নিঃসঙ্গতার ভিতরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গবোধ
তমালশেখর
দে
নিঃসঙ্গতার সাথে মানুষের সম্পর্ক কি খুব আদিম? এই প্রশ্ন নিয়ে আমি বহুবার নিজের কাছে ছুটে গেছি। নিঃসঙ্গতা আমাকে খুব ভাবায়।আমার খুব প্রিয়ও। আমাকে যদি কেউ একবাক্যে জিজ্ঞেস করে- ‘তোমার কি ভাল লাগে?’ আমি এতটুকু সময় নষ্ট না-করে উত্তর দেব-‘বৃষ্টির ভিতরের নিঃসঙ্গতা’। যদিও আমি কখনই নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করি না। আমার সাথে সর্বদাই ‘আমি’ থাকি। তারপরও কি কখনও একা মনে হয় না? খুব মনে হয় ! তখন রবীন্দ্রনাথের কাছে ছুটে যাই।মনে মনে আওড়াই ‘রোদনও ভরা এ বসন্ত সখী, কখনো আসে নি বুঝি আগে।’ কিংবা ‘তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে/ যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।’রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমার গতি নেই। আজকের তরুণ প্রজন্ম এবং রবীন্দ্রনাথ নিয়ে জানতে সব সময়ই আমি খুব উৎসুক থাকি। এই প্রজন্ম কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে? কিংবা নিবিড়ে জানালার পাশে বসে একমনে শুনে রবীন্দ্রনাথের কোন প্রিয় গান?এনিয়ে বইপত্রের সাথে খুনসুটি করে জানলাম--, ফেইসবুকে বিখ্যাত প্রায় সব লোকের একটি বা দুটি ফ্যান ক্লাব আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আছে পাঁচ-ছয়টি।এখন হয়ত আরও বেড়েছে। এসব ফ্যান ক্লাবের ওয়াল অন্যান্য ফ্যান ক্লাবগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।এসবের ফ্যানরা প্রায় প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথের কথা বলেন, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কথা বলেন। তাঁর গান শেয়ার করেন বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এই তো সেদিন একটি ছেলে দেখলাম পোষ্ট করল -‘হায় অতিথি এখনি কি হল তোমার যাবার বেলা।’ আর কিছু নেই!মাত্র একলাইনই।ভাবলাম এ’কেমন কথা? কিন্তু এরপররে দেখলাম তার নীচে এক মেয়ে কমেন্ট করেছে -‘কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে--’। কবির উত্তর খুঁজে আনল কবির ভিতর থেকেই। এতেই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ এখনও খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রবাহমান রয়ে গেছেন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে।হয়ত এখনও পাগল করে তাঁর ‘শেষের কবিতা’-র আধুনিকতা।
মানুষের নিঃসঙ্গতা, তার চরম একাকীত্ব, কখনও কখনও কারও সাথে সংযোগ-স্থাপনের ব্যর্থতা আমাদের কি বারবার টেনে নিয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের গানের দিকে? অনেক সময় আমরা খুব হিসেব কষেও বলতে পারি না, হঠাৎ কোথা থেকে, কীভাবে বিশেষ মুহূর্তে তাঁর গানের একটা কলি ঠোঁটের ডগা দিয়ে সুর হয়ে বেরিয়ে পড়ে। তখন নিঃসঙ্গতা শ্রোতা হয়ে শুনে।বেসুর গানের গলা সহ্য করে চুপচাপ। আমার প্রেমের, বিরহের সব ভাবনাই রবীন্দ্রনাথের সাথে যেন মিলে যায়। রাতের নির্জনে যখন একা একা গভীর রাতে ছাদের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করি, তখন চমকিত হই, এই গানটির কথা ভেবে- ‘আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।’ সত্যিই কি বিস্ময় আমাদের এই গ্রহ-তারা। আমার এই দাঁড়িয়ে থাকা,বেঁচে থাকা। শরীরে কাঁটা দেয়। বিষণ্ণতা মোড় নেয় চরম এক ঈশ্বরীক বোধের দিকে। মনে পড়তে থাকে গানের আরও কলি-- ‘বিশ্ব যখন নিদ্রামগন, গগন অন্ধকার,/কে দেয় আমার বীণার তারে এমন ঝঙ্কার।’ তখন মনে হয়, গীতিকার রবীন্দ্রনাথকে নির্জনেই পেতে হয়। পেতে হয় অহংকারের উর্দ্ধে উঠে। জীবনে একের পর এক মর্মান্তিক দুঃখের পরও তিনি কোথাও যেন বড় অবিচল ছিলেন। সেই শক্তিরই সন্ধান করি তাঁর গানে। কি অপূর্ব করে তিনি বলে ফেলেন-‘ তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে/কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে’। জ্যোৎস্নারাতে বন্ধুর মতো নিরাকার ব্রহ্মের অনুভবে ভাবিত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকেন। ‘বসন্তের এই মাতাল সমীরণে’- সবাই বনে গেলেও তিনি পড়ে থাকেন ঘরে। কিন্তু কেন? কবি বলেন- ‘আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে/ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।