Wednesday, December 10, 2025

কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির এক নিবিড় অন্তর্বিক্ষেপ করেছেন সেলিম মুস্তাফা / তমালশেখর দে


 

 

 

              কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির এক নিবিড় অন্তর্বিক্ষেপ করেছেন সেলিম মুস্তাফা

                                           তমালশেখর দে


 ত্রিপুরার কবি-সাহিত্যিকদের  নিয়ে, তাদের কাজ নিয়ে আলোচনামূলক বইয়ের সংখ্যা প্রায় হাতে গোনা । সেই হাতে গোনার মধ্যে এই সময়ে  খুবই  গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছেন কবি-আলোচক সেলিম মুস্তাফা। ২০২৬ সালে বইমেলায়  ‘সৈকত প্রকাশন’  প্রকাশিত হচ্ছে  তাঁর “ কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ”। এর আগেও তিনি দশ কবি চার কথাকার নিবিড় পাঠের অনুভব নামে  আলোচনামূলক মূল্যবান একটি গ্রন্থ  আমাদের উপহার দিয়েছেন, একী প্রকাশনা থেকে । সেখানে তিনি  কবি দীপঙ্কর সাহা, কবি তপন দেবনাথ, কবি স্বপন সেনগুপ্ত, কবি প্রদীপ চৌধুরী, কবি পীযূষ রাউত,কবি শক্তি দত্ত রায়, কবি অজিতা চৌধুরী, কবি মানস পাল, কবি অর্পিতা আচার্য, কবি স্বাতী ইন্দু, গল্পকার-উপন্যাসিক দীপক দেব, গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে, উপন্যাসিক সুতপা দাস, গল্পকার দীপক দেবতাদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন  এবার তিনি ত্রিপুরার প্রখ্যাত উপন্যাসিক এবং ছোটোগল্পকার দুলাল ঘোষ-এর যাবতীয় সাহিত্যকর্ম মানে তাঁর দশটি গল্প, পাঁচটি অনুগল্প, দুইটি উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । এই প্রচেষ্টা আমাদের একটা দিশা দেখাচ্ছে বলেই   আমার ধারণা । আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আমরা আলোচনা না-করলে, কারা করবে ? সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সেলিম মুস্তাফার এই কাজগুলো ত্রিপুরার আলোচনা-সাহিত্যের এক সম্পদ । চিন্তনশীল পাঠকরা এর মাধ্যমে আরও গভীরভাবে কবি- সাহিত্যিকদের জানতে পারবে ।পাঠক-গ্রাহ্যতার তত্ত্ব সাতের দশকের শেষে সমালোচনার একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে প্রকাশ পেতে আরম্ভ করে । আলোচকরা মনে করেন যে, পাঠের ওপর এই প্রতিবন্ধকতা লাগানো যায় না যে, পাঠক ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ বা আগামী ভবিষ্যতে কীভাবে পাঠ করবেন । পাঠের প্রকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলি স্থায়ীভাবে নিশ্চিত প্রতিক্রিয়া অথবা নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, কিন্তু অর্থ-গ্রহণের স্বাধীনতা সাধারণত পাঠকের আছে । প্রত্যেকটি ব্যক্তিই তার নির্দিষ্ট স্বভাব,অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ, পূর্ব-ধারণা ও মূল্যবোধের অধিকারী । আর এখান থেকেই শুরু হয় পাঠ- গ্রহণের জটিলতা । আর ঠিক এই জায়গাতেই সেলিম মুস্তাফার এই কাজের সফলতা । একজন আলোচক তাঁর সমৃদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে পাঠকে অন্য একটা স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ।

