‘জীবনকে মঞ্চে নামিয়ে দেখার
আকাঙ্খা আজও মনকে নাটকের দিকে টানে’
ত্রিপুরার ৯০ দশকের দিকে
ধর্মনগরের নাট্য-তৎপরতায় টগবগে উজ্জ্বল এক তরুণের নাম ছিল শুভাশীষ
গুপ্ত ।
আজ সেইসব দিন নিয়ে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ ১। প্রশ্ন ঃ আপনার নাট্যজীবনের শুরুর দিনগুলো নিয়ে আমাদের কিছু বলুন? ঠিক কখন এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে গেলেন?
উত্তর ঃ আমার নাট্য-জীবন শুরু হয়
ছোটোবেলাতেই প্রায় ১৯৮২ সালে । বাবা ছিলেন যাত্রা পাগল মানুষ । মূলত তাঁকে
দেখে দেখেই মঞ্চের প্রতি একটা তীব্র আগ্রহবোধ তৈরি হয় ।
নাট্য-চর্চার শুরুতেই গুরু হিসেবে পেয়ে যাই প্রণম্য মিহির পুরকায়স্থ এবং
বিকাশ ভট্টাচার্যকে । কাঁলী বাড়ি রোডের প্রদীপ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে আমরা প্রায়
বালকবেলাতেই পাঁচবন্ধু মিলে “কিশোর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী” নামে একটি সংঘটন গড়ে তুলি ।
তখন ধর্মনগরে কোনো স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । অগত্যা
কাঁলীবাড়ি রোডের উপরেই অস্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ করে মঞ্চস্থ করি আমাদের প্রথম
নাটক সুকান্ত ভট্টাচার্যের – ‘অভিযান’ । আজ যতদূর মনে পড়ছে, আমি ছাড়াও সেই নাটকে
ছিল শেখর চক্রবর্তী, কৌস্তভ ভট্টাচার্য, হরিহর ভট্টাচার্য, পার্থ দত্ত, এছাড়াও আরও
কয়েকজন । সেই প্রথমের উৎসাহ থেকেই একে একে করা হয়ে গেল – ‘মুকুট’ ‘ জীবন যেমন’
এরকম বেশ কয়েকটি নাটক ।পরে আমাদের সাথে বলিষ্ঠভাবে পাই সৌমেন সেন, মিলন দেবকে ।
বিদ্যালয় জীবন শেষ করে আবার বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লে, নাটকে কিছুদিন ভাটা পড়ে ।
তারপর দীর্ঘ বিরতির আবার নাটক নিয়ে পাগল হয়ে পড়ি ১৯৯৬ সাল থেকে, যা
আজও বহমান । বাড়ি থেকে দূর কলেজ জীবনের
ব্যস্ততার পর আবার সবাই মিলে তীব্রভাবে নাটক-সংঘটন, প্রযোজনা নিয়ে মত্ত হয়ে পড়ি । যে মত্ততায় আজও অম্লান । তৃপ্তিহীন । জীবনকে মঞ্চে নামিয়ে দেখার আকাঙ্খা আজও মনকে নাটকের
দিকে টানে । নাটক এমনই এক মত্তনীল নেশা ।
২।প্রশ্ন ঃ আপনার অনেক মঞ্চসফল
নাটকের মধ্যে আজ একটি নাটকের গল্প শুনতে
চাই ? সেই ভাল লাগা, সেই উন্মাদনা –
উত্তর ঃ নাটক তো জীবনে অনেক করেছি । তার মধ্যে ‘প্রসঙ্গ মহাভারত’
‘শপথ’ ‘মহড়া’ ‘সাতেই নেই পাঁচেও নেই’ ‘ এক মুঠো রোদ’ ‘ একটি অবাস্তব গল্প’ ‘পরবাস’
‘অলকানন্দার পুত্র কন্যা’ ‘এই তো সময়’ উল্লেখযোগ্য । তবে প্রিয় নাটক বললে, কেন
জানি আজও বারবার ‘এই তো সময়’ নাটকের নামটাই চট করে মনে সামনে চলে আসে । আমি আমার
জীবনে অনেক নাট্য নির্দেশকের সাথে কাজ করেছি, শিখছি অনেক কিছু । তারপরও
বন্ধুবর মিলন দেবের ভূমিকা কিছুতেই
অস্বীকার করতে পারব না । আমার নাট্য জীবনের তার ভূমিকা অপরিসীম ।
‘এই তো সময়’ নাটকে একটি বখাটে ছেলের চরিত্রে অভিনয় করি । যে
পরবর্তীতে ব্রেখট-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় । নাটকের চরিত্রে একটা গান ছিল । কিন্তু
আমি তো গান পারি না ! কিন্তু পরিচালক মিলন দেব নাছোড়বান্দা । সে-কী গানের রিহারসেল
! শেষ অবধি আমাকে দিয়ে সে গান গাইয়েই ছাড়ল । সে-সব দিনে এই সব উন্মদনা, অনুভূতি
আজও আমাকে প্রাণিত করে । নাটকের জন্য জাগিয়ে রাখে।
৩।প্রশ্ন ঃ নাটক বলতে
আপনি কি নিটোল টানটান একটা গল্পকে মঞ্চস্থ করা বুঝে থাকেন ? এ-ব্যাপারে
আপনার ব্যক্তিগত মূল্যায়নটা ঠিক কিরকম জানতে চাই ?
