Tuesday, July 15, 2025

‘জঠর’ ও ‘পাখি সব করে রব’ – দুই অঙ্গে এক আত্মার বলিষ্ঠ তৎপরতা --- তমালশেখর দে

 


 

 


 

 

‘জঠর’ ও ‘পাখি সব করে রব’ – দুই অঙ্গে এক আত্মার বলিষ্ঠ তৎপরতা

                        তমালশেখর দে

 

 ত্রিপুরা সাহিত্যের ইতিহাসে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা এবং অবদান অনস্বীকার্য । মূলত  লিটল ম্যাগাজিনের কাঁধে ভর করেই গড়ে উঠেছে ত্রিপুরার সাহিত্য সম্পদ । সেই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে “কথা ও কবিতায়”। “কথা ও কবিতায়” সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরের ষাণ্মাসিক সাহিত্যপত্রের নাম –“জঠর” আর মাসিক সাহিত্যপত্রের নাম “পাখি সব করে রব” ।  সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে – ‘জঠর-৬’ – ৩বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুলাই ২০২৫ । এবং “পাখি সব করে রব”- এর ১২ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, জুলাই- ২০২৫ । এই মুহূর্তে ত্রিপুরার অন্যতম দুটি তাৎপর্যময়  লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছে, এই দুই ম্যাগাজিনের কর্মকাণ্ড‘জঠর-৬’ এর এবারের সম্পাদনায় ছিলেন চিরশ্রী দেবনাথ । তিনি তার সম্পাদকীয় ‘আমাদের কথা’ লিখেন – “দিনের পর দিন যুদ্ধ তৈরি করে নিরীহ মানুষকে মৃত্যু- উপত্যকায় চিরতরে শুইয়ে দিয়ে, উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল দীর্ঘ করার নামই মানুষের ইতিহাস । হত্যা আসলে কোনো নিষ্ঠুর সংবাদ নয়, ব্যবসা মাত্র । আর সাহিত্য সেখানে আবহমানকালের সচেতন দর্শক । সাহিত্য যুদ্ধ থামাতে জানে না, শুধু একটি ঘৃণা তৈরি করতে হয়তো সক্ষম হয় । এই ঘৃণা, স্ববিরোধ ও আত্মচক্ষুর জন্যই পৃথিবী এখনও সুন্দর । অস্থির সময় সাহিত্যের সময় । নিষ্ঠুর সময়েই লিখিত হয়েছে পৃথিবীর সেরা সাহিত্য । আমরা হয়তো সেই সময়কালের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি ।” তীব্র এই কথাগুলো পাঠক হিসেবে আমাকে প্রথমেই গভীর এক কৌতুহলের দিকে ঢেলে দেয় ।

“যাদের ক্ষিধে আছে, খাবার নেই / বুদ্ধি আছে চিন্তা করার ক্ষমতা নেই / অস্ত্র নেই এবং মাংস চিবোতে পারে না / তারা এমনিতেও মরে গেছে ।” – কবি অর্পিতা আচার্যের কবিতাটি পড়তে পড়তে কেন জানি, আমারও মনে হল, কোথাও  কোনো এক গভীর খাদের দিকেই কবি ইশারা করেছেন । ইঙ্গিতই তো কবির প্রধান অস্ত্র ।  

 

‘জঠর-৬’ এর কবিতা বিভাগে মোট  ৩৮ জন কবি কবিতা লিখেছেন । জীবনের কত কথা উঠে এসেছে তাদের কবিতায় । সবার সব কবিতা বোঝতে পেরেছি, সেটা বলার মতো মানসিক সক্ষমতা আমার নেই । তবু ব্যক্তিগত কিছু ভালো লাগা লাইন উল্লেখ না- করে পারছি না। যেমন – “ নিজের গভীরে / সযতনে লুকিয়ে রাখি অত্যাচার/ শুষে নিই সব অপমান” – কবি মণিকা বড়ুয়া । “ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেও / নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু ঔষুধের নাম বেড়ে যাওয়ায় / মাঝে মাঝে ভয় তবু ঈষৎ বাদামী চোখ কেমন অস্থির করে তোলে” – কবি শম্ভু শংকরের এই সব লাইন সত্যিই ভাবায় ! ভাবায় কবি রাহুল শীলের এমন কবিতার লাইন – “ বিচ্ছেদসূত্রে যারা কেঁদে ওঠে দাঁতে দাঁত চেপে / তারও বুঝি হেসেছিল প্রণয়িনীর কামুক সন্ত্রাসে !” গভীর ভাবনার সূত্রপাত হতে পারে এমন সব লাইনকে কেন্দ্র করে ।  তেমনই আশ্চর্য হয়ে ভেবেছি, অনিন্দিতা চক্রবর্তী-র ‘কিছু ব্যথা, রিরংসার মতো’ কবিতার – “রিরংসা পাতকুয়োর জলে ওঠানামা করে / অঘ্রাণের বাতাসে জাগে, চৈত্রের মিলিয়ে যায় / অনন্ত হেমন্তসন্ধ্যায় আমি আর দড়ি পালিয়ে যাই” । তরুণ কবিদের এমন ইঙ্গিতময় ভাবনা ভালো লাগে ।  বরিষ্ঠ কবি হৃষিকেশ নাথের ‘প্রিয় চিঠি’ হঠাৎ করে কেমন যেন অতীত-মুখো করে দিল – “ নোংরা ময়লা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে দেখি / অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আবর্জনার স্তুপে / পোকা মাকড় ইঁদুরের নির্ভয় গৃহস্থালি / অতিপ্রিয় চিঠিগুলি । মূল্যহীন - / আমরা এখন বিবাহিত।” এরই নাম জীবন । অনুভূতির বিচিত্র কাব্যময় এক যাত্রা । এখানেই তো কবি ও কবিতার জয় । পাঠক হিসেবে বর্তমানের সামাজিক- রাজনৈতিক অস্থির ডামাডোল ভুলে আমিও কোথায় যেন পুরনো চিঠি, পুরনো প্রেমের দেশে ফিরে গেলাম ।  জীবনের বহমান অভিজ্ঞতার খাঁজে খাঁজে কবিতারা কোথায় কীভাবে যে লুকিয়ে থাকে ?  এরপরই পড়লাম কবি রুপালী দাসের কবিতা – “ শেষ বিকেলের পিলু রাগের হালকা সুখে / সরল এবং মন্থর হয় ঘামে-ভেজা অনুশোচনা ।” ‘অনুশোচনা’ শব্দটা পড়েই কেমন যেন ঝিম মেরে গেলাম!  শব্দের সামান্য এদিক-ওদিক প্রয়োগে কীভাবে গোটা কবিতা টার্ন করে নিচ্ছে ! ‘কবি ও পাঠক’ নিবন্ধে কানন দাসগুপ্ত সোম ঠিক বলেছেন – “ কবিতা একজন কবির আনন্দ- বেদনা, প্রেম-অপ্রেমের ফসল, যেখানে অপরিসীম বেবনার বিষে কবি নীলকণ্ঠী”।  কবি দেবাশ্রিতা চৌধুরী যখন তার কবিতার একটা অংশে লিখেন – “প্রতিটা আত্মহত্যা আসলে হত্যা” তখন আবার কেমন যেন হতভম্ব হয়ে যাই । প্রায় একই ভাবনা, নিঃস্বতার আভাস পাই তমা বর্মণের কবিতার লাইনে – “মাঝে মাঝে নির্বাসিত মনে হয় / যেমন হাওয়ার মতো অস্তিত্ব নেই / বুকের বসত-ভিটা দহন...সম্পর্ক...দাহ... মায়া.../ দিবানিশি সংঘর্ষ খণ্ডজীবন”। কবি চিরশ্রী দেবনাথের এই কয়েকটি লাইন মনকে ছুঁয়ে গেছে – “যাবার সময় এই অন্ধ পৃথিবীর / বুকের ওপর প্রগাঢ় ধানের ছায়ার মতো / ছড়িয়ে পড়ব / মাটির অনায়াস স্নিগ্ধতা তখন আমার বাহুদামে/ যদিও জানো / পৃথিবী হত্যা / পৃথিবী জখমের / পৃথিবী আর শিশুদের নয়” ।

