‘দেখাই জীবন। দেখাই ছবি !’
ত্রিপুরার চিত্রকলা থেকে শুরু করে নাটক, মূকাভিনয়, কবিতাআবৃত্তি, প্রচ্ছদশিল্পী প্রায় সব আর্ট ফর্মেই শিল্পী স্বপন নন্দী এক অবিস্মরণীয় নাম। প্রতিটি বিভাগেই তিনি রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় তমালশেখর দে ।
প্রশ্ন ঃ নারী ও নিসর্গ, জল ও রঙের খেলায় আপনি ভুবনখ্যাত চিত্রশিল্পী। এ’সবের ভিতর দিয়েই আপনার মৌলিক চিত্রযাত্রা।এইসব ভাবনা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ বিশ্বখ্যাত শিল্পী
গোপাল
ঘোষ
এবং
গণেশ
হালুই
মশাইদের
কাছে
আমার
জল
রঙের
হাতে
খড়ি।
জলরং
আমার
হৃদয়ের
মাধ্যম।
প্রকৃতির
যা
কিছু
আমরা
প্রেক্ষণ
করি
তার
মধ্যে
একটা
কোমলতা
আছে।
সে
মানুষই
হোক
বা
প্রাকৃতিক
দৃশ্য।
এই
কোমলতা
বা
নমনীয়তাকে
ছবিতে
আনতে
গেলে
আমার
ধারণা
জলরঙের
বিকল্প
নেই।
জলরঙের
স্বচ্ছতা
যেন
ভাবনার
স্বচ্ছতাকে
রূপ
দেয়।
নারী
ও
নিসর্গ
চিত্রাবলী
যদিও
আমি
অন্য
মাধ্যমে
করেছি।
কিন্তু
জলরঙের
প্রলেপ
আমাকে
সবসময়
সজাগ
রাখে।
রেখেছেও।
প্রশ্ন ঃ আপনার চিত্র জীবনের শুরুর দিনগুলো নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ বিদ্যালয় শিক্ষাস্তরে
আমি
পেয়ে
যাই
ননী
চক্রবর্তী
এবং
শক্তি
হালদারের
মতো
চিত্রশিক্ষককে।
যাঁদের
প্ররোচনায়
শুরু
হয়
আমার
চিত্রযাত্রা
। তারপর ১৯৬৬ সালে বিশ্বখ্যাত চিত্রাঙ্গন
কলকাতার
সরকারি
চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে আমার প্রবেশ। সত্যি কথা বলতে
কি
, ঐ
প্রাঙ্গণে
নিজেকে
খড়কুটোর
মতো
মনে
হত।
সময়প্রবাহে
অনেক
মহীরুহের
পাশে
একটি
ছোট্ট
চারাগাছ
হয়ে
কখন
শেকড় গেঁড়ে বসলাম
টেরই
পাইনি
। এই চিত্র অঙ্গনে রঙরেখার বসন্ত
উৎসব
চলত
বারোমাস।
সেই
সময়কার
মহান
মাষ্টার
মশাইদের
ছত্রছায়ায়
থেকেই
আজকের
আমি।
এখন
শুধু
নিরলস
এঁকে
যাই।
‘কাল’
বিচার
করবে
আমার
রঙ,রেখা ছবি হয়ে উঠলো কিনা!
প্রশ্ন ঃ আপনার ছবিতে বিমূর্ত খেলার চারু এবং কারুকে পেছনে ফেলে খুব সহজেই কাব্যগুণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। আপনি কি বলেন ? সেই অর্থে বলাই যায়, চিত্রী স্বপন নন্দী খুব আবেগীমানুষ। আপনি কি মনে করেন?
