গল্পকার তন্ময় মণ্ডলের গল্পে সময়ের সংকট এবং উপস্থাপনার মুন্সিয়ানা প্রকটভাবে লক্ষ করা যায় ।
তমালশেখর
দে
এই কথাগুলো ভাবছিলাম গল্পকার তন্ময় মণ্ডল –এর “শকুন ও গঙ্গাজল” ছোটগল্পের
সংকলন থেকে উক্ত গল্পটি পড়তে পড়তে । পশ্চিমবঙ্গের তরুণ গল্পকার । তাঁর গল্পের
প্রধান বৈশিষ্ট্য , তিনি হাঁটতে হাঁটতে জীবন থেকে টুক্ করে একটা মুহূর্ত তুলে নিয়ে
আসেন । চরিত্রের পর্যবেক্ষণও অসাধারণ । কোথাও
কোথাও পাঠককে দাঁড় করিয়ে রেখে দেয় যেন ।
“শকুন ও গঙ্গাজল” গল্পটার শুরু
এভাবে --
“‘বলো হরি হরি বলো’ – এই শব্দ ভেদ করে যেটুকু শুনতে পাচ্ছে সুমঙ্গল তাতে
উত্তর দেওয়া মুশকিল । নিমতলা থেকে ফিল্ড ম্যানেজার শান্তুনুর ফোন ।
“শান্তুনু একটু সাইডে যাও । কোনো কথাই শোনা যাচ্ছে না ।”
এবার শোনা গেল, “ স্যার এই পার্টির লাস্ট পেমেন্ট আটকে আছে । বডি শ্মশানে
নিয়ে এসেছি । মেয়ে ইউ.কে । আসতে পারবে না । অফিসে ফোন করতে বললাম । আপনি একটু
দেখুন । পেমেন্ট হয়ে গেলে আমাকে জানান । আপাতত বার্নিং হোল্ডে রাখছি।”
কী অসাধারণ শুরু । কোথাও কোনো কৃত্রিম ভণিতা নেই। পাঠক হিসেবে এটাই আমার প্রথম প্রাপ্তি । টানটান শুরু । টগবগে
তরতাজা শব্দ চয়ন । ছোটো ছোটো বাক্যের সটান গঠন-পদ্ধতি। এবং শুরুতেই পাঠককে
প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ না- দিয়েই নির্দয়ের মতো আক্রমণ করে বসেন । পাঠক তার মুঠোফোন
রাখতে বাধ্য হয়ে পড়ল । না-হলে ডিজিটালের
এই যুগে পাঠককে গল্পে শুধু
ন্যারেটিভের চকমক বক্তব্য দিয়ে আটকানো
কেবল মুস্কিল নয়, অসম্ভবও বটে । এই তরুণ গল্পকার সেদিকে যথেষ্ট সচেতন । তাই তো শুরুতে শুধু একটি বাক্য
ব্যয় করলেন-- “স্যার এই পার্টির লাস্ট
পেমেন্ট আটকে আছে । বডি শ্মশানে নিয়ে এসেছি । মেয়ে ইউ.কে ।” ‘বড়ি’ শব্দটা এখানে খুব সচেতন চয়ন করলেন গল্পকার
। পাঠককে শুরুতেই চমকে দিলেন, অনেকটা
ইচ্ছাকৃতভাবেই । তেমনই চরিত্রের
নাম ‘সুমঙ্গল’ নামটাও খুব সচেতনভাবে
নির্বাচন করলেন । প্রথম ছয় লাইনেই গল্পকার
যা বাজিমাত করার করে ফেললেন । এটা টেকনিক বটে, কিন্তু সার্থক করতে পারে ক-জন
গল্পকার! নাহলে আজকের এই ডিজিটাল যুগে, পাঠকের মনে কৌতুহল জাগিয়ে তোলাই তো এখন এক ভয়ানক ব্যাপার ।
বিচিত্র এই দেশে, এখন তো কেউ কিছুতেই বিস্মিত হয় না । অবাক হয় না । আবেগিয় হয়ে ওঠে
না । এই রকম পরিস্থিতিতে যেকোনো গল্পকারের
চ্যালেঞ্জ সহজাতভাবেই বেড়েই যায় ।
যাই হোক, আমরা ছিলাম “শকুন ও
গঙ্গাজল”- এর প্রথম আট লাইনের প্রথমভাগে । এরপর কী হবে, মনে মনে এই ভাবার ফাঁকেই দেখি