/যদি আমায় পড়ে তাহার মনে/বসন্তের এই মাতাল সমীরণে।’ আজ যখন ধর্মের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে ভারত তথা বিশ্ব উতাল-পাতাল।অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাজনিত এক সীমাহীন নৈরাজ্য যে কোনও মননশীল অনুভূতিসম্পন্ন মানুষকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক অর্থহীন, অন্ধকার, অসম্ভব ভবিতব্যের মুখোমুখি। তখনও রবীন্দ্রনাথের কাছে পাই গভীর এক আশ্রয়।তাঁর ‘বিশ্ববোধ’ প্রবন্ধে যখন দেখতে পাই -‘আমরা মানুষের সমস্ত বিচ্ছিন্নতা মিটিয়ে দিয়ে তাকে যে এক করে জানবার সাধনা করব তাঁর কারণ এই নয় যে, সেই উপায়ে আমরা প্রবল হব, আমাদের বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের স্বজাতি সকল জাতির চেয়ে বড়ো হয়ে উঠবে, কিন্তু তার একটিমাত্র কারণ এই যে, সকল মানুষের ভিতর দিয়ে আমাদের আত্মা সেই ভূমার মধ্যে সত্য হয়ে উঠবে যিনি ‘সর্বগত শিবঃ’, যিনি ‘সর্বভূতগুহাশয়ঃ’, যিনি ‘সর্বানুভূঃ’। তাঁকেই চাই, তিনিই আরম্ভে, তিনিই শেষে।’ শরীর জড়িয়ে যায় শীতল এক অনুভবে। এই অনুভবই স্পর্শ আবার পাই তাঁর গানে –‘তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে/কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে।’ রবীন্দ্রনাথ মানেই বিচিত্র অনুভবের ভিতর দিয়ে জীবনকেই ঘুরে-ফিরে জানা, দেখা। দুঃখের সাথে আনন্দের যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক, মেলবন্ধন, তা আমি কবির কাছ থেকেই জেনেছি। ‘আর আমি-যে কিছু চাহি নে, জননী ব’লে শুধু ডাকিব।/তুমি না রাখিলে, গৃহ আর পাইব কোথা, কেঁদে কেঁদে কোথা বেড়াব-/ওই-যে হেরি তমসঘনঘোরা গহন রজনী।’- এই ‘গৃহ’ এবং ‘জননী’ শব্দটা নিয়ে যতবার ভেবেছি, ততবার নতুন করে নিজেকে পেয়েছি বিশ্বের সাথে একাত্ম করে। জগৎ কি আশ্চর্য সুন্দর!এখানে আমরা অসীমকে লাভ কেরি সীমাকে কেন্দ্র করে। মা-ই জননী হলেন। সৌন্দর্য ও প্রেমের অনুভূতি মিলে গেল বিশ্বপ্রাণের সাথে। বিশ্ব-প্রাণের মধ্যে ব্যক্তি-প্রাণকে একাকার করে সব বন্ধন ছিন্ন করার একদিকে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে আবার ওই বিশ্ব-সত্তাকে একটি রূপের মধ্যে এনে, তাকে অনুভবে তুলে ধরার এক সুতীব্র ব্যাকুলতা আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনার ভিতরে দেখতে পাই। যা আমাকে ব্যাকুল করে তুলে। তাঁর দিকে প্রাণিত করে বারবার। তাই তিনি আমার কাছে শুধু একজন কবি নন, গীতিকার নন, চিত্রকর নন-- তিনি আমার গুরু।তাঁর নাম আমার কাছে চিরকালীন এক শীতল অনুভব। এবং আমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র সঙ্গী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে- ‘কোনও নবীন লেখক যদি সূচনাপর্বে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে নিজস্ব ভাষা সন্ধানের চেষ্টা না করে, রবীন্দ্রনাথেই আপ্লুত হয়ে থাকে সে অতি মূর্খ। পরিণত বয়েসেও যদি কোনও লেখক রবীন্দ্রনাথের থেকে দূরে সরে থাকে, তাকে জীবনযাপনের সঙ্গী করে না নেয়, তাহলে সে আরও বড় মূর্খ।’
যুগ থেকে যুগান্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের আত্মার মনন ঘিরে থাকবেন। কিন্তু তাঁকে কীভাবে পাঠ করতে হবে, আবিষ্কার করতে হবে, তা আমাদের নতুন করে জানতে হবে পুনঃপাঠ ও পুনঃবিশ্লেষণের মাধ্যমে।তবেই তাঁকে সমকালে বারবার খুঁজে পাব।না-হলে আমরা ভীষণ বিপদজনক এক বাস্তবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আগামিতে, যেখানে মনে হবে, নিঃসঙ্গ নিরীশ্বর মহাবিশ্ব এমন একটি চেতনা, যা নিরর্থকই শুধু নয়, উদ্বেগজনকও। যে উদ্বেগ, যে ভয়, হতাশা এবং অস্বস্তি একসময় গোটা মানবিকসত্তাকে আগ্রাসীভাবে ঘিরে ধরবে। যার থেকে বেরিয়ে আসা মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই আমার কাছে ঘুরে ফিরে রবীন্দ্রনাথের বিকল্প রবীন্দ্রনাথই। আমার নিঃসঙ্গতার ভিতরে তিনিই একদিন গুঁজে দিয়েছিলেন বিশ্বচেতনার সঙ্গবোধ।
@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@
No comments:
Post a Comment