Tuesday, July 15, 2025

‘সাহিত্য-সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ ছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ -- তমালশেখর দে

 


               ‘সাহিত্য-সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ ছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’

                                           আলোচনা – তমালশেখর দে 



আটের দশকে ত্রিপুরায় সাহিত্য সংস্কৃতিতে এক আলোড়ন তুলেছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’।যদিও মূলত  এর কর্মকাণ্ড   আগরতলাকেন্দ্রিকই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । কিন্তু এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল  ত্রিপুরার সাহিত্য মননে । সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে, প্রসারে ও প্রচারে গ্রুপ সেঞ্চুরি যে ভূমিকা নিয়েছিল তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে । সেই  গ্রুপ সেঞ্চুরি-র ইতিহাস,প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকে একত্রিত করে সংকলন ও  সম্পাদনা  করেছেন ত্রিপুরার তরুণ গবেষক- আলোচক জ্যোতির্ময় দাস । “গ্রুপ সেঞ্চুরি” গ্রন্থের ‘ কিছু কথা’-য় তিনি লিখছেন – “... সেই ১৯৮০ সালের কথা । ত্রিপুরার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় সময় । মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ভিত ভেঙে হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরার আকাশ বাতাস । সেই সময় সুস্থ সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচারে পথে নেমে পড়েন কয়েকজন তরুণ । সম্মিলিত এই প্রয়াসের নাম দেওয়া হলো “গ্রুপ সেঞ্চুরি’।” ১৯৮০ সালের ২৮ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে পথ অনুষ্ঠান শুরু করে  গ্রুপ সেঞ্চুরি । প্রথম থেকেই এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, নাট্যশিল্পী, আবৃত্তিকার । সাইক্লোস্টাইল প্রচারপত্রে সেদিন বলা হয়েছিল – ‘সাহিত্য সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ গ্রুপ সেঞ্চুরি ।’

১৯৮৩ সালে গ্রুপ সেঞ্চুরি  আগরতলা বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করে ‘গ্রুপ সেঞ্চুরির কবিতা’ নিয়ে ।  কবিতাপত্রে জোরালো দাবি ছিল ‘একটা খোলামেলা মেলা চাই।’  সেইবছর গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করে আরও একটি কবিতার যৌথ নিবেদন । বাংলা কবিতা, সঙ্গে কবিতার ইংরেজি অনুবাদ । যা পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল । ‘বাস্তবতা ও লেখকদের স্বাধীনতা’ এই শিরোনামে ১৯৮৫ সালে পাঠকদের সামনে গ্রুপ সেঞ্চুরি নিয়ে আসে বিশেষ গদ্য সংখ্যা । দক্ষিণ আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মোলাইসের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিকে সামনে রেখে গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করেছিল প্রচারপত্র । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক মুখপত্র ‘ধ্বনিপ্রান্তর’ আত্মপ্রকাশ ছিল একটি বিরাট ঘটনা ।  সেই অর্থে বলা যায়, গ্রুপ সেঞ্চুরি ছিল একটি প্ল্যাটফর্ম আর ধ্বনিপ্রান্তর ছিল সেই প্ল্যাটফর্মের মুখপত্র । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তার এক নিবন্ধে লেখেন – “‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ হঠাৎ করেই ১৯৭৯ সালের কোনও একদিন সৃষ্টি হয়ে যায়নি । গ্রুপ সেঞ্চুরি একটি দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ারই ফল এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে যার মূল কারিগর ছিলেন কবি নকুল রায় । আমাদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন তিনি । আমাদের প্রেরণার উৎস । ... ১৯৭৯ সালে নকুলদা  কলকাতা থেকে চিঠি লেখেন সন্তোষ রায়কে এবং আমাকে ।আমাদের কাছে আইডিয়াটা ছিল চমৎকার । রামেশ্বে ভট্টাচার্য, শুভেশ ও সুবিনয়ের সঙ্গে কথা বলে তার বাস্তবায়নের দিকে এগোলাম আমরা । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নামকরণ করলেন নকুল রায় । ’৮০-তে নকুলদা ফিরে এলেন আগরতলায় । কবিতাকে এবং শিল্পকলাকে মানুষের আরও নিবিড় নৈকট্যে নিয়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে নিজেদের আরও শানিত করে তোলাই ছিল গ্রুপ সেঞ্চুরির প্রাথমিক লক্ষ্য।” আবার ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে কবি নকুল রায় বলেন – “ আমাদের প্রতীক ছিল ‘পেঁচা’। পেঁচার দুই ডানা মেলা, উড়বে-উড়বে ভাব । ব্যাখ্যা করলাম এই প্রতীকের । সময়টা ছিল ভয়ঙ্কর । ঘরে বাইরে সর্বত্র অস্থির পদচারণা । রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙে ফেটে টুকরো হচ্ছে সব । হচ্ছে মূল্যবোধও । অস্তিত্ব রক্ষা করাই মুশকিল । নিশাচরদের উৎপাত বেড়েছে, দালালদের রমরমা । এই অশুভ অবস্থায় মানব পেঁচারা দিনে চুপচাপ, রাতের অন্ধকারে লুট- ধর্ষণ- জমি- দখল-ভাঙচুর চলছে সর্বত্র ।” আবার এই প্রসঙ্গকে আরও এগিয়ে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় তার স্মৃতিচারণায় লেখেন – “এত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল বলেই আমরা জানতাম সাফল্য আসবেই । আন্তরিকতা ও সহযোগী মনোভাবের ফলে গ্রুপ  সেঞ্চুরিয়ানদের উদ্যোগে এখনো যেকোনও সৃজনাত্মক উদ্যোগ সফল হয় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র বড় সাফল্য যেটি, তা হল নিরাশা হতাশা কাটিয়ে আশাবাদী করে তুলেছিল । সাহিত্যশিল্প তৎপরতার এটিই বিশেষ গুণ । কবিতায় উদ্বাস্তু নই এখন আর । শেকড় প্রোথিত প্রেরণায় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সফলতার যোগফল অনেক দীর্ঘ । প্রথমদিন থেকে আজ অব্দি, আজ থেকে আগামী দিনগুলির কর্মফল যোগ করতে হবে ।” 

