** রবীন্দ্র-চিত্রকলায় সময় এখনও তীব্রভাবে কথা বলে **তমালশেখর দে
সময় তার মনন বদলায়। মন বদলায়
মানসিকতা। ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ শীর্ষক যামিনী রায়ের একটি লেখার পরিপ্রেক্ষিতে
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – ‘ তোমাদের মত গুণীর সাক্ষ্য
আমার পক্ষে পরম আশ্বাসের বিষয়।...আমি জানি চিত্র দর্শনের যে-অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের
বিচারশক্তিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে প্রচার করা যায়, আমাদের দেশে তার কোনো
ভূমিকাই হয়নি।’ এখানে কবির অভিমান স্পষ্টতই ধরা পড়ে। আমরা সবাই জানি, রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখতে
গিয়ে আঁকিবুঁকি কাটার অভ্যাস ছিল, ইংরিজিতে যাকে বলে ‘ডুডলিং’৷ রবীন্দ্রনাথের এই লিপিচিত্র সত্যিই একটা আশ্চর্য জিনিস। কবি তাঁর প্রথম জীবনের পাণ্ডুলিপিতেও
মাঝে মাঝে এরকম কিছু আঁকিবুঁকি কেটেছেন, তাও আমরা দেখেছি। আমরা
তাঁর চিঠিপত্র বিভাগে পাই, রবীন্দ্রনাথ
যামিনী রায়কে লিখছেন- ‘ছবি কি?’ এই প্রশ্নের উত্তর এই যে – সে একটি নিশ্চিত
প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সাক্ষী। তার ঘোষণা যতই স্পষ্ট হয়, যতই সে হয় একান্ত, ততই সে হয় ভালো। তার
ভালো-মন্দের আর কোনো যাচাই হতে পারে না। আর যা কিছু – সে অবান্তর,
অর্থাৎ যদি সে কোনো
নৈতিক বাণী আনে, তা উপরি দান।’ রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা আজও চূড়ান্ত
প্রাসঙ্গিক। একবার এক ফরাসি সমালোচক
বলেছিলেন- ‘রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতা
লেখেন, তখন ছবি আঁকেন৷ আর যখন ছবি
আঁকেন, তখন লেখেন কাব্য।’
রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার
বিষয় নিয়ে কথা উঠলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ছবিতে পাশ্চাত্য রীতির প্রসঙ্গ চলে আসে। চিত্রশিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ আসলে কি
চেয়েছিলেন তার ছবিতে? আমরাই বা এখন কি পাচ্ছি? আজকের জেনারেশন কীভাবে নিচ্ছে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের কাজ? এই নিয়ে ত্রিপুরার চিত্রশিল্পী পুষ্পল দেবের
সাথের কথা হচ্ছিল। গল্পে গল্পে জানতে
চাইলাম- ‘আজকের বাজারে দাঁড়িয়ে
রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে একজন তরুণ খুব বেশি মাথা ঘামতে যাবে কেন? তার উপযোগিতাটাই
বা কোথায় ?’ পুষ্পল চমকে উঠে বলে- ‘ বল কি বস্! পুরো বাজারটাই এখন তাঁর উপর
দাঁড়িয়ে! উত্তর আধুনিকতার এই যুগে রবীন্দ্রনাথের ছবি এখন ব্যান্ড।’ আমি আসলে
মানসিকভাবে এমন একটা উচ্ছ্বসিত প্রশংসার জন্য তৈরি ছিলাম না। চমকিত হয়ে বললাম-‘কীভাবে?’
পুষ্পল বলল-‘ ওমা! আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ একটা প্যাকেজ। মঞ্চ সাজানো থেকে
সিনেমা, সিনেমা থেকে গারমেন্স শিল্প, গারমেন্স শিল্প থেকে ঘরের অন্দরশিল্প,
গৃহসজ্জা সবকিছুতেই তো এখন রবীন্দ্রনাথ। তিনিই তো এখন চূড়ান্ত
আধুনিকতার কনসেপ্টে। দিনদিন তাঁকে ঘিরে ক্রেজ
বাড়ছে। খুব সস্তা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বাজার চাইছে রবীন্দ্রনাথকে।’ কথাটা
কিন্তু সে অর্থে আমি এতক্ষন ভেবে দেখিনি। আমাদের মানসিক পরিবর্তনের সাথে সাথে একটা
শ্রেণির কাছে রবীন্দ্রনাথ দিনদিন ক্রমেই গ্রহণীয় হয়ে উঠছেন। গারমেন্স শিল্পে তো