‘জঠর- ৬’  আমরা এগারো-টি গল্প উপহার পেয়েছি । প্রায় সব গল্পেই জীবনের বিভিন্ন দিক ফোটে উঠেছে । তারপরও কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি কাজ করেছে । কোথাও  যেন এই সময়ের বহমান বিশৃঙ্খলাকে গল্পের চরিত্রে মিস্ করেছি। গুরুত্বপূর্ণ ‘নিবন্ধ’ ছিল আটটি । যা সংখ্যাটিকে খুবই সমৃদ্ধ করেছে ।

তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘পাঠ-প্রতিক্রিয়া’ বিভাগের প্রায় সব লেখাই। এই বিভাগটি যত সমৃদ্ধ হবে ততই সাহিত্যের জন্য মঙ্গল । তরুণ প্রজন্মের এইসব টগবগে আলোচক, দারুণ লিখেছে । “পাখি সব করে রব”- এর ১২ বর্ষ, ৯ম সংখ্যাটিও অনবদ্ধ হয়েছে । কবি- শিল্পী লিটন আচার্যের প্রচ্ছদ এককথায় অসাধারণ । একটা ফ্লো ! একটা উচ্ছ্বাস ।প্রাণবন্ত ঢেউয়ের এখন বড় দরকার । এমন   উচ্ছ্বাস ক্ষণিকের জন্য হলেও মনকে মুক্তি দিয়ে যায় । ‘পাখি সব করে রব’ এবং ‘জঠর’ – এর জন্য রইল শুভ কামনা । এই রকম লিটল ম্যাগাজিন আছে বলেই পাঠক হিসেবে আমরা আশাবাদী । ত্রিপুরার সাহিত্য জগত আরও নব চেতনায় জেগে উঠছে । উঠবেও আগামীতে ।

 

জঠর

সম্পাদক চিরশ্রী  দেবনাথ

ধর্মনগর /মূল্য ১৫০ টাকা

 

 পাখি সব করে রব

সম্পাদক পীযূষকান্তি দাশ বিশ্বাস

  ধর্মনগর / মূল্য ২০ টাকা

 

 

  

ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ‘জলজ’ একটি উজ্জ্বল নাম --- তমালশেখর দে

 


ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ‘জলজ’ একটি  উজ্জ্বল  নাম

                        তমালশেখর দে


ত্রিপুরার সাহিত্যের ইতিহাসে একের পর এক প্রচুর বলিষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়েছে । আবার  সময়ের সাথে সাথে তারা তাদের অবদান রেখে একসময় হারিয়েও গেছে সময়ের দাবি মেনে । তবে বর্তমানে ত্রিপুরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি লিটল ম্যাগাজিনের নাম বলতে বললে, প্রথমেই যে নামটা উঠে আসে, তার নাম – “জলজ”। ‘জলজ’ মানেই এক চমক । নতুনের এক উন্মাদনা ।  এর প্রতিটি সংখ্যাতেই থাকে নতুনত্বের ছোঁয়া!  সেই ‘জলজ’  সম্প্রতি তার ১০০ তম সংখ্যা, ২৫বর্ষ,প্রকাশ করেছে ।   ‘জলজ’ লিটল ম্যাগাজিনের শততম সংখ্যায় “অসম্পাদকীয়”-তে বিস্তারিত লেখা রয়েছে ‘জলজ’  লিটল ম্যাগাজিনটির  অতীত- বর্তমান এবং তার যাত্রাপথ নিয়ে । সম্পাদক লিখেছেন -- “ ‘জলজ’ শততম সংখ্যা এটি । না, শত কোনো গন্তব্য নয় । যাত্রা পথের একটি মাইলস্টোন মাত্র । লিটলম্যাগাজিন কতদূর যাবে, তার আয়ুষ্কাল কত হবে, কোন সম্পাদক-প্রকাশকের পক্ষেই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, কারণ  লিটল ম্যাগাজিনের ভাগ্যলিপি কল্পনায়ও আসে না । স্বল্পায়ু নিয়েই জন্মায়, তারপর যা পায় পুরোটাই বোনাস । আসলে সম্পাদক,প্রকাশকের একাগ্রতা, দায়বদ্ধতা ও নিষ্ঠার উপরই তার দীর্ঘায়ু, হ্রস্বায়ু নির্ভর করে । আমরা দীর্ঘজীবনের  জন্যেই চর্চা ও চর্যায় ছিলাম ও আছি । একশ’ বা দু’শ নয়, লক্ষ্য অসংখ্যের । জলজ অভিজ্ঞ হবে প্রাজ্ঞ হবে, সময়ের সাথে পা মিলিয়ে ধরিত্রির  পাশে থাকবে, এ লক্ষ্যেই লালন- পালন।” জলজের এই শততমের যাত্রা এত বর্ণময় যে, একে একে তার উল্লেখযোগ্য সব বিষয়ের উপর ছুঁয়ে যেতে গেলেও পাতার পর পাতা দরকার । একটি লিটল ম্যাগাজিন কেবলই লেখা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয় না, লেখক- কবি- সময়কেও প্রকাশ করে । পঁচিশ বছর সময়কালে অনেক অন্যান্য তৎপরতার মধ্যে প্রকাশন একটি । ‘জলজ’-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রকাশন, আড্ডার নামেই যার নামকরণ হয়েছে –‘ সাতদিন’ । এখন পর্যন্ত প্রায় সত্তর- আশিটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । ত্রিপুরার ছোট্ট শহর ধর্মনগরে সাহিত্যকেন্দ্রিক বড় আয়তনে যেসব উৎসব-সম্মেলন হয়েছে তার মধ্যে ‘জলজ সাহিত্য সম্মেলন’-একটি । ‘জলজসম্মান সাহিত্যেৎসব’ এখন পর্যন্ত দেওয়া হয় – কবি কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, কবি নন্দকুমার দেববর্মা, কবি পীযূষ রাউত, কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, কবি মিলনকান্তি দত্ত এবং কবি অমিতাভ দেবচৌধুরী-কে ।  ২০১০ সালে জলজ-এর সাহসী পদক্ষেপ – ‘ লিটলম্যাগাজিন সম্পাদক সম্মেলন’ । এরপর নির্জন চা-বাগানে আয়োজন করা হয় ‘রৌদ্র গানে কবিতা’- এর  উৎসব । এভাবেই একে একে আসে – ‘ চিত্রকলা ও কবিতা উৎসব’ ‘সান্ধ্য পংক্তিমালা’ । এককথায় ‘জলজ’ এভাবে একের পর এক উত্তেজনা জিইয়ে রেখে আসছে এত বছর থেকে ।

