ওস্তাজ বিসমিল্লাহ খান পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ নাট্যব্যক্তিত্ব শুভজিৎ বন্দোপাধ্যায় থিয়েটার নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন নিজের স্বতন্ত্র আঙ্গিকে । আজ তার সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
--
"থিয়েটার কতটা সময়োপযোগী হল তার ওপরেই নির্ভর করে তার সাফল্য।"
প্রশ্ন ঃ সময়, থিয়েটার এবং সাফল্য – এই ত্রয়ী শব্দবন্ধ আপনার সামনে রাখলে, আপনি কীভাবে এদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ থিয়েটার সব সময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে বর্তমানকে দেখেছে। থিয়েটার কেন? যে কোনো শিল্পই তাই। সেই কারণেই শিল্পী বর্তমানকে সাধারণের চেয়ে বেশি কাটা ছেড়া করতে পারে। থিয়েটার যেহেতু তিলোত্তমা শিল্প এবং নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম, তাই তার দায় সময়কে চোখে চোখ রেখে চিনিয়ে দেওয়া। তার নকল পোশাক খুলে নগ্ন করে তাকে বিচার করে। মানুষের সামনে বিবেচনার কাটগড়ায় তাকে তুলে আনা। যাতে করে সময়ে কথা বলতে দেরি না-হয়ে যায়। সেই সাহস থিয়েটার দেখিয়ে এসেছে বহুকাল।
এর পর যদি আসে ‘সাফল্য’- শব্দটা! তবে আমার মতে সেটি সাবজেকটিভ। কোন শিল্প কিসে সফল সেটি কোনো এক বা একশো জন নির্ধারণ করতে পারে না। পারে সেই সময়। এবং সেটি সেই মুহূর্তে টের পাওয়া যায় না । পাওয়া যায় শিল্প সৃষ্টির বহু কাল পরে, যখন তার তাৎক্ষণিক রেশ কেটে যায়। হৈ চৈ, প্রচার, উন্মত্ততা থেমে যায়। কারণ সেসব ম্যান-মেড। অনেকটা সময় পেরোলে যে শিল্প জীবন্ত, সেই শিল্পই চিরকালীন। যার অনুরণন সময়, কালের বেড়া টপকে সহজেই ঢুকে পড়ে সমসময় নামক রাস্তায়, সেই শিল্পই সফল। যা হিট করে একেবারে মনের গভীরে। যেমন রবি ঠাকুর, যেমন জীবনানন্দ, যেমন ভ্যান গগ, যেমন চার্লি চ্যাপলিন।
বিভূতিভূষণ এর শেষ জীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্যে কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর একটা ' পথের পাঁচালী ' সৃষ্টি হয়নি। বা ভিনসেন্টের প্রায় সব ছবিই বিখ্যাত হয় তার মৃত্যুর পর। কোন সাফল্য আসলে আমাদের সফল বানায়? যা আমরা চোখে দেখি নাকি যা অনুভব করি ? শিল্পের সাফল্য অনুভূতিতে। সৃষ্টিতে। কোনো থিয়েটার মানুষ না দেখলে সেটা ব্যর্থ এমনটা ভাবার কারণ আমি দেখি না। কারণ ওই যে প্রথমেই বললাম শিল্প সাধারণের থেকে অনেক এগিয়ে দেখে ও ভাবে।
প্রশ্ন ঃ নাটক একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা লোকশিক্ষা বা জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারে। --- একজন উদীয়মান তরুণ নাট্য নির্দেশক হিসেবে আপনি বিষয়টাকে কীভাবে মূল্যায়ন করতে চাইবেন?
