Wednesday, December 10, 2025

কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির এক নিবিড় অন্তর্বিক্ষেপ করেছেন সেলিম মুস্তাফা / তমালশেখর দে


 

 

 

              কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির এক নিবিড় অন্তর্বিক্ষেপ করেছেন সেলিম মুস্তাফা

                                           তমালশেখর দে


 ত্রিপুরার কবি-সাহিত্যিকদের  নিয়ে, তাদের কাজ নিয়ে আলোচনামূলক বইয়ের সংখ্যা প্রায় হাতে গোনা । সেই হাতে গোনার মধ্যে এই সময়ে  খুবই  গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছেন কবি-আলোচক সেলিম মুস্তাফা। ২০২৬ সালে বইমেলায়  ‘সৈকত প্রকাশন’  প্রকাশিত হচ্ছে  তাঁর “ কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ”। এর আগেও তিনি দশ কবি চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব নামে  আলোচনামূলক মূল্যবান একটি গ্রন্থ  আমাদের উপহার দিয়েছেন, একী প্রকাশনা থেকে । সেখানে তিনি  কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি তপন দেবনাথ, কবি স্বপন সেনগুপ্ত, কবি প্রদীপ চৌধুরী, কবি পীযূষ রাউত,কবি শক্তি দত্ত রায়, কবি অজিতা চৌধুরী, কবি মানস পাল, কবি অর্পিতা আচার্য, কবি স্বাতী ইন্দু, গল্পকার-উপন্যাসিক দীপক দেব, গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে, উপন্যাসিক সুতপা দাস, গল্পকার দীপক দেবতাদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন  এবার তিনি ত্রিপুরার প্রখ্যাত উপন্যাসিক এবং ছোটোগল্পকার দুলাল ঘোষ-এর যাবতীয় সাহিত্যকর্ম মানে তাঁর দশটি গল্প, পাঁচটি অনুগল্প, দুইটি উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । এই প্রচেষ্টা আমাদের একটা দিশা দেখাচ্ছে বলেই   আমার ধারণা । আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আমরা আলোচনা না-করলে, কারা করবে ? সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সেলিম মুস্তাফার এই কাজগুলো ত্রিপুরার আলোচনা-সাহিত্যের এক সম্পদ । চিন্তনশীল পাঠকরা এর মাধ্যমে আরও গভীরভাবে কবি- সাহিত্যিকদের জানতে পারবে ।পাঠক-গ্রাহ্যতার তত্ত্ব সাতের দশকের শেষে সমালোচনার একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করে । আলোচকরা মনে করেন যে, পাঠের ওপর এই প্রতিবন্ধকতা লাগানো যায় না যে, পাঠক ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ বা আগামী ভবিষ্যতে কীভাবে পাঠ করবেন । পাঠের প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলি স্থায়ীভাবে নিশ্চিত প্রতিক্রিয়া অথবা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, কিন্তু অর্থ-গ্রহণের স্বাধীনতা সাধারণত পাঠকের আছে । প্রত্যেকটি ব্যক্তিই তার নির্দিষ্ট স্বভাব,অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ, পূর্ব-ধারণা ও মূল্যবোধের অধিকারী । আর এখান থেকেই শুরু হয় পাঠ- গ্রহণের জটিলতা । আর ঠিক এই জায়গাতেই সেলিম মুস্তাফার এই কাজের সফলতা । একজন আলোচক তাঁর সমৃদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে পাঠকে অন্য একটা স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ।

  সম্প্রতি প্রকাশিত “কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ” এই গ্রন্থে দুলাল ঘোষ এবং তাঁর যাবতীয় লেখালেখিকে আমরা নতুন এক দর্শনে, উপলব্ধিতে , অনুভবে মনের ভিতরে আবিষ্কার করি । সেলিম মুস্তাফার আলোচনার ছোট্ট একটা অংশ এখানে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি – “ এখন পর্যন্ত   যতগুলি গল্প আমরা পেলাম সবই, আমার মনে হয়েছে  আঙ্গিকপ্রধান বয়ান । যদিও ছেঁড়া সুতোর মতো একটা গল্প অবশ্যই আছে ভেতরে বহমান । রচনায় দুটো প্রধান বিষয় আমরা খুঁজি – বিষয় আর আঙ্গিক । কী বললেন লেখক আর কীভাবে বললেন । এই দুটোই জরুরি । বিষয়হীন বলে কিছু হয় না । কারণ আঙ্গিক পরাশ্রয়ী । তার প্রকাশ ও বিকাশের জন্য বিষয় চাই আশ্রয়দাতা হিসেবে । তেমনি আঙ্গিকের অজস্র ডালপালা । দেখা, বীক্ষণবিন্দু, কী দেখা, কতটুকু দেখা, ভাষা, চিহ্নায়ক চয়ন, উপস্থাপনার মাত্রা ইত্যাদি ইত্যাদি অগণন ব্যাপার রয়েছে । ... কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায় । সেটা হচ্ছে নিরীক্ষার সার্থকতা । সঞ্চরণ । কম্যুনিকেশন । এক্সপেরিমেন্ট সম্পূর্ণ সফল না হলে অষুধ সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যায় । বিপরীত প্রতিক্রিয়াও হতে পারে । দুলাল ঘোষের গল্প পড়তে পড়তে  এইসব প্রশ্ন পাঠকের মনে জাগতেই পারে – দুরধিগম্যতার, দুরবগাহতার ।”

গল্পকার  দুলাল ঘোষের  সেই তথাকথিত দুরধিগম্যতার, দুরবগাহতার, ভিতরে প্রবেশ করে সেলিম মুস্তাফা প্রতিটি রচনাকে উন্মুক্ত করেছেন । কখনও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে, কখনও ভালবাসায় গল্পকারকে কাছে টেনে নিয়েছেন প্রকৃত আলোচকের মতো ।  এই গ্রন্থের সবচেয়ে বড় কথা, আলোচক কোথাও আলোচনার ক্ষেত্রে আপস করেননি । এবং আলোচনা প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক কথাও আলোচনায় এনেছেন, যা গ্রন্থটিকে আলাদা মর্যাদায় উন্নীত করেছে । দুলাল ঘোষের ছোটোগল্প, অনুগল্প, আর উপন্যাস দুটির আলোচনা পাঠ করে এটা মনে হয়েছে, সেলিম মুস্তাফা তাঁর নিজের মতামতকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে । এতে আমরা নিরপেক্ষ একটা দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছি, যা ত্রিপুরার সাহিত্য আলোচনায় অনেকটাই দুর্লভ । এবং  দুলাল ঘোষ সম্পর্কেও তাঁর মূল্যায়ন প্রায় একই । তিনি লিখছেন – “ একথা  পরিষ্কার যে, তিনি শুরুতেই স্থির করে নিয়েছেন, যা আসলে বলার, তা-ই বলবেন, একেবারে কাছ থেকে বলবেন, নিজের পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা থেকে বলবেন, একজন ‘ পার্টিসিপেন্ট অবজার্ভার’ হয়ে বলবেন, যেরকম একজন নাট্যকার স্বয়ং নাটকের কুশীলব হয়ে পরিবেশন করেন তাঁর নির্ভেজাল অপ্রতিরোধ্য বক্তব্য ।”

ত্রিপুরার গল্প-উপন্যাস সাহিত্যে দুলাল ঘোষ এক অনিবার্য নাম । ‘অনিবার্য’- শব্দটার পেছনে রয়েছে তাঁর বহু প্রাপ্তি । বহু সংগ্রাম । বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা । সেই সবই সেলিম মুস্তাফা “কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ” – বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । এটা নিছক আলোচনামূলক গ্রন্থ নয়, আলোচনার ক্ষেত্রে কীভাবে একজন লেখককে আবিষ্কার করতে হয়, তারও একটা পাঠ পাওয়া যায়  । আশা করি, আপনাদের ভালো লাগবে ।    

 

গ্রন্থ -- কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ

লেখক সেলিম মুস্তাফা

প্রকাশক সৈকত প্রকাশক / আগরতলা

মূল্য ২৮০ টাকা

Friday, December 5, 2025

ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষ্যে আগরতলায় জমজমাট চলচ্চিত্র উৎসব / তমালশেখর দে


 

ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষ্যে আগরতলায় জমজমাট চলচ্চিত্র উৎসব

 

