“কবি প্রাণজয় সিনহার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'নরকে যাবার আগে' । এ আরেক অভিজ্ঞতা । এক উচ্ছন্ন কবি। তাকে ধরে বেঁধে এই গ্রন্থের প্রকাশ । ইনি যথার্থই এক লাজুক বাউণ্ডুলে আর আমাদের সকলের প্রিয়! সময়কে জড়িয়ে থাকেন বিশৃঙ্খল শব্দে আর নীরবতায় । এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা !” – সেলিম মুস্তাফা-র এই কথাগুলো বারবারই মনে পড়ে । আজ প্রাণজয় সিনহা-র ইন্টার্ভিউ প্রকাশিত হয়েছে “দৈনিক সংবাদ” পত্রিকায় । ভালোবাসা রইল । তোর মুখেই মানায় – “ আমার কবিতা আমার মেনিফেস্টো ।”
তরুণ কবি প্রাণজয় সিনহা তার চারপাশের সংকীর্ণ সামাজিক গণ্ডিকে দু-হাতে দুমড়ে-মুচড়ে নিজের ইচ্ছে মতো চলতেই পছন্দ করেন। আজ তার সাথে একান্ত কথোপকথন ।
প্রশ্ন ঃ “তোকে দেবার মতো / কিছুই তো ছিল না আমার/ যা ছিল/ সব-ই বিষ” -- আপনার কবিতায় বিষাদের একটা ছায়া প্রায়ই লক্ষ করা যায় । আবার কোনও কোনও কবিতায় বিদ্রোহী ভূমিকায় দেখা যায় । জীবনের প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয়কে কবিতায় কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন আপনি ?
উত্তর ঃ কবি মাত্রই তো বিষাদের সঙ্গে বিদ্রোহ । আমার প্রাত্যহিক যাপন, টানাপোড়েন, রাগ-অভিমান, ক্রোধ, দেখা, না-দেখা অভিজ্ঞতাই আমার কসমোলজির উপাদান । এখন তো অক্ষম আদর্শবিলাসের যুগ । ব্যর্থ মেটাফোরিক ইমেজ নিয়েই তো আমাদের আপস । চারপাশের অনাকাঙ্খিত ঘটনা আমাকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলে যা নীরব বিদ্রোহের আভাস দেয় । বিষাদের মোকাবেলার স্পর্ধাই তো নিজের সাথে নিজের বিদ্রোহ । আমি দেশ অথবা রাষ্ট্রের মধ্যে তফাৎটা ঠিক বুঝতে পারি না । রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে গোটা সমাজ যেন কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে । শহরের অথবা রাজ্যের অথবা দেশের নির্মম হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণকাণ্ড দেখেও যদি আমার ভেতর বিষাদ বা বিদ্রোহ না জাগে তাহলে ভেবে নিতে হবে একটা ভয় আমাকে নির্জীব করে তুলছে । আমার সাংস্কৃতিক পতন অনিবার্য । আমার নিরপেক্ষতা নিরক্ষর হয়ে আমার কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে । জীবনে আত্মতৃপ্তির তীব্র সুখে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হবার কোনো অবকাশ নেই ।তাহলে আত্মাবিস্কার বলে কিছুই থাকে না । আমাদের মেটাফোরিক মস্তিষ্ক ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে হজম করে কীভাবে নিজেকে অন্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় সে কৌশল শিখিয়েছে । নিজের প্রতি এই করুণা বা আক্রমণ, নিজের প্রতি নিজের এই মিথ্যাচারিতা আমাকে ভীষণভাবে আহত করে । রাজার গণতান্ত্রিক সমাজ থেকে আমরা ঝাঁপ দিয়েছি দলতান্ত্রিক সমাজে । একদল মানুষ যেমন অন্যায়ের বিপক্ষে মিছিলে হাঁটে , ঠিক আরেক দল অন্যায়ের পক্ষেই মিছিলে হাঁটে । আমার কাছে দুটোই আপেক্ষিক । সবই তো ভোট রাজনৈতিক ট্রাপিজ অথবা শূন্যতায় ত্রিশঙ্কু । এই অবিকৃত রূপগুলো আমার এজেন্ডা হিসেবে আমি কবিতায় তুলে ধরি । অতর্কিত হিস্টিরিয়ায় আমি বিড়বিড় করি । এই নিষিদ্ধ স্বাধীনতায় আমার কবিতাই আমার মেনিফেস্টো ।
প্রশ্ন ঃ “একটা যুদ্ধ –/ দু-হাত ভরে কামানের গলায় / পরিয়ে দিচ্ছে নৃমুণ্ডমালা” – ঠিক কখন একটি কবিতা লেখার কথা ভাবেন আপনি ?
