ত্রিপুরার ধর্মনগরের অদূরে গ্রামীণ এলাকা থেকে উঠে এসে বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন নিবারণ নাথ । আজ তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
“অদ্ভুত এক জীবনবোধের তাড়নায় বেঁচে থাকি। ”
প্রশ্ন ঃ আপনি একাধারে কবি, গল্পকার, নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক। আবার ইদানীং ইউটিউবে নাটক লিখছেন, নির্মাণ করছেন। এত কিছু সামলান কি করে?
উত্তর ঃ ভালোবাসার টান--মারাত্মক ব্যাধি। সংক্রামিত হলে আর রক্ষা নেই। বসে থাকা যায় না। ছুটতে হয় আত্মীক সৌরভে, গন্ধে । মিলন স্পৃহায়। মূলত, একটা তাড়া থেকেই এত কিছুর পেছনে নিরন্তর ছুটে চলা । এই চলা, কোনো অর্থেই কোনো উন্মাদনা নয়। বরং বলতে পারি, অনুশীলন । এ-যেন এক ধরণের তাড়নার উদযাপন। মিলন বেলার আনন্দ। না, আমি শুধু আনন্দে বিশ্বাস করি না। বিনোদনেও না। বরং বিনোদনকে হাতিয়ার করে সত্যের সার খুঁজে, তা নিয়েই কথা বলতে পছন্দ করি। মানুষের কথা,সমাজের কথা,দেশের কথা বলার তাড়না থেকেই কবিতা, গল্প, নাটকসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের সাথে বারবার জড়িয়ে যাই। নিজেরই অজান্তেই যেন দায়বদ্ধতা ঘাড়ে চেপে বসে। সত্তর দশকের শেষ লগ্নে অর্থাৎ১৯৭৫-৭৬ সাল থেকেই সাংস্কৃতিক বিভিন্ন তৎপরতায় ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ি । এরপর আর পেছন ফিরে তাকাইনি। জীবন-জীবিকার যাঁতাকলের ভেতর থেকে সময় বের করেই নিই । না-হলে যে স্বস্তি পাই না । লিটল ম্যাগাজিন, নাটক, যাত্রা,‘সাংস্কৃতিক ঐক্যমঞ্চ’ বর্তমানের সাথে তাল মিলিয়ে ইউটিউব চ্যানেল-- “মাটির গন্ধ”, এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকি । এভাবেই অদ্ভুত এক জীবনবোধের তাড়নায় বেঁচে থাকি । মনে প্রাণে থাকতে চাই । এখানেই জীবনের আনন্দ পাই । উৎসাহ পাই ।
প্রশ্ন ঃ সেই সত্তর দশকের কবি আপনি। অথচ সেই অর্থে আপনার কাব্য মাত্র দুটি। বই প্রকাশে এই অনীহা কেন? নাকি নিজেকে তলিয়ে দেখছিলেন!
উত্তর ঃ সৃজনী ভাবনায় সত্তর দশকের শেষ লগ্নে এলেও কবিতায় আত্মবিশ্বাস
জন্মাতে পারিনি। যদিও ১৯৯৬-৯৭ সালে হৃষিকেশ নাথের সম্পাদনায় যৌথ কাব্য সংকলন “বন্দি রাজহাঁস, মুক্ত বিহঙ্গ ", যৌথ গীতি-কবিতা সংকলন "যুগল বন্দি এবং " প্রকাশিত হয়েছে। রাজ্য ও বহিঃরাজ্যের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা প্রকাশ হত । তারপরও একক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সিদ্বান্তটা ঠিক নিতে পারছিলাম না । একটা উদাসীনতাও ছিল । অবশেষে জীবনের এক দ্বারপ্রান্তে এসে কবি সেলিম মুস্তাফা, হৃষিকেশ নাথ, মন্টু দাস,সমর চক্রবর্তীর তাড়নায় শেষপর্যন্ত কবি ও প্রকাশক শান্তনু মজুমদার প্রচেষ্টায় " দাগ", "ভালো আছি', এবং স্বনির্বাচিত পাঁচটি নাটক নিয়ে "ধর্মের ঢোল', সংকলন প্রকাশিত হয় । এ ছাড়াও আরো দুইটি এক ফর্মার কবিতার বই "আষাঢ়ের গান" ও " আগনের উঠোন" প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন ঃ আপনি এখনও গ্রামে বসবাস করেন। সেখান থেকেই নাটক, যাত্রা, নাট্যোৎসব সবই সাধ্য মতো করার চেষ্টা করেছেন। আপনার এই সাংস্কৃতিক আলোড়ন নিয়ে আমাদের কিছু বলুন!
