অসাধারণ এক স্মৃতির নকশীকাঁথা “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া”
তমালশেখর দে
নদী-মাতৃক
বাংলাদেশের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের ঐতিহ্যবাহী তিতাস-বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া
। শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীটস্থান হিসেবে পরিচিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক
রাজধানীও বলা হয়। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ,
ব্যারিস্টার এ রসুল,সৈয়দ শামসুল হুদা, প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ ,
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত,কবি আব্দুল কাদিরসহ বহু গুণীজনের জন্মধন্য জেলা এই
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।ত্রিপুরার সীমান্ত সংলগ্ন এই অংশ এক সময় ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত
ছিল। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে “আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া” গ্রন্থ রচনা করেছেন রাজ্যের
বিশিষ্ট সঙ্গীতব্যক্তিত্ব মায়া রায়। নজরুল ইসলামের উপর তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ
সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অনেক আগেই। এবার তাঁর মেয়েবেলা, বড় হওয়া ,
সঙ্গীতশিক্ষা , এই সব প্রায় বাইশটি ছোটো ছোটো নিবন্ধ লিখেছেন মায়া রায়। এত সাবলীল গদ্যভাষা তরতর করে পড়ে
যেতে যেতে, কখন যেন পাঠক হিসেবে নিজেই মিশে গেলাম লেখিকার সাথে। শুধু কি তাঁর সাথে
মিশলাম? না, আসলে, এক অপূর্ব বাংলাদেশকে পেয়ে যাই মনের অন্তরালে। তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বা বাওনবাইড়ার
সংস্কৃতি, সামাজিক হিন্দু- মুসলিমের মেলবন্ধনের ভিতর কোথাও যেন হারিয়ে যাওয়া যায়
বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে। যাদের
পূর্ববঙ্গের সাথে ক্ষীণমাত্র সম্পর্ক আছে, তারা মুহূর্তেই এই বই পড়তে পড়তে সেই
স্মৃতিময়তায় হারিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। আর যাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই, তারও লেখিকার
লেখনীর জাদুতে হাতিয়ে যাবেন নিজেদের শৈশবে। কখনও বা যৌবনে। ‘শ্রীমাস্টার’
‘নিদানদা’ ‘আমার গৃহশিক্ষক’ ‘ধনীপিসি’ ‘ফুলবাসীর মা’ ‘হেনাদি’ এইসব চরিত্রের কথা
শুনতে শুনতে প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য হবেন পাঠকরা। কোথাও মনে হবে, এইসব চরিত্রের সাথে
কোথাও-না-কোথাও আমিও জড়িয়ে ছিলাম। একটা আশ্চর্য
মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়। মনে হয়, এদের আমিও যেন কোথাও দেখেছি।
কথা বলেছি প্রতিটি
চরিত্রের সাথে। এই
যে সংযোগ গড়ে তোলা, এখানেই আমার মতে লেখিকার সার্থকতা। আবার যেমন তার – ‘ব্রত পার্বণ’ ‘পয়লা
বৈশাখ’ ‘রবীন্দ্র জয়ন্তী’ ‘দুর্গাপূজা’ ‘ঈদ উৎসব’ এই নিবন্ধগুলি পড়তে পড়তে সেই সময়ের পরিবেশ, পরিস্থিতি, সেই মায়াময় এক
সময়ের কথাচিত্র ফোটে ওঠে লেখিকার স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে। আবার ‘নৌকা বাইচ’ ‘খেলাধূলা’ ‘মামার বাড়ি
কৃষ্ণপুর’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তন্ময় করে দেয়। সেই তিতাস নদীর উপর দিয়ে কলের গান
শুনতে শুনতে পরিবারের সাথে মামার বাড়ি যাওয়ার বর্ণনা, এককথায় অসাধারণ এক অনুভূতি। যা মুহূর্তেই
মনকে আলোড়িত করে তোলে। অবশেষে শেষ নিবন্ধ ‘স্মৃতিগুলো রয়ে যায়’ মনকে উদাস করে
দেয়, লেখিকা এত বছরও যখন বলেন- “ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চলে আসার পরও তিতাস পারের
সঙ্গে আমার সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন হয়নি। বরং উত্তরোত্তর সেই বাঁধন আরও দৃঢ় হয়েছে।
জন্মভূমির মাটির টান কে ভুলতে পারে?” তখন মনটা কেমন এক নস্টালজিয়ায় ভুগতে থাকে। এই
কঠিন সময়ে লেখিকা শিকড়ে মোচড় দেন। ফেলে আসা বাংলাদেশের জন্য এখনও তিনি কাঁদেন। লালন করেন তার ভালোবাসা।
“আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া” বইটি পড়তে পড়তে শেষে গিয়ে
মনে হয়, যেন একটি উপন্যাসই পড়ে ফেললাম। কত চরিত্রের মসৃণ সমাবেশ লেখিকা টেনে আনলেন
গল্পের ছলে তার লেখায়। আসলে আত্মজীবনীমূলক আলোচনাকে বা স্মৃতিচারণাকে একটা সময়ের নিরিখে পর্যায়ক্রমে
উপন্যাসের ছকে ফেলে দেয়াই লেখিকা মায়া রায়ের অন্যতম
কৃতিত্ব
বলে
মনে হয়েছে
আমার।
বইটি পড়তে পড়তে সময়, সমাজ, এবং
তৎকালীন সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিকেও অনুমান করা যায়। বইটি পাঠককে
সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
‘আমার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া’
লেখিকাঃ মায়া রায়
নীহারিকা
প্রকাশনী, আগরতলা
মূল্য ঃ ২৫০ টাকা

No comments:
Post a Comment