Monday, April 28, 2025

‘জীবনকে মঞ্চে নামিয়ে দেখার আকাঙ্খা আজও মনকে নাটকের দিকে টানে’ -- শুভাশীষ গুপ্ত

 


 ‘জীবনকে মঞ্চে নামিয়ে দেখার আকাঙ্খা আজও মনকে নাটকের দিকে টানে’





 ত্রিপুরার ৯০ দশকের দিকে ধর্মনগরের নাট্য-তৎপরতায় টগবগে উজ্জ্বল এক তরুণের নাম ছিল শুভাশীষ গুপ্ত । আজ সেইসব দিন নিয়ে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।


প্রশ্ন ঃ ১। প্রশ্ন ঃ আপনার নাট্যজীবনের শুরুর দিনগুলো নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? ঠিক কখন এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে গেলেন?

উত্তর ঃ আমার নাট্য-জীবন শুরু হয়  ছোটোবেলাতেই প্রায় ১৯৮২ সালে । বাবা ছিলেন যাত্রা পাগল মানুষ । মূলত তাঁকে দেখে দেখেই মঞ্চের প্রতি একটা তীব্র আগ্রহবোধ তৈরি  হয় ।  নাট্য-চর্চার শুরুতেই গুরু হিসেবে পেয়ে যাই প্রণম্য মিহির পুরকায়স্থ এবং বিকাশ ভট্টাচার্যকে । কাঁলী বাড়ি রোডের প্রদীপ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে আমরা প্রায় বালকবেলাতেই পাঁচবন্ধু মিলে “কিশোর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী” নামে একটি সংঘটন গড়ে তুলি । তখন ধর্মনগরে কোনো স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । অগত্যা  কাঁলীবাড়ি রোডের উপরেই অস্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করে মঞ্চস্থ করি আমাদের প্রথম নাটক সুকান্ত ভট্টাচার্যের – ‘অভিযান’ । আজ যতদূর মনে পড়ছে, আমি ছাড়াও সেই নাটকে ছিল শেখর চক্রবর্তী, কৌস্তভ ভট্টাচার্য, হরিহর ভট্টাচার্য, পার্থ দত্ত, এছাড়াও আরও কয়েকজন । সেই প্রথমের উৎসাহ থেকেই একে একে করা হয়ে গেল – ‘মুকুট’ ‘ জীবন যেমন’ এরকম বেশ কয়েকটি নাটক ।পরে আমাদের সাথে বলিষ্ঠভাবে পাই সৌমেন সেন, মিলন দেবকে । বিদ্যালয় জীবন শেষ করে আবার বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লে, নাটকে কিছুদিন ভাটা পড়ে ।

তারপর দীর্ঘ বিরতির আবার নাটক নিয়ে পাগল হয়ে পড়ি ১৯৯৬ সাল থেকে, যা আজও বহমান ।  বাড়ি থেকে দূর কলেজ জীবনের ব্যস্ততার পর আবার সবাই মিলে তীব্রভাবে নাটক-সংঘটন, প্রযোজনা নিয়ে মত্ত হয়ে পড়ি ।  যে মত্ততায় আজও অম্লান । তৃপ্তিহীন ।  জীবনকে মঞ্চে নামিয়ে দেখার আকাঙ্খা আজও মনকে নাটকের দিকে টানে । নাটক এমনই এক মত্তনীল নেশা ।






২।প্রশ্ন ঃ আপনার অনেক মঞ্চসফল নাটকের মধ্যে আজ  একটি নাটকের গল্প শুনতে চাই ? সেই ভাল লাগা, সেই উন্মাদনা –

উত্তর ঃ নাটক তো জীবনে অনেক করেছি । তার মধ্যে ‘প্রসঙ্গ মহাভারত’ ‘শপথ’ ‘মহড়া’ ‘সাতেই নেই পাঁচেও নেই’ ‘ এক মুঠো রোদ’ ‘ একটি অবাস্তব গল্প’ ‘পরবাস’ ‘অলকানন্দার পুত্র কন্যা’ ‘এই তো সময়’ উল্লেখযোগ্য । তবে প্রিয় নাটক বললে, কেন জানি আজও বারবার ‘এই তো সময়’ নাটকের নামটাই চট করে মনে সামনে চলে আসে । আমি আমার জীবনে অনেক নাট্য নির্দেশকের সাথে কাজ করেছি, শিখছি অনেক কিছু । তারপরও বন্ধুবর  মিলন দেবের ভূমিকা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারব না । আমার নাট্য জীবনের তার ভূমিকা অপরিসীম ।

‘এই তো সময়’ নাটকে একটি বখাটে ছেলের চরিত্রে অভিনয় করি । যে পরবর্তীতে ব্রেখট-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় । নাটকের চরিত্রে একটা গান ছিল । কিন্তু আমি তো গান পারি না ! কিন্তু পরিচালক মিলন দেব নাছোড়বান্দা । সে-কী গানের রিহারসেল ! শেষ অবধি আমাকে দিয়ে সে গান গাইয়েই ছাড়ল । সে-সব দিনে এই সব উন্মদনা, অনুভূতি আজও আমাকে প্রাণিত করে । নাটকের জন্য জাগিয়ে রাখে।  






প্রশ্ন ঃ নাটক বলতে আপনি কি নিটোল টানটান একটা গল্পকে মঞ্চস্থ করা বুঝে থাকেন ? এ-ব্যাপারে আপনার ব্যক্তিগত মূল্যায়নটা ঠিক কিরকম জানতে চাই ?

