Tuesday, May 23, 2023
Thursday, May 18, 2023
আবারও আলো ছড়ালঃ তমালশেখরের কলম” / আলোচক – কিশোররঞ্জন দে
হৃদয়ের
আলো জ্বালাবার জন্যই কলম হাতে নিয়েছিল একজন ভাবুক তরুণ । স্বাভাবিক, তার জীবনের
চলার পথে পরপর এসেছে জোয়ার ভাটার টান । আর এই দুয়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে জীবনের অমোঘ
টান । তমালশেখর নামের সেদিনের সেই ভাবুক তরুণটি আজ পরিণত যুবক । তার দেখার চোখ,
বোঝার মন পাল্টেছে, যেভাবে নদী তার গতিপথ পাল্টায় । চলতে গেলে নদীকে গতিপথ
পাল্টাতেই হয় । তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী” । প্রথমেই
তার এক, দুই পঙক্তির আশ্চর্য কিছু কবিতা পড়ে নিই ।
তবু
কাঁথা জানে –
মা কাল
কেঁদেছিল সারারাত নীরবে” ( কান্না)
আজ অফিস
থেকে ফেরার পথে, দরজায়
হেলানো
মোমবাতির মতো দেখে এসেছি তাকে । ( প্রিয় বান্ধবী)
এই কবি
এক-দুই পংক্তির সার্থক কবিতা লেখার কৌশল আগেও দেখিয়েছেন ।এক- দুই পঙক্তিতে
কবিতা -- তাও এক তরুণ বা যুবকের কলম থেকে
যখন বের হয়, তখন মেপে নেওয়া যায় তার অনুভবের গভীরতা । এতে পাঠক হৃদয় আক্রান্ত হতে বাধ্য । কারণ জীবন থেকে এরকম জরুরি বার্তাই বহন করে তুলে এনেছেন কবি
। এমনই নাতিদীর্ঘ তার কবিতা । স্বল্প দৈর্ঘ্যের কবিতা ছাড়াও প্রকাশিতব্য সংকলনে
কবিতার শরীরে যুক্ত হয়েছে তার দীর্ঘ পদচারণার কারুকাজও । যেমন – ‘পথকে মনে হয়
সাপ’ ‘বাবা-২’ ‘বাবা-৩’ ‘প্রশ্নরা উত্তর না দিয়ে পালায়’ ইত্যাদি চমৎকার কবিতা সব ।
তবে কবিতায় নাম নিয়ে আরও ভাবতে হবে কবিকে । কবিতার শিরোনাম শুধু কবিতার বীজ ধারণ
করে রাখে না, নামের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার সুপ্ত অবয়বও ।
যাই হোক, এবার
প্রবেশ করা যাক কবির দীর্ঘ কবিতায় । ‘বাবা’ নিয়ে দুটো কবিতা আছে । মনে পড়ে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘কবিরে খোঁজ না তার জীবন চরিতে’ । কবির জীবনকে কবিতায়
খুঁজতে যাওয়া ভুল । তবু, এখানে দুটো কথা বলতেই হয় ! মানুষ তমালের জীবনে তার বাবার
আত্মা জড়িয়ে আছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে । এই দুটো দীর্ঘ কবিতাই আবার গদ্যের ভাষায় লেখা
হলেও নিঃশব্দে বহন করেছে কবিতার মায়া ।
প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য এখানে ‘বিছরা’ মানে হল, বসতবাড়ির সংলগ্ন একটা উঁচু জমি, যেখানে মূলত
রবিশস্য চাষ হয়ে থাকে ।
২) ‘বাবাদের মুখ
থাকে বুকে । প্রেম রাখালের মতো হাঁটে আড়ালে আড়ালে ।’
যে কোনও সার্থক
কবিতা এক হাতে পাঠককে ছুঁয়ে থাকে, অন্য হাতে ধরতে চায় কবিকে । তাহলেই কবিতা
অন্তরঙ্গে উচ্চারিত হয় । মায়ার পোশাক খুলে
যায় তার । মোট আটাত্তরটি কবিতা ।তার মধ্যে এক পঙক্তি, দুই পঙক্তির কবিতা যেমন
হাজির, তেমনি দীর্ঘ, অতিদীর্ঘ কবিতাও রয়েছে । বাংলা কবিতাভুবন কবিতার আকার নিয়ে
মাথা ঘামায় না ।সার্থকতা তার আকারে নয় । সার্থকতা হল, সেই অচিন পাখিকে ধরতে পারা ।
এখানেই পৃথিবীর আদিম অরণ্য থেকে নিজস্ব শৈলীতে তমালশেখর তুলে এনেছেন অমল রোদ ।
“ হয়ত দরজা
খুলে, এত রক্ত দেখে অবাক হয়ে যাবে
পাগলের মতো ছুটে
যাবে বালিশের তলায় ।
এই বুঝি,
কান্নার পাশে ফুটফুটে একটা সুইসাইড নোট রেখে গেলাম ।
ভয় পেয়ো না,
মাধবী, আমি মরবো না ।
ব্লেডের সাথে
অদ্ভুত এক মাদকতায় জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে ।
রাত হলেই রক্তের
জন্য পাগল হয়ে যাই ।
নিজেকে
ক্ষতবিক্ষত করার মাঝে কি যে নেশা,
কি যে মোহ - !”