উত্তর ঃ নাটক যেহেতু জীবন্ত তাই সে সতেজ। তার ক্ষমতা ওই খানেই। তার সতেজতা, সরলতায় ও স্বচ্ছতায়। থিয়েটার আসলে আপাতত দৃষ্টিতে একটি বিনোদন মাধ্যম হলেও তার ব্যবহার হয়েছে সমাজের কথা তুলে ধরতে। সময়কে সে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যা দেখতে পায় সেটি সে সরাসরি বলতে চায়। জনগণকে অন্ধকারে বসিয়ে রাখলেও সে মঞ্চের আলো প্রবেশ করাতে চায় দর্শকের মনে ও মাথায়। থিয়েটার পারে এবং থিয়েটারের সেই নৈতিক দ্বায় আছেও। যেকোনো শিল্প একটি দর্শনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। থিয়েটারের দর্শন তার বাস্তবতায়। আমাদের দেশের থিয়েটার তথা গোটা পৃথিবীর থিয়েটার তাই করেছে। আমরা হয়তো সেই থিয়েটারকে ' সামাজিক বা রাজনৈতিক ' নাম দিয়ে ভাগ করতে চেয়েছি, কিন্তু শিল্পের কোনো জাত হয় কি ? লালন বা পিট সিগার অথবা শ্রী চৈতন্য! শিল্প আমার কাছে আসলে সাধনা । মানব সাধনা। থিয়েটারও তাই করে। পরাধীন ভারতে ১৮২৯ এ যখন সতীদাহ বন্ধ হলো সেই সময় এই সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছে থিয়েটার। ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি ' উপেন্দ্রনাথ দাস ' লিখেছে ' গজানন্দ ও যুবরাজ ' লেখা হচ্ছে ১৮৬০ সালে ' নীল দর্পণ '। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নির্মাণ করছে ' ন্যাশনাল থিয়েটার ' । ব্রিটিশ সরকার ভয়ে ১৮৭৬ সালে নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে থিয়েটার বন্ধ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বার্টল্ট ব্রেক্ট, পিস্কাটার, রোমা রোলাঁ গর্জে উঠছেন। ভারতেও মুন্সী প্রেম চাঁদ এর নেতৃত্বে লেখকরা মিলিত হচ্ছেন এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। এর পরবর্তীতেও বহুবার স্বাধীন ভারতেও রাষ্ট্রের ও সমাজের চোখ রাঙানিকে তোয়াক্কা করেনি থিয়েটার। শুধু শহর না, গ্রাম বাংলার লোকনাট্য যেমন - আলকাফ, গম্ভীরা, বন বিবির পালা ইত্যাদি নির্মিত হয় সামাজিক সমস্যা কে কেন্দ্র করেই। ব্রাজিলের আগস্তু বোয়ালের ' থিয়েটার অফ দ্যা অপ্রেসড ' সরাসরি একটি গণ আন্দোলনের কাজ করে। ফলে থিয়েটার লোকশিক্ষা ঘটায় এ-কথা হলফ করে বলা যায়।
প্রশ্ন ঃ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নাটকে প্রতীকের পাশাপাশি আমরা নিত্যনতুন কোরিওগ্রাফি, সিনোওগ্রাফির কত রকম প্রয়োগ দেখছি। ঠিক এই সূত্রকে মাথায় রেখে নাটকে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য ভাবনার যুক্তি-তর্ককে আপনি ঠিক কীভাবে অতিক্রম করেন ? কিংবা মেলাতে চাইবেন ?
উত্তর ঃ আমি কোনো ভাবনাকেই প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য এভাবে আলাদা করে দেখি না। আমার কাছে থিয়েটার একটি দৃশ্য-শ্রাব্য শিল্প। তাই শিল্প নির্মাণেও তাকে বিশ্বাসযোগ্য এবং দৃশ্যত সুন্দর করে তুলতে যা প্রয়োজন সেটি প্রয়োগ করা যেতেই পারে। সেই প্রয়োগ একেবারেই নির্মাতার শিল্পকে দেখা, নাটক বা টেক্সটকে বোঝা এবং তার যে-রস তিনি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান, তিনি যেভাবে সেটাকে দেখানে বা ভাবাটে চান সেটি একেবারেই সেই নির্মাতার নিজস্ব নির্বাচন। একটি শিল্প বা সাহিত্যকে অনুধাবন করা ও তার শৈল্পিক নির্যাস বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন রকম হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। সেখানেই শিল্পের সার্থকতা। এর কোনো মান দণ্ড হতে পারে না। একটি ক্যানভাসের আঁকার সঠিক অর্থ চিত্রকর ছাড়া কেউ খুঁজে পাবেন না এবং সেটি বিভিন্ন দর্শকের কাছে বিভিন্ন মনে পৌঁছাবে। এটাই শিল্পের বহুমুখী দিক।
আমরা যেহেতু মূলত বিদেশের ধার করা প্রসেনিয়াম থিয়েটার চর্চায় দীর্ঘদিন অভ্যস্ত তাই পাশ্চাত্যের ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক। এতে আমি কোনো দোষ দেখি না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে থিয়েটারের প্রয়োগ যখন তার বিষয় কে ছাপিয়ে যায় তখন থিয়েটার যার কিনা মূল লক্ষ জন সংযোগ বা কমিউনিকেশন, কিছু কথা পৌঁছে দেওয়া বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে , তখন তার লক্ষ সে হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন শুধু প্রাণহীন পোশাক পড়ে থাকে। তাই লেখা, অভিনয় ও প্রয়োগ এই তিনের বণ্টন এবং ভারসাম্য রাখাটাই মূল কথা।
প্রশ্ন ঃ “থিয়েটার শরীরের ভিতর 'ডোপামিন' ক্ষরণ ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না” – আপনারই একটি মৌলিক চিন্তাসূত্র । এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন !
উত্তর ঃ সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমের একটি পোস্টে এই কথাটি আমি লিখি। আসলে থিয়েটার বা নাটক এই দুইয়ের সাথেই দুটি বিশেষণ খুব সহজেই যোগ করা যায়। এক ' গুরুগম্ভীর বিষয় ' যাকে সহজ বাংলায় আতলামো বলে। আর দুইই অবমাননা সূচক। ' নাটক ' শব্দের সাথেই মিথ্যা আর অপমানের একটা সম্পর্ক আছে। তাই এই শিল্প এতো প্রাচীন হয়েও জনবিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক। আমরা একটা কাঁচের ঘরে থিয়েটার নামক শিল্পকে ভরে রেখেছি, পুজোর বিগ্রহের মত করে। সাধারণ যাকে ভয় পায় বা অবজ্ঞা করে। আর কিছু সংখ্যক মানুষ থিয়েটারকে একটা কালচারাল প্রাকটিস মনে করেন। যেমন - একটা রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন বা দুটি ভাষা দিবস উদযাপন আবার একটা সরস্বতী পুজো, এই সব। কিন্তু থিয়েটার একটা যাপনের নাম। যেকোনো মৌলিক শিল্পই তাই। কালচার আর শিল্প তাই এক নয়।
আমি বরাবরই শিল্পকে একটা খেলার মত করে দেখে এসেছি ও ভালোবেসেছি। যাকে আমি ভয় পাইনি, জড়িয়ে ধরতে চেয়েছি। আমি তাকে পুজোর আসনে বসাইনি বা থিসিস পেপারের মলাটে মুড়িয়ে রাখিনি। নাটক অর্থে প্লে যার বাংলা অর্থ খেলা। খেলা আমাদের শরীর ও মন কে একসাথে উত্তেজিত করে। চনমনে করে তোলে। স্ফূর্তি যোগায়। ডোপামিন আমাদের শরীরের একটি হরমোন যার ক্ষরণ আমাদের আনন্দ যোগায়, এক্সাইট করে। এই থিয়েটার যদি প্রাথমিক ভাবে ভিতর থেকে আমাদের আনন্দ না-দিতে পারে, আমাদের চারপাশের কঠিন সময়কে কাটানোর ইতিবাচক সহজ ফুর্তি না-যোগায় তবে এই অন্ধকারকে কাটিয়ে ওঠার কথা কিভাবে হাসি মুখে বলবো ? আমরা হাসবো তবেই তো সেটি জারিত হবে অন্যের মনে। আমরা যখন থিয়েটার করতে আসি, তখন নিছক ভালো লাগা থেকেই আসি। একটা আকর্ষণ যা আমাদের টেনে রাখে, ওই ভালোলাগাটাই বিশুদ্ধ। থিয়েটার আসে ওটাই পারে। একটা নেশার মত যা সব ভুলিয়ে আপনাকে মঞ্চে সবার সামনে দাঁড় করায়। সব কষ্ট, যন্ত্রণা ভুলিয়ে আলোর নীচে রাজার মত শক্তিমান করে তোলে। এটাই থিয়েটারের ম্যাজিক। থিয়েটারের কাজ ওই খোঁচাটা দেওয়া যা আজও আমাকে মাঠ চষে ফুটবল খেলার মত বা পাখির দৃষ্টি নিয়ে একমনে দাবার ছক ভাঙার আনন্দ দেয়। আমায় রক্ষণশীল না, স্বাধীন করে। ঠিক যেমনটা রবি ঠাকুরের অমল ওষুধ চায় না, চায় খোলা জানলার বাইরে ধ্রুব তারাটি চিনতে, তেমনটা।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার সাথে নাটক নিয়ে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ।বহু নাটক পরিকল্পনার সাথে আপনি সরাসরি জড়িয়ে ছিলেন । আছেনও । কেমন সম্ভাবনা দেখছেন ?