উত্তর ঃ সত্যজিৎ রায় বিমূর্ত
ছবি
পছন্দ
করতেন
না
। ‘চিত্রকর’
গল্পে
তিনি
খুব
সুন্দর
করে
বলেছেন।
যা
এখন
অনেকেই
বলে।
গল্পটা
হল—একজন শিল্পী তার সবটা আবেগ দিয়ে একটা ছবি এঁকে প্রদর্শনীতে পাঠালো।
খুব
সুন্দর
করে
প্যাকেট
করে
যত্ন
নিয়ে
ছবিটি
পৌঁছে
দিল
আয়োজকের
কাছে।
নিশ্চিন্ত
হয়ে
হাল্কা
মনে
স্টুডিও
ফিরে
দেখল
ঘরের
কোণে
তার
এতদিনের
পরিশ্রমের
ফসল
পড়ে
রয়েছে।
অর্থাৎ ভুল ছবি চলে
গেছে।
যা
হবার
হয়ে
গেছে,
এই
ভেবে
চিত্রকর
যখন
সব
ভুলে
যাওয়ার
পথে
, তখন
তিনি
জানতে
পারলেন
উক্ত
প্রদর্শনীতে
তিনিই
প্রথম
হয়েছেন
! হতচকিত
হয়ে
ইনি
দেখলেন,
মূল
ছবিটি
আঁকতে
গিয়ে
তিনি
যে
কাগজ’টিতে
তুলি
মুছেছিলেন
, এটি
সেই
কাগজই! ...এই গল্প এখন অনেকেই
জানেন
এবং
বলেন।
সত্যজিৎ
রায়ের
এই
গল্প
বিমূর্ত
ছবি
নিয়ে
আমাদের
একটা
প্রশ্নের
সামনে
দাঁড় করিয়ে দেয়। যদিও বিষয়টা
তর্ক
সাপেক্ষ।
আমি
ব্যক্তিগতভাবে
তাই বিমূর্ত থেকে সচেতনভাবেই
কিছুটা দূরে থাকি ।
প্রশ্ন ঃ সেই অর্থে কি বলা যায় চিত্রী স্বপন নন্দী খুব আবেগীমানুষ। আবেগই তাঁর ছবির প্রাণ ভ্রমরা! আপনি কি মনে করেন ?
উত্তর ঃ অবশ্যই আমি আপাদমস্তক একজন
আবেগি
মানুষ।
আবেগ
না-থাকলে
কবি,
শিল্পী
হওয়া
যায়
না।
কবিতার
চিত্রকল্পে যেমন একটা ছবি
থাকে,
তেমনি
ছবির
ভেতরও
একটা
কবিতা
থাকে।
না-হলে
যেন
কেউ
সম্পূর্ণ
হয়
না!
এক
‘মোনালিসা’
নিয়ে
পৃথিবীতে
কম
তো
লেখালেখি,
গবেষণা হয়নি ? আবার রবীন্দ্রনাথের
অসাধারণ সব কবিতা, গানে আমরা কত অজস্র ছবি, চিত্রকল্প দেখতে
পাই। তাই তো তাঁর লেখা , আঁকা, আজও আমাদের এত ভাবায় ! আবেগে তাড়িত করে। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাল
ছবি
দেখে
বা
ভাল
কবিতা
পড়ে
আবেগে
তাড়িত
হয়ে
পড়ি।
এবং
এটা
অবশ্যই
আমার
দুর্বলতা
নয়!
বরং
তা আমার পঠন ও প্রেক্ষণের
সফলতা। কবিতার সর্বগ্রাসী আবেগের
ভিতরেই
আমি
আমার
ছবিগুলোকে
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে
দিই। সেজন্যই আমার
ছবিতে
কবিতা
একটা
প্রধান
বিষয়।
প্রশ্ন ঃ রাজন্যযুগ থেকে এই আধুনা পর্যন্ত ত্রিপুরার চিত্রচর্চা খুবই উল্লেখ্যমানের। তবু যেন একটা সার্বিক শৈলীর ছাপ নির্মিত হল না কোথাও ! এ’নিয়ে আপনি কি মনে করেন ?
