Thursday, October 30, 2025

“প্রেম,ভালবাসা, দেশ- সময়- সমাজ সব পর্যায়কেই ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন দেবপ্রতিম ”

 





প্রেম,ভালবাসা, দেশ- সময়- সমাজ সব পর্যায়কেই ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন দেবপ্রতিম

                         তমালশেখর দে   

 

এখানে সবুজ নেই আর, কত লাশ ছুঁয়ে দেখি

পরাজিত, বিকেলের শোকমিছিল...

                       ... ...

অন্ধকারের নাভি, নিভে দিন, অনিদ্রা এলোমেলো,

অভিমানী রাতের মন্থর আলসেমি” ( মালবিকা , কাব্যগ্রন্থ- কাফের)

                       

ধর্ষিতার ক্ষত দেখিনি কখনো, দুঃখ বুঝতে পারি;

শব্দহীনতায় যখন মূক, নতুন ভোরের কথা বলতে পারিনি

 দূরত্ব আমাদের

 অন্য এক জাহাজকে বহুদূর দেখা যায় শব্দহীন;

দেহসাধনার কথা জেনেও, গূঢ় প্রেমিকতায় ডোবা হয়নি ” (অঙ্গরাজ - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 “সাইলেন্সার কেটে ফেলা মোটরবাইকের মতো

এখন সেলফিবাজ সময়, খোলা আকাশের গান হয়

আর মুক্ত প্রেমিকতায় ভরে যায় ইনবক্স !” ( রুদ্র - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 “ যুক্তি এবং আবেগ যেখানে শেষ হয়,

সেই পৃথিবী অভিজ্ঞতার

 

মুহূর্তরা চায়ের মতো, ব্যথাগুলো যেন পেয়ালায় গুড়ো।

( সেদিন, যখন মুখোমুখি ছিলাম, কাব্যগ্রন্থ-কাফের) 

 “ অচল রাজপথে কুয়াড্রিপ্লেগিক / হুইলচেয়ার” ( কাবেরী - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 “নিঃশব্দের এই নির্জনতা কোনো  মাদকতা নিয়ে আসে না,

যেন নিঃশব্দের উষ্ণ তাপে ছাঁচ-মূর্ত চুম্বনের দৃশ্য” ( নগ্নতা - কাব্যগ্রন্থ- কাফের) 

 “ অনিশ্চয়তার সমস্ত শরীর থেকে বাষ্প হয়ে উঠল / অপেক্ষা” ( মেঘ - কাব্যগ্রন্থ- কাফের)

 

বরাক উপত্যকা শিলচরের তরুণ কবি ( জন্মসাল ১৯৯৫) দেবপ্রতিম দে-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ – ‘কাফেরথেকে উপরের পঙক্তিগুলো উল্লেখ করলাম কাফেরতার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৮ সালে   এরপর  আরও তিনটি কাব্যগ্রন্থবর্শা বিকেলের হুইস্কি” – (প্রকাশ কাল ২০২৩ সাল), “অপূর্ব তোমাকে” (প্রকাশ কাল ২০২৪ সাল) এবংWords Run Riot” ( প্রকাশ কাল২০২৪) পড়েছি আর এখন পড়ছি তার সদ্য জুন, ২০২৫ সালে  প্রকাশিত পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ  বেদনা বৈদ্যুতিক