 ঋত্বিক ঘটকের কর্মকাণ্ড লোকোত্তর ত্রিকালদর্শিতার মহাকাব্যিক পরিধিটিতেই যে ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকবে, তাঁর জন্মশতবর্ষে এসে সে ব্যাপারে আর অনিশ্চয়তার কোন অবকাশ নেই । ব্যাপারটা ঘতেই চলেছে দর্শক ও স্রষ্টার পারস্পারিক উপহার-আলিঙ্গনে । ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা শ্রেষ্ঠ দলিল, আমাদের বিভাজনের । তাঁর ছবিতে উত্তর বিভাজন মানুষের মনোবিপর্জয় স্পষ্ট লক্ষ করা যায় । এক জায়গায় বিস্মৃতি, অন্য দিকে শূন্যতা । মধ্যে একটা  অন্তর্বর্তী বেদনার প্রতিবেদন । এখানে ব্যক্তি আমার কিছুই করার নেই । ঋত্বিক ঘটকের  সিনেমাও তাই আমাদের মনোবেদনাকে তিনি গ্রন্থিত করেছেন পরম যত্নেসময়ের যা অতীত, সময়াতীত,এবং যা সময়ানুবর্তী তাকে যুক্ত করা এটা ঋত্বিক ঘটকের  একটা বড় কাজ ।  তাই তার কোন ছবিতেই নায়কের ঠিকানা স্থায়ী থাকে না । গৃহস্থ নয় । গৃহচ্যুতি, বাসস্থানচ্যুতি, তার সিনেমায় সব সময়ই একটা একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে । ইতিহাস চেতনা তার সিনেমায় স্পষ্টতই প্রবল । চিরকালীন বাস্তবতার সাথে তিনি আমাদের বারবার জুড়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন ।  ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় দেশভাগ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল মানব-অস্তিত্বের এক গভীর সংকট, যা তাঁর চলচ্চিত্রগুলিতে অবিচ্ছিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি দেশভাগের যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, এবং উদ্বাস্তু জীবনের মর্মন্তুদ আখ্যানকে বারবার তুলে ধরেছেন, যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' 'কোমল গান্ধার' এবং 'সুবর্ণরেখা' চলচ্চিত্রে। তাঁর শিল্প ছিল সমাজবদলের হাতিয়ার, এবং দেশভাগ নিয়ে তাঁর কাজগুলি ছিল এক প্রকারের নস্টালজিয়া ও এক গভীর মানবিক যন্ত্রণার প্রকাশ। দেশভাগকে তিনি মানুষের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি আখ্যান হিসেবে দেখেছেন। তাঁর 'মেঘে ঢাকা তারা' ছবিতে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট বিচ্ছিন্ন এবং বিচ্যুত মানুষের গল্প বলা হয়েছে।র‍্যাডক্লিফের আঁকা একটি কাল্পনিক রেখা কীভাবে একটি পরিবারের হেঁশেল এবং উঠানকে বিভক্ত করে দিতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন।ঋত্বিক ঘটক শুধুমাত্র বাস্তবতাকে তুলে ধরেননি, বরং বাস্তবতাকে তিনি তাঁর নিজস্ব শৈল্পিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যা ছিল বিনোদনের প্রভাবের বাইরে। তাঁর কাজগুলিতে দেশভাগের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া ও গভীর মানবিক যন্ত্রণা লক্ষ্য করা যায়, যা তিনি বারবার তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছন ।  'কোমল গান্ধার' ছবিতে তিনি দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক মিলনের কথা তুলে ধরেছেন, যদিও এটি দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে একটি গভীর যন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছিল। ‘সুবর্ণরেখা’ এই ছবিতেও ঋত্বিক ঘটক  দেশভাগের পরবর্তী সময়ের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে তুলে ধরেছেন। তাঁর নিজের জীবন এবং তাঁর শিল্প একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, এবং তাঁর দেশভাগ সংক্রান্ত কাজগুলি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণার প্রতিফলন  

সম্প্রতি ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর ‘সুকান্ত একাডেমি’-তে ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষে  ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় । প্রথম সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হয় ‘অযান্ত্রিক’ । মূল প্রদর্শনী শুরুর আগে    ‘পরিসর’ ও ‘ ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগ’- এর উদ্যোগে ঋত্বিক ঘটকের জীবনের উপর নির্মিত স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত করা হয় ।  এরপর তাঁর জীবন ও চলচ্চিত্র আলোচনা করেন অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ওড়িশা উচ্চ আদালতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শুভাশিস তলাপাত্র। সম্মানিত অতিথি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন – অধ্যাপক এবং চলচ্চিত্র বিশ্লেষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, ও রাজ্যের চলচ্চিত্র পরিচালক-নির্মাতা দীপক ভট্টাচার্য । অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন  ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষ  উদযাপন কমিটির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম শাহ । অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগের অধ্যাপক  সুনীল কলই।  স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুমন্ত চক্রবর্তী ।

দেশভাগের তিক্ত যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে ত্রিপুরাও অতিক্রম করেছে । এখনও সেই সম্পর্কিত ঘটনাবহুল স্মৃতি আমাদের ক্লান্ত করে । আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই ছবিগুলো পৌঁছে দেওয়া, এরসাথে তাদের ইনভলভমেন্ট করিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব । সেই দায়িত্বই কাঁধে নিয়েছেন যেন  ‘পরিসর’ ও ‘ ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগ’ ।  এই যাত্রা ক্রমে ক্রমে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাক । প্রজন্ম ফিরে দেখুক তার অতীত । চলচ্চিত্রের ভিতর দিয়ে আমরাও বিচিত্র জীবনের মুখোমুখি হই । অজস্র ধন্যবাদ ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটিকে ।

 

 

Thursday, December 4, 2025

“আমি ইউটোপিয়ান ওয়ার্ল্ডের গল্প লিখি না।” / সাক্ষাৎকার তমালশেখর দে

 





বাংলা সাহিত্যের তরুণ কবি-গল্পকারদের মধ্যে তন্ময় মণ্ডল এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন, মূলত তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং লেখনীর গুণে। আজ তাঁর সাথে একান্ত কথোপকথনে তমালশেখর দে ।


                       “আমি ইউটোপিয়ান ওয়ার্ল্ডের গল্প লিখি না।”


১। প্রশ্ন :  প্রথমেই আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, জীবন-চর্চার ঠিক কখন, কোন পর্যায়ে আপনার মাথায় একটা গল্প ঝিলিক দিয়ে খেলে যায়? নাকি গোটাটাই দীর্ঘ এবং নিখুঁত পর্যবেক্ষণের একটা প্রতিফলন!


উঃ গল্প লেখা আমার মনে হয় কৃষিকাজের মতো। কোনো ফসল উঠতে তিনমাস লাগে, কোনটা দেড় মাসেও পরিপক্ক হয়। তবে যন্ত্রণার ভেতরে বসে যন্ত্রণার কথা লেখা যায় না। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব লাগে। সময়কাল লাগে। আর গল্পের বীজ তো পাওয়া যায় জীবন থেকেই। শুধু লাগে জীবনকে হাতের তালুতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার চোখ। পর্যবেক্ষণ, জীবনকে পড়া, প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত মানুষ পড়া আর পাশাপাশি উপস্থাপনের শৈলী নিয়ে কাটাছেঁড়া-অনুশীলন, নতুন ভাষার সন্ধান— এই তো। আমি চেষ্টা করি মূলত সমাজের সংকট, বৈষম্য, বিশ্বায়নের দাসত্বে আলো ফেলতে। ভণিতা আর পোশাকি ভদ্রতার যে আবরণ— তার প্রতিপক্ষে আমি অস্ত্রের মতো এক একটি গল্পকে দাঁড় করাতে চাই।       


 ২। প্রশ্ন : কবিতা এবং গল্প দুটোতেই আপনি সব্যসাচী। কোথাও কি আপনি মনে করেন, দুটো মাধ্যম একে-অন্যের পরিপূরকই? নাকি মনে হয়, পাশপাশি হেঁটে গেলেও দু-জনের মধ্যে একটা সতীনপনা সম্পর্ক আছে? এদিক ওদিক হলেই সমূহ বিপদ ? 


উঃ আমি কখনও গল্প লিখতে চাইনি। সময় আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে। কবিতায় সব কথা বলা যায় না। তাই একদিন পাশাপাশি গল্পও লিখতে শুরু করেছিলাম। একশোর ওপর গল্প লেখা হয়ে গেল। আমার মনে হয়নি কখনও দুজনের মধ্যে কোনো বৈরিতা আছে। বরং একে অপরের পরিপূরক হতে পারে যদি নিমগ্নতা জোরালো হয়। আর একটি কথা বলতেই হয় কবিতার পাঠক ও গদ্যের পাঠক কিন্তু অনেকাংশেই আলাদা। গদ্যের পাশাপাশি কবিতাও পড়েন এমন পাঠকের সংখ্যাটা মনে হয় তুলনামূলক কম। মূলত মনে কিছু চিন্তা আসে, সেই চিন্তা যে প্রকরণে আমার কাছে ধরা দেয় তা-ই উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। কখনও তা গদ্যে আসে কখনও কবিতায়। পাঠকের কাছে কোন প্রকরণে তা পৌঁছল তা আমার হাতে নেই। একটির বদলে দুটি রাস্তা যদি পাওয়া যায় ক্ষতি কি।


৩। প্রশ্ন : সামাজিক, নৈতিক, আর্থিক টানাপড়েনের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ভিতরেও মানুষের চেতনার ভিতরে খুব ধীরলয়ে, চুপিসারেও একধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলতে থাকে, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মানসিকতাকে জর্জরিত করতে থাকে তার আপন মনে। আর আপনি সেই সংকটকেই কখনও আলতো করে, কখনও প্রবলভাবে আপনার গল্পে তুলে ধরতে চান। আমার প্রশ্ন, আপনি আপনার গল্পে মূলত পাঠককে কোন্ সে অস্বস্তিকর মুহূর্তের সামনে দাঁড় করাতে চান ?