উত্তর ঃ আমার লেখালেখির কোনো ধারাবাহিকতা নেই ।আগেও তেমন ছিল না। যখন বিকৃত-অবিকৃত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, বুকের ভেতর অবিরত অ্যাসিড বৃষ্টি হতে থাকে, তখন না লিখে পারি না । অনেক সময় নিজের অজান্তেই এক দুই লাইন বেরিয়ে আসে । খুব নস্টালজিক হলেও লিখতে ইচ্ছে করে । দুম্ করে কবিতা লিখতে পারি না । শব্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণের সেই আনন্দ পাওয়া যায় না । আসলে রুটিন মেইনটেইন করে নিয়মিত লেখা যায় কিন্তু আবিষ্কার বা সৃষ্টি হয় না । অবশ্য কবিতার ঘোরে থাকাটা বা কবিতার মধ্যে যাপন করাটাও অণুঘটকের মতো কাজ করে । কগনিটিভ থিওরি দিয়ে অন্তত কবিতা লেখা যায় না । যখন কোনো ঘটনা মস্তিস্কে ক্ষরণ ঘটায় তখন লিখতে ইচ্ছে করে । কখনও কোনো কারণ ছাড়াই লিখি। কখনও কখনও সুখ-দুঃখকেও লিপিবদ্ধ করে রাখি। অতিরিক্ত দুঃখে যেমন স্থবির হয়ে যাই ঠিক তেমনই অতিরিক্ত সুখ সেরাব্যাল কর্টেক্সকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় । থিতিয়ে থাকা ভাবনার কণাগুলো ব্রাউনীয় গতি অর্জন করতে পারে না ।
প্রশ্ন ঃ “আজকাল গ্রহণ লেগেছে মনে / তোমার কফিনে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ / আমার বুকের ভেতর অসুস্থ প্রজাপতি” – আপনার কবিতায় প্রেম-ভালোবাসা নানাভাবে জর্জরিত । আমরা কী ক্রমেই প্রেমহীন কসমিক একটা সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? নাকি স্বপ্ন এখনও আপনাকে আশা জাগায় !
উত্তর ঃ প্রেম চিরন্তন । প্রেম হল লো অব কনজারভেশন – যার সৃষ্টি বা বিনাশ বলে কিছুই নেই । যতদিন শরীরের ভেতর স্পন্দন থাকবে, স্ফুলিঙ্গের মতো প্রেম উৎসারিত হবে । আধুনিক প্রযুক্তি বা আধুনিকতা প্রেমের দুরন্ত গতিকে স্তব্ধ করতে পারে না । বুকের ধুকধুক যন্ত্রের এরোবিক্স মানেই তো প্রেম । এটা শুধু মস্তিস্কের নিপুণ কায়দাবাজি বা রসায়নের খেলা নয় । এ এক অলৌকিক অনুভূতি । সৌন্দর্যচেতনা সময়ের দাস । কালের বিবর্তনে আবেদনের ধরনটাও বদলে যায় । শিরা-উপশিরার পরতে পরতে অক্সিটোসিনের লীলা কে রুখতে পারে ! বুকের অন্ধকার গহ্বরে এখনও স্বপ্নেরা উঁকি দেয় । ক্যারলের ধ্বনি শুনতে পাই । আভিধানিক বা বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে যে যাই বলুক, আবেগ বা মোটিভেশন সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না । প্রেম চিরন্তন । সুন্দর ও শাশ্বত ।
প্রশ্ন ঃ আপনি তো নাট্যচর্চার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত । নাটক এবং কবিতা এই দুটো শিল্প-মাধ্যমের মধ্যে কোথায় নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন ?