দেবপ্রতিম দেব আমার প্রিয় কবির মধ্যে একজন তার নিজেকে কেন্দ্র করে থাকা, নিজের মতো করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে আগলে রাখা, এটা আমার ভালো লাগে । তার সদ্য প্রকাশিত  বেদনা বৈদ্যুতিক”—এর প্রথম দুই লাইনের একটি  কবিতা পড়েই কুপোকাত হয়ে যাই –“মা সিঁথিতে এক নদী, / সিন্দুরের দুধারে ভারত বাংলাদেশকবিতার নাম দিয়েছেন কবিদৃশ্য মাত্র দুই লাইনের এই কবিতার ভিতরে গুঁজে রয়েছে একের পর এক দৃশ্য অথচ কবি কিছুই বললেন না শুধু দুটো লাইনে যেন দুটো রেখা টেনে চুপচাপ পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলেন  কিন্তু অসাধারণ  শৈল্পিক প্রতিভা বলুন, কিংবা কাব্যিক চতুরতা বলুন, কিংবা খুবই সংযমী আবেগের নিয়ন্ত্রণ বলুন, যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন, কবির প্রতিভাকে অস্বীকার করার উপায় নেই কী চমৎকার  নির্মল এক আঙ্গিকে, কীভাবে ইতিহাস   গুঁজে দিলেন মায়ের সিঁথির ভিতরে নীরব, শান্ত, তপ্ত এক দুপুরে, নদী পারের অসহ্য মন-কেমন-করা এক দৃশ্য  দেখছি যেন যার এক পারে ভারত অন্য পারে ফেলে আসা বাংলাদেশ আর মায়ের সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে ব্যথা বেদনার ইতিহাস যেন নাগরিকতার প্রমাণ নিয়ে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত এক দেহ আজ কোন্ ইতিহাস স্বীকার করবেন , আর কাকেই বা অস্বীকার করবেন ! আবার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, এখানে মা যেন  দ্বিধা-বিভক্ত পড়ে রয়েছেন পড়ে রয়েছে তার ইতিহাস মধ্যে বহমান একের পর এক অদৃশ্য  দিনলিপি আনন্দ- বেদনার ধারাবিবরণী শিলচরের অবস্থান থেকে কবির অনুভবে যখন এই দৃশ্য উঠে আসে, তখন তার স্থানিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখতে পাব, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে একটি কাঁটাতারের যন্ত্রণা দেশ-ভাগের রক্তাক্ত বেদনা শিলচরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বরাক নদীর কলকল নীরব, নির্মল এক ধ্বনি, শুধু যেন একটা ধ্বনি নয়, কবির নেহাত শৌখিন চিত্রকল্প নয়, কোথাও মনে হয় জ্বলন্ত এক ইতিহাস  কথা বলছে। আজও বলে চলেছে কথা । দুটো লাইনের ভিতরে কবির  এই যে কথা লুকিয়ে রাখা, এই লুকিয়ে রাখা কিন্তু কবিতার  বড় একটা সৌন্দর্য সব বলে দেওয়া তো কবিতা নয় । বরং না- বলাটাই বেশির ভাগ সময় কবিতা ।  ঠিকানাহীনতার আরেকটা হাহাকারময় চিত্রকল্প দেখি এরপরের কবিতায়ও

কে জানে ঘর কোথায় তার কোন শহরের নদীর তীরে ?

সে হেঁটে যায় কোন বাহানায় দূর পাখিদের মতো নীড়ে ?

নদীর তীরের গাছগুলো কেটে দিলে পাখি ফিরে না ঘরে

পাহাড়ে পর্বতে অন্যদেশে ঠিকানাহীন যেন সে না মরে !” ( এক যে ছিল মুসাফির গানে)

এখানেও কোথাও-না-কোথাও অস্তিত্বের সংকট কবিরঅন্যদেশে ঠিকানাহীন যেন সে না মরে!” এই বেদনাবোধ কোথায় যেন আমাকেও গ্রাস করে ফেলে উদ্বাস্তু এই সংকটের ভিতরে পাখির সাথে কোথায় যেন মানুষও মিশে যায় পাখির নীরব ত্রাস মানুষ হিসেবে আমারও গ্রাস করে ফেলে কবি এখানেই থেমে থাকলেন না, এরপরের কবিতায় তুলে এনেছেন আরেকটি মারাত্মক উপলব্ধি

উদ্বাস্তুরা পরিব্রাজকের মতো,

ক্যাম্পের ভাত তাদের মাধুকরী।” ( মাধুকরী সম্বল)

কবির  যে কোনো ব্যক্তিগত আঘাত তো ব্যক্তিগত নয়, তা তার ইতিহাসকেও গ্রাস করে   এই কাব্যগ্রন্থে কবি তার চারপাশের অস্তিত্বের সংকটকেই বারবার তুলে আনার চেষ্টা করেছেন

আগুনে পুড়ছে বাস্তুভিটা, আগুনে পুড়ছে দেশ,

গ্রাম কি শহর দপদপ্ লেলিহান,

লিকলিকে আগুন বন বাজারে” ( মিডিয়া/ মণিপুর)