উঃ  পাঠককে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করালে একটু তো অস্বস্তি হবে বৈকি! আমি ইউটোপিয়ান ওয়ার্ল্ডের গল্প লিখি না। মানে যে গল্পে তুমুল এক আনন্দঘন অবাস্তবিক পৃথিবীর ছবি আঁকা হয়। তা আমি লিখতে পারি না। হয়তো এ আমারই ব্যর্থতা। আমার গল্পের প্রথম এবং শেষ উপকরণ মানুষ ও সমাজ। ফলত আমি যদি ভূতের গল্পও লিখি সেখানে ভূতের আড়ালে মানুষের সমাজ আসবে, সংকট আসবে, বৈষম্য আসবে, রাজনীতি আসবে। সচেতনভাবেই চেষ্টা করি সমাজকে আয়না করতে। একটা অভিমুখ তৈরি করতে। কতটা সফল হয় সেগুলো যাঁরা পড়েন তারাই বলতে পারবেন।



 ৪। প্রশ্ন : ‘শকুন ও গঙ্গাজল’ গল্পে আমরা নিঃসঙ্গতার ভয়াবহ এক সত্যের মুখোমুখি হই। ছেলেমেয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কলকাতায় বাবার মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। টাকা পাঠালে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাদের হয়ে যাবতীয় কাজ করে দেবে। এরপর গল্প এবং জীবনের জটিলতা তার মতো করে গড়ায়। আপনার কি মনে হয়, আমরা এতটাই যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি? নাকি বাধ্য হচ্ছি? লেখক সত্তার বাইরে দাঁড়িয়ে আপনি গোটা বিষয়কে কীভাবে পর্যালোচনা করতে চাইবেন?


উঃ ‘শকুন ও গঙ্গাজল গল্পটির যে চিন্তা— তা হয়তো আগামীর পৃথিবীতে ঘটবে। কোথাও কোথাও ঘটছেও। আমরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হচ্ছি। পরিবার থেকে। আত্মীয়স্বজন থেকে। বন্ধুবান্ধব থেকে। আমাদের বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। কর্পোরেট দুনিয়া, বিশ্বায়ন, পুঁজির দৌরাত্ম্য আমাদের ভবিতব্য লিখছে। মানুষ যত একা হবে সে তত দুর্বল হবে। একটি পরিবারে চারটি টিভি, দুটো ফ্রিজ বিক্রি করা সহজ হবে। জাপানে একটি শব্দ এখন খুব প্রচলিত ‘কোডোকুশি। এর অর্থ হল একাকী মৃত্যু। এমন ঘটনা জাপানে অহরহ ঘটছে— একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা একাই থাকেন, যিনি মারা যাওয়ার কিছুদিন পর তার মৃতদেহ আবিস্কৃত হয়। একদিন-দু-দিন,-দু-রাত কেটে যাওয়ার পরও দরজায় কড়া নাড়ার কেউ নেই। আমরাও তো সেদিকেই এগোচ্ছি।   


৫। প্রশ্ন : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শক্তি আপনাকে বারবার আহত করেছে। আপনার গল্পের বয়ানও তাই বলে। আপনার কাছে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, শুধু গল্প লিখে কী এই প্রপোগেন্ডা, হেজিমনির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব? লেখক হিসেবে সামাজিক দায়-দায়িত্ব টাইপ কথাবার্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?

উঃ আপনার এই প্রশ্নের ভেতর দুটো প্রশ্ন আছে। এক এক করে বলি। প্রথমত পৃথিবীতে যতরকম উপায়ে মানুষকে ভাগ করা যায় আমি তার বিরুদ্ধে। আমাদের দেশে একটা বড় সমস্যা হল ধর্ম সম্পর্কে মানুষের স্বল্প জ্ঞান আর তীব্র আস্ফালন আছে- যা ভয়ঙ্কর। ফলত ধর্ম যে মানুষকে সংযম দেবে, শৃঙ্খলা দেবে— তা হয় না। এর বিরুদ্ধে গল্প লিখে কী হবে আমি জানি না। তবে যদি একজনেরও মনোজগতে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আসে, তাতেই তৃপ্তি। এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নে, লেখক কোনো ভিনগ্রহের জীব নয়। তাঁকেও বাজার করতে হয়, হাসপাতালে বাড়ির লোক নিয়ে ফুটবলের মতো একাউন্টার থেকে ও কাউন্টারে ছুটতে হয়, ছেলেমেয়ের সুখের জন্য নিজের আনন্দ গিলে ফেলতে হয়। লেখকদের আলাদা যেটা থাকে বলে আমার মনে হয়, তা হল দেখার চোখ ও দেখানোর আঙ্গিক।

  

৬। প্রশ্ন : যতদিন যাচ্ছে আমরা ক্রমশ এক জটিলতার এগিয়ে চলেছি। কখনও ক্লান্ত। কখনও বিধ্বস্ত হই। তারপরও এটা সত্য আমরা স্বপ্ন দেখবো। আপনিও দেখবেন। আমি আপনার সে-ই স্বপ্নটা সম্পর্কে একটু জানতে চাইব। 


উঃ স্বপ্ন তো অনেক। আর স্বপ্ন আছে বলেই না মানুষের বেঁচে থাকার আশ্বাসটুকু আছে। কিছু স্বপ্ন ব্যক্তিগত হয়েও সার্বজনীন হয়। আমাদের সেই স্বপ্নগুলো নিয়ে ভাবা উচিত, কথা বলা উচিত। এই অস্বস্তিকর ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-দের যুগে পরিমিতিবোধ, পরিশীলিত রুচি নিয়ে কথা বলা উচিত। একটা পৃথিবীর স্বপ্ন আমি দেখি যেখানে লোভের ভাষা হেরে যাবে ভালোবাসার সঙ্গবদ্ধ প্রয়াসের কাছে। একটা অশীতিপর বৃক্ষের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে সবেমাত্র হাঁটতে শেখা শিশুটি খিলখিল করে হেসে উঠবে। আর গাছের কোটরে বসে ঝিমধরা পাখিটি সেই হাসির ভাষা বুঝে যাবে নিমেষে। অবশ্য সব স্বপ্ন তো পূরণ হয় না। তবু স্বপ্ন আছে বলেই আমরা আছি।  






৭। প্রশ্ন : খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন গল্পকার একসময় গল্পের ভিতরেও আর নিজেকে আটকে রাখতে চান না। পাখা মেলে আরও উপরে, আরও দূর সীমানা, মানে উপন্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আপনিও কি এমন কিছু ভাবছেন? বিষয় কিছু ভাবছেন...

উঃ একটা উপন্যাস লিখেছি আমি। এখনও সন্তুষ্ট হতে পারিনি। পোস্টমর্টেম চলছে। কবে প্রকাশিত হবে জানি না। প্রত্যেক কালখণ্ডে সমাজ আশ্চর্য বাঁক নেয়। ফলত মানুষের জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। ‘ট্রেন্ড’ নামক বিকৃত শব্দও গিলে নেয় মগজের বিবেচনাবোধ। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে আছে প্রকৃতি। একটি হাতির, একটি বিড়ালের, একটি শকুনেরও যে এ পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার আছে আমরা ভুলে গেছি। এই প্রকৃতি, পরিবর্তিত সমাজ, আমাদের লোভ, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, পরিণতি— এইসব নিয়েই আমার প্রথম উপন্যাস।

গল্পকার তন্ময় মণ্ডলের গল্পে সময়ের সংকট এবং উপস্থাপনার মুন্সিয়ানা প্রকটভাবে লক্ষ করা যায় ।/ তমালশেখর দে

 





গল্পকার তন্ময় মণ্ডলের গল্পে সময়ের সংকট এবং উপস্থাপনার মুন্সিয়ানা প্রকটভাবে লক্ষ করা যায় । 

                                তমালশেখর দে

 

 বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পেই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা- নিরীক্ষা, খাত-বদল, পালাবদল হয়েছে । একটা সময় গল্প ছিল গল্পকে নিয়েই । প্রেম, অভাব-কষ্ট, জীবন –সংগ্রাম, হাসি-মজা, দারিদ্র, দেশপ্রেম, এইসব নানা বিষয় নিয়ে কাহিনি নিয়ে লিখিত হয়েছে ।  গল্পে আদি- মধ্য- অন্ত থাকত । কিন্তু সেই ক্রমে, ক্রমেই পরিবর্তন এসে গল্প দেখা দিল, অনুসন্ধান, একটি বিশেষ মুহূর্ত, মুহূর্তের ভয়ঙ্কর  ওঠা-পড়া, বিশেষ একটি আবহ, সামান্য সংলাপ, আবছা সম্পর্ক নিয়ে গল্প, যা বিষয়বস্তুহীন, হয়েও আশ্চর্য কিছু উন্মোচন। আর এভাবেই গল্প অনেকটাই কবিতার কাছাকাছি আসতে লাগল । কবিতা ও গল্পের এই কাছাকাছি আসা এবং চরিত্রের ভিতর দিয়ে গল্পে একাকার হয়ে যাওয়া নিয়েও প্রচুর   পরীক্ষা- নিরীক্ষা হয়েছে । মাঝে মধ্যে নিজের কাছেই জানতে চাই, আসলে গল্প, মোড় নিচ্ছে কোথায় ? এই  পরীক্ষা- নিরীক্ষা  সবই কী বহিরঙ্গের ব্যাপার ? মূলত ছোটগল্প আধুনিকতর হয়ে ওঠে যুগ ও সেই যুগের মানসিকতার পরিবর্তনের ফলে, ভাষা ও বিষয়েও আসে সেই সংস্কার । সেই প্রবণতা ।

এই কথাগুলো ভাবছিলাম গল্পকার তন্ময় মণ্ডল –এর “শকুন ও গঙ্গাজল” ছোটগল্পের সংকলন থেকে উক্ত গল্পটি পড়তে পড়তে । পশ্চিমবঙ্গের তরুণ গল্পকার । তাঁর গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য , তিনি হাঁটতে হাঁটতে জীবন থেকে টুক্ করে একটা মুহূর্ত তুলে নিয়ে আসেন । চরিত্রের  পর্যবেক্ষণও অসাধারণ । কোথাও কোথাও পাঠককে দাঁড় করিয়ে রেখে দেয় যেন ।  

 

 “শকুন ও গঙ্গাজল” গল্পটার শুরু এভাবে -- 

“‘বলো হরি হরি বলো’ – এই শব্দ ভেদ করে যেটুকু শুনতে পাচ্ছে সুমঙ্গল তাতে উত্তর দেওয়া মুশকিল । নিমতলা থেকে ফিল্ড ম্যানেজার শান্তুনুর ফোন ।

“শান্তুনু একটু সাইডে যাও । কোনো কথাই শোনা যাচ্ছে না ।”

এবার শোনা গেল, “ স্যার এই পার্টির লাস্ট পেমেন্ট আটকে আছে । বডি শ্মশানে নিয়ে এসেছি । মেয়ে ইউ.কে । আসতে পারবে না । অফিসে ফোন করতে বললাম । আপনি একটু দেখুন । পেমেন্ট হয়ে গেলে আমাকে জানান । আপাতত বার্নিং  হোল্ডে রাখছি।”

 

কী অসাধারণ শুরু । কোথাও কোনো কৃত্রিম ভণিতা নেই। পাঠক হিসেবে  এটাই আমার প্রথম প্রাপ্তি । টানটান শুরু । টগবগে তরতাজা শব্দ চয়ন । ছোটো ছোটো বাক্যের সটান গঠন-পদ্ধতি। এবং শুরুতেই পাঠককে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ না- দিয়েই নির্দয়ের মতো আক্রমণ করে বসেন । পাঠক তার মুঠোফোন রাখতে  বাধ্য হয়ে পড়ল । না-হলে ডিজিটালের এই যুগে পাঠককে  গল্পে শুধু ন্যারেটিভের  চকমক বক্তব্য দিয়ে আটকানো কেবল মুস্কিল নয়, অসম্ভবও বটে । এই তরুণ গল্পকার সেদিকে  যথেষ্ট সচেতন । তাই তো শুরুতে শুধু একটি বাক্য ব্যয় করলেন--  “স্যার এই পার্টির লাস্ট পেমেন্ট আটকে আছে । বডি শ্মশানে নিয়ে এসেছি । মেয়ে ইউ.কে ।”  ‘বড়ি’ শব্দটা এখানে খুব সচেতন চয়ন করলেন গল্পকার । পাঠককে শুরুতেই চমকে দিলেন, অনেকটা  ইচ্ছাকৃতভাবেই । তেমনই  চরিত্রের নাম ‘সুমঙ্গল’ নামটাও  খুব সচেতনভাবে নির্বাচন করলেন । প্রথম ছয় লাইনেই  গল্পকার যা বাজিমাত করার করে ফেললেন । এটা টেকনিক বটে, কিন্তু সার্থক করতে পারে ক-জন গল্পকার! নাহলে আজকের এই ডিজিটাল যুগে, পাঠকের মনে  কৌতুহল জাগিয়ে তোলাই তো এখন এক ভয়ানক ব্যাপার । বিচিত্র এই দেশে, এখন তো কেউ কিছুতেই বিস্মিত হয় না । অবাক হয় না । আবেগিয় হয়ে ওঠে না । এই রকম পরিস্থিতিতে  যেকোনো গল্পকারের চ্যালেঞ্জ  সহজাতভাবেই বেড়েই যায় ।

যাই হোক, আমরা ছিলাম  “শকুন ও গঙ্গাজল”- এর প্রথম আট লাইনের প্রথমভাগে ।  এরপর কী হবে, মনে মনে এই ভাবার ফাঁকেই দেখি গল্পকার পুরো প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে পড়েন । এই বাঁক নেওয়াটাও একটা টার্নিং পয়েন্ট । এবং খুব চালাকি করে পাঠককেও  বাম-হাতে আটকে রেখে, তিনি এগিয়ে গেলেন গল্পের ডান দিকে । এই পয়েন্টটা আমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলল ! গল্পকারের টেকনিকটাও ভালো লাগল । তাই তো বলছি, গল্পকারের গল্পের জাদু এখন আর শুধু গল্পে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, তাকে পাঠকের মনস্তত্ত্বের সাথেও সমান তালে খেলা চালিয়ে যেতে হয় । তবেই-না লেখক- পাঠকের মধ্যের খেলাটা  ফাইনাল খেলার মতো জমে ওঠে । আর এখানে তন্ময় সফল । ততক্ষণে তন্ময় এগিয়ে চলেছে অনেকটাই নিরাবেগভাবে তার মতো করে, স্মার্ট, সটান বয়ানে –

 

“অফিসে ঢুকেই ঢাকুরিয়া এরিয়ার লাস্ট মাসের কাস্টমার লিস্ট দেখছেন এস কে স্যানাল ।  আওহাওয়া খুবই উত্তপ্ত ।”

“এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং । এমাসের মধ্যে যদি অন্তত ফিফটি পার্সেন্ট কাস্টমার  ক্র্যাক না করতে পারো বিদায় হও । শকুনের মতো চোখ ফেলে বসে থাকো । নাহলে এই প্রফেশনে টিকবে কী করে ? কোম্পানি কি মুখ দেখে মাইনে দেবে ? আমাকেও তো কৈফিয়ত দিতে হয় নাকি ?” বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলার পর ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের ওপর নেমে আসা বটের ঝুরির মতো গোঁফগুলো সরাতে সরাতে রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন এস কে সান্যাল।”

 

--এই পর্যন্ত পড়ে  থামলাম । এবং বুঝলাম, পাঠক হিসেবে  আমি আটকে গেছি । এবং কোথায় যেন  নিজের অজান্তে নিজেকেও   জড়িয়ে নিতে শুরু করেছি গল্পের সাথে ।  এস কে স্যানালের সাথে আমিও আমার অফিসের বসের একটা মিল খুঁজে পেতে শুরু করেছি । “এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং।” – এটা তো এখন প্রবাদ বাক্যের মতো একটা আতঙ্কের বাক্যবন্ধ হয়ে উঠেছে । শত শত নিম্নবিত্ত- মধ্যবিত্তের আতঙ্কের বাক্যবন্ধ এখন এটা । গল্পকার কীভাবে আমার ভিতরেও প্রবেশ করিয়ে দিলেন তার গল্পের আতঙ্কটা!  অথচ আমি প্রথমে তো নিছক একজন নিরীহ পাঠকই ছিলাম । আর এখন গল্পকার  কীভাবে, কী চতুরতার সাথে আমাকে তার গল্পের একটি চরিত্রে পরিণত করে ফেললেন । আমি কি পাঠক হিসেবে, এটা চেয়েছিলাম ? নিশ্চয়ই না । মূলত একটু রিলিফের আশায় গল্পের নামটা দেখে, বইটা হাতে নিয়েছিলাম । অথচ কোথায় রিলিফ, এখন যেন আমিই এর শিকার হয়ে গেলাম । মনের যুক্তি বলল, তাহলে বাদ দাও পড়া ! কিন্তু সেও তো পারছি না । গল্পকার আমাকে কী এক মোহে, নিষ্ঠুরের মতো আঁকড়ে ধরেছেন । আমি ইচ্ছে করেও আর গল্পটি না- পড়ে  রাখতে পারছি না ।  মন বলছে, ‘এটা তো তোমার কথাই বলছে যে ! পড়বে না ?’ এই তো গল্পের খেলা । এটাও গল্পকারের এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা । বুঝলাম, এটাও  এখন গল্প লেখার একটা অংশ । নীরব খেলা ।  ডিজিটাল মাধ্যম এখানেই এখনও মানুষের কাছে হেরে আছে । তাই তো এখনও গল্প লেখা চলছে । সাহিত্য হচ্ছে । যন্ত্র এখনও সব কিছু জয় করে নিতে পারেনি ।