‘জলজ’ ১০০তম সংখ্যা সেজে উঠেছে – গদ্য,কবিতা, অণুগল্প, অনুবাদ, আলোচনাসহ এক জমজমাট ১০০ পৃষ্ঠায় । ‘পূজাবিজ্ঞানের আলোকে রবীন্দ্রনাথঃ পূজা পর্যায়’ – নামে গদ্য লিখেছেন মিলনকান্তি দত্ত ।  মিলনকান্তি দত্ত  মানেই নতুনত্বের এক  অজানা চমক । এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তিনি লিখছেন – “পূজা কাকে বলে ? দেবদেবীর পূজা জড়ের পূজা নয় । চৈতন্যের পূজা নয়। ভাবতত্ত্বের পূজা । ভাবতত্ত্বের পূজা । এক-একটি বিশিষ্ট ভাব, শক্তি ও অন্তঃপ্রজ্ঞার পূজা । পূজাই যোগ । যোগই পূজা । পূজাযোগ । ... দেবতা মানেই আলো । ‘দিব্’ ধাতু । আলো-কে ভালোবাসলে জীবন দিব্য হয়ে ওঠে । ‘দিব্য’ মানে আলোকিত। প্রিয়কে যা দিতে পারি, তা দেবতাকে দিয়ে,দেবতাকে প্রিয় করে তোলার নামই পূজা। প্রাগার্য-আর্যের সম্মিলনের হিতফল আধুনিক হিন্দুজাতি ।” এভাবেই একটু একটু মিলনকান্তি দত্ত   বিষয়ের গভীরে ঢুকতে থাকেন । তারপরই আমরা পাই তার মোক্ষম ভাবনার প্রকাশ – “ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম কবির ধর্ম । তাঁর সাধনা মূলত আর্টিস্টের সাধনা । কবি পূজাতত্ত্বকে দেখেছেন আর্টের দিক থেকে । পূজার ভাব ও পূজনসামগ্রী থেকে শিল্পগত উপাদান সংগ্রহ করেছেন ।”  মিলনকান্তি   দত্ত লিখছেন – “ তোমায় বসাই এ-হেন ঠাঁই / ভুবনে মোর আর কোথা নাই,/ মিলন হবার আসন হারাই আপন-মাঝে-- /সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই।” – ঘটস্থাপন করতে হবে আনন্দময়ের কৃপাধারার তলে । ঘটস্থাপন । ঘট মানে দেহঘট । কলস । “কলাং কলাং গৃহীত্বা বৈ দেবানাং বিশ্বকর্মনা।” দেবতাদের কলা-কলা শক্তি দিয়ে বিশ্বকর্মা নির্মিত ঘটই ‘কলস’। জলপূর্ণ ঘটে “ইমং ঘটং সমারুহ্য তিষ্ঠ দেবগণৈঃ সহ” সকল  দেবদেবীর প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই পূজকের কামনা । কামনা পূর্ণ হয় । কবি গেয়েছেন – “ তোমারই ঝরনাতলার নির্জনে ।/ মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন্ ক্ষণে।”  ধ্যাননির্জনতা চাই । কখন আমার দেহঘট তাঁর কৃপাশীর্বাদের ধারায় উপচে পড়েছে ।” এভাবেই একের পর এক পূজা- পর্যায়ের গান ধরে মিলনকান্তি দত্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমাদের সামনে নতুন এক রূপে যে পরিচয় করিয়ে দিলেন ।

এরপর যে গদ্যটায় আমার চোখ আটকে যায় অশোক দেব-এর “হস্তিপরিচয়” ।  “হস্তিপরিচয়” গদ্যটিতে অশোক দেব বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সঠিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন ।  তারপরও গদ্যটি পড়তে পড়তে একটা জায়গায় এসে প্রায় চমকে যাই, যখন তিনি লিখছেন – “বাংলা কাব্যসাহিত্য   মূলত বিকলাঙ্গ, রূপবিচ্যুত । একথা বলা বড়ো বিপদজনক হল । তথাপি বলতে হল। ইংরেজ আসার কিছু আগেও তার দীর্ঘ উত্তরকাল ধরে বাংলা কাব্যকে মেরে মেরে বিকলাঙ্গ করা হয়েছে ।” আবার কিছু পরে একই প্রসঙ্গে লিখছেন –“ছন্দ প্রকরণকে আঁচলবদ্ধ করার জন্য নানা নামকরণ ও চলনবিন্যাসকে মান্যরূপ দিয়ে বলা হল এই নাও বাংলার সবেধন তিন ছন্দ । হল বিদেশি প্রকরণের প্রচার । সনেট থেকে হাইকু, রুবায়েত থেকে গজল সব চেষ্টা করা হল । তাতে ভাষা মহত্ত্বর বাঁক নিয়েছে, সন্দেহ নেই । কিন্তু তাঁর মৌলরূপটি আজ খুঁজে পাওয়া যায় না । মূলত ইংরেজি সাহিত্যের চালচলন এনে বাংলায় অনুপ্রবিষ্ট করা হল । ... কথায় কথায় কবিতাকে  ক্ষণে স্যুররিয়াল, ক্ষণে ইম্প্রেশনিস্ট, আজকাল সাব অল্টার্ন বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে লাগল । তরুণ কবিটি লিখতে এসেই তাই বোধ সরিয়ে রেখে বুদ্ধির অভিভাবকত্বে পরিধান হয়ে যায়। জীবনের আকাশপাতাল ভুলে নাগরিক হয়ে উঠবার চেষ্টা করে।” কবি-গদ্যকার, ভাবুক অশোক দেবের কথাগুলো ভাববার মতো । আমাদের ভাবনা জগতের শিকড়ে ধরে টান মেরেছেন তিনি । ভালো লেগেছে আমার ।