  

“গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র যাবতীয় লেখালেখি এক মলাটে সংকলন ও  সম্পাদনা  করে সমৃদ্ধ করেছেন জ্যোতির্ময় দাস । ত্রিপুরার লেখালেখি নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারাই বুঝবেন এই সংকলনটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়েছে । আজও এর প্রভাব বহমান । 


গ্রন্থ ঃ গ্রুপ সেঞ্চুরি

সংকলন ও সম্পাদনা -- জ্যোতির্ময় দাস 

প্রকাশক -- ‘পূর্বমেঘ পাবলিকেশন’

আগরতলা 

মূল্য – ৬০০ টাকা   

  

 

 

                 আলোচনা – তমালশেখর দে

 

 

আটের দশকে ত্রিপুরায় সাহিত্য সংস্কৃতিতে এক আলোড়ন তুলেছিল ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’।যদিও মূলত  এর কর্মকাণ্ড   আগরতলাকেন্দ্রিকই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । কিন্তু এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল  ত্রিপুরার সাহিত্য মননে । সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে, প্রসারে ও প্রচারে গ্রুপ সেঞ্চুরি যে ভূমিকা নিয়েছিল তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে । সেই  গ্রুপ সেঞ্চুরি-র ইতিহাস,প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকে একত্রিত করে সংকলন ও  সম্পাদনা  করেছেন ত্রিপুরার তরুণ গবেষক- আলোচক জ্যোতির্ময় দাস । “গ্রুপ সেঞ্চুরি” গ্রন্থের ‘ কিছু কথা’-য় তিনি লিখছেন – “... সেই ১৯৮০ সালের কথা । ত্রিপুরার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় সময় । মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ভিত ভেঙে হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরার আকাশ বাতাস । সেই সময় সুস্থ সাহিত্য সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচারে পথে নেমে পড়েন কয়েকজন তরুণ । সম্মিলিত এই প্রয়াসের নাম দেওয়া হলো “গ্রুপ সেঞ্চুরি’।” ১৯৮০ সালের ২৮ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে পথ অনুষ্ঠান শুরু করে  গ্রুপ সেঞ্চুরি । প্রথম থেকেই এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, নাট্যশিল্পী, আবৃত্তিকার । সাইক্লোস্টাইল প্রচারপত্রে সেদিন বলা হয়েছিল – ‘সাহিত্য সংস্কৃতির খোলামেলা মুক্ত আকাশ গ্রুপ সেঞ্চুরি ।’

