অনর্গল শব্দ-শৈলীর আড়ালে না-বলা কথার উদ্গত অশ্রু
তমালশেখর দে
“নরকে যাবার আগে” – প্রাণজয় সিনহা-র প্রথম কবিতার বই হাতে আসার পর একের পর এক কবিতা পড়েই যাচ্ছিলাম । পাতা উল্টেই চোখে পড়ল প্রথম কবিতার প্রথম লাইন – “ ফুল ফোটার মুহূর্তে কাঁদতে ইচ্ছে করে না ।” এমন লাইনে কোন কবিতা প্রেমিক আঁতকে উঠবে না ! এই কবির দেখায় যে ভিন্নতা থাকবে, এটা এই লাইন থেকেই তো স্পষ্ট বোঝা যায় । এরপর পড়ে গেলাম –
“ এই ভাসমান মেঘ আমার/ এই নীল রঙ আমার /পাগলীর হাতে ছেঁড়া রুমাল / জানি না কার/মনে হয় আমার ।” ( কাঁদতে ইচ্ছে করে না আমার ) নিঃস্বতার বিবরণ দিয়ে গেলেন, কিন্তু কোথাও সরাসরি দুঃখের কথায় এলেন না কবি । কেবল একের পর এক দৃশ্য তোলে গেলেন । কবিতায় কোথাও কোনো প্রকার ব্যাখ্যা করার প্রবণতা নেই । এটা প্রাণজয়ের কবিতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য । আবার এই প্রাণজয়ই লিখল –“আজ আমার নীরবতাই আমার শত্রু হয়ে গেছে/ আমি শত্রুর সাথে বসে/আকাশ দেখি, /আজ এই মুহূর্তে আমি নীরব/ অতএব আমিই অপরাধী/আমার নীরবতার কোন ভাষা নেই/আকার, আকৃতি, উচ্চতা নেই/ অতএব আমি-ই অপরাধী / আজ আমার নীরবতাই আমার শত্রু হয়ে গেছে ।” ( মৌনশোক )
‘মৌনশোক’ এই কবিতায় দেখি কবি নিজের দিকেই আঙুল তুলে বলছেন – “ আজ এই মুহূর্তে আমি নীরব/ অতএব আমিই অপরাধী” । এই কবির দায় । কবি নিজের দায় স্বীকার করে নিলেন । আমাদের ক্রমাগত নীরবতাই আমাদের শত্রু করে তুলছেন। আমরাই আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নিচ্ছি এক পর্যায়ে । আবার এই কবিই লিখছেন – “ যুদ্ধ হচ্ছে, কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে /পোড়া ভাতের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গলে/পাহাড় টিলা ভেঙে কেউ উপরে উঠল না/যারা উপরে ছিল নেমে আসল না নীচে/ বিশেষ গোপন সূত্রে জানা গেছে এই যুদ্ধ অবিরাম ।” (এই যুদ্ধ অবিরাম )
এই কবিতাই দীর্ঘ । প্রাণজয়ের কবিতার ভিতর কবি-ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ও ক্রমবিকাশ দেখতে পাই । আবার তার প্রেমের কবিতাও আমাকে মুগ্ধ করে । যেখানে সে লিখছে –“তুমি এসো, ফিরে এসো মালবিকা/কিছুই আমার ভালো লাগে না/ মিছিল থেকে উপড়ে ফেলি একটা আকাশ/আমার স্বপ্ন, আমার মাটি, আমার বাতাস,/তুমি এসো, ফিরে এসো মালবিকা/ হাজার তারা গুনি/ঘুমের ভেতর এখনও যে ব্যথার কান্না শুনি। ” ( মালবিকা )। ‘ঘুমের ভেতর এখনও যে ব্যথার কান্না শুনি’ – ঘুমের ভিতর এই যে কান্না শব্দ শুনার অনুভূতি, তাকে এভাবে মিছিলের সাথে মিলিয়ে ফেলা, এবং শেষঅবধি শূন্যতার হাহাকার, কবিতার ভিতর দিয়ে অনুভবের এমন চমৎকার খেলা দেখা যায় প্রাণজয়ের কবিতায় । আরেকটা কবিতা পড়ছিলাম - “ লাঙলের ফালে ডুবে আছে / আমার অর্ধেক শরীর।/শরীর গড়িয়ে নামে ভালোবাসার ঘাম।/অনর্থক গড়াগড়ি খাই।/এখানে ফলে না ফসল কোন/ অন্নপূর্ণা, ঘর বেঁধেছো কোথায় / খুঁজছে সবাই ।/ আমার উঠোনে বারোমাস ঝিঁ ঝিঁ-র ডাক/ নীল চাদরে ঢাকা কত ধার্মিকতারা / সর্বহারা কেউ উপোসী বসে দুঃস্বপ্ন দেখে / ঈশ্বরের সাথে লুকোচুরি খেলে” (অন্নপূর্ণা)
প্রাণজয় সিনহা আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে একজন । কারণ সে কবিতাকে অনুভব করে । লালন করে। পালন করে মনের ভিতর । জীবনের ভিতর । সেলিম মুস্তাফা তার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছেন – “কবি প্রাণজয় সিনহা-র কবিতার ভিতর থাকে অনর্গল শব্দ-শৈলীর আড়ালে কত না, না-বলা কথার উদ্গত অশ্রু । কবিতায় প্রচলিত সকল সম্পদ ও তার কুশলী উপস্থাপন ডিঙিয়ে আরেক উচ্ছৃঙ্খল কার্নিভেল রচনা করে ফেলে সে সহজেই । অত্যন্ত সহজ আটপৌরে ভাষার সারল্যই মননের গভীরতাকে প্রতিবার ক্যামোফ্লেজ করে যায় তাঁর প্রতিটি উচ্চারণকে ।”
“নরকে যাবার আগে” প্রাণজয় সিনহা-র প্রথম কাব্যগ্রন্থ । শূন্য দশকের
কবি হলেও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে তার ছিল তীব্র অনীহা । যাই হোক, এবার আমরা তার কাব্যগ্রন্থ হাতে পেয়ে আপ্লুত । আশা করছি, প্রাণজয় সিনহা আবার লেখায় ফিরবে । আমরা নতুন নতুন লেখা আবার পাবো তার কাছ থেকে ।
কাব্যগ্রন্থ -- “নরকে যাবার আগে”
কবি ঃ প্রাণজয় সিনহা
প্রকাশনী – “নীহারিকা পাবলিশার্স” আগরতলা


No comments:
Post a Comment