(ব্লেড এক উন্মুক্ত নেশা)
মানুষ জীবনের একটা মানে খুঁজে নিতে চায়, নিজের মতো করে । পৌঁছাতে চায় স্থিরত্বের বিন্দুতে । কোনও রকমের
কপটতার আশ্রয় নিলে সেখানে পৌঁছানো যায় না ।
তমালশেখরের জীবনের অসম্ভব বেদনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন এক
অমোঘ আমোদ । আসুন পাঠক, অবগাহন করি সেই অনাবিল আনন্দে । এই সময়ের যে কোনও কবির কবিতা
থেকে তার কবিতা আলাদা । তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবনও আলাদা ।তার সেই
ব্যক্তিগত জীবনটি শাসন করে একটি বিশুদ্ধ হৃদয় । ভালোবাসার হৃদয় । শিল্পী অনিমেষ
মাহাতোর প্রচ্ছদের দিগন্তে হারিয়ে যেতে চাওয়া মেঘ যেন কবির কবিতার অনুগামী । ওই
রাস্তায় পাঠকেরও হাঁটতে ইচ্ছে করবে ।
কাব্যগ্রন্থ -- “ আজ আকাশে মেঘ করেছে শ্রাবণী”
লেখক – তমালশেখর দে
প্রকাশক –
নীহারিকা প্রকাশনী/ আগরতলা
** পোশাক **কবিঃ সুভদ্রা সিংহ
** পোশাক **
"যেদিন পোশাকে অভ্যস্ত হয়েছি
শূন্যতার শুরু দেখেছি সেদিন থেকেই
শয়তানের আদেশে হাঁটছি দশদিক
দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ আবহাওয়ায়
শূন্যতাও বাড়ছে দ্রুত, শূন্যতা ।"
এই কবিতাটা পড়তে পড়তে হঠাৎই মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল । সাথে সাথে কবে পড়া একটা লাইন কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই মনে পড়ে গেল । ভাস্কর ফ্রেঙ্ক মেডজেসি-এর অতিখ্যাত একটা উক্তি –
“ পাথরের কঠিন অবয়বের মধ্যেই আমি যে শান্তশ্রী ও কমনীয়তা খুঁজে পাই অন্য কোন বস্তু বা বস্তুখণ্ডে তা পাই না। তাই পাথরের শক্ত বুকেই আমার সৃষ্টির বিন্যাস ।” কিন্তু এই উক্তির সাথে এই কবিতার সরাসরি সম্পর্ক কী ? আমি জানি না । সত্যিই জানি না! এই কবিতাটা পড়ার পর কোথা থেকে জানি, মগজের তথ্য সংগ্রহকারী বাহক এটা বহন করে নিয়ে এলো আমার সামনে। আমিও যত্ন করে রেখে দিলাম তাকে, আমার এই লেখার মাঝখানে । হয়ত এর কোনো মানে আছে । হয়ত কোনোও মানে নেই ।
“যেদিন
পোশাকে
অভ্যস্ত
হয়েছি
শূন্যতার শুরু দেখেছি সেদিন থেকেই ”
– এই লাইনটা আমাকে স্পর্শ করলো! ‘পোশাকের’ সাথে অদ্ভুত এক সম্পর্ক মুহূর্তে
তৈরি করে নিলেন কবি । আমি ‘পোশাক’-এর সাথে
ভেবেছিলাম খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়ত ‘শরীর’ কিংবা ‘ ভয়’ এমন কিছু একটা শব্দটা আনতে
চলেছেন কবি । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, কবি আমার কল্পনাকে বোকার মতো থামিয়ে দিয়ে,
আনলেন –‘শূন্যতা ’ শব্দটি । কী দাঁড়ালো তবে তার মানে ? এই ‘শূন্যতা
’ কীসের শূন্যতা? আমি তো এদিক-ওদিক তখন
থেকে ভেবেই চলেছি । নিশ্চয়ই আপনারাও ভাবছেন! ভাবা’টাই স্বাভাবিক । এই শূন্যতা-র
মাত্রা এবং বিস্তৃতি কবিই তো বাড়িয়ে দিলেন, তার নিখুঁত শব্দপ্রয়োগ কুশলতায়।