বটেই। ফ্যাশন জগতে যারা কাজ করেন তারা
সবাই জানে, স্টাইল ক্রমশ নিম্নগামি হয়। এটাই তার ধরণ। আর সেই নিরিখে দেখতে
গেলে রবীন্দ্রপ্রেম বা উন্মাদনা আজ নিম্নমুখি। ঘরের অন্দরসজ্জায় রবিঠাকুর আজ
অনেকটা জুড়েই। রবীন্দ্রনাথের কবিতার আঁকিবুকি নিয়ে পোশাক শিল্প এক
সময় একটা শ্রেণির পছন্দ তালিকায় থাকলেও, আজ তা সাধারণে চলে এসেছে। শাড়ির শাখা-প্রশাখায়
কি অসাধারণভাবে সেজে উঠছে তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ। পাঞ্জাবিতে ভেসে উঠেছে কবির অসাধারণ
সব কবিতার, গানের লাইন।চিত্রলিপি। নতুনভাবে যেন সেজে উঠছে যেন কবিতাগুলো। পয়লা
বৈশাখের দিন হয়ে ওঠে রবীন্দ্রময়। প্যারিসের
সফল প্রদর্শনীর পর কবি উচ্ছ্বসিত হয়ে ইন্দিরা দেবীকে লিখেছিলেন-‘ফ্রান্সের মত কড়া
হাকিমের দরবারেও শিরোপা মিলেছে-কিছুমাত্র কার্পণ্য করেনি।’ কবিগুরু আজ বেঁচে থাকলে, তরুণ প্রজন্মের এই উন্মাদনাকে
কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন কে জানে! আমি এই সময়ে বিভিন্ন প্রান্তের ভাবনাকে যাচাই করে
দেখতে চেয়েছিলাম। তাই পশ্চিমবঙ্গের
তরুণ কবি ও চিত্রশিল্পী আদিদেব মুখোপাধ্যায়ের
কাছে কথায় কথায় জানতে চেয়েছিলাম - ‘ছবি বাজারের এতো সব ছবির ভিড়ে রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে একজন তরুণ কতটা আগ্রহী বা তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কতোটাই বা
জরুরী ?’
প্রতিক্রিয়ায় বললেন – ‘সাধারণত রবীন্দ্রনাথকে আমরা
একপেশে চোখে দেখে এসেছি। আমাদের কাছে তিনি সমৃদ্ধি ও আস্তিক্যের শিল্পী। অথচ
শিল্পকর্মের মধ্যে অনন্ত শূন্যতার সংক্রমণ কীভাবে চোখ এড়িয়ে যায়! রবীন্দ্রনাথের
শ্রেষ্ঠ দুটি মাধ্যম গান ও ছবি, নির্দ্বিধায় আজও বলা যায়। যে বিপুল অন্ধকারকে তিনি সংকেতের মতো ধরে রেখেছেন, অজস্র স্ট্রোকের আহ্লাদে, রঙের উপর রঙ চাপানোর
দানবিকতায়, তার সঙ্গে তুলনীয়
হয়তো রেমব্রান্টই! এই পেইন্টিংগুলি প্রাসঙ্গিক থেকে আরো প্রাসঙ্গিক হতে থাকবে, দিনে দিনে। যেমন শ্রেষ্ঠ আধুনিক
শিল্পগুলি সময়ের মাত্রা মেনে অর্থ ও দ্যোতনা অর্জন করে! যেমন পিকাসো, যেমন দা ভিঞ্চির
সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ-
এঁরা সভ্যতার সমান বয়সী।’
তারমানে এখানে আমরা একজন তরুণের উন্মাদনার জায়গা দেখলাম রবীন্দ্রনাথের ছবির
অন্ধকার নিয়ে, তার সংকেত নিয়ে, স্ট্রোকের আহ্লাদ,তীব্রতা নিয়ে। রঙের উপর রঙ চাপানোর দানবিকতায়! এই জায়গাটায় এখনও তিনি
তরুণদের ধরে রেখেছেন নিঃসন্দেহে। এতক্ষণ
কথা বলে আমরা একেক তরুণের কাছে কিন্তু একেক রকম প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। যা খুবই
চমকপ্রদ। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একেক জন তাদের চিত্রী রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে
পেয়েছেন বা চলেছেন । এটাই তো সম্ভাবনার। এই তো বেঁচে থাকার লক্ষণ। সময়কে যে ধরে
রাখতে পেরেছে, সেই তো চিরতরুণ। ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং দেখে, আরও প্রতিক্রিয়া
জানার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। বহরমপুরের অধিবাসী এই সময়ের জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী ডা. আশুতোষ প্রামাণিককে
জিজ্ঞেস করেই ফেললাম- ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে
রবীন্দ্রনাথের ছবির কোনদিকটা পর্যালোচনার বিষয়
বলে আপনার মনে হয়?’