 

“কোম্পানি কি মুখ দেখে মাইনে দেবে ?” – কর্পোরেট অফিসের খুবই সাধারণ উক্তি এটি । কিন্তু গল্পকার কী নিখুঁত বর্ণনা দিচ্ছেন – “বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলার পর ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের ওপর নেমে আসা বটের ঝুরির মতো গোঁফগুলো সরাতে সরাতে রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন এস কে সান্যাল।” এর বেশি কিছু কি আর বলার থাকে ?  ‘শকুন’- শব্দটাই তো যথেষ্ট । কিন্তু এই শব্দের কী কোন বিকল্প ছিল এখানে ? হয়ত না । বরং এই শব্দটা না- আনতে পারলে, গোটা চিত্রকল্পটাই মাঠে মারা যেত । হয়ত গল্পটাও। এখানেই চাই গল্পকারের মানসিক প্রস্ততি । গল্প লেখার আগের গল্প ভাবার প্র্যাকটিস্ । ভাবা প্র্যাকটিস্ । প্লট নির্বাচন থেকে চরিত্রের নামকরণ পর্যন্ত ভাবা-র   প্র্যাকটিস্ ।  এখানেই  পরীক্ষা- নিরীক্ষা । এখানেই গল্পের পালাবদল । সামান্য সংলাপ, কিন্তু অদ্ভুত চতুরতা । বুননের দক্ষতা । আর এখানেই দশকের সাথে দশকের গল্প ভাবনার পার্থক্য । চরিত্রকে তুলে ধরার পার্থক্য। তরুণ গল্পকারদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ । এই পয়েন্টে তন্ময় দারুণভাবে সফল । সে গল্প বলতে এবং পাঠককে ধরে রাখতে জানে । বাক্য দিয়ে সে চিত্রকল্প আঁকতে জানে, পাকা চিত্রশিল্পীর মতো । ছোটো ছোটো রেখায় আবহকে ধরে ফেলে, সমগ্রের মতো ।

 গল্পের পরবর্তী আরেকটু পাঠ করলাম --

 

“বদমেজাজি হিসাবে তাঁর সুনাম সর্বত্র । স্যানাল স্যার ঢুকলেই কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মতো খিলখিল করা অফিসটায় স্মাশানের নীরবতা নেমে আসে ।

 

ঢাকনা সরিয়ে গ্লাসের জল ঢকঢক করে গলায় ঢেলে পেন্ডিং পেমেন্টের লিস্টটা দেখে নিলেন ।শম্ভু শাসমল, ঢাকুরিয়ার রিজিওনাল অবজারভার; তখনও পিছনে হাত দিয়ে মাথা নীচু করে সান্যাল স্যারের কেবিনে দাঁড়িয়ে । যেতে না বললে তো যাওয়াও যাবে না । অসীম নীরবতার মধ্যে শুধু শ্বাস- প্রশ্বাসের আওয়াজটুকুই শোনা যাচ্ছে ।

 

এস কে সান্যাল নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, “ডেটা সায়েন্সের ছোকরাদুটো যাদের আজ জয়েনিং ছিল ওদুটোকে কনফারেন্স রুমে বসাও। সুমঙ্গলকেও পাঠাও । আমি আসছি।”

 

গল্পকার ক্রমেই তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে । এস কে সান্যালের চরিত্র গল্পকার এক লাইনেই ধরিয়ে দিলেন, এই বলে – “স্যানাল স্যার ঢুকলেই কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মতো খিলখিল করা অফিসটায় স্মাশানের নীরবতা নেমে আসে ।” একটাও বাড়তি শব্দ ব্যবহার করেননি গল্পকার । অথচ পাঠকের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে চিত্রকল্প ।  শুধু কী তাই, অফিসকর্মীদের টেনশন, ভয়ের ভিতর দিয়ে বর্তমান চারকির বাজারটাকেও কী অসাধারণ কৌঁশলে ফুটিয়ে তুললেন, মাত্র এক লাইনের ভিতর দিয়ে । ‘ওয়ার্ড ইকোনমি’- র যথার্থ প্রয়োগ গল্পকারের গল্পে দেখার মতো । তার প্রতিটি শব্দই খুব সুচিন্তিত । কিন্তু কোথাও মনে হচ্ছে না,  এর ফলে গল্প যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে । গল্প তার সাবলীলতাকে ঠিক ধরে রেখেছে । আবার পাঠককেও টেনে ধরে রেখে দিয়েছে । গল্পের আগামী কি হতে যাচ্ছে, তার কোনো আভাসই পাচ্ছি না । তাই  গল্প থেকে আগ্রহ হারিয়েও ফেলতে পারছি না !  বইটা রাখতেও পারছি না । মন বলছে, এই তো কটা লাইন । পড়েই দেখি না, এরপর কী হল !  তাই গল্পেই আটকে রইলাম ।

 




মানুষ তো মনোজীবী । মনই তার প্রধান সম্বল । গল্পকার তন্ময় মণ্ডল পাঠকের সেই মনকে খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেই গল্পের বুনন সাজিয়েছেন । এই গল্পের মূল সম্পদ হচ্ছে তার কনসেপ্ট । আইডিয়া । সাথে তার উপস্থাপনার বিশেষ গুণ । নাহলে, আজকাল একটা গল্প শুনিয়ে বা পড়িয়ে আরেকজনকে কৌতূহলী করে তোলা প্রায় অসাধ্য । তন্ময় সেটা জানে । জেনেই সে তার জাল বিস্তার করেছে । গল্পের পুরো বিষয়টা আমি বিস্তারিত বলছি না  । গল্প থেকে একটা অংশ উল্লেখ করেই থামবো, এতে গল্পটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে  পাঠকের  কাছে –

 

“ আমরা প্রত্যেকেই গঙ্গাজলের এক-একটি বিন্দু । সবার মেহনতেই গঙ্গাজল প্রাইভেট লিমিটেড নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করছে । মন দিয়ে কাজ করুন । আপনি যদি কোম্পানির জন্য সময় ও শ্রম দেন কোম্পানি আপনাকে রিটার্ন দেবে । আর একটা কথা মনে রাখবেন তথ্য অর্থাৎ ডেটাই আমাদের ব্যবসার মূলধন । তাই প্রপার ডেটা মেন্টেনেন্স, কাস্টমার কলিং এগুলো যত ভালো হবে রেভিনিউ তত বাড়বে । যত দিন যাবে পরিবার ছোট হবে । ছেলেমেয়ে বিদেশে চলে যাবে । বাবা-মা এদেশে । তাছাড়াও বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা মৃত্যুর পরের রিচুয়ালস সম্পর্কে কিছু জানে না । জানলেও খুব কম । পুরোহিত পাওয়া মুশকিল এখন শহরে । সুতরাং চোখ কান খোলা রেখে কাজ করুন । মার্কেট বাড়ছে আর সোশ্যাল মিডিয়া, ডেটা সায়েন্স ইমপ্লিমেন্টের পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় কমিশন বেসিসে ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ করুন । যারা খবর দেবে । ডেটা দিলেই পয়সা । খাটনিও কম । ক্লাবের ছেলেদের টার্গেট করুন । ওদের হাতে পয়সা থাকে কম । আবার সবার হাঁড়ির খবরও জানে । থ্রি চিয়ার্স ফর ডেথ । মন দিয়ে কাজ করুন সবাই।”

 

গল্পকার এস কে সান্যালের এই বক্তব্যের ভিতর দিয়ে গোটা পৃথিবীর পুঁজিবাদের মূল সার কথাই তুলে ধরলেন ।  গতানুগতিক মানবিকতার অবস্থান কোথা থেকে কোথায় গেছে, এর প্রতিটি স্তরকে খুবই সাবলীলভাবে  চিত্রায়িত করেছেন তার বয়ানে । আমাদের বর্তমান, আগামী ভবিষ্যৎ তো সে দিকেই এগিয়ে চলেছে । বর্তমানেও বহমান ।