উত্তর ঃ আমি বরং বলবো, শৈলীর ছাপ নির্মিত হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার প্রচার
হয়নি। মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর
মাণিক্য
তাঁর
নিজস্ব
স্টুডিওতে
পশ্চিমা-প্রথায়
যে-সব কাজ করেছেন,
তা
এককথায়
অনবদ্য।
অসাধারণ।
কিন্তু
প্রশ্ন
হল,
এই
কথাটা
কতজন
জানে
? বা,
আমরা
জানাতে
পেরেছি
? রাজার
আঁকা
‘স্নানরতা রমণী’ বা ‘ সন্ন্যাসী’ –-, আমি বলবো, এই ছবিগুলি তেলরঙের
সঠিক
চিত্রণ। ড্রয়িং এবং ডিটেলের এমন কাজ,
এবং রঙের এমন মাধুর্য
পশ্চিমের
অনেক
গুণী শিল্পীদের সাথে
তুলনীয়।
প্রশ্ন ঃ এটাকে আপনি কি আমাদের দুর্ভাগ্য মনে করছেন ?
উত্তর ঃ অবশ্যই।
হায় ত্রিপুরা ! আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি এবং ক্রমাগত ফেলছি। রাজবাড়ির উত্তরপুরুষেরা
এ’সবের
যথার্থ
মর্মই
বুঝতে
পারেননি।
তারপরও
একথা
সত্য,
রাজ
আনুকূল্যে
অনেক
শিল্পী
ত্রিপুরায়
বসে
ছবি
এঁকেছেন।
অমূল্য
সেসব
ছবি।
সেসবেরও কোনো প্রচার
নেই।
আর
এসব
ক্ষেত্রে
প্রচার
কতটা
জরুরী
, সে
নিয়ে
নিশ্চয়ই
কোন
প্রশ্ন
উঠে
না
! আমার
সম্পদ
আমাকেই
সামনে
নিয়ে
আসতে
হবে।
যাদুঘরে
কিছু
ছবি
দেখা
যায়
দায়সারাভাবে
রাখা। আসলে, প্রশ্নটা
হল—আমাদের ত্রিপুরায় সমালোচনা
সাহিত্য
যেমন
গড়ে
ওঠেনি,
তেমনি
গড়ে
ওঠেনি
চিত্র
সমালোচকও!
আলোচনার
বড়
অভাব বা একপ্রকার নেইও বলতে
পারো।
আচ্ছা,
বল
তো
, শিল্পী
রমেন
চক্রবর্তী, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মণ , নলিণীকান্ত মজুমদার , শৈলেশ দেববর্মণ, সুরেশ দেব বর্মা, ঋষিকেশ
দেববর্মণ, এঁদের ক’জন
চেনেন
? বিশ্বপর্যায়ে
এঁদের
নিয়ে
যাওয়া
হয়েছে
কিনা
! অথচ
তাঁরা
বিশ্ব
দরবারে
ঠাঁই
পাওয়ার
মতো
চিত্রকর।
এ’দুর্ভাগ্য
নিঃসন্দেহে
আমাদের।
আগরতলায়
মাঝে
মাঝেও
নয়,
খুব
কম
কিছু
আলোচনা
সভায়
আমরা
নিজেরাই
নিজেদের
ঢাক
পেটাই।
১৯৭৫ সালে আগরতলায় আর্ট কলেজ
স্থাপিত
হওয়ার
পর
বহু
ছেলেমেয়ে
বেড়িয়েছে
শিল্পী
হয়ে।
কেউ
কেউ
বিদেশে
স্থায়ীভাবে
কাজ
করছেন।
কিন্তু
ওখানে
তারা
ত্রিপুরার
শিল্পী
নয়,
যে-দেশে
আছে সেখানকার শিল্পী!
-- ‘বলত! কেমন
লাগে
?’ আর
যারা
ত্রিপুরায়
থেকে
কাজ
করছে,
ভাল
কাজ করছে, তাদেরও তো কোনো
প্রচার
নেই। ভাল সমালোচকের
অভাবের
পাশাপাশি এ’দায় কিন্তু শিল্পীদেরও! বিস্তৃত
আর
কি
বলব?