উত্তর ঃ না, নাটক বলতে একটি নিটোল টানটান গল্পকে মঞ্চস্থ করা, এটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না ।
হ্যাঁ, গল্প তো একটা থাকবেই। বিনোদনের প্রাসঙ্গিকতাও থাকবে । আমার মনে হয়, আমরা
দর্শককে কী বোঝাতে চাইছি ! কি বার্তা দিতে
চাইছি, কীভাবে চাইছি, সেটা বিভিন্নভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করা যায় । আমি এখনও মনে
করি, নাট্য-গল্পে সংঘাত থাকাটা খুবই জরুরি । তবে আজকাল আবার নাটক নিয়ে নানা রকমের
এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে । সেটার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও মনে করি । আমি মূলত অভিনয় করতে
ভালবাসি। তাই করে যাব । নানা রকম চরিত্রে নিজেকে নিয়ে উলটপালট করে দেখলে আমি
ভালবাসি । আমার আনন্দ এখানেই । মুক্তিও খুঁজে পাই । এটাই নেশা । এখানেই উত্তরণ ।
৪। প্রশ্ন ঃ
‘ত্রিপুরার নাটক’ বললে, আপনার মননে ঠিক কি ধরণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয় ?
এ’নিয়ে কিছু আলোকপাত যদি করেন ?
উত্তর ঃ ত্রিপুরার নাটক আজ অনন্য আরেকটি মাত্রা পেয়েছে বলতেই হচ্ছে ।
আগরতলা থেকে ধর্মনগর বা সাব্রুম বলি না কেন, সর্বত্রই নাটকের জয় জয়কার । একটা সময়
ছিল আমরা পশ্চিমবঙ্গের নাটককে খুব বাহবা দিতাম । তাদের নাটকের দিকে তাকিয়ে থাকতাম
। কিন্তু আজ ত্রিপুরাতেও দারুণ সব নাটক হচ্ছে । আমাদের পূর্বসূরিরা যেমন মঞ্চ
দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন, আজ নতুনরাও তেমনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে । এবং তারা সত্যি খুব ভালো
ভালো কাজ করে যাচ্ছে । যেমন তাদের নাটকীয় চিন্তাধারা, তেমনি মঞ্চে প্রয়োগ কৌশল,
পরিণত অভিনয়, পরিবেশনা, প্রযোজনা সবই চমৎকার । আরও ভালো লাগে, যখন দেখি, আমাদের
রাজ্যে এখন মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত নাটকের দলও সফলভাবে নাট্য পরিচালনা করছে ।
৫। “পঞ্চম বৈদিক নাট্য সংস্থা” নামে আপনাদের
প্রতিষ্ঠিত সংস্থা একসময় ধর্মনগর তথা ত্রিপুরা, আসামসহ নানা জায়গায় দাপিয়ে নাটক
করেছেন । নাট্য উৎসবও করেছেন । সেই সব নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করুন আমাদের সাথে ।
আজ অনেকটাই তা ইতিহাস । সময়ের সাথে কী এভাবেই সব
হারিয়ে যায় ? আপনি কি বলবেন !
উত্তর ঃ এখানে আমাকে বলতেই হচ্ছে, “পঞ্চম বৈদিক” কোন ইতিহাস নয় ।
১৯৯৬ সালের ৩১ অক্টোবরে জন্ম নেয় আমাদের নাট্য সংস্থা “পঞ্চম বৈদিক”-এর । আমরা
১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ সাল এই দুইবার জাতীয় যুব উৎসবে অংশগ্রহণ করার পরও আমরা থেমে থাকিনি
। ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০টি নাট্য দল নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয়
নাট্য প্রতিযোগিতা আমরাই প্রথম অনুষ্ঠিত করেছি। গর্ব না- করেই বলছি, আমরা আমাদের
সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি । নাটক নিয়ে একটা উন্মাদনা, নতুন করে আবার ভাবতে চেয়েছিলাম
আমরা । আমি মনে করি, কিছুটা হলেও আমরা সফল হতে পেরেছি । আজকের নাটক নিয়ে ধর্মনগরের
এই উত্তেজনার পেছনে, এই সব উন্মদনার প্রভাবকে সরাসরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই ।
আজকের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী বেরিয়ে এসেছে
পঞ্চম বৈদিকের তিন বৎসরের জেলাভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা থেকে ।
৬।
আজ কি সেইসব স্মৃতি অনেকটাই ইতিহাস । সময়ের সাথে কী এভাবেই সব হারিয়ে যায় ?
আপনি কি বলবেন !
উত্তর ঃ হ্যাঁ, এটা স্বকার করতেই হচ্ছে, আমরা সময়ের নিরিখে কিছুটা
থমকে গেছি, জীবন-জীবিকার প্রশ্নে ! টিমের বিভিন্ন জন আমরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে
পড়েছি । নাটক একটা টিম-ওয়ার্ক । ফলে ইচ্ছে থাকলেও সব সময় আমরা চাইলেও সক্রিয় থাকতে
পারছি না । তারপরও বিভিন্ন উৎসবে এখনও আমরা অংশগ্রহণ করি । করছি । তবে এটুকু বলতে পারি, “পঞ্চম বৈদিক” এখনও ফুরিয়ে
যায়নি । আমরা আবারও দাপিয়ে বেড়াবো নাট্যমঞ্চে । জীবনের গান গেয়ে যাব নাটকে নাটকে ।




No comments:
Post a Comment