প্রিয় পাঠক, তাই নয় কী ? ‘পোশাক’- কীভাবে
শূন্যতা বাড়ায় ? আর যদি বাড়িয়েই থাকে, তবে কোন্ সময় থেকে ? কবি কী তবে সভ্যতার
শুরু থেকেই বলতে চাইছেন ? যখন থেকে পোশাক আবিষ্কৃত হয়েছে । নাকি, কবি যখন থেকে
পোশাক পরা শুরু করেছেন, তখনকার কথা বলতে চাইছেন ? কথাটা কবি খোলাসা করেননি ।
পাঠককে দ্বন্দ্বে রেখে কিংবা বলা যায়, ভাবনার দু-দিকেই ঠেলে দিয়ে কবি চলে গেলেন,
পরের প্রসঙ্গে । আমি পাঠক হয়ে পড়ে রইলাম ‘পোশাক
ও শূন্যতা’-র মাঝখানে । কবির শূন্যতার সাথে তখন কোথায় যেন আমিও একাকার ।
“শয়তানের আদেশে হাঁটছি দশদিক
দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
”
--এখানে এসেও মুক্তি পেলাম না । ‘শয়তান’ শব্দটা কবি কেন আনলেন
? তবে কী কবি সে-ই আদিম মানব-মানবীর
প্রেক্ষাপটকে টেনে আনতে চাইলেন ? তাহলে এটা কেন বলছেন- “দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
” ‘রোগী ’ হতে যাবেন কেন কবি ? আর সেই রোগটাই বা
কি তবে ? অথচ আপাত পড়তে বেশ সহজ-সরলই মনে হয়েছিল কবিতা-টা । ‘রোগ’-টা কী তবে
শূন্যতার ? পোশাকের ভিতরের শূন্যতার কথা কি বলছেন কবি ? কেমন হতে পারে সে
‘শূন্যতা’ ? এটা কি কোনো নারী-সত্তার শূন্যতার কথা বলতে চাইছেন কবি ? আমি এদিক-ওদিক
আবার ভাবতে লাগলাম । আমার চিন্তার সুত্র
এসে দাঁড়ালো – নারী-পোশাক এবং শূন্যতা-কে ঘিরে । এই তিনটি শব্দের একটা মহাআবর্ত ভূমিকা আছে, সমাজ উন্নয়নের সাথে
সাথে । কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়, কবি কী আদৌ সেটা মিন্ করতে চেয়েছেন ? নাকি আমি পাঠক
হিসেবে নিজে থেকে বেশি ভেবে ফেলছি কবিতাটি নিয়ে । এতেও কিন্তু পাঠ ভ্রান্ত হতে
পারে। কিন্তু আমার ভাবনা তো শুরু হয়েছে কবিতাটিকে কেন্দ্র করেই , এটা তো
সত্য । যেভাবেই হোক, কবি আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন ভাবনার এই পর্যায়ে । এই জন্য কবিকে তো বাহাবা দিয়েই হবে । সত্যিই আমি যেন
দেখতে পাচ্ছি, একজন কবি হাঁটছেন পোশাকের অসহ্য যন্ত্রণা বহন করতে করতে । তার সামনে
দশ দিক খোলা, অথচ তিনি কোথাও যেন পরাধীন । হাঁটতে পারছেন না । তার সামনে বিস্তর
খোলা রাস্তা । কিন্তু তিনি কোথাও যেন বড় একা । নিঃসঙ্গ । পোশাকের আবরণে রোগী ।
“রুগ্ন পোশাকে বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ
সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ
আবহাওয়ায়”
এখানে এসে কবি বলছেন – ‘রুগ্ন পোশাকে’ রোগটা বৃদ্ধি পেয়েছে । এই ‘রোগ’
কীসের রোগ ? আবারও প্রশ্ন থেকে গেল । তার মানে এখানে এসে কবি স্পষ্ট করলেন,
পোশাকের ভিতরেই রয়ে গিয়েছে রোগ । এবং সে
রোগ ‘সংক্রামিত’ । এই ‘সংক্রামিত’ শব্দটা বসিয়ে কবি তার কবিতা-ভাবনার
বিস্তৃতি ব্যাপক বাড়িয়ে দিলেন। পোশাকের সাথে
