Friday, July 4, 2025

"আমি এ-জীবন মা-মানসা’র গান গেয়েই অতিবাহিত করতে চাই।" -- ওঝা স্বপন কুমার পাল

 

মনসামঙ্গল পালা গানআমাদের বাঙালী ঐতিহ্যে  এক মৌলিক প্রাপ্তি বিশেষত্ব পূর্ববঙ্গের নদীর মত সর্পিল ঘনঘটায় তার সংস্কৃতি নতুন এক মাত্রা বহন করেবিচিত্র রাগ-রাগিনির ভিতর তার গ্রামীন চলন আজ গায়ন স্বপন কুমার পাল (ওঝা)- সাথে ঘনিষ্ঠ আলোচনায় তমাল শেখর দে  

"আমি এ-জীবন মা-মানসা’র গান গেয়েই অতিবাহিত করতে চাই।" 

 

প্রশ্ন আপনার এইমনসামঙ্গল পালা গান’-এর জগতে আসার প্রাথমিক শুরু নিয়ে আমাদের কিছু  বলুন?

উত্তর আসলে আমি বড়ই হয়েছি মনসামঙ্গলের পালা গান শোনতে শোনতে আমার  বাবা সমরেন্দ্র পাল একাধারে বাইন গাইন ছিলেন আমার দাদুও সেই সময় খুব নামকরা ওঝা ছিলেন আমি দাদু-বাবাকে সারা জীবন মা-মনসার ধ্যান-জ্ঞানে ডুবে থাকতে দেখেছিফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত ছিলাম কিন্তু বাবা ছোটবেলাই আমাকে শেখাননি আমরা এখনো বিশ্বাস করি, মা-মনসার আদেশ ছাড়া কেউ এই গান শিখতে পারে না বাবা হঠাৎ একদিন ডেকে আমাকে তোর দ্বারা হবে তুই গান গা !’ সেই থেকে শুরু তিনি শেখালেন, আমিও ম্ন দিয়ে শিখলাম পরে স্বপ্নেও আমি মায়ের আদেশ পাইএরমধ্যে বাবা দেহত্যাগ করলেন মা আবার আদেশ দিলেন, ‘এখন তুই গা !’ এখনো গাইছি আটারো বছর হতে চললো  

 

প্রশ্ন আপনি কোন পূঁথি অনুসরন করে থাকেন ? এর কোন বিশেষ কারণ ছিল

কি ?

উত্তর আমি মূলত কবি চৈতন্যচরণ পাল-এর গান গাই তাঁর ভাষা, রচনা-শৈলী সহজ- সরল উপস্থাপনা আমার খুব ভালো লাগে গাইতেও খুব সুবিধা হয়আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে  বিশ্বাম্বর নাথ-এর বই, দ্বিজ বংশী,বাইশ কবি এভাবে সবার পালা থেকেও গ্রহন করে থাকিযা আমার মনে হয়  পালা উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে ভালো  হবে চৈতন্যচরণ পাল এবং বিশ্বাম্বর নাথ ছিলেন আমাদের -দিকের আঞ্চলিক কবি ফলে তাদের ভাষা খুব সহজে শ্রোতারা বোঝতে এবং গ্রহণ করতে পারে    

প্রশ্ন আমাদের -দিকের আঞ্চলিক কবি বলতে

উত্তর কবি চৈতন্যচরণ পাল ত্রিপুরাতে বহুদিন ছিলেনজীবনের শেষ কিছুদিন তিনি আসামের নিলামবাজার- ছিলেনআর বিশ্বাম্বর নাথ তো ছিলেন পানিসাগর-এর লোক তাঁকে আমি নিজেও দেখেছি

প্রশ্ন বাইশ কবি বা রাধা নাথ-এর পুঁথি থেকে কেন পড়েন না ?

উত্তর এই পুঁথির পালা অনেক বড় বড় আমাদের ওজাদের পক্ষে এক আসরে শেষ করা সম্ভব হয় নাএই সমস্যা আবার বাকি দুজনের ক্ষেত্রে হয় নাহবিগঞ্জের ওঝারা বেশি রাধা নাথের পূঁথি পছন্ করে এভাবেই যার পক্ষে যেটা সুবিধাজনক 

প্রশ্ন মনসামঙ্গল গানে কি কি ধরণের বাদ্যযন্ত্র আপনারা ব্যবহার করে থাকেন ?  পুরোনো ধারার সাথে আধুনিক য্ন্ত্র ব্যবহার করার কথা কখনো ভেবে দেখেছেন ?

উত্তর আমি আমার পালা গানে  প্রথাগত  কর্তাল এবং পাখোয়াজ ব্যবহার করে থাকি এটাই মূলত এর বাদ্যযন্ত্র হবিগঞ্জীরা হারমোনি, ঢোল- ব্যবহার করে আজকাল আবার অনেক ওঝারা এর সাথে  আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার  করা শুরু করেছেন তবে আমি এর পক্ষপাতি নই

প্রশ্ন কেন ?

