Sunday, March 10, 2024

২০২৪ আগরতলা বইমেলায় কয়েকটি বই এবং দু-তিনটি কথা

 

                               ২০২৪ আগরতলা বইমেলায় কয়েকটি বই এবং  দু-তিনটি কথা

                         তমালশেখর দে 

 

 

শীতের শেষ পর্যায়। বাতাসে হিমেল হাওয়া বইছে । বনপ্রান্তর থেকে ভেসে আসছে ঝরাপাতার মর্মর ধ্বনি । আকাশে সাদা মেঘেদের উদাস উড়ে বেড়ানো, সন্ধ্যায় বকপাখিদের সারিবদ্ধ বাড়ি ফেরার দৃশ্য মনকে এমনিতেই প্রেমিক করে তোলে ।  বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বইমেলার হাওয়া এসেএখন ত্রিপুরায় পা ফেলেছে । চারদিকে প্রেমিদের উড়ুউড়ু মন । লেখক-প্রকাশকদের উন্মাদনার কথা তো বলাই বাহুল্য প্রতিটি প্রকাশনাই  এখন ব্যস্ত তাদের মূল্যবান বইটি পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিতে । এই রকম পরিস্থিতিতে ২১ ফেরুয়ারি থেকে “আগরতলা বইমেলা – ২০২৪” শুরু হতে যাচ্ছে ‘নীহারিকা পাবলিশার্স’ বরাবরের মতোই তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও কবিতা-গল্প-উপন্যাস- ছড়া-  সাক্ষাৎকার-স্মৃতিকথা- গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সম্পাদনাধর্মী সব মিলিয়ে প্রকাশ করতে চলেছে প্রায়  ৪২ টি টাইটেলপরিচিত লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখক-লেখিকাদের ঘনঘটা । যে-যার জীবনের অনুভুতিকে মেলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাদের লেখালেখিতে ।

 

 এবাবের নীহারিকা’-র  সমারোহের ভিতর থেকে আমি প্রথমেই বেছে নিই – ‘ হাওয়াই আড্ডা’ বইটি । এবং ফ্ল্যাবের লেখাটাই প্রথম পড়লাম - ‘আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে ‘কাগজের নৌকা’-র বিভিন্ন সংখ্যায় ‘হাওয়াই আড্ডা’- এই শিরোনামে যে ইন্টার্ভিউগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ‘ হাওয়াই আড্ডা’ বইটি তারই সংকলিত রূপ । এই ইন্টার্ভিউগুলোর একটি লিটারারি ভ্যালু রয়েছে । উঠে এসেছে বহু অজানা তথ্যদেখা গেছে একেকজন লেখকের স্ট্রাগল, ইন্টারডিসিপ্লিনারি পাঠ-প্রস্তুতি, ওয়র্ক লাইফ ব্যালেন্স, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, রেজিস্টেল, প্যাশন ও সেলফ এডিটিং, একটি কনটিনিউয়াস প্রসেসের ভেতর দিয়ে তাদের যাত্রাপথ, ধীরে ধীরে ফিকশন হয়ে উঠেছে’ হাওয়াই আড্ডায় মুখোমুখি পাচ্ছি আমরা – শঙ্খপল্লব আদিত্য, যার অসমাপ্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রবুদ্ধসুন্দর কর, পল্লব ভট্টাচার্য যার  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রবুদ্ধসুন্দর কর,  সেলিম মুস্তাফা যার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সত্যজিৎ দত্ত, অমিতাভ দেবচৌধুরী যার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রদীপ মজুমদার, যশোধরা রায়চৌধুরী যার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অমিতাভ দেবচৌধুরী এবং বিকাশ সরকারের আত্মসাক্ষাৎকার । প্রতিটি সাক্ষাৎকারই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে খুবই মূল্যবান । এখানে উল্লেখ, যার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, এবং যিনি নিয়েছেন উভয়েই সাহিত্য জগতে স্ব-নামেই বিখ্যাত । এই ধরণের সংযোগ খুব একটা দেখা যায় না । যেমন প্রশ্ন, তেমনই প্রতিভ উত্তর । প্রবুদ্ধসুন্দর কর আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তার উপস্থিতি আজও তীব্রভাবে উজ্জ্বল ।  তার প্রতিটি তীক্ষ্ন, প্রতিভ প্রশ্ন পড়তে পড়তে  তার ভিতরের নিখুঁত  পাঠ-পর্যবেক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম । প্রতিটি প্রশ্ন নিজেই অর্থবহ । এতে তার শ্রম ও নিষ্ঠা স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছিল । বাকি সাক্ষাৎকারগুলোও দলিল হয়ে থাকবে ত্রিপুরা- সাহিত্যের ইতিহাসে ।