সংক্রামণের কী সম্পর্ক থাকতে পারে ? মনে মনে এটাই ভাবছিলাম! কিন্তু কবি বলছেন – এই সংক্রমণ –“সংক্রামিত হয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ আবহাওয়ায়” । এখনও তো আমরা একটা
সংক্রামণজনিত রোগে ভুগছি । কিন্তু পোশাকের সংক্রমণ শব্দটা আমাকে খুব
ভাবিয়েছে । কবি এরপরই যোগ করেছেন –“সুস্থ আবহাওয়ায়” । কিন্তু পোশাকে অভ্যস্ত হওয়ার
পূর্বে কী তবে ‘আবহাওয়া’ সুস্থ ছিল? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে
ভাসছিল । কবি ‘পোশাক’ শব্দটাকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেলেন । তবে কি কবি বলতে
চাইছেন – ‘পোশাক’ –ই সুস্থ পরিবেশকে
অসুস্থ করে তুলেছে। পোশাকই বাড়িয়ে তুলেছে নিরাপত্তাহীনতা । কবি শেষ লাইনে আরও
ব্যাপক করে দিলেন গোটা ভাবনার বিষয়টাকে –
“ শূন্যতাও বাড়ছে দ্রুত, শূন্যতা”
গল্পকার সুভদ্রা সিংহ এবং তার একটি গল্প
আমার ভালো লাগা একটি গল্প । অবাক হয়ে গল্পটার দিকে তাকিয়ে আছি । একটা গল্প পড়ে শেষ কবে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে নেই । লেখিকার আরও লেখা কীভাবে পেতে পারি, কেউ জানালে খুশি হবো । এমন স্পর্ধা আজকাল কোথায়?
গল্প ** স্কেচ গুলি **
সুভদ্রা সিংহ
১. অস্ত্রবিদ্যা
অস্ত্রবিদ্যা বা গুলি চালনায় পুরোপুরি আগ্রহ বা কৌতূহল ছিল শেখরদ্বীপের । তা বলে অস্ত্রবিদ্যা নিয়ে ভাববার শিখবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়নি বা প্রয়োজনও পড়েনি । সে সুযোগও আসেনি । একটা সাধারণ মানুষ যেভাবে বেঁচে থাকে এভাবেই যেমন আমি নিরস্ত্র তাই শূন্য হাতে সুখের মধ্যেও অসুখী এবং অসুখের মধ্যেও সুখী হয়ে থাকি, এভাবেই শেখরদ্বীপও । ঠিক এভাবে। বেঁচে থাকা । বেঁচে থাকা । অসুখও হবে না, হলেও স্বাভাবিক সুখও হবে না । মানে এটাও অস্বাভাবিক নয় ।
ফলে শেখরদ্বীপের অস্ত্রবিদ্যা শেখা হয় না । দিনের পর দিন বছরের পর বছর । অবচেতনে কোথাও হয়তো মাঝে মাঝে ভাবনাটা মাথা উঁচু করে, তারপর, পর মুহূর্তেই আবার নুইয়ে ফেলে মাথা । এতে কিছু আসে যায় না । স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘদিন কেটে যায় । যেমন সামনের রাস্তায় বাচ্চা স্কুলে নিয়ে যাবার হুড়োহুড়িতে অফিসের তাড়ায় দোকানের কেনাকাটায় ঘর সংসারে জড়িয়ে পড়ে মানুষ বয়স বাড়িয়ে তোলে । কেউ কেউ কমায় । দিনগুলি এভাবেই কাটে কোথাও যেন কিছুই দাঁড়িয়ে পড়ছে না ।
এসবই মানুষের কথা যাদের রক্ত আছে রক্তে বিদ্যুৎ আছে মাংস আছে মাংসে গ্রহণ আছে এবং মন বলে একটা আছে যা নাকি শরীরের আগে অনেক দূর অনেক অনেক দূর যেতে পারে কখনো পা টিপে টিপে ধীর লয়ে ।
শেখরদ্বীপ এতদিন তাই করছিল । হ্যাঁ । কিন্তু তাকেও একদিন সহসা অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হল!