উত্তর ঃ কবিতা ও নাটক ভিন্ন স্বতন্ত্র ধারা । দুটি মাধ্যমেই আমার সমান প্রিয় । নাটকের মঞ্চসজ্জা, ধ্বনি ও সংগীত, অভিনয়, আলোকসম্পাত, ডিজাইন গতিকম্প, বা কোরিওগ্রাফির নিটোল সমন্বয়, দ্বান্দ্বিক ক্রিয়া যেমন ভীষণভাবে উপভোগ করি, ঠিক সেরকম কবিতার দ্যোতনাময় ভাষা, চাক্ষুষ বাস্তবতার চেয়েও অবচেতনার বাস্তবতাকে উদঘাটন আমাকে করে তোলে দ্রষ্টা । কবিতা ও নাটক দুটোই আমার কাছে আসে অভিজ্ঞতার উৎস হয়ে । কবিতার ক্ষেত্রে আমার যে আবেদন থাকে, নাটকের ক্ষেত্রে সে আবেদন স্বভাবত একটু ভিন্ন । একটি ভাষা, অন্যটি হল সময় । লেখার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখি সেটা হল, একজন পাঠক, আরেকজন দর্শক ।
কবিতা পাঠ একান্তভাবেই একক পাঠকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা ক্রিয়া যা এক অর্থে সময়হীন । কিন্তু নাটকের প্রদর্শনরীতি তৈরি করে নেয় দর্শকমণ্ডলীর পরিবেশ। অন্ধকার আসনে নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে যে দর্শক যে ফ্রেমের মধ্যে একটা নাটক দেখেন সেই ফ্রেম নাটকের প্রকৃতি নির্ধারণ করে । সময়ের রেখাকে মুক্তির রেখায় রূপান্তরিত করে নাটকের কাহিনি বিন্যাস গড়ে ওঠে । এখানে বেশি অবচেতনার খেলায় ভেসে গেলে, নাটককে বাঁচানো মুস্কিল হয়ে পড়ে । অনেক ক্ষেত্রে করা যায়ও না । নাটক একটি কম্পোজিট আর্ট । তাই নানা প্রোটোকলের কারণে নাটকে যা করা যায় না সেটাই চিৎকার করে কবিতায় বলার চেষ্টা করি । আবার যে আঞ্চলিক শব্দগুলো কবিতার বুর্জোয়ামির দোষে প্রত্যাখ্যাত হয় সাধারণত, সেই শব্দগুলো তখন নাটকে প্রয়োগ করে অমোঘ তৃপ্তি পাই। এভাবেই দুইয়ের মধ্যে এক হয়ে মিলেমিশে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা করি সৃষ্টি উল্লাসে ।
প্রশ্ন ঃ “দাঁড়াও!”একটি পথ-পত্রিকার সাথেও আপনি জড়িত । এই কবিতাপত্রের ভাবনার মৌলিক বিষয় নিয়ে আমাদের কিছু বলুন । হঠাৎ কেন এই পেছন ফেরা ?
