বিবর্তিত হলেও বিলুপ্ত হবে না পয়লা
বৈশাখীর
সংস্কৃতি – তমালশেখর
দে
বছর
ঘুরে আবার ফিরে এলো বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ! ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো..’
স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৫বঙ্গাব্দ।‘বৈশাখ’
তো এলো।কিন্তু এবার? মনের ভিতরে এই ‘এবার’ শব্দটা উঁকি দিতেই কী রকম একটা তন্ময়তায়
হারিয়ে গেলাম।পেছন
ফিরলাম নিজের মতো করে। জানতে পারলাম,
"বৈশাখ" শব্দটি এসেছে বিশাখা নক্ষত্রের নাম
থেকে। এই মাসে বিশাখা নক্ষত্রটিকে সূর্যের কাছে দেখা যায়।বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিই হল
বাংলা নববর্ষ।এই দিনটি ত্রিপুরা,পশ্চিমবঙ্গ, অসম,বাংলাদেশে "পয়লা বৈশাখ" নামে পরিচিত। বিভিন্ন
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হয় এই দিনটিকে স্বাগত
জানানো হয়।।বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে
নতুন বছরকে বরণ করে, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল
দুঃখ-গ্লানি। এই দিনটিকে যাবতীয় ব্যবসায়িক কাজকর্ম শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা
এই দিন নতুন হালখাতা শুরু করেন। এই উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড়
যোগাযোগ স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ করা যায়। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পড়ে এবং আত্মীয়স্বজন
ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটমুটি
সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত
এলাকায়, কোন খোলা
মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর
বিপণন, থাকে
নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন।চৈত্র মাসের শেষ দিন
অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুবসংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ
শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। এদিন
গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলার। আমাদের
প্রতিবেশি বাংলাদেশ, যার সাথে আমাদের শিকড়ের টান অনেকেরই। ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশের
ঢাকায় বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পয়লা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবণ এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা
হয়।এছাড়া খোঁজখবর করে জানলাম, অস্ট্রেলিয়ার
বিভিন্ন শহরে যেমনঃ সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরাতে বৈশাখী
মেলার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নাচ-গান, ফ্যাশন
শো, খাবারের মেলার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির এ ধারাকে আনন্দময় করে তোলা হয়। ২০০৬ সাল থেকে সিডনি অলিম্পিক পার্কে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।সুইডেনেও
বিপুল উৎসাহের সাথে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হয়। জানলাম, ইংল্যান্ডে অবস্থানকারী প্রবাসি
বাঙালিরা ‘স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল’ পালন করে এই পয়লা বৈশাখকে ঘিরে। এই উৎসবটি লন্ডনেও করা হয়। ইউরোপে অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ এশীয়
উৎসব এই বাঙালি উৎসব। পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার কালীঘাটে।
সেখানকার বিখ্যাত কালীমন্দিরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতীক্ষা করে থাকেন
দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্য। ব্যবসায়ী ছাড়াও বহু গৃহস্থও
পরিবারের মঙ্গল কামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন।
সেই প্রেক্ষাপট থেকে ফিরে ত্রিপুরার
কথা জানতে ইচ্ছে হল খুব।পয়লা বৈশাখকে ঘিরে আজকের স্মৃতিচারণ কি হতে পারে
বিশিষ্টজনের। রাজ্যের বিশিষ্ট গল্পকার, প্রকাশক নীলিপ পৌদ্দারের কাছে জানতে
চাইলাম- ‘পয়লা বৈশাখ নিয়ে আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কি বলবেন?’