ঘটনাটা কেউ বিশ্বাস করেনি । শেখরদ্বীপ এমন করে গুলি চালাবে, অন্ত্র হাতে নেবে এবং তাতে কারো প্রাণ যাবে । আর সব শেষে, আরেক জেলের ভেতর মুক্তি পাবার আশায় দিন গুনতে থাকবে । যখন স্বাভাবিক দিন কাটিয়েছে তখনও নিজেকে নিরস্ত্র ভেবে সুখের মধ্যেও অসুখে, অসুখের ভেতর সুখে দিন কেটেছে জেলে । এবারে অন্য জেলে দিন গুনে যাবে – এক, দুই, তিন ...
আসলে, ঘটনাটা এভাবেই ঘটে । ঘুমের মধ্যে বা ঘোরের মধ্যে শেখরদ্বীপ যখন দুঃস্বপ্ন অথবা শুধু স্বপ্নই দেখত তখন একটা অদ্ভুত বাঘ এসে তাকে হিংস্র থাবা তুলে তাড়া করত । স্বপ্ন সে অনেক দিন দেখেছে । দেখতে দেখতে ভয়ও চলে গেছে তার । দুঃস্বপ্ন বা স্বপ্নের প্রতি একটা মায়া জন্মায়, তেমনি শেখরদ্বীপেরও। স্বপ্নের বাঘকে মায়ায় শান্ত করার জন্য কিছু কিছু কর্তব্যও পালন করেছে । আর যেদিন স্বপ্নে সে বাঘটাকে দেখেনি, চিন্তায় পড়েছে শেখরদ্বীপ । কোথায় গেল ? এখন কি আর স্বপ্নে ফিরে আসবে না বাঘ ? ভেবে ভেবে এক শূন্যতায় ডুবেছে সে । না এলে ঘোর যে ঘোরেই থাকবে । দুঃস্বপ্ন বা স্বপ্ন আর দেখবে না, এই আতঙ্কে বা নেশায় নেশারই চরম পর্যায়ে চোখের সামনে যাকে দেখেছে, গুলি চালিয়েছে তাকেই । একবারও ভাবেনি গুলিটা কাকে চালিয়েছে বা ফিরে দেখেওনি । গুলিবিদ্ধ যে হয়েছে সে তারই খুব পরিচিত গুলি চালাবার মতো কোন কাজই সে করেনি যাতে তাকে গুলি করা যায় ।
শেখরদ্বীপের অস্ত্র হাতে নেওয়ার গুলি চালাবার এই মাত্র কারণ বা প্রয়োজন । এদিকে গুলিবিদ্ধ লোকটা কাঁতরাচ্ছে বুক ঘষে ঘষে এগুচ্ছে মৃত্যুর দিকে । অথচ মরছে না । কথা বলছে । যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছে কখনো চুপ করে থাকছে শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুত শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন এক্ষুনি সব স্তব্ধ হয়ে যাবে । কিন্তু তাও হচ্ছে না । বুকে গুলি । অসহ্য যন্ত্রণা । রক্ত পড়ছে গলগল করে অথচ বুকের ওঠানামা থেমে যাচ্ছে না । থেমে গেলেই হতো ।
ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে জানিয়ে দিয়েছেন, এ রোগী মরবে না । আর্দ্ধেক জীবন তার মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে যাবে। বিছানায় শরীর পড়ে থাকবে, তাতেও মরবে না । কেবল রক্ত গলগল করে পড়তে থাকবে, সবাইকে ভিজিয়ে দেবে এই রক্তে । এমনকি স্বপ্নের বাঘটাও ভিজে যাবে ।
একদিন রক্তে ভেসে যেতে মুক্তি হবে সবার । সবার আগে গুলিবিদ্ধ লোকটি । যার মৃত্যু-যন্ত্রণা বাতাসে বাতাসে ভাসবে গোঙানো স্বরে ।
তো, শেখর দ্বীপের অস্ত্রবিদ্যা এভাবেই শুরু হয় ।
২. কালো গোপাল
আমি কবরের ভেতরের কফিনে শুয়ে থাকতে চাই। আমার মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, মনে হচ্ছে আমি কবরের ভেতরে কফিনেরও ভেতরে শুয়ে থাকা এক মৃত মহিলা । আমিও এটা ভালোবাসি মৃত হয়ে বেঁচে থাকা । পৃথিবীময় শূন্যতার মাঝখানে একা কফিনের ভেতরে শুয়ে থাকা – উফ !
