Friday, December 5, 2025

ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষ্যে আগরতলায় জমজমাট চলচ্চিত্র উৎসব / তমালশেখর দে


 

ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষ্যে আগরতলায় জমজমাট চলচ্চিত্র উৎসব

 

 ঋত্বিক ঘটকের কর্মকাণ্ড লোকোত্তর ত্রিকালদর্শিতার মহাকাব্যিক পরিধিটিতেই যে ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকবে, তাঁর জন্মশতবর্ষে এসে সে ব্যাপারে আর অনিশ্চয়তার কোন অবকাশ নেই । ব্যাপারটা ঘতেই চলেছে দর্শক ও স্রষ্টার পারস্পারিক উপহার-আলিঙ্গনে । ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা শ্রেষ্ঠ দলিল, আমাদের বিভাজনের । তাঁর ছবিতে উত্তর বিভাজন মানুষের মনোবিপর্জয় স্পষ্ট লক্ষ করা যায় । এক জায়গায় বিস্মৃতি, অন্য দিকে শূন্যতা । মধ্যে একটা  অন্তর্বর্তী বেদনার প্রতিবেদন । এখানে ব্যক্তি আমার কিছুই করার নেই । ঋত্বিক ঘটকের  সিনেমাও তাই আমাদের মনোবেদনাকে তিনি গ্রন্থিত করেছেন পরম যত্নেসময়ের যা অতীত, সময়াতীত,এবং যা সময়ানুবর্তী তাকে যুক্ত করা এটা ঋত্বিক ঘটকের  একটা বড় কাজ ।  তাই তার কোন ছবিতেই নায়কের ঠিকানা স্থায়ী থাকে না । গৃহস্থ নয় । গৃহচ্যুতি, বাসস্থানচ্যুতি, তার সিনেমায় সব সময়ই একটা একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে । ইতিহাস চেতনা তার সিনেমায় স্পষ্টতই প্রবল । চিরকালীন বাস্তবতার সাথে তিনি আমাদের বারবার জুড়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন ।  ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় দেশভাগ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল মানব-অস্তিত্বের এক গভীর সংকট, যা তাঁর চলচ্চিত্রগুলিতে অবিচ্ছিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি দেশভাগের যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, এবং উদ্বাস্তু জীবনের মর্মন্তুদ আখ্যানকে বারবার তুলে ধরেছেন, যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' 'কোমল গান্ধার' এবং 'সুবর্ণরেখা' চলচ্চিত্রে। তাঁর শিল্প ছিল সমাজবদলের হাতিয়ার, এবং দেশভাগ নিয়ে তাঁর কাজগুলি ছিল এক প্রকারের নস্টালজিয়া ও এক গভীর মানবিক যন্ত্রণার প্রকাশ। দেশভাগকে তিনি মানুষের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি আখ্যান হিসেবে দেখেছেন। তাঁর 'মেঘে ঢাকা তারা' ছবিতে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট বিচ্ছিন্ন এবং বিচ্যুত মানুষের গল্প বলা হয়েছে।র‍্যাডক্লিফের আঁকা একটি কাল্পনিক রেখা কীভাবে একটি পরিবারের হেঁশেল এবং উঠানকে বিভক্ত করে দিতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন।ঋত্বিক ঘটক শুধুমাত্র বাস্তবতাকে তুলে ধরেননি, বরং বাস্তবতাকে তিনি তাঁর নিজস্ব শৈল্পিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যা ছিল বিনোদনের প্রভাবের বাইরে। তাঁর কাজগুলিতে দেশভাগের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া ও গভীর মানবিক যন্ত্রণা লক্ষ্য করা যায়, যা তিনি বারবার তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছন ।  'কোমল গান্ধার' ছবিতে তিনি দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক মিলনের কথা তুলে ধরেছেন, যদিও এটি দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে একটি গভীর যন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছিল। ‘সুবর্ণরেখা’ এই ছবিতেও ঋত্বিক ঘটক  দেশভাগের পরবর্তী সময়ের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে তুলে ধরেছেন। তাঁর নিজের জীবন এবং তাঁর শিল্প একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, এবং তাঁর দেশভাগ সংক্রান্ত কাজগুলি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণার প্রতিফলন  

সম্প্রতি ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর ‘সুকান্ত একাডেমি’-তে ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষউদযাপন উপলক্ষে  ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় । প্রথম সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হয় ‘অযান্ত্রিক’ । মূল প্রদর্শনী শুরুর আগে    ‘পরিসর’ ও ‘ ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগ’- এর উদ্যোগে ঋত্বিক ঘটকের জীবনের উপর নির্মিত স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত করা হয় ।  এরপর তাঁর জীবন ও চলচ্চিত্র আলোচনা করেন অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ওড়িশা উচ্চ আদালতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শুভাশিস তলাপাত্র। সম্মানিত অতিথি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন – অধ্যাপক এবং চলচ্চিত্র বিশ্লেষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, ও রাজ্যের চলচ্চিত্র পরিচালক-নির্মাতা দীপক ভট্টাচার্য । অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন  ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষ  উদযাপন কমিটির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম শাহ । অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগের অধ্যাপক  সুনীল কলই।  স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুমন্ত চক্রবর্তী ।

দেশভাগের তিক্ত যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে ত্রিপুরাও অতিক্রম করেছে । এখনও সেই সম্পর্কিত ঘটনাবহুল স্মৃতি আমাদের ক্লান্ত করে । আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই ছবিগুলো পৌঁছে দেওয়া, এরসাথে তাদের ইনভলভমেন্ট করিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব । সেই দায়িত্বই কাঁধে নিয়েছেন যেন  ‘পরিসর’ ও ‘ ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিভাগ’ ।  এই যাত্রা ক্রমে ক্রমে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাক । প্রজন্ম ফিরে দেখুক তার অতীত । চলচ্চিত্রের ভিতর দিয়ে আমরাও বিচিত্র জীবনের মুখোমুখি হই । অজস্র ধন্যবাদ ঋত্বিক ঘটক জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটিকে ।

 

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...