Thursday, January 23, 2025

ত্রিপুরার কবিতা জগতে জ্যোতির্ময় রায় একটি স্মরণীয় নাম / তমালশেখর দে


 কবি জ্যোতির্ময় রায় আর নেই আমাদের মাঝে । কিন্তু তাঁর কথাগুলো রয়ে গেছে । কবিতাময় তাঁর শেষ যাত্রাকে প্রণাম ।

ত্রিপুরার কবিতা জগতে জ্যোতির্ময় রায় একটি স্মরণীয় নাম। সাহিত্যের নানা শাখায় স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতেন তিনি ।
প্রশ্ন ঃ আপনি একাধারে ছড়াকার, কবি, নাট্যকার, সঞ্চালক, গবেষকও। শিল্পশাখার এতটা বিভাবে আপনার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এর মধ্যে আপনার স্বস্তির জায়গাটা নিয়ে আমাদের একটু আলোকপাত করুন!

উত্তর ঃ এক এতগু‌লো শাখা‌তে স্বচ্ছন্দ বিচর‌ণের যে ব্যাপার সে‌ক্ষে‌ত্রে বলা যায় সবগু‌লোরই মূল শিকড় এক জায়গায় ।অবশ্যই কিছুটা নান্দ‌নিক অনুভূ‌তি সহজাতভাবে আসে। অর বা‌কিটা হল জগৎ ও জীবন‌কে ভা‌লোবাসার যে জায়গাটা । কা‌জেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ ক‌রি ছড়া থে‌কে ক‌বিতা ক‌বিতা থে‌কে নাটক নাটক থে‌কে প্রবন্ধ ম‌ঞ্চে। সঞ্চালনায় । সব‌কিছুর ম‌ধ্যেই ঐক্য‌বিন্দু‌তে পাই জগৎ ও জীবন‌কে ভালবাসা । কা‌জেই অামার কোথাও কো‌ন বি‌রোধ ঘ‌টে না । আমার ম‌নে হয় সব ক্ষে‌ত্রেই আমি একই কথা বল‌ছি এবং একই বিষয়টা‌কে পা‌চ্ছি । প্রকা‌শের মাধ্যম বা অা‌ঙ্গিক বা প্রকরণ যা-ই বলুন সেটাশুধু ভিন্ন এই যা । তারপরও যদি বলতে হয় বলবো, ছড়াতেই আটকে থাকে আমার প্রাণভ্রমরা। আমি স্বস্তি এবং শান্তির দীর্ঘ শ্বাস নিই ছড়া কাটার মধ্যে দিয়েই। শিকড়ের কোথাও যেন তাকে আমি খুব নিবিড়ভাবে অনুভব করি এবং ভালবাসি।

প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার কবিতার জগৎ যতটা উজ্জ্বল, ততটা উজ্জ্বল ছড়ার জগৎ নয়। শিশুদের মধ্যেও ছড়া লেখার প্রবণতা কমে আসছে। এর কারণ কি মনে হয় আপনার ?

উত্তর : ছড়ার চর্চা একটু কম হ‌চ্ছে ব‌টে ত‌বে হতাশাব্যাঞ্জক নয় । বিস্তর ক‌বি র‌য়ে‌ছেন কিন্তু ছড়াকার সেভা‌বে উঠে আস‌ছে না । আস‌লে প্রেক্ষিতটা‌কে অস্বীকার করা যায় না । অাজকাল ঠাকুরমার ঝু‌লি,দাদামশা‌য়ের থ‌লে,কিংবা রূপকথার বা জাত‌কের গল্প ক'জন শিশু কি‌শোর প‌ড়ে ? ওরা স্কুলপাঠ্যবই‌য়ের বোঝা পি‌ঠে শুধু প্র‌তি‌যো‌গিতার দৌ‌ড়ে। আমরাও শিশু মনটা‌কে হা‌রি‌য়ে ফেল‌ছি । আমি য‌দি শিশুম‌নের দোলাটা আমার অনুভ‌বে না আন‌তে পা‌রি তো আমি শিশুছড়া লিখব কী ক‌রে? আমার প্রা‌প্তি বা সঞ্চ‌য়ের যোগান য‌দি শৈশবের ঐ আকাশ বাতাস ফুল পা‌খি প্রজাপ‌তি নদীনালা মাঠঘাটপ্রান্তর থে‌কে সমৃদ্ধ না হয় শুধু বৌ‌দ্ধিক সত্বা দি‌য়ে সে লেখা আস‌বে না । অভিজ্ঞতায় দে‌খে‌ছি ক‌বি শ‌ক্তি সুনীল নী‌রেন্দ্রনাথ খুব ভা‌লো ছড়া লিখ‌তেন । আমা‌দের রা‌জ্যে নেই তা একেবা‌রেই তা নয় । ক‌বি অনিুল সরকার বিম‌লেন্দ্র চক্রবর্তী, চুনি দাস, অপরাজিতা রায়সহ অনেকেই আছেন। কিন্তু বর্তমান এ সম‌য়ে আরও বড় ক্ষেত্র প্র‌য়োজন তো অস্বীকার করার নয় ।ত‌বে আমি একটা প্রস্তাব দি‌তে পা‌রি যে ব‌সে অাঁ‌কো প্র‌তি‌যো‌গিতা ইত্যা‌দির মত ব‌সে তাৎক্ষ‌নিকভা‌বে ছড়া লিখন প্র‌তি‌যো‌গিতা করা যে‌তে পা‌রে ।