সব
শিল্পীরাই এনিয়ে ভাবুক ...
প্রশ্ন ঃ চিত্রকলা এবং দর্শক অনিবার্যভাবে একে অন্যের পরিপূরক। দর্শকের তৃপ্তির বিষয়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন?
উত্তর ঃ এ’অতি ভীষণ প্রশ্ন হয়ে গেল ! পৃথিবীতে যা কিছু
সৃষ্টি
হচ্ছে
, লেখায়
বা
আঁকায়
বা
অন্যকোনো
মাধ্যমে
তার শেষ বিচারক দর্শক বা পাঠক। দর্শকদের
মন
এক
অপার
বিস্ময়! কাজেই শিল্পী
বা
লেখক
হিসেবে
তার
সন্ধান
পাওয়া
দূর
অস্ত । তবু, বলা যায়, দর্শকের কথা ভেবে
কখনও
কাজ
করি
আবার
একাধারে
এটাও ঠিক যে,
আমাদের
মতো
চিত্রকরের
ছবিও
দর্শক
প্রস্তুত
করে।
অর্থাৎ দর্শকের চোখ তৈরি করা। ‘ এমনটা তো আগে ভাবিনি ?’ গোছের কিছু প্রশ্ন তৈরি হয় দর্শকদের মধ্যে।
এখানেই
ছবি
আঁকিয়েদের
খানিকটা
সফলতা।
আমি
সাধারণত
ছবির
নামাকরণ
করি
না।
দর্শকদের
উপর
ছেড়ে
দিই।
তারাই
ঠিক
করুক
ছবিটার
নাম
কি
হতে
পারে
! মাঝখান
থেকে
আমার
লাভ
একটা
হয়
যে, ছবির অনেক নাম পেয়ে যাই। আমাকে তারপর ভাবতে সাহায্য করে। আসলে দর্শক,
শিল্পপ্রেমিদের
বাদ
দিয়ে
তো
ছবি
রচনা
করা
যায়
না।
তাই
বলে
আবার
আত্মসমর্পণ
করাও
ঠিক
নয়।
নিজস্বতা
বলেও
তো
একটা
কথা
থাকে।
এখানেই
দর্শক
ও
শিল্প
একে-অন্যের
পরিপূরক।
আসলে
দায়বদ্ধতা
বা বোধের জায়গাটার কথা মনে
রাখা
দরকার
উভয়েরই।
প্রশ্ন ঃ আজকের তরুণ চিত্রশিল্পীরা ফর্ম-ভাঙা ফর্মের দিকে প্রথম দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। একজন মনজ্ঞ চিত্রকরের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা’কে আপনি কীভাবে পর্যালোচনা করছেন?