গল্পকার চরিত্রের নামকরণও করেছেন গল্পের প্লটের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে । চরিত্রের মুখে কথোপকথনের ডায়লগও সাজিয়েছেন সেই অনুযায়ী । গল্পকারের এই বৈশিষ্ট্যটা আমাকে আলাদাভাবে আকর্ষণ করেছে ।   এক কথায় তন্ময় মণ্ডলের “শকুন ও গঙ্গাজল” গল্প সংকলনের বেশ কয়েকটি গল্প আমাকে আপ্লুত করেছে । আপনারাও পড়ে দেখতে পারেন ।  

Monday, November 10, 2025

কবি অজিতা চৌধুরী ঃ মন্দ্র উচ্চারণের গভীরে দ্রোহের এক গভীর উচ্চারণ -- তমালশেখর দে


 

 

কবি অজিতা চৌধুরী ঃ মন্দ্র উচ্চারণের গভীরে দ্রোহের এক গভীর উচ্চারণ

                           তমালশেখর  দে 

 

 

বৃষ্টি আমার কবিতার উৎস জলধারার অবিরল প্রবহমানতা অনর্গল খুলে জন্ম হয় কবিতার আরও কিছু অভিমুখ, কোন ঘটনা, গভীর কোন দুঃখবোধ অনিবার্যভাবে কবিতায় উঠে আসে আমার কৈশোর, যৌবন, মধ্যবয়স ত্রিপুরার আলো ছায়ায় কেটেছে, সেখানের বাস্তবতা, সমস্যা, প্রকৃতি সবই তো আমার ভালোবাসি স্থানিক ভূগোলকে জীবনের প্রান্তসীমায় উপলব্ধ হলাম কবিতার মূল শর্ত, ভালোবাসা – কবি অজিতা চৌধুরী আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে অন্যতম একজন ।  কবিতা- আড্ডায় তাঁকে প্রথম দেখি, চেহারায় একটা মা, মা, ভাব । স্থির, ধীর । নম্রভাষী । কথা বলার মধ্যেও সেই রেশ । ব্যবহারেও একটা মা মা ভাব। সেলিম মুস্তাফা বললেন, এই আমাদের ‘মেজদি!’ আমরা সবাই তাঁকে মেজদি বলেই ডাকি । তুমিও মেজদি ডেকো । সেই থেকে তিনিও আমার মেজদি হলেন । আজও মেজদি । এরপর বহু কারণে-অকারণে মেজদির বাড়ি গেছি । আজ যখন পেছন ফিরে সেইসব দিনের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, আমি মূলত মেজদির ভিতর দিয়ে একটি গ্রাম-বাংলার, আমার খুব আপন, খুব প্রিয়, যার কাছে সব বেদনা বলা যায়, এমন একটি চরিত্রকে মূলত কাছ থেকে দেখার, পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করতাম । এবং সেই অভিজ্ঞতা আমি আজও বহন করি । এই যে এখন মেজদির “কবিতা সমগ্র”-টি পড়ে চলেছি, তখনও আমি সেই মেজদির দিকেই তাকিয়ে আছি । তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় লিখেছেন – “ কবি যেমন কোমল মনের, তাঁর কবিতাও নম্র স্বভাবের । মন্দ্র  সপ্তকে উচ্চারণ, তাঁর মনের মায়া জড়িয়েছে ভাষাকে, শত যন্ত্রণায় বিরুদ্ধে শব্দ তাঁর উচ্চকিত নয়, বরং দরদী এক ভাষায় পাঠকমনে পৌঁছে যায় যন্ত্রণার অনুভব। শুরু থেকে কবিতার এই গুণগুলি কবি লব্ধ করেছিলেন বা বলা যায়, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছিল । ওইসময় থেকেই তিনি স্বতন্ত্র এবং কাব্যঘ্রাণে আভাসিত । কবি অজিতা চৌধুরী কবিতা লেখার চেষ্টা করেন না, সাদা কাগজে নিজেকে উজাড় করে দেন, নিজেকে ঢেলে দেয়াই তাঁর কবিতা, তাই কবিতা হয়ে ওঠে তিনি যেমন ।”

 

কবি অজিতা চৌধুরী-র প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ দীঘল বাঁকের জল” প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে । স্থানিক একটি খালের বাঁকের নামেই গ্রামটির নাম  দীঘল বাঁক ।  মিষ্টি একটা নাম তো বটেই । কিন্তু এর ভিতরে কোথায় যেন একটি কাব্যিকতা রয়েছে । রয়েছে একটি গোপন নারী মনের কথা । কেবল নারী-মন ? না, ভুল বললাম, আমাদের প্রত্যেকের মনের ভিতরেই একটা দীর্ঘ-বাঁক থাকে । হৃদয়ে থাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ । সুড়ঙ্গের বাঁকে বাঁকে গোপন মনের যত গোপন কথা । সুখ-কথা, দুঃখ-কথা। মায়াবি বিকেলের কথা । নিঃসঙ্গ  দুপুরের উদাসী কথা । আনন্দে আঁচল উড়ার কথা –

 

“হাওয়ায় উড়ছে আঁচল

জরির আঁচলে বিস্তীর্ণ সুখ

হলুদ পাখির খোঁজে ডাকবাক্স খুলি

...            ...             ...

জীবনের ছোট বড় ঢেউ, অগণিত পায়রা

গম্বুজে, খিলানে, গীর্জায়  শুধু কবুতর

মোনালিসার মুখ, গণ্ডোলা ভেসে চলে

সারারাত টুপটাপ শিশির

ভালবাসার নির্মেঘ আকাশ, জীবনের সরল সত্য

বারবার ফিরে আসে।” (   কবিতার পাণ্ডুলিপি)

 

এই তো আমাদের মেজদি !   দীঘল বাঁকের জলের হাওয়ায় উড়ছে আঁচল । জরির আঁচলে ‘বিস্তীর্ণ সুখ’ নাকি ‘নারী-সুখ’ নিজের সাথে নিজে থাকার এক অজানা সুখ । সুখের ছোটো ছোটো অনুভব, সারারাত টুপটাপ শিশির বিন্দুর মতো মনোরম, মায়াবি মৃদু এক সুখ । আর তখনই কবি অনুভব করছেন যেন জীবনের এক পরম সত্য – “জীবনের সরল সত্য বারবার ফিরে আসে।”

কবি জীবনের  সরল এক সত্যকেই দেখতে চেয়েছেন । দেখাতে চেয়েছেন । এই অনুভব অজিতা চোধুরীর অনুভব । একজন নারীর অনুভব যে – জীবনের সরল সত্য বারবার ফিরে আসে । এবং জীবনের বেশ কিছুটা পথ হেঁটে আসার পর আমিও সহমত এই এই সত্যে । জীবনকে আমরা যতটা জটিল ভাবি, জীবন কি সত্যিই ততটা জটিল ?

 

“একটা একটা করে পাথর গড়িয়ে পড়ে

কাছে এসে দেখে যাও

শুয়ে আছে রক্তাক্ত মানুষ

চত্বর ভেঙে গেছে; বাসস্থান নেই

 

দৃশ্য ঠিক হয়ে আছে

অশ্রুজলে আঁকা,

আমার ঘরের কাছে তোমার শ্মশান

বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে

আমাদের যৌথ জীবন।” ( চত্বর)

 

