কবি যখন জীবন প্রত্যয় অভিজ্ঞতার বিন্যাস
আলোচক ঃ কিশোররঞ্জন
দে
কবি তমালশেখর দে সর্বার্থে একজন সৃজনশীল
কবি । এর আগে গত দুই দশকে কবিতার পাঠক তার তিনটে কবিতার বই হাতে পেয়েছেন । আর শুধু
এই তিনটে কাব্যগ্রন্থই নয়, বিভিন্ন লিটলম্যাগ ও ফেসবুকে লেখালেখির সূত্রে কবির
কাব্যজিজ্ঞাসা গড়ে উঠেছে নানা মাত্রিকতায় । এই তরুণ বারবার শিল্পীসীমানা ভেঙেছেন ।
ষোলটি দীর্ঘকবিতা নিয়ে তার বর্তমান কাব্যসংকলন । গত বছরেই আমরা তার ‘ আজ আকাশে মেঘ
করেছে শ্রাবণী’ পড়েছি । তমাল কবিতাকে খুব ছোটো পরিসরে আটকে রাখতে সিদ্ধহস্ত ।
মাত্র দু-চার পঙক্তিতে তার কবিতায় মুগ্ধ হয়েছেন পাঠক । দুটি মাত্র পঙক্তিতে কবিতা
যে এক পূর্ণাঙ্গ কাব্যচেতনা পাঠকের মনে গড়ে তুলতে পারে, সেটাই এতদিন করে দেখিয়েছেন
কবি ।
এবারে তমালশেখর তার কাব্যসীমানা ভেঙেছেন ।
কবিতার ফর্ম ও বিষয়ভাবনা ভেঙে ফেলেছেন। তার এই ষোলটি কবিতার প্রতিটি আসলে এই সময়ের
আলেখ্য । বস্তুত কবিতার আঙ্গিক ও শৈলী দুদিক দিয়েই এই কবিতাগুলি এক স্বতন্ত্র
মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত। এবারে আমরা কিছু উদ্ধৃতিতে চোখ বুলাবো ঃ
১। “ হে অন্ধকার, তুমি সাক্ষী থাক,
হুইলচেয়ারের দুটো চাকাই ঘুরছে একে অন্যের দিকে । আমি বসে আছি স্থির, নৈঃশব্দে।
নন্দিনী এই নাও অনুভব! মৃত্যুর মতো আজ জীবনও তোমার হোক ।(রাজা ও ও নন্দিনী)
২। শাহজাহান মাথা নত করে স্মরণ করছেন
রাজজ্যোতিষীর সেই বাণী/ ‘ আপনার সবচেয়ে গৌরবর্ণ সন্তানটি এবং সর্বনাশের কারণ হবে”/ শাহজাহান এরপর থেকে ঔরঙ্গজেবকে
ডাকতেন শ্বেতসর্প !” ( মোঘল-এ-আজম)
৩। “ যাকে আপনি শ্বেতসর্প ভাবতেন!
ছোটবেলায় আমাকে আপনার পাশ ঘেঁষতে দিতেন না। আমি তখনও শিশু । কেবলমাত্র
রাজজ্যোতিষির কথায়,/ আপনি আমায় সর্প ভাবতেন / আমাকে দেখলেই, সাপের মতো সরে যেতেন
।/ আমি বুঝি আপনার ছেলে ছিলাম না ?” ( মোঘল-এ-আজম)
বলাবাহুল্য ভারতবর্ষের কুখ্যাত এই শাসকের
পরিবারের অন্তর্ঘাত ও ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে তমালের কলম এক আশ্চর্য পরিভ্রমণে নিয়ে
গেছে পাঠককে।
কবিতা বলতে আমরা কাব্য সুষুমার সঙ্গে এক
সত্যানুসন্ধান আশা করি । অধুনা দেখতে পাই, রাজনীতি বাদ দিয়ে সাহিত্যের অস্তিত্ব
নেই । আর কবিতা হল সাহিত্যের মেধা । পাঠককে তাই বহুবার পড়তে হবে কাব্যগ্রন্থের
শীর্ষক কবিতাটি –“ একটি লাশের গন্ধ ভুলতে কত দিন লাগে” । একশো পঁচিশ পংঙক্তির মধ্য
থেকে আমি দুটো তুলে ধরলাম –
১। “ আমি মিছিলে হাঁটার সময়ে মাথা নুইয়ে
রাখি
কারণ আমি জানি, আমি আমার ভেতরে কতটা মুখোশ
পরে আছি।”
(একটি লাশের গন্ধ ভুলতে কত দিন লাগে)
২। “ আমি সর্বনাশা একটা ট্রেনে উঠে চেন
টানতে ভুলে গেছি” (একটি লাশের গন্ধ ভুলতে
কত দিন লাগে)
৩। “ আপনি চাকরি দেবেন বলেছিলেন
আপনি কালোটাকা ফিরিয়ে আনবেন বলেছিলেন ।
ভোটের লাইনে আমি এক ঝাঁক স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে
ছিলাম” (একটি লাশের গন্ধ ভুলতে কত দিন লাগে)
কবিতা শুধু রসেরই কারবারি নয়- একথা বাংলা
কবিতা বহুকাল আগে থেকেই বারবার উচ্চারণ করে এসেছে ।‘ জিগোলো’ শব্দটা শুনলে এখন আর
রক্ষণশীল পাঠকেরা আঁতকে উঠেন না । যেমন-
১। “ শরীরের প্রধান দরজা কোথা দিয়ে খোলে?