উত্তর ঃ আমি মূলত ২০১৬ সালের পর থেকে নিয়মিত ত্রিপুরায় আমার থিয়েটার নিয়ে আসা বা বিভিন্ন দলের সাথে যুক্ত হতে পেরেছি। তার জন্য মূলত আমি মণিদীপ দাসকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি ত্রিপুরায় ৩টি দলের সাথে মোট ৬-৭টি নাটকে বিভিন্নভাবে যুক্ত থেকেছি। মূলত আমায় যেটা আকর্ষণ করেছে সেটি হলো আবেগ। যেহেতু ওই আগের উত্তরের মত থিয়েটার আমাদের মনে যে আনন্দ যোগায় সেটি থিয়েটারের সাথে আমাদের সম্পর্ককে আরো গাঢ় করে। তৈরী হয় আবেগ। যা আমাদের দূরে যেতে দেয় না। ত্রিপুরা আমাদের দেশের একটি প্রান্তে অবস্থিত এক পাহাড়ি রাজ্য। যা বহু শহুরে সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আধুনিকতা শব্দটি শুনতে বা বলতে সহজ হলেও জীবনে তার প্রয়োগ কঠিন। সেই ক্ষেত্রেও খানিক পিছিয়ে থাকলেও এই আধুনিক সময় ও ব্যবস্থাকে অর্জন করার প্রবল ইচ্ছে ও চেষ্টা মানুষকে অনেকটা এগিয়ে দেয়। আমি মূলত ধর্মনগর শহরেই বেশির ভাগ কাজ করেছি এবং দেখেছি নাট্য চর্চাকে নিয়ে মানুষের উন্মত্ততা। পেশাদারী না হয়েও একটি নাটকে অভিনয়ের জন্য যে শ্রম শিল্পীরা করেন সেটি সত্যি কুর্নিশ যোগ্য। এখানে সম্ভাবনা কম পেশাদার থিয়েটার শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকার যা গোটা দেশের প্রায় একি। তাও এই শহর বা এই রাজ্যে নাট্য শিল্পকে কোনো অর্থেই অবহেলা করেনি। নিজের পেশার বাইরে নিষ্ঠা ও আগ্রহ দেখিয়েছে বারবার। দেখার সুযোগ হয়তো কম তাই গোটা দেশ বা পৃথিবীর থিয়েটারের বিবর্তনের গতি ধরতে পারা যায় না এই রাজ্যের নাট্য চর্চায়। তবে সেই গতি বা পরিবর্তনকে জানার চেষ্টা তারা করে চলেছে। সর্বত্রই শিল্পের পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা হবে, কিন্তু শিল্প তার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালাবে। আশা করি আগামীতে এই রাজ্যের নাট্য প্রেমী দর্শক ও শিল্পীরা খোলা মনে এই নাট্য শিল্প চর্চা করবেন। কারন যা স্থবির তা মৃত। নতুন মৌলিক নাটকের অভাব লক্ষ করেছি। মৌলিক ভাবনার সাহস জোগাতে হবে আরও। দর্শক শিল্পকে নির্বাচন করবে না, শিল্প দর্শকের মন তৈরী করবে। তাদের স্বাদ বদল করবে। বোকা বাক্স থেকে টেনে আনবে। নতুন কিছু করবে। এটাই যেন লক্ষ হয়। তবেই এই শিল্প সমৃদ্ধ রাজ্যে দেশের মানচিত্রে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
প্রশ্ন ঃ জেন-জি বা অথবা এর পরবর্তী জেনারেশন আগামীতে নাটক দেখতে থিয়েটারে আসবে, তাদের আসতেই হবে, এই বিশ্বাসটা মনের ভিতর পোষণ করেন ? কোন বিশ্বাস থেকেই বা করেন ?