মুহূর্তেই তিনি বললেন, ‘এই দিনটি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া দুই রকম, আগে মুদির দোকান
থেকে একদম হলুদ রঙের মধ্যে লাল রঙে ছাপা একটা কার্ডে প্রচুর নিমন্ত্রণ আসত। আমরা একদম নিয়মমাফিক প্রত্যেক
দোকানে যেতাম, টাকা-পয়সা দেয়া হত। ওরা মিষ্টি-টিষ্টি খাওয়াত।পয়লা বৈশাখ যে আমাদের
একটা আনন্দের দিন তখন সেটা বোধ করতাম। আর এখন তো এই দিনটা যেন ক্যালেন্ডারেরই একটা
পাতা!সেই হলুদ কার্ডও আর দেখি না। পয়লা বৈশাখের দিন এখন আর অন্যরকম করে পোশাকেও
তার প্রভাব ফেলে না। আজকের প্রজন্ম যতটা ইংরেজি তারিখ
মনে রাখে, ততটা বাংলায় রাখে কিনা,
আমি সন্দেহপ্রবণ! এখন পয়লা বৈশাখ জাস্ট একটা মঞ্চের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে
বলে আমার মনে হয়।আমি হতাশ।’ ‘হলুদ রঙের মধ্যে লাল রঙে ছাপা কার্ড’ অনেক বছর পর আমারও যেন চোখের সামনে ফুটে উঠল। সে
না-জানি কত বছর আগের কথা।এভাবেই কি সময় প্রভাব ফেলে সময়ের উপরে? রুচি প্রভাব ফেলে
সমাজে! রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, প্রকাশক মানস পালের ব্যথা এই দিনটিকে নিয়ে আরও এক গহন
গভীরে। যখন তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘আজও কি আমরা ততটাই উচ্ছ্বসিত হই পয়লা বৈশাখ দিনটিকে ঘিরে? প্রতিক্রিয়ায়
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন,- ‘বাঙালি তো ভুলো জাত। নিজের ঐতিহ্য সংস্কৃতি
ভাষা ভুলে যেতে বাঙালির জুড়ি সারা বিশ্বে আর
নেই। তবুও, এখন, বাঙালি সারা বছরে, বাংলা শতাব্দে মনে রাখে মাত্র দুটো দিন- পয়লা
বৈশাখ আর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন।সামান্য কয়েকজন অবশ্য মনে রাখেন ১১ জৈষ্ঠ নজরুল
এবং ৬ ফাল্গুন জীবনানন্দের জন্মদিন। এর বাইরে,ব্যাপক হারে এই যে ভুলে যাওয়া, এই
মহারোগ, বাঙালিকে যে কতদূর বিপন্ন করে তুলছে তা সাধারণ জনে দূর, যথেষ্ট শিক্ষিত
জনেরাও বুঝে উঠতে চাইছেন না। সবাই ভাসতে চাইছেন ইংলিশ মিডিয়ামের স্রোতে, ইংরেজি
নববর্ষের ঢেউয়ে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আবহে। এই ভেসে যাওয়ার বিপদ যে বাঙালীকে বাংলা-শূন্য
করবে এই অনাগত সত্যটুকু আমাদের উপলব্দিতে পৌঁছুচ্ছে না।এই ভেসে চলা হয়তো থামবে
চরমভাবে বিপন্ন অস্তিত্বের দিনে,যখন অত্যাচারিত হতে হতে আবার একদিন বাঙালি প্রয়োজন
বোধ করবে আরও একটি একুশে ফেব্রুয়ারি বা আরও এক উনিশে মে-র। ততদিন আমাদের এই ক্ষয়,
চন্দ্রকলার মতো, চলতেই থাকবে, অমাবস্যার অন্ধকার খুঁজে।’ ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতির
আবহ’- কি এই মানসিক, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের জন্য মূলত দায়ি? এর আগে নীলিপ পোদ্দারের
আক্ষেপে আমরা পেয়েছি- ‘এই দিনটা যেন ক্যালেন্ডারেরই একটা পাতা!’ সব যুক্তিই ঠিক।
সব যুক্তিই পীড়া দেয় সচেতন মনকে।
রাজ্যের লিটিল ম্যাগাজিনের
প্রাণপুরুষ, কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক নকুল রায়-র কাছে পয়লা বৈশাখ নিয়ে তার
চিন্তার পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে বললেন, ‘পয়লা বৈশাখ মোগল সম্রাট আকবরের আমল থেকে
হিসেব করা হয়েছে। আমাদের বংলা সন শুরুর সাথে সূর্যের উত্তরায়ণ, দক্ষিনায়ণ একটা
ব্যাপার থাকে। তবে তার চেয়ে বড় হল- এই ব্যাপারটা