এরপরেই চোখ আটকে পড়ে – বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি-অনুবাদক শাহেদ কায়েস এর ‘মুক্তিকামী মানুষের কবিতা- মাহমুদ দারবিশ’বইটি এই মুহূর্তের একটি উজ্জ্বল দলিল । সদ্যপ্রয়াত মাহমুদ দারবিশ হচ্ছেন ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি । ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরাইল যুদ্ধের সময় ইজরায়েলি  সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম দখল করে নেয় । সেই যে তার উদ্বাস্তু জীবনের শুরু প্রায় সারাজীবনই দেশ ছেড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন তিনি । আজীবন তিনি স্বপ্ন দেখেছেন একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের । মাহমুদ দারবিশকে সাহিত্য জগতে আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর বলা হয়ে থাকে । তাঁর কবিতাই আজ আরবদের দেশপ্রেম ও সংগ্রামের ভাষা । কবিতাই ছিল মাহমুদ দারবিশের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন । মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখে গেছেন । তাঁর কবিতাই আজ বিপ্লবী ফিলিস্তিনি মানুষের অনুপ্রেরণা ।

এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির কবিতা অনুবাদ করে  শাহেদ কায়েস বাংলাভাষী পাঠকদের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন বলা যায় ! মাহমুদ দারবিশ তাঁর কবিতায় যখন লেখেন – “ লিখে রেখো / আমি একজন আরব / আমার কোনো গোত্র পরিচয় নাই/ আমার নিবাস এমন একটি দুর্ভোগের দেশে / যেখানে সবকিছুই টিকে থাকে -/ ঘৃণা আর অন্ধক্রোধের ঘূর্ণিস্রোতে /... এখানেই আমার শেকড়, আমিই ভূমিপুত্র।” ( পরিচয় পত্র)।  এই কবির ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে রয়েছে এই সময়ের ক্ষত-বিক্ষত যন্ত্রণার দাগ । একটা রাষ্ট্রের নিকৃষ্ট রাজনীতির শিকার কীভাবে আরেকটি রাষ্ট্র তারই জীবন দলিল যেন এই কাব্যগ্রন্থ ।  অনুবাদক শাহেদ কায়েস খুবই সময়োপযোগী একটা কাজ করেছেন । কাব্যকথার অন্তরালে  একটি জাতির জীবন্ত আত্মকথা তিনি যেন তুলে ধরেছেন পড়তে পড়তে একসময় কবিতাগুলো  পাঠককেও গ্রাস করে ফেলে ।  

এরপর চোখ যায় শুভদীপ দেব-এর  কাব্যগ্রন্থ “ ষোড়শপদ্মের নীল” কাব্যগ্রন্থের দিকে । গোটা কাব্য পড়ে মনে হয়েছে – অপ্রথার ছন্দ, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের দৃশ্যকল্প, ভাবনার বিস্তার স্রোতের মত গড়িয়ে যেতে থাকে শুভদীপের কবিতায় । মধ্যবর্তী নীরবতা কথাস্রোতের অন্তরে জলের মতই মিশে থাকে । ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দুর্বিষহ যন্ত্রণার উৎসারণের পরও জীবন যে প্রেমদায়ী, সেই জীবনপথের মুহূর্তগুলি গেঁথে গেঁথে রচিত হয়েছে তাঁর পঞ্চম কাব্য “ ষোড়শপদ্মের নীল”। শুভদীপ দেব-ই লিখতে পারে – “ আমি জানি / আমি কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি কীভাবে যাচ্ছি / আমি জানি আমার কবিতার কথায় ভুল থাকে / আমি জানি ভুলের একশো আট পাতা প্রজ্ঞার কথা / জীবনের নিবিড় উপক্রমণিকা সহ্য করতে করতে / পুড়ে গেছে আমার হৃদয়ের অন্তরাল”। ( জবানবন্দি)। শুভদীপ ত্রিপুরার কবিতার এক উজ্জ্বল  প্রদীপ ।