প্রশ্ন ঃ “বরাক উপত্যকায় ১৯শে মে-র ভাষা আন্দোলন ও দ্বাদশ শহিদকথা” – আপনার একটি চমক লাগানো গবেষণামূলক বই। এই বই নিয়ে আপনার কাছে একান্ত কিছু কথা শুনতে চাই। এতদিন পর হঠাৎ এই গবেষণা পত্র কেন ?

উত্তর ঃ " বরাক উপত্যকায় ১৯শে মে-র ভাষা আন্দোলন ও দ্বাদশ শহিদকথা " বইটি আসলে হঠাৎ নয়। আর এটা আমার কোন অ্যাকাডেমিক গবেষণাও নয় । এটা আমার সত্য সন্ধান । ঘটনার কালটা আমার শৈশব । স্থানটা আমার জন্মভূমিতে ।সুতরাং একটা বাড়তি অাবেগ কাজ করেছে । আমার পিতা প্রয়াত জীতেন্দ্রলাল রায় এই ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন । এই আবেগটাও কিছুদিন ধরে কাজ করে ছিল । আন্দোলনের বিবরণ অনেকবার বাবার মুখ থেকে শুনে ডাগর ডাগর চোখে গিলেছিলাম । আমার পেশা জীবনজীবিকার ব্যস্ততায় কিছু করতে পারছিলাম না । এরই ভিতরে অামি কিছু তথ্যের খোঁজও পাই । যা আমার ভিতরের প্রেরণাগুলোকে যেন উজ্জীবিত করে তুলে ।শুরু করি ক্ষেত্র সমীক্ষা । অনেকগুলো যোগসূত্র চতুর্দিক থেকে সমন্বিত হয়েছে । তাকেই দু'মলাটের মধ্যে করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমার আবেগটা কাজ করেছে । আর চমক বলবেন কি না জানি না তবে ১৯শে মে~র শিলচরের ভাষা শহিদ সংখ্যার বিচারে সবাই একাদশ বলেন । আমি তথ্য দিয়ে শহিদ সংখ্যা একাদশ নয় দ্বাদশ দেখিয়েছি। এটা নতুননত্ব । বাংলাভাষী পাঠকবর্গ একে মান্যতা দেবেন কি না এটা তারা বুঝবেন । আমি তথ্যটা জানান দিতে চেয়েছি ।

প্রশ্ন ঃ ইদানিং আপনার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে, “প্রজন্ম চত্বর”। এই নামটা শুনলেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের কথা মনে পড়ে যায়। এই নাম এবং এর উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার কাছে কিছু জানতে চাই !

উত্তর ঃ হ্যাঁ ,বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তো স্বীকারে আছেই । পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিছু জায়গা নানাবিধ কারণে যখন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কালের ইতিহাসে ইতিহাস হয়ে যায় তখন ওই নামটাকে সবাই ব্যবহার করেন । এক সময় বাংলাদেশের শাহবাগের এই প্রজন্মচত্বর~এর প্রতিবাদ আন্দোলন বিশ্বজনবিদিত । এই প্রজন্মচত্বরে বাংলাদেশের তরুণতরুণীরা তাদের প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করে । আমি নামটা ওখান থেকে নিয়েই একটা সার্বিক ব্যঞ্জনা দিতে চেয়েছি । প্রজন্মচত্বর মানে আগামী চত্বর ।সমস্ত স্রষ্টাদের আগামীর স্থান একটা মঞ্চ বা ক্ষেত্র । আর উদ্দেশ্য বলতে ষাটের দশকে কবি পীযূষ রাউত যখন ‘জোনাকি’ পত্রিকা বের করতেন, তখনতো বাংলাদেশও হয়নি । পূর্ববঙ্গ কলকাতাত্রিপুরা ব্রহ্মপুত্র বরাক উপত্যকার সব কবিকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্র ছিল ‘জোনাকি’ ।একটা সফল অভিযাত্রা ছিল সেটা । পরবর্তী সময়ে নবপর্যায়ে কোন যোগ্যজন একে ধরে রাখেননি । সেই জোনাকি-র মতই আমি চাই ‘প্রজন্মচত্বর’-ও যাতে সকলের চারণ ক্ষেত্র হয় ।

প্রশ্ন ঃ বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিশ্চয়ই ‘বাংলা ভাষা ও সংকট’ বিষয়টা আপনাকে ভাবিয়েছে। আপনি কীভাবে ভাবছেন বিষয়টা নিয়ে?