উত্তর ঃ গ্ৰামীন সভ্যতায় বেড়ে উঠা জীবন । ধর্মনগর শহর থেকে প্রায় তেরো কিলোমিটার দূর গ্ৰাম ঠেকনী, সরসপুর থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টের তো বটেই। তবু কাউকে-না-কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে, গ্রামীণ চেতনাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে । আমাদের জনজীবন কৃষি নির্ভর। আমোদ-প্রমোদে গ্ৰামীন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ভরপুর পরিবেশ দেখে দেখে আমাদের ছোটোবেলা কেটেছে । ধামাইল,গাজন,বাঘাই সেবা,বাউলা গানের আসরে মেতে উঠতো আমাদের গ্ৰামীণ জীবন । শীতের মরশুমে বসত যাত্রার আসর। ‘বিশ্বনাথ যাত্রা পার্টি’ ‘সরস্বতী অপেরা’ ‘মহামায়া অপেরা’ ‘গৌরী অপেরা’ ‘শীতলা অপেরা’ ‘নীলকণ্ঠ অপেরা’ --- তাদের যাত্রা দেখে দেখে আমাদের বড় হওয়া । এ সবে কিশোর-মন আকর্ষন করত। যুবক বয়সে বেশ কিছু যাত্রাভিনয়েও অভিনয় করেছি । তবে তাতে তেমন একটা তৃপ্তিবোধ মনে হচ্ছিল না। বরং সমসাময়িক ঘটনাবলীর বাস্তবতার নিরিখে আধুনিক নাটক মনে নাড়া দিত বেশি। সেই তাড়না থেকেই একসময় জেনে যাই, নাটক শুধু বিনোদন নয়, নাটক সময়ের দর্পনও বটে । বন্ধু-বান্ধব, হিতাকাঙ্খী নিয়ে গঠন করে ফেলি সংস্কৃতি চর্চার এক অনন্য অঙ্গন যার নাম দিই “সাংস্কৃতিক ঐক্যমঞ্চ”। সেটা ১৯৯৫ সাল। মেতে উঠি নাটক নিয়ে । নিজস্ব পান্ডুলিপি, নাটক নিয়ে চলে পরীক্ষা- নিরীক্ষা। ধর্মনগরের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মিলন দেব ও অভিজিৎ চক্রবর্তী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। এরপর “সাংস্কৃতিক ঐক্য মঞ্চ”-কে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নাটক লেখা, মহড়া-মঞ্চস্থ ইত্যাদি কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়লাম। স্থানীয় শিল্পীদের থেকে বেরিয়ে এলেন অভিনেতা অভিনেত্রী। পেয়ে গেলাম নির্দেশক নকুলচন্দ্র নাথকে। ডাক পড়ল রাজ্য থেকে বহিঃরাজ্যে । একে একে মঞ্চ সফল হতে থাকে -- ‘ধর্মের ঢোল’ ‘রেতিয়া সুরতিয়া’ ‘প্রসঙ্গ পুরাণ’ ‘বিভ্রাট’ ‘স্বপ্ন দর্শন’ এমন বহু নাটক ।
প্রশ্ন ঃ লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথে আপনি জড়িত। সেইসব শুরুর দিনের কথাগুলো আমাদের কিছু বলুন।
উত্তর ঃ সত্তর দশক লিটিল ম্যাগের জাগরণের উজ্জ্বল প্রভাব ত্রিপুরায়ও পড়ে। তখন আমি কৈশোর পেরিয়ে সদ্যতরুণ। সৌভাগ্যক্রমে কিছু লিটল ম্যাগের সাথে জড়িয়ে পড়ি । শহরের শৌখিন জীবনের তুলায় গ্রামীণ জীবন মোটেই সুখকর নয়। নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকতে হয় আমাদের। বেঁচে থাকতে হয় অভাব-অভিযোগ শোষণ বঞ্চনাকে সঙ্গী করে। তার উপর থাকে রাজনৈতিক চাপানউতোর। এর মধ্যেই সৃষ্টিশীল ভাবনায় নিজের কথাগুলো বলার বাসনা মাথার ভিতর কাজ করত। এলোমেলো করে লেখা শুরু করি । উৎসাহ পাই কদমতলা থেকে প্রকাশিত কমলাকান্তি নাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জুঁই সাহিত্য দর্পন’ সাহিত্যপত্র থেকে । যদিও ম্যাগাজিনটি দীর্ঘ স্থায়ী হয়নি । এরপর পানিসাগর থেকে কবি রসরাজ নাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘প্রলেতারিয়েত’-এ লিখতে থাকি । ধর্মনগর থেকে কবি বিধান দে সম্পাদিত ‘বহুব্রীহি’,দেবাশীষ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ‘চার্বাক’। মন্টু দাস সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বহ্নিশিখা’ এমন আরও দু-চারটি লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে থাকি । আশির দশকের শুরুতেই মার্চ মাসে সাহিত্যিক ডক্টর মোহিত দেবনাথের একান্ত সহযোগিতায় আমার সম্পাদনায় প্রকাশ করি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিকতার স্বচ্ছ ভাবনার কাগজ ‘বহ্নি’। চারটের সংখ্যা প্রকাশের পর বিভিন্ন টানাপোড়েনে আর প্রকাশ সম্ভব হয়নি । কিন্তু প্রকাশনা ভাবনা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। এর মধ্যে পরিচয় ঘটে কবি ও সাহিত্যিক এবং ধর্মনগরের স্বনামধন্য এডভোকেট হৃষিকেশ নাথের সাথে। নতুন ভাবনা চিন্তায় প্রকাশ করি ‘নীলকন্ঠ’। আজ ৩৫ বছর যাবৎ ‘নীলকন্ঠ’ এখনও স্বমহিমায় এগিয়ে চলেছে ।


No comments:
Post a Comment