Tuesday, May 9, 2023

আমার রবীন্দ্রনাথ এবং মুহূর্তের শত অব্যক্ত চিত্রকথা / তমালশেখর দে

 

          আমার রবীন্দ্রনাথ এবং মুহূর্তের শত অব্যক্ত চিত্রকথা 

                    তমালশেখর দে



 

 ছোটবেলা থেকেই আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমার বন্ধু করে নিয়েছিলাম। যতদিন গেছে, তত নিবিড়, নিত্য নতুনভাবে খুঁজে পেয়েছি তাকে।মনের আড়ালে তাঁকে নিয়ে কত চিত্রকল্প এঁকেছি। সে এক নিজস্ব জগত ছিল আমার। যে জগতে আর কারও প্রবেশ ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই দিন যত গড়াল, ততই ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল আমার আর  গুরুদেবের মাঝে।তাঁর কবিতা, তাঁর গানকে কেন্দ্র করেই দিনযাপন গুরু। সুখে কিংবা দুঃখে কিংবা বিরহে চট করে ছুটে যেতাম তাঁর কাছে। যত বড় হতে থাকলাম, তত দেখলাম,-  রবীন্দ্রনাথের গানে, প্রেমের, কি পূজার, কি প্রকৃতির, যে পর্যায়ের গান হোক, অধিকাংশ গানের মধ্যেই প্রেম আর বিরহ   একাকার হয়ে মিলে যায় অদ্ভুতভাবে। প্রেমিকার কাছ থেকে ব্যথা পেয়ে যখন মন খারাপ করে কলেজের নিঃসঙ্গ বারান্দায় হাঁটতাম, তখন আরও সহজ করে তাঁর কাছ থেকেই জানলাম- বিরহ হল মিলনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, না-পাওয়া  কিংবা পেয়ে হারানোর অনুভব।  কলেজের কর্নারের কোণে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ দুপুরের দিকে চেয়ে চেয়ে উপলব্দি করলাম বিরহ বুঝি মানুষের জীবন জুড়ে। সেই বিষণ্ণতা ক্রমে যখন বড় হতে হতে এক সময় হারিয়েই গেল, তখন কবির কাছেই পেলাম আশ্রয়--‘ তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে/ কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে কিংবা কবিতায় —‘ মনেরে আজ কহ যে/ ভাল মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে প্রেমে বিরহে আমি আমার গুরুদেবকে  মনসপটে বহন করে গেলাম নীরবে। গুরুদেবকে পড়তে পড়তে, তাঁর দর্শনের হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে পা রাখলাম, উপনিষদে। একসময় গুরুদেব টেলে দিলেন, বুদ্ধে- দিকে।বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠতে উঠতে আমার রবীন্দ্রনাথ, আমার কানে আলতো করে গুঁজে দিলেন এক অমৃত বাণী –‘নিজেই নিজের আশ্রয় হও, নিজেই নিজের শরণ হও।