গল্পকার পুরো প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে পড়েন । এই বাঁক নেওয়াটাও একটা
টার্নিং পয়েন্ট । এবং খুব চালাকি করে পাঠককেও
বাম-হাতে আটকে রেখে, তিনি এগিয়ে গেলেন গল্পের ডান দিকে । এই পয়েন্টটা আমার
আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলল ! গল্পকারের টেকনিকটাও ভালো লাগল । তাই তো বলছি, গল্পকারের
গল্পের জাদু এখন আর শুধু গল্পে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, তাকে পাঠকের মনস্তত্ত্বের
সাথেও সমান তালে খেলা চালিয়ে যেতে হয় । তবেই-না লেখক- পাঠকের মধ্যের খেলাটা ফাইনাল খেলার মতো জমে ওঠে । আর এখানে তন্ময় সফল
। ততক্ষণে তন্ময় এগিয়ে চলেছে অনেকটাই নিরাবেগভাবে তার মতো করে, স্মার্ট, সটান বয়ানে
–
“অফিসে ঢুকেই ঢাকুরিয়া এরিয়ার লাস্ট মাসের কাস্টমার লিস্ট দেখছেন এস কে
স্যানাল । আওহাওয়া খুবই উত্তপ্ত ।”
“এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং । এমাসের মধ্যে যদি অন্তত ফিফটি পার্সেন্ট কাস্টমার ক্র্যাক না করতে পারো বিদায় হও । শকুনের মতো চোখ
ফেলে বসে থাকো । নাহলে এই প্রফেশনে টিকবে কী করে ? কোম্পানি কি মুখ দেখে মাইনে
দেবে ? আমাকেও তো কৈফিয়ত দিতে হয় নাকি ?” বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলার পর
ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের ওপর নেমে আসা বটের ঝুরির মতো গোঁফগুলো
সরাতে সরাতে রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন এস কে সান্যাল।”
--এই পর্যন্ত পড়ে থামলাম । এবং
বুঝলাম, পাঠক হিসেবে আমি আটকে গেছি । এবং
কোথায় যেন নিজের অজান্তে নিজেকেও জড়িয়ে নিতে শুরু করেছি গল্পের সাথে । এস কে স্যানালের সাথে আমিও আমার অফিসের বসের
একটা মিল খুঁজে পেতে শুরু করেছি । “এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং।” – এটা তো এখন প্রবাদ
বাক্যের মতো একটা আতঙ্কের বাক্যবন্ধ হয়ে উঠেছে । শত শত নিম্নবিত্ত- মধ্যবিত্তের
আতঙ্কের বাক্যবন্ধ এখন এটা । গল্পকার কীভাবে আমার ভিতরেও প্রবেশ করিয়ে দিলেন তার
গল্পের আতঙ্কটা! অথচ আমি প্রথমে তো নিছক
একজন নিরীহ পাঠকই ছিলাম । আর এখন গল্পকার কীভাবে, কী চতুরতার সাথে আমাকে তার গল্পের একটি
চরিত্রে পরিণত করে ফেললেন । আমি কি পাঠক হিসেবে, এটা চেয়েছিলাম ? নিশ্চয়ই না ।
মূলত একটু রিলিফের আশায় গল্পের নামটা দেখে, বইটা হাতে নিয়েছিলাম । অথচ কোথায়
রিলিফ, এখন যেন আমিই এর শিকার হয়ে গেলাম । মনের যুক্তি বলল, তাহলে বাদ দাও পড়া !