আমাদের সাথে সাথে আদিবাসিদের সংস্কৃতির মধ্যেও আছে। দুই সংস্কৃতির মিশ্রণই এই পয়লা বৈশাখ। শুধু একক দিন হিসেবে এর ভিন্ন কোন অর্থে নেই, আমার কাছে। আসলে আবাহমান সমাজ ব্যবস্থাকে নতুন করে আশাবাদি করে তুলতে এবং বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতেই নির্দিষ্ট এই দিনকে বেছে নেয়া হয়।এখানেই তার সামাজিক, মানসিক গুরুত্ব।’
এই দিকটাও খুব ভাবার মতো। চিন্তার এই সূত্রটা খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। আর একটা দিকও লক্ষনীয়, পয়লা বৈশাখ একটি সেক্যুলার উৎসব। এটা এর একটা
প্রধান দিক। এই কথা আমরা অনেকেই ভুলে যাই। বাঙালির জীবনে ধর্মের সাথে যুক্ত বহু
উৎসব-পার্বণ রয়েছে। হিন্দুদের একধরনের উৎসব, মুসলমানদের আরেক ধরণের। কিন্তু এই এক
জায়গায় ধর্মের উর্দ্ধে উঠে সব বাঙালির মিলন ঘটে। এটা আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য। আর এখানেই কিছুটা হতাশ রাজ্যের
বিশিষ্ট কবি, শিশু সাহিত্যিক, চিত্রকর বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর কাছে জানতে চাইলাম,
‘যুগের হাওয়া এবং পয়লা
বৈশাখ’ – এই বিষয়কে কীভাবে দেখছেন? উত্তরে বললেন, ‘যুগের হাওয়ায় সবই কেমন যেন
পালটে গেছে!অনেকেই প্রশ্ন করে বসেন-‘বাংলা নববর্ষ কয় তারিখ?’ সেই পুকুর নেই, যে
জাল ফেলে মাছ ধরা যাবে? পরিবারগুলো ভাগ হয়ে যাওয়ায়--পয়লা বৈশাখ সবাই মিলে আনন্দ
করার সুবিধে কমে গেছে। টেলিফোন,মোবাইল, ইন্টারনেট-এর দৌলতে চিঠির মতো একটা বিরাট
সম্পদ হারিয়ে গেছে, প্রণাম-ভালবাসা- গ্রিটিং কার্ড সবই এখন ইন্টারনেটে
আদান-প্রদান। তবে ভিড় খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি, আনন্দ আছে।মাছ-মাংস, মিষ্টির দোকানে
উপছে পড়া ভিড়,বন্ধুর সাথে গল্পটল্প, ছোটাছুটি সবই আছে। শুধু যেন বাংলা ভাষাটাই
কেমন ক্রমাগত কঠিন হয়ে যাচ্ছে।কোথায় যেন প্রাণ নেই!’ কবির ভাষায়- ওই বুঝি
কালবৈশাখী সন্ধ্যা আকাশ দেয় ঢাকি/ভয় কী রে তোর ভয় কারে, দ্বার খুলে দিস চারধারে...।‘ সেই প্রানের কথা, স্পিডের কথা, বোধ হয় বলতে
চেয়েছেন কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক
কৃষিরও।সেই কৃষি কাজের ছোঁয়া শহরে কোথায়?এটাও কি আমাদের
যান্ত্রিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা কারণ? কিংবা আমরা বাংলাদেশের মতো বিষয়টাকে
নতুন করে, নতুন ভাবে, তুলে আনতে পারছি না, বা এনিয়ে কোন প্রকার উদ্যোগ নিচ্ছি না।
ক্রমশ হিন্দি-ইংরেজি ক্যালচার গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে। নাকি এর পেছনেও কাজ করছে কোন পুঁজিবাদ? রাষ্ট্রীয় কোন ভাবনা? ক্রমেই তো
ছোটছোট জনগোষ্ঠির ঐতিহ্য তার প্রাধান্য হারাচ্ছে।এনিয়ে কথা হচ্ছিল, ত্রিপুরার
লোকগবেষক এবং চা বাগান প্রিয় সমর চক্রবর্তীর সাথে।তিনি বললেন, ‘পয়লা বৈশাখ দিনটাকে এখন আর
বিশেষভাবে কিছু দেখি না।আর দশদিনের মতো এটাও একটা দিন। অতীতের সেই আবেগ, উচ্ছ্বাস
কিছুই চোখে পড়ে না।আর সাঁওতালদের মধ্যে এটা প্রতিদিনই দেখা যায়।তারা প্রতিদিনই
নিজেকে নতুন করে তুলে চেষ্টা করে।সম্মিলিত হওয়ার বিষয়টা তাদের রক্তের মধ্যেই আছে। এই
তো তারা আমন্ত্রণ করেছে যাবার জন্য। হাঁড়িয়া প্রস্তুত করে নিয়েছে ঐ দিনের জন্য।
সারাদিন হাঁড়িয়া খেয়ে খেয়েই আনন্দ, উচ্ছ্বাস হবে। তারা প্রতিটি দিন উপভোগ করতে
জানে।’ আবার রাজ্যের বিশিষ্ট গল্পকার কিশোর রঞ্জন দে এই বিশেষ দিনটি নিয়ে বললেন, ‘এই