 উত্তর কি জানি ! আমার ভালো লাগে না না-গেয়ে , না-শোনে বাদ্যযন্ত্রের জটিলতায় কোথায় যেন ভক্তি-টা হারিয়ে যায় বলেই আমার মনে হয়

প্রশ্ন গুরমি এবং বাইন মনসামঙ্গল পালার এক অবিচ্ছিন্ন অংশএই যে সর্পিল ভঙ্গিমায় নাচএই নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর গুরমি এবং বাইন একে অপরের পরিপূরক বাইনের বাজনার উপর যেমন গুরমির নাচ নির্ভর করে তেমনি যদি একজন  ভালো গুরমির উপরে  বাইনের বাজনা নির্ভর করে লাচাড়ীর শেষ পর্যায়ে যখন নাম-পদ আসে তখন গুরমিনাগ প্যাঁচনৃত্য-টা সর্পিল ভঙ্গিমায় করে থাকে তাছাড়া ত্রিপদী ছন্দে বা যখন দিশা গাই  তখন লাচাড়ী শেষে ঝুমুর আসে তখনও গুরমিনাগ প্যাঁচনৃত্য করে থাকেএর সাথে যদি আরও  কোনো গভীর সম্পর্ক থেকে থাকে, তা আমার জানা নেই   

প্রশ্ন মনসামঙ্গল পালা গানের সময় আপনারা যে পোষাক পরিধান করেন তার কোনো নিজস্বতা আছে ?

উত্তর এই পোষাক সম্পূর্ণ আলাদা ঢং-এর মাথায় পাগড়ী, কোমরে ঘাঘরার উপর আড়াই হাত কাপড়ের ঘের হয়ে থাকে বাবা বলেছেন, এটা আমাদের দেহের  বৃহদন্ত্রের সমান কাপড় থাকবে একুশ হাত এবং তাকে আড়াই হাতের মধ্যে বেষ্টনী দিতে হ্য় ।।মাথায় পাগড়ী-টাও আড়াই হাত প্যাঁচের হয়ে থাকেবসুমাতাকে বন্ধন করে বাঁধা হয়ে থাকেআমরা ওঝারা একে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি

প্রশ্ন : চামর-এর সাথে একজন ওঝার সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন?  

উত্তর চামরযতক্ষণ ওঝার হাতে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত পোষাক পরিপূর্ণ হয় না চামরের ভিতরেই মা-মনসার অবন্থান এবং আর্শীবাদ থাকে তখন সে মায়ের অধীনে চলে যায় বলেই আমরা মনে করি ।আমার কাছে যে চামর আছে তার বয়েস প্রায় দুশো বছর। আমি পঞ্চম পুরুষ এটা বহন করছি ।বংশ পরম্পরায় এটা হস্তান্তরিত হয় ।এবং এটাকে আমরা জীবন্ত বলে বিশ্বাস করি ।

 

প্রশ্ন ঃ সাপের সাথে আপনাদের সম্পর্ক-টা কেমন ?

উত্তর ঃ সাপ তো মায়েরই সন্তান।সেই অর্থে আমরা তো ভাই-ভাই সম্পর্ক মনে করি। ফলে আমরা এত ভয় পাই কম।বরং দেখলেই নমস্কার করি ।সাপ মারাটা ঠিক নয়সঠিক অর্থে সাপ তো উপকারি প্রাণী ।      

প্রশ্ন : আপনি কি কাউকে মনসামঙ্গল পালা শেখাচ্ছেন কিংবা শেখার আগ্রহ নিয়ে কেউ আসে আপনার কাছে ?

উত্তর ঃ আমি দুই জনকে শিখিয়েছি।তাদের বাবা-মায়ের ইচ্ছেতেই। আসলে মনসামঙ্গল গান কোন অভিভাবক তাদের ছেলেমেয়েদের শিখাতে উৎসাহ বোধ করেন না, বরং ভয় পান। আমরাও মনে করি, যার প্রতি মা-য়ের কৃপা হয়, সেই এই গান শেখার অধিকার পায়। আমার দুই ছেলের কেউ শেখেনি। আমি জোর করিনি।

প্রশ্ন ঃ তবে কি হারিয়ে যাবে ?

উত্তর ঃ নিশ্চয়ই না! হারিয়ে যাবার হলে এতদিনে হারিয়ে যেত।এখন তো আমাদের সরকারী অনেক অনুষ্ঠানেও ছোট করে  মনসামঙ্গল পালা গাওয়া হয়। তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর-এর উদ্যোগে ২০১১ সালে সারা ত্রিপুরা মনসামঙ্গল পালা গান নিয়ে যে প্রতিযোগিতা হয়েছিল তাতে আমার দল প্রথম হয়েছিলপ্রয়াত মন্ত্রী অনিল সরকার আমাকে কাছে বসিয়ে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন।যা আমার কাছে আজও প্রেরণা হয়ে আছে।

 প্রশ্ন ঃ মনসামঙ্গল নিয়ে আর  কোন কথা ...

উত্তর ঃ কথা তো অনেক। তবে সংক্ষেপে বলবো, মায়ের কৃপা যখন হয়েছে আমার উপর ,তখন আমি এই জীবন মা-মানসা’র গান গেয়েই  অতিবাহিত করতে চাই। এটাই আমার একান্ত ইচ্ছা । জয় মা মনসা ... 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...