এরপর হাত বাড়াই মৌলিক মজুমদার-এর গল্পগ্রন্থ “ গল্পসত্র”-র দিকে । মৌলিক মজুমদারকে কবি হিসেবেই এতদিন জেনে এসেছি । এবার গল্পকার হিসেবে পেলাম – ‘ ভাইরাস’ ‘নয়ন’ ‘বুনো বেড়াল’ ‘কেতকী দত্ত ক্ষমা করবেন প্লিজ’ ‘ সাইকো’ ‘ইচ্ছে ডানায়’ ‘আগুনচরিত’ ‘ কালা মিঞা শিশু উদ্যান’ ‘খাদ’ ‘ভোট’ ‘ছেঁড়া ছেঁড়া সুখ’ ‘শনি থেকে সোম’ ‘প্রতিবস্তু’ । প্রতিটি গল্পেই জীবনের ছোটো ছোটো মনোজগতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মৌলিক । সামাদের মনোজগতকে দেখতে চেয়েছেন নানাদৃষ্টিকোণ থেকে ।  গল্পের কথনভঙ্গির পাশাপাশি কাহিনি বিন্যাসেও নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন তিনি । খুবই সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে আমার ।

এরপর হাতে তুলে নিই  নীহারিকার এবারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি বই.উমাশঙ্কর রায় এরসিটি অফ আগরতলাঃ ডেভেলোপম্যান্ট, প্র্যাবলেমস্ এণ্ড মিউনিসিপাল সেট-আপ গ্রন্থের নামের ভিতর দিয়েই বইয়ের ভিতরের  বিষয়বস্তু প্রায় স্পষ্ট ফোটে ওঠে আধুনিক ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা সম্পর্কে মানে তার অতীত, তার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশকে  খুবই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক আগরতলার অতীত- বর্তমানকে তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করে, তার জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মিউনিসিপাল সেট-আপ, রাজ্যের ভিতরের আন্তঃসম্পর্ককেও বিশ্লেষণ করেছেন নির্মোহভাবে   ত্রিপুরার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা এবং বিকাশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন .উমাশঙ্কর রায় এককথায় আগরতলাকে সামনে রেখে লেখক গোটা ত্রিপুরা সম্পর্কে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল  তুলে ধরেছেন তার এই গ্রন্থে

 

এবার তার ৪২ টি গ্রন্থে নানাভাবে সমীক্ষা করেছেনপ্রকাশনার  গুনগত মানের দিকে রেখেছে কঠোর মনোভাব । কবিতা-গল্প-উপন্যাস- ছড়া- সাক্ষাৎকার-স্মৃতিকথা- গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সম্পাদনাধর্মী সব মিলিয়ে একটা জমজমাট প্যাকেজ নিয়ে সে হাজির হয়েছে “ ৪২তম আগরতলা বইমেলা- ২০২৪”আপনারা আসুন, দেখুন এবং আপনাদের প্রিয় গ্রন্থটিকে ভালবেসে গ্রহণ করুন । পাঠককেও উৎসাহিত করুন । বই মানুষের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করে । জীবনকে বুঝতে সাহায্য করে । জীবনকে করে তুলে সুন্দর এবং আশাবাদী । কথায় আছে –“ বই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আত্মীয়, যার সাথে কোনদিন ঝগড়া হয় না, কোনদিন মনোমালিন্য হয় না ।”  চলুন ২০২৪ সালের আগরতলা বইমেলায় আমরা আমাদের আত্মীয় বাড়াই । ভালবাসা ছড়াই মাঠজোড়ে ।

“বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন...” - সেলিম মুস্তাফা

 






                “বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন...”

                    আলোচনা – সেলিম মুস্তাফা

 কবি জাফর সাদেকের এই যে উচ্চারণ, তা আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতায় কখনও না কখনও এসেই যায় । কেউ সয়ে নিতে পারে, কেউ পারে না ।

১৯৯০ সালে প্রয়াত কবি জাফর সাদেককে নিয়ে একটি সুদীর্ঘ পর্যটন সারলেন আরেক কবি তমালশেখর দে । এই ভ্রমণের লিপিলেখা নিহত রাত্রির দরজা পাঠ, পুনঃপাঠএই শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন নীহারিকা পাবলিশার্স