সে তো ভিখারীর মতো কেবলই সুখ খুঁজে মরে।
দেহের অন্তরালে কোথাও কি সুখ বোকার মতো বসে
থাকে!
সে
অপরাধীর মতো এ-দরজা থেকে সে দরজা খুলে কেবলই সুখ খোঁজে” (জিগোলো)
২। “ আমি আবার আলোতে মিথ্যে বলতে পারি
অনর্গল
কারণ
আমি আলোতেই প্রথম মিথ্যে বলা শিখেছি ।” (জিগোলো)
তমালের কবিতা এভাবেই ব্যাপক সময় আর পরিসর
নিয়ে অন্তর্বয়নের আঁকর হয়ে ওঠে ।দু-একটি
তাৎপর্যপূর্ণ ইশারায়
কবি বৃহত্তর জীবনের তাল-লয়-সুর আর কার্যকারণের পরম্পরা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তার এই ষোলটি দীর্ঘকবিতায়।
১। ‘মৌলবাদ আমাদের
থামাতে পারবে না ।
মাথায় সামান্য একটা
লাটির আঘাত আমাদের থামাতে পারবে না।
কাল কুঠিরের অন্ধকার
আমাকে থামাতে পারবে না ।’
( একটি সুময়ের জন্য
প্রার্থনা করি)
২। ‘আমি তাদের
কারোরই নাম জানি না ।
কেবল তাদের
রক্তশূন্য চোখের কোণে হাহাকার দেখি
আমি তাদের কারোরই
নাম জানি না ,
কেবল তাদের নত হওয়া
মাথা দেখি ।
কান্না দেখি –’ (
১০৩২৩)
৩। ‘তবু কেন জানি,
গভীর রাতে তাদের কথা ভেবে জেগে উঠি।
আমি তাঁদের কারোরই
নাম জানি না।
আমার নাম তাঁদের
সাথে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি ।’ ( ১০৩২৩)
দুর্বিষহ ১০৩২৩- এর আঘাত শুধু ঔ-কটি পরিবারকেই নয়, নাড়িয়ে দিয়েছে ত্রিপুরার বিবেবকে । এই কবিতা-টা তো ত্রিপুরার পাঠকই পড়বে না, পড়বেন আসাম-পশ্চিমবঙ্গ- বাংলাদেশ আর বৃহত্তর ভারতবর্ষের পাঠকও । একটা ফুটনোট থাকলে ত্রিপুরার বাইরের পাঠকদের কবিতাটির মর্মার্থ বুঝতে সুবিধা হত । না- হলে তাঁদের কাছে ১০৩২৩ একটি সংখ্যা মাত্র । এটা যে কমপক্ষে দেড়লাখ নাগরিককে ক্ষুধার দেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে, এটা পরিষ্কার করলে হয়ত আরও ভালো হত । তমালের এই কবিতাটা বারবার কষাঘাত করবে পাঠককে ।
আলোচনা শেষ করবো- ‘লক ডাউন’ কবিতাটি দিয়ে। ‘লক ডাউন’ রাষ্ট্রের কাছে কতগুলি আইনের সমষ্টিমাত্র । মানবতার কাছে এক মন্বন্তর । শতাব্দীর সেরা বিপর্যয় । কবি লিখছেন –
১। “ আমি কাল
ক্ষুধার বারান্দায় মোমবাতি জ্বালিয়েছি
একের পর
এক অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনি
আমি এত শব্দ কোনদিন শুনিনি
এত লাশ
একসাথে এত মৃত দেহ
দেখিনি কোনদিন” (‘লক ডাউন’)
তমালশেখরের কবিতাবিশ্ব আসলে সময়ের আলেখ্য, জীবনের আলেখ্য। তাঁর ১৬টি কবিতা এভাবেই আলোচিত করে ইদানিং বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেয় ১৬টি অভিঘাত ।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রচ্ছদশিল্পী চারুপিন্টুর প্রচ্ছদ বড় অর্থবহ। কাব্যের মূল মর্মবেদনাকে ধরতে পেরেছেন তিনি তার প্রচ্ছদে।
কাব্যগ্রন্থ ঃ ‘একটি লাশের গন্ধ ভুলতে কতদিন লাগে’
কবি ঃ তমালশেখর দে
প্রকাশক ঃ নীহারিকা/ আগরতলা
মূল্য – ১৭০ টাকা


No comments:
Post a Comment