এভাবে আরও গদ্য পাই আমরা ‘জলজ’-এর ১০০ তম সংখ্যায় । প্রখ্যাত কবি- প্রাবন্ধিক রবীন্দ্র গুহ লিখেছেন – “ মাটি ও মানুষের বাঁটোয়ারা”, কবি-প্রাবন্ধিক পল্লব ভট্টাচার্য লিখেছেন – “তোমার ভাষা বোঝার আশায়” । পল্লব ভট্টাচার্য মানেই অচেনা- অজানা এক কৌতুহলের দিকে পাঠককে ঠেলে দেয়ার তৎপরতা। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি –“ যদি বলা শোনার মধ্যে কোনও যোগাযোগ না ঘটতো, তাহলে এই যে আমাদের এত এত কথা বলা আর এত এত কথা শোনা, সব কোথায় যেতো ? শব্দতরঙ্গ হয়ে যদি বাতাসে ভেসে না যেতে পারতো, তবে কোন অন্ধ মরুপথে হারিয়ে যেতো আমাদের এত এত কথা ? যদি বাংলাভাষা তৈরির সেই আদি যুগের কোনো একসময় উচ্চারিত ও গীত হয়ে, লিখিত না হত কাহ্নপা-র চর্যার এই পদ, তবে কীভাবে আমরা আন্দাজ করতে পারতাম, ‘ সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’!” খুবই মূল্যবান একটা গদ্য । এরপর একে একে আমরা গদ্য পাচ্ছি, অমিতাভ দেব চৌধুরীরগদ্য – ‘ভাক্সো পোপাঃ একটি ভূমিকা” । কবি- গদ্যকার অভিজিৎ চক্রবর্তীর মূল্যবান গদ্য – “ ত্রিপুরার কবিতার হাংরি প্রভাবিত আধুনিকতা ও টিনের তলোয়ার”। কবি-প্রাবন্ধিক অশোকানন্দ রায়বর্ধনের গদ্য – “ রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ বাংলা কবিতায় ভিন্নতায় স্বরায়ন” । গদ্য ছাড়াও এই সংখ্যায় রয়েছে প্রায় ৯২ জন কবির কবিতা, গল্পে পাচ্ছি – স্বকৃত নোমান, অলক দাশগুপ্ত এবং মোজাফফর হোসেন । মূল্যবান দুটি অনুবাদ পাচ্ছি – “ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা চরিত” – জুয়েল মাজহার, “ আলফোনসিনা স্তর্নি ” অর্পিতা আচার্য ।  “ লে সাইলেন্স ডিলা মার কুমার” আলোচনায় পাচ্ছি অজিত দত্ত-কে ।

এককথায় ‘জলজ’ শততম সংখ্যা  শততম পৃষ্ঠায় অসাধারণ একটি সংখ্যা । সম্পাদক সন্তোষ রায়কে এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতেই হয় । ‘জলজ’ প্রকাশের প্রথম সংখ্যার উজ্জ্বল সাক্ষী ছিলাম আমি । সেই চরম সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । আজ সেই ‘জলজ’ এর  শততম সংখ্যা নিয়ে লিখছি, ভাবতেই ভালো লাগছে । আজ ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ‘জলজ’ উজ্জ্বল একটি নাম । একটা উদাহরণ। একটা প্রেরণার নাম । সংগ্রামের নাম । ‘জলজ’  আরও এগিয়ে যাক, এই শুভ কামনা রইল ।

 

পত্রিকা --‘জলজ—১০০ তম সংখ্যা

সম্পাদক সন্তোষ রায়

ধর্মনগর / উত্তর ত্রিপুরা

মূল্য ২০০ টাকা

           

‘সাহিত্য-সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ ছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ -- তমালশেখর দে

 


               ‘সাহিত্য-সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ ছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’

                                           আলোচনা – তমালশেখর দে 



আটের দশকে ত্রিপুরায় সাহিত্য সংস্কৃতিতে এক আলোড়ন তুলেছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’।যদিও মূলত  এর কর্মকাণ্ড   আগরতলাকেন্দ্রিকই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । কিন্তু এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল  ত্রিপুরার সাহিত্য মননে । সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে, প্রসারে ও প্রচারে গ্রুপ সেঞ্চুরি যে ভূমিকা নিয়েছিল তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে । সেই  গ্রুপ সেঞ্চুরি-র ইতিহাস,প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকে একত্রিত করে সংকলন ও  সম্পাদনা  করেছেন ত্রিপুরার তরুণ গবেষক- আলোচক জ্যোতির্ময় দাস । “গ্রুপ সেঞ্চুরি” গ্রন্থের ‘ কিছু কথা’-য় তিনি লিখছেন – “... সেই ১৯৮০ সালের কথা । ত্রিপুরার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় সময় । মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ভিত ভেঙে হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরার আকাশ বাতাস । সেই সময় সুস্থ সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচারে পথে নেমে পড়েন কয়েকজন তরুণ । সম্মিলিত এই প্রয়াসের নাম দেওয়া হলো “গ্রুপ সেঞ্চুরি’।” ১৯৮০ সালের ২৮ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে পথ অনুষ্ঠান শুরু করে  গ্রুপ সেঞ্চুরি । প্রথম থেকেই এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, নাট্যশিল্পী, আবৃত্তিকার । সাইক্লোস্টাইল প্রচারপত্রে সেদিন বলা হয়েছিল – ‘সাহিত্য সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ গ্রুপ সেঞ্চুরি ।’

১৯৮৩ সালে গ্রুপ সেঞ্চুরি  আগরতলা বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করে ‘গ্রুপ সেঞ্চুরির কবিতা’ নিয়ে ।  কবিতাপত্রে জোরালো দাবি ছিল ‘একটা খোলামেলা মেলা চাই।’  সেইবছর গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করে আরও একটি কবিতার যৌথ নিবেদন । বাংলা কবিতা, সঙ্গে কবিতার ইংরেজি অনুবাদ । যা পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল । ‘বাস্তবতা ও লেখকদের স্বাধীনতা’ এই শিরোনামে ১৯৮৫ সালে পাঠকদের সামনে গ্রুপ সেঞ্চুরি নিয়ে আসে বিশেষ গদ্য সংখ্যা । দক্ষিণ আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মোলাইসের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিকে সামনে রেখে গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করেছিল প্রচারপত্র । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক মুখপত্র ‘ধ্বনিপ্রান্তর’ আত্মপ্রকাশ ছিল একটি বিরাট ঘটনা ।  সেই অর্থে বলা যায়, গ্রুপ সেঞ্চুরি ছিল একটি প্ল্যাটফর্ম আর ধ্বনিপ্রান্তর ছিল সেই প্ল্যাটফর্মের মুখপত্র । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তার এক নিবন্ধে লেখেন – “‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ হঠাৎ করেই ১৯৭৯ সালের কোনও একদিন সৃষ্টি হয়ে যায়নি । গ্রুপ সেঞ্চুরি একটি দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ারই ফল এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে যার মূল কারিগর ছিলেন কবি নকুল রায় । আমাদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন তিনি । আমাদের প্রেরণার উৎস । ... ১৯৭৯ সালে নকুলদা  কলকাতা থেকে চিঠি লেখেন সন্তোষ রায়কে এবং আমাকে ।আমাদের কাছে আইডিয়াটা ছিল চমৎকার । রামেশ্বে ভট্টাচার্য, শুভেশ ও সুবিনয়ের সঙ্গে কথা বলে তার বাস্তবায়নের দিকে এগোলাম আমরা । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নামকরণ করলেন নকুল রায় । ’৮০-তে নকুলদা ফিরে এলেন আগরতলায় । কবিতাকে এবং শিল্পকলাকে মানুষের আরও নিবিড় নৈকট্যে নিয়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে নিজেদের আরও শানিত করে তোলাই ছিল গ্রুপ সেঞ্চুরির প্রাথমিক লক্ষ্য।” আবার ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে কবি নকুল রায় বলেন – “ আমাদের প্রতীক ছিল ‘পেঁচা’। পেঁচার দুই ডানা মেলা, উড়বে-উড়বে ভাব । ব্যাখ্যা করলাম এই প্রতীকের । সময়টা ছিল ভয়ঙ্কর । ঘরে বাইরে সর্বত্র অস্থির পদচারণা । রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙে ফেটে টুকরো হচ্ছে সব । হচ্ছে মূল্যবোধও । অস্তিত্ব রক্ষা করাই মুশকিল । নিশাচরদের উৎপাত বেড়েছে, দালালদের রমরমা । এই অশুভ অবস্থায় মানব পেঁচারা দিনে চুপচাপ, রাতের অন্ধকারে লুট- ধর্ষণ- জমি- দখল-ভাঙচুর চলছে সর্বত্র ।” আবার এই প্রসঙ্গকে আরও এগিয়ে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় তার স্মৃতিচারণায় লেখেন – “এত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল বলেই আমরা জানতাম সাফল্য আসবেই । আন্তরিকতা ও সহযোগী মনোভাবের ফলে গ্রুপ  সেঞ্চুরিয়ানদের উদ্যোগে এখনো যেকোনও সৃজনাত্মক উদ্যোগ সফল হয় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র বড় সাফল্য যেটি, তা হল নিরাশা হতাশা কাটিয়ে আশাবাদী করে তুলেছিল । সাহিত্যশিল্প তৎপরতার এটিই বিশেষ গুণ । কবিতায় উদ্বাস্তু নই এখন আর । শেকড় প্রোথিত প্রেরণায় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সফলতার যোগফল অনেক দীর্ঘ । প্রথমদিন থেকে আজ অব্দি, আজ থেকে আগামী দিনগুলির কর্মফল যোগ করতে হবে ।” 