কিন্তু গোটা ভবনাটাই আমূল পালটে যায়, যখন আমি কবি  থেকে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের পরিচিত হলাম। জানলাম, জীবনের শেষ সতেরটি বছর তিনি এঁকে গেছেন প্রায় ২০০০ এর অধিক ছবি।  আঁকেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উদ্দামতাকে তুলনা করেছেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সাথে। এবং নিজেকেতুলে ধরেছেন প্রতিটি ধারায় স্বকীয় মৌলিকতায়অনেক বিতর্ক পেরিয়ে প্রতিষ্ঠা পেলেন প্যারিসে প্রথম সফল ছবির প্রদর্শনীর পর। এরপর অবশ্য রবীন্দ্রনাথকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নিইউরোপের  বহু জায়গায় তাঁর চিত্র প্রদর্শিত হতে থাকে। এবং ছবির জগতে বিশেষকরে বাংলা ছবির জগতে সূত্রপাত হতে থাকে এক নতুন ভাবনার। যা আজও বহমান মোটামুটি আমরা সবাই জানি, তাঁর ছবিকে কয়েকটি ভাবে ভাগ করা যায়। প্রথমত- মুখমণ্ডল বা মুখাবয়বের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের ছবি। দ্বিতীয়ত- অদ্ভুত কাল্পনিক প্রাণীর ছবি। তৃতীয়ত- প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি।এবং তাঁর প্রতিটি বিভাগই অবাক করে আমাকে। বিশেয় করে নারী তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে দেখা মুখাবয়বের মূর্ত যন্ত্রণা। ইদানিং কিছু বছর থেকে  ভারতবর্ষের চারিদিকে যেভাবে পশুর মতো নারী- ধর্ষণ, হায়নার মতো ব্লেড দিয়ে কেটে আসিফার মতো শিশুদের ধর্ষণ..., তখন আমার কেন জানি, রবীন্দ্রনাথের আঁকা একের পর এক নারীর মুখাবয়বের  ভিতরে আগুন দেখতে পেলাম। এই আগুন, এই দ্রোহ- যেন আজকের। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পর, প্রতিটি মুখ যেন আমাকে তীব্র ব্যঙ্গ করছিল, ধিক্কার দিচ্ছিল। আর আমি নিরুপায়ের মতো খবরের কাগজ পড়ে, টিভির পর্দায় চোখ রেখে, স্তম্ভিত হতে হতে প্রতিদিন  বিছানার দিকে এগিয়ে যাই। সেই প্রেক্ষাপট থেকে আজকের চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর ছবি নিয়ে বিভিন্ন চিত্রকর ব্যক্তিত্বের কাছে গেলাম, রবীন্দ্রনাথের ছবির বিভিন্ন প্রক্ষাপট তলিয়ে দেখতে।হাতের কাছে যাকে পেয়েছি, তার কাছ থেকেই প্রতিক্রিয়া নিয়েছি। প্রথমেই কাছে পেলাম আমাদের রাজ্যের প্রখ্যাত কবি চিত্রকর মিলনকান্তি দত্তকে।জানতে চাইলাম  নারী মনের গোপন যন্ত্রণা এবং রবীন্দ্রনাথের ছবিতে তার প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া আজকের প্রেক্ষাপটে কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন ?” উত্তরে চিত্রকর বললেন আমাদের রেনেসাঁ যুগে নারীনির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং নারীস্বাধীনতার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ এক তুঙ্গ কণ্ঠস্বর তাঁর"স্ত্রীর পত্র"গল্পের মৃণালকে কি আমরা ভুলতে পারি? কিন্তু চিত্রকলা কবির এক অন্য প্রেক্ষিত এখানে সমাজসংস্কারক রবীন্দ্রনাথ প্রচ্ছন্ন,আমার ধারণা,প্রথাসিদ্ধ রঙরেখার চিত্রকে কবি ভাঙছেন,সুন্দরপানা মুখকেও বিকৃত করে দিচ্ছেন, ভাবনার অন্য ব্যাখ্যা তবু বলব,কবির আঁকা কিছু নারীমুখ,নারীশরীর রহস্যরেখার মায়ায় অবগুণ্ঠনবতী আবার এক বেপরোয়া ভঙ্গির উদ্ধতচিত্রণেও যেন তারা প্রথা ভাঙতে চায় পুরুষপ্রাধান্যের সামাজিক অবস্থানে নারী আজও নির্যাতিতা এর সামাজিক_রাজনৈতিক জটিল কিছু কারণ আছে,সবটাই জৈবিক নয় হয়তো কিন্তু সমাজে তো প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরও আজ তুমুল,বিশেষ করে নারীসমাজে_ নারীরা যেন রবীন্দ্রচিত্রের নারীদের মতোই, কী বলব,বেপরোয়া, সাহসিনী!