দিনটা আমার সুখ-স্মৃতিতে কেটে যায়। পয়লা
বৈশাখ মানেই হালখাতা। এ’দোকান ও’দোকানে নতুন খাতায় হিসেব লেখা শুরু।রঙিন কাগজ কেটে
সাজানো হত দোকান। শান্তা মহাজন বলে একজনের দোকানে খাওয়া ছানার আমৃতির স্বাদ আজ ৫৫
বছর পরেও যেন মুখে লেগে রয়েছে।গ্রামের মেলায় ঘুরে বেড়াতাম। মনে মনে এখনও যেন বেড়াই
এই দিন এলে। পোষ্ট কার্ডে বড়দের প্রণাম পাঠাতাম।আর হ্যাঁ, একটা কাজ পয়লা বৈশাখে করিই। লিখি। এবারে আরেকটা কাজ করব।
আমার এদিক ওদিক হারিয়ে যাওয়া শ দুয়েক কবিতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।’রাজ্যের
বিশিষ্ট আইনজীবী, কবি-নাট্যকার হৃষিকেশ নাথের সাথে লেখার বিষয়টা গল্পকার কিশোর
রঞ্জন দে-র সাথে একদম মিলে গেল। তিনিও বলেন, ‘১লা বৈশাখে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণে
রেখে ডায়রি নিয়ে অবশ্যই বসি। কিছু একটা লিখতে মন চায়। লিখিও প্রতিটি নববর্ষে – যা
হৃদয় বলে ওঠে। তবে মাঝে মাঝে কষ্ট হয়, যখন দেখি ইংরেজি নববর্ষের মতো উত্তাপ থাকে
না ১লা বৈশাখ, বা ২৫শে বৈশাখের দিনগুলিতে।’ এবার এগিয়ে গেলাম মণিপুরি
সাহিত্যের প্রখ্যাত গল্পকার, অনুবাদক, গবেষক এম বীরমঙ্গল সিংহ-এর কাছে, ‘১লা বৈশাখ
এবং মণিপুরি সমাজের উন্মাদনা, সংস্কৃতি নিয়ে সংক্ষেপে আমাদের কিছু বলুন?’ বললেন,
‘চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ উৎসব মণিপুরিরা হিন্দু ধর্ম গ্রহণের করার আগে থেকেই
পালন করে আসছে। এই উৎসবকে বলে ‘চেইরাউবা’।বলা বাহুল্য আদিকালে আজকের মতো পঞ্জিকার
প্রচলন ছিল না।তাই কবে বছরের শেষদিন আর শুরুর দিন, তা রাজার নির্দেশে বছরের শেষদিন
একজন রাজকর্মচারী এসে ঘণ্টা বাজিয়ে বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় চিৎকার করে জানিয়ে দিয়ে
যেত। চেইরাউবার দিনে প্রতিটি মণিপুরি বাড়িতে নানারকমের ব্যাঞ্জন রান্না করা হয়।নানা
ফলমূল, গুড়মাখা চিড়া, পিঠা ইত্যাদি গৃহদেবতা সনামহী , লেইমারেল শিদবী ও অপাকপা
বংশের আদি পুরুষদের পুজো করা হয়। এর পাশাপাশি ঘরের সীমানার বাইরে ‘লমলাই’ অর্থাৎ
অপদেবতাদেরও পুজো দেওয়া হয়। যাতে পারিবারের প্রতি তাদের কুদৃষ্টি না-পড়ে।চেইরাউবার
রাতে অনেকেই দল বেঁধে না ঘুমিয়ে রাত কাটায়। তাদের ভয় সে রাতেই আগামি বছর কাদের
মৃত্যু হবেতাদের নামের তালিকা তৈরি হয়। তাই রাত জেগে থাকতে পারলে নাকি সেই কালো
তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ পড়ে। আগের দিনে মণিপুরিরা নববর্ষের একমাস খেলাধুলা ,
নাচ, গান, আনন্দ-ফুর্তি করেই দিন কাটাত। কোন কাজ কর্ম করত না। তখন দিনের বেলা গ্রামে
গ্রামে নানা লোকক্রীড়ার আয়োজন করা হত। বিকেল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত বাড়ির উঠোনে
বসে যুবক-যুবতিদের মধ্যে চলত কড়ি খেলা। যুবক বয়েসে কত খেলেছি এইসব খেলা।কত রাত না
ঘুমিয়ে কাটিয়েছি দল বেঁধে চেইরাউবার রাতে। আজ এ’সব কিছুই আমার কাছে নস্টালজিয়া।
আমার জীবনে মধুর স্মৃতি হয়ে রয়েছে।আজকের যুবক-যুবতিরা এইসব অনাবিল আনন্দ থেকে বঞ্চিত।ভাবলে খুব কষ্ট হয়। এভাবেই
কি সব পালটে যাবার ছিল?’ এম বীরমঙ্গল-এর এই প্রশ্নের সামনে আবার অসহায়ের মতো
দাঁড়িয়ে পড়ি!তার দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে যায়, আমাকেও। তবে কি আমরা কেবল হারাচ্ছি? কেন হারাচ্ছি!
