আমার ভালো লাগা একটি গল্প । অবাক হয়ে গল্পটার দিকে তাকিয়ে আছি । একটা গল্প পড়ে শেষ কবে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে নেই । লেখিকার আরও লেখা কীভাবে পেতে পারি, কেউ জানালে খুশি হবো । এমন স্পর্ধা আজকাল কোথায়?
গল্প ** স্কেচ গুলি **
সুভদ্রা সিংহ
১. অস্ত্রবিদ্যা
অস্ত্রবিদ্যা বা গুলি চালনায় পুরোপুরি আগ্রহ বা কৌতূহল ছিল শেখরদ্বীপের । তা বলে অস্ত্রবিদ্যা নিয়ে ভাববার শিখবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়নি বা প্রয়োজনও পড়েনি । সে সুযোগও আসেনি । একটা সাধারণ মানুষ যেভাবে বেঁচে থাকে এভাবেই যেমন আমি নিরস্ত্র তাই শূন্য হাতে সুখের মধ্যেও অসুখী এবং অসুখের মধ্যেও সুখী হয়ে থাকি, এভাবেই শেখরদ্বীপও । ঠিক এভাবে। বেঁচে থাকা । বেঁচে থাকা । অসুখও হবে না, হলেও স্বাভাবিক সুখও হবে না । মানে এটাও অস্বাভাবিক নয় ।
ফলে শেখরদ্বীপের অস্ত্রবিদ্যা শেখা হয় না । দিনের পর দিন বছরের পর বছর । অবচেতনে কোথাও হয়তো মাঝে মাঝে ভাবনাটা মাথা উঁচু করে, তারপর, পর মুহূর্তেই আবার নুইয়ে ফেলে মাথা । এতে কিছু আসে যায় না । স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘদিন কেটে যায় । যেমন সামনের রাস্তায় বাচ্চা স্কুলে নিয়ে যাবার হুড়োহুড়িতে অফিসের তাড়ায় দোকানের কেনাকাটায় ঘর সংসারে জড়িয়ে পড়ে মানুষ বয়স বাড়িয়ে তোলে । কেউ কেউ কমায় । দিনগুলি এভাবেই কাটে কোথাও যেন কিছুই দাঁড়িয়ে পড়ছে না ।
এসবই মানুষের কথা যাদের রক্ত আছে রক্তে বিদ্যুৎ আছে মাংস আছে মাংসে গ্রহণ আছে এবং মন বলে একটা আছে যা নাকি শরীরের আগে অনেক দূর অনেক অনেক দূর যেতে পারে কখনো পা টিপে টিপে ধীর লয়ে ।
শেখরদ্বীপ এতদিন তাই করছিল । হ্যাঁ । কিন্তু তাকেও একদিন সহসা অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হল!
ঘটনাটা কেউ বিশ্বাস করেনি । শেখরদ্বীপ এমন করে গুলি চালাবে, অন্ত্র হাতে নেবে এবং তাতে কারো প্রাণ যাবে । আর সব শেষে, আরেক জেলের ভেতর মুক্তি পাবার আশায় দিন গুনতে থাকবে । যখন স্বাভাবিক দিন কাটিয়েছে তখনও নিজেকে নিরস্ত্র ভেবে সুখের মধ্যেও অসুখে, অসুখের ভেতর সুখে দিন কেটেছে জেলে । এবারে অন্য জেলে দিন গুনে যাবে – এক, দুই, তিন ...
