বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে চরিত্ররা এক সময় নিজেরাই এক একটা স্বতন্ত্র চরিত্র হয়ে ফুটে ওঠে । আলোচক বলছেন – “গল্প উপন্যাস লেখকের একটা একান্ত গোপন তত্ত্ব থাকে, একটা অভিসন্ধান থাকে।” এই বিষয় ভাবনাকে আলোচক আরও বিস্তারিত করেছেন, যা সত্যি আমার কাছে এক নতুন উপলব্ধি ।  এরপর আলোচক “কবি অর্পিতা আচার্য” অধ্যায়ে কবির মনোজগত এবং তার কবিতার বিষয়বস্তুকে খুব সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেনএই গ্রন্থের শেষ নিবেদন – “স্বাতী ইন্দু ঃ তির্যক বর্শার ফলা”। এই কবিকে নিয়ে ত্রিপুরার কোথাও তেমন আলোচনাই হয়নি ।  এই মেধাবী কবিকে আলোচক তুলে এনেছেন তার এই মূল্যবান গ্রন্থে । যার খুব প্রয়োজন ছিল ।

অবশেষে বলতেই হয়,আলোচক সেলিম মুস্তাফা-র “দশ কবি ও চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব” গ্রন্থটি ত্রিপুরার সাহিত্যে একটা নতুন সূত্রপাত । নতুন সংযোজন । এই ধরণের গ্রন্থ সচরাচর চোখে পড়ে না । প্রচ্ছদ করেছেন  আরেক উল্লেখ্যযোগ্য কবি অরূপ দত্ত । খুবই ইঙ্গিতবহ । মন কেড়ে নেয় সহজেই। এই মূল্যবান গ্রন্থটির সার্বিক সাফল্য কামনা করছি ।  

    

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...