উত্তর ঃ ভারতে বাংলাভাষা একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে,এই প্রশ্নে রাজনৈতিক গভীরে না গিয়ে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে,হ্যাঁ, আমাদের দেশ বহুভাষিক এবং বহুত্ববাদী, সেখানে প্রাদেশিক ভাষা বাংলার উপর সংখ্যাগুরুর ভাষার একটা চাপ আছে আর এটাই সংকট। তা কাটানোর জন্য মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সচেতনতা যেমন দরকার,তেমন রাজনৈতিকশক্তি গুলিরও সহিষ্ণুতা দরকার।ইদানীংকালে রাজনৈতিক আভরণে বহু শব্দ এ অঞ্চলের আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে এড়িয়ে চালু করা হচ্ছে । বিশেষত উত্তর ভারতীয় শব্দগুলির বহুল ব্যবহার করা হচ্ছে । বাঙালির চিন্তাভাবনা চেতনা বোধ মনন সংস্কৃতিতে এটাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে । যুব সমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে । এনিয়ে চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে । অন্য ভাষা যত বেশি শেখা যায় তত বেশি মানুষকে অপন করা যায় ।কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে যোগ্য মর্যাদায় রেখে তো !
প্রশ্নঃ আপনি তো নাটকের সাথে বিভিন্নভাবে দীর্ঘদিন জড়িয়েছিলেন। সেই নাটক থেকে বেশ কিছুদিন থেকে দূরে। তার কারন কি ? আপনার কি মনে হয়, নাটক আসলেই সমাজের মানসিকতা পাল্টাতে সক্ষম?

উত্তরঃ হ্যাঁ, আমি নাটকের সাথে জড়িয়ে ছিলাম । বহু পথ নাটক লিখেছি । মঞ্চনাটক আলেখ্যও লিখেছি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এমনকি জাতীয় স্তরেও সরকারি অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত হয়েছে আমার নৃত্যালেখ্য পর্যন্ত। মঞ্চনাটকের পাশাপশি অসংখ্য পথনাটক করেছি । তখন পেশাগত কারণে গ্রামেগঞ্জে ,পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতাম। মানুষের সমস্যা পীড়া দিত । স্বত:স্ফূর্তভাবে মানুষের গান নাটকের সংলাপ বেড়িয়ে আসত । তখন বিভিন্ন কর্মসূচীতে এলাকার বন্ধুবান্ধব শিশুকিশোরদেরকে নিয়ে নাটক করতাম । পরবর্তীতে আমার কাজের ক্ষেত্রটা পরিবর্তন হয়ে যায় । সময়টা অন্যদিকে ব্যয় হত । নাটকের জন্য প্লট ভাবনায় আসলেও প্রতিটি চরিত্র অনুযায়ী সরস সংলাপ ,নাটকের দ্বন্দ্ব বা উত্তরণের বিষয় নিয়ে ভাবনার সুযোগ থাকত না ।
আর সখের নাটকের পক্ষ নিয়ে নিছক বিনোদনের জন্য নাটক নয় মানুষ নাটকটাকে দেখে যাতে তার মননে কিছু নিয়ে যেতে পারেন তার পক্ষে আমি । নাটক তো জীবন থেকে উৎসারিত বিষয় । এই নাটকে মানুষের যাপনের প্রতিটি মুহুর্তের বিভিন্ন বাস্তবোচিত দিক তুলে ধরা যায় । এই নাটকের মধ্যে মানুষ তাকেই দেখেন । তার সুখ দু:খ ব্যাথা বেদনা যন্ত্রণাকে স্বীয় চোক্ষে অবলোকন করেন । সফল নাটক থেকে তার উত্তরণের পথও পেয়ে যান তারা । সমাজ সভ্যতার শত্রু মিত্রকে চিহ্নিত করতে পারেন মানুষ এই নাটকের মধ্য দিয়েই । কাজেই শিশুর বাসযোগ্য নতুন বিশ্ব গঠনে নাটক যে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে
তা অনুমেয় ।


May be an image of 1 person and smiling
All reactions:
Niharika Prokashani, শম্ভু শংকর and 39 others

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...