  

“গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র যাবতীয় লেখালেখি এক মলাটে সংকলন ও  সম্পাদনা  করে সমৃদ্ধ করেছেন জ্যোতির্ময় দাস । ত্রিপুরার লেখালেখি নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারাই বুঝবেন এই সংকলনটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়েছে । আজও এর প্রভাব বহমান । 


গ্রন্থ ঃ গ্রুপ সেঞ্চুরি

সংকলন ও সম্পাদনা -- জ্যোতির্ময় দাস 

প্রকাশক -- ‘পূর্বমেঘ পাবলিকেশন’

আগরতলা 

মূল্য – ৬০০ টাকা   

  

 

 

                 আলোচনা – তমালশেখর দে

 

 

আটের দশকে ত্রিপুরায় সাহিত্য সংস্কৃতিতে এক আলোড়ন তুলেছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’।যদিও মূলত  এর কর্মকাণ্ড   আগরতলাকেন্দ্রিকই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । কিন্তু এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল  ত্রিপুরার সাহিত্য মননে । সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে, প্রসারে ও প্রচারে গ্রুপ সেঞ্চুরি যে ভূমিকা নিয়েছিল তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে । সেই  গ্রুপ সেঞ্চুরি-র ইতিহাস,প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকে একত্রিত করে সংকলন ও  সম্পাদনা  করেছেন ত্রিপুরার তরুণ গবেষক- আলোচক জ্যোতির্ময় দাস । “গ্রুপ সেঞ্চুরি” গ্রন্থের ‘ কিছু কথা’-য় তিনি লিখছেন – “... সেই ১৯৮০ সালের কথা । ত্রিপুরার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় সময় । মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ভিত ভেঙে হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরার আকাশ বাতাস । সেই সময় সুস্থ সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচারে পথে নেমে পড়েন কয়েকজন তরুণ । সম্মিলিত এই প্রয়াসের নাম দেওয়া হলো “গ্রুপ সেঞ্চুরি’।” ১৯৮০ সালের ২৮ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে পথ অনুষ্ঠান শুরু করে  গ্রুপ সেঞ্চুরি । প্রথম থেকেই এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, নাট্যশিল্পী, আবৃত্তিকার । সাইক্লোস্টাইল প্রচারপত্রে সেদিন বলা হয়েছিল – ‘সাহিত্য সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ গ্রুপ সেঞ্চুরি ।’

১৯৮৩ সালে গ্রুপ সেঞ্চুরি  আগরতলা বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করে ‘গ্রুপ সেঞ্চুরির কবিতা’ নিয়ে ।  কবিতাপত্রে জোরালো দাবি ছিল ‘একটা খোলামেলা মেলা চাই।’  সেইবছর গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করে আরও একটি কবিতার যৌথ নিবেদন । বাংলা কবিতা, সঙ্গে কবিতার ইংরেজি অনুবাদ । যা পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল । ‘বাস্তবতা ও লেখকদের স্বাধীনতা’ এই শিরোনামে ১৯৮৫ সালে পাঠকদের সামনে গ্রুপ সেঞ্চুরি নিয়ে আসে বিশেষ গদ্য সংখ্যা । দক্ষিণ আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মোলাইসের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিকে সামনে রেখে গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করেছিল প্রচারপত্র । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক মুখপত্র ‘ধ্বনিপ্রান্তর’ আত্মপ্রকাশ ছিল একটি বিরাট ঘটনা ।  সেই অর্থে বলা যায়, গ্রুপ সেঞ্চুরি ছিল একটি প্ল্যাটফর্ম আর ধ্বনিপ্রান্তর ছিল সেই প্ল্যাটফর্মের মুখপত্র । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তার এক নিবন্ধে লেখেন – “‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ হঠাৎ করেই ১৯৭৯ সালের কোনও একদিন সৃষ্টি হয়ে যায়নি । গ্রুপ সেঞ্চুরি একটি দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ারই ফল এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে যার মূল কারিগর ছিলেন কবি নকুল রায় । আমাদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন তিনি । আমাদের প্রেরণার উৎস । ... ১৯৭৯ সালে নকুলদা  কলকাতা থেকে চিঠি লেখেন সন্তোষ রায়কে এবং আমাকে ।আমাদের কাছে আইডিয়াটা ছিল চমৎকার । রামেশ্বে ভট্টাচার্য, শুভেশ ও সুবিনয়ের সঙ্গে কথা বলে তার বাস্তবায়নের দিকে এগোলাম আমরা । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নামকরণ করলেন নকুল রায় । ’৮০-তে নকুলদা ফিরে এলেন আগরতলায় । কবিতাকে এবং শিল্পকলাকে মানুষের আরও নিবিড় নৈকট্যে নিয়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে নিজেদের আরও শানিত করে তোলাই ছিল গ্রুপ সেঞ্চুরির প্রাথমিক লক্ষ্য।” আবার ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে কবি নকুল রায় বলেন – “ আমাদের প্রতীক ছিল ‘পেঁচা’। পেঁচার দুই ডানা মেলা, উড়বে-উড়বে ভাব । ব্যাখ্যা করলাম এই প্রতীকের । সময়টা ছিল ভয়ঙ্কর । ঘরে বাইরে সর্বত্র অস্থির পদচারণা । রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙে ফেটে টুকরো হচ্ছে সব । হচ্ছে মূল্যবোধও । অস্তিত্ব রক্ষা করাই মুশকিল । নিশাচরদের উৎপাত বেড়েছে, দালালদের রমরমা । এই অশুভ অবস্থায় মানব পেঁচারা দিনে চুপচাপ, রাতের অন্ধকারে লুট- ধর্ষণ- জমি- দখল-ভাঙচুর চলছে সর্বত্র ।” আবার এই প্রসঙ্গকে আরও এগিয়ে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় তার স্মৃতিচারণায় লেখেন – “এত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল বলেই আমরা জানতাম সাফল্য আসবেই । আন্তরিকতা ও সহযোগী মনোভাবের ফলে গ্রুপ  সেঞ্চুরিয়ানদের উদ্যোগে এখনো যেকোনও সৃজনাত্মক উদ্যোগ সফল হয় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র বড় সাফল্য যেটি, তা হল নিরাশা হতাশা কাটিয়ে আশাবাদী করে তুলেছিল । সাহিত্যশিল্প তৎপরতার এটিই বিশেষ গুণ । কবিতায় উদ্বাস্তু নই এখন আর । শেকড় প্রোথিত প্রেরণায় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সফলতার যোগফল অনেক দীর্ঘ । প্রথমদিন থেকে আজ অব্দি, আজ থেকে আগামী দিনগুলির কর্মফল যোগ করতে হবে ।”