কবি জাফর সাদেকের একটিই কাব্যগ্রন্থ নিহত রাত্রির দরজাতাঁর অকাল মৃত্যুর পর সতীর্থরা বের করেন । তাতে ৫০টির মত কবিতা সংযোজিত হয় । এছাড়া অপ্রকাশিত নাকি রয়ে গেছে আরও অজস্র কবিতা ।  রয়ে গেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় । তমালশেখর সেই ৫০টি ছাড়াও আরও দু-একটি সংগ্রহ করে তার আলোচনায় যুক্ত করতে পেরেছেন । সার্বিকভাবে তাকে সহযোগিতাও করেছেন কবির অগ্রজ আকবর আহমেদ এবং তাদের গোটা পরিবার । আকবর আহমেদও কবি ।

নিহত রাত্রির দরজাআমি আগেও পড়েছি । এবং সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই জীবন ও কবিতার নতুন দিশা আবিষ্কারের আনন্দ ও বিস্ময় দিয়েছে । যিনি পড়বেন তিনিই হোঁচট খেতে খেতে বিস্মিত হবেন । কেননা উনিশ বছর বয়েসের কবি জাফরের এই কাব্যপথ মোটেই কোনো বইমেলার দিকে যায়নি, গিয়েছে এক এবড়োখেবড়ো পথে রক্তাক্ত পা নিয়ে শেষপর্যন্ত এক কবরের কিনারে, যেখানে গোলাপ চারার মতো উঁচিয়ে আছে তাঁরই মায়ের হাত ।

এই পথ ভোলার নয় । এবার তাতে আরও কাঁটা ছড়িয়ে দিলেন কবি ও আলোচক তমালশেখর দে । এবার আমরা আরও রক্তাক্ত হবো, হয়ত কাঁদবোও গোপনে, নিঃস্ব হবো কিন্তু নিরাশ হবো না । জাফরের কবিতা দুর্বোধ্য নয়, অচেনা । স্যুট কোট টাই পরে প্রতিদিনের পরিচিত রাজপথ দিয়ে মচমচ করে হেঁটে যাওয়া কবিতা নয় জাফরের । বিশেষভাবে জাফরের শব্দচয়ন আর বাক্যগঠন একাধারে পাঠকের মেধা ও কল্পনাসমৃদ্ধ মনোযোগ দাবি করে । কঠিন শব্দ নয়, তবে অনেক অব্যবহৃত শব্দ  অত্যন্ত মোক্ষমভাবে তার এসে কবিতায় বসেছে । ফলে কবির কথা হয়েছে আরও আটপৌরে ও আন্তরিক এবং অবশ্যই গভীরসঞ্চারী । কখনো প্রচলিত সিন্টেক্স এমনভাবে নেড়ে দিয়েছেন যে, গোটা বাক্যটা বোঝা গেলেও একটা অপরিচিতির আকর্ষণ নিয়ে ঝকমক করে উঠেছে । এই দক্ষতা একজন উনিশ বছর বয়েসের কবির চেতনায় কী করে সৃষ্টি হয়, ভাবলে সত্যি অবাক লাগে । আরবি ফার্সি উর্দু শব্দের নিপুণ ব্যবহার কবিতাকে এক অন্যভুবনে নিয়ে যায় মুহূর্তেই । তেমনি রয়েছে অনেক তৎসম ও গ্রাম্য শব্দের ব্যবহার । যার শরীরে চব্বিশ ঘণ্টা বাতের যন্ত্রণা আর মনে মা-কে হারানোর অকূল কান্না, শব্দ আর বাক্য যেন তাকে আর ব্যথা না দিয়ে নিজে নিজেই এসে বসেছে তার কবিতার খাতায়, এতোই স্বাভাবিক মনে হয় । সব মিলিয়ে  জাফরের কবিতা এক অন্যভুবন থেকে যেন আগত । তাই একে স্বাগত জানাতে হলে উপযুক্ত ক্ষেত্রও জরুরি হয়ে ওঠে । আর সেই ক্ষেত্রটাই গোটা গ্রন্থ জুড়ে ধীরে ধীরে তৈরি করে গেছেন আলোচক তমালশেখর দে ।

