Sunday, March 10, 2024

“বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন...” - সেলিম মুস্তাফা

 






                “বিষবৃক্ষের নীচে যে একাকিত্বের আলিঙ্গন...”

                    আলোচনা – সেলিম মুস্তাফা

 কবি জাফর সাদেকের এই যে উচ্চারণ, তা আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতায় কখনও না কখনও এসেই যায় । কেউ সয়ে নিতে পারে, কেউ পারে না ।

১৯৯০ সালে প্রয়াত কবি জাফর সাদেককে নিয়ে একটি সুদীর্ঘ পর্যটন সারলেন আরেক কবি তমালশেখর দে । এই ভ্রমণের লিপিলেখা নিহত রাত্রির দরজা পাঠ, পুনঃপাঠএই শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন নীহারিকা পাবলিশার্স

কবি জাফর সাদেকের একটিই কাব্যগ্রন্থ নিহত রাত্রির দরজাতাঁর অকাল মৃত্যুর পর সতীর্থরা বের করেন । তাতে ৫০টির মত কবিতা সংযোজিত হয় । এছাড়া অপ্রকাশিত নাকি রয়ে গেছে আরও অজস্র কবিতা ।  রয়ে গেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় । তমালশেখর সেই ৫০টি ছাড়াও আরও দু-একটি সংগ্রহ করে তার আলোচনায় যুক্ত করতে পেরেছেন । সার্বিকভাবে তাকে সহযোগিতাও করেছেন কবির অগ্রজ আকবর আহমেদ এবং তাদের গোটা পরিবার । আকবর আহমেদও কবি ।

নিহত রাত্রির দরজাআমি আগেও পড়েছি । এবং সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই জীবন ও কবিতার নতুন দিশা আবিষ্কারের আনন্দ ও বিস্ময় দিয়েছে । যিনি পড়বেন তিনিই হোঁচট খেতে খেতে বিস্মিত হবেন । কেননা উনিশ বছর বয়েসের কবি জাফরের এই কাব্যপথ মোটেই কোনো বইমেলার দিকে যায়নি, গিয়েছে এক এবড়োখেবড়ো পথে রক্তাক্ত পা নিয়ে শেষপর্যন্ত এক কবরের কিনারে, যেখানে গোলাপ চারার মতো উঁচিয়ে আছে তাঁরই মায়ের হাত ।

এই পথ ভোলার নয় । এবার তাতে আরও কাঁটা ছড়িয়ে দিলেন কবি ও আলোচক তমালশেখর দে । এবার আমরা আরও রক্তাক্ত হবো, হয়ত কাঁদবোও গোপনে, নিঃস্ব হবো কিন্তু নিরাশ হবো না । জাফরের কবিতা দুর্বোধ্য নয়, অচেনা । স্যুট কোট টাই পরে প্রতিদিনের পরিচিত রাজপথ দিয়ে মচমচ করে হেঁটে যাওয়া কবিতা নয় জাফরের । বিশেষভাবে জাফরের শব্দচয়ন আর বাক্যগঠন একাধারে পাঠকের মেধা ও কল্পনাসমৃদ্ধ মনোযোগ দাবি করে । কঠিন শব্দ নয়, তবে অনেক অব্যবহৃত শব্দ  অত্যন্ত মোক্ষমভাবে তার এসে কবিতায় বসেছে । ফলে কবির কথা হয়েছে আরও আটপৌরে ও আন্তরিক এবং অবশ্যই গভীরসঞ্চারী । কখনো প্রচলিত সিন্টেক্স এমনভাবে নেড়ে দিয়েছেন যে, গোটা বাক্যটা বোঝা গেলেও একটা অপরিচিতির আকর্ষণ নিয়ে ঝকমক করে উঠেছে । এই দক্ষতা একজন উনিশ বছর বয়েসের কবির চেতনায় কী করে সৃষ্টি হয়, ভাবলে সত্যি অবাক লাগে । আরবি ফার্সি উর্দু শব্দের নিপুণ ব্যবহার কবিতাকে এক অন্যভুবনে নিয়ে যায় মুহূর্তেই । তেমনি রয়েছে অনেক তৎসম ও গ্রাম্য শব্দের ব্যবহার । যার শরীরে চব্বিশ ঘণ্টা বাতের যন্ত্রণা আর মনে মা-কে হারানোর অকূল কান্না, শব্দ আর বাক্য যেন তাকে আর ব্যথা না দিয়ে নিজে নিজেই এসে বসেছে তার কবিতার খাতায়, এতোই স্বাভাবিক মনে হয় । সব মিলিয়ে  জাফরের কবিতা এক অন্যভুবন থেকে যেন আগত । তাই একে স্বাগত জানাতে হলে উপযুক্ত ক্ষেত্রও জরুরি হয়ে ওঠে । আর সেই ক্ষেত্রটাই গোটা গ্রন্থ জুড়ে ধীরে ধীরে তৈরি করে গেছেন আলোচক তমালশেখর দে ।