কবির ইঙ্গিত স্পষ্ট অস্তিত্বের সংকট বহমান যে জীবন চোখের সামনে দিয়ে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু তুচ্ছ হাজার কাজের চাপে সেদিকে তাকাচ্ছি না, সেই জীবনকে, যত্ন করে কবিতার মধ্যে তুলে আনলেন কবি এই কবিতার নামটাই যেন যথেষ্ট । কবি কেন , কি বোঝাতে চাইছেন, তা নামের মধ্যেই স্পষ্ট – “ মিডিয়া/ মণিপুর

তোমার গভীরে যেতে চেয়েছিলাম,

আমি এক ভাঙা জাহাজ, তলিয়ে যাই

যত গভীরে ডুবছি প্রেশার বাড়ছে সমুদ্রের জলে

আমি এখন সেই তিমি, যার কোনও প্রত্যাবর্তন নেই।” ( ফিরে আসা নেই)

এ- হল সেই জাতের  কবিতা, যা নিজের কথা আপন মনে বলে চলে যায় আবার কখন, যেন কিচ্ছু না- জানিয়ে  ঢুকে পড়ে পাঠকদের ফেলে আসা জীবনের মধ্যে । “আমি এখন সেই তিমি, যার কোনও প্রত্যাবর্তন নেই।একদা যে প্রেমিক ছিল, আজ সে তলিয়ে যাচ্ছে, তো যাচ্ছেই..., কোনও প্রত্যাবর্তন নেই। অভিযোগ নেই।মৃত্যুতে আচ্ছন্ন জীবনের অর্থহীনতার এক দৃশ্যপট যেন রচিত হল, কবির এই কবিতায় নীরব এক আত্মসমর্পণ, অর্থহীন সময়ের সামনে যেতোমার গভীরে যেতে চেয়েছিলামসে যেতে পারল না তলিয়ে গেল গহীন এক অন্ধকারে নিরর্থকতার ছায়ায় দীর্ঘস্থায়ী এক উৎক্ষিপ্ততা কোন এক বিপন্ন সময় বিস্ময়” – এর ভিতর দিয়ে কবির এই যাত্রাআমি এক ভাঙা জাহাজ  

এইফিরে আসা নেইকবিতার পরই কবি পরবর্তী কবিতাপ্রশ্ন”- কবিতায় কবি লিখছেন –“ কতটা ভালবাসলে বুকের এক্স-রে তে/ প্রেমিকার ছবি ভেসে ওঠে ?” আসলে নির্মল এই প্রশ্নের ভিতরে একটা হাহাকার আছে আবার সেই অস্তিত্বের সংকট আছে অনুভূতিটা শুধু ভিন্ন

গাড়ি ছুটে চলেছে দূর থেকে দূরে, রাত হয়ে এল

আঁধারে ঢাকা ঘর

গন্তব্য ভুলে তুমি নির্লিপ্ত নামলে মন্থর

ক্লান্ত কাম এল ডি আলোয় ঝলসে ওঠে

বিছানা যেন মহাসড়ক-, আমরা দুই গাড়ি, আহত সফরনামা ” ( মুখোমুখি সংঘর্ষ)

কবিতাও যেন কাউকে কিছু জানানোর জন্য লেখা নয় একাকী নিষ্ক্রান্ত হয়ে বাতাসে মেশার জন্য লেখা ... কবিতা সব সময় নিজেকে প্রকাশই করে না , কখনও কখনও গোপনও করে সব কথা খুলে না- বলাও কবিতার একরকম ধর্ম শৈলীও বটে ।  এখানে আপাত সরল, দীর্ঘশ্বাসময় স্বগতোক্তির মতো এই কবিতাও আড়াল অবলম্বন করল বিছানা যেন মহাসড়ক-, আমরা দুই গাড়ি, আহত সফরনামা ক্লান্ত ঘুমের গভীরে, গন্তব্য ভুলে, গভীর ঘুমের গভীরে দুজন কবি কেবল উচ্চারণ করলেন – “আমরা দুই গাড়ি, আহত সফরনামাখুবই সংযমী আচরণ  আবেগের ব্যবহার কবি শুধু তার উপলব্ধি ছুঁয়ে গেলেন যেন  কবিতায়।