না, এই পরিবর্তন’টাই জীবন।এভাবেই পলে পলে, কালে কালে, সমাজ কি পালটায়। পরিস্থিতি
পালটায়।পালটায় সংস্কৃতি? তবে কি আমরা আনন্দহীন যান্ত্রিক এক জীবনের দিকে ক্রমশ
এগিয়ে চলেছি? এসব অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে মুখোমুখি হলাম রাজ্যের বিশিষ্ট কবি,গল্পকার সন্তোষ রায়ের দিকে। প্রশ্ন করলাম, ‘বিবর্তিত এই
পরিস্থিতিতে কি বিলুপ্ত হতে চলেছে আমাদের শিকড়ের সংস্কৃতি?’ কবি হতাশ হতে নারাজ। তিনি
বললেন, ‘পুরো বাংলা-ই একসময় গ্রাম ছিল। আমাদের ব্রত-পার্বণের উৎসস্থল গ্রামবাংলা।
আজ কোন কোন গ্রাম উন্নীত শহরে, কোন কোন শহর আবার নগর কি মহানগর। সংস্কৃতি
দ্বিধাবিভক্ত- গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতিতে। গ্রামের প্রোণোৎসারিত পার্বণ শহরে এসে
রূপ পায় ফ্যাসানের।তাতে না থাকে আবেগ, না থাকে নির্মল আনন্দ তেমন। আজকাল উন্নয়নের
প্রবাহে গ্রাম হয়ে উঠছে মিনি শহর। ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ছে বিশ্বাস ও আবেগ নিরোধী
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি। বিবর্তিত হচ্ছে মন।
ফলে আজকের সংক্রান্তি-সন পয়লার আগামি রূপ কী হবে সেটাই ভাবনার। গ্রামবাংলার
ব্রত-পার্বণ নানান উপকরণ-প্রতীক-উপাচার ও বিজ্ঞান সমন্বিত। আজকাল অনেক উপকরণই
দুর্লভ এবং প্রতীকী তৃণ-লতা-গুল্মাদি বিলুপ্ত প্রায়। ফলত সংক্রান্তি ও ব্রতের
অবয়বের পরিবর্তন ঘটেই গেছে, হাতে রইল মননের আবেগ-নিষ্ঠা ও বিশ্বাসহীনতা। তারপরও
বলতে পারি, বিবর্তিত হলেও বিলুপ্ত হবে না সংস্কৃতি। কেননা, আমাদের মনে বাস করে
একেকটি গ্রাম, আমরা সেই মনকে নিয়ে শহরে থাকি।’ এইখানে, তার কথায়, বোধ হল কিছুটা
সান্ত্বনা যেন পেলাম। পরিবর্তন যুগের নিয়মে স্বাভাবিক। আমরা গ্রামের কাদা শরীরে মেখেছি
বলে হয়ত, এই ঘ্রাণ ছাড়া কীভাবে বেঁচে থাকা যায়- ভাবতে পারছি না। আজকের এই যুগ, এই
যুগের মতো তাদের উচ্ছ্বাস খুঁজে নেবে, এটাই হয়ত নিয়ম। এবং তারা বেছেও নেয়েছে।তারা
তাদের মতো করে বুকের ভিতরে বহন করছে একটা গ্রাম।তারাও তাদের মতো পালন করবে বাংলা
নববর্ষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। আর এখানেই আমাদের ভরসা। বিশ্বাস।
No comments:
Post a Comment