 

“গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র যাবতীয় লেখালেখি এক মলাটে সংকলন ও  সম্পাদনা  করে সমৃদ্ধ করেছেন জ্যোতির্ময় দাস । ত্রিপুরার লেখালেখি নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারাই বুঝবেন এই সংকলনটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়েছে । আজও এর প্রভাব বহমান ।

 

গ্রন্থ ঃ গ্রুপ সেঞ্চুরি

সংকলন ও সম্পাদনা -- জ্যোতির্ময় দাস

প্রকাশক -- ‘পূর্বমেঘ পাবলিকেশন’

আগরতলা

মূল্য – ৬০০ টাকা  

  

 

Wednesday, July 9, 2025

"ইনস্টিটিউশনের দিকে গুলি বেরোচ্ছে গ্যান পয়েন্ট থেকে!'" -- আলোচক গৌরব নাথ

                        "ইনস্টিটিউশনের দিকে গুলি বেরোচ্ছে গ্যান পয়েন্ট থেকে!'"

                               আলোচনা -- কবি গৌরব নাথ





'এই যে পেছন হাঁটছি,/এটা যুদ্ধ।/ এই যে তোমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছি/এটাও যুদ্ধ।' 
 (যুদ্ধ, পৃ-১৬)

২০২৩ সালের অটল কবিতা উৎসবে প্রথম এই কবিতাটি শুনে আহা বলে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। চরম উত্তেজনায়। এখন বইয়ে কবিতাটি পড়ার পর কিন্তু সেই উত্তেজনা পেলাম না। ক্রাইসিসের সংযমী ও শান্ত রূপান্তর।

কোথাও একটা জায়গায় জন এফ কেনেডির একটা ইন্টারপ্রিটেশন পড়েছিলাম যে, চাইনিজ ভাষায় 'ক্রাইসিস' শব্দকে দুটো চরিত্রে দেখা হয়- এক ডেঞ্জার, আরেক সুযোগে হাতছানি। এমনকি নিৎশেও এভাবেই ক্রাইসিস-কে দেখতেন। আমাদের কবি তমালশেখর দে-র কবিতাযাপনে এই দুটোর সামঞ্জস্যই হয়ে ওঠে স্মর্তব্য। সাধারণত থিসিস-অ্যান্টিথিসিসের নিরন্তর প্রক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসল ক্রাইসিসের অন্তর্দশন করতে দেয় না। সময়ের সেট-বিলিফ একে আচ্ছাদিত করে রাখে। তা-সত্ত্বেও একজন নিগূঢ় পাঠকৃতি-সম্পন্ন তথা সময়চেতা কবি সেক্ষেত্রে সিনথেসিস করেন। করতেই হয়! নিজের দিব্যদর্শন বা imagination-কে কাজে লাগিয়ে ভাষার symbolic প্রয়োগে দেখান ক্রাইসিসের বিভিন্ন প্যারাডক্সিক্যাল মুভমেন্টকে। ঠিক এভাবেই কবি তমালশেখর দে-এর বিগতকালীন দুটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে স্টাইলের ফারাকে ধরা পড়েছে ক্রাইসিসের বিভিন্ন ধরন। ফলত বিগত দুই বই প্রকাশের কালানুক্রমিক শৈলীতে কবির এই পরিবর্তন হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। এজন্যই বলা যায়, কবি তমাল শেখর দে-র 'আই কান্ট ব্রিদ' এর দীর্ঘকবিতার মধ্যে একই কথার যে পলিফোনিক্যাল পথগুলো অভিব্যক্ত হয়েছিল তারই পরবর্তী এক ধৃতিসম্পন্ন নির্যাস যেন এই 'গ্যান-পয়েন্ট কবিতা সংকলন' সংকলন।

যে কবি এর আগের বই 'আই কান্ট ব্রিদ'-এ ক্রাইসিসকে লিখেছিলেন- 'আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না'-এর মতো কনফেশনে, সেই কবিই এই কাব্যে এসে বলেছেন-'ভাঙা দেওয়াল, আরও একটু ভেঙে দিয়ে/দেখছি চাঁদ'-(দারিদ্র্যবিলাস, পৃ-৫)। আহা, শব্দের সৌম্য প্রয়োগ! ক্লাসি! নিজেকেই চরম নির্ভীকতায় তীব্র ক্রাইসিসের সাথে জুড়ে দিলেন দেওয়াল চিহ্নায়কের প্রয়োগে। এরপরেই 'দেখছি চাঁদ' পদের সমন্বয়- Epic theatre এর মতো কবিতার দুটি প্লটকে গোটা দৃশ্যে পরিণত করেছে।