উত্তর ঃ আর্ট কলেজগুলো শিল্পী তৈরি করার কারখানা নয়। ওখানে একাডেমিক দিকটা শেখানো হয়। অর্থাৎ ড্রয়িং, প্রেক্ষিত, ফর্ম, টোন ইত্যাদি। এখন একশোজন ছাত্র যদি পাশ করে বেরোয় তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই একশোজনই শিল্পী হয়ে গেল! যদি প্রকৃত অর্থে দশজনও শিল্পী হয়, তবেই বলা যেতে পারে সার্থক ব্যাচ। আর বাকিরা হবেন ছবির প্রকৃত প্রেক্ষক। আমার এ-কথায় বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু আমি আমার ভাবাদর্শে নিরুপায় । এখন এই ‘দশজন শিল্পী’ যদি প্রথমেই ফর্ম ভাঙার খেলায় মেতে ওঠেন, তবে আমি বলবো, এই প্র্যাকটিস ঠিক নয়। কলেজ থেকে বেরিয়ে নিজের চৌহদ্যিতে যখন সে কাজ করছে তখন তার দায়িত্ব বেড়ে যায়। ছবির বিষয় নির্বাচন অবশ্য শিল্পীর ব্যাপার কিন্তু সেটা মানুষের কাছে কতটা পোঁছবে, কীভাবে পোঁছবে, সে জন্য কোন্ ফর্ম বেছে নিতে হবে, নাকি জাগতিক সব ফর্মকে ভেঙেচুরে চুরমার করে দর্শকদের সামনে আনতে হবে, এইসব ভাবনা তরুণ শিল্পীদের ভাবতে হবে। তারা অনেক সময়ই পিচ্ছিল পথে পদচারণা করে ফেলেন। আর ঠিক এখানেই আমার সমস্যা মনে হয়! আমি তো শিল্পের মাষ্টারমশাই নই, তারপরও কিছু বলতে হলে, শুধু রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি করবো -- ‘‘ দেখ, দেখার চোখকে সদা জাগ্রত রাখ্!’’ এই যে দেখার কথা কবি বলেছেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা। একবার জগতটাকে দেখার চোখ খুলে গেলেই, ছবির বিষয় পেয়ে যাবো আমরা। তখন যখন খুশি পরীক্ষানিরীক্ষা করে ফর্ম ভেঙে আবার জোড়া লাগিয়ে যেতে তো কোনো অসুবিধা নেই! শেষ অবধি, ছবি আঁকাটাই তো মূল কথা ।
প্রশ্ন ঃ ত্রিপুরার প্রকাশনী সংস্থার শুরুর সাথে সাথে অনিবার্যভাবে আপনিও জড়িয়ে গেলেন প্রচ্ছদশিল্পের সাথে। এই নিয়ে আপনার স্মৃতিমন্থন, অভিজ্ঞতা, ভাললাগা, না-লাগা, কিছু সুখকথা শুনতে চাই আপনার কাছে ?
উত্তর ঃ কলকাতার পাট
চুকিয়ে ১৯৭২ সালে বাড়ি
ফিরে
দেখি,
আমার প্রজন্মের অনেকেই লেখালেখি নিয়ে মেতে
আছেন। লিটিল ম্যাগাজিন
প্রকাশিত
হচ্ছে
প্রায় নিয়মিত। সেই
সময়
দেখলাম
প্রেসের
টাইপ
উলটেপালটে,
মোটাসরু
রুল
ব্যবহার
করে
প্রচ্ছদ
করা
হচ্ছে।
বেশ
মজাদার।
রামলাল
দত্তের ‘সন্তান প্রেস’ই ছিল মূলত
শহরের
লেখকশিল্পীদের
আড্ডার স্থান। রামুদার আস্কারায়
আমরা
যথেচ্ছভাবে
প্রেসটাকে
ব্যবহার
করতাম।
তখন
তো
ব্লক
ছিল না। তাই প্রচ্ছদ নিয়ে
চলত
নানারকম
পরীক্ষানিরীক্ষা । এরমধ্যে বিশিষ্ট
শিল্পী
প্রশান্ত
সেনগুপ্ত
লিনো
কেটে
অসাধারণ
সব
প্রচ্ছদ
করেছিলেন। আর্ট কলেজে
গ্রাফিক্স
আর্ট
শেখার
সুবাদে
লিনো, লিথো, এচিং
, এইসব
কাটার
অভ্যাস
আমার
ছিলই!