আসলে, ঘটনাটা এভাবেই ঘটে । ঘুমের মধ্যে বা ঘোরের মধ্যে শেখরদ্বীপ যখন দুঃস্বপ্ন অথবা শুধু স্বপ্নই দেখত তখন একটা অদ্ভুত বাঘ এসে তাকে হিংস্র থাবা তুলে তাড়া করত । স্বপ্ন সে অনেক দিন দেখেছে । দেখতে দেখতে ভয়ও চলে গেছে তার । দুঃস্বপ্ন বা স্বপ্নের প্রতি একটা মায়া জন্মায়, তেমনি শেখরদ্বীপেরও। স্বপ্নের বাঘকে মায়ায় শান্ত করার জন্য কিছু কিছু কর্তব্যও পালন করেছে । আর যেদিন স্বপ্নে সে বাঘটাকে দেখেনি, চিন্তায় পড়েছে শেখরদ্বীপ । কোথায় গেল ? এখন কি আর স্বপ্নে ফিরে আসবে না বাঘ ? ভেবে ভেবে এক শূন্যতায় ডুবেছে সে । না এলে ঘোর যে ঘোরেই থাকবে । দুঃস্বপ্ন বা স্বপ্ন আর দেখবে না, এই আতঙ্কে বা নেশায় নেশারই চরম পর্যায়ে চোখের সামনে যাকে দেখেছে, গুলি চালিয়েছে তাকেই । একবারও ভাবেনি গুলিটা কাকে চালিয়েছে বা ফিরে দেখেওনি । গুলিবিদ্ধ যে হয়েছে সে তারই খুব পরিচিত গুলি চালাবার মতো কোন কাজই সে করেনি যাতে তাকে গুলি করা যায় ।
শেখরদ্বীপের অস্ত্র হাতে নেওয়ার গুলি চালাবার এই মাত্র কারণ বা প্রয়োজন । এদিকে গুলিবিদ্ধ লোকটা কাঁতরাচ্ছে বুক ঘষে ঘষে এগুচ্ছে মৃত্যুর দিকে । অথচ মরছে না । কথা বলছে । যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছে কখনো চুপ করে থাকছে শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুত শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন এক্ষুনি সব স্তব্ধ হয়ে যাবে । কিন্তু তাও হচ্ছে না । বুকে গুলি । অসহ্য যন্ত্রণা । রক্ত পড়ছে গলগল করে অথচ বুকের ওঠানামা থেমে যাচ্ছে না । থেমে গেলেই হতো ।
ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে জানিয়ে দিয়েছেন, এ রোগী মরবে না । আর্দ্ধেক জীবন তার মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে যাবে। বিছানায় শরীর পড়ে থাকবে, তাতেও মরবে না । কেবল রক্ত গলগল করে পড়তে থাকবে, সবাইকে ভিজিয়ে দেবে এই রক্তে । এমনকি স্বপ্নের বাঘটাও ভিজে যাবে ।
একদিন রক্তে ভেসে যেতে মুক্তি হবে সবার । সবার আগে গুলিবিদ্ধ লোকটি । যার মৃত্যু-যন্ত্রণা বাতাসে বাতাসে ভাসবে গোঙানো স্বরে ।
তো, শেখর দ্বীপের অস্ত্রবিদ্যা এভাবেই শুরু হয় ।
২. কালো গোপাল
আমি কবরের ভেতরের কফিনে শুয়ে থাকতে চাই। আমার মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, মনে হচ্ছে আমি কবরের ভেতরে কফিনেরও ভেতরে শুয়ে থাকা এক মৃত মহিলা । আমিও এটা ভালোবাসি মৃত হয়ে বেঁচে থাকা । পৃথিবীময় শূন্যতার মাঝখানে একা কফিনের ভেতরে শুয়ে থাকা – উফ !
আসলে আমি কি তাই চাই ?
অনেকদিন আগে কালো কাপড় দিয়ে খুব যত্ন করে একটা কালো গোলাপ তৈরি করেছিলাম । অনেকের চোখেই কালো গোলাপটা ভালো লেগেছিল । আবার খারাপও ।
নীলিমাময় এসে দেখে চমকে ওঠেছিল । আমিও কি চমকে উঠিনি তখন ? নীলিমাময় আমাকে জিগ্যেস করেছিল, ঠিক এটাই তৈরি করতে কেন গেলে ? সেদিন কোন জবাব আমি দিইনি ।
আজ সেদিনের কালো গোলাপ তৈরি করার উত্তর যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম । আবার ভাবছি, কালো গোলাপ আমার তৈরি না করলেই হতো না ?
এইরকমই ভাঙাগড়ায় আছি । কফিনের ভেতর । ঠিক তখনই সহসা এক ঝড়ো হাওয়া এসে জ্বলন্ত শরীর ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে । আমি টের পাচ্ছি । মনে হচ্ছে ঝড়টা যেন আবেগাতুর পুরুষ এবং নারীর শারীরিক তৃপ্তির পরমুহূর্তের চরম নেশার মতো গন্ধ । আর ক্রমশই তাতে অসুস্থতার ভেতর সুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম । সুস্থ হয়ে ।
৩. মরচে পড়া ঘড়ি
অনেক কাল ধরে অনেক দূর যখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখনও শুনছিলাম সেই মরচে পড়া ঘড়িটার একটানা শব্দ । টিক টিক টিক । কোথাও কোনদিন পরিশ্রান্ত হয়নি । ঘড়িটা হাঁটছে শব্দ হচ্ছে হাঁটছে । মরচে পড়ে গেছে বলে ক্লান্ত বা নিঃস্ব মনে করার কোন কারণ ছিল না । এতদিন যে নিঃশব্দে শব্দ করে করে গেছে একবারও কি থেমেছিল, একবারও নয় । চারদেয়ালের ভেতরের নানা আসবাবপত্র তার সাক্ষী ।
আসবাব ছাড়া আর কি কিছুই ছিল না যারা জানতে পারতো ওর গায়ে মরচে পড়েনি । এমনকি নিঃস্বও নয়, ক্লান্তও নয় । টেবিলের একপাশ জুড়ে ঘড়িটা । আর শব্দ করতে পারবে না বা পারবে কেউ লক্ষ রাখেনি । এ ভাবেই মরছে পড়ে গেছে অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে বা অনিয়মিত না হলেও ওর শব্দটা কানে নেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না কারো ।
শেখরদ্বীপও সেদিন কাকে যেন বলছিল অন্য এক ঘড়ির কথা । ভালো লাগার কথা । যে ঘড়ির শব্দ নিঃশব্দে, শব্দ করবে না মরচে ধরবে না বা মরচে পড়ার মত রঙও ধরবে না । নতুন ঘড়িটাকে ঢেকে রাখতে হবে না যত্ন করতে হবে না । ঝেড়ে মুছে রাখতে হবে না । দীর্ঘদিন অথবা তারও বেশিদিন পাশে থাকবে কোনও কিছুর প্রত্যাশা না করে । শেখরদ্বীপ তাই ভাবছে । অথবা ভাবছে না । কিন্তু নতুন ঘড়ি দেখার আনন্দও কম কোথায় ?