প্রতিক্রিয়ায় বললেন -‘অবচেতন প্রক্রিয়া থেকে শুরু
হয় তাঁর শিল্পকর্ম, তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলিতে ডুডল করে কিছু রূপ ধারণ করে, যেমন উদ্ভট প্রাণী, মুখোশ, রহস্যময় মানুষের মুখ, রহস্যময় ল্যান্ডেস্কেপ , পাখি ফুল সহ বিভিন্ন ধরনের
চিত্র তৈরি করে. বাইরের চাকচিক্য নয়, বাস্তবের হুবহু নকল নয়, মনের গভীর থেকে উঠে এসেছিল তাঁর চিত্রকলাগুলি, যাকে দেখা যায় না। যিনি অনুভবে থাকেন নিরন্তর। তাঁকেই তিনি ধরতে চেয়েছিলেন
চিত্রকলার মাধ্যমে. তাঁর বিমূর্ত শিল্পকর্মগুলি দেখায় না, ভাবতে শেখায়।’ চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক চিত্রশিল্পী কৃষ্ণধন
আচার্যের কাছে জানার খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম- ‘আজকের তরুণ চিত্রকরদের আপনি দেখছেন। তাদের মধ্যে
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কতটা ক্রেজি হতে দেখছেন ?’ উত্তরে বললেন- ‘প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীরা এমনিতেই
অনেক জানে।
অনেক পড়াশোনা করে। তারাও রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে খুব আগ্রহী। তারা রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে
মূল্যায়ন করছেন। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে তারা
খুঁজে পায় আলো অন্ধকার রঙ রেখার রহস্যময় মন্তাজ! সবচেয়ে বড় কথা, প্রচলিত ছবির শুদ্ধতা থেকে রবিঠাকুরের ছবি বাঁধন ছাড়া
স্বেচ্ছাচারে ভরা। যা তরুণ শিল্পীদের আকর্ষণের একটি
মূল জায়গা। এই জায়গাটা বরাবরই তারুণ্য
টানে।
একটা ক্রেজের পর্যায়ে তাদের নিয়ে যেতে বাধ্য করে
বলে আমার ধারণা।’ আসলে, রবীন্দ্রনাথ চিত্র জগতে একটা সাহসের প্রতীক রূপে
ধরা দেন তরুণ প্রজন্মের কাছে। রবীন্দ্রনাথের চিত্রসত্তার যন্ত্রণা, তাঁর দুর্মর ‘আর্জ’ আজকের তরুণদের ভীষণ ক্রেজি করে
রেখেছে। আমার ধারণায় কবি রবীন্দ্রনাথ থেকে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ ভাবুক নবীন
প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়। গ্রহণযোগ্যতায়ও তিনিই যেন এগিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ছে চিত্রকর নন্দলাল বসুর
একটি কথা। যেখানে তিনি বলছেন - ‘ আমার আঁকা ছবির অর্থ কী লোকে আমায় প্রায়ই
জিজ্ঞাসা করে। আমার ছবিও যেমন নীরব, আমিও তাই। ব্যক্ত করাই তো ওদের কাজ, ব্যাখ্যা
করা নয়।’ অর্থাৎ ছবির অর্থ কী রকম লাগল,কী অনুভূতি হল, কী রকম আনন্দের অনুরণন মনের
ভিতর উঁকি দিল, সেটাই বড় কথা। এই অনুরণনের ভিতরেই চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজও
বেঁচে আছেন তরুণদের মনে। সকল শিল্পবোধের গভীরে। চিত্র সৃষ্টিতে তিনি ভীষণরকম
পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রবণ ছিলেন। এই বিষয় নিয়ে সেদিন কবি অশোক দেবের সাথে
কথোপকথনে জানতে চেয়েছিলাম –'আজকের
প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের ছবির কোন দিকটা আপনাকে আজও ভাবায়?” উত্তরে বললেন- ‘শব্দের নিজস্ব সীমা আছে। যতই ব্রহ্ম বলা হোক। 'নীল' লিখলে নীলের যে অযুত বিভা, তার সবগুলোকে ধরা যায় না। তেমনি প্রায় সকল শব্দ। সীমায়িত। তাই হয়তো কবি এক সময় অন্যতর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে চান। রবীন্দ্রচিত্রাবলি আসলে কবিতারই প্রবৃদ্ধ রূপ। সুললিত রেখা, আবছা রহস্য আর সুন্দর। আর আছে আত্মদর্শনের আর্তি। নাহলে যত মুখচ্ছবি তিনি এঁকেছেন, তাতে কেন তাঁরই চেহারার আদল! রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কেমন একটা হারমনি। চিরকাল সুরাশ্রিত মানুষটির অনন্যতা এইখানে। তাঁর ছবি যতই দ্রুত আঁকা হয়ে থাক না, বড়ো সুরেলা, কাব্যিক আর ধ্যানগম্ভীর। এ ধারার ছবির কোনও উত্তরাধিকার হয় না। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে এসব ছবি কেবল সংরক্ষিত সম্পদের মতন।’ অশোক দেবের কথা শোনে কবিগুরুর একটা কথা মনে পড়ে গেল। যেখানে
চিত্রী রবীন্দ্রনাথ বলছেন- ‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তাঁর থেকেও কিছু বেশি,
আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন। আমার চিত্র রেখার ছন্দে আবদ্ধ
কবিতা।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানের মধ্যে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তখন কি তিনি
জানতেন বাঙালির আত্মার ভিতর তিনি শুধু গানের মধ্যে দিয়ে নয়, চিত্রকর হিসেবেও
অম্লান থাকবেন! শুরুতে বলেছিলাম সময় তার
মনন বদলায়। রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে বাঙালি তার মনন পাল্টেছে। কবি দেখে যেতে
পারেননি, এই যা! রবীন্দ্রনাথ সত্যিই আজ একটি প্যাকেজ। একটি ব্র্যান্ডের নাম।
No comments:
Post a Comment