তাই
লেগে
গেলাম
লিনো
কেটে
প্রচ্ছদ
করতে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮
সাল
পর্যন্ত
লিনো,
উডকাটিং
করে
বেশ
কিছু
প্রচ্ছদ
করলাম।
ঐ-সময়
পৌণমী
প্রকাশনী
কলকাতা
থেকে
শিল্পী
অসিত
পালের
আঁকা
ছবির
প্রচ্ছস
ছাপিয়ে
তাক্
লাগিয়ে
দিয়েছিল।
১৯৮০
সাল
পর্যন্ত
প্রকাশনা
খুবই
স্তিমিত
থাকলেও
১৯৮১
সালের
তৎপরবর্তী
থেকে
বইমেলাকে
কেন্দ্র
করে
ত্রিপুরার
প্রকাশনার
জোয়ারে
একপ্রকার
বিপ্লব
আসে।
কত
কত
বই
ছাপা
হচ্ছে
আর
আমরাও
একের
পর
এক
নানারকম
চিন্তায়
প্রচ্ছদ
করে
গেছি।
“ স্বপন’দা একটা কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ চাই এবং আজকেই! কাল কলকাতায় পাঠাবো।”
– এমন কত আবদারের মুখোমুখি
হয়ে
হয়েছে।
একবার
‘অক্ষর
পাবলিকেশন’
এর
রাজমালার
প্রচ্ছদ
এঁকে
দিলাম
ভোর
পাঁচ’টায় অফিসের দরজা খুলে
, কেননা
তখন
আমার
আঁকার
যাবতীয় সরঞ্জাম আমার কর্মস্থল তথ্য-সংস্কৃতি
দপ্তরের
অফিসেই
থাকতো।
সেই
ভোরেই
এঁকে
দিলাম
রাজবাড়ি
উজ্জ্বয়ন্ত
প্রসাদের
ছবি।
প্রায় কাঁচা অবস্থায়ই কলকাতার
ফ্লাইটে
নিয়ে
উঠলো।
খুব
ভয়
পেয়েছিলাম,
কি
জানি
হয়!
যদিও
পরে
সবাই
খুব
প্রশংসা
করলো।
এইসব
স্মৃতি
তো
মনকে
আজও
গভীরভাবে
দোলা
দেয়।
আবার
লেখকরা
অনেক
ক্ষেত্রে
তাদের
ইচ্ছে
মতো
প্রচ্ছদ
চেয়ে
নানাভাবে
বিরক্ত
করেছেন
এটাও
সত্য! এ’নিয়ে মনোমালিন্যও যে হয়নি, তাও নয়। আবার ভাবও হয়েছে।
প্রশ্ন ঃ এখন তো কম্পিউটারে সব হয়ে যাচ্ছে! এ’নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া --
উত্তর ঃ হ্যাঁ, এখন তো কম্পিউটারে সব হয়ে
যাচ্ছে! ফটোশপে যাও, বোতাম টেপ আর প্রচ্ছদ বানাও!
তাই
তো
এটা
আঁকা
হয়
না,
বানানো
হয়।
আমি
পুরনোতেই
আছি।এ’ব্যাপারে
আমি
আনন্দ
পাবলিশার্সকে
প্রশংসা
করি।
তারা
এখনও
ট্রেডিশনটাকে
মর্যাদার
সহিত
বহন
করে
চলেছে।
ত্রিপুরায়
তরুণ
শিল্পীরাও
অনেক
ভাল
ভাল
প্রচ্ছদ
আঁকছে।
এটা
খুব
আশার এবং প্রশংসার দাবি রাখে।
প্রশ্ন ঃ আপনি একাধারে একজন বাচিক শিল্পী, মূকাভিনয় শিল্পী, ভাল বক্তা, নাটক, শ্রুতিনাটকের সাথেও যুক্ত ছিলেন, গানও জানেন -–একের ভিতর এত বহু! এর রহস্য-কথা নিয়ে আমাদের কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ আসলে, মঞ্চভীতি
জিনিসটা
আমার
ভিতরে
কোনদিনই
ছিল
না।
তাই
অন্ধকার
আসনের
দর্শকদের
সাথে
যোগাযোগ
তৈরি
করতে
আমার
কোনো
অসুবিধা
হত
না।
একবার
গান
শেখার
খুব
শখ
হল
গেলাম।রবীন্দ্রসংগীতের
গুণী
শিল্পী
সমীরকান্তি
দাসের
কাছে।
তিনি
বললেন,
“ স্বপন,
তুমি
আবৃত্তি
কর।
তোমার
কণ্ঠে
গানের
চাইতে
আবৃত্তি
ভাল
হবে!”
