Tuesday, February 20, 2024

দেবাশ্রিতা চৌধুরী এবং অর্পিতা আচার্য- এর গল্পের বাঁকে বাঁকে জীবনের অদ্ভুত চিত্রকথা / তমালশেখর দে

 

 

           




গল্পের বাঁকে বাঁকে জীবনের অদ্ভুত চিত্রকথা

              আলোচনা ঃ তমালশেখর দে

 

 

গল্প কী শুধু ঘটনার মাঝেই লুকিয়ে থাকে? মনে হয় না । গল্প বলার ঢঙও জানতে হয় গল্পকারকে! সেটা যে যত ভাল জানে, সে তত ভাল গল্পকার নিঃসন্দেহে । ‘আকাল’ গল্পে লেখিকা গ্রামের একটি পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গ্রামের বর্ণনার আড়ালে আড়ালে গল্পকে নিয়ে যান টানটান এক পরিস্থিতির দিকে । “এই অভাগী গ্রাম থেকে এখন প্রায়ই কিশোরী- যুবতী মেয়েরা উধাও হয়ে যায়।” গল্পের শেষে এক ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে গল্পকার দাঁড় করিয়েও সরাসরি কিছু বলতে গেলেন নাকেবল সরল শিশুর প্রশ্নের উত্তরে এক  মায়ের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করালেন  “ও কিছু না । কারো মুরগির ঘরের ভাঙ্গা দরজা দিয়ে শেয়াল ঢুকেছে বোধহয়।” এখানেই গল্পের ইতি টানেন । কিন্তু গল্প শেষ হয় না ।  পাঠককে নিয়ে যায় আরও দীর্ঘপথ । আসলে এখানে গল্পকার দেবাশ্রিতা চৌধুরী-র দক্ষতা । ‘হাঁড়ি’ ‘দেবী’ ‘যাযাবর’ ‘ কুসুম’ ‘অচেনা গল্প’ ‘উজাগর’ প্রায়  প্রতিটি গল্পের ভিতরেই লেখিকা তার প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন দারুণ মুন্সিয়ানায়। প্রতিটি গল্পই এক শ্বাসে না-পড়া পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যায় না । অন্তত আমি পাইনি না-পড়ে ।  

অর্পিতা আচার্য কবি গল্পকার । মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা । ফলে তার গল্প-কবিতায় অনায়াসে বিচরণ করে মনের বিচিত্র জগতের রহস্য । এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । ‘ অন্ধকার’ গল্পেও আমরা মৌনীর  অন্ধকারময় মনোজগতের দেখা পাই । শাহিনের জন্য তার গুমরে ওঠা কান্না দেখতে পাই । গল্পকার শেষ লাইনে লিখছেন – “ সে এখন অন্ধকার খাবে, অন্ধকার মাখবে, অন্ধকারে গান গাইবে ... একা ” কোন দাঁড়ি, কমা ছাড়া শেষ হয়েও শেষ হয় না গল্পটা । মননের ভিতরে গুঞ্জরিত হতে থাকে মৌনীর  অন্ধকার । অনুগল্পের ঢঙে লেখা প্রায় প্রতিটি লেখা, দারুণ মুগ্ধ করে । ‘সাপ’ গল্পটাও বড় ব্যঞ্জনাধর্মী। ‘সারসাদিনই তো বই পড়ে অনিন্দ্য । বইয়ের মধ্যে খায়, বই এর মধ্যে ঘুমায় । শুধু মধ্য রাত্রে...’ তবে কী এখানেই গল্পকারের দুঃখ ? না, একটু এগুলে আমরা আরও ভিন্ন কিছু দেখতে পাই গল্পকার শেষ লাইনে এসে লিখছেন – “ সবুজ সাপের মত শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হেসে উঠি খিলখিল করে । ” এই হাসি ক্রমেই আলোর মত বিচ্ছুরিত হয় । কিন্তু এই বিচ্ছুরণ কিসের ?  চরম  আনন্দের না বেদনার ? মনোজগতের অন্ধকার জীবনে আবার উঁকি দিয়ে চরিত্রটিকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকেন গল্পকার অর্পিতা আচার্যের গল্প পাঠের অন্যরকম একটা মেজাজ আছে ।  তার গল্পের প্রতিটি চরিত্রই বিচরণ করে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, দুঃখ-বেদনা- সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে । ফলে তার গল্প পাঠে অন্য একটা মাত্রা পাওয়া যায় । ‘ট্রিকোটিলোম্যানিয়া’  গল্পও এক ভিন্ন আনে । এটাও একটা মনোবিজ্ঞানের টার্ম ।  “লোমশ শরীরটা গায়ে লাগলে রিয়ার শরীর শির শির করে ওঠে । মনে পড়ে যায়...” না, গল্পকার আর বেশিকিছু লেখেননি এব্যাপারে । রিয়ার জীবনের গোপন যন্ত্রণার কথা এভাবেই গল্পে তুলে ধরেন তিনি । ‘পাহাড়ি সন্ধ্যা’ ‘কেস নম্বর তেরো’ ‘উদ্বন্ধন’ ‘ভয়’ প্রতিটি গল্পই অনবদ্য পারদর্শিতায় সাজিয়েছেন লেখিকা ।

‘পিতলের পিলসুজ’ গ্রন্থটি দুই বোনের এক মনোরম সৃষ্টি । বইটি তারা উৎসর্গ করেছেন তাদের তৃতীয় বোন দেবদৃতাকে । প্রচ্ছদ করেছেন তীর্থঙ্কর দাস । ত্রিপুরার গল্পে এই বইটি আগামীতে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে ।

 

বই ঃ পিতলের পিলসুজ

লেখক ঃ দেবাশ্রিতা চৌধুরী

অর্পিতা আচার্য

প্রকাশক ঃ নীহারিকা

মূল্য ঃ ১৪০ টাকা

No comments:

Post a Comment

অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎

  'অরণ্যের নির্জনতা, ধান ক্ষেতে রঙীন শোভা, মাদলের শব্দ এর মধ্যেই আমি এখনও ডুবে আছি' ‎ ‎সত্তর দশকের উন্মাদনায় এক ভিন্ন উচ্চারণ-ভঙ্গ...