আমাদের রাজ্যের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী স্বপন নন্দীর কাছে জানতে চাইলাম, “আপনার চিত্র জগতের ভাবনাকে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রভাবিত করেছেন বলে আপনি মনে করেন?” জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রায় সত্তর বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতে শুরু  করেন রবিঠাকুরের ছবির স্টাইল ভারতীয় সব পদ্ধতির ছবির থেকে আলাদা আমাদের দেশে তাঁর আঁকা ছবি প্রথম গ্রহণ করেননি  এখানকার রসিকেরাওকাম্পোর আয়োজনে প্রথম ইয়োরোপের জার্মানিতে রবিঠাকুরের ছবির প্রদর্শনী হয় এবং ভারতীয় এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী হিসেবে  আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পানতাঁর ছবির প্রকৃতি  ,নারী প্রতিকৃতি ইত্যাদি অনেক কিছুই বহু আলোচিত বিষয় দ্বিমাত্রিক ছবিটি তাঁর আঁকার গুনে ত্রিমাত্রিক রূপ পেয়েছে এটা অনুভবের বিষয় বিতর্কের নয়তিনি বলতেন ছবি দেখতে হবে গভীরভাবে,তবেই মর্মে পৌঁছবে রবীন্দ্রনাথের ছবি এই জায়গাটাই আমাকে আকর্ষণ করে প্রবাদপ্রতিম থিয়েটার চলচ্চিত্র লিটিল্ ্যাগাজিন গণমাধ্যমের এক অনন্য ব্যাক্তিত্ব হিরন মিত্র  লেন, “রবীন্দ্রনাথের ছবি,ঠিকমতো বললে, উত্তর আধুনিক মনোভাবকে প্রকাশ করেছে কীভাবে, চিরাচরিত দৃশ্য-সাধনার ক্ষেত্রে শিল্পীই ছিলেন শেষ কথা, রবীন্দ্রনাথ। শিল্পকেও শিল্পী বললেন, অর্থাৎ, শিল্পী যেমন ছবি আঁকছেন,ছবিও শিল্পীকে আঁকছেন। প্রভাব বললে, জার্মান এক্সপ্রেসনিস্ট নারী প্রকৃতি, বিষয়ে প্রাধান্য পেয়েছে। দুটোকেই রবীন্দ্রনাথ সমান গুরুত্বে দেখতে চেয়েছেন।উত্তর আধুনিকতা এবং রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে বিশেষ আলোচনা আমার চোখে পড়েনি। তবে এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যখনই বিস্তৃত দেখা শুরু করবো, রবীন্দ্রনাথের এক নতুন জগতের দিকেই বোধহয় আমরা যাত্রা শুরু করবো। আর এভাবেই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠবেন, আমাদের কাছে চিরকালীন রবীন্দ্রনাথ। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন আচার্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-,রবীন্দ্রনাথের ছবিতে নারী এবং তার ভেতর থেকে উঠে আসা দ্রোহকে আজকের প্রেক্ষাপটে কীভাবে দেখছেন আপনি?” তিনি বলেছেন-, ‘লেখার সঙ্গে বিরহ হলে তাঁর সখ্যতা ঘটে ছবির সঙ্গে। কখনও কাটাকুটিতে , কখনও সুখে-দুঃখে, সুগভীর প্যাসনে। তাঁর নারীরা দৃপ্ত মাথা তুলে চেয়ে থাকে কঠিন ভঙ্গিতে, যেমন , শেষের কবিতায় তাঁর লেখাতে আঁকা রইল অনন্য লাবণ্য নারী-শোক নিজের জীবনে এসেছে শতবার, আত্মজার দুঃখ, কাদম্বরীর মৃত্যু তাঁর আঁকা শরীর ও মুখাবয়বে। রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারীরা যেন এই সমাজের, এই সময়েরই কথা বলতে চাইছে, যেন গতকালের ঘটে যাওয়া ঘটনারই প্রতিবাদ তাদের চোখে ও শরীরে।’ নারী-শোক এবং রবীন্দ্রনাথ এবংছবিতে তার প্রভাব ’ এই প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা ক্রমবর্ধিত হতে পারে। এবং এখানেও আমরা নতুন আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে অনন্য রবীন্দ্রনাথকে পেতে পারি। ‘কাদম্বরী’- দেবীর গোটা জীবনের দ্রোহ, বঞ্চনা, চাপা অভিমান, নিঃসঙ্গতা সবই দেখতে পাই তার ছবিতে, যদি আমরা সেই প্রক্ষাপটকে মাথায় রেখে দেখা শুরু করি !সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে ত্রিপুরার সরকারি চারু ও কারু কলা মহাবিদ্যালয়ের  ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং প্রখ্যাত চিত্রকর অভিজিৎ ভট্টাচার্য -র কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারী চরিত্রগুলোর ভিতরে প্রবেশ করলে, আপনার ভিতরে কী প্রতিক্রিয়া হয়?” তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, “নারী অবয়ব রবীন্দ্র চিত্রমালায় একটি বিশেষ ও ব্যাপ্ত পরিসর নিয়ে তার উপস্থিতির জানান দেয়, সেটা আমরা দেখতে পাই।   বিশেষত নারীর মুখাবয়ব রবীন্দ্রনাথের চিত্রপটে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে  নারী মুখের নানা রকম অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি রূপ নির্মাণে যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা শিল্প জগতে বড়ই দুর্লভ  তবে তার নারী চরিত্ররা চিত্রপটে হাজির হয়েছেন এক বিষাদদীর্ন পরিসরে সীমাহীন বিষন্নতা নিয়ে গভীর কোনো দুঃখবোধ যেন তাড়িয়ে বেড়ায় রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্রগুলিকে.. কিন্তু তারপরও লক্ষ্য করা যায় যে প্রত্যেকটি নারীর রূপ গঠনে তিনি নারীর অন্তর্নিহিত শক্তির উদ্ভাস ঘটিয়েছেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণতার সাথে রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের এমন একটি পর্যায়ে এসে চিত্রকলা কে আঁকড়ে ধরেছিলেন যখন হয়তো তার মনে অনুচ্চারিত এমন কিছু কথা ছিল যা প্রকাশ করতে শুধুমাত্র লেখাকেই তার যথেষ্ঠ মনে হচ্ছিল না... তিনি হয়তো চরিত্রের রূপ নির্মানে শুধু কলমের উপর নির্ভর করতে পারছিলেন না  আর তার ছবি যদি আমার গভীরভাবে অধ্যয়ন করার চেষ্টা করি তবে দেখবো তার ছবিতে রূপের মননের যে আলোআঁধারি পরিমন্ডল তৈরি হয়েছে এবং তার থেকে চরিত্রগুলি যেভাবে আমাদের সামনে বেরিয়ে আসছে সে এক বিচিত্র পরিবেশ তা কোনো অবস্থাতেই লেখনীতে নির্মান করা সম্ভব নয় আজকের এই সামাজিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে যখন আমার রবীন্দ্রনাথের ছবি গুলোর দিকে আবার ফিরে তাকাই তখন মনে হয় যেন আমদের আশপাশের যন্ত্রনাক্লিষ্ট মুখগুলোই আমাদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে, বলছে ,  আরে কি করছো তোমরা ? আর কত চোখ বুঁজে থাকবে অনন্তকাল ধরে ? এবার অন্তত আলো হাতে নাও,হাতে হাত ধর, মুক্ত কর এই আঁধার ঘেরা মানুষগুলোকে....  চিত্রকরের এই অভিমত -তারপরও লক্ষ্য করা যায় যে প্রত্যেকটি নারীর রূপ গঠনে তিনি নারীর অন্তর্নিহিত শক্তির উদ্ভাস ঘটিয়েছেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণতার সাথে ’- এই  উপলব্দির সাথে একদম মিলে যায় ত্রিপুরার তরুণ উদীয়মান চিত্রকর উমা মুজদারের অনুভব। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি তাঁর নারী চরিত্রগুলোর সামনে দাঁড়ালে সাহস পাই।মনে হয়, শত মর্মবেদনা নিয়েও তারা কত সটান, বলিষ্ঠ মেরুদণ্ড নিয়ে চেয়ে থাকে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের মুখোমুখি।কোন বেদনাই যেন বেদনা নয়।