শুনে
কষ্টের
বদলে
জেদ
চেপে
গেল।
এমনিতে
বিখ্যাত
আবৃত্তিশিল্পী
কাজী
সব্যসাচী,
প্রদীপ
ঘোষ
এঁদেরে
সান্নিধ্য
আমি
পেয়েছি
কলকাতার
ছাত্রাবস্থায়। প্রতিনিয়ত অভ্যাসের
মাধ্যমে
আবৃত্তি আয়ত্বে আনার চেষ্টা
করেছি।
এখনও
করি।
আর
আমার
লেখা শ্রুতিনাটকের প্রয়োজনে
গানও
এককলি
গেয়ে
দিই
মঞ্চে।
সহশিল্পী
শুভ্রা
ধরও
নাটকের
গান
ভাল
করে।
এতে
চরিত্রের
প্রকাশ
ঘটে
সহজাতভাবে। নাটকটাকেও
অনেক
বেশি
জীবন্ত
মনে
হয়।
প্রশ্ন ঃ আপনার মূকাভিনয় প্রতিভা নিয়ে কিছু বললেন না যে ! কিছু বলুন ?
উত্তর ঃ হ্যাঁ, আমার জীবনে প্রথম প্রেম ছবি আঁকায়, তারপর একে একে মূকাভিনয়, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি।
যোগেশ
দত্ত
মশাইয়ের
মূকাভিনয় প্রথম দেখি কলকাতায়। তখন নিজে কখনও করবো ভাবিনি। ১৯৬৯ সালে রাশিয়া থেকে একটা ছোট্ট সাংস্কৃতিক দল আসে, সেখানে ‘ইউরি’ নামে একটি রাশিয়ান যুবকের মূকাভিনয় দেখে বিস্মিত হয়ে যাই! মনে মনে চেষ্টা করবো নাকি, ভেবেই লেগে গেলাম চেষ্টায়। দো-ভাষীর মাধ্যমে ইউরি’র সাথে আলাপ করে মনের কথা জানালাম। তখন তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে টিপস দিয়ে সাহায্য করেন। তারপর থেকে আয়নার সামনে অভ্যাস শুরু করি । আমার চারপাশের ঘটনাবলী নিয়ে গল্প তৈরি করি। প্রথম একক মূকাভিনয় করি কলকাতার শিশির মঞ্চে ১৯৭০ সালে। এরপর আর থেমে থাকিনি। প্রায় আটচল্লিশ বছর ধরে মূকাভিনয়
করে চলেছি। আগরতলার পুরনো রবীন্দ্র ভবনে দু’ঘণ্টা একক মূকাভিনয় মঞ্চস্থ করেছি। এখন তো বয়েস হয়েছে, তবু নাটকের কর্মশালায় গিয়ে তরুণ প্রজন্মদের শেখাবার চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে আগরতলা, খোয়াই, উদয়পুর, কমলপুর বিভিন্ন জায়গায় কর্মশালা করেছি। নাটকে মূকাভিনয় ভীষণ পজিটিভ ভূমিকা রাখে। এর ব্যবহারও প্রচুর পরিমাণে হয়।
প্রশ্ন ঃ এই বয়সেও আপনি এত তরুণ! এর রহস্য জানতে চাই ?
উত্তর ঃ আসলে, আমি
বসে
থাকতে
পারি
না!
ঝিমুনি
আমার
নেই।
জীবনের
নানা
টানাপড়েনে
সংস্কৃতিই
আমাদের
উজ্জীবিত
করে।
বাঁচিয়ে
রাখে।
আমিও
বেঁচে
আছি
‘এই
সংস্কৃতি’কে ধরেই। আমি ঘুরতে ভালবাসি আর ভালবাসি
দেখতে।
মনে
হয়,
দেখাই
জীবন। দেখাই ছবি !







