Friday, July 4, 2025

“ভাস্কর্য আমার রক্তে, আর চলচ্চিত্র আমার মননে।” -- চলচ্ছিত্রকার মনেট সাহা

 





তরুণ চলচ্ছিত্রকার  মনেট সাহা ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এক সম্ভাবনার নাম তাঁর কিছু কাজ ইতিমধ্যেই মুগ্ধতা কুড়িয়েছে অনেকের আজ তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে

 

“ভাস্কর্য আমার রক্তে, আর চলচ্চিত্র আমার মননে।”

 

প্রশ্ন    ভাস্কর্যচর্চা বলতে গেলে আপনার রক্তে মজ্জাগত তাই প্রথমেই জানতে চাইবো ভাস্কর্য থেকে চলচ্চিত্র জগতে চলে আসার পেছনের মূলগত তাগিদটা কী ছিল ?

উত্তর ঠিকই বলেছেন, কোনো না কোনোভাবে শিল্পচর্চাটা আমার মজ্জাগত আমার চোখ ফোটার পর থেকেই আমি এসব দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি আমার বাবা এবং মা দুজনেই ভাস্কর্যচর্চার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়েছিলেন তাই আমি অনেকটা এরকমই বলতে পছন্দ করি, ছোটোবেলা আমি যেন শিল্পচর্চার মধ্যেই বন্দি ছিলাম কিছু একটা আঁকলেই বাবা মাকে ডেকে দেখাতেন এভাবেই আমার বড় হওয়া, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া আমার জীবনে ভাবনার মোড় ঘুরে রবীন্দ্রভারতীর ডিন এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পার্থপ্রতিম দেব-এর একটি কথায়,– “বাবার পরিচয়ে তো অনেকদিন কাটালে, এবার নিজের একটি আইডেন্টিটিটি গড়ে তোল!”  সেটাই ছিল আমার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট আর আর্ট থেকে চলচ্চিত্র জগতে আসার কথা বললে বলবো, আর্ট বা ভাস্কর্যচর্চা আমার চলচ্চিত্র জগতে আসার ভিত্তিভূমি বলতে পারেন  আর্ট বা ভাস্কর্যচর্চায় কাজ করার পরও আমি অন্য আরেকটা মাধ্যম খোঁজ করছিলাম ।  তখন আমি  রবীন্দ্রভারতী থেকে দিল্লিতে যাই পোষ্ট গ্রেজুয়েসন করতে তখন বন্ধুদের নিয়ে একটা ইনার আইনামে একটি  তথ্যচিত্র দেখি এরপর দিল্লির বন্ধুদের সাথে   মেলামেশার সময়ই মূলত আমি চলচ্চিত্র জগতের সাথে জড়িয়ে পড়ি । সেখানে একটা নতুনত্বের স্বাদ পেয়ে যাই । তারপর থেকে একের পর বিভিন্ন এমব্যাসিতে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখা শুরু করি । মূলত তখন থেকে ভাস্কর্য থেকে চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ি । এবং সেই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি ।  

 

প্রশ্ন   ফিল্ম এবং  ভাস্কর্য নিয়ে   নিয়ে পুনে-মুম্বাই করছেন অনেক বছর আমার জানার ইচ্ছে, গোটা আর্ট ফর্মের মধ্যে আপনি নিজেকে কোথায় স্বাধীন, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ  করেন কিংবা মুক্তির স্বাদ খুঁজে পান ?    

 

উত্তর  এফ টি আই আই পুনে থেকে পাসআউট করার পর আমি কিছু ডকুমেন্টরি করি এরপর কিছুদিন দিল্লি আর্ট কলেজে পড়াতে চলে যাই । তারপর কিছুদিন শর্ট ফিল্ম করি । কেননা আমাদের  প্রোডিউসার খুঁজতে হয় ।   আর পছন্দের বিষয়টা বললে বলবো, ভাস্কর্য চর্চা অনেকটা নিজেকে কেন্দ্র করেএখানে আমিই সর্বেসর্বা । কিন্তু ফিল্মের  ক্ষেত্রে বিষয়টা পুরো উল্টো । সেখানে অনেককে নিয়ে কাজ করতে করতে হয় । সবাইকে পেছনে ফেলে নিজের কাজটাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয় । ফলে চ্যালেঞ্জটা বেশি থাকে । আর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটা জিনিস প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে একটা আলাদা চার্ম থাকে । উত্তেজনা থাকে । কিন্তু ভাস্কর্য চর্চা আমার কাছে অনেকটা মেডিটেশনের মতো । ব্যস্ত লাইফ থেকে একটু দূরে নিজের সাথে একান্তে সময় কাটানো ।  কিছুদিন নীরবতার পর আবার চলচ্চিত্র জগতে ফিরে যাই । দুটো মাধ্যমকেই  আমি দু-ভাবে উপভোগ করে থাকি । দু-রকমভাবে দুটোই মজাদার এবং  চমৎকার ।  ভাস্কর্য আমার রক্তে, আর চলচ্চিত্র আমার মননে।