কিন্তু সেও তো পারছি না । গল্পকার আমাকে কী এক মোহে, নিষ্ঠুরের মতো আঁকড়ে ধরেছেন ।
আমি ইচ্ছে করেও আর গল্পটি না- পড়ে রাখতে
পারছি না । মন বলছে, ‘এটা তো তোমার কথাই
বলছে যে ! পড়বে না ?’ এই তো গল্পের খেলা । এটাও গল্পকারের এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা ।
বুঝলাম, এটাও এখন গল্প লেখার একটা অংশ ।
নীরব খেলা । ডিজিটাল মাধ্যম এখানেই এখনও
মানুষের কাছে হেরে আছে । তাই তো এখনও গল্প লেখা চলছে । সাহিত্য হচ্ছে । যন্ত্র
এখনও সব কিছু জয় করে নিতে পারেনি ।
“কোম্পানি কি মুখ দেখে মাইনে দেবে ?” – কর্পোরেট অফিসের খুবই সাধারণ উক্তি
এটি । কিন্তু গল্পকার কী নিখুঁত বর্ণনা দিচ্ছেন – “বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলার
পর ডানহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের ওপর নেমে আসা বটের ঝুরির মতো
গোঁফগুলো সরাতে সরাতে রিভলভিং চেয়ারটায় বসলেন এস কে সান্যাল।” এর বেশি কিছু কি আর
বলার থাকে ? ‘শকুন’- শব্দটাই তো যথেষ্ট ।
কিন্তু এই শব্দের কী কোন বিকল্প ছিল এখানে ? হয়ত না । বরং এই শব্দটা না- আনতে
পারলে, গোটা চিত্রকল্পটাই মাঠে মারা যেত । হয়ত গল্পটাও। এখানেই চাই গল্পকারের
মানসিক প্রস্ততি । গল্প লেখার আগের গল্প ভাবার প্র্যাকটিস্ । ভাবা প্র্যাকটিস্ ।
প্লট নির্বাচন থেকে চরিত্রের নামকরণ পর্যন্ত ভাবা-র প্র্যাকটিস্
। এখানেই পরীক্ষা- নিরীক্ষা । এখানেই গল্পের পালাবদল ।
সামান্য সংলাপ, কিন্তু অদ্ভুত চতুরতা । বুননের দক্ষতা । আর এখানেই দশকের সাথে
দশকের গল্প ভাবনার পার্থক্য । চরিত্রকে তুলে ধরার পার্থক্য। তরুণ গল্পকারদের নতুন
নতুন চ্যালেঞ্জ । এই পয়েন্টে তন্ময় দারুণভাবে সফল । সে গল্প বলতে এবং পাঠককে ধরে
রাখতে জানে । বাক্য দিয়ে সে চিত্রকল্প আঁকতে জানে, পাকা চিত্রশিল্পীর মতো । ছোটো
ছোটো রেখায় আবহকে ধরে ফেলে, সমগ্রের মতো ।
গল্পের পরবর্তী আরেকটু পাঠ করলাম
--
“বদমেজাজি হিসাবে তাঁর সুনাম সর্বত্র । স্যানাল স্যার ঢুকলেই
কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মতো খিলখিল করা অফিসটায় স্মাশানের নীরবতা নেমে আসে ।
ঢাকনা সরিয়ে গ্লাসের জল ঢকঢক করে গলায় ঢেলে পেন্ডিং পেমেন্টের লিস্টটা দেখে
নিলেন ।শম্ভু শাসমল, ঢাকুরিয়ার রিজিওনাল অবজারভার; তখনও পিছনে হাত দিয়ে মাথা নীচু
করে সান্যাল স্যারের কেবিনে দাঁড়িয়ে । যেতে না বললে তো যাওয়াও যাবে না । অসীম
নীরবতার মধ্যে শুধু শ্বাস- প্রশ্বাসের আওয়াজটুকুই শোনা যাচ্ছে ।
এস কে সান্যাল নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, “ডেটা সায়েন্সের ছোকরাদুটো যাদের আজ
জয়েনিং ছিল ওদুটোকে কনফারেন্স রুমে বসাও। সুমঙ্গলকেও পাঠাও । আমি আসছি।”
গল্পকার ক্রমেই তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে । এস কে সান্যালের চরিত্র
গল্পকার এক লাইনেই ধরিয়ে দিলেন, এই বলে – “স্যানাল স্যার ঢুকলেই কিন্ডারগার্টেন
স্কুলের মতো খিলখিল করা অফিসটায় স্মাশানের নীরবতা নেমে আসে ।” একটাও বাড়তি শব্দ
ব্যবহার করেননি গল্পকার । অথচ পাঠকের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে চিত্রকল্প । শুধু কী তাই, অফিসকর্মীদের টেনশন, ভয়ের ভিতর
দিয়ে বর্তমান চারকির বাজারটাকেও কী অসাধারণ কৌঁশলে ফুটিয়ে তুললেন, মাত্র এক লাইনের