কবিরটুগেদার টিল দা এন্ডকবিতাটি তীব্র দহন শেষে নিয়ে এসেছে এক পশলা বৃষ্টি মনোরম দৃশ্যের যাত্রা

কাফের আমি, তুমি দিয়েছ আমাকে, নতুন প্রাণ,

আমি তোমারই থেকে যাই,

আমার বুকের সব, দহন কষ্ট যা, এতদিন হাতের ছোঁয়াতে,

সব ধুয়ে মুছে দিলে, এই রতিস্নানে” (টুগেদার টিল দা এন্ড-)

উন্মাদনায় আমরা উলঙ্গ হয়েছি

নগ্নতায় ঢেকেছি নিজেদের

দুটো হৃদয় ভেঙ্গে শরীরে এখন

অভিন্ন এক মন” (টুগেদার টিল দা এন্ড-)

নিরেট প্রেমের কবিতা যদিও ভিতরে রয়েছে  অজস্র গোপন কথোপকথন আদান-প্রদান আরও কিছু উজ্জ্বল লাইন দেখতে পাই

ক্লান্ত দিনের শেষে ঘুম/ নামতে চাইছে তোমার শরীরে” ( পুণ্য অভিমান) “ দূর থেকে একদিন তোমার ক্রোধ এবং কান্নাজলে/ ভিজিয়ে দিয়েছিলে এই বুক আমার / সেদিন তোমাকে মনে হয়েছিলঃ/  কোথাও দূর কোনও শতাব্দীর তেজস্বিনী ভৈরবী/ যেন শিবলঙ্গের মাথায় জল ঢেলে দিচ্ছে।” ( তোমার অশ্রু)

প্রেমের কবিতা পড়ার পর শেষ কবিতাডেস্টিনিপড়ে আমি চমকে গেছি প্রায়

প্রতিটা ঘর থেকে মৃত মানুষ হেঁটে চলেছে

আয়নার ভেতরে গহীন শ্মশানের দিকে-

নদী ছিল, নদীর কিনারে

পতাকা উত্তোলন

ভাসে লাশ, ভাসে ভেলা  

প্রতিটা ঘর থেকে মৃত মানুষ হেঁটে চলেছে ... গহীন শ্মশানের দিকে-” গোটা কাব্যে সরাসরি এভাবে কবি কখনও পাঠককে থমকে দেননি এই তরুণ কবির জন্ম ১৯৯৫ সালে গোগ্রাসে গিলে চলেছেন জীবনের যাপনের প্রতিটি পর্বকে কবিরবেদনা বৈদ্যুতিককাব্যটি আমার ভালো লেগেছে প্রেম,ভালবাসা, দেশ- সময়- সমাজ সব পর্যায়কেই ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন দেবপ্রতিম   দেবপ্রতিমের কবিতার ক্রমপর্যায়  যদি আমরা লক্ষ করি, তাহলে দেখব, সে খুব চঞ্চল নয় তার কবিতার ভিতরে আপনি চট করে অস্থিরতা দেখবেন না জীবনকে সে দেখে ধীর-গতিতে চারপাশকে বেশ সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বিষয়কে বোঝার জন্য, তাকে শব্দে তুলে আনার ক্ষেত্রেও সে সুচিন্তিত এই বিষয়টা আমাকে তার প্রতি খুব আশাবাদী করে তুলেছে ভাবা প্র্যাকটিস্’ করার বিষয়টা তার মধ্যে আছে একটা  টোট্যালিটি  একটা  সামগ্রিকতাকে ধরার সে চেষ্টা করে তার কবিতায়  তাই বলে কী তার সব কবিতাই  কি সফল হয়েছে ? হয়ত না হয়ত আরও বিষয়ের ভিতরে যেতে পারত, সেটা যেমন রাজনীতির ক্ষেত্রে, তেমনই প্রেমের কবিতার বেলায় তাই ।  কিন্তু তাই বলে তার পর্যবেক্ষণকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না কোনভাবেই  নাহলে কবি কীভাবে লিখতে পারেন এমন লাইন –“ পাহাড় সব কেটে ফেলা হয়েছে, / খাবার সব হয়েছে বাসি,/ কাপড়ের অন্তরালে দেখা যায় অন্তরবাস!”  শব্দটা তো ‘অন্তর্বাস’ হতে পারত ?  অথচ হল না-তো !

 

 

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...