১৯৮৩ সালে গ্রুপ সেঞ্চুরি  আগরতলা বইমেলায় আত্মপ্রকাশ করে ‘গ্রুপ সেঞ্চুরির কবিতা’ নিয়ে ।  কবিতাপত্রে জোরালো দাবি ছিল ‘একটা খোলামেলা মেলা চাই।’  সেইবছর গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করে আরও একটি কবিতার যৌথ নিবেদন । বাংলা কবিতা, সঙ্গে কবিতার ইংরেজি অনুবাদ । যা পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল । ‘বাস্তবতা ও লেখকদের স্বাধীনতা’ এই শিরোনামে ১৯৮৫ সালে পাঠকদের সামনে গ্রুপ সেঞ্চুরি নিয়ে আসে বিশেষ গদ্য সংখ্যা । দক্ষিণ আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মোলাইসের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টিকে সামনে রেখে গ্রুপ সেঞ্চুরি প্রকাশ করেছিল প্রচারপত্র । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক মুখপত্র ‘ধ্বনিপ্রান্তর’ আত্মপ্রকাশ ছিল একটি বিরাট ঘটনা ।  সেই অর্থে বলা যায়, গ্রুপ সেঞ্চুরি ছিল একটি প্ল্যাটফর্ম আর ধ্বনিপ্রান্তর ছিল সেই প্ল্যাটফর্মের মুখপত্র । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তী তার এক নিবন্ধে লেখেন – “‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ হঠাৎ করেই ১৯৭৯ সালের কোনও একদিন সৃষ্টি হয়ে যায়নি । গ্রুপ সেঞ্চুরি একটি দীর্ঘ প্রতিক্রিয়ারই ফল এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে যার মূল কারিগর ছিলেন কবি নকুল রায় । আমাদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন তিনি । আমাদের প্রেরণার উৎস । ... ১৯৭৯ সালে নকুলদা  কলকাতা থেকে চিঠি লেখেন সন্তোষ রায়কে এবং আমাকে ।আমাদের কাছে আইডিয়াটা ছিল চমৎকার । রামেশ্বে ভট্টাচার্য, শুভেশ ও সুবিনয়ের সঙ্গে কথা বলে তার বাস্তবায়নের দিকে এগোলাম আমরা । ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নামকরণ করলেন নকুল রায় । ’৮০-তে নকুলদা ফিরে এলেন আগরতলায় । কবিতাকে এবং শিল্পকলাকে মানুষের আরও নিবিড় নৈকট্যে নিয়ে যাওয়া, সেইসঙ্গে নিজেদের আরও শানিত করে তোলাই ছিল গ্রুপ সেঞ্চুরির প্রাথমিক লক্ষ্য।” আবার ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ নিয়ে কবি নকুল রায় বলেন – “ আমাদের প্রতীক ছিল ‘পেঁচা’। পেঁচার দুই ডানা মেলা, উড়বে-উড়বে ভাব । ব্যাখ্যা করলাম এই প্রতীকের । সময়টা ছিল ভয়ঙ্কর । ঘরে বাইরে সর্বত্র অস্থির পদচারণা । রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙে ফেটে টুকরো হচ্ছে সব । হচ্ছে মূল্যবোধও । অস্তিত্ব রক্ষা করাই মুশকিল । নিশাচরদের উৎপাত বেড়েছে, দালালদের রমরমা । এই অশুভ অবস্থায় মানব পেঁচারা দিনে চুপচাপ, রাতের অন্ধকারে লুট- ধর্ষণ- জমি- দখল-ভাঙচুর চলছে সর্বত্র ।” আবার এই প্রসঙ্গকে আরও এগিয়ে গিয়ে কবি সন্তোষ রায় তার স্মৃতিচারণায় লেখেন – “এত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল বলেই আমরা জানতাম সাফল্য আসবেই । আন্তরিকতা ও সহযোগী মনোভাবের ফলে গ্রুপ  সেঞ্চুরিয়ানদের উদ্যোগে এখনো যেকোনও সৃজনাত্মক উদ্যোগ সফল হয় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র বড় সাফল্য যেটি, তা হল নিরাশা হতাশা কাটিয়ে আশাবাদী করে তুলেছিল । সাহিত্যশিল্প তৎপরতার এটিই বিশেষ গুণ । কবিতায় উদ্বাস্তু নই এখন আর । শেকড় প্রোথিত প্রেরণায় । গ্রুপ সেঞ্চুরি-র সফলতার যোগফল অনেক দীর্ঘ । প্রথমদিন থেকে আজ অব্দি, আজ থেকে আগামী দিনগুলির কর্মফল যোগ করতে হবে ।”

 

“গ্রুপ সেঞ্চুরি”-র যাবতীয় লেখালেখি এক মলাটে সংকলন ও  সম্পাদনা  করে সমৃদ্ধ করেছেন জ্যোতির্ময় দাস । ত্রিপুরার লেখালেখি নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারাই বুঝবেন এই সংকলনটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়েছে । আজও এর প্রভাব বহমান ।

 

গ্রন্থ ঃ গ্রুপ সেঞ্চুরি

সংকলন ও সম্পাদনা -- জ্যোতির্ময় দাস

প্রকাশক -- ‘পূর্বমেঘ পাবলিকেশন’

আগরতলা

মূল্য – ৬০০ টাকা  

  

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...