শেষপর্যন্ত, একদিন, শেখরদ্বীপ ঘরে ফিরে এসে মেঝেতে পা দিয়েই আশ্চর্য হয়ে গেল । এই চার দেয়ালের ভেতরে এত জল এক কি করে ? আসবাবেরও চোখে জল থাকে তাহলে ? মরচে ধরা ঘড়িটার দুঃখে ।
শেখরদ্বীপ ভাবেনি এমনটা যে হবে । সে আশ্চর্য হয়ে মরচে পড়া ঘড়িটার দিকে মায়ায় তাকাল । দেখল শব্দটা অনেক কমে গেছে । আর চার দেয়ালের ভেতরের আসবাবপত্র বা কারোর কানে যাচ্ছে না শব্দ । শেখরদ্বীপ এতদিন লক্ষ করেনি । ভেবে পেল না কি করে কোনটা বুঝবে বা বোঝাবে। অন্যদেরও । আর আদর করে চুম্বন করে নেবে পুরানো জিনিসের স্মৃতিকে ।
এমন কিছু একটা ঘটবে বা উচিৎ তা কিন্তু শেখরদ্বীপ চায়নি । নতুন ঘড়ির কথা ভুলে গিয়ে তাই মরচে ধরা ঘড়িটা নিয়ে এলিয়ে পড়ল সমস্ত আসবাবের উপর । এবং ঘড়িটাকে উলটে পালটে উলটে পালটে দেখতে লাগল । দেখতে দেখতে ভেজা মেঝেতে কেটে যাবে সময় । বা কাটিয়ে দেবার জন্যই এলিয়ে দিল শরীর ।
৪. শেষ পর্যন্ত, বাইসন তেড়ে আসে
কালো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতেই বাইসন আমাকে তেড়ে আসে । আমি পুলকিত হই । আনন্দে নড়াচড়ার চেষ্টা না করে দাঁড়িয়ে থাকি চোখে হাত দিয়ে । এদিকে দূর থেকে লুকিয়ে কিছু সংখ্যক লোকে এ দৃশ্য দেখছে । আমার কিন্তু ভয় করছে না, কান্নাও পাচ্ছে না । আধঘণ্টার মধ্যে বাইসনটা আমাকে ছিন্নভিন্ন করে গেছে ।
৫. নিষিদ্ধ ঠোঁট
আজ কাল ঠোঁট নাড়ানো মানে কাউকে অন্ধকার গর্তে ফেলে দেওয়া । ফলে এখন ঠোঁট নিষিদ্ধ অথবা ঠোঁট নাড়ানো নিষিদ্ধ ।
৬. কাগজ
কাগজের নৌকা ভাসিয়েছি জলে
মাঝি নেই যাত্রী নেই যার
গিয়ে দেখি পৌঁছায়নি গন্তব্যস্থলে
যেখানে যাত্রা শুরু সেখানেই আছে
বালুচরে নেংটো শিশু বাসা তৈরি করে
হাত তালি দিয়ে বলে কাগজ শুধুই কাগজ
কোথায় নৌকার আকার
কোথায় যাত্রী আর কোথায় সে কাগজ ?
৭. ঝুল বারান্দায়
আমি বসে আছি ঝুল বারান্দায় । অনুভব করছি হাওয়ার স্পর্শ । কোনদিন থেকে হাওয়া বইছে তা ভাবছি । কোনদিকেই বা যাবে ? শুধু জানতে পারছি না । কেবল অনুভব করছি প্রচণ্ড হাওয়া । হাওয়ার তাণ্ডব । ঝুল বারান্দা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
( ম্যাগাজিন – “ বাইসন ” -গল্প সংখ্যা / ৬ষ্ঠ সংখ্যা / ১৯৮৯ /
সম্পাদক : প্রদীপ দত্তচৌধুরী
প্রকাশিকা : সুভদ্রা সিংহ
মুদ্রণ : রূপলেখা, লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ী রোড়, আগরতলা
.jpg)

No comments:
Post a Comment