ভিতর দিয়ে । ‘ওয়ার্ড ইকোনমি’- র যথার্থ প্রয়োগ গল্পকারের গল্পে দেখার মতো । তার
প্রতিটি শব্দই খুব সুচিন্তিত । কিন্তু কোথাও মনে হচ্ছে না, এর ফলে গল্প যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে । গল্প তার
সাবলীলতাকে ঠিক ধরে রেখেছে । আবার পাঠককেও টেনে ধরে রেখে দিয়েছে । গল্পের আগামী কি
হতে যাচ্ছে, তার কোনো আভাসই পাচ্ছি না । তাই গল্প থেকে আগ্রহ হারিয়েও ফেলতে পারছি না ! বইটা রাখতেও পারছি না । মন বলছে, এই তো কটা লাইন
। পড়েই দেখি না, এরপর কী হল ! তাই গল্পেই
আটকে রইলাম ।
মানুষ তো মনোজীবী । মনই তার প্রধান সম্বল । গল্পকার তন্ময় মণ্ডল পাঠকের সেই
মনকে খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেই গল্পের বুনন সাজিয়েছেন । এই গল্পের মূল
সম্পদ হচ্ছে তার কনসেপ্ট । আইডিয়া । সাথে তার উপস্থাপনার বিশেষ গুণ । নাহলে, আজকাল
একটা গল্প শুনিয়ে বা পড়িয়ে আরেকজনকে কৌতূহলী করে তোলা প্রায় অসাধ্য । তন্ময় সেটা
জানে । জেনেই সে তার জাল বিস্তার করেছে । গল্পের পুরো বিষয়টা আমি বিস্তারিত বলছি
না । গল্প থেকে একটা অংশ উল্লেখ করেই
থামবো, এতে গল্পটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে
পাঠকের কাছে –
“ আমরা প্রত্যেকেই গঙ্গাজলের এক-একটি বিন্দু । সবার মেহনতেই গঙ্গাজল
প্রাইভেট লিমিটেড নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করছে । মন দিয়ে কাজ করুন । আপনি যদি
কোম্পানির জন্য সময় ও শ্রম দেন কোম্পানি আপনাকে রিটার্ন দেবে । আর একটা কথা মনে
রাখবেন তথ্য অর্থাৎ ডেটাই আমাদের ব্যবসার মূলধন । তাই প্রপার ডেটা মেন্টেনেন্স,
কাস্টমার কলিং এগুলো যত ভালো হবে রেভিনিউ তত বাড়বে । যত দিন যাবে পরিবার ছোট হবে ।
ছেলেমেয়ে বিদেশে চলে যাবে । বাবা-মা এদেশে । তাছাড়াও বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা মৃত্যুর
পরের রিচুয়ালস সম্পর্কে কিছু জানে না । জানলেও খুব কম । পুরোহিত পাওয়া মুশকিল এখন
শহরে । সুতরাং চোখ কান খোলা রেখে কাজ করুন । মার্কেট বাড়ছে আর সোশ্যাল মিডিয়া,
ডেটা সায়েন্স ইমপ্লিমেন্টের পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায় কমিশন বেসিসে ফ্রিল্যান্সার
নিয়োগ করুন । যারা খবর দেবে । ডেটা দিলেই পয়সা । খাটনিও কম । ক্লাবের ছেলেদের
টার্গেট করুন । ওদের হাতে পয়সা থাকে কম । আবার সবার হাঁড়ির খবরও জানে । থ্রি
চিয়ার্স ফর ডেথ । মন দিয়ে কাজ করুন সবাই।”
গল্পকার এস কে সান্যালের এই বক্তব্যের ভিতর দিয়ে গোটা পৃথিবীর পুঁজিবাদের
মূল সার কথাই তুলে ধরলেন । গতানুগতিক
মানবিকতার অবস্থান কোথা থেকে কোথায় গেছে, এর প্রতিটি স্তরকে খুবই সাবলীলভাবে চিত্রায়িত করেছেন তার বয়ানে । আমাদের বর্তমান,
আগামী ভবিষ্যৎ তো সে দিকেই এগিয়ে চলেছে । বর্তমানেও বহমান ।
গল্পকার চরিত্রের নামকরণও করেছেন গল্পের প্লটের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে ।
চরিত্রের মুখে কথোপকথনের ডায়লগও সাজিয়েছেন সেই অনুযায়ী । গল্পকারের এই বৈশিষ্ট্যটা আমাকে আলাদাভাবে আকর্ষণ করেছে । এক কথায় তন্ময় মণ্ডলের “শকুন ও গঙ্গাজল” গল্প
সংকলনের বেশ কয়েকটি গল্প আমাকে আপ্লুত করেছে । আপনারাও পড়ে দেখতে পারেন ।


No comments:
Post a Comment