আসলে আমি কি তাই চাই ?
অনেকদিন আগে কালো কাপড় দিয়ে খুব যত্ন করে একটা কালো গোলাপ তৈরি করেছিলাম । অনেকের চোখেই কালো গোলাপটা ভালো লেগেছিল । আবার খারাপও ।
নীলিমাময় এসে দেখে চমকে ওঠেছিল । আমিও কি চমকে উঠিনি তখন ? নীলিমাময় আমাকে জিগ্যেস করেছিল, ঠিক এটাই তৈরি করতে কেন গেলে ? সেদিন কোন জবাব আমি দিইনি ।
আজ সেদিনের কালো গোলাপ তৈরি করার উত্তর যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম । আবার ভাবছি, কালো গোলাপ আমার তৈরি না করলেই হতো না ?
এইরকমই ভাঙাগড়ায় আছি । কফিনের ভেতর । ঠিক তখনই সহসা এক ঝড়ো হাওয়া এসে জ্বলন্ত শরীর ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে । আমি টের পাচ্ছি । মনে হচ্ছে ঝড়টা যেন আবেগাতুর পুরুষ এবং নারীর শারীরিক তৃপ্তির পরমুহূর্তের চরম নেশার মতো গন্ধ । আর ক্রমশই তাতে অসুস্থতার ভেতর সুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম । সুস্থ হয়ে ।
৩. মরচে পড়া ঘড়ি
অনেক কাল ধরে অনেক দূর যখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখনও শুনছিলাম সেই মরচে পড়া ঘড়িটার একটানা শব্দ । টিক টিক টিক । কোথাও কোনদিন পরিশ্রান্ত হয়নি । ঘড়িটা হাঁটছে শব্দ হচ্ছে হাঁটছে । মরচে পড়ে গেছে বলে ক্লান্ত বা নিঃস্ব মনে করার কোন কারণ ছিল না । এতদিন যে নিঃশব্দে শব্দ করে করে গেছে একবারও কি থেমেছিল, একবারও নয় । চারদেয়ালের ভেতরের নানা আসবাবপত্র তার সাক্ষী ।
আসবাব ছাড়া আর কি কিছুই ছিল না যারা জানতে পারতো ওর গায়ে মরচে পড়েনি । এমনকি নিঃস্বও নয়, ক্লান্তও নয় । টেবিলের একপাশ জুড়ে ঘড়িটা । আর শব্দ করতে পারবে না বা পারবে কেউ লক্ষ রাখেনি । এ ভাবেই মরছে পড়ে গেছে অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে বা অনিয়মিত না হলেও ওর শব্দটা কানে নেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না কারো ।
শেখরদ্বীপও সেদিন কাকে যেন বলছিল অন্য এক ঘড়ির কথা । ভালো লাগার কথা । যে ঘড়ির শব্দ নিঃশব্দে, শব্দ করবে না মরচে ধরবে না বা মরচে পড়ার মত রঙও ধরবে না । নতুন ঘড়িটাকে ঢেকে রাখতে হবে না যত্ন করতে হবে না । ঝেড়ে মুছে রাখতে হবে না । দীর্ঘদিন অথবা তারও বেশিদিন পাশে থাকবে কোনও কিছুর প্রত্যাশা না করে । শেখরদ্বীপ তাই ভাবছে । অথবা ভাবছে না । কিন্তু নতুন ঘড়ি দেখার আনন্দও কম কোথায় ?