আজকের দিনে, চারিদিকে যখন একের পর এক নারী-শিশুর উপর অত্যাচার, ধর্ষণ হতে দেখি, তখন মনে হয়, এই চরিত্রগুলো যেন মা-র চরিত্র ধারণ করে তাকাচ্ছে আমার দিকে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাদের আমি কাছে পাই। এটাই আমার রবীন্দ্রনাথের কাছে পাওনা।’ এখানে আমরা আরেক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ পেলাম নারীর দেখা, নারী-মুখ এবং তার ভিতর  থেকে উঠে আসা প্রত্যাশা। আসলে এখানেই রবীন্দ্রনাথ। আজকের রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশের তরুন চিত্রশিল্পী চারু পিন্টু –র কাছে প্রশ্ন করেছিলাম- ‘কবি রবীন্দ্রনাথ আর চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ-কে অনেক সময়ই আমরা মেলাতে পারি না। আপনি কি কখনও এনিয়ে ভেবেছেন? কিংবা এনিয়ে আপনার ভাবনা –’ উত্তরে তিনি বললেন-- ‘ আমি মনে করি, পাশ্চাত্য আধুনিকতা  বাঁধাধরা গণ্ডি থেকে নিস্কৃতি দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের  ছবির তথাকথতি  ‘আদিমতা গুণ। কবি তাঁর পরপিক্বতায়  ফুটাতে পেরেছিলেন এই অভিব্যক্তি।বিশ্বশিল্পের সার গ্রহণ করে তার নির্যাস যেন তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। চরিত্রের অপ্রকাশতি অবচেতনাকে রূপ দিয়েছিলেন তার ছবিতে।  এর পছেনে একটি কারণ এটা হতে পারে যে, ছবির ভাষায় তাঁর ওপরে কোনো চাহদিার বা উচ্চাশার চাপ ছিল না।তাঁর ছবি প্রতীকীবাদ ও অভিব্যক্তিবাদের  সাথে সর্ম্পকতি হলওে প্রকৃতপক্ষে তাঁর ছবি তাঁর একান্তই নিজের’ এখানে ‘আদিমতা’ শব্দটি এক নতুন আলোকে আবিষ্কার করলাম। এই প্রসঙ্গ এতক্ষণ মিস করছিলাম। এই দিকটা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে খুব ভাবায়।আর এই  এখানেই আমি আমার আনাড়ি চোখে, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তার  সাহস, স্পর্ধা দেখতে পাই। তরুণ চিত্রশিল্পী পুষ্পল দেবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ছবির কোন বিষয় তোমার কাছে আকর্ষণীয়? তিনি উল্লেখ করলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ছবির গতি আমাকে বারবার প্রভাবিত করে। ভাবায় তার প্রথম পর্যায়ের কলম দিয়ে কাটাকুটি ওয়ার্ক এবং তার কালো রঙয়ের বলিষ্ঠ ব্যবহার, আমাকে ভীষণরকম আকর্ষণ করে।’ রবীন্দ্রনাথের এই জায়গাটা নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সুশোভন অধিকারী মন্তব্য করেছিলেন, ‘ রবীন্দ্রনাথের চিত্রসত্তার যন্ত্রণা, তাঁর দুর্মর ‘আর্জ’ সম্পর্কে আমরা ততটা সচেতন নই বলেই হয়তো তাঁর পরিচিত চিঠিপত্রের মধ্যে আমাদের চোখ হারিয়ে ফেলে ছোট ছোট কিছু কথা—যেখানে লুকিয়ে আছে তাঁর চাপা অভিমান বা প্রতিবাদের আগুন- ফুলকি।’  

আজ ২৫শে বৈশাখীর এই শুভ মুহূর্তে আমি চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কাটাব। তাঁকে নিয়ে ভাবব। তাঁর আঁকা নারীর ভিতরে খুঁজবো আমার শ্রাবণীর না-বলা দুঃখ। না-দেখান বুকের যন্ত্রণা, দ্রোহ। আমাকে বিদায় জানিয়েও  কেন সে বারবার ফিরে তাকিয়েছিল! হাতের স্বর্ণালী অনামিকা দিয়ে লুকিয়েছিল চোখের কোণে  যে অশ্রু, সেই অশ্রুর কথা ভাবব ।আজ যে ২৫শে বৈশাখী।শুরুর মতো জড়িয়ে রয়েছে আমাদের বিদায়ের দিনটিও এভাবেই খুপে খুপে আমার সাথে লুকিয়ে রয়েছেন আমার রবীন্দ্রনাথ এবং আমার মুহূর্তের শত অব্যক্ত চিত্রকথা            

 

@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...