উত্তর ঃ ‘ দাঁড়াও!’ একটা নতুন প্রয়াস । চিরাচরিত ফ্রেমের বাইরে কিছু করা । একদিন আমার এক দাদা পথ-পত্রিকার পরিকল্পনার কথা আমাকে বললে আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম । সিদ্ধান্ত হল, পথ-পত্রিকার নামকরণ করা হল ‘দাঁড়াও!’ । মূলত ছোটো কবিতা বা অণু-কবিতা দিয়ে সাজানো হত এর প্রতিটি সংখ্যা । পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখা হত এক লাইনে, যাতে এক ঝলকে পড়ে নেয়া যায় । ছয় ফুট বাই তিন ফুট ফ্রেমে প্রকাশ করা হল প্রথম সংখ্যা ২০০৭ সালে । জনবহুল স্থানে বড় গাছের ডালে আমরা দড়ি দিয়ে বেঁধে টাঙিয়ে দিলাম । তিনমাস পর পর করার পরিকল্পনা করা হয় । সেই থেকে এখনও করা হচ্ছে । এটা একটা অভিনব পরিকল্পনা ছিল কবিতাকে আরও জনমুখী করার ক্ষেত্রে । আমরা বিজ্ঞাপনের মতো কবিতাকে জনমানসের মাথায় গিথে দিতে চেয়েছিলাম । আমরা একপ্রকার পথচলতি জনগণকে বাধ্য করেছিলাম কবিতা পড়তে । ছোটো ছোটো কবিতা থাকায় সহজেই চোখের ফ্রেমে পড়ে যেত । পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগাজিকের সংরক্ষক সন্দীপ দত্ত বলেছিলেন তিনি এমন প্রয়াস আর কোথাও দেখেননি । সেই অর্থে আমরা কিছুটা সফলও হয়েছিলাম । ভোরবেলা মর্নিং-ওয়াক করতে গিয়ে প্রায় ভিড়ই লক্ষ করা যেত । কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও খুব গুরুত্ব দেয়া হত । প্রত্যেকটা লেখায় যেন সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা থাকে সেদিকটা খুব সংবেদনশীলতার সাথে নজর রাখা হত । আমাদের এই উদ্যোগ অনেককেই পরে উৎসাহিত করেছিল ।
প্রশ্ন ঃ “খোলা চিঠি উড়ছে বাগানে/ খাম নেই/নাম নেই/ ঠিকানা নিখোঁজ”-- প্রথম দশকের কবি আপনি । অথচ বই প্রকাশে আপনার এত অনীহা কেন ? বই কী মুক্তি দেয় না আপনাকে ?
উত্তর ঃ বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি কেন জানি একটু বেশিই উদাসিন । আমার মতো আড্ডাবাজ, বাউন্ডুলের কাছে লিখতে পারাটাই মুক্তির আস্বাদ । তাই গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করার কথা কোনোদিনই সিরিয়াসলি ভাবিনি । লিখেই আনন্দ পেতাম । বই প্রকাশে একটা ভয়ও কাজ করত । কবিতা, বই ও প্রকাশ প্রসঙ্গ আমার কছে কেমন যেন এলিট এলিট মনে হত । তাছাড়া আমি যথাসম্ভব বিদগ্ধজনদের থেকে একটু দূরত্বই পছন্দ করতাম । কবি সম্মেলন বা সাহিত্য সম্মেলন কিছুতেই আমি নিজেকে খুব স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নিতে পারিনি । যাই হোক, শেষ পর্যন্ত নীহারিকা প্রকাশনীর তীর্থঙ্কর-দার একান্ত অনুরোধ কিছুতেই ফেলতে পারলাম না । আত্মসমর্পণ করতেই হল । অথচ আমার কাছে কোনো কবিতাই ছিল আমার । ভাগ্যক্রমে আমার এক দাদা আমার সব কবিতা নিজের সংগ্রহে রেখেছিলেন ভালবেসে , তাঁর কাছ থেকে সব কবিতা সংগ্রহ করে অবশেষে বই আকারে প্রকাশ পেল আমার প্রথম কবিতার বই – “ নরকে যাবার আগে” । অবশ্য একথা বলতেই হয়, বই আকারে নিজের কাব্যগ্রন্থ দেখে মন্দ লাগেনি । যেন মুক্তিরই কোনো মেটাফর হয়ে কবিতাগুলি ফিরে এসেছে আমার কাছে ।







No comments:
Post a Comment