কথাটা হচ্ছে, একজনের কবিতা যে স্তরের, আলোচনাও সেই স্তরের হওয়া বাঞ্ছনীয় । আলোচক তমালশেখর এই গ্রন্থে সেই কাজটিই, দীর্ঘ সময় নিয়ে, কোনো এপোরিয়া বা অন্ধবিন্দু হেলায় এড়িয়ে না গিয়ে, কবির ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যের প্রকৃত তাৎপর্যকে ছোঁবার চেষ্টা করে গেছেন অবিনির্মাণের ধারাবাহিকতায়, অর্থ ও তার বহুলার্থতাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে, তিলে তিলে, অসীম ধৈর্য সহকারে । এজন্য তাকে কখনো যুক্তির সাহায্য নিতে হয়েছে যেমন, তেমনি প্রশ্রয় দিতে হয়েছে অযৌক্তিকতাকেও, কারণ কবিতার প্রাণ তো ভাবনা আর দৃষ্টির উলম্ফনে, দৃষ্টির উদ্বৃত্ততায় । কবিতা তো যুক্তির বাইরের অবসরটুকুই, যেখানে বাগানের ফুল আর কবরের ফুল একই বাতাসে দোল খায়, একই বেদনায় মাথা নত করে ফেলে ।

বস্তুত কবি জাফর সাদেক এক বিস্ময় । উনিশ বছর বয়েসে একজন কবি কতটুকু সময় সাধারণত ব্যয় করেন বা করতে পারেন কবিতার জন্য, এটা মনে রেখে যদি তার কবিতার গহীনে প্রবেশ করতে চাই, তাহলে  বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কোনো অপ্শন থাকে না । এবং এই কথাটা স্বীকার করে নিলেই হয়ত বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কবিরা নিজেকে সমৃদ্ধ ভাবতে পারবেন, যদিও এটা দুরূহ ব্যাপার, কিন্তু এটা এড়িয়ে যাবারও কোনো উপায় নেই । উপায় নেই কবি জাফর সাদেককে কোনো না কোনো বাহানায় পাঠ-তালিকায় ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার । এখনই পড়তে হবে । পড়তেই হবে। আগামীর কবিতার গুহামুখ এই নিহত রাত্রির দরজার ভেতরেই ।

একটা ভীষণ দুঃসাধ্য কাজ করেছে কবি ও আলোচক তমালশেখর দে । বইটি তৈরি করার বহু আগে থেকেই তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । ফলে কয়েকবার বিশালগড়ের অদূরে কবির বিষণ্ন বাড়িতে তাকে যেতে হয়েছে । কথা বলেছেন জাফর সাদেকের অগ্রজ আকবর আহমেদের সঙ্গে ও তাদের বোনদের সঙ্গেও । এর বিস্তৃত বিবরণ তিনি গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন । তমাল কাজটি করেছেন তার নিজের একান্ত কবিতা-প্রীতি থেকেই । এই মহাশ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়ত কখনোই হবে না, হয় না । আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি এই বই পড়েই থাকবে প্রকাশকের শেলফে দিনের পর দিন । দু-চার কপি হয়ত তৎক্ষণাৎ চলে যাবে পাঠকের হাতে। এটাও কম কথা নয় । আজকাল নেট ছাড়া অন্য কোথাও কেউ কিছু পড়ে না । সময় নেই, বইমেলার গাড়ি এসে হর্ন দিতে থাকে । হাজার হাজার কবিতা বইমেলার মাঠময় ব্যুমেরাঙের মতো ঘুরতেই থাকে ঘুরতেই থাকে, কেউ কাউকে রেয়াত করে না । এই অবস্থায় এমন আরোগ্যহীন কবিতা ও তার উপলব্ধির বয়ান কে চাইবে হৃদয়ে বহন করতে ? তবু কবিতা তো কবিতাইএকটা নিরুপম মাধ্যম নিজেকে প্রকাশের, যা যত আলোচনা করা যায় ততই যেন দূরে যেতে থাকখুলে যেতে থাকে জানালার পর জানালা ।

ত্রিপুরায় বাংলা আলোচনা-সাহিত্য এই গ্রন্থ একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবেই স্থাপিত হলো বলেই আমি মনে করি । তবে পঠিত না হলে কোনো গ্রন্থেরই অস্তিত্ব আছে বলে স্বীকার করা যায় না । বই প্রকাশের আসল চাবি চিরকালই পাঠকের হাতে । জাফর বলেন

 

‘… জীবনের গেয় মানচিত্র তুলতে গিয়ে

হয়তো কখনো গুণে ফেলেছি আকাশের নক্ষত্র ।

জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি

কবরের পাশে । … …’

 

গ্রন্থ :  জাফর সাদেক নিহত রাত্রির দরজা পাঠ, পুনঃপাঠ ।

লেখক : তমালশেখর দে ।

প্রকাশক : নীহারিকা পাবলিশার্স ।

 মূল্য : ৪০০ টাকা ।

 

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...