শেষপর্যন্ত, একদিন, শেখরদ্বীপ ঘরে ফিরে এসে মেঝেতে পা দিয়েই আশ্চর্য হয়ে গেল । এই চার দেয়ালের ভেতরে এত জল এক কি করে ? আসবাবেরও চোখে জল থাকে তাহলে ? মরচে ধরা ঘড়িটার দুঃখে ।
শেখরদ্বীপ ভাবেনি এমনটা যে হবে । সে আশ্চর্য হয়ে মরচে পড়া ঘড়িটার দিকে মায়ায় তাকাল । দেখল শব্দটা অনেক কমে গেছে । আর চার দেয়ালের ভেতরের আসবাবপত্র বা কারোর কানে যাচ্ছে না শব্দ । শেখরদ্বীপ এতদিন লক্ষ করেনি । ভেবে পেল না কি করে কোনটা বুঝবে বা বোঝাবে। অন্যদেরও । আর আদর করে চুম্বন করে নেবে পুরানো জিনিসের স্মৃতিকে ।
এমন কিছু একটা ঘটবে বা উচিৎ তা কিন্তু শেখরদ্বীপ চায়নি । নতুন ঘড়ির কথা ভুলে গিয়ে তাই মরচে ধরা ঘড়িটা নিয়ে এলিয়ে পড়ল সমস্ত আসবাবের উপর । এবং ঘড়িটাকে উলটে পালটে উলটে পালটে দেখতে লাগল । দেখতে দেখতে ভেজা মেঝেতে কেটে যাবে সময় । বা কাটিয়ে দেবার জন্যই এলিয়ে দিল শরীর ।
৪. শেষ পর্যন্ত, বাইসন তেড়ে আসে
কালো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতেই বাইসন আমাকে তেড়ে আসে । আমি পুলকিত হই । আনন্দে নড়াচড়ার চেষ্টা না করে দাঁড়িয়ে থাকি চোখে হাত দিয়ে । এদিকে দূর থেকে লুকিয়ে কিছু সংখ্যক লোকে এ দৃশ্য দেখছে । আমার কিন্তু ভয় করছে না, কান্নাও পাচ্ছে না । আধঘণ্টার মধ্যে বাইসনটা আমাকে ছিন্নভিন্ন করে গেছে ।
৫. নিষিদ্ধ ঠোঁট
আজ কাল ঠোঁট নাড়ানো মানে কাউকে অন্ধকার গর্তে ফেলে দেওয়া । ফলে এখন ঠোঁট নিষিদ্ধ অথবা ঠোঁট নাড়ানো নিষিদ্ধ ।
৬. কাগজ
কাগজের নৌকা ভাসিয়েছি জলে
মাঝি নেই যাত্রী নেই যার
গিয়ে দেখি পৌঁছায়নি গন্তব্যস্থলে
যেখানে যাত্রা শুরু সেখানেই আছে
বালুচরে নেংটো শিশু বাসা তৈরি করে
হাত তালি দিয়ে বলে কাগজ শুধুই কাগজ
কোথায় নৌকার আকার
কোথায় যাত্রী আর কোথায় সে কাগজ ?
৭. ঝুল বারান্দায়
আমি বসে আছি ঝুল বারান্দায় । অনুভব করছি হাওয়ার স্পর্শ । কোনদিন থেকে হাওয়া বইছে তা ভাবছি । কোনদিকেই বা যাবে ? শুধু জানতে পারছি না । কেবল অনুভব করছি প্রচণ্ড হাওয়া । হাওয়ার তাণ্ডব । ঝুল বারান্দা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
( ম্যাগাজিন – “ বাইসন ” -গল্প সংখ্যা / ৬ষ্ঠ সংখ্যা / ১৯৮৯ /
সম্পাদক : প্রদীপ দত্তচৌধুরী
প্রকাশিকা : সুভদ্রা সিংহ
মুদ্রণ : রূপলেখা, লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ী রোড়, আগরতলা
অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি'
'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...
-
'চেতনার গভীরে এক বহমান শূন্যতা!' সত্তর দশকের চিত্রশিল্পী চিন্ময় রায় ত্রিপুরার গর্ব। নাচ, নাটক, মঞ্চ, ভাস্কর্য সব কিছ...
-
কবি দীপঙ্কর সাহা : জীবনপ্রিয় , বোহিমিয়ান এক কবির নাম তমালশেখর দে কবি দীপঙ্কর সাহা , ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তা...


































.jpg)
.jpg)
