** পোশাক **
"যেদিন পোশাকে অভ্যস্ত হয়েছি
শূন্যতার শুরু দেখেছি সেদিন থেকেই
শয়তানের আদেশে হাঁটছি দশদিক
দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ আবহাওয়ায়
শূন্যতাও বাড়ছে দ্রুত, শূন্যতা ।"
এই কবিতাটা পড়তে পড়তে হঠাৎই মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল । সাথে সাথে কবে পড়া একটা লাইন কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই মনে পড়ে গেল । ভাস্কর ফ্রেঙ্ক মেডজেসি-এর অতিখ্যাত একটা উক্তি –
“ পাথরের কঠিন অবয়বের মধ্যেই আমি যে শান্তশ্রী ও কমনীয়তা খুঁজে পাই অন্য কোন বস্তু বা বস্তুখণ্ডে তা পাই না। তাই পাথরের শক্ত বুকেই আমার সৃষ্টির বিন্যাস ।” কিন্তু এই উক্তির সাথে এই কবিতার সরাসরি সম্পর্ক কী ? আমি জানি না । সত্যিই জানি না! এই কবিতাটা পড়ার পর কোথা থেকে জানি, মগজের তথ্য সংগ্রহকারী বাহক এটা বহন করে নিয়ে এলো আমার সামনে। আমিও যত্ন করে রেখে দিলাম তাকে, আমার এই লেখার মাঝখানে । হয়ত এর কোনো মানে আছে । হয়ত কোনোও মানে নেই ।
“যেদিন
পোশাকে
অভ্যস্ত
হয়েছি
শূন্যতার শুরু দেখেছি সেদিন থেকেই ”
– এই লাইনটা আমাকে স্পর্শ করলো! ‘পোশাকের’ সাথে অদ্ভুত এক সম্পর্ক মুহূর্তে
তৈরি করে নিলেন কবি । আমি ‘পোশাক’-এর সাথে
ভেবেছিলাম খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়ত ‘শরীর’ কিংবা ‘ ভয়’ এমন কিছু একটা শব্দটা আনতে
চলেছেন কবি । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, কবি আমার কল্পনাকে বোকার মতো থামিয়ে দিয়ে,
আনলেন –‘শূন্যতা ’ শব্দটি । কী দাঁড়ালো তবে তার মানে ? এই ‘শূন্যতা
’ কীসের শূন্যতা? আমি তো এদিক-ওদিক তখন
থেকে ভেবেই চলেছি । নিশ্চয়ই আপনারাও ভাবছেন! ভাবা’টাই স্বাভাবিক । এই শূন্যতা-র
মাত্রা এবং বিস্তৃতি কবিই তো বাড়িয়ে দিলেন, তার নিখুঁত শব্দপ্রয়োগ কুশলতায়।
প্রিয় পাঠক, তাই নয় কী ? ‘পোশাক’- কীভাবে
শূন্যতা বাড়ায় ? আর যদি বাড়িয়েই থাকে, তবে কোন্ সময় থেকে ? কবি কী তবে সভ্যতার
শুরু থেকেই বলতে চাইছেন ? যখন থেকে পোশাক আবিষ্কৃত হয়েছে । নাকি, কবি যখন থেকে
পোশাক পরা শুরু করেছেন, তখনকার কথা বলতে চাইছেন ? কথাটা কবি খোলাসা করেননি ।
পাঠককে দ্বন্দ্বে রেখে কিংবা বলা যায়, ভাবনার দু-দিকেই ঠেলে দিয়ে কবি চলে গেলেন,
পরের প্রসঙ্গে । আমি পাঠক হয়ে পড়ে রইলাম ‘পোশাক
ও শূন্যতা’-র মাঝখানে । কবির শূন্যতার সাথে তখন কোথায় যেন আমিও একাকার ।
“শয়তানের আদেশে হাঁটছি দশদিক
দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
”
--এখানে এসেও মুক্তি পেলাম না । ‘শয়তান’ শব্দটা কবি কেন আনলেন
? তবে কী কবি সে-ই আদিম মানব-মানবীর
প্রেক্ষাপটকে টেনে আনতে চাইলেন ? তাহলে এটা কেন বলছেন- “দুচোখ যেখানে
গিয়েছে,
আমি
হয়েছি