উত্তর ঃ না, নাটক বলতে একটি নিটোল টানটান গল্পকে  মঞ্চস্থ করা, এটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না । হ্যাঁ, গল্প তো একটা থাকবেই। বিনোদনের প্রাসঙ্গিকতাও থাকবে । আমার মনে হয়, আমরা দর্শককে কী বোঝাতে চাইছি ! কি বার্তা  দিতে চাইছি, কীভাবে চাইছি, সেটা বিভিন্নভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করা যায় । আমি এখনও মনে করি, নাট্য-গল্পে সংঘাত থাকাটা খুবই জরুরি । তবে আজকাল আবার নাটক নিয়ে নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে । সেটার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও মনে করি । আমি মূলত অভিনয় করতে ভালবাসি। তাই করে যাব । নানা রকম চরিত্রে নিজেকে নিয়ে উলটপালট করে দেখলে আমি ভালবাসি । আমার আনন্দ এখানেই । মুক্তিও খুঁজে পাই । এটাই নেশা । এখানেই উত্তরণ ।   

৪। প্রশ্ন ঃ ‘ত্রিপুরার নাটক’ বললে, আপনার মননে ঠিক কি ধরণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয় ? এ’নিয়ে কিছু আলোকপাত যদি করেন ?

উত্তর ঃ ত্রিপুরার নাটক আজ অনন্য আরেকটি মাত্রা পেয়েছে বলতেই হচ্ছে । আগরতলা থেকে ধর্মনগর বা সাব্রুম বলি না কেন, সর্বত্রই নাটকের জয় জয়কার । একটা সময় ছিল আমরা পশ্চিমবঙ্গের নাটককে খুব বাহবা দিতাম । তাদের নাটকের দিকে তাকিয়ে থাকতাম । কিন্তু আজ ত্রিপুরাতেও দারুণ সব নাটক হচ্ছে । আমাদের পূর্বসূরিরা যেমন মঞ্চ দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন, আজ নতুনরাও তেমনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে । এবং তারা সত্যি খুব ভালো ভালো কাজ করে যাচ্ছে । যেমন তাদের নাটকীয় চিন্তাধারা, তেমনি মঞ্চে প্রয়োগ কৌশল, পরিণত অভিনয়, পরিবেশনা, প্রযোজনা সবই চমৎকার । আরও ভালো লাগে, যখন দেখি, আমাদের রাজ্যে এখন মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত নাটকের দলও সফলভাবে নাট্য পরিচালনা করছে ।







৫। “পঞ্চম বৈদিক নাট্য সংস্থা” নামে আপনাদের প্রতিষ্ঠিত সংস্থা একসময় ধর্মনগর তথা ত্রিপুরা, আসামসহ নানা জায়গায় দাপিয়ে নাটক করেছেন । নাট্য উৎসবও করেছেন । সেই সব নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করুন আমাদের সাথে ।

আজ অনেকটাই তা ইতিহাস । সময়ের সাথে কী এভাবেই সব হারিয়ে যায় ? আপনি কি বলবেন !

উত্তর ঃ এখানে আমাকে বলতেই হচ্ছে, “পঞ্চম বৈদিক” কোন ইতিহাস নয় । ১৯৯৬ সালের ৩১ অক্টোবরে জন্ম নেয় আমাদের নাট্য সংস্থা “পঞ্চম বৈদিক”-এর । আমরা ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ সাল এই দুইবার জাতীয় যুব উৎসবে অংশগ্রহণ করার পরও আমরা থেমে থাকিনি । ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০টি নাট্য দল নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নাট্য প্রতিযোগিতা আমরাই প্রথম অনুষ্ঠিত করেছি। গর্ব না- করেই বলছি, আমরা আমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি । নাটক নিয়ে একটা উন্মাদনা, নতুন করে আবার ভাবতে চেয়েছিলাম আমরা । আমি মনে করি, কিছুটা হলেও আমরা সফল হতে পেরেছি । আজকের নাটক নিয়ে ধর্মনগরের এই উত্তেজনার পেছনে, এই সব উন্মদনার প্রভাবকে সরাসরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই । আজকের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী বেরিয়ে এসেছে  পঞ্চম বৈদিকের তিন বৎসরের জেলাভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা থেকে ।

 ৬।  আজ কি সেইসব স্মৃতি অনেকটাই  ইতিহাস । সময়ের সাথে কী এভাবেই সব হারিয়ে যায় ? আপনি কি বলবেন !

উত্তর ঃ হ্যাঁ, এটা স্বকার করতেই হচ্ছে, আমরা সময়ের নিরিখে কিছুটা থমকে গেছি, জীবন-জীবিকার প্রশ্নে ! টিমের বিভিন্ন জন আমরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছি । নাটক একটা টিম-ওয়ার্ক । ফলে ইচ্ছে থাকলেও সব সময় আমরা চাইলেও সক্রিয় থাকতে পারছি না । তারপরও বিভিন্ন উৎসবে এখনও আমরা অংশগ্রহণ করি । করছি ।  তবে এটুকু বলতে পারি, “পঞ্চম বৈদিক” এখনও ফুরিয়ে যায়নি । আমরা আবারও দাপিয়ে বেড়াবো নাট্যমঞ্চে । জীবনের গান গেয়ে যাব নাটকে নাটকে । 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...