  সম্প্রতি প্রকাশিত “কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ” এই গ্রন্থে দুলাল ঘোষ এবং তাঁর যাবতীয় লেখালেখিকে আমরা নতুন এক দর্শনে, উপলব্ধিতে , অনুভবে মনের ভিতরে আবিষ্কার করি । সেলিম মুস্তাফার আলোচনার ছোট্ট একটা অংশ এখানে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি – “ এখন পর্যন্ত   যতগুলি গল্প আমরা পেলাম সবই, আমার মনে হয়েছে  আঙ্গিকপ্রধান বয়ান । যদিও ছেঁড়া সুতোর মতো একটা গল্প অবশ্যই আছে ভেতরে বহমান । রচনায় দুটো প্রধান বিষয় আমরা খুঁজি – বিষয় আর আঙ্গিক । কী বললেন লেখক আর কীভাবে বললেন । এই দুটোই জরুরি । বিষয়হীন বলে কিছু হয় না । কারণ আঙ্গিক পরাশ্রয়ী । তার প্রকাশ ও বিকাশের জন্য বিষয় চাই আশ্রয়দাতা হিসেবে । তেমনি আঙ্গিকের অজস্র ডালপালা । দেখা, বীক্ষণবিন্দু, কী দেখা, কতটুকু দেখা, ভাষা, চিহ্নায়ক চয়ন, উপস্থাপনার মাত্রা ইত্যাদি ইত্যাদি অগণন ব্যাপার রয়েছে । ... কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায় । সেটা হচ্ছে নিরীক্ষার সার্থকতা । সঞ্চরণ । কম্যুনিকেশন । এক্সপেরিমেন্ট সম্পূর্ণ সফল না হলে অষুধ সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যায় । বিপরীত প্রতিক্রিয়াও হতে পারে । দুলাল ঘোষের গল্প পড়তে পড়তে  এইসব প্রশ্ন পাঠকের মনে জাগতেই পারে – দুরধিগম্যতার, দুরবগাহতার ।”

গল্পকার  দুলাল ঘোষের  সেই তথাকথিত দুরধিগম্যতার, দুরবগাহতার, ভিতরে প্রবেশ করে সেলিম মুস্তাফা প্রতিটি রচনাকে উন্মুক্ত করেছেন । কখনও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে, কখনও ভালবাসায় গল্পকারকে কাছে টেনে নিয়েছেন প্রকৃত আলোচকের মতো ।  এই গ্রন্থের সবচেয়ে বড় কথা, আলোচক কোথাও আলোচনার ক্ষেত্রে আপস করেননি । এবং আলোচনা প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক কথাও আলোচনায় এনেছেন, যা গ্রন্থটিকে আলাদা মর্যাদায় উন্নীত করেছে । দুলাল ঘোষের ছোটোগল্প, অনুগল্প, আর উপন্যাস দুটির আলোচনা পাঠ করে এটা মনে হয়েছে, সেলিম মুস্তাফা তাঁর নিজের মতামতকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে । এতে আমরা নিরপেক্ষ একটা দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছি, যা ত্রিপুরার সাহিত্য আলোচনায় অনেকটাই দুর্লভ । এবং  দুলাল ঘোষ সম্পর্কেও তাঁর মূল্যায়ন প্রায় একই । তিনি লিখছেন – “ একথা  পরিষ্কার যে, তিনি শুরুতেই স্থির করে নিয়েছেন, যা আসলে বলার, তা-ই বলবেন, একেবারে কাছ থেকে বলবেন, নিজের পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা থেকে বলবেন, একজন ‘ পার্টিসিপেন্ট অবজার্ভার’ হয়ে বলবেন, যেরকম একজন নাট্যকার স্বয়ং নাটকের কুশীলব হয়ে পরিবেশন করেন তাঁর নির্ভেজাল অপ্রতিরোধ্য বক্তব্য ।”

ত্রিপুরার গল্প-উপন্যাস সাহিত্যে দুলাল ঘোষ এক অনিবার্য নাম । ‘অনিবার্য’- শব্দটার পেছনে রয়েছে তাঁর বহু প্রাপ্তি । বহু সংগ্রাম । বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা । সেই সবই সেলিম মুস্তাফা “কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ” – বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । এটা নিছক আলোচনামূলক গ্রন্থ নয়, আলোচনার ক্ষেত্রে কীভাবে একজন লেখককে আবিষ্কার করতে হয়, তারও একটা পাঠ পাওয়া যায়  । আশা করি, আপনাদের ভালো লাগবে ।    

 

গ্রন্থ -- কথাকার দুলাল ঘোষ সৃষ্টির অন্তর্বিক্ষেপ

লেখক সেলিম মুস্তাফা

প্রকাশক সৈকত প্রকাশক / আগরতলা

মূল্য ২৮০ টাকা

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...