ওমা! একী চিত্র অঙ্কন করলেন কবি ! ‘একটা একটা করে পাথর গড়িয়ে পড়ে’  কিন্তু এরপর কবি কাকে বলছেন – ‘কাছে এসে দেখে যাও’ । ‘যাও’ শব্দের ভিতরে একটা ‘তুমি’ খুব নীরবে লুকিয়ে আছে। কে সে-ই তুমি ?  যখন কবিতার ভিতরে নীরবে বয়ে চলা ‘তুমি’-কে খুঁজে পেলাম, তখনই মনে হল তাহলে তো তুমি-র ভিতরে আরও নীরবে একটা ‘আমি’ লুকিয়ে রয়েছে ! সে আমি কী তবে কবি নিজে ? যার জন্য কবি পরে লিখছেন – “আমার ঘরের কাছে তোমার শ্মশান / বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে / আমাদের যৌথ জীবন।” এখানে ‘যৌথ জীবন’ শব্দটা এসেই উপরের যাবতীয় পাঠের পরিকল্পনা পাল্টে দিল ।  তুমি আর আমি কি অবলীলায় মিশে গেল এখানে । এবার পেছন ফিরে পড়লাম সেই লাইন – “শুয়ে আছে রক্তাক্ত মানুষ”  কে সেই মানুষ ? মানব না মানবী ? নিশ্চয়ই দুজন ! নাহলে ‘আমাদের যৌথ জীবন।’ শব্দবন্ধটা কবি আনতেন না । আবার লিখছেন – “দৃশ্য ঠিক হয়ে আছে / অশ্রুজলে আঁকা” । তাহলে বিতর্কিত সে-ই সীমানা কোনটা ? এই সীমানা কি জমির ? না ব্যক্তিত্বের ? এক একটা পাথর কোথায় গড়িয়ে পড়ছে ? কবির বুকে ? না, বিছানার বিতর্কিত সীমানায় ? নাকি নিছকই এক বিচ্ছেদের মন-ভার কবিতা এটা ?  কবির উদ্দিষ্ট যাত্রা যে-দিকেই হোক, আমি এখানে মর্মে-আহত একটি নারী হৃদয়ের চিত্রকথা দেখতে পাচ্ছি । দেখতে পাচ্ছি, একটা মরমিয়া কাহিনি । যা যেমন প্রেমের হতে পারে ! হতে পারে রক্তাত্ত এক  যৌথ জীবনের চিত্র । পাঠকের মেজাজের সাথে সে মিশে যাবে, তার ভাব নিয়ে । এই কবিতার একটা বহুমাত্রিক যাত্রার সুযোগ আছে । এখানে কবি কী বলতে চাইছেন, আমার কাছে সেটা বড় কথা নয় , আমার কাছে বড় কথা, আমি এই লাইনগুলিকে ব্যবহার করে, পাঠক হিসেবে আমি  কোথায় ভেসে যাচ্ছি । এই ভাসমান অবস্থা থেকে  আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারছি না । কবি লিখছেন-  “আমার ঘরের কাছে তোমার শ্মশান/ বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে/ আমাদের যৌথ জীবন।” আর আমি পড়ছি, আমার বুকের মাঝে তোমার স্মৃতির শ্মশান / ভালোবাসার বিতর্কিত সীমানার কাছে পড়ে আছে/ আমাদের যৌথ জীবন।” কবি কী তা বলতে চেয়েছেন ? জানি না ! কিন্তু আমি পাঠক হিসেবে এভাবেই অনুবাদ করেছি । কবি কি আমাকে বাধা দেবেন ? না, কবির সেই অধিকার নেই । কারণ আমি তাকে সে অধিকার দিইনি । এখানেই পাঠক- ভাবনা বদলে যায় । এখানেই পাঠকের মনস্তত্ত্বই শেষ কথা বলবে । কবিতার অর্থ- গ্রহণের স্বাধীনতা পাঠকের পক্ষেই থাকবে । পাঠকই পাঠের অর্থকে মূলত মূর্ত করে থাকেন ।

 

“যখন নিজের সঙ্গে একাত্ম হই নির্জনতাকে

বড় ভাল লাগে, অকারণ কলরব শুধু

ভারাক্রান্ত করে কোন নিবিড় উপলব্ধির,

দক্ষিণের জানালা যা অগোচরে গড়ে ওঠে,

মনে মনে তার মুখোমুখি হই,

চলমান দৃশ্যপট ভেসে যায় –

মানুষ হয়েও মানুষের কাছ থেকে

দূরে সরে যাই” (দক্ষিণের জানালা)

 

এই ব্যক্তি-মেজদিকে আমি যেন দেখেছি । এই কবি-মেজদিকে আমি যেন খুব কাছে থেকে দেখেছি । তাঁর কবিতা পাঠ শুনেছি । তাঁকে আনমনে দূর থেকে দেখেছি । কী অপূর্ব অনুভূতির প্রকাশ - “দক্ষিণের জানালা যা অগোচরে গড়ে ওঠে /মনে মনে তার মুখোমুখি হই”   কোন্ ‘ তার’ – এর মুখোমুখি হন কবি ? নিজেই নিজের মুখোমুখি হন কবি, একান্ত নির্জনতায় । একান্ত অবেলায়, নিজের কাছাকাছি  দক্ষিণের জানালায়, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, নিজের মুখোমুখি হওয়া কিন্তু সাহসী একটা কাজ । নিজের কাছে নিজের আত্মসমর্পণ বড় ভয়ানক এক উপলব্ধি ।  একথা জেনেও কবি নিজের মুখোমুখি দাঁড়ান ! একের পর এক দৃশ্য ভাসতে থাকে । কী-এক মর্মঘাতী বেদনায় কবি  নিজেই নিজের কাছে স্বগতোক্তি করেন – “মানুষ হয়েও মানুষের কাছ থেকে / দূরে সরে যাই”

এইসব কবিতার, অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা হয় না । কেবল তাকিয়ে থাকতে হয়, কবির দিকে । কবির মুখের দিকে । তাঁর অনুভবের দিকে ।  কবির সেই অনুভবের যাত্রা একসময় পাঠক হিসেবে আপনাকেও আক্রমণ করে ফেলবে । আপনিও তলিয়ে যেতে থাকবেন, আপনার এক নিজস্ব অনুভবের দিকে ।  একসময় লাইনগুলো আর আপনার থাকবে না, হয়ে উঠবে একান্ত আপনার । আপনি এসে পড়বেন আপনার মুখোমুখি , আপনারই অজান্তে । এবং হঠাৎ লক্ষ করবেন, আপনিও কোথায় যেন দূরে সরে যাচ্ছেন । মানুষ থেকে । আপনার থেকে । তখন হঠাৎ লক্ষ করবেন, আপনিও আপনার দক্ষিণের জানালা খুলেননি বহুদিন । নিজেকে স্পষ্ট দেখার যন্ত্রণাও কম পীড়াদায়ক নয় । কবি সেই পীড়া থেকেই যেন লিখেছেন  এই কবিতা ।

সেই ঘোর থেকেই কবি যেন লিখে চলেন –

 

“এক পা দু-পা করে যত উঠি

ক্রমশ সিঁড়ির ধাপ উঠে যায়

অবেলায় স্নান সেরে ভিজে চুলে

সংক্ষিপ্ত করে নিতে চাই সবকিছু

সন্ধ্যার আগে।

 

কি যেন রয়েছে সম্মুখে পশ্চাতে

সমাপ্তির আগে শেষ সিঁড়ি

দীর্ঘ হয়ে আরও আরও উঠে যায়।” (বিক্ষিপ্ত)

 

কবি এই কবিতার নামের মতোই কবিতার সর্বাঙ্গে একটা বিক্ষিপ্তপনা আছে । চিত্রকল্পটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এবং সংযমী ।  ‘অবেলায় স্নান সেরে’ খুবই সাংকেতিক একটা লাইন। একটা প্রতীকের চিহ্নায়ন । ‘সংক্ষিপ্ত করে নিতে চাই সবকিছু’ – কিন্তু কেন ? কী হয়েছে ? কবি স্পষ্ট কিচ্ছু বলছেন না । কেবল আঙুলের মতো ইঙ্গিতে কাঁপা কাঁপা হাতে যেন বললেন – “কি যেন রয়েছে সম্মুখে পশ্চাতে” । এইসব লাইন কিন্তু মারাত্মক। দেখতে তেমন  কিছু স্পষ্ট বলে না । অথচ ইশারায় বলে যায় বহু বহু কথা । কবি কবিতার সগুরু করলেন এই বলে - “এক পা দু-পা করে যত উঠি/ ক্রমশ সিঁড়ির ধাপ উঠে যায়”। আবার শেষ করছেন – “সমাপ্তির আগে শেষ সিঁড়ি / দীর্ঘ হয়ে আরও আরও উঠে যায়।”

ওমা ! দৃশ্য, দৃশ্যট সব যেন পাল্টে গেল । ‘অবেলা’ পুনরায় পড়তে গিয়ে কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল । এখানে ‘অবেলা’ শব্দের সাথে ‘স্নান’ শব্দটা কেমন গোটা কবিতাটাকে খচ্ করে  শেকলের মতো আঁকড়ে ধরে বুকটাকে । অথচ এই কবিতায় কবি সত্যি কিছুই বলেননি ।  ‘বিক্ষিপ্ত’ কবিতার নামের মতো কবি যেন ক্যানভাসে বিক্ষিপ্ত কিছু তুলির টান মেরেছেন । তারপরই সরিয়ে নিয়েছেন তার তুলি । আমরা পাঠকরা যেন অসহায় একটা  ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি । কিছু একটা বুঝেও বুঝে উঠতে পারছি না ।  এই কবিতায় এই  খেলার মুহূর্তটা ধরা সব সময় সম্ভব হয় না । সহজও নয় ।  

 

  

 কবি অজিতা চৌধুরীর কবিতায় বলিষ্ঠ উচ্চারণ আছে প্রচুর ।  বলিষ্ঠ চিত্রকল্পও আছে । তবে তা চলে নীরবে-নিভৃতে ।  আমি অনুভব করেছি, কবির ভিতরে কোথাও একটা না- বলা কথা আছে । না- বলা ব্যথা আছে । উচ্চারণ আছে । যা তিনি খুব চুপ করে কবিতায় বলতে চেয়েছেন –