জাপানিজ আর্ট ফর্মে যেভাবে আলতো হাতে এক তুলির টান মোচড় দেয় আমাদের, এখানে প্রায় সেরকমই নরম টানে দীর্ঘ চিড় কেটেছেন কবি। এই দীর্ঘ জখমই এই কবিতার থেকে প্রাপ্ত সম্পদ। তাই বলি পোয়েট্রি সমান এক্সপেরিয়েন্স। তাছাড়া কবিতাটির নামের দিকে তাকালে এবং 'চাঁদ' শব্দের ব্যবহার প্রথমত চেতনাকে রোমান্টিক করে ঠিকই কিন্তু বস্তুত এর দ্যোতনা অস্ত্যর্থক ভঙ্গিতে আধ্যাত্মিক বস্তুবাদে গিয়ে পৌঁছায়। অবশ্য এরকম ডেস্টিনেশন দেখা যায় 'দুঃখ' কবিতায়ও, কবি বলেছেন-'আমার লালিত দুঃখগুলো যেন হারিয়ে না-যায়!' (পৃ-১০)। এখানে কবির সম্পদ হল সাবজেক্ট দুঃখ! বড় আপন করে বলেছেন 'আমার লালিত দুঃখগুলো' যেন নিজের সন্তানের মতো যত্নবান এই দুঃখের প্রতি কবি, যেন নিজের নিভৃতির আখ্যান, যেন নিজেই দুঃখ। এই তো হেটারোগ্লোসিয়া! 'নীরবতা' কবিতায়ও এই আত্মপীড়নমূলক বিরহের প্রকাশ দেখা যায়- 'আমি দুয়ার খুলে বসে আছি/ বিরহ, আমাকে রাঙাও। তোমার মতো রাঙিয়ে দিয়ে যাও/ কথা বলার মতো ঘরে কেউ অবশিষ্ট নেই!' (পৃ-৯)

বলা হয় সব কবিতাই বিরহের কবিতা। বিরহ ভালোবাসার একনিষ্ঠ সহযোগী সত্তা। তেমনি ভালোবাসা এবং রাগ এপিঠ ওপিঠের মতো। এজন্যই কবি রাগের কথা বলতে গিয়ে বলে ফেলেন ভালোবাসার কথা, অনুরাগের বাক্য। কবির কথায়-'তাকে আজ রাগের কথা বলতে গিয়ে ভালোবাসার কথা বলে ফেলেছি।' কবিতা পড়তে পড়তে ফিলিপ লাকুলাবার্তের একটি কথা মনে পড়ে যে 'It is always easy to mock 'distress', but we are its contemporaries...'। এই রেশেই কবি বলেন- 'বড় সহজে একটা দিন আমাকে অতিক্রম করে যায়/ একটা দিনকে আমি অতিক্রম করতে পারি না/ সারাজীবনের রাত যোগ করে।' (ব্যর্থতা, পৃ-৬) এই অতিক্রম না করতে পারা, অবজ্ঞা না করার অক্ষমতাই 'সারাজীবনের রাত' বিষয়-নিরূপককে উত্থিত করেছে। শব্দের কী দুরন্ত ব্যবহার। উফ। শিক্ষনীয়! সাবজেক্ট-বিধেয়-যুক্তির আবহে যেমন কবিতার পোক্ত গঠন তেমনি কাব্য-বিষয়ের গমন। শব্দ, বাক্যগঠন, পদ ও এদের অর্থযাত্রার প্রতি গভীর মনোযোগী কবি তমালশেখর দে-র কবিতার অ্যালগোরিদমিক মেথড লক্ষ করলে দেখা যায় ইদানীন্তন কবি হয়েও কবিতার লজিক্যাল সিকোয়েন্সকে তিনি আপন লয়ে রেখেছেন, কেবলমাত্র যে ইমোশনাল সিকোয়েন্সই প্রভুত্ব করবে, এমন তিনি করেননি।

এছাড়া, কবি মাত্রেই জানেন তার ব্যবহার্য শিল্প-মাধ্যমে কেবল শব্দ সকল অনুভূতিগুলোকে সর্বাঙ্গসুন্দরভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম; তাই এই অপূর্ণতার বৈচিত্র্যে অস্তিত্বের মৌল উচ্চারণ ধ্বনিত করতে গেলে, এক্সপ্রেশনের অন্তর্নিহিত সীমা অতিক্রমের মাধ্যমে কবিতায় সঞ্চারিত করতে হয় গূঢ়তর ব্যঞ্জনা। ফলে গড়ে ওঠে সিনট্যাক্টিক্যাল আঙ্গিক। বলা যায় a language within a language। এভাবেই এই কবির কবিতাগুলোও বিচরণ করে শব্দের প্রয়োগিক সংকেতে। একটা কবিতা দেখা যাক-'এ যাত্রার কোনও শেষ নেই/ রাধা যখন ছুটে যায় কৃষ্ণের দিকে' (যাত্রা, পৃ-৩৭)। এই 'ছুটে যায়' শব্দ অনেকার্থে ছোটে। যদি ভাবি প্রেম, তাহলেও তীব্র
আশায় নিরন্তর গমনকে ইঙ্গিত করে; রাজনীতি ভাবলেও টার্গেট সেই নিরন্তর গমনই। স্বগত যাত্রা! সত্তা ও পরাসত্তার যাত্রাও হতে পারে।

পড়তে পড়তে একটা তুলনার কথা মাথায় এল। যে বিষয়গুলো প্রায় সময় আমাদের যন্ত্রণা দেয়, পীড়া দেয়, ঐ বিষয়গুলোকে সাধারণত আমরা উপেক্ষা করি, কেমন হবে যদি সেগুলো আমাদের জীবনের প্রতি নতুন কোনো আমন্ত্রণ হয়, কোনো মুক্তির পথ হয়, কোনো দরজা হয়। এই ব্যাপারেই Dr. Clarissa Pinkola Estes এর 'women who run with wolves' বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, যদি মানুষের ভেতরে কোনো গভীর দাগ থাকে, যদি আপনার ভেতরে কোনো পুরোনো জমা কথা থাকে, যদি আপনি আকাশ নদী জল দেখে নিস্তব্ধ হোন আনন্দিত হোন কিংবা আপনার ভেতরে সহজ সুন্দর পূর্ণাঙ্গ জীবনের সতত তাড়না থাকে- তাহলে সেগুলো সবই একেকটা দরজা, মুক্তির পথ, বেঁচে থাকার জন্য জমায়েত আশার খুদকুড়ো। কবি তমালশেখর দে বলেন-'আমার এক ঝাঁক স্বপ্ন হঠাৎ ভেঙে পড়ার পর/ যে টুকরোগুলো বেঁচে থাকে,/ আমি তাদের জীবনানন্দের গল্প শোনাই/ বনলতার কথা বলি' (এক ঝাঁক স্বপ্ন, পৃ-৩৪) জীবন টোটালি একটা জীবন। কিন্তু যখন এর একেকটি সিন একেকটি কমপ্লিট সেন্স নিয়ে আসে, তখন একেকটি সিন জীবনের উপচিত্রমালা। কবির 'একঝাঁক স্বপ্ন' ভেঙে যাওয়া উপচিত্রের মতো সাপ্রেসিং, পীড়াদায়ক অসহায়ত্বই আমন্ত্রণ করেছে মুক্তির দরজা। যে টুকরোগুলো বেঁচে থাকে, সেই পদগুলোকে যদি এখানে সম্পূর্ণ একটা সাবজেক্ট ধরি, তাহলে এই সাবজেক্টকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে পরবর্তী দুটি লাইন। এই যে 'জীবনানন্দের গল্প শোনাই'- প্রেডিকেট পরবর্তী 'বনলতার কথা বলি' প্রেডিকেট-কে জাস্টিফাই করল, করে তাদের সাবজেক্টকে ঠিকানায় পৌঁছাল। ফলত খুলেছে বেঁচে থাকার নতুন দরজা। যা শেষপর্যন্ত পরাবাচনে গিয়ে ঠেকে।

