Tuesday, February 20, 2024

কবি নকুল রায়-এর ‘কবিতা সমগ্র’ ত্রিপুরার কবিতা চর্চার একটি প্রয়োজনীয় দলিল / তমালশেখর দে

 

 






কবি নকুল রায়-এর ‘কবিতা সমগ্র’ ত্রিপুরার কবিতা চর্চার একটি প্রয়োজনীয় দলিল   

 

ত্রিপুরার  কবিতার ইতিহাসে নকুল রায় একটি অবিস্মরণীয় নাম। সত্তর দশকের উন্মাদনা পর্যায়ের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। ত্রিপুরার সাহিত্য তৎপরতায় ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ বলিষ্ঠ ভূমিকাকে কে অস্বীকার করার সাহস দেখাবে?  সেই গ্রুপ সেঞ্চুরি-র যাবতীয় উদ্দীপনার তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ।  ত্রিপুরার অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন কবিতাকে ভালোবেসে। গোটা বাংলা সাহিত্যের সর্বত্র তাঁর বিস্তার এবং ব্যক্তিত্ব ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর উন্মাদনা একরাশ তরুণ উদ্দীপিত হয়েছিল কবিতা নিয়ে। সেই নকুল রায়ের যেকোনো রচনাই পাঠকদের মনে আলাদা একটা মূল্য রাখে। ত্রিপুরার লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের তিনি অগ্রগামি পথিক। সেই নকুল রায়ের সমগ্র কবিতা নিয়ে নীহারিকা প্রকাশনী এবার প্রকাশ করছে তাঁর ‘কবিতা সমগ্র’। একই মলাটের ভিতর থাকছে তাঁর প্রায় বাইশটি কাব্যগ্রন্থের বিশটি কাব্যগ্রন্থ এবং অগ্রন্থিত প্রায় তিনশো কবিতাদুটো কাব্যগ্রন্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি।  কবিতা নিয়ে কবি বিশ্বাস করেন –“ বাস্তবতার বাইরে কোনো কল্পনা নেই এবং কোনো কবিতাই বাস্তবশূন্য নয়।” এখানে এই ছোট্ট পরিসরে বিশটি কাব্যগ্রন্থের নির্যাস তুলে ধরা সম্ভব নয়।  তবে তাঁর কবিতার মর্মকাহিনির বিষয় হয়ে আছে, তাঁর জীবনের ক্ষুধা, কাম, বিরক্তি, হতাশা, প্রতিবাদময়। সত্তর দশক বা তার পরবর্তী সময়ের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির জটিল আবহ উঁকি দেয় তাঁর কবিতায়। তিনি সময়কে, সময়ের সংকটকে অনুভব করেন তার প্রতিটি কবিতার চরণে। নিজেকে নিংড়ে নিয়ে, তারই রূপ দেন যেন কবিতার লাইনে। নকুল রায়ের কাব্যগ্রন্থের নামই আপনাকে অনেককিছু বলে দেয়। যেমন – ‘হৃদপিণ্ডের হাট’ ‘ আমি নীরোর হাতের বাঘটাকে’ ‘শব্দশৈল্য এবং শানিতদীপমল্লিকা’ ‘পাঁজরের এন্টেনা’ কিংবা ‘অন্নদাসের পায়ের ধুলো’  এমন করে কত নাম বলা যায়।  দ্রোহ তাঁর এবং তাঁর কবিতার মর্মস্থলে অবস্থান করে।

“ ভালোবাসা লীন হয়ে আছে/ পাপের শরীর/ কীরকম চিনির মতো গলে যায় ধোপার শরীর!”(দেয়ালে দেয়ালে) কিংবা “ কখনো এই শরীর ছুঁয়েই পালক হয়ে যাই/ কখনো কাঁটার মতো বিঁধে যায় ঈশ্বর/ শিরায় শিরায় স্নান সেরে/ পেছন দুয়ার খুলে হারিয়ে যাই” (হৃদপিণ্ডের হাট)  কিংবা “ ওই তো কাছেই নির্জনতা মগ্ন থাকি পরবাসী বলে/ সবাই একপ্রকার ভালো থাকি শংকর হোটেলের মানুষ/ অন্ধকার ফুরালে ঠিক চোখের কোণে/ পরাভূত মানুষের ভয় ও বিতৃষ্ণা জটিল।” (সাঁকো) অথবা একদম শেষ পর্যায়ের কবিতা  “আমি শেষ রাতের প্রহরী লাইটম্যান, আমি/ সবুজ আলো উঁচু করে তুলে বলছি-‘ কেন/ ভাষা শহিদ রেল ইস্টিশনের নামকরণ হলো না!” (মাতৃভাষা সুরক্ষা দিবস)

 

কবি নকুল রায়ের কাব্যভাষা টানটান। দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবনের শিকড় যন্ত্রণা, স্থানিক চিত্রকল্পের বুনন তাঁর কবিতাকে করে তুলে হৃদয়গ্রাহী। ত্রিপুরার কবিতা সম্পর্কে নিবিড় একটা ধারণা তৈরি করতে হলে, কবি  নকুল রায়কে স্পষ্টভাবেই  ছুঁয়ে যেতে হবে। নাহলে, গোটা বিষয়টাই অধরা থেকে যাবে। তাই তাঁর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কবি নকুল রায়ের এই ‘কবিতা সমগ্র’  বাংলা কবিতার পাঠক এবং গবেষকদের জন্য এক অসামান্য দলিল হয়ে থাকবে, এই প্রত্যাশা করা খুবই স্বাভাবিক। অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু। তার প্রতিটি প্রচ্ছদই পাঠককে নতুন এক উপলব্ধি দিয়ে যায়।       

 

কবিতা সমগ্র 

নকুল রায়

নীহারিকা প্রকাশনী, আগরতলা

মূল্য ঃ ১২০০ টাকা       

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...