 

“যে রাত অবগুণ্ঠিত তার কাছে আত্মসমর্পণের

গ্লানি মর্মান্তিক । তোমার সান্নিধ্যে

শব্দেরা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, রাত গভীর হয়

বাসনার কালো ঘোড়া দুর্দম বেগে

নিথর রাত্রিকে চুরমার করে

রাত্রির কৌমর্য নষ্ট হয়, বিরল সতীত্বে

স্বপ্নের সিঁড়ি দীর্ঘ হয় ।” ( আশ্চর্য স্বপ্ন)

 

কবিতার ভিতরে কিন্তু দাবানল আছে । খুব নিরীহ উচ্চারণ কিন্তু এটা নয় ।  “যে রাত অবগুণ্ঠিত তার কাছে আত্মসমর্পণের  গ্লানি মর্মান্তিক ” – এই লাইনটার ব্যাখ্যা করতে গেলেই তো আপনাকে  দীর্ঘ একটা দ্রোহের অনুভবের ভিতর গড়িয়ে গড়িয়ে  যেতে হবে । ‘গ্লানি’ শব্দটাই তো এখানে ভয়ানক । তার উপর কবি লিখছেন- ‘আত্মসমর্পণে গ্লানি’ । ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটা তো সম্মতিসূচক । তাহলে কবি এরপরই ‘গ্লানি’ শব্দটা জুড়ে দিলেন কেন ? বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়েছে । এত নরম কবির ভিতরে এই বিস্ফোরণ কীসের ? আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কবি দ্বিধান্বিত ? তাই কবি এরপর ক্রম অনুযায়ী লিখছেন – “ নিথর রাত্রিকে চুরমার করে / রাত্রির  কৌমর্য নষ্ট হয়” । এই লাইনগুলো পড়ে আমি ভাবছি, যেখানে যেখানে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ, সেখানেই ‘নিথর’ শব্দটা কেন যোগ করলেন কবি ? ‘নিথর’- মানে তো স্থির, যা নড়ে না । স্পন্দনহীন, নিস্তব্ধ। আর সেখানেই আমি একটা বিরোধাভাস পাচ্ছি । কবিতার চিত্রকল্পে একটা বৈপরীত্য, অসঙ্গতি লক্ষ করছি । কবি একবার লিখছেন - শব্দেরা বাঙ্ময় হয়ে উঠে, মনের ভিতরে বাসনা জাগে। অথচ নিথর দেহ । অচঞ্চল । গ্লানিময় । এবং কবিতা শেষ করছেন এই বলে – “স্বপ্নের সিঁড়ি দীর্ঘ হয়” আর ব্যঙ্গ করেই কী বললেন – এর আগে – “বিরল সতীত্বে” । শব্দটা কি ব্যঙ্গাত্মক ? আমার তো তাই মনে হয়েছে ? আপনার ...

আসলে এখানেই কবিতার খেলা । পাঠক হিসেবে ভালোলাগা । ভাবা প্র্যাকটিস্ করা । কবিতা যে কখন, কীভাবে বাঁক নেয়, তা সচেতনভাবে কবিও বলতে পারেন না । কবির এই যে, ছোটো ছোটো চিত্রকল্পে জীবনের গভীরতাকে কি শান্ত সব শব্দে শুয়ে ফেলেন । এখানেই তো কবিতার মজা । কবির ‘দাহ’ কবিতায় আমরা একটি চিত্রকল্প দেখতে পাই –

 

“বিকেলের পড়ন্ত আলোয় আমি শ্বাপদের গন্ধ পাই ।

...     ...        ...

ঘরগুলো পাথরের মতো শক্ত

আমার নরম পায়ে বিঁধল হাড়ের ছক্কা” ( দাহ)

নারীর জীবন তো প্রধানত ঘরকেন্দ্রিক । তাহলে কবি কোন্  প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে লিখছেন –“ঘরগুলো পাথরের মতো শক্ত” । তাহলে কি সেটা আর ঘর থাকে ? ‘হাড়ের ছক্কা’ – মারাত্মক একটি পাশা-খেলার চিত্রকল্পের দিকে আমাদের নিয়ে যায় । যেখানে নারীর ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই । সে নিছকই একটা বস্তুমাত্র । কবি খুব নরম সুরে, খুবই ভয়ানক একটি জায়গার দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন। বর্তমান  শ্বাপদ দিয়ে শুরু করলেন । এখানে ‘শ্বাপদ’ কবি কি মানুষের কথা বলছেন ? নাকি স্বামীর কথা বলছেন ? নাকি প্রেমিকের কথা ? প্রেমিক ‘শ্বাপদ’ হতে পারে না ।  তবে কি স্বামীর কথা বলছেন ? যে সামাজিক কারণে অধিকারপ্রাপ্ত !  কবি তাকে  মাংসাশী  বলছেন কেন ? তাহলে কেমন সে সম্পর্ক ?  অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে মনের ভিতর ।  কবির কবিতায় কেবল কিছু ইঙ্গিত পাই –

 

“কাঁচের দেয়ালে অজস্র মডেলের নগ্ন দেহ

লাল আলোর সংকেতে

দেয়ালে মাথা ঠুকে

রক্তাক্ত বিবসনা ক্রমশ ক্লান্ত হয়।” ( দাহ)

 

‘রক্তাক্ত বিবসনা ক্রমশ ক্লান্ত হয়। ” – কী চরম একটি চিত্রকল্প । রক্তাক্ত, নগ্ন, উলঙ্গ একটি নারী দেহ ক্রমশ ক্লান্ত হয় । কী ভয়ানক একটি চিত্রকল্প । অথচ কবি খুব সঙ্গোপনে চিত্রটি চিত্রায়িত করেছেন । অথচ কী বীভৎস চিত্রকল্প । এবং কত বলিষ্ঠ উচ্চারণ । কবিতার নাম দিয়েছেন- ‘ দাহ’ । কেন দহন হচ্ছে? কবি কী নিজেই ? প্রতীক তো বটেই ! কবি নিজেও তো হতে পারেন ? কবি কি যন্ত্রণার উর্দ্ধে ? তিনিও তো ঘরণী ।

আসলে, এভাবেই কবিতার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে চিত্রকল্পের রহস্য । কবির দক্ষতা । তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ ।

কবি-আলোচক সেলিম মুস্তাফা “ কবি অজিতা চৌধুরী ও কবির ভূখণ্ড” আলোচনার একটা অংশে উল্লেখ করছেন- “ এই কবিকে পাঠ করতে গিয়ে যে যে বিষয়গুলো নজরে এল, সেটা হচ্ছে এই যে, কবি  অজিতা চৌধুরীর কবিতায় রান্নাঘর থেকে গাজাপট্টি, দীঘলবাঁক থেকে কৌরবসভা, সমাজ, সময়, অর্থনীতির আর গোটা নিসর্গ, সবই এসেছে । খুবই ইনফর্মেটিভ এই কবি ।”  

আমি আমার মতো অজিতা চৌধুরীকে পড়ার, বোঝার চেষ্টা করেছি । আপনারও করুন, আপনাদের মতো।আমার কাছে তিনি একজন শক্তিশালী কবি । অনেকবেশি ব্যঞ্জনাময় । তাঁর জীবনকে দেখার মাঝে যেমন অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায়, তেমনই পাওয়া যায় নারীর বেদনার নিস্তব্ধ একটা দিক । অনুচ্চারিত এক বেদনা-বোধ । অপরিসীম এক ভালোবাসার ছোঁয়া । প্রকৃতির প্রতি এক মোহমায়া ।

 

“খুব উঁচু, বাড়ি থেকে একদিন রাস্তাকে দেখেছিলাম

মানুষ, বাড়ি, গাড়ি সবকিছুকে বড় যান্ত্রিক

তাৎপর্যহীন মনে হয়, নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে

সন্দিহান হয়ে পড়ি—পারিপার্শিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন

হয়ে থাকার ব্যর্থতা; বিচ্ছিন্ন মানসিকতায়

মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় ঝুলতে থাকি ।” (মার্চ, ১৯৮০)

 

এই কবিকে নিয়ে দীর্ঘ কাজ করার ইচ্ছে আছে । একজন কবিকে বিশদে জানতে গেলে, তাকে পরতে পরতে খুলে দেখতে হয় । জানতে হয় । মিশতে হয় । সে অভিজ্ঞতা আমার আছে । তাই তো এই কবিকে নিয়ে আরও কাজ করার ইচ্ছে রইল ।  

 

কাব্যগ্রন্থ ঃ   “কবিতা সমগ্র”

কবি – অজিতা চৌধুরী

প্রকাশনী – পূর্বমেঘ পাবলিকেশন

আগরতলা

মূল্য – ৩৫০ টাকা  

 

 

    

     

 

 

 

 

 

   

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...