চোখে পড়ে 'হঠাৎ একদিন' কবিতা। পড়ে দেখি-'কথা বলতে বলতে হঠাৎ একদিন দেখি/ ভালোবাসার শব্দগুলো কোলাহলহীন দমবন্ধ মাছের মতো।' (হঠাৎ একদিন, পৃ-৬)। প্রসঙ্গত মনে পড়ে ভাষা-দার্শনিক Marc Froment-Meurice-এর 'That is to say' বইয়ে original silence'-এর ব্যাখ্যা, 'Everything remains to be said, even in saying everything'। তেমনি আমরাও, সব কথার ভিড়ে ভালোবাসার কথাকে মোড়ক দিতে দিতে তার উন্মুক্ত ধ্রুপদি চলনকেই আবদ্ধ করে ফেলি। বেঁধে ফেলি। ভালোবাসার কথা আর কিছুই থাকে না। যেন আসলেই ভালোবাসার কথা বলিনি! কোনো কিছুই বলিনি। পরবর্তীতে আরেকটি কবিতায় কবি বলেন-'একদা যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল/ আজ সেখানে ফুল হাত তুলে আছে।' আবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শব্দের ব্যবহার। প্রায় বেশিরভাগ জায়গায়ই এমন। 'একদা' না বলে কবি 'এক সময়'ও বলতে পারতেন, কিন্তু বলেননি। কারণ এ শুধু গোটা কদিন বা বছর আগের নয়। এই 'একদা' কবির নিজের জীবনের আদি, এর থেকেও পুরোনো কয়েক জেনারেশন আগে। তবে কবি বলছেন 'ফুল হাত তুলে আছে'। ফুলের অবস্থাটা কেমন? কেন হাত তুলে আছে? অধিকার, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অস্তিত প্রকাশের দাবিতে? হয়তো সেটাই। ফলত চরম রাজনৈতিক চেতনা ধরা পড়েছে এখানে। কবি তমালশেখর দে-র কবিতায় তীব্র দাপট ও আত্মবিশ্বাসের খামতি নেই। যেমন রয়েছে বাক্যে, তেমনি রয়েছে ভাবে। কবি বলেন-'সব বিস্ফোরণ ভাঙা হবে একদিন।' (বিস্ফোরণ, পৃ-১১)। অথবা 'হাঁটু ভেঙেছি, ভাঙতে দাও।/ মাথা ভাঙতে দেবো না কোনোদিন।' (দৃঢ়তা, পৃ-৮)। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এফেক্টিভ কথা। শুধুই কি এই সময়ের? না, কবি দু-এক খোঁচায় সময় থেকে সময়ান্তরের আবর্তিত বাচনকেও ধরেছেন। কবি বলেন- 'ছুরির মতো সম্ভাবনাময় নিখুঁত একটা সুযোগের জন্য/ আপনারা প্রার্থনা করুন।' কবি অপেক্ষমাণ। কিসের? সুযোগের। ঘুরে দাঁড়ানোর। ঐ যে আগে বলেছিলাম ক্রাইসিসের দুটি চরিত্রের একটি সুযোগ। এই তার মানসিক প্রমাণ। এই কবিতায় যেমন ধরা পড়েছে কবির ভদ্র ও সংযত রোষ, তেমনি খানিকটা শ্লেষও ধরা পড়েছে।

এরপর, আপাদমস্তক প্রেমিক মানুষ তমাল শেখর দে যখন প্রেম নিয়ে সরাসরি বললেন-'আমাদের গ্রামে কোথাও কোনো নদী নেই।/ তবু আপনাকে যখন দেখি, নদীর মতো তাকিয়ে থাকি।' (প্রেম, পৃ-১৩)। কবির এই 'আপনি'-টা কে? নদীটাই বা কী? সত্তা অপরসত্তা? নাকি কবি ও তার প্রেমিকা? আসলে দুই-ই এক।

প্রেম দাম্পত্য নিয়ে কবি প্রচুর লিখেছেন। বেশিরভাগ লেখায় বিষয় হয়ে এগুলোই এসেছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কখনো কখনো এমন মনে হয়েছে, এই ধরনের লেখা একঘেয়েমি এনেছে। কিছুটা লঘু ব্যঞ্জনায় এই লেখাগুলো কাতরতা সৃষ্টি করে না। এই ধরনের অনুকবিতায় শব্দের একটু এদিক-সেদিক হলেই এপথ ওপথ করে ফলে, দিকভ্রান্ত ও রসভ্রান্ত করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কবি তমালশেখর দে-এর সিদ্ধহস্তের কারণে কবিতাগুলো অসীমের যাত্রাতে সক্ষম হয়েছে। 'ভাত' কবিতাটাই দেখি-'আমি সেই ধানের গন্ধে মুখরিত হই/যা আমার মুখের ভিতরে বিস্তারিত হয়।' (ভাত, পৃ-৮৩)। ক্ষুধা, খাদ্য ও খাদ্য-নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি ধরা পড়েছে 'মুখরিত' ও 'বিস্ফোরিত' কবিতায়। কবি বলেন-'এই পা-দুটোর কোনো শারীরিক ভাষা নেই।/ পথের দিকে আজন্ম চেয়ে থাকে শুধু।' অনুমান করি কবি তাঁর বিশেষভাবে-সক্ষম স্ত্রী সঙ্গীতশিল্পী শ্রীমতী নবনীতা ভট্টাচার্যের কথা মনে রেখে এই কথা বললেও কথাটা পরাবাচনিক হয়ে সার্থক কবিতা হয়ে উঠেছে।

এখন একেবারে ইতির দিকে যাওয়া যাক। এই বইয়ের প্রচ্ছদ রূপকের প্রতিনিধিত্ব করছে। ইনস্টিটিউশনকে চ্যালেঞ্জ করছে! বলা হয় সংকেত শুরু হয় কবিতার প্রচ্ছদ থেকেই। এই বইয়ের প্রচ্ছদ লক্ষ করলে দেখা যায় স্কাল্পচারটা চুম্বনের। আসলে রাষ্ট্র এটাই চায় না, প্রতিষ্ঠান সমাজ সবসময়ই এটাকে আস্তরণে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু কবি এটাকেই ভাঙতে চেয়েছেন। এরজন্য তিনি Gun এর লক্ষ্য অর্থাৎ গ্যান-পয়েন্টের শিকার! কিংবা এরকমও ভাবা যায়, ঐ চুম্বনকৃত মিলন থেকেই ছড়িয়ে পড়বে সাহস, ভালোবাসার আর্তি। বইয়ের গঠন বাইন্ডিং সহ যাবতীয় অন্যান্য কাজ মোটামুটি ভালোই লেগেছে। প্রচ্ছদ করেছেন অনিমেষ মাহাতো, প্রকাশনা- নীহারিকা পাবলিশার্স।
Edit
All rea
Praothers

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...