‘জঠর’ ও ‘পাখি সব করে রব’ – দুই অঙ্গে এক আত্মার বলিষ্ঠ
তৎপরতা
তমালশেখর দে
ত্রিপুরা সাহিত্যের ইতিহাসে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা এবং অবদান অনস্বীকার্য । মূলত লিটল ম্যাগাজিনের কাঁধে ভর করেই গড়ে উঠেছে ত্রিপুরার সাহিত্য সম্পদ । সেই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে “কথা ও কবিতায়”। “কথা ও কবিতায়” সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরের ষাণ্মাসিক সাহিত্যপত্রের নাম –“জঠর” আর মাসিক সাহিত্যপত্রের নাম “পাখি সব করে রব” । সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে – ‘জঠর-৬’ – ৩বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুলাই ২০২৫ । এবং “পাখি সব করে রব”- এর ১২ বর্ষ, ৯ম সংখ্যা, জুলাই- ২০২৫ । এই মুহূর্তে ত্রিপুরার অন্যতম দুটি তাৎপর্যময় লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছে, এই দুই ম্যাগাজিনের কর্মকাণ্ড । ‘জঠর-৬’ এর এবারের সম্পাদনায় ছিলেন চিরশ্রী দেবনাথ । তিনি তার সম্পাদকীয় ‘আমাদের কথা’ লিখেন – “দিনের পর দিন যুদ্ধ তৈরি করে নিরীহ মানুষকে মৃত্যু- উপত্যকায় চিরতরে শুইয়ে দিয়ে, উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল দীর্ঘ করার নামই মানুষের ইতিহাস । হত্যা আসলে কোনো নিষ্ঠুর সংবাদ নয়, ব্যবসা মাত্র । আর সাহিত্য সেখানে আবহমানকালের সচেতন দর্শক । সাহিত্য যুদ্ধ থামাতে জানে না, শুধু একটি ঘৃণা তৈরি করতে হয়তো সক্ষম হয় । এই ঘৃণা, স্ববিরোধ ও আত্মচক্ষুর জন্যই পৃথিবী এখনও সুন্দর । অস্থির সময় সাহিত্যের সময় । নিষ্ঠুর সময়েই লিখিত হয়েছে পৃথিবীর সেরা সাহিত্য । আমরা হয়তো সেই সময়কালের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি ।” তীব্র এই কথাগুলো পাঠক হিসেবে আমাকে প্রথমেই গভীর এক কৌতুহলের দিকে ঢেলে দেয় ।
“যাদের ক্ষিধে আছে, খাবার নেই / বুদ্ধি আছে চিন্তা করার ক্ষমতা নেই / অস্ত্র নেই এবং মাংস চিবোতে পারে না / তারা এমনিতেও মরে গেছে ।” – কবি অর্পিতা আচার্যের কবিতাটি পড়তে পড়তে কেন জানি, আমারও মনে হল, কোথাও কোনো এক গভীর খাদের দিকেই কবি ইশারা করেছেন । ইঙ্গিতই তো কবির প্রধান অস্ত্র ।
‘জঠর-৬’ এর কবিতা বিভাগে মোট ৩৮ জন কবি কবিতা লিখেছেন । জীবনের কত কথা উঠে এসেছে তাদের কবিতায় । সবার সব কবিতা বোঝতে পেরেছি, সেটা বলার মতো মানসিক সক্ষমতা আমার নেই । তবু ব্যক্তিগত কিছু ভালো লাগা লাইন উল্লেখ না- করে পারছি না। যেমন – “ নিজের গভীরে / সযতনে লুকিয়ে রাখি অত্যাচার/ শুষে নিই সব অপমান” – কবি মণিকা বড়ুয়া । “ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেও / নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু ঔষুধের নাম বেড়ে যাওয়ায় / মাঝে মাঝে ভয় তবু ঈষৎ বাদামী চোখ কেমন অস্থির করে তোলে” – কবি শম্ভু শংকরের এই সব লাইন সত্যিই ভাবায় ! ভাবায় কবি রাহুল শীলের এমন কবিতার লাইন – “ বিচ্ছেদসূত্রে যারা কেঁদে ওঠে দাঁতে দাঁত চেপে / তারও বুঝি হেসেছিল প্রণয়িনীর কামুক সন্ত্রাসে !” গভীর ভাবনার সূত্রপাত হতে পারে এমন সব লাইনকে কেন্দ্র করে । তেমনই আশ্চর্য হয়ে ভেবেছি, অনিন্দিতা চক্রবর্তী-র ‘কিছু ব্যথা, রিরংসার মতো’ কবিতার – “রিরংসা পাতকুয়োর জলে ওঠানামা করে / অঘ্রাণের বাতাসে জাগে, চৈত্রের