 

প্রশ্ন আপনি আগরতলায়আবক্ষ পল্টুদা নামে একটা  ডকুমেন্টারি করেছিলেন সে বিষয়ে অনেকেই জানেন না সেই ডকুমেন্টারির আসয়-বিষয়, তার তাগিদ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর  তখন আসলে আমি অন্য আরেকটা প্রজেক্ট নিয়ে আগরতলা এসেছিলাম । কিন্তু এসে জানলাম, প্রজেক্ট সাবমিট করার সময় চলে গেছে । তখন বিচ্ছিন্নভাবে এদিক-ওদিক ঘুরছি । ত্রিপুরার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি । তখন হঠাৎ আমার মাথায় এলো পল্টুদা মানে রমাপ্রসাদ দত্ত-কে নিয়ে একটা কাজ করলে কেমন হয় ? গান্ধি লাইব্রেরীর পেছনে তাঁর কোয়াটার ছিল তখন ।আর্ট কলেজ থেকে বের হবার পর আমি সব কিছুকে দেখতাম ফর্মের আকারে । আবার ফিল্ম জগতে আসার পর থেকে সব কিছুকে ক্যারেক্টার বা গল্প আকারে   দেখতে থাকি । দুই শিল্প মাধ্যমে দুই রকম দেখা হয়ে গেল । সেই চরিত্র দিয়ে তখন আমি পল্টুদাকে দেখা শুরু করলাম । পুনরায় যেতে শুরু করলাম আবার । তিনি বলছেন, আমরা শুট করছি । আমরা একটা সিনেমা খুঁজে পাচ্ছিলাম তাঁর ভেতর । তারপর ক্রমেই একটা নেশায় যেন জড়িয়ে পড়তে লাগলাম । পল্টুদার জীবন, তাঁর প্রাণের লাইব্রেরি, একের পর দুষ্প্রাপ্য সব বই, ডকুমেন্ট, সেই লাইব্রেরি নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা, এইসব বিষয়কেই  প্রাধান্য দিয়েছিলাম আমরা এটাকে বাঁচানোর খুব তাদিগ অনুভব করছিলাম আমাদের সামনেই বৃষ্টিতে ভিজছিল মূল্যবান কিছু বই এটাকে বাঁচানোর তাগিদ থেকেই  আবক্ষ পল্টুদাডকুমেন্টারিটা করে  আগরতলা ‘ তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর জমা দিয়েছিলাম   

 

প্রশ্ন   সম্প্রতি  প্রকৃতি  চলচ্চিত্রটি নানা জায়গায় প্রদর্শিত হচ্ছে বেশ সাড়াও ফেলেছে এই  চলচ্চিত্রটির পরিকল্পনা, তাগিদ নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?

উত্তর   হ্যাঁ, ‘প্রকৃতি’ চলচ্চিত্রটির সাফল্য আমাকে অনেকটা অনুপ্রাণিত করেছে । লক-ডাউনের সময় লক্ষ করলাম হঠাৎ পারিবারিক হিংসা-বিদ্বেষের গ্রাফ অনেকটাই বেড়ে গেছে । তখন আমাদের সমাজ, সেই সমাজে নারীর অবস্থান, আমাদের মিথোলজিতে তাদের কীভাবে ধরা হয়েছে, এসব নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় নতুনভাবে নারী- সত্তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম । আর তখনই আমার বন্ধু এবং লেখক অভিষেক ভট্টাচার্য আমাকে ‘প্রকৃতি’ চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য শোনায় । যেখানে আমরা দেখি, দেবী দুর্গাকে আমরা একদিকে আবাহন করছি, তাঁকে শ্রদ্ধাভরে পূজা করছি, আবাহ্বন করছি । অথচ আমার বাস্তবের নারী রয়ে গেছে সেই অবহেলায় । গার্হস্থ ঘটনায় সে দিনের পর দিন সে নির্যাতিত হচ্ছে । উপেক্ষিত হচ্ছে। তখন সেই দেবী দুর্গার পাশাপাশি আমাদের সামাজিক নারীর অবস্থান খোঁজার চেষ্টা করলাম  চলচ্চিত্রটির ভিতর দিয়ে।  কোথাও- না- কোথাও আমাদের সামাজিক জীবনকে আমারই কী প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছি না ? সেই ভাবনারই প্রতিচ্ছিবি ছিল আমার ‘প্রকৃতি’ চলচ্চিত্রটি ।

প্রশ্ন ত্রিপুরা নিয়ে আগামীতে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে ?

 

উত্তর   ত্রিপুরা নিয়ে আগামীতে কাজ করার ইচ্ছে আছে ইদানিংকবি অনঙ্গমোহিনী দেবীকে নিয়ে একটা কাজ শেষ করেছি আরও কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে আমার কাছে ত্রিপুরা খুব সম্ভাবনাময় একটা জায়গা

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...