রোগী
” ‘রোগী ’ হতে যাবেন কেন কবি ? আর সেই রোগটাই বা
কি তবে ? অথচ আপাত পড়তে বেশ সহজ-সরলই মনে হয়েছিল কবিতা-টা । ‘রোগ’-টা কী তবে
শূন্যতার ? পোশাকের ভিতরের শূন্যতার কথা কি বলছেন কবি ? কেমন হতে পারে সে
‘শূন্যতা’ ? এটা কি কোনো নারী-সত্তার শূন্যতার কথা বলতে চাইছেন কবি ? আমি এদিক-ওদিক
আবার ভাবতে লাগলাম । আমার চিন্তার সুত্র
এসে দাঁড়ালো – নারী-পোশাক এবং শূন্যতা-কে ঘিরে । এই তিনটি শব্দের একটা মহাআবর্ত ভূমিকা আছে, সমাজ উন্নয়নের সাথে
সাথে । কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়, কবি কী আদৌ সেটা মিন্ করতে চেয়েছেন ? নাকি আমি পাঠক
হিসেবে নিজে থেকে বেশি ভেবে ফেলছি কবিতাটি নিয়ে । এতেও কিন্তু পাঠ ভ্রান্ত হতে
পারে। কিন্তু আমার ভাবনা তো শুরু হয়েছে কবিতাটিকে কেন্দ্র করেই , এটা তো
সত্য । যেভাবেই হোক, কবি আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন ভাবনার এই পর্যায়ে । এই জন্য কবিকে তো বাহাবা দিয়েই হবে । সত্যিই আমি যেন
দেখতে পাচ্ছি, একজন কবি হাঁটছেন পোশাকের অসহ্য যন্ত্রণা বহন করতে করতে । তার সামনে
দশ দিক খোলা, অথচ তিনি কোথাও যেন পরাধীন । হাঁটতে পারছেন না । তার সামনে বিস্তর
খোলা রাস্তা । কিন্তু তিনি কোথাও যেন বড় একা । নিঃসঙ্গ । পোশাকের আবরণে রোগী ।
“রুগ্ন পোশাকে বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ
সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ
আবহাওয়ায়”
এখানে এসে কবি বলছেন – ‘রুগ্ন পোশাকে’ রোগটা বৃদ্ধি পেয়েছে । এই ‘রোগ’
কীসের রোগ ? আবারও প্রশ্ন থেকে গেল । তার মানে এখানে এসে কবি স্পষ্ট করলেন,
পোশাকের ভিতরেই রয়ে গিয়েছে রোগ । এবং সে
রোগ ‘সংক্রামিত’ । এই ‘সংক্রামিত’ শব্দটা বসিয়ে কবি তার কবিতা-ভাবনার
বিস্তৃতি ব্যাপক বাড়িয়ে দিলেন। পোশাকের সাথে
সংক্রামণের কী সম্পর্ক থাকতে পারে ? মনে মনে এটাই ভাবছিলাম! কিন্তু কবি বলছেন – এই সংক্রমণ –“সংক্রামিত হয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে সুস্থ আবহাওয়ায়” । এখনও তো আমরা একটা
সংক্রামণজনিত রোগে ভুগছি । কিন্তু পোশাকের সংক্রমণ শব্দটা আমাকে খুব
ভাবিয়েছে । কবি এরপরই যোগ করেছেন –“সুস্থ আবহাওয়ায়” । কিন্তু পোশাকে অভ্যস্ত হওয়ার
পূর্বে কী তবে ‘আবহাওয়া’ সুস্থ ছিল? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে
ভাসছিল । কবি ‘পোশাক’ শব্দটাকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেলেন । তবে কি কবি বলতে
চাইছেন – ‘পোশাক’ –ই সুস্থ পরিবেশকে
অসুস্থ করে তুলেছে। পোশাকই বাড়িয়ে তুলেছে নিরাপত্তাহীনতা । কবি শেষ লাইনে আরও
ব্যাপক করে দিলেন গোটা ভাবনার বিষয়টাকে –
“ শূন্যতাও বাড়ছে দ্রুত, শূন্যতা”

.jpg)
No comments:
Post a Comment