কথাটা হচ্ছে, একজনের কবিতা যে স্তরের, আলোচনাও সেই স্তরের হওয়া বাঞ্ছনীয় । আলোচক তমালশেখর এই গ্রন্থে সেই কাজটিই, দীর্ঘ সময় নিয়ে, কোনো এপোরিয়া বা অন্ধবিন্দু হেলায় এড়িয়ে না গিয়ে, কবির ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যের প্রকৃত তাৎপর্যকে ছোঁবার চেষ্টা করে গেছেন অবিনির্মাণের ধারাবাহিকতায়, অর্থ ও তার বহুলার্থতাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে, তিলে তিলে, অসীম ধৈর্য সহকারে । এজন্য তাকে কখনো যুক্তির সাহায্য নিতে হয়েছে যেমন, তেমনি প্রশ্রয় দিতে হয়েছে অযৌক্তিকতাকেও, কারণ কবিতার প্রাণ তো ভাবনা আর দৃষ্টির উলম্ফনে, দৃষ্টির উদ্বৃত্ততায় । কবিতা তো যুক্তির বাইরের অবসরটুকুই, যেখানে বাগানের ফুল আর কবরের ফুল একই বাতাসে দোল খায়, একই বেদনায় মাথা নত করে ফেলে ।

বস্তুত কবি জাফর সাদেক এক বিস্ময় । উনিশ বছর বয়েসে একজন কবি কতটুকু সময় সাধারণত ব্যয় করেন বা করতে পারেন কবিতার জন্য, এটা মনে রেখে যদি তার কবিতার গহীনে প্রবেশ করতে চাই, তাহলে  বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কোনো অপ্শন থাকে না । এবং এই কথাটা স্বীকার করে নিলেই হয়ত বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কবিরা নিজেকে সমৃদ্ধ ভাবতে পারবেন, যদিও এটা দুরূহ ব্যাপার, কিন্তু এটা এড়িয়ে যাবারও কোনো উপায় নেই । উপায় নেই কবি জাফর সাদেককে কোনো না কোনো বাহানায় পাঠ-তালিকায় ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার । এখনই পড়তে হবে । পড়তেই হবে। আগামীর কবিতার গুহামুখ এই নিহত রাত্রির দরজার ভেতরেই ।

একটা ভীষণ দুঃসাধ্য কাজ করেছে কবি ও আলোচক তমালশেখর দে । বইটি তৈরি করার বহু আগে থেকেই তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । ফলে কয়েকবার বিশালগড়ের অদূরে কবির বিষণ্ন বাড়িতে তাকে যেতে হয়েছে । কথা বলেছেন জাফর সাদেকের অগ্রজ আকবর আহমেদের সঙ্গে ও তাদের বোনদের সঙ্গেও । এর বিস্তৃত বিবরণ তিনি গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন । তমাল কাজটি করেছেন তার নিজের একান্ত কবিতা-প্রীতি থেকেই । এই মহাশ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়ত কখনোই হবে না, হয় না । আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি এই বই পড়েই থাকবে প্রকাশকের শেলফে দিনের পর দিন । দু-চার কপি হয়ত তৎক্ষণাৎ চলে যাবে পাঠকের হাতে। এটাও কম কথা নয় । আজকাল নেট ছাড়া অন্য কোথাও কেউ কিছু পড়ে না । সময় নেই, বইমেলার গাড়ি এসে হর্ন দিতে থাকে । হাজার হাজার কবিতা বইমেলার মাঠময় ব্যুমেরাঙের মতো ঘুরতেই থাকে ঘুরতেই থাকে, কেউ কাউকে রেয়াত করে না । এই অবস্থায় এমন আরোগ্যহীন কবিতা ও তার উপলব্ধির বয়ান কে চাইবে হৃদয়ে বহন করতে ? তবু কবিতা তো কবিতাইএকটা নিরুপম মাধ্যম নিজেকে প্রকাশের, যা যত আলোচনা করা যায় ততই যেন দূরে যেতে থাকখুলে যেতে থাকে জানালার পর জানালা ।

ত্রিপুরায় বাংলা আলোচনা-সাহিত্য এই গ্রন্থ একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবেই স্থাপিত হলো বলেই আমি মনে করি । তবে পঠিত না হলে কোনো গ্রন্থেরই অস্তিত্ব আছে বলে স্বীকার করা যায় না । বই প্রকাশের আসল চাবি চিরকালই পাঠকের হাতে । জাফর বলেন

 

‘… জীবনের গেয় মানচিত্র তুলতে গিয়ে

হয়তো কখনো গুণে ফেলেছি আকাশের নক্ষত্র ।

জন্মদাকে ভুলতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছি

কবরের পাশে । … …’

 

গ্রন্থ :  জাফর সাদেক নিহত রাত্রির দরজা পাঠ, পুনঃপাঠ ।

লেখক : তমালশেখর দে ।

প্রকাশক : নীহারিকা পাবলিশার্স ।

 মূল্য : ৪০০ টাকা ।

 

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...