উত্তর ঃ জেনারেশন- Z বা পরবর্তী আলফা জেনারেশন যার একটা অন্য সময়ের মধ্যে বড় হচ্ছে তাদের এই বেড়ে ওঠার শিল্প বিষয়টার মনে বদলাচ্ছে। রিলস, স্টোরি, ভ্লগ ইত্যাদি যেখানে বিনোদনের কেন্দ্র সেখানে থিয়েটারের মত শিল্প যা মনন এর সাথে যুক্ত সেটি কতটা প্রাসঙ্গিক থাকবে সেটা বলা মুশকিল।
তবে জীবন্ত শিল্প চিকালীন। বাকি সবই ক্ষণস্থায়ী। তাই মানুষ যেমন তার ইতিহাস খুঁজতে চাই তেমনই মানুষের সংস্কৃতির শিকড়ের প্রয়োজন একদিন হবেই। সেদিনও এই থিয়েটার নামন কর্মকান্ডটি একই ভাবে চলবে। মানুষ নাটক দেখবেন তার নিজের তাগিদেই। নতুন সমাজ বা প্রজন্ম এখনো দল বেঁধে থিয়েটার দেখে। অভিনয় করে মঞ্চে। সব সময়ই থিয়েটার এই অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে এসেছে নিজের শিকড়ের জোরেই। আগামীতেও তাই ঘটবে বলেই আমার বিশ্বাস। যতদিন মানুয়ের হুসটা আছে, চেতনা, আবেগ আছে তত দিন শিল্প আছে।
প্রশ্ন ঃ “থিয়েটার শাইন” মানে আপনার নাট্য দলের “পোস্টমাস্টার” দেখে আমরা একপ্রকার হতবাক । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই একই গল্প । কিন্তু আপনার সে-কি অসাধারণ আঙ্গিক,বিনির্মাণ কৌশল দেখলাম! এখানে একটা প্রশ্ন, আপনি বড় মঞ্চে নাটক উপস্থাপনা বা প্রযোজনা থেকে নিজেকে গুঁটিয়ে রাখেন কেন ? এর পেছনের সাইকোলজিটা যদি একটু খুলে বলতেন !
উত্তর ঃ আলাদা কোনো মনন নেই। বড় মঞ্চে কাজ করি তবে বড় স্কেলে আমার একটু ভয় লাগে। বড় অভিনেতা, বড় সেট, বড় কাস্টিং ইত্যাদি আমি একটু ভয় পাই কারণ যেহেতু এটা একটি কম্পোজিট আর্ট তাই সবটা সমান ভাবে সামলানো কঠিন। আর একটি বিষয় হলো স্পেস। ছোটো ইন ফরমাল স্পেস আমায় একটু বেশি টানে, তার কারণ সেখানে কোনো গ্রামার নেই। কোনো নির্দিষ্ট ছক নেই। প্রসেনিয়ামে যা আছে। আমার মঞ্চে নিজেকে পরাধীন মনে হয়। ভাঙার স্কোপ বা সুযোগ কম। অনেক প্রাযুক্তিক ঝামেলা আছে। কিন্তু একটা বাড়ির বারান্দা, একটা গাড়ির গ্যারেজ, একটা ছাদ বা উঠোন বা কোনো স্টুডিও থিয়েটার আমার একটা আবিষ্কারের সুযোগ দেয় সেই স্পেস্টাকে, যাকে আমি চিনি না। প্রেমিকাকে পুরোপুরি আবিষ্কার করে ফেললে সেই অপূর্ণ প্রেমের উত্তেজনা থাকে না। ছোটো অন্য রকম স্পেসকে নেড়ে-চেড়ে, দেখতে মজা লাগে। ওই ডোপামিন ক্ষরণ হয় আরকি। তবে যে কোনো থিয়েটার নির্মাণ তার স্পেসের উপর নির্ভর করে। বিদেশে যেমন একটি থিয়েটারের জন্য একটি নতুন স্পেস নির্মাণ করা হয়। যেখানেই সেই নাট্য অভিনয় হয় অন্য কোথাও না। এমনটাই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। পোস্ট মাস্টার তেমনি একটি চেষ্টা।

No comments:
Post a Comment