মিলিয়ে যায় / অনন্ত হেমন্তসন্ধ্যায় আমি আর দড়ি পালিয়ে যাই” । তরুণ কবিদের এমন ইঙ্গিতময় ভাবনা ভালো লাগে । বরিষ্ঠ কবি হৃষিকেশ নাথের ‘প্রিয় চিঠি’ হঠাৎ করে কেমন যেন অতীত-মুখো করে দিল – “ নোংরা ময়লা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে দেখি / অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আবর্জনার স্তুপে / পোকা মাকড় ইঁদুরের নির্ভয় গৃহস্থালি / অতিপ্রিয় চিঠিগুলি । মূল্যহীন - / আমরা এখন বিবাহিত।” এরই নাম জীবন । অনুভূতির বিচিত্র কাব্যময় এক যাত্রা । এখানেই তো কবি ও কবিতার জয় । পাঠক হিসেবে বর্তমানের সামাজিক- রাজনৈতিক অস্থির ডামাডোল ভুলে আমিও কোথায় যেন পুরনো চিঠি, পুরনো প্রেমের দেশে ফিরে গেলাম । জীবনের বহমান অভিজ্ঞতার খাঁজে খাঁজে কবিতারা কোথায় কীভাবে যে লুকিয়ে থাকে ? এরপরই পড়লাম কবি রুপালী দাসের কবিতা – “ শেষ বিকেলের পিলু রাগের হালকা সুখে / সরল এবং মন্থর হয় ঘামে-ভেজা অনুশোচনা ।” ‘অনুশোচনা’ শব্দটা পড়েই কেমন যেন ঝিম মেরে গেলাম! শব্দের সামান্য এদিক-ওদিক প্রয়োগে কীভাবে গোটা কবিতা টার্ন করে নিচ্ছে ! ‘কবি ও পাঠক’ নিবন্ধে কানন দাসগুপ্ত সোম ঠিক বলেছেন – “ কবিতা একজন কবির আনন্দ- বেদনা, প্রেম-অপ্রেমের ফসল, যেখানে অপরিসীম বেবনার বিষে কবি নীলকণ্ঠী”। কবি দেবাশ্রিতা চৌধুরী যখন তার কবিতার একটা অংশে লিখেন – “প্রতিটা আত্মহত্যা আসলে হত্যা” তখন আবার কেমন যেন হতভম্ব হয়ে যাই । প্রায় একই ভাবনা, নিঃস্বতার আভাস পাই তমা বর্মণের কবিতার লাইনে – “মাঝে মাঝে নির্বাসিত মনে হয় / যেমন হাওয়ার মতো অস্তিত্ব নেই / বুকের বসত-ভিটা দহন...সম্পর্ক...দাহ... মায়া.../ দিবানিশি সংঘর্ষ খণ্ডজীবন”। কবি চিরশ্রী দেবনাথের এই কয়েকটি লাইন মনকে ছুঁয়ে গেছে – “যাবার সময় এই অন্ধ পৃথিবীর / বুকের ওপর প্রগাঢ় ধানের ছায়ার মতো / ছড়িয়ে পড়ব / মাটির অনায়াস স্নিগ্ধতা তখন আমার বাহুদামে/ যদিও জানো / পৃথিবী হত্যা / পৃথিবী জখমের / পৃথিবী আর শিশুদের নয়” ।
‘জঠর- ৬’ আমরা এগারো-টি গল্প উপহার পেয়েছি । প্রায় সব গল্পেই জীবনের বিভিন্ন দিক ফোটে উঠেছে । তারপরও কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি কাজ করেছে । কোথাও যেন এই সময়ের বহমান বিশৃঙ্খলাকে গল্পের চরিত্রে মিস্ করেছি। গুরুত্বপূর্ণ ‘নিবন্ধ’ ছিল আটটি । যা সংখ্যাটিকে খুবই সমৃদ্ধ করেছে ।
তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘পাঠ-প্রতিক্রিয়া’
বিভাগের প্রায় সব লেখাই। এই বিভাগটি যত সমৃদ্ধ হবে ততই সাহিত্যের জন্য মঙ্গল ।
তরুণ প্রজন্মের এইসব টগবগে আলোচক, দারুণ লিখেছে । “পাখি সব করে রব”- এর ১২ বর্ষ,
৯ম সংখ্যাটিও অনবদ্ধ হয়েছে । কবি- শিল্পী লিটন আচার্যের প্রচ্ছদ এককথায় অসাধারণ ।
একটা ফ্লো ! একটা উচ্ছ্বাস ।প্রাণবন্ত ঢেউয়ের এখন বড় দরকার । এমন উচ্ছ্বাস
ক্ষণিকের জন্য হলেও মনকে মুক্তি দিয়ে যায় । ‘পাখি সব করে রব’ এবং ‘জঠর’ – এর জন্য
রইল শুভ কামনা । এই রকম লিটল ম্যাগাজিন আছে বলেই পাঠক হিসেবে আমরা আশাবাদী ।
ত্রিপুরার সাহিত্য জগত আরও নব চেতনায় জেগে উঠছে । উঠবেও আগামীতে ।
‘জঠর
– ৬’
সম্পাদক – চিরশ্রী
দেবনাথ
ধর্মনগর /মূল্য
– ১৫০
টাকা
‘পাখি
সব করে
রব’
সম্পাদক – পীযূষকান্তি
দাশ বিশ্বাস
ধর্মনগর / মূল্য
– ২০
টাকা


No comments:
Post a Comment